শেষ রাত্রির সন্ত্রাস
অশ্বত্থামা অশ্বচালনা করে পাণ্ডব শিবিরে এসে যখন পৌঁছলেন তখন রাত্রির চতুর্থ প্রহর। হাতে সময় খুব কম। তাঁর পিছনে পিছনে কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা অশ্ব নিয়ে উপস্থিত হলেন।
অশ্বত্থামা দেখলেন শিবিরের দ্বারে দাঁড়িয়ে এক মহাকায় পুরুষ শিবির পাহারা দিচ্ছে। তিনি যেন চন্দ্র ও সূর্যের প্রভা সম্পন্ন। তাঁর বদনমণ্ডল বিচিত্র, তার সহস্র নেত্র, বাহু দীর্ঘ, তাঁর মুখ হাঁ করা। অতিভয়ংকর চন্দ্ররাজি দেখা যাচ্ছে। তাঁর গায়ে কৃষ্ণবর্ণ উত্তরীয়। পরনে রক্তে ভেজা ব্যাঘ্রচর্ম, গলায় বেষ্টিত উপবীতের মতো সৰ্প। সেই ভীষণদর্শন মহাপুরুষকে দেখে অশ্বত্থামা চিনতে পারলেন তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং মহাদেব। তাঁর সহস্র নেত্র থেকে তেজোরাশি নির্গত হচ্ছিল। সেই তেজোরাশি বেরিয়ে আসছিল শঙ্খ-চক্রধারী অসংখ্য হৃষীকেশের অবয়ব।
অশ্বত্থামা এই অলৌকিক তেজঃপুঞ্জের সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলেন না। এও কি দৈব, স্বয়ং মহাদেব পাণ্ডব শিবির সহস্র সূর্যের মতো পাহারা দিচ্ছেন!
অশ্বত্থামা সেই ভয়ংকর অদ্ভুতদর্শন মহাপুরুষকে অবলোকন করে বিন্দুমাত্র ভীত না হয়ে তাঁর প্রতি দিব্যাস্ত্র নিক্ষেপ করতে শুরু করলেন। কিন্তু তাঁর সমস্ত অস্ত্র প্রয়োগ ব্যর্থ হল। তখন অশ্বত্থামা আকাশের মতো নীল বর্ণের একটি খঙ্গ সেই পুরুষের প্রতি নিক্ষেপ করলেন। মনে হল যেন বিবর (গর্ত) থেকে একটি ভীষণ সর্প তীব্রবেগে তার শিকারের দিকে ছুটে গেল। কিন্তু সেই দিব্যাস্ত্রও সেই দিব্যপুরুষ যেন লুকিয়ে থাকা নকুলের মতো ধরে খেয়ে ফেললেন। অশ্বত্থামা এবার তাঁর প্রতি ইন্দ্রধ্বজের মতো প্রজ্বলিত গদা নিক্ষেপ করলেন। সেই অলৌকিক মহাপুরুষ তা নিমেষে গ্রাস করে ফেললেন।
অশ্বত্থামা বিস্মিত হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন সেই মহাপুরুষের তেজোরাশি থেকে অসংখ্য হৃষিকেশ আকাশ সমাচ্ছন্ন করে রয়েছেন। অশ্বত্থামার মনে হল যে সুহৃদের কথা না শুনে হঠকারির মতো কাজ করে তার পক্ষে এমন বিপদ ঘনিয়ে আসা স্বাভাবিক। আমি গোপনে শিবিরে ঢুকে আমার কাজ শেষ করব ভেবেছিলাম, অকস্মাৎ একী বিপত্তি এসে উপস্থিত। শাস্ত্রবাক্য লঙ্ঘন করার ফল এখন হাতে হাতে টের পাচ্ছি। এখন বৃদ্ধ ব্যক্তিরা যা উপদেশ দেন তা যথার্থ বলে মনে করছি। তাঁরা বলেন, গো, ব্রাহ্মণ, নৃপ, স্ত্রী, সখা, মাতা, গুরু এবং মৃতপ্রায়, জড় অন্ধ, ক্ষীণ নিদ্রিত, ভীত মদমত্ত, উন্মক্ত ও অনবিহিত (দুর্বল, প্রতিরোধে অসমর্থ) ব্যক্তিদের ওপর আঘাত হানতে নেই। আমি সেই শাস্ত্রবিহীন, সনাতন পথ অতিক্রম করে কুপথে গিয়ে ঘোরতর বিপদে পড়েছি। বিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতে কোনো মহৎ কাজ শুরু করে তা থেকে বিরত হওরাও আবার ঘোরতর বিপদের বিষয়। সে ব্যক্তি তখন ধর্মপথ পরিভ্রষ্ট হয়। প্রতিজ্ঞা করে তারপর সে কাজ থেকে পিছু হঠে আসা ওই ব্যক্তির বিরাট অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। ইনিই দেখছি আমার অধর্ম প্রবৃত্ত কলুষিত বুদ্ধির ভয়ংকর পরিণতির সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি। আমি কখনও যুদ্ধ থেকে সরে আসিনি। কিন্তু দেখছি দৈবই আমাকে যুদ্ধ থেকে বিরত করতে চলেছে। দৈব প্রাপ্ত না হলে আমি এই কার্য সাধন করতে পারব না। এখন আমার একমাত্র ভরসা দেবাদিদেব মহাদেব। আমি তাঁর শরণাপন্ন হবো।
অশ্বত্থামা তখন অশ্ব থেকে নেমে করজোড়ে শিবের স্তব করতে শুরু করলেন। বললেন, তুমি চন্দ্রমৌলি ও হিরণ্যকবচধারী। তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ নেই। তুমি অস্ত্রবিশারদ, দিগন্ত ও গো-রক্ষক। আমি একাগ্রচিত্তে তোমারই শরণাগত হলাম। আমি যদি বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে পারি তোমাকে আমার শরীরের পঞ্চভূত উপহার দিয়ে পূজা করব।
অশ্বত্থামার স্তবের ফলে তার সামনে একটি স্বর্ণ বেদি তৈরি হয়ে গেল। দিকমণ্ডল ও আকাশমণ্ডল উদ্ভাসিত করে ভগবান মহাদেব সেই বেদির ওপর উদ্ভাসিত হলেন। সেই সঙ্গে তাঁর সহচরদের ভিড়ে প্রাঙ্গণ ভরে উঠল। এই সহচরেরা সব অদ্ভুতদর্শন জন্তু। তাদের কারও কুকুর, উট আর বরাহের মতো মুখ। কারও বা মাথা নেই, কারও পেট অতি ছোট, কারও কান গর্দভের মতো। কেউ উষ্ণীষধারী, কারও গলায় মুণ্ডমালা, আবার কারও মস্তক ও উৎপলে শোভিত।
ওই অদ্ভুতদর্শন প্রাণীরা ভেরী, শঙ্খ, মাদঙ্গ, আনঘ, গোমুখ ভেরী প্রভৃতি বাদ্য বাজাতে লাগল। কেউ লাফাতে লাগল মত্ত মাতঙ্গের মতো আর ছোটাছুটি করতে লাগল।
অশ্বত্থামা বিন্দুমাত্র ভীত না হয়ে মহাদেবকে তাঁর দেহ উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত হলেন। তিনি কৃতাঞ্জলি হয়ে বন্দনা করতে লাগলেন। আমি তোমার জন্য হুতাশনে আত্মাহুতি দেবার সঙ্কল্প করেছি। তুমি আমাকে গ্রহণ করো।
বেদিতে হোমাগ্নি জ্বলছিল। অশ্বত্থামা বেদিতে উঠে হুতাশনের মধ্যে প্রবেশ করলেন। তখন ভগবান মহাদেব হাস্যমুখে তাঁকে বললেন, হে বীর, মহাত্মা কৃষ্ণ সত্য, শৌচ, দান, তপ, ক্ষমা, ধৃতি, (ধৈর্য) বুদ্ধি ও বাক্যে আমার আরাধনা করেছেন। তাঁর থেকে প্রিয় আমার আর কেউ নেই। সেই কৃষ্ণ আমায় স্মরণ করায় আমি তাঁরই জন্য আমি এতক্ষণ পাণ্ডব শিবির সুরক্ষিত করে রেখেছিলাম। কিন্তু পাঞ্চালেরা কালগ্রস্ত হয়েছেন।* আজ আর তাদের জীবন রক্ষা হল না। এই বলে মহাদেব নিজেই এগিয়ে এসে অশ্বত্থামার হাতে একটি শাণিত খড়্গা দিয়ে তাঁর শরীরে প্রবেশ করলেন।
[* তাঁদের আয়ু শেষ হয়ে এসেছে।]
অশ্বত্থামা তখন দ্বিগুণ তেজে জ্বলে উঠলেন। তিনি পাশে তাকিয়ে দেখলেন কৃপ ও কৃতবর্মা এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারা যেন এক মহানাটকের অভিনয় দেখছে। তারা বিস্ময়ে নিস্পন্দ।
অশ্বত্থামা মাতুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকে কী দেখছেন? এইবার আমাদের কার্য করার মাহেন্দ্রক্ষণ এসে উপস্থিত হয়েছে। মহাদেব আমার দেহে। আমার হাতে তাঁরই দেওয়া খঙ্গ। আমি শিবিরের সবাইকে নিধনের জন্য যাচ্ছি। তোমরা এই শিবিরের দ্বারে দাঁড়িয়ে প্রহরা দাও। একটি শিশুও যেন পালাতে না পারে।
অশ্বত্থামা সেই নিদ্রিত পুরীর মধ্যে উদ্যত খঙ্গ হাতে কালান্তক যমের মতো ঢুকে পড়লেন। ভূত ও রাক্ষসেরাও অদৃশ্য হয়ে তাঁর সঙ্গে ভেতরে ঢুকে গেল।
অশ্বত্থামা সবার আগে গিয়ে ঢুকলেন ধৃষ্টদ্যুম্নের শয়ন শিবিরে। বিলাসবহুল শিবিরে কুরুক্ষেত্রজয়ী দ্রোণ হত্যাকারী ধৃষ্টদ্যুম্ন মহাসুখে নিদ্রা যাচ্ছিলেন।
অশ্বত্থামা শয়নঘরে ঢুকে নিদ্রিত ধৃষ্টদ্যুম্নের মুখে পদাঘাত করে তাঁকে জাগ্রত করলেন। ধৃষ্টদ্যুম্নর ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখলেন সামনে শমনরূপী দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা দাঁড়িয়ে। হাতে উদ্যত খঙ্গ। দুই চোখে রোষবহ্নি।
অশ্বত্থামা প্রথমে কোনো অস্ত্র ব্যবহার করলেন না। এক কোপে গলা কেটে ফেললে সে মৃত্যু তো যন্ত্রণাদায়ক হবে না। অশ্বত্থামা চান যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু। তিনি ক্রমাগত পদাঘাত করতে করতে ধৃষ্টদ্যুম্নকে খাট থেকে মাটিতে ফেলে দিলেন। তারপর তার সর্বাঙ্গে পদাঘাত করতে লাগলেন। দ্রুপদপুত্রের দেহ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল। চোখে আঘাত লাগায় তিনি দৃষ্টিশক্তি রহিত হয়ে পড়লেন। তিনি কাতর কণ্ঠে অনুনয় করলেন, আচার্যপুত্র আমাকে অস্ত্র দিয়ে সংহার করো। এভাবে পদাঘাত কোরো না। তুমি আমাকে বধ করলে আমি পবিত্রলোকে চলে যেতে পারব।
অশ্বত্থামা আরও পদাঘাত করতে করতে বললেন, কুলাঙ্গার, আচার্য-হস্তাদের কারও স্বর্গে যাওয়ার অধিকার নেই। তোর ওপর অস্ত্র প্রয়োগ করা আমার অকর্তব্য। এই বলে আরও নির্মমভাবে লাথি মেরে তাঁর দেহের সমস্ত হাড় গুঁড়ো করে দিলেন। যন্ত্রণায় প্রবল আর্তনাদ করছিলেন দ্রুপদপুত্র। অবশেষে তাঁর কণ্ঠ ক্ষীণ হতে হতে নিথর হয়ে গেল।
অশ্বত্থামার চিৎকারে শিবিরের মহিলারা জেগে উঠেছে। ধৃষ্টদ্যুম্নের পত্নীরাও যুদ্ধক্ষেত্রে এসেছিলেন। তাঁরা জেগে উঠে ঘরে এসে দেখে ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রাণহীন দেহ মাটিতে পড়ে রয়েছে। অশ্বত্থামা সিংহনাদ করছেন। ধৃষ্টদ্যুম্নপত্নীরা রোদন করতে শুরু করলেন। তাঁরা আর্তস্বরে চেঁচাতে লাগলেন, রাজপুত্রগণ, তোমরা সবাই এসে দেখো এক দুর্বৃত্ত আমাদের আক্রমণ করেছে। আমাদের রক্ষা করো। ওই দেখো কে একজন ধৃষ্টদ্যুম্নকে হত্যা করেছে।
এই আহ্বানে দ্রুপদরাজের অন্যান্য সেনাপতিরা বেরিয়ে এসে অশ্বত্থামাকে ঘিরে ধরলেন। অশ্বত্থামা এইবার রুদ্র প্রদত্ত অস্ত্র প্রয়োগ করে বাকি সবাইকে নিহত করলেন।
অশ্বত্থামা এবার নিদ্রিত পাঞ্চালবীর উত্তমৌজাকে পা দিয়ে বিছানা থেকে মাটিতে ঠেলে ফেলে তার গলা ও বুকে আঘাত করতে করতে তাকেও মেরে ফেললেন। তখন পাঞ্চাল সৈন্য শিবিরের যুধুমন্যু ভাবলেন উত্তমৌজা বোধহয় রাক্ষসদের হাতে নিহত হয়েছে। তিনি একটি গদা নিয়ে অশ্বত্থামাকে আঘাত করলেন। দ্রোণপুত্র তাঁকেও দ্রুত মাটিতে ফেলে পশুর মতো হত্যা করলেন।
যুধুমন্যুকে নিহত করার পর মহাবীর অশ্বত্থামা ইতস্তত শুয়ে থাকা মহারথদের দিকে এগিয়ে গেলেন। প্রত্যেককে পশুর মতো খা গিয়ে কেটে ফেললেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি তাদের হস্তী ও অশ্বদেরও হত্যা করলেন। কয়েক দণ্ডের মধ্যে নিহতদের রক্তে অশ্বত্থামার সর্বাঙ্গ রুধিরসিক্ত হয়ে উঠল। তাঁকে কালান্তক যমের মতো মনে হতে লাগল। অনেকের কাছে তাঁর এই রূপ নরখাদক রাক্ষসের মতো মনে হতে লাগল।
শিবিরের সবাইকে নিহত করার পর অশ্বত্থামা কোথাও পঞ্চপাণ্ডবকে দেখতে পেলেন না। তিনি তাঁদেরই খুঁজছিলেন। পাণ্ডবেরা সে রাতে শিবিরে ছিলেন না। ছিলেন দ্রৌপদীর পুত্রেরা। অশ্বত্থামা তাদের হত্যা জন্য তাদের শয়ন শিবিরে ঢুকলেন। অশ্বত্থামাকে প্রতিহত করার জন্য ততক্ষণে শিখণ্ডী বেরিয়ে এসেছেন। তিনি শরজালে দ্রোণপুত্রকে প্রায় ঢেকে ফেললেন। সেই মুহূর্তে শিখণ্ডী অশ্বত্থামার কপাল লক্ষ্য করে বাণ ছুড়লেন। কিন্তু অশ্বত্থামার কোনো ক্ষতি হল না। তাঁর কপালে মণি সে বাণ প্রতিহত করল।
অশ্বত্থামা সাক্ষাৎ যমের মতো শিবিরে শিবিরে ঢুকছেন আর নিরস্ত্র ঘুমন্ত পাণ্ডবপক্ষীয় বীরদের একে একে হত্যা করছেন। এইবার দ্রৌপদীর পাঁচপুত্রদের ঘরে ঢুকলেন। শিখণ্ডী তাকে বাধা দিতে এসেছিলেন। রক্ষীরা প্রবল বাধা দিলেন কিন্তু অশ্বত্থামা তাদের সকলকে হত্যা করে দ্রৌপদীপুত্রদের হত্যা করার জন্য তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন।
প্রথমে তিনি প্রতিবিন্ধের কোমর থেকে তাকে কেটে দু’খণ্ড করে ফেললেন। তখন শ্রুতসোম তাঁর খঙ্গ নিয়ে অশ্বত্থামার দিকে ছুটে এলেন। কিন্তু অশ্বত্থামা শ্রুতসোমের অসিশুদ্ধ বাহু কেটে ফেললেন। এরপর অশ্বত্থামা মহাবীর শ্রুতসোমের পাঁজরের পাশে আঘাত হানলেন। সেই আঘাতে লুটিয়ে পড়লেন ছিন্নবাহু শ্রুতসোম। তখন নকুলপুত্র মহাবল শতানীক অশ্বত্থামার গায়ে একটি রথচক্র ছুড়লেন। অশ্বত্থামা রেগে গিয়ে তাঁকে মাটিতে ফেলে তাঁর মাথা কেটে ফেললেন। মহাবীর শ্রুতকর্মা একটি পরিঘ দিয়ে অশ্বত্থামার কোমরে আঘাত করলেন। আচার্যপুত্র তা দেখে করবাল (নখ) দিয়ে তাকে টিপে পিষে তাঁকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিলেন। তাঁরও মৃত্যু হল। শ্রুতকর্মা আচার্যতনয়ের খঙ্গাঘাতে বিকৃতবদন হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। দ্রৌপদীর শেষ জীবিত পুত্র শ্রুতকীর্তি অশ্বত্থামার দিকে বাণ ছুড়লেন কিন্তু অশ্বত্থামা এক কোপে তাঁর মাথাটা কেটে ফেললেন। দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র (পঞ্চপাণ্ডবের ঔরসে জাত) সবাই একে একে নিহত হল। অশ্বত্থামার নিহত তালিকায় শত শত শিবিরবাসীর মধ্যে শিখণ্ডীসহ প্রভদ্রকগণ, বিরাট রাজার অবশিষ্ট সৈন্যরা, দ্রুপদের পুত্র, পৌত্র ও তাঁদের বন্ধুরা সবাইকে নিহত করলেন অশ্বত্থামা। নিহতের সংখ্যা দাঁড়াল কয়েক সহস্ৰ।
অশ্বত্থামা প্রথম দিকে যাদের নিহত করেছিলেন তারা নিদ্রিত ও নিরস্ত্র ছিল। পরে কোলাহলে সবাই জেগে ওঠে এবং অনেকেই প্রতিরোধ ও প্রতি আক্রমণের চেষ্টা করে। কিন্তু একা অশ্বত্থামা সবাইকে নিহত করে পাণ্ডব শিবিরকে শ্মশানে পরিণত করে ফেলেন।
অশ্বত্থামার অস্ত্রাঘাতে দ্রুপদের সমস্ত সৈন্য ও বিরাট রাজার অবশিষ্ট সৈন্যরা সবাই নিহত হল। অশ্বত্থামা এরপর একটি বাণ মেরে শিখণ্ডীকে দু’খণ্ড করে ফেললেন। পাণ্ডবপক্ষীয় সৈন্য ও সেনাপতিরা সবাই নিহত হন। এরপর একে একে দ্রুপদের পুত্র-পৌত্র সবাইকে অশ্বত্থামা ছিন্নভিন্ন করে দিলেন। ওই সময় নিদ্রায় একান্ত কাতর অনেক যোদ্ধা ঘুম থেকে উঠে এই বীভৎস কাণ্ড দেখে ইতস্তত ছুটোছুটি করতে লাগল। তারা অস্ত্রশস্ত্রও খুঁজে পেল না। হস্তী ও অশ্বেরা দড়ি ছিঁড়ে বিষ্ঠা ও মুত্র ত্যাগ করতে লাগল। কিছু হস্তী ও পশু বাইরে বেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। কিছু শিবিরবাসী পালাতে গিয়ে অনেকে মাটিতে পড়ে গেল। তাদের ওপর দিয়ে হস্তী ও অশ্বরা ছুটে আসায় তারা দলিত মথিত হয়ে মাংসপিণ্ডে পরিণত হল।
তখন সেই রণস্থলে রাক্ষসেরা চলে এলো নরমাংসের লোভে। তারা সিংহনাদ করতে লাগল। তাদের চরণ থেকে উত্থিত ধূলিজালে’ সেই রজনীতে শিবিরের অন্ধকার আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠল। সবাই জ্ঞানশূন্য হয়ে কে পিতা, কে পুত্র, কে ভ্রাতা, কিছুই স্থির করতে পারল না। হা তাত হা পুত্র বলে অনেকে চিৎকার করতে করতে ভূতলে পতিত হল। এবার জীবিত ব্যক্তিরা শিবির ছেড়ে পালাতে গেলে অশ্বত্থামা খঙ্গ নিয়ে তাদের পিছু পিছু ধাওয়া করলেন। কিন্তু পালাবার পথ নেই। দ্বারদেশে কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা দাঁড়িয়ে। তাঁরা তাঁদের সবাইকে হত্যা করলেন। তাঁদের মৃতদেহ লুটিয়ে পড়ল তোরণদ্বারে।
দেখা গেল নানা ধরনের পিশাচ ও রাক্ষসেরা যারা শিবিরে নরমাংসের আশায় ঢুকে পড়েছিল তারা হতাহতদের রক্তপান করছে। তারা অনেকে বিকট নৃত্য শুরু করে দিয়েছে আর বলছে, এটি খুব ভালো, এই মাংস বেশ সুস্বাদু। সমস্ত শিবির নরমাংসভোজী রাক্ষসে পূর্ণ হয়ে গেছে।
ধীরে ধীরে ভোর হচ্ছিল। সমস্ত পাণ্ডব শিবিরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর যে সব সেনানী ও সেনাপতিরা বেঁচেছিলেন তাঁরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নিহত হলেন। অসংখ্য হস্তী-অশ্ব হয় নিহত হল, না হয় কোথায় পালিয়ে গেল।
সারা শিবির জুড়ে শুধু রক্তাক্ত মৃতদেহ আর অসংখ্য নরমাংসলোভী রাক্ষসের ভিড়। তারা মনের সুখে নরমাংস খাচ্ছে।
সুপ্তিমগ্ন শিবিরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অবশিষ্ট পাঞ্চাল, পাণ্ডব ও সোমকদের মধ্যে একজনমাত্র বেঁচে ছিলেন। তিনি ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথি।
নিহতদের রক্তে রঞ্জিত অশ্বত্থামা শিবির থেকে বেরিয়ে দ্বারের সামনে কৃপাচার্য ও কৃতবর্মাকে দেখে আনন্দে তাঁদের জড়িয়ে ধরলেন। অশ্বত্থামার মুখে এতদিন পরে এক পৈশাচিক আনন্দে মন ভরে উঠেছে। তিনি পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে পেরেছেন। শুধু দৃষ্টদ্যুম্ন, উত্তমৌজা, ভীষ্ম বিনাশকারী শিখণ্ডীকেই নয়—তিনি দ্রৌপদীর নিদ্রিত পুত্রদের একে একে হত্যা করেছেন। এ যে কী আনন্দ, কী অপার আত্মতৃপ্তি তা একমাত্র তিনিই অনুধাবন করতে পারেন। তার পিতা দ্রোণাচার্য, ভীষ্ম, কর্ণ, শল্য, রাজা দুর্যোধন যা পারেননি, তিনি তা পেরেছেন। শুধু আফশোস থেকে গেল পঞ্চপাণ্ডব, দ্রৌপদী ও কৃষ্ণ যদি আজ শিবিরে থাকতেন তাহলে ভারতবর্ষের মাটি থেকে পাণ্ডবদের নাম চিরদিনের জন্য মুছে দিতে পারতেন।
তাহলে এই মহাভারতে তিনি রাজা হয়ে এক নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতেন, যা হত তাঁর সম্পূর্ণ নিজস্ব, মৌলিক। তাঁর চিন্তাভাবনা অনুসারে এক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র তৈরি হত। ক্ষত্রিয় যুগের অবসান হয়ে শুরু হত এক নতুন ব্রাহ্মণ শাসন যুগ। তবে ব্রাহ্মণ্য শাসন অর্থে তাঁর মতে বেদের শাসন নয়, প্রজাকেন্দ্রিক এক মঙ্গলরাজ্য গড়ে তোলা। এক নতুন সমাজ। বিদ্রোহীদের নব্যচেতনার অধিকারী সমাজ। যেখানে অহিংসা পরম ধর্ম নামে এই ভণ্ডামির স্থান থাকবে না। হিংসা যেখানে প্রয়োজন সেখানে হিংসাই হবে রাজধর্ম। রাজার বিরুদ্ধে অঙ্গুলি হেলনকেই তা হিংসা বলে গণ্য হবে। আর কে বলে অহিংসা পরম ধর্ম? হিংসাই যে শেষ কথা বলে আজকের কালরাত্রিই তার প্রমাণ। পাণ্ডব বংশের ভবিষ্যৎ সিংহাসন আজ শূন্য। দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রই হত। শাণিত কৃপাণই সমস্ত ক্ষমতার উৎস। অশ্বত্থামা কৃপাচার্য ও কৃতবর্মাকে ডেকে বললেন, দ্বৈপায়ন তীরে চলো। দুৰ্যোধন যদি এখনও বেঁচে থাকেন এই বিজয় সংবাদে তাঁর মরণ আরও সুখের হবে।
.
শেষ কৌরবের শেষ দিন
তিন অশ্বারোহী যখন দ্বৈপায়ন হ্রদের তীরে মৃতপ্রায় দুর্যোধনের কাছে এসে পৌঁছলেন, তখন সূর্য উঠে গেছে। দুর্যোধন তখনও জীবিত। তবে তাঁর মৃত্যুর আর বেশি দেরি নেই। তখন তাঁর ক্রমাগত রক্তবমি হচ্ছে। তিনি বিলুপ্ত চেতন। তাঁকে ঘিরে রয়েছে বন্য শৃগাল ও কুক্কুরের দল। মৃত্যু হওয়ামাত্র তার মাংস তারা ভক্ষণ করবে বলে সারা রাত্রি তারা তাঁকে ঘিরে বসে আছে। ব্যাসদেব দুর্যোধনের সেই শেষ দৃশ্যকে বর্ণনা করেছেন হুতাশনত্রয় পরিশোভিত যজ্ঞবেদির মতো’।
অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা দুর্যোধনকে সেই অবস্থায় দেখে ক্রন্দন করতে লাগলেন। মহারাজ লোকে তোমাকে অগ্রগণ্য ধনুর্ধর বলে থাকে। তুমি হলধারী বলরামের প্রিয় শিষ্য। যুদ্ধে ধনাধিপতি কুবেরের সমান। দুরাত্মা ভীম যুদ্ধে তোমাকে কীভাবে তোমার ছিদ্র খুঁজে পেল? কালকে অতিক্রম করা বড় সুকঠিন। ভীম তোমাকে সংহার করেছে আমাকে এটাও দেখতে হল। সেই পাপাত্মা ছল করে তোমাকে বিনাশ করতে পেরেছে। এই দুরাচারী ধর্মযুদ্ধে তোমাকে ডেকে তোমাকে অধর্মযুদ্ধে পরাস্ত করেছে। তোমাকে মাটিতে ফেলে তোমার মস্তকে পদাঘাত করেছে। কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠির তা দেখেও উপেক্ষা করেছে। অতএব তাদেরও ধিক। যতদিন এই জীবলোক থাকবে, ততদিন বৃকোদর যে শঠতা করে তোমায় হত্যা করেছে সকলেই এজন্য তাকে নিন্দা করবে। মহাবল বলদেব সর্বদা সভামধ্যে গর্ব করে বলেন, কুরুরাজ দুর্যোধন আমার কাছ থেকে গদাযুদ্ধের শিক্ষা নিয়েছেন। তাঁর চেয়ে বড় গদাযোদ্ধা আর কেউ নেই।
হে মহারাজ, মহর্ষিগণ ক্ষত্রিয়দের পক্ষে যা শ্রেষ্ঠ গতি বলে গণ্য করে থাকেন, তুমি নিহত হয়ে সেই শ্রেষ্ঠ গতি লাভ করলে। অতএব তোমার জন্য আমার কোনো দুঃখ হচ্ছে না। তোমার যথা কর্তব্য তুমি পালন করেছ। আমি শুধু ভাবছি তোমার বৃদ্ধ জননী ও পিতার কথা। তাঁরা যে নিদারুণ পুত্রশোক পাবেন তা ভেবেই আমি কাতর হচ্ছি। যদুকুলজাত কৃষ্ণ ও দুর্মতি অর্জুনকে ধিক। ওরা আবার নিজেদের ধার্মিক বলে অহংকার করে। তোমাকে অধর্ম যুদ্ধে নিহত দেখে তাদের মনে কোনো হেলদোল হল না। যখন অন্যান্য রাজারা জিজ্ঞাসা করবে দুর্যোধন কীভাবে নিহত হলেন, তখন তারা তাদের কি উত্তর দেবে?
এখন বন্ধু-বান্ধববিহীন, হতপুত্র গান্ধারী ও প্রজ্ঞাচক্ষু ধৃতরাষ্ট্রের কী গতি হবে? ভোজরাজ কৃতবর্মাকে ও সেই সঙ্গে আমাকেও আমি ধিক্কার দিচ্ছি। আমরা প্রজারক্ষক সর্বকামনাপূরণকারী নৃপতিকে নিজেরা উপস্থিত থেকে স্বর্গারোহণ করাতে পারলাম না। পূর্বে আপনার ও আমার পিতার প্রভাবে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে বিভিন্ন বিলাসবহুল প্রাসাদে থেকেছি, বিভিন্ন যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেছি। এখন আমরা কার কাছে যাব?
আমরা জীবিত থেকেই বা আপনার কী উপকারটা করব! আপনি আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। আমাদের সুখ-শান্তি একেবারে বিনষ্ট হল। এখন এই হতভাগ্যদের অতিকষ্টে পৃথিবী পর্যটন করে বেড়াতে হবে।
মহারাজ, আপনি স্বর্গে গিয়ে আমার পিতাকে বলবেন, আজ আপনার পুত্র অশ্বত্থামা আপনার হত্যাকারী ধৃষ্টদ্যুম্নকে হত্যা করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিয়েছে। আমি ধৃষ্টদ্যুম্নের সব পুত্রদের, সমস্ত পাঞ্চালদের সবংশে নিধন করেছি। পাণ্ডবদের অবশিষ্ট সমস্ত সৈন্যদের পশুর মতো হত্যা করেছি।
দুর্যোধনের কানে সেই সংবাদ এসে প্রবেশ কালে মহারাজ যেন সংজ্ঞা ফিরে পেলেন। তিনি মৃদুকণ্ঠে বললেন, হে বীর, মহাবাহু ভীষ্ম, কর্ণ ও তোমার পিতা দ্রোণাচার্য যে কাজ করে যেতে পারেননি, তুমি, কৃতবর্মা ও কৃপাচার্য মিলিত হয়ে সেই কাজ করলে। নীচাশয় ধৃষ্টদ্যুম্ন ও শিখণ্ডী নিহত হয়েছে জেনে আমি পরম শান্তিতে এখন মরতে পারছি। অশ্বত্থামার মুখটি তাঁর মুখের কাছে টেনে নিয়ে মুমূর্ষু দুর্যোধন পরম স্নেহভরে তাঁকে চুম্বন করে বললেন, আমি চলি অশ্বত্থামা। স্বর্গে তোমার সঙ্গে দেখা হবে।
কিছুক্ষণ স্তব্ধতার পর অশ্বত্থামা দুর্যোধনের নাসিকার নীচে হাত দিয়ে অনুভব করলেন নিশ্বাস পড়ছে না। বুঝলেন দুর্যোধন আর নেই। দুর্যোধনের সেই প্রাণহীন দেহ হিংস্র শ্বাপদদের হাতে ছেড়ে দিয়ে তাঁরা তিনজন চোখের জল মুছে তাদের নিজ নিজ অশ্বের কাছে ফিরে গেলেন।
প্রতিদিনের মতো আজও রোদ্দুর উঠেছে। সূর্যালোকের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে প্রকৃতি। কৃপাচার্য বললেন, অশ্বত্থামা, আমরা যেখানে যাই না কেন, পাণ্ডবেরা এখনও জীবিত। তারা আমাদের ঠিক খুঁজে বার করবে। এখন কোথায় যাবে তুমি?
অশ্বত্থামা বললেন, মাতুল, আমাদের যুদ্ধ তো সবে শুরু হয়েছে। পাণ্ডবরা যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন আমার যুদ্ধ শেষ হবে না। আমি ভারতবর্ষকে পাণ্ডবমুক্ত করব। আমি নতুন ভারত গড়ে তুলব। আপনি ও আমি মৃত্যুঞ্জয়ী। আমাদের কেউই নিঃশেষ করতে পারবে না। আমার একমাত্র বাণী পাণ্ডব—‘ভারত ছাড়ো’।
কৃপ ঈবৎ ব্যঙ্গ ভরে বললেন, তুমি একা সাম্রাজ্য গড়ে তুলবে?
—একা কেন, তোমরা দুজন আমার সঙ্গে থাকবে। আমার লক্ষ্য এবার পঞ্চপাণ্ডব আর শ্রীকৃষ্ণ। তারাই আমার শত্রু। আর আমার শত্রু মানে দেশের শত্রু। এরাই সমস্ত অধর্মের মূলে। এদের বিনাশই দুষ্কৃতীর বিনাশ। আমি এদের বিনাশ করবই।
কৃপাচার্য বললেন, কাল রাতে তুমি উন্মাদের মতো যে সব কাণ্ড ঘটিয়েছ বুঝলাম তার পিছনে তোমার পিতৃহন্তার প্রতিশোধস্পৃহা তোমাকে উন্মত্ত করে তুলেছিল। তুমি ধৃষ্টদ্যুম্ন ও শিখণ্ডীকে হত্যা করেই চলে আসতে পারতে। তা তুমি করোনি। তুমি একটি গণহত্যা ঘটিয়েছ।
অশ্বত্থামা বললেন, যুদ্ধও তো গণহত্যা। আমাদের একাদশ অক্ষৌহিণী সেনা আঠারো দিনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল তা কি গণহত্যা নয়?
তারপর বললেন, আমাদের জীবনই একটা বড় যুদ্ধ। কোনো জীবনই যুদ্ধ ছাড়া সফল হতে পারে না। আর যুদ্ধ মানেই হিংসা। পাণ্ডবেরাই প্রমাণ করেছে যুদ্ধ মানে নিত্যনতুন কৌশলের উদ্ভাবন। কেউ তোমার জন্য বিনাযুদ্ধে সুচাগ্র ভূমিও ছাড়বে না। তোমার লড়াই করতে হবে তোমারই জন্য। আর সে লড়াইতে সামনে থাকবে ধর্মের বাণী—আর পিছনে কপট হিংসা, অন্যায় হত্যা। কোনও জীবিত ব্যক্তি তার একচুল জমিও ছাড়বে না। তাই তোমাকে হত্যা করতেই হবে।
অশ্বত্থামা বলে চললেন, তবে এই যুদ্ধ থেকে আমি এক নতুন ধর্মে দীক্ষিত হয়েছি। মাতুল, ‘সন্ত্রাস ধর্ম’। রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত শত্রুকে আক্রমণ করে পর্যুদস্ত করাই আমার নতুন রণনীতি। আগামী দিনে এই রণনীতিই সারা পৃথিবী গ্রহণ করবে। এই মহাযুদ্ধে আমরা তিনজনই যথেষ্ট। দুর্যোধনের উত্তরাধিকার আমি বহন করে চলব। আপনি আমায় মন্ত্রপড়ে সেনাপতিত্বে বরণ করেছেন মাতুল। মহারাজ দুর্যোধনের স্বপ্ন আমি পূরণ করব। ক্ষত্রিয় যুগ শেষ হবে। আমি ব্রাহ্মণ যুগ প্রবর্তন করব। আপনি আর আমি সে যুগের স্থপতি। ব্রাহ্মণের বুদ্ধি আছে, অধ্যয়ন আছে, সেই সঙ্গে ক্ষাত্রতেজও আছে। আমরা সমাজে প্রকৃত সাম্য নিয়ে আসব। আর্থিক সাম্য। সামাজিক ভেদাভেদ দূর করব। ক্ষত্রিয় রাজশক্তির চাপে পড়ে পিতা অনেক বৈষম্য করে গেছেন। তিনি নিষাদপুত্র একলব্যকে অস্ত্রশিক্ষা দেননি। আমার সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষায় সবার সমান অধিকার থাকবে। বলুন আপনি রাজি?
কৃপ বললেন, ‘অশ্বত্থামা, আমি এখন অবসর চাই, বিশ্রাম চাই। শাস্ত্র ছেড়ে অস্ত্র ধরেছিলাম ভগিনীপতি দ্রোণের কথায়। এখন দ্রোণ নেই। আমারও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
—আপনি এখন তাহলে কী করতে চান?
—পাণ্ডবপুত্রদের হত্যায় আমার খুব অনুশোচনা হচ্ছে অশ্বত্থামা। আমি প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। আমি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের আশ্রয়ে চলে যেতে চাই। পাণ্ডবেরা যদি আমাকে তাদের পুত্রহত্যার জন্য শূলবিদ্ধ করে সে দণ্ড আমি মাথা পেতে নেব। আমি জানি না, কৃতবর্মা কি বলেন।
কৃতবর্মা কললেন, আমি কৃষ্ণের কাছে দ্বারকায় ফিরে যেতে চাই।
অশ্বত্থামা বললেন, তাহলে তোমরা আমায় সবাই ছেড়ে যাচ্ছ। বেশ যাও। আমি বাধা দেব না।
কৃতবর্মা বললেন, আপনিও আত্মসমর্পণ করুন সেনাপতি। যুধিষ্ঠির অতি সজ্জন ব্যক্তি। তিনি আপনার মতো বীরকে সেনাপতি করবেন। তাছাড়া এখন তো আর কোনো পাণ্ডব সৈন্য নেই। সব কিছু নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। মহাযুদ্ধ সম্পর্কে আমার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। এখন দেখলাম যুদ্ধ মানে শুধু লোকক্ষয়। শুধু ধন নাশ। শেষ পর্যন্ত জয়ের আনন্দ পাওয়া গেলেও তাতে মানসিক শান্তি পাওয়া যায় না। আপনি ব্রাহ্মণপুত্ৰ। ব্রাহ্মণের প্রকৃত ভূমিকা পালন করুন। যজন যাজন অধ্যয়ন, বেদ পাঠে বাকি জীবন কাটিয়ে দিন। আপনার তো অনন্ত জীবন। অনন্ত জীবন যদি জ্ঞানচর্চায় কাটান তাহলে বিশ্বের সমস্ত জ্ঞান স্বচ্ছ আয়নার মতো আপনার হৃদয়ে এসে জমা হবে। কী দারুণ লাভবান হবেন আপনি। আপনি পুঁথি রচনা করুন। শাস্ত্র চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করুন। হিংসা ব্রাহ্মণের ধর্ম নয়।
অশ্বত্থামা বললেন, আমি নিশ্চয়ই রচনা করব। কিন্তু সে লেখা হবে আমার নতুন চিত্তনের ওপর। হিংসা কীভাবে রাষ্ট্রধর্মের পরিবর্তন ঘটাতে পারে তারই দর্শনতত্ত্ব নিয়ে আমি শাস্ত্র রচনা করব। তার আগে আমাকে নিজে প্রমাণ করতে হবে আমার তত্ত্ব ব্যর্থ নয়। আমি আমার মতো করে আমার স্বপ্নের রাষ্ট্র তৈরি করব।
অশ্বত্থামা এরপর বললেন, আমার মাথার এই মণি, আর পিতৃপ্রদত্ত ‘ব্রহ্মশির অস্ত্র’ যতক্ষণ আমার হাতে আছে ততক্ষণ আমাকে কেউ পরাস্ত করতে পারবে না। এই অস্ত্র আমি পঞ্চপাণ্ডবের জন্য রেখে দিয়েছি।
কৃপাচার্য বললেন, অশ্বত্থামা, এই ব্রহ্মশির অস্ত্র দ্রোণাচার্য তোমাকে মানুষের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে নিষেধ করেছিলেন। এ এক ভীষণ মারক অস্ত্র। এর তেজষ্ক্রিয়ায় সারা মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
অশ্বত্থামা তার উত্তরে বললেন, একদা এই ব্রহ্মশির অস্ত্র আমি কৃষ্ণকে দিয়ে এর বদলে তাঁর সুদর্শন চক্রটি চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি তা দেননি। দেননি, ভালোই হয়েছে। এই অস্ত্র দিয়েই আমি পাণ্ডবদের নিধন করব। তারপর যে শক্তি আমার বিরোধিতা করবে, তাদেরও নিধন করব।
কৃপাচার্য বললেন, আমি শুনেছি কৃষ্ণ তোমাকে সুদর্শন চক্র দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তুমি চক্রটি বামহাতে ধারণ করে আর সেটি নাড়াতে পারোনি।
অশ্বত্থামা একথার কোনো উত্তর দিলেন না। তারপর বললেন, আমি পাণ্ডবপুত্রদের হত্যা করেছি বলে আপনি অনুতপ্ত হচ্ছেন কেন মাতুল? আমি কিন্তু পরম গৌরববোধ করছি। আমার পিতার সঙ্গে আপনার রক্তের সম্পর্ক নেই। তাই এই প্রতিশোধ আপনার মনে কোনো রেখাপাত করছে না। কিন্তু আপনার ভগিনী, আমার মাতা যে দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করছেন তা আমি কল্পচক্ষে দেখতে পাচ্ছি। আমি চলি মাতুল, বিদায়। সেনাপতি কৃতবর্মা, যদি আমার স্বপ্নরাজ্য কোনোদিন প্রতিষ্ঠিত করতে পারি আপনাদের সঙ্গে আবার দেখা হবে।
কৃপ ও কৃতবর্মা দেখলেন অশ্বত্থামার অশ্ব পথের ধুলা উড়িয়ে দিগন্তরেখায় মিলিয়ে গেল।
