দম্যক আশ্রমে ব্যাসদেব
মহর্ষির রথ যখন আশ্রমে এসে পৌঁছল তখন ছাত্ররা সান্ধ্য প্রার্থনা করছে। সোমক মহর্ষি ও আচার্য গৌতমকে আশ্রমের তোরণদ্বারে একটি করে আম্রপল্লব দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। বললেন, আমরা ছাত্র ও আচার্যরা অপরাহ্ণ থেকে আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু আপনাদের আগমনে বিলম্ব হচ্ছে দেখে প্রার্থনার সময় হয়ে গেছে বলে তাদের প্রার্থনায় পাঠিয়ে দিয়েছি। আপনাকে আমাদের প্রণাম ভগবন। এই আশ্রম আপনার প্রতিষ্ঠিত। আপনার আগমনে তা পুনর্বার ধন্য হল।
ব্যাসদেব বললেন, ওঁ শান্তি। আমার জন্য বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন হয়ো না। আমার কোনও অসুবিধা হয়নি। রাজা যুধিষ্ঠির একটি দীর্ঘ সরণি তৈরি করে দিয়েছেন। দিব্যি রথ নিয়ে চলে এলাম।
আচার্য সোমক বললেন, এই পথে আমার যাওয়া হয়নি। কিন্তু আমার আচার্যরা ওই পথ ধরে যান। তাদের যাতায়াতের খুব সুবিধা হয়েছে। এখন প্রায়ই হস্তিনাপুর থেকে রাজকর্মচারীরা রথ চালিয়ে আসছেন।
মহর্ষি ও আচার্য গৌতমকে নিয়ে আশ্রমের কার্যালয়ে এনে বসালেন। তাঁদের জন্য শীতল পানীয় পরিবেশন করলেন। কিন্তু মহর্ষি বললেন, আমার এখনও সন্ধ্যাহ্নিক হয়নি। আমি জলস্পর্শ করব না।
সোমক বললেন, তাহলে আমি ব্যবস্থা করছি। আপনি সন্ধ্যাহ্নিক সেরে নিন।
বেদব্যাস বললেন, না, আমি সর্বাগ্রে অশ্বত্থামাকে দেখে আসি। তারপর সন্ধ্যাহ্নিক করে আচার্যদের সঙ্গে বসব। ছাত্রদের সঙ্গে কাল প্রভাতের প্রার্থনা সভায় আমি কিছু বলব। আমি আগামী পরশু ভোরে রওয়ানা হয়ে যেতে চাই। আপনাদের পুরনো সহকর্মী আচার্য গৌতম এই আশ্রমের ভার নেবেন। এই আশ্রমকে আমি সাধারণ বেদ শিক্ষাকেন্দ্র হিসাবে আর রাখতে চাই না। আমাদের শল্য চিকিৎসকের খুবই অভাব। মহারাজ যুধিষ্ঠির বলছিলেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সহস্র সহস্র আহত সৈনিক শল্য চিকিৎসকের অভাবে মৃত্যুবরণ করেছে। আমাদের দেশে সর্পদংশন ও বন্য জন্তুর আক্রমণে শত শত ব্যক্তি আহত হয়। কিন্তু চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। আমরা এই দমক আশ্রমটিকে শল্য চিকিৎসা বিদ্যালয় করতে চাই। আচার্য গৌতম এর ভার নেবেন। ইনি এই বিদ্যা নিয়ে যথেষ্ট চর্চা করেন। অথর্ববেদ মন্ত্রকে তিনি ব্যবহারে প্রয়োগ করে বেশ সফল হয়েছেন।
ক্ষত্রিয়দের ধর্মযুদ্ধ, মানে মনুষ্য নিধন। আমাদের ব্রাহ্মণদের ধর্ম মানুষকে পুনর্জীবন দেওয়া। জীবনের বিনির্মাণ। আমরা জীবনহত্তা নই, জীবনদায়ী মানুষ তৈরি করতে চাই। আমরা কাজ শুরু করে দিই। ভবিষ্যতে এই দেশ থেকে অনেক কৃতবিদ্য ভিষক তৈরি হবেন যারা মা বাসুকীর মতো পৃথিবীকে ধারণ করবেন।
আপনাদের আর একটি দুঃখজনক সংবাদ জানাই। মহা আচার্য সোমককে আমি মূল আশ্রম মহাবিদ্যালয়ে নিয়ে যাচ্ছি। তিনি এই অরণ্যের মধ্যে অসংখ্য আশাতরু সৃজন করে গেছেন। আচার্য গৌতম ওঁর যোগ্য উত্তরাধিকারী হবেন। আচার্য শারদ্বত কি এখানে উপস্থিত আছেন?
শারদ্বত উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হ্যাঁ প্রভু, আমি উপস্থিত আছি।
—তোমাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে। তুমি মহাচার্য সোমককে সাহায্য করবে। তুমি যেমন বিদ্বান তেমনি বিনয়ী। সেই প্রকৃত বিদ্বান যে বিনয়ী। বৃক্ষ যত ফলভারে পরিপূর্ণ হবে, তত নত হবে। তুমি অশ্বত্থামার খুব খনিষ্ঠ আমি শুনেছি। তুমি তাঁকে কীরকম বুঝেছ?
—প্রভু, যদি তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা জিজ্ঞাসা করেন, বলব তাঁর দেহে ধীরে ধীরে রাজযক্ষ্মার প্রকোপ দেখা দিচ্ছে। তিনি ক্রমশ হীনবল হয়ে পড়ছেন।
বেদব্যাস বললেন, অশ্বত্থামা এক বিভ্রান্ত ব্রাহ্মণ। সে ক্ষত্রিয় ধর্ম গ্রহণ করে নিজের বিপদ নিজে ডেকে এনেছে।
অস্ত্র এবং শাস্ত্র এ দুটিতে যারা ব্যুৎপত্তি অর্জন করে তাদের সঙ্গে সঙ্গে দরকার হয় আত্মজ্ঞান অর্জন। তা না হলে তারা দুটির মধ্যে তফাত করতে পারে না। আত্মজ্ঞান অর্জন করার জন্য আলাদা শক্তির দরকার। সেটি হল গাঢ় অনুভূতি আর সংবদেনশীলতা। সমস্ত মানুষ ও সমাজকে অনুধাবন করার ক্ষমতা। সমত্ব জ্ঞান। সর্বং খল্বিদং ব্রহ্মা। সমস্ত কিছুর মধ্যেই ব্রহ্মকে দেখার ক্ষমতা। ব্রহ্ম তো নির্গুণ নিরাকার। তাঁকে দেখা যায় না। অনুভব করতে হয়। এই অনুভব থেকেই আসে অনৃশংস, হিংসাহীনতা, অহিংসার ধারণা। ‘আমি বীর’, ‘আমি বিদ্বান’ এই অনুভব তো অহং। মানে তুমি সবার থেকে আলাদা। এটি অভিমান। বিদ্যা তোমায় শেখায় তুমিও ব্রহ্ম। ব্রহ্মের অংশও ব্রহ্ম। এটিই আত্মজ্ঞান। এই আত্মজ্ঞান নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দেয়। অশ্বত্থামার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। সে আবেগতাড়িত। আবেগতাড়িতদের এই পরিণাম হয়। তাদের মানসিক তাড়না শেষ পর্যন্ত দৈহিক ব্যাধিতে রূপ নেয়।
তোমরা জানো, আবেগতাড়িত হয়ে সে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম অপরাধ করেছে। সে নিদ্রিত শিশুদের হত্যা করেছে। একমাত্র অনুতাপের আগুনই তাকে পরিশুদ্ধ করতে পারে। আমি তাকে সুকর্মের দ্বারা পাপক্ষালনের জন্য এখানে পাঠিয়েছিলাম। সাধুসঙ্গে থেকে জ্ঞান ও কর্মের দ্বারা যদি সে নিজের ভুল বুঝতে পারে। যদি সে অনুতপ্ত হয়। তাহলে সে সুস্থ হয়ে উঠবে।
শারদ্বত বললেন, প্রভু, অশ্বত্থামার মধ্যে এক বিরাট নেতৃত্বগুণ লুকিয়ে আছে। অথর্ববেদ সম্পর্কে তার জ্ঞানও অপরিমিত। কিন্তু তার বড় গুণ, সে ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।
ব্যাস বললেন, শিক্ষকের প্রেষণাদান ক্ষমতাই সবচেয়ে বড় গুণ। শিক্ষক হবেন নির্লোভ, ছাত্ররাই হবে তার পুত্রসম পরম আত্মীয়। শাস্ত্র অধ্যয়নই তাঁর আত্মশক্তির উৎস, প্রাণের আরাম। মানুষ তৈরিই তাঁর তপস্যা। শিক্ষকতা সমস্ত ধর্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। সমস্ত কর্মের মধ্যে মহান। অশ্বত্থামা শাপভ্রষ্ট, বড় দুঃখী, পথভ্রষ্ট এক মহান বীর। তোমরা তাকে দু’দণ্ড শান্তি দিও। আর সে যে অসুখে ভুগছে, একদিন যদি এই বিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র ব্যুৎপত্তি অর্জন করে তাকে নিরাময় করে তুলতে পারে, সেটিই হবে এই বিদ্যায়তনের শ্রেষ্ঠ উপহার।
.
ব্যাস-অশ্বত্থামা সাক্ষাৎকার
আচার্যদের সঙ্গে দেখা করে মহর্ষি এবার অশ্বত্থামার ঘরে ঢুকলেন। কথা ছিল, মহর্ষি অশ্বত্থামার সঙ্গে একান্তে কথা বলবেন। তাই মহাচার্য গৌতম মহর্ষিকে দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে চলে এলেন।
অশ্বত্থামা প্রতীক্ষা করছিলেন। একটি কাষ্ঠাসনে তিনি বসেছিলেন। মহর্ষি আসবেন বলে আর একটি মৃগচর্মে মোড়া কাষ্ঠাসন তাঁর সম্মুখে পাতা। বেদব্যাস ঘরে ঢোকামাত্ৰ অশ্বত্থামা তাঁর পাদস্পর্শ করলেন। মহর্ষি এসে মৃগচর্মাসনে বসলেন। তিন বছর পর তিনি অশ্বত্থামাকে আবার দেখলেন। অশ্বত্থামা আরও বৃদ্ধ হয়েছেন। তাঁর দীর্ঘ পক্ককেশ আরও বিরল হয়ে এসেছে। তিনি এখন লাঠি ধরে চলেন। দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে ঢাকা মুখের ভেতর থেকে তাঁর কঠোর দুটি আয়ত চক্ষু এখনও রাত্রি শেষের নক্ষত্রের মতো জ্বলছে। কিন্তু তাঁর সমস্ত মুখমণ্ডল জুড়ে অবসন্নতার ছায়া। বেশ বোঝা যায়, তিনি রোগজর্জর।
অশ্বত্থামা তাঁকে দেখে বললেন, আপনার প্রতীক্ষায় এই তিন বছর ধরে অপেক্ষা করছি মহর্ষি।
মহর্ষি ঈষৎ হেসে বললেন, তুমি তো অনন্তকাল অপেক্ষা করতে পারো বৎস। তুমি তো চিরঞ্জীবী। কিন্তু আমি তা নই। কুরুবংশের পঞ্চম প্রজন্ম পর্যন্ত বেঁচে রইলাম। আমিই এখন কৌরববংশের মধ্যে প্রবীণতম ব্যক্তি। যুধিষ্ঠির আমাকে শিক্ষাবিস্তারের কিছু দায়িত্ব দিয়েছেন। সেগুলি সমাপ্ত হলেই চলে যাব।
অশ্বত্থামা বললেন, উত্তরার মৃত পুত্রকে শ্রীকৃষ্ণ কি বাঁচিয়েছেন?
—হ্যাঁ বৎস। তোমার ব্রহ্মশির অস্ত্র উত্তরার গর্ভস্থ সন্তানকে বিনষ্ট করেছিল। কিন্তু তোমার সংকল্প ভারতকে নিষ্পাণ্ডব করবে, তা হয়নি। কৃষ্ণ এসে মৃত পরীক্ষিৎকে বাঁচিয়েছেন। কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান। কোনও ঈশ্বরী ইচ্ছার বিরুদ্ধে মানুষী ইচ্ছা টিকতে পারে না। এই ভারতবংশের ওপর স্বয়ং বাসুদেবের আশীর্বাদ আছে। আমি দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছি, ভবিষ্যতেও এই মহান দেশকে বিনষ্ট করার অক্ষম চেষ্টা হবে। কিন্তু সত্য ও সনাতন ধর্মের এই পরম্পরাকে কেউ বিনষ্ট করতে পারবে না। অহিংসা ধর্ম চিরকাল টিকে থাকবে।
তারপর অশ্বত্থামার বিষণ্ন মুখের দিকে চেয়ে বেদব্যাস বললেন, পরীক্ষিতের পুনর্জীবন লাভে তোমার আনন্দই হওয়া উচিত অশ্বত্থামা। পরীক্ষিৎ যদি না বাঁচত, তাহলে সত্যধর্মের হন্তারক বলে তুমি ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে থাকতে। তুমি কী ভেবেছিলে, অরাজক ভারতবর্ষকে তুমি অধিকার করতে পারতে? তুমি ভারত ঈশ্বর হতে? দেশের রাজন্যবর্গ কী হত্যাকারীকে মেনে নিত?
তারপর ব্যাস অশ্বত্থামার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি একটি মহাপ্রলয়ের মুখে দেশকে ফেলে দিয়েছিলে অশ্বত্থামা। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বাঁচিয়েছেন।
ব্যাস বলে চললেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুদ্ধনীতির লঙ্ঘন হয়েছে একথা সত্যি। কিন্তু তবু এটি প্রধানত সম্মুখসমর। বীরেদের মধ্যে লড়াই। ধর্ম ও অধর্মের লড়াই। অসূয়া আর ইন্দ্রিয় পরতন্ত্রতার বিরুদ্ধে লড়াই। সে লড়াইয়ে অধর্ম পরাজিত হয়েছে। অসূয়া, লোভ, শঠতা, অহংকার, মোহকে হার মানতে হয়েছে। যুধিষ্ঠির একটি কল্যাণরাষ্ট্র স্থাপন করেছেন। তুমি শুধু প্রতিশোধস্পৃহায় এই মঙ্গলরাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে গিয়েছিলে। বলো, তোমার মধ্যে শেষ পর্যন্ত উচ্চাশা আর লোভ কী করে এত বড় হয়ে উঠল? তুমি তোমার ব্যক্তিগত ক্রোধ, উচ্চাশা, তোমার সমগ্র জীবনের হতাশাকে সমর্থন করে একটি তত্ত্ব গড়তে চেয়েছিলে—সন্ত্রাসতত্ত্ব। তাই কি না?
অশ্বত্থামা অধোবদন হয়ে রইলেন।
ব্যাস আবার বললেন, আমি তোমাকে এই দম্যক আশ্রমে পাঠিয়েছিলাম আত্মানুসন্ধানের জন্য। নগরীর জনারণ্যে সমস্ত মানুষই নিজেকে হারিয়ে বসে থাকে। সে নিত্যকর্মের মধ্যে এত ব্যস্ত হয়ে থাকে যে সংসার জীবনে তাঁর ধর্মাচরণ, তার জপ, তপ, ভজন, যজ্ঞানুষ্ঠান, সবই যেন একটি যান্ত্রিক কর্মসূচির মতো হয়ে পড়ে। যজ্ঞের আগুনে জীর্ণ মন ও মনন ধ্বংস হয়। পরিণামে তা কিছু ধুম ও ভস্মের সৃষ্টি করে মাত্র। আত্মানুসন্ধানের জন্য আলাদা আকুতি চাই। কস্তুরি মৃগের মতো আপন গন্ধে পাগল হতে না পারলে তুমি কখনও আপন রচিত আত্মবন্ধন থেকে মুক্তি পাবে না। রিপুর তাড়নায় কামকে তুমি প্রেম বলে গ্রহণ করবে, ক্রোধকেই ভাববে বীরত্ব, লোভকেই ভাববে ন্যায্য অধিকার, মোহকেই মনে করবে সৌন্দর্যপ্রিয়তা, আর মাৎসর্যকে ভাববে প্রতিশোধস্পৃহা।
এখানে তোমাকে পাঠানোর উদ্দেশ্যই ছিল আত্মজ্ঞান লাভ করে আরও বলশালী হয়ে ওঠা। যে শক্তি তোমাকে পুনর্জন্ম লাভে সাহায্য করবে। অশ্বত্থামা, কৃষ্ণ তোমাকে তিন হাজার বছর বাঁচার অভিশাপ দিয়েছেন। কিন্তু এই একই জীবনে তুমি বারবার পুনর্জীবন লাভ করতে পারো। সব মানুষই স্বল্পকালীন জীবন নিয়ে জন্মায়। কিন্তু যে বিনির্মাণ করতে জানে সে তার স্বল্প জীবনই বারবার ভাঙে, বারবার গড়ে। তোমার তো অনন্তকাল ধরে সুযোগ রয়ে গেছে। তুমি ইতিবাদী হও। যুগোপযোগী হও। মানুষই সমাজকে বারবার বদলায়। সমাজ মানুষকে বদলায় না। যে মানুষ শুধু কতগুলি জীর্ণ সংস্কার ও বিশ্বাসকে আঁকড়ে বসে থাকে, সে তো একটি মৃতদেহ আগলে বসে থাকে।
অশ্বত্থামা মহর্ষির কথা মন দিয়ে শুনছিলেন। তাঁর কথা শেষ হতে বললেন, মহর্ষি, আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ আমায় এই আশ্রমে পাঠানোর জন্য। প্রথম প্রথম আমার একটু অন্যরকম লাগলেও আমি স্বধর্মে ফিরে আসতে পেরে একটু একটু করে মনের দোলাচল কাটিয়ে উঠছিলাম। ভেবেছিলাম কৃষ্ণের অভিশাপ আমাকে আর স্পর্শ করবে না। আমি সুস্থই থেকে যাব। কিন্তু আমার মধ্যে যে অসুস্থতা দেখা দিয়েছে, তাতে আমি চিন্তিত হয়ে পড়ছি মহর্ষি। এখানে সবাই সন্দেহ করছে আমি দুরারোগ্য রাজযক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছি।
ব্যাসদেব বললেন, আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, আমি তোমায় হস্তিনাপুর থেকে ভিষক পাঠাব। তাছাড়া শীঘ্রই দম্যক আশ্রম বিদ্যাপীঠকে আমরা চিকিৎসাশাস্ত্র শিক্ষণের বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করছি। তবে তোমাকে বলে গেলাম তুমি অথর্ববেদের শাপমোচন মন্ত্রটি প্রতিদিন দুবেলা জপ করো। চতুর্থ কাণ্ডের ষষ্ঠ অনুবাকে পাবে।
সকল প্রাণের হে দ্যাবা পৃথিবী তোমরা অপরিমিত যোজন বিস্তীর্ণ হয়ে আছ, তোমরা সকল পাপ থেকে আমাকে উদ্ধার করো।
‘প্রতিষ্ঠে হাভভতং বসু নাং
তে নো মুঞ্চতং মং হসঃ।’
প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বেদব্যাসকে অশ্বত্থামা বললেন, আজকাল ছাত্র বা আচার্যরা কেউ আমার ঘরে ঢোকে না। আমি একাই প্রভাতে ও অপরাহ্ণে বনপথ ধরে একটু পদচারণা করি। বেশিদূর যেতে পারি না। আপনিই অবাধে আমার ঘরে ঢুকলেন। আমার সঙ্গে কথা বললেন। আপনি একটু সতর্ক থাকবেন মহর্ষি। আপনার জীবনের দাম আমার চেয়ে অনেক বেশি।
ব্যাসদেব বললেন, মানুষের স্পর্শ এড়িয়ে কোনো মহৎ মানুষ বেশিদূর চলতে পারেন না। অনেক ব্রাহ্মণ আছেন যাঁরা ছুঁৎমার্গী, কিন্তু আমি মনে করি মানুষ কখনও উচ্ছিষ্ট হয় না। অচ্ছ্যুৎ বলে কিছু থাকতে পারে না। নিজেকে সতত রক্ষা করতে হয় যোগ করে, পুষ্টিকর খাদ্য খেয়ে। মনকে রক্ষা করতে হয় ইতিবাচক চিন্তার দ্বারা। মনকে প্রফুল্ল আনন্দময় ও ক্রিয়াশীল রাখলে অন্য রোগ স্পর্শ করতে পারে না। আমি একথা মহাচাৰ্য গৌতমকে বলে যাব, তিনি তোমার যাবতীয় ভার নেবেন। আমি প্রার্থনা করব তোমার শাপমোচন হোক। তুমিও এই প্রার্থনা করো।
অশ্বত্থামা বললেন, এই তিন হাজার বছর আমি কী নিয়ে বেঁচে থাকব? এ তো বড় দীর্ঘ সময়। আমি তো জীর্ণ হয়ে যাব।
ব্যাসদেব বললেন, গৃহ যত জীর্ণ হয়, ততই সে পরিবর্তনের প্রয়াসী হয়ে ওঠে। গৃহের চার দেওয়াল, গবাক্ষ, মেঝে যতবার জীর্ণ হয়, ততবার তাকে নবনির্মাণ করতে হয়। ক্ষয় এবং বিনির্মাণ দেহেরই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর জন্য মৃত্যুর অপেক্ষা করতে হয় না। এই যে বিগত তিন বছরে তোমার মনের যে সব পরিবর্তনগুলি হয়েছে, তার দ্বারাই প্রমাণ হয় পুরাতন ধারণাকে পরিবর্তন করতে গেলে দেহ বিনাশ করার প্রয়োজন নেই। একই দেহে তুমি বারবার নবকলেবর লাভ করতে পারো।
—কীভাবে পরিবর্তন সম্ভব?
—শুধু নিত্যনতুন জ্ঞান সঞ্চয়ের দ্বারা। ব্যাস আরও বললেন, হিংসা আদিম রিপু। অজ্ঞানী মানুষ আর হিংস্র পশুর একমাত্র আশ্রয় হিংসা মানুষ যত সভ্য হয়েছে, সে তত জ্ঞান অর্জন করেছে। সেই জ্ঞান তাকে হিংসার চেয়ে আরও শক্তিশালী অস্ত্র তার হাতে তুলে দিয়েছে।
অশ্বত্থামা বললেন, কী সে অস্ত্র ভগবন? তা কী আমার মহাশির অস্ত্রের চেয়ে শক্তিশালী?
ব্যাস শান্ত কণ্ঠে বললেন, সমস্ত অস্ত্রের চেয়ে শক্তিশালী যে অস্ত্র, তার নাম ‘ভালোবাসা’। নির্মল চিত্ত হয়ে আত্মভূতের মধ্যে সর্বভূতকে দেখা। তুমি যদি নিজের মধ্যে সবাইকে দেখো, সবার মধ্যে নিজেকে দেখো, তাহলে তোমার মধ্যে আর হনন ইচ্ছা জাগবে না। সবাইকে আত্মবৎ ভালোবাসতে পারবে।
অশ্বত্থামা বললেন, সেই উপলব্ধি একমাত্র আপনার মতো ব্রহ্মজ্ঞানীদের পক্ষেই অর্জন করা সম্ভব। আপনারাই বলতে পারেন সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে এই উপলব্ধি কখনওই সম্ভব নয়।
ব্যাস বললেন, এই জন্যই তো শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রয়োজন। শিক্ষা মানুষকে নিজেকে জয় করতে শেখায়। দেখো, বিনাশ ও রোগের কারণ স্বরূপ কালচক্র ঈশ্বরের উদ্দেশেই নিরন্তর পরিভ্রমণ করছে। মানুষ ওই শরীরের অন্তর্গত ইন্দ্রিয়গুলিকে রুদ্ধ করতে পারলেই কাম, ক্রোধ, ভয়, লোভ, অভিদ্রোহ ও মিথ্যা প্রবৃত্তি দূর করতে সমর্থ হয়। যে ব্যক্তি ওই পঞ্চভূতের স্থূলদেহের অভিমান ত্যাগ করেন, তিনিই হৃদয়াকাশে পরমব্রহ্মের সাক্ষাৎকার লাভ করেন।
অশ্বত্থামা বললেন, আমি যদি ব্রহ্মদর্শন না করতে চাই। তাহলে? আমি নিজের অধিকারে বেঁচে থাকতে চাই।
বেদব্যাস বললেন, অশ্বত্থামা, বাঁচার অধিকার পাণ্ডবপুত্রদেরও ছিল। তুমি তাদের জীবনের অধিকার হরণ করে নিজে জীবনের অধিকার ভোগ করতে চাইছ।
—হ্যাঁ ভগবন, আমি বেঁচে থাকতে চাই। আমি জ্ঞানচর্চা, বিদ্যাচর্চা করেই বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু আমি কেন তা পারছি না?
—তুমি জানো, কেন পারছ না। কৃষ্ণের অভিশাপে দুরারোগ্য ব্যাধি তোমাকে গ্রাস করছে। আরও করবে।
— তাহলে আমি কী করব?
—আমরা তোমার সমুচিত চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। তোমাকে এমন জ্ঞান লাভ করতে হবে যাতে তুমি ইন্দ্রিয়াতীত নিরাসক্ত মননের অধিকারী হতে পারো। রোগযন্ত্রণার ঊর্ধ্বে উঠতে পারো। ব্যাধিকে উপেক্ষা করতে পারো।
—সেটি কীভাবে সম্ভব?
—একমাত্র পরমব্রহ্মের সন্ধানে জীবন অতিবাহিত করতে পারলেই তা সম্ভব। তুমি চক্ষু বন্ধ করো। মনে মনে দেবাদিদেব মহাদেবের ধ্যান করো।
অশ্বত্থামা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধ্যানাসনে বসলেন। উপবেশনে তাঁর ভীষণ কষ্ট। তবু কষ্ট উপেক্ষা করে তিনি বসলেন।
ব্যাস বললেন, চক্ষু বন্ধ করে মহাদেবের পঞ্চমুখের মধ্যে তাঁর দক্ষিণ মুখের ধ্যান করো। তোমার মনের মধ্যে কী জেগে উঠছে?
—শুধু কতগুলি ছিন্ন মুণ্ড, ছিন্ন দেহ, শত শত রক্তাক্ত মৃতদেহ। আমার সামনে ভেসে উঠছে শাণিত অসংখ্য খঙ্গ। মনে হচ্ছে এই শাণিত খাগুলি নিয়ে আমি শত্রুদের দিকে ছুটে যাই।
ব্যাস বললেন, আমি দুঃখিত অশ্বত্থামা, তোমার মন থেকে এখনও হিংসা যায়নি। মনকে যতদিন না হিংসাশূন্য করতে পারবে ততদিন পরমব্রহ্মের সাক্ষাৎ লাভ করতে পারবে না। মনঃসংযম মনকে ইন্দ্রিয় থেকে বিমুখ করাই হল ধর্মলাভের একমাত্র উপায়। তুমি মানুষের মঙ্গলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করো।
—কিন্তু আমি নিজেই দৈহিকভাবে অক্ষম। মন তো শরীরের অধীন
—কিন্তু শরীরও মনের অধীন। তুমি যদি মানসিক ইচ্ছার বিকাশ ঘটাও, মনকে পাহাড়ের মতো অটল করো, তাহলে তোমার শরীরও তোমার মনের মতো দৃঢ় হয়ে উঠবে। দৃঢ় মন মানে নীরোগ দেহ। মনের দৃঢ়তা আসে কোনো মহান লক্ষ্যের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে। নিজেকে সৎ, পবিত্র ও জ্ঞানী তৈরি করতে পারলে। হিংসা মনকে দূষিত করে, অপবিত্র করে। যে প্রাণ তুমি দিতে পারো না, তা নেওয়ার অধিকার তোমার নেই। তুমি সম্পূর্ণভাবে জ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করো—শান্তি পাবে। জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয় সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। তবু যদি কর্ম করতে না পারো, জ্ঞানচর্চাতেই জীবন অতিবাহিত করো।
অশ্বত্থামা বললেন, জ্ঞান, কর্ম, বেদান্ত, কার্য, ইন্দ্রিয় সংযম, তপস্যা, ও অহিংসা এর মধ্যে কোনটিকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন?
ব্যাসদেব বললেন, শরশয্যায় শায়িত ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলেছিলেন, অহিংসাই পরম ধর্ম। আমরা তাই একটা ধর্মের কথাই জানি। এটিই ভারতের সনাতন ধর্ম। অহিংসাই সত্য। সত্যমেব জয়তে।
অশ্বত্থামা বললেন, প্রভু, আমি তো চেষ্টা করে যাচ্ছি আমার অতীত ভুলে যেতে। আমি উপলব্ধি করেছি কর্মের মধ্যেই ধর্মের উপলব্ধি আরও দৃঢ় হয়। আমি তাই কর্মকেই ধর্ম বলে আঁকড়ে ধরেছিলাম। তা সত্ত্বেও কেন কৃষ্ণের অভিশাপ আমাকে পরিত্যাগ করছে না?
মহর্ষি বললেন, বৎস অশ্বত্থামা, মানুষ দৈবের অধীন, দৈবকে কেউ অতিক্রম করতে পারে না। সুতরাং সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য সবই দৈবের বিধান। উভয়কেই গৌরবের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। পণ্ডিতেরা গুণাতীত, অভিমানশূন্য, অভেদদর্শী (সমদর্শী)। ব্রাহ্মণের সুখকে সর্বসুখের আধার বলে নির্দেশ করে থাকেন।* কূর্ম (কচ্ছপ) যেমন দেহের মধ্যে নিজের অঙ্গকে সঙ্কুচিত করে রাখে, তেমন যে মহাত্মা রজোগুণ পরিত্যাগ করে নিজের সমস্ত কামনাকে সঙ্কুচিত করে বিষয় বাসনা পরিত্যাগ করতে পারেন, তিনিই যথার্থ সুখী হন।
[* মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বে ব্রহ্মা ঋষিদের এই উপদেশ দেন।]
অশ্বত্থামা বললেন, আমার তো কোনো বিষয় বাসনা নেই মহর্ষি। একমাত্র প্রাণ ছাড়া আর আমি নিজের জন্য কিছুই অবশিষ্ট রাখিনি। কিন্তু অমরত্বের অভিশাপে আমার প্রাণও আমার হাতে নেই।
বেদব্যাস বললেন, তোমার মনের ভেতর সমস্ত কামনারই কি অবসান হয়েছে? তোমার প্রতিহিংসার আগুনকে কি চিরদিনের মতো নির্বাপিত করতে পেরেছ? তোমার সুপ্ত চেতনার মধ্যে কি তোমার অতৃপ্ত কামনা ভস্মাচ্ছাদিত বহ্নির মতো ধূম উদ্গীরণ করছে না? খুব ভালো করে ভেবে দেখো। সবটাই কি শুধু ইন্দ্রিয়ের শাসন নাশন? নিয়ন্ত্রণাতীত কোনো দুর্বার আকাঙ্ক্ষার বীজ এখনও মনের মধ্যে সুপ্ত হয়ে আছে কি না।
অশ্বত্থামা বললেন, আমি বুঝতে পারছি না মহর্ষি। স্বীকার করছি দীর্ঘদিন ধরে জিঘাংসা প্রবৃত্তি আমায় কুরে কুরে খাচ্ছিল। আমি আমার বিদ্যা ও বুদ্ধি দিয়ে সেই জিঘাংসার একটি লোকায়ত রূপ দিতে চেয়েছিলাম। যার নাম দিয়েছিলাম ‘সন্ত্রাস শাস্ত্র’। সেটি হিংসার জয়গান। আমি প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম, বিনাশ ছাড়া নতুন সৃষ্টি হতে পারে না। ধ্বংস ছাড়া পুনর্নির্মাণ সম্ভব নয়। একটা জীবন ধ্বংস না হলে পুনর্জন্ম হতে পারে না।
`ব্যাস বললেন, বৎস, পৃথিবী এক বিরাট মায়ার কুহেলিতে আচ্ছন্ন। এই মায়াই আমাদের ইন্দ্রিয়াসক্ত করে তোলে। আমরা আত্মার চেয়ে ইন্দ্রিয়গুলিকে আপন করে তুলি। ইন্দ্রিয় ও আমাদের আসক্ত করে তোলে। এই আসক্তির বন্ধন কাটাতে না পারলে প্রকৃত জ্ঞান আহরণ সম্ভব নয়। বেদকে জানতে গেলে তাকে শুধু কণ্ঠে ধারণ করলে চলবে না, হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আর জীবনকে নিরাপদ রাখতে গেলে তাকে সব সময় সংযমের বেড়া দিয়ে রাখতে হবে। এ শিক্ষা শৈশব থেকে হওয়া চাই। তুমি যদি একটু অসতর্ক হও, তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে অত্যধিক স্নেহবশত তোমার ভ্রান্ত পথকেও অভ্রান্ত বলে ভাবেন তাহলে তার পরিণাম যা হয়, গান্ধারীর শত পুত্র তা প্রমাণ করেছে। নয়তো তারা প্রত্যেকে যথেষ্ট বীর ছিল। অসীম শক্তিধর ছিল; কিন্তু মনুষ্যত্বের পাঠ তারা নেয়নি। আত্মজ্ঞানের লেশমাত্র ছিল না। বৎস বেদ শুধু কণ্ঠস্থ করলেই বেদজ্ঞ হওয়া যায় না। বেদের বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। শৌর্যবীর্য, ধন-সম্পদ নিয়ে ধৃতরাষ্ট্রও তো বেঁচেছিলেন, কিন্তু ভারত ঈশ্বর হয়েও শান্তি পাননি কেন? বৎস, এই বনবাসের অভিশাপকে তুমি পরম প্রাপ্তি বলে গ্রহণ করো। শুধু আত্মজ্ঞানের পাঠ নাও। আত্মনির্মাণের কোনো বয়স নেই।
.
পরদিন প্রত্যুষের প্রার্থনা সভায় মহর্ষি উপস্থিত হলেন। ছাত্ররা সেদিন শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতার প্রথম শ্লোকটি সমবেতভাবে স্তোত্র আকারে পরিবেশন করল।
ওঁ। ইষে ত্বোর্জে ত্বা বায়বস্তু মৃ। দেবেবঃ সবিতা প্রাপয়তু শ্রেষ্ঠতমায় কৰ্মনে।*
[* হে দেব আমাদের অভীষ্ট পূরণ করার জন্য বল ও প্রাণদানের জন্য তোমাকে আহ্বান করছি। সৎ কর্মের দেবতা তোমরা আমাকে তোমাদের শ্রেষ্ঠতম কাজে নিয়োজিত করো।]
ব্যাসদেব স্বস্তিবাচন সেরে বললেন, আমার পরম প্রিয় বিদ্যার্থীগণ তোমাদের প্রার্থনা ফলবতী হোক। তোমরা সৎকর্মে নিয়োজিত হও। এখন প্রশ্ন হতে পারে, সৎকর্ম কোনটি? দান, তীর্থ, স্নান, তীর্থ মৃত্তিকা গায়ে লেপন, বেদ অধ্যয়ন। ইন্দ্রিয় সংযম ও দান। বেদোক্ত এই সব সৎকর্মের মতে শ্রেষ্ঠ হল দান। দাতাই যথার্থ প্রাণদাতা। ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে ভোজন দান করা অপেক্ষা মহাফলপ্রদ কাজ অল্পই আছে। দাতা ব্যক্তিরাই যথার্থ প্রাণদাতা। তাঁদের ওপরেই ধর্ম প্রতিষ্ঠিত থাকে। দান, সুন্দরভাবে বেদ অধ্যয়ন, ইন্দ্রিয় সংযম ও সর্বত্যাগের মতো উৎকৃষ্ট কর্ম। বুদ্ধিমান ব্যক্তিরাই দান, যজ্ঞ, সম্পত্তি, ও যশের সুখলাভের অধিকারী হয়। যে ব্যক্তি বিষয়সুখে আসক্ত হয় সে নিশ্চয়ই পরিণামে দুঃখ লাভ করে। যে ব্যক্তি তপস্যা প্রভৃতি কষ্টসাধ্য কাজে প্রবৃত্ত হয় সে পরিণামে সুখভোগ করে। এই পৃথিবীতে কিছু মানুষ পুণ্যশীল, কিছু মানুষ পাপপরায়ণ এবং বেশ কিছু মানুষ পাপ-পুণ্য বর্জিত। যাঁরা যজ্ঞ দান ও তপস্যা করে থাকেন তাঁরা পুণ্যশীল। যাঁরা যজ্ঞ দান ও তপস্যা করে থাকেন তাঁরা পুণ্যশীল। যাঁরা পরবিদ্রোহী (পরবিদ্বেষী) হয়ে অসৎ কাজ করেন তারা পাপপরায়ণ আর যাঁরা পরের ক্ষতি না করে ব্রহ্মযজ্ঞানুষ্ঠানে যত্নবান থাকেন তাঁরা পাপ-পুণ্য বর্জিত। তোমরা পুণ্যলাভের অধিকারী হয়েছ। সৎকার্য করে পুণ্যবৃদ্ধি করো।*
[* মহাভারতের অনুশাসন পর্ব থেকে ব্যাসের এই উপদেশ গৃহীত।]
ব্যাসদেব এইবার বললেন, তোমাদের এই বিদ্যাপীঠে আমরা নতুন পাঠসূচি নিয়ে আসছি। বেদকে শুধু আমরা তত্ত্ব হিসাবে দেখতে চাই না। তার প্রায়োগিক লোকহিত দিকটিও চর্চা করতে চাই। আমরা অথর্ববেদের প্রায়োগিক দিকগুলি তোমাদের শেখাব। আপাতত আমরা আরোগ্য শাস্ত্র নিয়ে শিক্ষণ দেব। আমাদের স্নাতকরা ভিষকের পুণ্যকর্মে প্রশিক্ষিত হয়ে মানুষের সেবা করবে। সেই সঙ্গে বেদ অধ্যায়ের পাঠ হিসাবে জ্ঞানকাণ্ড তো থাকছেই। কিন্তু আমরা বেদের জ্ঞানকাণ্ড ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে চাই। তোমাদের নতুন মহাচার্য গৌতম আমার সঙ্গে আছেন। তিনি তোমাদের পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বেই আমাদের নতুন কর্মকাণ্ড শুরু হবে। আরও চারজন আচার্য শীঘ্র যোগ দেবেন।
ব্যাসদেব বিদ্যার্থীদের আরও বললেন, প্রিয় বিদ্যার্থীরা, তোমরা আচার্যদের সন্তানতুল্য। তপোবন মানে তপস্যার বন। বহু তপোবনে ঋষিরা তপস্যার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদেরও তপস্যা করতে শেখান। সেটি হল অধ্যয়নই তপস্যা। তুমি যা কিছু একমন হয়ে করবে এবং তার জন্য সর্ব সময় দেবে সেটিই তপস্যা। কোনো তপস্যাই উদ্দেশ্যহীন নয়—সিদ্ধি অর্থাৎ সাফল্যলাভই তার উদ্দেশ্য। ছাত্রদের তপস্যা অধ্যয়ন, উদ্দেশ্য জ্ঞানলাভ। যে জ্ঞান তাদের চৈতন্যকে বিমুক্ত করবে। প্রজ্ঞাকে সংহত করবে। এবং নিজেকে জানতে সাহায্য করবে। নিজেকে জানার, নিজের চৈতন্যের স্বরূপকে জানা। তুমি কী চাও। কোনো কোনো বিষয়ে তোমার অনুরাগ ও প্রবণতা। জীবনের কোনো কোনো মূল্যবোধ তোমার কাছে স্বচ্ছ হয়ে ধরা দেয়। সনাতন ধর্ম কতগুলি ইতিবাচক মূল্যবোধের সমবায়ে গঠিত। তার মূল অস্ত্র হল সর্বখল্বিদং ব্রহ্ম। এই ব্রহ্ম চরাচর ব্যাপী এক অসীম সত্তা। তিনি প্রতিটি মানুষের দেহেও বিরাজমান। তার মূল সত্য হল, অনৃশংসতা, অহিংসা। মূল্যবোধগুলি কী? সত্য প্রেম সহযোগিতা, অনসূয়া, শম দম শৌচ নিজের বেশবাস ও মনকে সর্বদা মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখা।
জীবনের সারসত্য নিয়ে আমি একটি মহাগ্রন্থ রচনা করব মনস্থ করেছি। নানা ঋষি ও বিদ্বজ্জনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছি। বহু উপাখ্যান শুনে শুনে কণ্ঠস্থ করে রাখছি। তাতে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি ভারতের আত্মাই মূর্ত হয়ে উঠবে। তোমরা বিদ্যার্থীরা যারা বেদ অধ্যয়ন করছ, বেদের মর্মবাণীকে তোমরা তোমাদের প্রতিটি নিশ্বাসের সঙ্গে অন্তরে গ্রহণ করবে। কারণ বেদের সারাৎসার বেদান্তই হল ভারতের হৃদয়। যুধিষ্ঠির যে ধর্মরাজ্য গড়ে তুলতে চাইছেন, সেই ধর্মই ভারতের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। মনে রেখো, এই ধর্মরাজ্য যে মূল্যবোধের ওপর রচিত তা হল ভোগ নয় ত্যাগ, আত্মসংযম, কৃচ্ছ্রসাধন ও সৎ ধর্মনিষ্ঠ প্রজাপালন। এই সৎ, ধৈর্যশীল, পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল মানুষের ভিত্তি তৈরি হয় ছাত্রজীবনে। তার শিক্ষার উপাদানের মধ্যে, গুরুর মধ্যে, আচার্যের মধ্যে তার শ্রদ্ধেয় অনুকরণীয় মানুষেরা বাস করেন। গুরু-শিষ্যের মধ্যে শ্রদ্ধা-প্রীতি ও অনুরাগের সম্পর্ক তৈরির জন্যই ঋষিরা স্বল্প সংখ্যক ছাত্রকে নিয়ে তাঁদের তপোবন সৃষ্টি করেছেন। আমরা সেই তপোবনকেই একটু সম্প্রসারিত করে বিদ্যাপীঠ স্থাপনের পরিকল্পনা করেছি। আমরা দেশের প্রয়োজনের কথা মনে করে একটু বেশি সংখ্যক ছাত্র সমাগম ঘটাতে চাই। নতুন পর্যায়ে আরও ছাত্র এখানে আসবে। এই বিদ্যাপীঠ হয়ে উঠবে নব আত্মনির্মাণের পীঠভূমি। আচার্যদের দেখতে হবে সংখ্যাধিক্যের চাপে শিক্ষার গুণগত উদ্দেশ্য যেন চাপা না পড়ে। জনবল যেন কোলাহলে পরিণত না হয়। তবে সবশেষে আবার মনে করিয়ে দেব, জীবনধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম। মহাভারতের জীবনধর্ম হল অহিংসা। এই অহিংসার মন্ত্র শৈশব থেকেই ধারণ করতে হবে। মূল্যবোধের শিক্ষা শৈশবকাল থেকে না দিলে জীবন অপূর্ণ থাকে। আমরা ব্যবহারিক শিক্ষা প্রবর্তন করতে যাচ্ছি কিন্তু আমাদের মূল্যবোধের শিক্ষাকে সযত্নে ধারণ করতে হবে।
মনে রাখবে, পুরুষের সর্বোৎকৃষ্ট পরমার্থ ধর্ম এই অহিংসা ধর্ম। যে ব্যক্তি কাম, ক্রোধ ও লোভ ত্যাগ করে অহিংসা ধর্ম পালন করে তারই সিদ্ধিলাভ ঘটে। যে ব্যক্তি অহিংসক, যিনি নিরীহ প্রাণীদের নিজের সুখের জন্য হত্যা করেন না, তিনিই পরম সুখলাভ করেন। যিনি সকলকে নিজের মতো সুখ দিতে চান, দুঃখ থেকে বিরত রাখতে চান, সকলের প্রতি সমান দৃষ্টি সম্পন্ন হন, যিনি নিজের পক্ষে যা প্রতিকূল অন্যের প্রতি তা প্রয়োগ করেন না, তিনিই প্রকৃত অহিংসা ধর্ম প্রতিপালন করেন। অহিংসা মানে শুধু যুদ্ধবিরতি নয়—সর্বাঙ্গীণ শান্তি। ভীষ্মের এই অহিংসা ধর্মকেই আমরা দেশবাসীরা সবাই আত্মধর্ম বলে গ্রহণ করেছি। যুধিষ্ঠির এই অহিংস ধর্মকেই রাজধর্ম করেছেন।
ব্যাসদেব আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন। একটি ছাত্র উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, প্রভু আমার একটি প্রশ্ন আছে, যদি অভয় দেন তো বলি।
ব্যাসদেব পরম স্নেহে বললেন, প্রশ্ন করা প্রতিটি ছাত্রেরই কর্তব্য। এটি অধ্যয়নেরই অঙ্গ। প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া। এই ত্রিবিধ গুণের দ্বারাই প্রকৃত জ্ঞানলাভ হয়। আগে তোমার নামটি কী বলো।
—আমার নাম চন্দ্রচূড়। আমি পঞ্চ নদের অধিবাসী। আমার প্রশ্ন, অহিংস ধর্ম তো আজ সদ্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তা বেদের ধর্ম। কিন্তু এই যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয়ে গেল। শুনেছি এই যুদ্ধে মাত্র দশজন বেঁচে আছেন। পাণ্ডবেরা পাঁচভ্রাতা, ও কৃষ্ণ সাত্যকি আর কৌরবদের পক্ষে মাত্র তিনজন। তাদের একজন অশ্বত্থামা এখন আমাদের আশ্রমিক। কিন্তু তিনিও অসুস্থ। এই যে অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্য নিহত হল, এ তো প্রবল হিংসার ফল। এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা কী সবাই ধর্মচ্যুত হননি?
ব্যাস বললেন, বৎস, তুমি খুব ভালো প্রশ্ন করেছ। এই যুদ্ধ ন্যায়-নীতি ও মানবধর্ম লঙ্ঘনের ফল। কিন্তু লঙ্ঘনকারী কে?- তা বিচার করতে হবে। রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও রাজা দুর্যোধনের আত্মজ্ঞানের অভাব, অপরিণামদর্শিতা এই যুদ্ধের জন্য দায়ী। তাঁরা কেউই ধর্ম মানেননি। বিচক্ষণ প্রবীণদের উপদেশ শোনেননি। সর্বগ্রাসী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন।
— পাণ্ডবদের কি কোনো দোষই নেই? চন্দ্রচূড় আরও প্রশ্ন করল।
—যুধিষ্ঠিরের হঠকারিতার জন্য তো এই যুদ্ধে সবাইকে জড়িয়ে পড়তে হল। এই কথা শুনে আচার্যদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। একজন আচার্য উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, চন্দ্রচূড় তুমি উপবেশন করো। যুধিষ্ঠির আমাদের রাজা, রাজনিন্দা আমাদের আশ্রমে নিষিদ্ধ।
চন্দ্রচূড় বিব্রত হয়ে বসে পড়ল। ব্যাসদেব বললেন, বালক তো নিন্দা করেনি, সমালোচনা করেছে মাত্র। ছাত্রদের দেশের মঙ্গলামঙ্গল বিষয়ে সমালোচনা করার অধিকার আছে। অনেক সময় অজ্ঞানতা থেকেই সমালোচনা আসতে পারে। গুরুর কাজ হচ্ছে সমস্ত রকমের অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে ছাত্রদের আলোর পথ দেখাবেন।
শোনো বিদ্যার্থীরা, আসক্তি থেকে জ্ঞানী ও শ্রেষ্ঠ মানবরাও মুক্তি পান না। রাজারা প্রচুর পেয়েও আরও পেতে চান। আরও মণিরত্ন, আরও রাজ্য, আরও মহিষী লাভ করতে চান। সব কিছু আসক্তি থেকে আসে। রাজা যুধিষ্ঠির আমার পৌত্র—আমি নিঃসন্দেহে তার নেতিবাচক দিকগুলি নিয়ে বলতে পারি। তিনি সততার সঙ্গে দ্যুতক্রিড়ায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু দ্যূতক্রীড়ায় তাঁর আসক্তি ছিল। তিনি তাকেই ধর্ম বলে জ্ঞান করেছিলেন। ব্যাধ যেমন পশু হিংসাকে তার ধর্ম বলে ভাবে। আসক্তি বর্জন করলে তিনি দ্যূতক্রীড়ায় এসে আত্মহারা হয়ে সর্বস্ব পণ করতেন না। যারা মদ্যাসক্ত হয় তারাও প্রবল আসক্তির বসে মদ্যপানকেই ধর্ম বলে ভাবে। দস্যুরাও ঈশ্বর আরাধনা করে। কারণ হিংসা, পরস্বপহরণ তাদের ধর্ম। বৎস, ধর্মের নামে সর্বত্র অধর্মাচরণ হচ্ছে। ধর্ম পালনই ধর্ম। ধর্ম আচরণই ধর্ম নয়। ধর্ম কতগুলি নিয়ন্ত্রক রেখা। যা জীবনকে কখনও প্লাবিত হতে দেয় না। বিনষ্টি থেকে রক্ষা করে। ধর্ম কতগুলি মূল্যবোধ। তা যতখানি অন্যের জন্য, ঠিক ততখানিই নিজেকে পালনের জন্য। দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে আরও বেশি করে সচেতন থাকতে হয়। যে কোনো বিচ্যুতি প্রলয়কাণ্ড ঘটাতে পারে। হিংসা দাবানলের মতো সব কিছু গ্রাস করে নেয়। অগ্নিহোত্রীর মতো সে অগ্নিকে শুধু সক্রিয় রেখে দিতে হয়। ভবিষ্যতে হোমাগ্নি জ্বালাবার জন্য। কিন্তু ভস্মাচ্ছাদিত অগ্নিতে ফুঁ দিতে নেই।
একটু থেমে মহর্ষি বললেন, তবে এই যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল বৎস। প্ৰয়োজন এই কারণে যে হিংসা যে কী বীভৎস তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার জন্য। আচ্ছা, তোমরা এখানে উনিশজন ছাত্র উপস্থিত আছো। তোমাদের মধ্যে এই যুদ্ধে কারও কি আপনজন নিহত হয়েছে?
ছাত্ররা হাত তুলল। দেখা গেল উনিশজনের মধ্যে অন্তত সাতজনেরই খুব নিকটজন যুদ্ধে নিহত হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশের বাবা, দাদা বা আত্মীয়রা কেউ যুদ্ধে যায়নি। কারণ তারা ব্রাহ্মণ। শুধু ক্ষত্রিয় ছাত্রদেরই আপনজন বিয়োগ হয়েছে।
ব্যাসদেব বললেন, এই যুদ্ধই আমাদের অহিংস ধর্মের প্রতি আরও শ্রদ্ধাপরায়ণ করে তুলবে। আমরা জীবন দিয়ে হিংসার পরিণাম দর্শন করেছি। রাজা যুধিষ্ঠির তাঁর নিজের ভুলও বুঝতে পেরেছেন। তিনিও শান্তি চান। পাণ্ডববংশের একমাত্র অধিকারী শিশু পরীক্ষিৎকে তিনি শৈশব থেকেই শান্তির সঙ্গে দীক্ষিত করে তুলবেন।
নিস্তব্ধ সভায় বেদব্যাস বললেন, আর একটি কথা বলেই আমার প্রবচন শেষ করব। গণশিক্ষার মতো রাজ্যশাসন শিক্ষাও দেশের মঙ্গলের পক্ষে খুব প্রয়োজনীয়। রাজার পাপে রাজ্যনাশ নয়। রাজার অবিমৃষ্যকারিতায় যেমন যুদ্ধ বাধতে পারে, তেমনি রাজ্যের বিনাশও ঘটে। তাই বলছিলাম, রাজাকে হতে হবে সত্যবাদী, চরিত্রবান, তিনি সাধুদের পরিত্রাণ করবেন, অসাধু অর্থাৎ দুর্নীতিপরায়ণদের কঠোর শাস্তি দেবেন। তাদের শূলবিদ্ধ করবেন। দুর্নীতিকে কখনও প্রশ্রয় দেবেন না। অসাধুদের কাছ থেকে কোনো সাহায্যই নেবেন না। রাজার পরিচয় তাঁর সভাসদ ও অমাত্যদের চরিত্র দিয়ে। তিনি নিজে সাধু, সৎ হলে হবে না, তার পরিষদ অমাত্যবর্গ ও সভাসদদেরও সাধু হতে হবে। রাজা কান দিয়ে দেখেন। তাঁকে বধির হয়ে তাঁর তৃতীয় নয়ন উন্মীলিত করতে হবে। অসাধু রাজা নিজে সর্বদা চাটুকার পরিবৃত হয়ে থাকেন। চাটুকারদেরই রাজ পুরস্কারে ভূষিত করেন। পরভৃতিকার মতো যারা রাজার প্রিয় ব্যক্তিদের গায়ে সেঁটে থাকে, তাদের পদলেহন করে সমৃদ্ধ হয় রাজার দৃষ্টি তাদের দিকেই পড়ে। যেমন আকাশের চিল বহু কিছু দেখে কিন্তু সর্বাগ্রে তাদের চোখ পড়ে মৃত কুৎসিত জীবদেহের দিকে।
রাজা সর্বদা পুরবাসী ও জনপদবাসীদের দোষ-গুণ অবহত হওয়ার জন্য সব সময় চেষ্টা করবেন। বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের বিচারক নিযুক্ত করবেন উৎকোচজীবী (ঘুষখোর ), পরদারহরণকারী, যারা কথায় কথায় উগ্রদণ্ড দেয় (বাহুবলী) মিথ্যাবাদী, অন্যের অনিষ্টকারী, লুব্ধ স্বভাব (লোভী), পরধন অপহরণকারী (চোর, লুঠেরা), অসৎ কর্ম অনুষ্ঠানরত (জুয়ারি, চোরা কারবারি), সভাভঙ্গকারী (ভাড়াটিয়া দুর্বৃত্ত) ও জাতিনাশকারী বর্ণদূষকদের দেশ-কাল বিবেচনা করে কখনও সুবর্ণদণ্ড, কখনও প্রাণদণ্ডের আদেশ দেবেন। রাজা সব সময় খেয়াল রাখবেন, গুণী ব্যক্তিদের গুণ যাতে পরিবর্ধিত হয় ও তাঁরা যাতে সেই গুণ থেকে বিচ্যুত না হন। অধ্যবসায় সম্পন্ন, পরাক্রমশালী। কষ্ট সহ্য করতে পারে এমন ব্যক্তি প্রভুভক্ত, গরু ও গাধার মতো কেবল আহারমাত্র গ্রহণ করে নিজের কাজটি করে সেদিকেই সর্বদা চোখ থাকবে। সর্বদা নিজের ও শত্রুর ছিদ্র অন্বেষণ করবে। সব সময় খেয়াল রাখবে গুণী ব্যক্তিদের গুণ যাতে পরিবর্ধিত হয় ও তাঁরা যাতে সেই গুণ থেকে বিচ্যুত না হন।
মহর্ষি বললেন, রাজার কাজকর্মও প্রজাদের সর্বদা নিরীক্ষণ করা উচিত। রাজা যদি লোভী হয়, অসূয়াগ্রস্ত হয়, দুর্নীতিতে ডুবে থাকে, তাহলে সে যোগ্য লোকের মর্যাদা দেবে না। স্তাবকদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকবে। স্তাবক পরিবেষ্টিত রাজ্য মেঘাবৃত সূর্যের মতো। তার কিরণ এসে সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছবে না। সে সংখ্যাধিক্য, ও অর্থ দিয়ে সত্যকে কিনতে চাইবে। ধৃতরাষ্ট্র মনে করেছিলেন আমার শত পুত্র আর পাণ্ডবদের মাত্র পাঁচজন, আমরা ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ। ওরা রাজ্যচ্যুত বনবাসী, সর্বহারা। সত্য কখনও সংখ্যার জোরে প্রতিষ্ঠিত হয় না। একাদশ অক্ষৌহিণীকেও সপ্ত অক্ষৌহিণী নিঃশেষ করে দিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এটিই প্রমাণ করে দিল বাহুবল একমাত্র বল নয়, মনোবলই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। যারা বাঁচল তারা নিত্যগ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকল। এই যুদ্ধে সবচেয়ে দুঃখী মানুষ তিনি, যিনি এই যুদ্ধে জিতে রাজা হয়েছেন। তিনি স্বয়ং যুধিষ্ঠির। আর এই প্রবল যুদ্ধের প্রতিঘাত থেকে আশ্চর্যভাবে বেঁচে ফিরেও অশ্বত্থামা সুখী হতে পারেননি। তিনি এই আশ্রমে সুখের সন্ধান করতে এসেছেন।
মহর্ষি এবার নীরব হলেন। তারপর বললেন, আমি এই প্রহরেই ভাগীরথী আশ্রমে রওয়ানা হয়ে যাব। আজ এখানেই বিদায় নিচ্ছি। এই আশ্রম এখন বিরাট পরিবর্তনের পথে। আর কিছুদিনের মধ্যে সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়ে যাবে। বিদায়। বলো ওঁ শান্তি। ওঁ শান্তি। ওঁ শান্তি।
সভাস্থলে সমবেত কণ্ঠে শান্তিমাত্র ধ্বনিত হল। একজন ছাত্র বলল, প্রভু, আবার কবে আসবেন?
মহর্ষি বললেন, কালই আমার গতি নির্ধারক। আমার তো মন পড়ে থাকে এই আশ্রমের প্রতি। এটি আমার প্রথম আশ্রম স্থাপনা।
আচার্য সোমক বললেন, মহর্ষি, আমাদের আনন্দ সরোবর দেখতে যাবেন। তোমরা ধীরে ধীরে অনুগমন করো।
.
মহর্ষি যখন পায়ে হেঁটে অদূরে আনন্দ সরোবরের পাড়ে এসে পৌঁছলেন, দেখলেন তার পাড়টির চারদিকে চারটি দেবদারু পাতা দিয়ে তোরণ করা হয়েছে। একটি গৈরিক কাপড়ে লেখা ‘স্বাগতম মহর্ষি’। মহর্ষির আগমন সংবাদ পেয়ে সুদূর গ্রামাঞ্চল ও পাহাড়ের তলদেশে বসবাসকারী কিরাত সম্প্রদায়ের কিছু নর-নারী তাদের বিচিত্র পোশাক পরে ঢোলক বাজাতে বাজাতে এসেছে। সরোবরের চারটি পাড় এখন জনাকীর্ণ। মহর্ষির উপবেশনের জন্য সরোবরের দক্ষিণ তীরে ইষ্টক নির্মিত সারি সারি অস্থায়ী আসন করা হয়েছে। প্রতিটি আসন মৃগচর্ম দিয়ে ঢাকা।
মহর্ষি এসে উপবেশন করলে সমবেত জনতা উচ্চৈস্বরে কী যেন ধ্বনি তুলতে লাগল বেদব্যাস কিছু বুঝতে না পেরে সোমককে জিজ্ঞাসা করলেন, ওরা কী বলছে?
সোমক বলছে, মহারাজ যুধিষ্ঠিরের জয় হোক
ব্যাস জিজ্ঞাসা করলেন, এরা কী ভাষায় কথা বলে?
—স্থানীয় পাহাড়ি আর দেহাতি ভাষা।
—এরা কি প্রাকৃত বা পালি বুঝবে? সংস্কৃত তো একদম বুঝবে না। তাহলে এদের সঙ্গে কী ভাষায় কথা বলব?
—আপনি সংস্কৃততেই বলুন। আমি ওদের ভাষায় বুঝিয়ে দেব।
মহর্ষি গঙ্গাবন্দনা করে বললেন, প্রিয় গ্রামাবাসিবৃন্দ, তোমাদের যে আজ এখানে দেখা পাব তা ভাবিনি। তোমরা আগে বলো হস্তিনাপুর তো এখান থেকে অনেক দূর। তোমরা কি কেউ সেখানে গিয়েছ?
জনতা বলল, না প্রভু। আমরা এই পাহাড়ের বাইরে আর কোথাও যাইনি। এখানেই আমাদের জন্ম, এখানেই মৃত্যু
—কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কথা শুনেছ?
একজন বলল, তা শুনেছি, আমাদেরই কত জওয়ান এই যুদ্ধে মরেছে।
—কারা জিতেছিল এই যুদ্ধে?
—মহারাজ যুধিষ্ঠির।
—আমি বলব, না, জিতেছিল ধর্ম। ধর্ম কী তা বলতে পারো?
একজন বলল, ধর্ম মানে পুজো। এই যে আমরা শিবের পুজো করি, পাথরে ফুল চড়াই, সেটাই ধর্ম।
বেদব্যাস বললেন, না, সেটা ধর্ম নয়। সেটা তোমার ঈশ্বরে বিশ্বাস। ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। এই গাছ, পাথর, পাহাড়, মানুষ, জন্তু, সবাইকে সৃষ্টি করেছেন। এই সবাইকে নিয়ে আমরা কীভাবে চলব? গাছপালা, পাহাড়, জীবজন্তু থেকে বাবা, মা, ভাই, বোন, সবাইকে নিয়ে চলতে গেলে আমাদের সবাইকে ভালোবাসতে হবে। রাগ দমন করতে হবে। কারণ রাগ বা ক্রোধই আমাদের ভালোবাসার শত্রু। রাগ থেকেই হিংসা আসে। হিংসা থেকে যুদ্ধ। যুদ্ধ থেকে লোকক্ষয়। সবচেয়ে বড় ধর্ম হল, অহিংসা, ভালোবাসা।
ব্যাসদেব যখন সহজ-সরল ভাষায় অহিংসা, প্রেম ও ভালোবাসার তত্ত্ব বোঝাতে শুরু করেছেন, ঠিক সেই সময় দেখলেন দুর্বল শরীরে টলতে টলতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছেন অশ্বত্থামা।
ব্যাসদেব চিৎকার করে উঠলেন, অশ্বত্থামা, তুমি এভাবে আসছ কেন? তিষ্ঠ, তিষ্ঠ। পড়ে যাবে যে।
অশ্বত্থামা সেই কণ্ঠ শুনতে পেলেন কি না বোঝা গেল না। তিনি স্খলিত চরণে এগিয়ে আসছেন। ছাত্ররাও চেঁচাচ্ছে, প্রভু, আপনি পড়ে যাবেন। আর অগ্রসর হবেন না।
কিন্তু কেউ এগিয়ে এসে অশ্বত্থামার হাত ধরল না। যে যেখানে উপবিষ্ট, সেখানেই স্থাণুর মতো বসে চিৎকার করতে লাগল।
এবার বেদব্যাস নিজেই দ্রুত চরণে এগিয়ে গেলেন। গিয়ে অশ্বত্থামাকে ধরলেন। অশ্বত্থামা বেদব্যাসের চরণপ্রান্তে লুটিয়ে পড়ে অশ্রুসজল কণ্ঠে বলতে লাগলেন, প্রভু, আজ আমি ধন্য হলাম। আপনার করস্পর্শে আনন্দ সরোবরের জল পবিত্র হল। আপনি আমায় নিজহাতে এই শান্তিবারি ছিটিয়ে দিন।
ব্যাস তাঁর দুই হাত ভরে সরোবরের জল অশ্বত্থামার মাথায় ছিটিয়ে দিতে দিতে মন্ত্রপাঠ করতে লাগলেন।
ইমং মে গংগে যমুনে সরস্বতী
স্তোমং সতো পুরুষ্ণ্যা অসিকনা মরুদ্বৃধে
বিতাস্তয়াজীকীয়ে শৃণুহ্যা সুষোময়া*
[* হে গঙ্গা, হে যমুনা ও সরস্বতী। হে শুভদ্রি (শতদ্রু) ও পরুষ্ণি আমার এই স্তবগুলি তোমরা ভাগ করে নাও। হে অশ্বিনী সংগতা মরুদবৃথা নদী, হে বিতস্তা ও সুমো সংগতা আজীকীয়া নদী তোমরা শ্রবণ করো। –ঋগ্বেদ। ৭৫ নং সূক্ত।]
সরোবরের চারপাশ থেকে ধ্বনি উঠল, সাধু সাধু।
আনন্দ সরোবরের পাড়ে পাতা অতিথি ও আচার্যদের জন্য নির্দিষ্ট আসনে ব্যাস অশ্বত্থামাকে বসিয়ে দিয়েছেন। তিনি বললেন, দ্রোণপুত্র, তোমাকে কিছু বলতে হবে। এককথা দুকথায় তুমি মনের ভাব প্রকাশ করো।
অশ্বত্থামা উঠে দাঁড়িয়ে উচ্চৈস্বরে শুধু বললেন, ওঁ স্বস্তি। ওঁ স্বস্তি। ওঁ স্বস্তি। তারপর
বসে পড়লেন।
এবার সমুদ্রের কলতান উঠল, সাধু। সাধু। সাধু।
—
* মহাভারতে বারবার যুধিষ্ঠিরকে সমগ্র পৃথিবীর অধীশ্বর বলা হয়েছে। তখন ভারতকেই পৃথিবী বলা হত কী?
* মহাভারতে রাজসূয় যজ্ঞতেও স্ত্রী দানের কথা আছে। এই ‘স্ত্রী’ কারা?
