প্রার্থনা সভায় অশ্বত্থামা
ঘুম ভাঙল শারদ্বতের ডাকে। ধড়মড়িয়ে অশ্বত্থামা উঠে পড়লেন। আচার্যরা ইতিমধ্যেই প্রার্থনাগৃহে এসে উপস্থিত হয়েছেন। এটিও একটি বড় মাটির ঘর। তবে আরও প্রশস্ত। সামনে একটি বেদি। সেখানে একটি উজ্জ্বল প্রদীপ জ্বলছে। একটি আসনে যোগাসনে উপবিষ্ট ঋষি সোমক। তাঁর পাশে ধ্যানমগ্ন আচার্য চতুষ্টয়। নীচে বসে বিদ্যার্থী আশ্রমিকরা। অশ্বত্থামা প্রার্থনাগৃহে পৌঁছতে সোমক তাঁকে ইঙ্গিত করলেন বেদির একপাশে এসে বসার জন্য। সেখানে একটি আসন পাতা ছিল। অশ্বত্থামা উপবিষ্ট হতেই প্রার্থনা শুরু হল।
ইন্দ্রিয়েভ্য পরা হার্থা অর্থেভ্যশ্চ পরং মনঃ।
মনসশ্চপরা বুদ্ধিবুদ্ধেরামাত্মা মহান পরঃ।।*
[* বিজ্ঞান যাঁর সারথি, মন যার প্রগ্রহ (নিয়ন্ত্রণে) তিনি সংসার পথের সীমাপ্রাপ্ত হন। এই সীমা হল বিষ্ণুর পরম পদ। যজুর্বেদীয় কঠোপনিষদ, তৃতীয় বহুরী।]
এরপর আচার্য মণ্ডুক ও তৈত্তিরীর উপনিষদ থেকে বললেন,
সত্যমেব জয়তে নানৃতং সত্যেন পন্থা
বিততো দেবয়ানঃ।
সত্যেরই জয় হয়, মিথ্যার নয়; সত্যরূপ সাধনার দ্বারাই দেবযান মার্গ প্রসারিত হয়। তোমরা সত্য বলবে। ধর্ম আচরণ করবে।
সত্যংবদ ধর্মংচর স্বাধ্যায়ন মা প্রমদঃ।
পড়াশোনা থেকে একদম বিচ্যুত হবে না।
ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি—তিনবার শান্তি উচ্চারণ করে পরম ব্রহ্মের উদ্দেশে করজোড়ে প্রণাম করে আচার্য এবার থামলেন।
কিছুক্ষণের নীরবতা। শুধু গাছ-গাছালির মধ্য থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছে। আচার্য সোমক এবার বলতে শুরু করলেন, আজ এই স্নিগ্ধ প্রভাতে তোমাদের সঙ্গে আমাদের নতুন আচার্যকে আলাপ করিয়ে দিই। এঁর নাম অশ্বত্থামা। তোমরা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কথা শুনেছ। আমাদের এই তপোবন থেকে বেশি দূর নয় কুরুক্ষেত্র। সেখানে এক বিরাট যুদ্ধ হয়ে গেল অষ্টাদশ দিবস ধরে। সেই যুদ্ধ এই কদিন হল শেষ হয়েছে। এই যুদ্ধের কৌরবপক্ষের শেষ সেনাপতি ছিলেন এই অশ্বত্থামা। তিনি অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের পুত্র। তোমরা বলো তো আমাদের রাজা এখন কে?
একজন বিদ্যার্থী উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কুরুতিলক, মহাধনুর্ধর দুর্যোধন।
সোমক বললেন, দুর্যোধন এখন আর ইহলোকে নেই। তিনি নিহত হয়ে স্বর্গে গেছেন। আমাদের হস্তিনাপুরের মহারাজ হয়েছেন পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির। তোমাদের সৌভাগ্য যে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে তোমরা দুরে আছো। অরণ্যের বনস্পতি ভেদ করে যুদ্ধে মৃত্যুর হাহাকার ধ্বনি তোমাদের কানে আসেনি। আমরাও তোমাদের এ সম্পর্কে অবহিত করাইনি। যুদ্ধ, আক্রমণ, হত্যা, লুণ্ঠন, এসব হল রাজা এবং দস্যুদের নিত্যকর্ম। যুদ্ধ মানুষের স্থায়ী সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারে না। তোমরা কী জানো কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে উভয়পক্ষের সব সৈন্য নিঃশেষ হয়ে গেছে। কিন্তু কেন? রাজায় রাজায় বিবাদের ফলে। প্রত্যেক কার্যেরই একটি কারণ থাকে। এই যুদ্ধের পিছনেও কারণ ছিল। একপক্ষ সব সময় অন্যপক্ষকে অভিযুক্ত করে। কিন্তু দু’পক্ষই একসঙ্গে হয় ঠিক না হয় ভুল হতে পারে না। কে ভুল কে ঠিক আমরা তা বিচার করতে যাব না। কারণ তা রাজনীতির বিষয়, রাজধর্মের নীতি। রাজনীতিতে দু’পক্ষই নিজেদের নির্দোষ বলে। অপরপক্ষের ঘাড়ে দোষ চাপায়। আমরা এখানে বিচারকের ভূমিকা পালন করতে পারি না। কিন্তু আমরা যারা মগজচর্চা করি, জ্ঞানচর্চা করি, পেশীচর্চা করি না, কে সিংহাসনে বসল তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। সমস্ত রাজ্য ভাঙা-গড়া তুচ্ছ করে, জীবন-মৃত্যুর ওঠা-পড়াকে অগ্রাহ্য করে, অরণ্যের আড়ালে এই তপোবনগুলিতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যেও আমাদের জ্ঞানচর্চা অব্যাহত ছিল, আছে এবং থাকবেও।
অশ্বত্থামা সম্পর্কে যা বলছিলাম—এই মহাবীর ব্রাহ্মণ হয়েও ক্ষাত্রধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কেন করেছিলেন তার মধ্যে আমরা যাব না। আমাদের গুরু ব্যাসদেব ওকে আমাদের আশ্রমে পাঠিয়েছেন। উনি এখন থেকে আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তোমাদের পড়াবেন। আর অস্ত্র ধরবেন না। অস্ত্রের বদলে উনি লেখনী ধরবেন। উনি নতুন শাস্ত্র রচনা করবেন, যে শাস্ত্র তরবারির চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তোমরা জেনে রাখো, আমাদের সুপ্রাচীন আর্য সভ্যতা মানে বেদ, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক আর উপনিষদ। বেদের মধ্যে যজুর্বেদেই গদ্য এবং পদ্য দুটোই আছে। শুক্ল যজুর্বেদ ও কৃষ্ণ যজুর্বেদ তথা তৈত্তিরীয় সংহিতাই ভারতের সম্পদ। কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ডের মধ্যেই দেশের সম্পদ লুকিয়ে আছে। শুক্তির ভেতর যেমন মুক্তো লুকিয়ে থাকে। এই সম্পদ রাজপ্রাসাদে নেই, আছে এই তপোবনে। বিদ্যার্থীগণ, তোমরা এই ব্রহ্মচর্য আশ্রমটিতে যতদিন থাকবে শুধু জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে কাটাও। জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে কঠোর জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে সংসারের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হও। তোমরা কেউ গজদত্ত মিনারের অধিবাসী হবে না। সহপাঠী, আচার্য, ও বনবাসীদের সঙ্গেও তোমাদের মিশে মৃত্তিকার সন্তান হয়ে উঠতে হবে।
আচার্য অশ্বত্থামা, এখন থেকে এই আশ্রম আপনার। আমাদের আচার্য চতুষ্টয় আপনার ভ্রাতা, আমাদের বিদ্যার্থীরা আপনার সন্তান। আপনি বিখ্যাত মানুষের আত্মজ। আপনার বীরত্বগাথা সারা দেশ বিদিত। আপনি বহু যুদ্ধের সৈনিক। এবার আপনি শস্ত্র ত্যাগ করে শাস্ত্র ধরুন। অসি ত্যাগ করে মসী অবলম্বন করুন।
‘সংগচ্ছধৃং, সংবদধৃং, সংবো মনাংসি জানতাম’
তোমরা একসঙ্গে মিলে একই মন্ত্র উচ্চারণ করো, তোমাদের মন এক হয়ে উঠুক। আপনি এবার কিছু বলুন। মহাচার্য সোমক অশ্বত্থামাকে আহ্বান করলেন।
অশ্বত্থামা বলতে গিয়ে বিশেষ কিছু বলতে পারলেন না। শুধু বললেন, মহাচার্যকে শত কোটি প্রণাম। এখানে এসে এই পরিণত বয়সে আমার যেন নবজীবন লাভ হল। সত্যি পুনর্জন্মের জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। একই জীবনে বারবার যে জন্মান্তর ঘটে, তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাই জীবনের বড় শিক্ষা। আমি তোমাদের মতো তপোবনে পড়াশোনা করিনি। আমার যা কিছু শিক্ষা, তা আমার পিতার কাছ থেকে। আমি বেদ অধ্যয়ন করেছি গৃহকোণে বসে। অস্ত্রশিক্ষা করেছি রাজপুত্রদের সঙ্গে। পিতাই আমার শিক্ষক, আমার গুরু। শিশুকাল থেকে আমার সেনাপতি হবার প্রবল ইচ্ছা ছিল। এক একজনের ইচ্ছা বিচিত্র উপায়ে পূরণ হয়। এটাই বিধির নির্বন্ধ।
আমি সেনাপতি হয়েছিলাম দুজন মাত্র সৈনিকের অধিপতি হয়ে। সেনাপতি হয়েছিলাম মাত্র এক রাত্রির জন্য। তারপরই আমার গোটা সৈনিক জীবনের ইতি। আমি আবার ব্রাহ্মণের ধর্মে ফিরে এলাম। সেই থেকে মনের সঙ্গে অনবরত সংগ্রাম করে চলেছি। স্বধর্মে কেন নিধন হলাম না। আবার প্রশ্ন জেগেছে আমার প্রকৃত ধর্ম কোনটি? ব্রাহ্মণত্ব না ক্ষাত্রধর্ম? অবশেষে আমার ললাটলিপিই আমাকে নির্দিষ্ট করে দিল আমার গতি। আচার্য ব্যাসদেব আমাকে এই তপোবনে পাঠালেন। এখন আমি এই তপোবনেরই। এই তপোবনই এখন আমার আপন গৃহ।
জীবন সম্পর্কে আমার আজ যে গূঢ় উপলব্ধি হয়েছে তা বিদ্যার্থীদের বলি। জয়লাভের আনন্দের জন্যই জীবনের যুদ্ধগুলি নয়, পরাজয়ের শিক্ষালাভের জন্যও যুদ্ধ জরুরি। পরাজয়ের শিক্ষা একমাত্র পরাজিত না হলে পাওয়া যায় না। তার জন্য পরাজয়কে গৌরবের সঙ্গে মনে নিতে জানা চাই। প্রতিটি বিদ্যার্থীর মনে রাখতে হবে, জীবন তোমাকে জয়ের গৌরব ও পরাজয়ের গ্লানি দুটোই দিতে পারে। তুমি যদি পরাজয়কে গ্লানি হিসাবে না নিয়ে গৌরবের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারো তাহলেই তুমি মনের দিক থেকে অপরাজিত থাকবে। আমি অপরাজিত। এটাই আমার গৌরব।
গতিশীল থাকাটাই জীবন। তোমরা গতিশীল থাকো। যে জ্ঞান তোমাকে স্থাণু করে রাখবে, চার দুয়ারের মধ্যে বন্দি করে রাখবে, সেই জ্ঞান জ্ঞান নয়, তা নাগপাশ।
পুষ্পিন্যে চরতো জংঘে—
চরৈবেতি চরৈবেতি।
(যে গতিশীল, চলমান, তার দুটি জঙ্ঘা পুষ্পময়।)
সমস্বরে রব উঠল, সাধু, সাধু।
.
দ্বিতীয় দিন কিছুক্ষণের জন্য বিদ্যার্থীদের বিরতি। এই সময়টা তারা প্রাতরাশ করে। একটি ঘরে টিনের পাত্রে মুড়ি রয়েছে। একটি ছোট মগ রয়েছে সামনে। তাতে করে প্রতিটি ছাত্র এক মগ করে মুড়ি নিজেরাই ঢেলে নিয়ে চলে যাচ্ছে। প্রাতরাশের পর তারা আশ্রমের জন্য শ্রমদান করবে।
দ্বিপ্রহরের খাবার পর শুরু হবে সেদিনের পাঠক্রম। চলবে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যায় প্রার্থনা। তারপর নিজেদের মধ্যে আলোচনা। সে আলোচনায় আচার্যরাও অংশ নেন। পাঠ্য বিষয়ের ওপর অথবা কোনো বিশেষ সামাজিক বা দার্শনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা চলে। তারপর নৈশ আহারের শেষে বিদ্যার্থীরা ঘুমিয়ে পড়ে। অতিনিদ্রা ও নিদ্রাহীনতা দুটিই আশ্রমে নিষিদ্ধ।
অশ্বত্থামাকে কে একজন বলে গেল আচার্য সোমক তাকে ডেকেছেন। অশ্বত্থামা আচার্যের ঘরে যেতেই দেখল সহ আচার্য শারদ্বত বসে আছেন। সোমক তাঁকে বললেন, আর্যপুত্র, আমাদের প্রতিদিন কিছু শ্রমসাধ্য কাজ করতে হয়, তার মধ্যে পানীয় জল নিয়ে আসা একটি। আজ তুমি ও শারদ্বত দুজনে গিয়ে পানীয় জল নিয়ে আসবে।
অশ্বত্থামা বললেন, জলাশয় কোথায়?
—এখান থেকে ক্রোশখানেক দূরে পাহাড়ের ওপর একটি ঝরনা আছে। সেই ঝরনার জলই সবার পেয়। এখানে পানীয় জলের তীব্র সংকট। বিশেষ করে এই গ্রীষ্মকালে। অদূরে একটি নদী আছে বেত্রবতী নাম। কিন্তু গ্রীষ্মে তার জল থাকে না। তাই পাহাড়ে উঠে ওই নদীর উৎস ঝরনা থেকেই জল সংগ্রহ করতে হয়। প্রতিদিনই দুজনকে পাঠানো হয় পানীয় জল সংগ্রহের জন্য। শারদ্বত তোমাকে পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে।
একটু পরে দুজনে দুটি কলস নিয়ে বেরিয়ে গেলেন অরণ্যপথ ধরে। তখন বেশ রৌদ্র উঠে গেছে এবং তখনই তাপ দিতে শুরু করেছে।
দিনের আলোয় অশ্বত্থামা আশ্রমটিকে ভালো করে দেখলেন। যেদিকে তাকাও অরণ্য। বড় বড় শাল, পিয়াল, ঝাউ, ও নানা ধরনের গাছে ভর্তি। আর সামান্য দূর থেকে পাহাড়ের সীমানা শুরু। পাহাড়গুলিকে ঘিরে সারি সারি গাছ উঠে গেছে। খুব সুউচ্চ পর্বত নয়। কিন্তু অরণ্যের সবুজ প্রাচীর। মনে হয় পাহাড়ের সারিগুলিকে যেন জাগ্রত প্রহরীর মতো তপোবনটিকে রক্ষা করছে। আর আকাশ পাহাড়গুলিকে ডিঙিয়ে আশ্রমের মাথার ওপর চন্দ্রাতপের মতো ঘিরে আছে।
আশ্রম অঙ্গনটি ঘিরে নুড়িপাথরের রাস্তা আয়তক্ষেত্রের মতো আশ্রমকে ভাগ করেছে। তার দু’পাশে ফুল ফুটে রয়েছে। কত রকমের বিচিত্র ফুল। মহাচার্য সোমক ফুলগাছগুলি নিজে পরিচর্যা করেন। আশ্রমে কোনো ভৃত্য নেই। ছাত্ররাই গোটা আশ্রমটিকে পরিচ্ছন্ন রাখে। তারাই মাটির ঘর গো-ময় দিয়ে নিকোয়। গো-শালে গিয়ে গো-দাহন করে। গো-মাতার সেবা করে। তাদের খাদ্য দেয়। প্রত্যেকটি বিদ্যার্থীর ওপর কায়িক শ্রমের কাজ নির্দিষ্ট করা আছে। প্রত্যেকেই জানে এই মুহূর্তে তার কী কী করণীয়।
অশ্বত্থামা ঘুরে ঘুরে সব দেখছিলেন। বিদ্যার্থীরা তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। এই কর্মকাণ্ড শেষ হবার পর তারা দুপুরের আহার সেরে পাঠ শুরু করবে। আচার্যরাও ছাত্রদের সঙ্গে সমানভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে শারদ্বত এসে বলল, আর্যপুত্র, চলুন আমরা রওয়ানা হয়ে যাই। আপনার কলস এটি। বলে অশ্বত্থামার হাতে একটি বড় কাংস কলস তুলে দিল।
দুজনে মিলে কথা বলতে বলতে বনপথ ধরে রওয়ানা দিলেন।
শারদ্বতের বয়স আঠাশ বছর। সব আচার্যদের মতো সে মুণ্ডিত মস্তক। কাম্যক বনের এই তপোবনের সঙ্গে সে প্রথমদিন থেকেই আছে। এই জায়গাটি তার পরিচিত। সে শৈশব থেকে মহর্ষি ব্যাসের আশ্রমেই আশ্রমিক ছিল। সে ভাগীরথীর তীরেই বড় হয়ে উঠেছে। তার বাড়ি কাম্যক বনের কাছেই। বাবা দরিদ্র ব্রাহ্মণ। যজন যাজন করে কোনোমতে সংসার চলে। সে পিতার একমাত্র সন্তান। গ্রামে বিদ্যাচর্চার কোনো সুযোগ নেই। অনেক বর্ধিষ্ণু গ্রামে ব্রাহ্মণেরা চতুষ্পাঠী চালান, কিন্তু তাদের গ্রামে মাত্র কয়েক ঘর ব্রাহ্মণ। তাঁদের মধ্যেও বিদ্যাচর্চা নেই, যজমানি করে সংসার চালান। একে তো শিক্ষার প্রচলন শুধু ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের মধ্যে। শূদ্রদের শিক্ষার অধিকার নেই। বৈশ্যদের আছে। কিন্তু তারা আগ্রহী নয়। কিন্তু শারদ্বতের ছোটবেলা থেকে পূজাপাঠ কথকতায় আগ্রহ।
সে সময় মূর্তিপূজার প্রচলন হয়নি। তবে বৈদিক দেবতারা কথকথা ও পাঠের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচার লাভ করেছেন। পূজা বলতে ছিল বেদ অনুসারী নানা যজ্ঞ। এই যজ্ঞানুষ্ঠান সমাজে নিয়মিত কর্ম ছিল। ব্রাহ্মণদের এই হোমযজ্ঞ করাই প্রধান জীবিকা ছিল। কিন্তু একমাত্র রাজা ও অভিজাত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের সঙ্গতি ছিল না উপযুক্ত ব্রাহ্মণ বিদায়ের। তাই তাদের হাতে নগদ অর্থ থাকত না। সেজন্য তাঁরা চেষ্টা করতেন তাঁদের আগ্রহী একটি ছেলেকে অন্তত কোনো ঋষির তপোবনে যুক্ত করতে।
এই তপোবন বিদ্যাশ্রমগুলিতে প্রভাবশালী ও সঙ্গতিসম্পন্ন ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তানেরাই সুযোগ পেত। যে সব ঋষিদের খ্যাতি ছিল তাদের বিদ্যায়তনগুলিতে ছাত্র ভর্তির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা লেগে থাকত। কারণ অভিজাত সামন্ত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, ও বৈশ্য পরিবার তাঁদের একটি ছেলেকে ব্রহ্মচর্যাশ্রমে পাঠাতে চাইত। দূর দূর থেকে দু-তিন দিনের পথ অতিক্রম করেও এই সব ছাত্ররা আসত। তারপর দ্বাদশ বর্ষ পাঠ সম্পন্ন করে সমাবর্তন
শেষ করে স্নাতক হয়ে তারা সংসারশ্রমে প্রবেশ করত। অনেকে আর সংসার আশ্রমে প্রবেশ করতে চাইত না। তারা নিজেরাই আচার্য হয়ে সারাজীবন অধ্যাপনা ও ধর্মচর্চায় জীবন অতিবাহিত করতেন।
শারদ্বত এই দলের। তার বাবা তাঁকে ব্যাসদেবকে বহু মিনতি করে আশ্রমের বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে পঁচিশজন একসঙ্গে স্নাতক হয়। তার মধ্যে ছ’জন ছাত্র আর সংসারশ্রমে ফিরে যায়নি। তারা ব্রহ্মচারীর জীবন বেছে নিয়েছে।
তাদের গ্রাম বেশি দূরে নয়। তার বাবা গত হয়েছেন। কিন্তু মা এখনও জীবিত। তিনি একান্নবর্তী পরিবারে বাস করেন। সে সময় একান্নবর্তী পরিবারে একসঙ্গে দশ থেকে ত্রিশ-চল্লিশজনও বাস করত। তবে দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে সদস্য সংখ্যা খুব বেশি হত না। কৃষিজীবী পরিবারে পঞ্চাশজন মানুষও এক একটি পরিবারে থাকত। পরিবারের সদস্য ছাড়া আশ্রিত বিধবা ও অনূঢ়া কন্যারাও এই সব পরিবারে স্থান পেত।
শারদ্বত বলল, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাদের গ্রাম থেকে বহু যুবক যোগ দিয়েছিল। বেশিরভাগই ক্ষত্রিয় যুবক। যুদ্ধের ঠিক আগে রাজা দুর্যোধনের রাজকর্মচারীরা ঢেড়া পিটিয়ে ঘোষণা করেছিল যুদ্ধের জন্য সৈনিক নেওয়া হবে। নগদ বেতন ঘোষণা করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের হাতে নগদ অর্থের একটা বড় আকর্ষণ ছিল। তাছাড়া যুবকদের মধ্যে যুদ্ধের উন্মাদনাও কাজ করেছে। তারা নাম লিখিয়েছে। মাত্র একমাস-দু’মাসের অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে তাদের যুদ্ধে নামানো হয়। এছাড়া দুর্যোধনের একাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্যের বেশিরভাগই মিত্র রাজ্যগুলি থেকে এসেছিল।
পথে যেতে যেতে শারদ্বত বলছিল আশপাশের গ্রামে যুবক ছেলে এখন বিরল। গ্রামের পর গ্রাম শুধু বিধবা আর প্রবীণেরা বাস করছেন। তবে কিছু সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে এসেছে। তারা প্রথমদিকে ভয়ে গ্রামের ভিতর ঢোকেনি। জঙ্গলে জঙ্গলে কাটিয়েছে। যুদ্ধ শেষ হবার সংবাদ শুনে তারা বাড়ি ফিরে এসেছে।
কথা বলতে বলতে ওরা অনেক দূর চলে এসেছিল। এইবার পাহাড়ি পথ শুরু হল। চড়াইয়ের ওপর উঠতে হবে। আর তখনই দেখা গেল পাহাড়ের নীচে এবং পাহাড়ের গায়ে জনবসতি। ছোট ছোট কুটির। ইষ্টক নির্মিত দু-একটি বাড়িও চোখে পড়ল। বেশ কিছু গবাদি পশু চোখে পড়ল। কিছু ভেড়ার পাল। তাদের পিছনে রাখাল বালকেরা। পাহাড়ি পথে রাস্তার চিহ্ন আছে বটে। কিন্তু পাথর আর নুড়ি বিছানো অসমান।
অশ্বত্থামা বললেন, এতখানি পথ তোমাদের জল নিতে আসতে হয়?
শারদ্বত বলল, হ্যাঁ, আমাদের আশ্রম থেকে রোজই কেউ না কেউ আসে।
—আশ্রমের আশেপাশে কোথাও পুষ্করিণী নেই?
—আশ্রমের পাশেই একটি পুষ্করিণী আছে। কিন্তু গ্রীষ্মে তার জল কমে আসে। কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। পানের অযোগ্য। বর্ষাকাল থেকে শীতকাল আমরা পুষ্করিণীর জল পান করি।
—গ্রামের লোকেরা কীভাবে পানীয় জল পান?
—অনেক গ্রামে ধনীরা কূপ খনন করে রেখেছেন। কিন্তু গ্রীষ্মকালে কূপও শুকিয়ে যায়। এ সময়টা সবাই জলসংকটে ভোগে।
—এই দু’ কলসি পানীয় জলে আশ্রমের এতগুলি মানুষের হয়?
—আমরা বিদ্যার্থীদের মধ্যে সংযম অভ্যাস করিয়েছি। দ্বিপ্রহর ও রাতে আহারের সময় সকলের এক গ্লাস করে জল বরাদ্দ। অন্য কাজের জন্য সবাই পুষ্করিণীতে যায়। আমাদের আচার্য সোমক বলেন, শৈশব থেকে সংযম অভ্যাস করতে হয়। বাক সংযম ও ইন্দ্রিয় সংযম। কাম দমন ও রিপু দমনের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। ইন্দ্রিয় দমনের মধ্যে আছে পরিমিত আহার। ব্রাহ্মণের এক সন্ধ্যায় দুবার আহার নিষিদ্ধ। এর কারণ কী? অতিরিক্ত ভোজন শরীরের মেদ বাড়ায়। যা সহজ পাচ্য নয় তাতে আন্ত্রিক অসুখ ছড়ায়। আমাদের ছাত্ররা কেউ স্থূলকায় নয়। আপনি দীর্ঘকায় মহাভুজ। সৈন্যদলে শুনেছি আমিষ আহারের চল আছে। আপনি কী মাংসাশী?
—হ্যাঁ, আমি নিরামিষাশী নই। কিন্তু আমি খাদ্যাভ্যাস বদলাতে পারি। আমাকে নিয়ে আপনাদের কোনো সমস্যা হবে না। আমি ব্রাহ্মণপুত্র। মাসের মধ্যে অর্ধেক দিনই উপবাস করে নানা ব্রত পালন করি। পিতা সাত্ত্বিক আহার করতেন। আমিই শুধু সর্বভুক ছিলাম। কিন্তু আমি ব্রাহ্মণ সন্তান, সাত্ত্বিক আহার আমার সহজাত।
অশ্বত্থামাকে এর আগে কখনও পর্বতারোহণ করতে হয়নি। তিনি একটু ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। ক্রমাগত আরোহণে তাঁর জিভ শুষ্ক হয়ে আসছিল। এমন সময় ঝিরঝির শব্দ কানে এল। পাহাড়ের গা বয়ে ব্রাহ্মণের শুভ্র উপবীতের মতো ঝরনার ধারা নামছে। নামতে নামতে একটি ছোট প্রস্রবণের রূপ ধারণ করেছে। ওপরের একটি শিলাখণ্ড থেকে জল এসে আছড়ে পড়ছে নীচে। গ্রামের বহু স্ত্রীলোক সেই জল সংগ্রহের জন্য কলস নিয়ে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কলস ভরে যাচ্ছে। একদল শিশু প্রস্রবণে মাথা পেতে স্নান করছে। আর তাদের কলরবে স্থানটি মুখরিত হয়ে উঠেছে। ঘোড়ায় টানা কয়েকটি শকট রাস্তায় অপেক্ষা করছে। এগুলি কোনও অভিজাত ব্যক্তির শকট। তাঁরা পানীয় জল সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছেন।
ওরা দুজনেও সেই মুক্তধারায় স্নান করে নিলেন। তারপর দুটি কলসে জল ভরে আশ্রমের দিকে রওয়ানা হলেন।
অশ্বত্থামা সেই দীর্ঘ পথ জলভরা কলস বয়ে আনতে আনতে ভীষণ ক্লান্তি অনুভব করছিলেন। মাথার ওপর প্রচণ্ড রৌদ্রতেজ। রাস্তার ধূলিকণা তপ্ত হয়ে উঠেছে। তাঁরা দুজনেই খালিপদ। অশ্বত্থামার চরণ এই প্রথম ধূলি স্পর্শ করল। তিনি সর্বদা শিরোস্ত্রাণ ও পাদুকা পরে পথে বার হতেন। কদাচ হাঁটতেন। তিনি পদস্থ সেনানী। তাঁর নিজস্ব দুই অশ্বের রথ ছিল। সারথি ছিল। রথের পিছনে দুজন দেহরক্ষী থাকত। কুরুক্ষেত্রে তিনি যুদ্ধ করেছেন। তিরবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। কিন্তু সর্বদা রথারুঢ় অবস্থায়। তাঁর অধীনে সহস্ৰ সৈনিক সর্বদা তাঁর আদেশের প্রতীক্ষায় থাকত।
সেই অশ্বত্থামা আজ নগ্নপদে কাঁধে জল ভর্তি কলস নিয়ে তপ্ত প্রস্তর খণ্ড ও ধূলির ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছেন।
