প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব : সত্যমেব জয়তে

দুর্যোধন-ভীম যুদ্ধ

দুর্যোধন-ভীম যুদ্ধ

কালচক্র একটি নাটকের মতো। কোন ঘটনার পরক্ষণেই কী ঘটবে অথবা কোন ঘটনার নেপথ্যে আর কী বৃহত্তর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তার সন্ধান কোনও প্রতিবেদকের পক্ষে রাখা সম্ভব নয়। সংবাদী যা দেখেন তাই লেখেন। কিন্তু তাঁর দেখাটি সম্পূর্ণ নয়, একটি বিরাট ঘটনার খণ্ডাংশ মাত্র। ঘটনা যিনি ঘটান, কালচক্র যাঁরা হাতে সুদর্শনচক্রের মতো ঘোরে তিনি কালপুরুষ। সঞ্জয় এক প্রহর পরে দ্বৈপায়ন হ্রদে এসে দেখলেন এখানকার গোটা ছবিটি পালটে গেছে। কিন্তু দ্বৈপায়ন হ্রদে তার সঙ্গে দুর্যোধনের সাক্ষাৎ হঠাৎ দৈববশে ঘটে গেছে। দুর্যোধনের দ্বৈপায়নবাসের সংবাদ তিনি অশ্বত্থামা, কৃতবর্মা ও কৃপাচার্যকে দিয়েছিলেন। দিয়েছিলেন এক কর্তব্যবোধ থেকে। তাঁর মনে হয়েছিল দুর্যোধন এখন একক, নিঃসঙ্গ, অসহায়। তিনি জীবনে অনেক ভুল করেছেন। তার মধ্যে একটি হল তাঁর অনমনীয় ঔদ্ধত্য ও দর্প। অথচ তাঁর পিতা-মাতার মধ্যে যথেষ্ট বিনয়, নমনীয়তা ও ভদ্রতা আছে। কর্মচারী হলেও ধৃতরাষ্ট্র তাঁকে বন্ধুর মতোই দেখেন। গান্ধারীও তার প্রতি স্নেহশীল। কৌরব পরিবারে একমাত্র দুঃশাসন ছাড়া আর সবাই ভদ্র, নম্র। কিন্তু দুর্যোধনের আর একটি খারাপ স্বভাব ছিল তিনি যাকে পছন্দ করতেন তার সব কথাই বিশ্বাস করতেন। আর যাকে পছন্দ করতেন না, তাদের কোনো কথাই বিশ্বাস করতেন না। তাদের প্রতি উদাসীন ও কঠোর ছিলেন। সঞ্জয়কে দুর্যোধন কোনোদিনই কাছের লোক বলে মনে করেননি। তিনি তাঁকে পিতার লোক’ বলে গণ্য করতেন। উদ্ধত, আত্মভরী তরুণেরা বৃদ্ধ পিতাকে অপদার্থ ভাবে এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের ঘৃণা করে। সঞ্জয়ও দুর্যোধনের চোখে এমন ছিলেন। যেমন বিদুর, ভীষ্ম ও দ্রোণকেও পছন্দ করতেন না। বৃদ্ধ ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁর এক ধরনের উপেক্ষা কাজ করত। অশ্বত্থামাকে তিনি পছন্দ করতেন; সে বীর বলে নয়, আচার্য দ্রোণের পুত্র বলে। কিন্তু তার ওপর নির্ভর করতেন না। তিনি নির্ভর করতেন একমাত্র কর্ণের ওপর। কিন্তু দুর্যোধনের শেষ পরিণতি তাঁকে ব্যথিত করে তুলেছিল। কিন্তু তার কিছু করার ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন অশ্বত্থামা যদি তাঁকে কোনো সাহায্য করতে পারেন। তাই তিনি অশ্বত্থামাকে দুর্যোধনের খবরটি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তো কোনো ষষ্ঠ ব্যক্তি ছিল না। নির্জন হ্রদের তীরে দাঁড়িয়ে তিনি যখন দুর্যোধনের সঙ্গে কথা বলছিলেন সেখানে তো ত্রিসীমানায় কেউ ছিল না। আবার কিছুক্ষণ পরে অরণ্যপথে যখন অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মার সঙ্গে দুর্যোধনের বিষয়ে কথা বলছিলেন তখনও তো কেউ ছিল না। সঞ্জয় খুব আশ্চর্য হলেন।

কিন্তু সঞ্জয় জানতেন না, সেই সময় দুজন ব্যাধ গাছের আড়াল থেকে দুর্যোধনের সঙ্গে তাঁর সব কথা শুনছিল। এই ব্যাধেরাই সংবাদ বাহক।

.

ব্যাধের মুখে সংবাদ

ব্যাধেরা দুটি বরাহ নিয়ে কুরুক্ষেত্র শিবিরে গিয়ে বৃকোদরের সঙ্গে দেখা করে বরাহ দুটি দিতেই বৃকোদর আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠলেন। আজ যুদ্ধ শেষে একটু মনোমতো উপাদেয় আহার জুটবে। তিনি আদেশ দিলেন, এ দুটিকে ভোজশালায় জমা দিয়ে তোমাদের যোগ্য মূল্য চেয়ে নাও।

ব্যাধ বলল, আমরা আপনাকে শুধু বরাহ উপহার দিতে আসিনি মহাত্মন। আপনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দিতে এসেছি। তার জন্য কিন্তু উপযুক্ত রত্ন রাজি চাই।

ভীমসেন বললেন, কি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ আমায় বলো। আমার অদেয় কিছু নেই। তখন ব্যাধ বৃকোদরের কানে কানে দ্বৈপায়ন হ্রদে দুর্যোধনের অবস্থান ও অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মার সঙ্গে কথোপকথনের সারাংশ বর্ণনা করল।

মহাভারতে ভীমসেন চরিত্রটির সঙ্গে দুর্যোধনের অনেকটা মিল পাওয়া যায়। দুজনেই বাহুবলী। যুদ্ধবিশারদ এবং আবেগপ্রবণ। অতি দ্রুত ক্রুদ্ধ হন। ভীম বহুবার আপন ভ্রাতাদের সঙ্গে কলহে লিপ্ত হয়েছেন। দ্যুতসভায় তো যুধিষ্ঠিরকে হত্যা করতে উদ্যাত হয়েছিলেন। যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে তাঁর মতের মিল ছিল না। বিশেষ করে যুধিষ্ঠিরের মতো তাঁর অত নৈতিক শুচি মার্গ ছিল না। তিনি অনেকটা দুর্যোধনের মতো। তবে দুর্যোধনের মতো তিনি মূল্যবোধহীন ও লোভী ছিলেন না। মানুষ হিসাবে তিনি মাতৃভক্ত ও পরোপকারী ছিলেন। কোদালকে কোদাল বলতে ভালোবাসতেন। খনিত্র বলতেন না। দুর্যোধন ভীমকে হিংসা করতেন ছোটবেলা থেকে। ভীমের অসীম শক্তি ও সাহসকে তিনি ঈর্ষা করতেন। শৈশবে তিনি বিষ প্রয়োগে ভীমকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেন।

দ্যূতসভার দুর্যোধন ও দুঃশাসনের দ্রৌপদী অবমাননা ভীম সহ্য করতে পারেননি। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন দুঃশাসনের রক্তপান করবেন। করেছেনও। দুর্যোধন দ্যূতসভায় দ্রৌপদীকে অশ্লীল ইঙ্গিত করেছিলেন। উরু দেখিয়েছিলেন। ভীম প্রতিজ্ঞা করেছিলেন দুর্যোধনের উরু তিনি ভঙ্গ করে দেবেন। দুর্যোধন রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ায় চারিদিকে পাণ্ডবেরা গুপ্তচর পাঠিয়েছিল। কিন্তু কেউ কোনো খবর আনতে পারেনি।

এখন দুর্যোধনের সঠিক অবস্থানের খবর পেয়ে ভীম উল্লাসে ব্যাধদ্বয়কে জড়িয়ে ধরে শূন্যে ছুড়ে আবার লুফে নিলেন। তারা তো ভয়ে আধমরা। ভীম তাঁর মুক্তার কণ্ঠহার ব্যাধদের উপহার দিয়ে বিদায় দিলেন।

.

পাণ্ডবদের দ্বৈপায়ন আগমন

কিছুক্ষণের মধ্যে যুধিষ্ঠির পাণ্ডবদের নিয়ে দ্বৈপায়ন হ্রদের তীরে এসে হাজির হলেন। মুহূর্তে কী করে খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। দেখা গেল পাণ্ডব শিবির থেকে অজস্র রথের সারি দ্বৈপায়নের দিকে চলেছে। চলেছেন যুধিষ্ঠির, অর্জুন, ভীম, নকুল, সহদেব, পাঞ্চালতনয় ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, উত্তমৌজা, যুধামন্যু, সাত্যকি, দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র। এবং যুদ্ধে জীবিত অবশিষ্ট পাঞ্চালগণ। একটি রথে চলেছেন স্বয়ং বাসুদেবও। সবাই এসে দ্বৈপায়নের তীরে দাঁড়িয়ে পড়লেন।

নিস্তব্ধ হ্রদে কারও সাড়াশব্দ নেই। দুর্যোধনকে খুঁজে বার করা এক দুরূহ কাজ। শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, দুর্যোধন মায়া প্রভাবে জলের তলদেশে ঢুকে বাস করছেন। তাঁর কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। তাঁকে হ্রদ থেকে বার করতে হলে আপনাকেও মায়া প্রভাবে তা করতে হবে।

যুধিষ্ঠির একটু হেসে দুর্যোধনকে উদ্দেশ করে বললেন, তুমি তোমার নিজের দোষে সমস্ত ক্ষত্রিয়দের ধ্বংস করেছ। এখন কী জন্য নিজের জীবন রক্ষার জন্য জলের নীচে লুকিয়ে আছ? তুমি এখনই গাত্রোত্থান করে উঠে এসো। আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। হে পুরুষোত্তম, তোমার সেই দর্প ও অভিমান আজ কোথায়? বাইরে সকলে তোমার বীরপুরুষ রূপে কীর্তন করে। কিন্তু আজ তুমি প্রাণভয়ে জলাশয়ের ভেতর লুকিয়ে আছ?

ঠিক এই সময় সঞ্জয় এসে দ্বৈপায়নের তীরে যুধিষ্ঠিরের কাছে চলে এলেন। যুধিষ্ঠির সঞ্জয়ের দিকে একবার তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, তুমি তো ক্ষত্রিয়বংশে জন্মগ্রহণ করেছ দুর্যোধন। যুদ্ধ পরাঙ্মুখ হয়ে এভাবে লুকিয়ে থাকা কিন্তু ক্ষত্রিয়ের ধর্ম নয়। অসাধু লোকেরাই পলায়ন করে থাকে। তুমি যুদ্ধ না করে কি জন্য বেঁচে থাকতে চাইছ? তুমি সবার সামনে নিজেকে বীর বলে পরিচয় দাও, এটি একদম অসার। বীর পুরুষেরা কিন্তু প্রাণ গেলেও শত্রুকে দেখে পালায় না। তুমি কী মনে করে যুদ্ধ বর্জন করেছ সেটা খুলে বলো। ভয় না পেয়ে জল থেকে উঠে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। সমস্ত সৈন্য ও ভ্রাতৃগণকে নিপতিত করে জীবনের বাসনা করা ক্ষাত্রধর্ম অনুসারে তোমার কাছে অকর্তব্য। তুমি কর্ণ ও শকুনিকে মোহবশত আশ্রয় করে নিজেকে অপরাজেয় বলে ভাবতে। যে পাপাচরণ তুমি করেছ তার ফল ভোগ করতেই হবে তোমাকে। তোমার মতো বীর পুরুষেরা কখনই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালায় না। তোমার সে পৌরুষ, ক্ষত্রিয়াভিমান, সে বিক্রম এবং তর্জন-গর্জন, সে অস্ত্রশিক্ষা এখন কোথায় গেল? তুমি কী জন্যে জলাশয়ের ভেতরে লুকোলে? অচিরে তুমি জল থেকে উঠে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো। হয় আমাদের পরাজিত করে পৃথিবী ভোগ করো, না হয় আমাদের হাতে নিহত হয়ে ভূতলশায়ী হও।

এই কথা শুনে দুর্যোধন জল থেকে উঠলেন। বললেন, আমি পালাইনি। যে কোনো প্রাণীরই অন্তরে ভয় হতে পারে, এটি বিচিত্র নয়। কিন্তু আমি প্রাণভয়ে পলায়ন করিনি। আমার রথ ও তৃণীর বিনষ্ট হওয়ায় আমার সমস্ত সৈন্য-সামন্ত নিহত হওয়ায় আমি নিতান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে বিশ্রামের জন্য এই জলাশয়ে এসেছিলাম। প্রাণভয়ে নয়। হে কুত্তীনন্দন, তুমি একটু অপেক্ষা করো। আমি একটু পরে আসছি। তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করব।

যুধিষ্ঠির বললেন, যাক, অনেক চেষ্টা করে তোমাকে পাওয়া গেল। তুমি তাড়াতাড়ি এসে যুদ্ধ করো। যুদ্ধক্ষেত্রে হয় তুমি আমাদের বিনাশ করো, না হয় আমরা তোমাকে বিনাশ করি।

দুর্যোধন বললেন, হে মহারাজ, আমি যাদের জন্য রাজ্যলাভের অভিলাষ করেছিলাম তারা আজ সকলে মৃত। পৃথিবী এখন রত্নহীন ও ক্ষত্রিয়শূন্য। আমি তোমাকে এখনই পরাজিত করতে পারি। কিন্তু বিধবা রমণীর মতো এই অবনীকে উপভোগ করার আমার কোনো স্পৃহা নেই। আমি এখনই তোমায় পরাজিত করতে পারি, কিন্তু ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণকে হারিয়ে আর আমার যুদ্ধ করার মতো প্রবৃত্তি নেই। তুমিই এই হস্তী-অশ্বশূন্য বন্ধু-বান্ধবহীন পৃথিবী ভোগ করো। আমার মতো সহায়হীন কোন রাজা রাজ্য শাসন করতে ইচ্ছা করবে? আমার বন্ধু ও ভ্রাতারা নিহত, শত্রু আমার রাজ্য অপহরণ করে নিয়েছে। আমার জীবন ধারণের কোনো অভিলাষ নেই। আমি এখন মৃগচর্ম পরে বনে গমন করব। রাজ্যভোগে আমার আর বিন্দুমাত্র স্পৃহা নেই।

যুধিষ্ঠির বললেন, দুর্যোধন, তুমি জলের মধ্যে লুকিয়ে থেকে আর এই পরিতাপ কোরো না। শকুনির মতো তোমার এই মায়াকান্না আমার মনে বিন্দুমাত্র দয়ার সঞ্চার হচ্ছে না। তুমি এখন আমাকে সামান্য রাজ্য দিলেও আমি শাসন করতে আগ্রহী নই। পূর্বে আমি ধর্মসম্মতভাবে পুর রক্ষার জন্য রাজ্য প্রার্থনা করেছিলাম, তখন তুমি আমাদের তা দাওনি কেন? তুমি একদা বাসুদেবকে প্রত্যাখ্যান করেছিলে, এখনই বা রাজ্য দিতে চাইছ কেন? এখন এই রাজ্য তোমার বলপূর্বক অধিকারের ক্ষমতা নেই। সুতরাং তুমি কীভাবে সে রাজ্য দান করবে? এখন তুমি আমাকে পরাজিত করে এই পৃথিবী প্রতিপালন করো। শোনো কুরুরাজ, তুমি রাজ্য দিতে চাইলেও এখন আমি তোমার প্রাণ রক্ষা করব না। এখন হয় তুমি আমাদের জয় করে রাজ্য শাসন করো, না হয় আমাদের হাতে নিহত হয়ে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হও। তুমি বা আমি দুজনে জীবিত থাকলে লোকে আমাদের জয়-পরাজয়ে সন্দেহ করবে। এখন তোমার জীবন আমার হাতে। আমি তোমার প্রাণ রক্ষা করতে পারি। কিন্তু তাতে আমার আত্মরক্ষা হবে না। পূর্বে তুমি গৃহদাহ করে,

বিষ প্রয়োগ করে আমাদের বিনাশের চেষ্টা করেছিলে। তুমি আমাদের রাজ্য অপহরণ করেছ, দ্রৌপদীর কেশাকর্ষণ করেছ ও অপ্রিয় বাক্য প্রয়োগ করে বারবার আমাদের কষ্ট দিয়েছ। এই সব কারণে তুমি নিশ্চয়ই সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে যাবে। এখন তুমি জল থেকে ওঠো। যুদ্ধ করো। যুদ্ধই তোমার পক্ষে শ্রেয়। যুদ্ধ ছাড়া তোমার গতি নেই।

দুর্যোধন বললেন, তোমাদের বন্ধু-বান্ধব, রথ, অস্ত্র—সবই রয়েছে। আমি একাকী, রথহীন, হতবাহন ও পরিশ্রান্ত। আমি কী করে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব? এক কর্মহীন, পরিশ্রান্ত, বিপন্ন, ক্ষত-বিক্ষত ও শ্রান্তবাহন ব্যক্তিদের বীরের যুদ্ধ মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়। তবে তা সত্ত্বেও যখন যুদ্ধ চাইছ, একটু অপেক্ষা করো। সাধুগণের নামে শপথ নিয়ে বলছি বৎসর যেমন একে একে সমুদয় ঋতুতে মিলিত হয়, তেমনি আমি একে একে তোমাদের সকলের সঙ্গে মিলিত হব। প্রভাত সূর্য যেমন কিরণজাল বিস্তার করে রোগ-বীজাণু বিনাশ করে, তেমনি আমি তোমাদের সবাইকে সংহার করব। আমি তোমার ভাইদের নিকেশ করে ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণ, জয়দ্রথ, ভগদত্ত, শল্য, ভুবিশ্রবা, শকুনি ও আমার ভ্রাতা ও পুত্র ও বন্ধুদের হত্যার ঋণ পরিশোধ করব।

যুধিষ্ঠির তাই শুনে বললেন, হে দুর্যোধন, তুমি ক্ষত্রিয়ের ধর্ম অবগত আছ। তোমার ইচ্ছা পূরণের জন্য আমাদের মধ্যে যে কোনও একজন বীরকে বেছে নিয়ে তুমি তার সঙ্গে যুদ্ধ করো। তুমি আমাদের একজনকে বিনাশ করতে পারলেই সমুদয় রাজ্য তোমার। আমরা আবার বনে চলে যাব। বলো রাজি?

দুর্যোধন বললেন, আমায় যদি একজনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়, তাহলে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বলশালীর সঙ্গে যুদ্ধ করব। আর তুমি তোমার ইচ্ছামতো যে কোনো অস্ত্র বেছে নিতে বলেছ। আমি গদা বেছে নিলাম।

এরপর দুর্যোধন গদা হাতে করে হ্রদ থেকে উঠে এসে পাণ্ডবদের কাছে চলে এসে ঘন ঘন হুংকার ছাড়তে লাগলেন। পাঞ্চালরা যারা উপবিষ্ট ছিলেন তাঁরা পরস্পরকে করমর্দন করে মনের আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলেন।

দুর্যোধন বললেন, তোমরা একজন একজন করে এসে আমার সঙ্গে গদাযুদ্ধ করো।

দুর্যোধন গদা হাতে সিক্ত কলেবরে হ্রদের তীরে দাঁড়িয়ে। তাঁকে ক্রুদ্ধ কৃতান্ত অর্থাৎ যমরাজের মতো দেখাচ্ছিল।

যুধিষ্ঠির এবার বললেন, তুমি এমকজন একজন করে লড়তে চাইছ কিন্তু যখন অভিমন্যুর সঙ্গে সবাই মিলে লড়াই করেছিলে তখন তোমার প্রজ্ঞা কোথায় ছিল? বিপদকালে সবাই ধর্মচিন্তা করে কিন্তু সুখের সময় ভাবে পরলোকের দরজা বুঝি বন্ধ আমি এখনও বলছি, তুমি পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে যার সঙ্গে তোমার অভিরুচি, তার সঙ্গে যুদ্ধ করো। তাকে বিনাশ করলেই এই রাজ্য তোমার। না হলে নিহত হয়ে স্বর্গসুখ অনুভব করো।

দুর্যোধনের মাথায় কনকময় শিরস্ত্রাণ। বুকে সুবর্ণময় বর্ম। তিনি যেন সুমেরু পর্বতের মতো শোভা পাচ্ছিলেন। দুর্যোধন বলতে লাগলেন, হে বীরগণ, তোমাদের মধ্যে সহদেব, ভীম, নকুল, অর্জুন অথবা যুধিষ্ঠির যে কোনও একজন আমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে এগিয়ে এসো। গদাযুদ্ধে তোমরা কেউই আমার সমকক্ষ নয়। হ্রদের তীরে দাঁড়িয়ে দুর্যোধন বারবার হুংকার ছাড়তে লাগলেন।

শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে একান্তে বললেন, মহারাজ, আপনি কোন সাহসে দুর্যোধনকে বললেন যে তুমি আমাদের মধ্যে পছন্দমতো একজনের সঙ্গে যুদ্ধ করো। ওই দুরাত্মা যদি অর্জুন, নকুল কিংবা সহদেবকে যুদ্ধে আহ্বান করে তাহলে কি দুর্দশা হবে তা একবার ভেবে দেখেছেন? আপনারা কেউই কিন্তু গদাযুদ্ধে দুর্যোধনের সঙ্গে পেরে উঠবেন না। আপনি জানেন, ভীমসেনকে গদাযুদ্ধে নিহত করার বাসনায় দুর্যোধন তেরো বছর ধরে লৌহময় পুরুষের সঙ্গে লড়াই অনুশীলন করেছেন। আমাদের মধ্যে একমাত্র ভীম ছাড়া দুর্যোধনের সমকক্ষ কেউ নেই। এমনকী ভীমও গদাযুদ্ধ দুর্যোধনের মতো অত অনুশীলন করেননি। ভীমসেন বলবান, পরাক্রমশালী, কিন্তু দুর্যোধন গদাযুদ্ধে কৃতী, নিপুণ। বলবান ও কৃতী ব্যক্তিরাই সমধিক ক্ষমতাসম্পন্ন হন।

তখন ভীম উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, যদুনন্দন এ নিয়ে আর বিবাদ করবেন না। আজ আমি নিশ্চয়ই দুর্যোধনকে বিনাশ করব।

বাসুদেব বললেন, ভীম তুমি আশার কথা শোনালে। তোমার বাহুবলেই আজ ধর্মরাজ শত্রুহীন হয়ে রাজলক্ষ্মী লাভ করবেন। বিষ্ণু যেমন দেবরাজ ইন্দ্রকে স্বর্গরাজ্য জয় করে এনে দিয়েছিলেন, তুমি তেমনি যুধিষ্ঠিরকে সসাগরা পৃথিবী প্রদান করো।

ভীম এবার যুধিষ্ঠিরের অনুমতি চাইলেন। বললেন, ওই পুরুষাধম কখনই আমাকে পরাস্ত করতে পারবে না।

দুর্যোধন ততক্ষণে কাছাকাছি চলে এসেছেন। ভীম তাঁকে উদ্দেশ করে বললেন, তোমার পুত্রগণ্য ভাইয়েরা, তোমার পক্ষে যোগদানকারী ভূপতিরা সবাই শেষ হয়ে গেছে। এখন বাকি রয়েছ শুধু তুমি। আমি তোমাকে এই গদা দিয়েই যমালয়ে পাঠাব। তোমার দৰ্প ও বিপুল রাজ্যলালসা দূর হবে।

কুরুরাজ তা শুনে বৃকোদরকে বললেন, অত কথার কোনো দরকার নেই। অবিলম্বে আমার সঙ্গে এসে যুদ্ধ করো। তুমি বৃষ্টিহীন শরতের মেঘের মতো ফাঁকা গর্জন কোরো না।

সেই যুদ্ধের সময় ঘটনাক্রমে কৃষ্ণের জ্যেষ্ঠভ্রাতা বলরাম উপস্থিত ছিলেন। তিনি তীর্থ পর্যটনে বেরিয়েছিলেন। পর্যটন শেষে কুরুক্ষেত্রে এসে উপস্থিত হয়েছেন। ভীম, দুর্যোধন দুজনেই তাঁর শিষ্য। তাঁদের গদাযুদ্ধ দেখতে তিনি চলে এসেছেন। যুধিষ্ঠির তাঁকে বললেন, আপনি আমার ভ্রাতৃদ্বয়ের গদাযুদ্ধ নিরীক্ষণ করুন।

ভীম-দুর্যোধনের গদাযুদ্ধে দেখা গেল যে ভীম অপেক্ষা দুর্যোধন গদাযুদ্ধে অনেক পটু। তবে মহাবীর ভীম গদা ঘোরানোর ফলে গদা থেকে আগুন ও ধোঁয়া বেরোতে লাগল। দুজনের গদার অভিঘাতে ভয়ংকর শব্দ হতে লাগল। অগ্নি স্ফুলিঙ্গ বার হতে লাগল।

দুর্যোধন ভীমের ললাট চূর্ণ করার জন্য তাঁর ললাটে আঘাত করলেন। ভীমের ললাট থেকে রক্তধারা নেমে এলো। কিন্তু ভীম অটল রইলেন। তখন ভীম জোরে দুর্যোধনকে আঘাত হানতে দুর্যোধন সেই আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। পরক্ষণেই দুর্যোধন উঠে গদার আঘাতে তাঁর কবচ ছিন্ন করে ফেললেন। ভীম চৈতন্য হারালেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।

অর্জুন ভীমের দুরবস্থা দেখে কৃষ্ণকে বললেন, সখে, বৃকোদর ও দুর্যোধনের মধ্যে কোন বীর তোমার মতে যুদ্ধকুশল?

বাসুদেব বললেন, উভয়েই সমান শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়েছেন। ভীমসেন দুর্যোধনের চেয়ে বলবান কিন্তু কুরুরাজের যত্ন ও যুদ্ধ নৈপুণ্য অধিক। তবে দুর্যোধনকে নিহত করতে গেলে ন্যায় শাস্ত্র মতো যুদ্ধ করলে হবে না। একটু এদিক-ওদিক করতে হবে। উনি দ্যূতক্রীড়ার সময় দুর্যোধনের উরুভঙ্গের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। সে প্রতিজ্ঞা রাখতে গেলে মায়াবী দুর্যোধনকে মায়াবলেই নিপতিত করতে হবে। যদি ভীম দুর্যোধনের সঙ্গে ন্যায় যুদ্ধ করেন তাহলে যুধিষ্ঠিরেরই সংকট। দেখো কৌরবপক্ষীয় মহাবীররা সবাই নিহত হয়েছেন। কিন্তু ধর্মরাজের জন্যই এখন আমাদের সম্পূর্ণ জয়লাভ হবে কি না সন্দেহ। আচ্ছা তুমি বলো, উনি কী করে বললেন যে দুর্যোধন তুমি ভাইদের মধ্যে একজনকে বেছে নিয়ে লড়ো। একজনকে হারালেই তোমার রাজ্যলাভ হবে। দুর্যোধন যুদ্ধনিপুণ ভুলে যেও না। তাতে সে একাগ্রচিত্তে এ সমরে নেমেছে। তাকে হারানো দুঃসাধ্য। অন্যায় যুদ্ধ করেই দুর্যোধনকে হারাতে হবে। নইলে সে আমাদের অর্জিত রাজ্য পুনর্দখল করবে।

অর্জুন কৃষ্ণের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে ভীনকে ইশারা করে দেখালেন কোথায় আঘাত করতে হবে। যুদ্ধ করতে করতে ভীম দুর্যোধনের দিকে গদা ছুড়লেন। সেই গদা দুর্যোধনের গায়ে লাগল না। দুর্যোধন উলটে ভীমকে গদাঘাত করলেন। সেই গদাঘাতে ভীম মূর্ছা গেলেন।

ভীম আবার উঠে মহাবেগে দুর্যোধনের দিকে এগিয়ে গেলেন। এবার ভীম দুর্যোধনের জঘন লক্ষ্য করে গদা ছুড়লেন। গদা গিয়ে দুর্যোধনের দুটি হাঁটুই ভেঙে দিল। দুর্যোধন আর দাঁড়াতে পারলেন না। উরুভঙ্গ হয়ে সেখানেই নিহত বৃষের মতো পড়ে গেলেন।

গদাযুদ্ধে হাঁটুর নীচে আঘাত করা নীতি বহির্ভূত। দুর্যোধন কিন্তু কোথাও সে নীতি অমান্য করেননি। কিন্তু অর্জুনের নির্দেশে ভীম সেই কাজটা করলেন। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন, এছাড়া জয়লাভের আর কোনও উপায় নেই।

দুর্যোধনের পতনে পর্বত-বৃক্ষ সম্বলিত সমস্ত পৃথিবী যেন বিচলিত হয়ে উঠল। আকাশ থেকে রক্তবৃষ্টি হতে লাগল। অনবরত শোণিত বর্ষণ, ভীষণ উল্কাপাত ও পাংশুবৃষ্টি পড়তে লাগল। অন্তরীক্ষ থেকে রাক্ষস-নিশাচরদের কর্কশ চিৎকার ভেসে আসতে লাগল। এদিকে সমবেত দর্শকেরা চিৎকার আর জয়ধ্বনি শুরু করে দিল। যে জনতা কদিন আগেও মহারাজ দুর্যোধনের জয়ধ্বনি দিত, আজ দুর্যোধনের পতনে তারা ভীমের জয়ধ্বনিতে দ্বৈপায়ন তীর মুখরিত করে তুলল। পাণ্ডবপক্ষীয়রা ভেরী শঙ্খ বাজাতে লাগল।

ভীমসেন মুমূর্ষু ভূপতিত ভীমসেনের কাছে গিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, আমাদের প্রতি এতদিন যে উপহাস করে এসেছ, দ্রৌপদীর প্রতি যে কটূক্তি করে এসেছ এখন তার ফল ভোগ করো। এই বলে ভীমসেন ধরাশায়ী দুর্যোধনের মস্তকে বারবার পদাঘাত করতে লাগলেন।

উপস্থিত ধর্মাত্মা বলরাম ভীমের এই আচরণে ক্ষুব্ধ হলেন। যুধিষ্ঠির অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, ভীম, তুমি আজ বৈরীঋণ মুক্ত হয়েছ।* সৎকার্য দ্বারা হোক, অথবা অসৎকার্য দ্বারা হোক প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করেছ। এবার তুমি ক্ষান্ত হও। ভুলে যেও না, দুর্যোধন আমাদের জ্ঞাতি, এই বীর একাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্যের অধিপতি ছিল। ওর মস্তকে গদাঘাত করে অধর্ম কোরো না। প্রবীণ ব্যক্তিরা সবাই তোমাকে ধার্মিক বলে জানে। তোমার কাছ থেকে এই ধরনের ব্যবহার আমরা আশা করি না।

[* মহাভারতের মতে বৈরীঋণ শোধ করা অর্থাৎ শত্রুর প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হওয়া ও প্রতিপক্ষকে নিধন করাই ধর্ম। মহাভারত, কালীপ্রসন্ন সিংহ : শল্যপর্ব।]

দুর্যোধন মুমূর্ষু অবস্থায় মাটিতে পড়ে রয়েছেন। সারা দেহ রক্তাক্ত। তাঁর দুটি জানুই ভেঙে গেছে। তিনি আর কোনোদিনই উঠে দাঁড়াতে পারবেন না। গদাঘাতে মস্তক প্রায় বিচূর্ণ। তার ওপর এই মৃতপ্রায় মানুষটির ওপর ভীম কয়েকবার লাথি মেরেছেন। ভীমের লাথি কয়েকটি হস্তীর পদাঘাতের সমান। দুর্যোধন চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসছে।

তিনি যুধিষ্ঠিরের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। যুধিষ্ঠির তাঁর কাছে চলে এসেছেন। খুব করুণ মিনতিমাখা সুরে যুধিষ্ঠির তাঁকে বলছেন, হে কুরুত্তম, বিধাতার নির্দেশ তুমি আমাদের হিংসা করবে। আমরাও হিংসায় প্রবৃত্ত হব। এটাও বিধাতার নির্দেশ ছিল। তুমি তোমার পূর্বকৃত কর্মের ফল ভোগ করছ। এ নিয়ে তোমার এখন দুঃখ বা শোক করা উচিত নয়। যাই হোক, তুমি বালকের মতো লোভী ছিল, তোমার নিজের দোষেই তোমার এমন অবস্থা হল। তুমি তোমার বন্ধু, ভ্রাতা, গুরুপুত্র, পৌত্র ও অন্যান্য আত্মীয়গণের বিনাশ সাধন করে শেষে নিজে নিহত হলে। এখন তোমার শোক করা উচিত নয়। এখন মৃত্যুই তোমার পক্ষে শ্রেয়। আমরাই নিতান্ত হতভাগ্য আমাদের প্রাণাধিক বন্ধু বিচ্ছেদের বিচ্ছেদব্যথা সহ্য করে শোচনীয় অবস্থার মধ্যে দিন কাটাতে হবে। কী করে এখন বিধবা মিত্রপত্নী, ভ্রাতৃবধূ ও ভ্রাতুষ্পুত্রবধূদের শোকার্ত মুখ দেখে দিন কাটাব? তুমি এখন থেকে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে স্বর্গে বাস করবে। আর আমাদের বেঁচে থেকে নরকতুল্য এ সংসারে থেকে দিন কাটাতে হবে। এই জগতের সমুদয় দুঃখ আমাদেরই ভোগ করতে হবে। ধৃতরাষ্ট্রের বিধবা পুত্রবধূরা একান্ত শোকার্ত হয়ে আমাদের নিরন্তর ভর্ৎসনা করে যাবেন।

যুধিষ্ঠির এই কথা বলে আলতোভাবে দুর্যোধনকে স্পর্শ করে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রান্ত হলেন। প্রতিটি কথা দুর্যোধনের কানে এল বহুদূর থেকে ভেসে আসা কলগুঞ্জনের মতো। কিন্তু তাঁর চক্ষু নিমীলিত। দেহ প্রায় নিস্পন্দ।

আগেই বলেছি, ভীমের প্রথাবহির্ভূতভাবে দেহের অধঃপ্রদেশে (নাভির নীচে) আঘাত বলরাম মেনে নিতে পারেননি। ভীম বেরিয়ে আসতেই বলরাম দ্রুত ভীমকে মারতে ধেয়ে গেলেন। কৃষ্ণ দাদাকে দু’হাতে জড়িয়ে তাকে বাধা দিলেন।

শ্রীকৃষ্ণের রঙ কালো আর বলরাম ধাতুরাগরঞ্জিত শ্বেতপর্বতের মতো গৌরবর্ণ। কৃষ্ণ যখন বলরামকে জড়িয়ে ধরে নিবৃত্ত করছেন তখন মহাভারতকার তার বর্ণনা করছেন বিকেলের আকাশে যেন যুগল চন্দ্ৰ-সূর্য।’

বাসুদেব দাদাকে শান্ত করার জন্য বললেন, হে মহাত্মন, শাস্ত্রে ছ’ রকমের উন্নতির কথা আছে। এক, আপনার নিজের উন্নতি, দুই, আপনার বন্ধুদের উন্নতি, তিন, তাদের বন্ধু-বান্ধবদের উন্নতি, চার, শত্রুর অবনতি, পাঁচ, শত্রুর মিত্রদের অবনতি, ছয়, তাদের বন্ধু-বান্ধবদের অবনতি।

পাণ্ডবেরা আমাদের পিসিমার ছেলে। পিসতুতো ভাই। আমাদের সহজমিত্র। এরা বিপক্ষদের পরাজিত করেছে। দেখুন, প্রতিজ্ঞা পালনই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম। মহাবীর বৃকোদর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি দুর্যোধনের উরুভঙ্গ কররেন। এর আগে ঋষি মৈত্রেয় দুর্যোধনকে অভিশাপ দিয়েছিলেন একদিন ভীমের গদাঘাতে দুর্যোধনের উরুভঙ্গ হবে। তাই ভীমের দুর্যোধনকে গদাঘাত আমি অনুমাত্র দোষের দেখছি না। হে রেবতীরমন আপনি ক্রোধ সংবরণ করুন। পাণ্ডবদের সঙ্গে আমাদের যোনি সম্বন্ধ (বৈবাহিক সম্পর্ক) ও সাতিশয় সৌহার্দ্য আছে। সুতরাং এদের উন্নতিই আমাদের উন্নতি।

বলরাম সাময়িকভাবে নিরস্ত হলেন। কিন্তু বললেন, কৃষ্ণ, সাধু লোকেরাই ধর্মানুষ্ঠান করে থাকেন, কিন্তু সেই ধর্ম, অর্থ ও কাম দ্বারা লব্ধ হয়। অতিশয় লোভী ব্যক্তি অর্থলোভে, অতি আসক্ত ব্যক্তি কাম প্রভাবে ধর্মহীন হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি ধর্ম, অর্থ ও কামের প্রতি সমদৃষ্টি সম্পন্ন হয়ে দিন যাপন করতে পারেন তিনিই একমাত্র সুখভোগ করতে পারেন।* হৃষীকেশ, তুমি যতই আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করো না কেন, ভীমসেন যে অধর্ম আচরণ করেছে তা আমি আমার হৃদয় থেকে দূর করতে পারব না।

[*সনাতন হিন্দুধর্মের মূল কথা বলরামের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ ধর্ম, অর্থ ও কামের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখাই সুখ।]

বলরাম রাগ করে সেই মুহূর্তে রথে চড়ে দ্বারকার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। বলরামের এই হঠাৎ চলে যাওয়ায় উপস্থিত সকলেই মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। তখন বাসুদেব বিষণ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ দুর্যোধন ভীমকে পদাঘাত করায় সবাই অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তার এই অধর্মে অনুমতি দেওয়া আপনার কর্তব্য হয়নি।

যুধিষ্ঠির বললেন, ভীম ক্রুদ্ধ হয়ে যে কাজটা করেছে তাতে আমার সমর্থন নেই। আমি কুলক্ষয়েও সন্তুষ্ট নই। (কৌরব ভ্রাতাদের হত্যা) কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রতনয় নিত্য শঠ আচরণ করেছে। আমাদের কীভাবে নির্বাসিত করেছিল তা আপনি জানেন। আমি সেজন্য ধর্ম-অধর্ম যাই হোক জনবিরোধী, সদাচার বর্জিত দুর্যোধনের বিনাশ চেয়েছিলাম। সেজন্য তার মস্তকে পদাঘাতকে উপেক্ষা করেছি।

বলরাম যাই বলে যান, দুর্যোধনকে পদানত করার জন্য উপস্থিত পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণ ভীমকে প্রশংসা করতে লাগলেন। বললেন, বৃত্রাসুরকে নিহত করে দেবগণ ইন্দ্রকে যেমন অভিনন্দিত করেছিল, তেমনি আমি তোমাকেও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

কৃষ্ণ বললেন, যেদিন মহাত্মা বিদুর, দ্রোণ, কৃপ, ভীষ্ম, সঞ্জয় বারবার অনুরোধ করলেও দুর্যোধন পাণ্ডবদের পৈতৃক রাজ্যের অংশ দিতে অসম্মত হয়েছিল তখনই সে আমার কাছে মৃত। আজ আর তার সম্পর্কে আলোচনা করে লাভ নেই। এখন ওই পাপিষ্ঠ মুমূর্ষু। তার মৃত্যু আসন্ন। চলো আমরা এই স্থান ত্যাগ করে শিবিরে ফিরে যাই।

তারপর সেই নির্জন দ্বৈপায়ন হ্রদের বালুভূমিতটে জানুভঙ্গ, গুরুতর আহত মৃত্যুপথযাত্রী দুর্যোধনকে ফেলে রেখে সবাই কুরুক্ষেত্র শিবিরে রওয়ানা দিলেন।

জনতা ধীরে ধীরে চলে গেল। শুধু কয়েকজন বার্তাবহ রয়ে গেল। তারা এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছিল দুর্যোধন মৃত্যুর আগে যদি কিছু বলেন সেই আশায়। তাহলে সেই কথাগুলি তাঁরা তাঁদের নিয়োগকর্তাদের কাছে গিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা কাবেন।

কিন্তু তাঁরা দুর্যোধনের কাছে গিয়ে দেখলেন জীবন ও মৃত্যুর প্রান্তদেশে ভারত ঈশ্বর ভূমিশয্যায় শায়িত। তাঁকে ডেকেও সাড়া পাওয়া গেল না। তাঁরা মহারাজের চৈতন্য ফিরে আসার প্রতীক্ষায় রইলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *