ব্যাসের আশ্রমে
ব্যাসদেবের এই আশ্রমটি হস্তিনাপুর থেকে একবেলার হাঁটা পথ। সবুজ অরণ্যের মধ্যে আশ্রম। অরণ্যের মধ্যে নিস্তব্ধতা দিয়ে ঘেরা ছবির মতো কয়েকটি কুটির নিয়ে এই তপোবন। এখানে দ্বাদশটি শিশু বেদ শিক্ষা করে। অরণ্যটির নাম দম্য বন। এই গহন বনে চারজন আচার্য এটি চালান। মহর্ষি ব্যাস’ বৎসরান্তে একবার তাঁর প্রতিটি আশ্রম পরিদর্শন করে যান। দৈনন্দিন কার্য পরিচালনা করেন তাঁর শিষ্য এই চার আচার্য। তাদের মধ্যে মহাআচার্য হলেন আচার্য সোমক। তিনি প্রবীণ ঋষি। বহু বৎসর ধরে এই আশ্রম পরিচালনা করছেন
পথ খুঁজে খুঁজে পথশ্রান্ত অশ্বত্থামা গোধূলিবেলায় যখন ব্যাসদেবের আশ্রমে পৌঁছলেন, তখন আশ্রম প্রাঙ্গণে আশ্রমিকেরা সান্ধ্য প্রার্থনা করছে—
‘সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সংবো মনাংসি জানতাম’
(তোমরা মিলিত হও, তোমরা এক স্তব উচ্চারণ করো, তোমাদের পরস্পরের মন এক হোক।)
অশ্বত্থামা প্রার্থনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন।
প্রার্থনা শেষ হতে আচার্য সোমক তাঁর কাছে এগিয়ে এসে বললেন, আর্য, আপনি কোথা থেকে আসছেন? আপনার গলায় উপবীত দেখে মনে হচ্ছে আপনি ব্ৰাহ্মণ!
অশ্বত্থামা বললেন, আমার নাম অশ্বত্থামা। আমি দ্রোণপুত্র। মহর্ষি ব্যাসদেব* আমাকে এই আশ্রমে পাঠিয়েছেন। আমি আপনাদের আশ্রমিক হতে চাই। এই তাঁর অভিজ্ঞান পত্র।
[* বশিষ্ঠের পুত্র শক্তি, শক্তির পুত্র পরাশর। পরাশরের ঔরসে ধীবরকন্যা মৎস্যগন্ধার গর্ভে ব্যাসের জন্ম। একটি দ্বীপে তাঁর জন্ম বলে তাঁর নাম হয় দ্বৈপায়ন ব্যাস। তিনি বেদকে চার ভাগে ভাগ করেন ও বেদজ্ঞ হন বলে তাঁর নাম বেদব্যাস।]
অভিজ্ঞানটি দেখে সোমক বললেন, আপনি দ্রোণপুত্র? আপনার নাম আমি বহুবার শুনেছি। আপনার পিতা এখন কেমন আছেন? আমি শুনেছি কুরুক্ষেত্রে এক মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। পাণ্ডবেরা তাদের হৃতরাজ্য উদ্ধারের জন্য এই যুদ্ধ করছেন। শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবদের সঙ্গে আছেন। আমরা নগরজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। মাঝে মাঝে নগর থেকে কেউ এলে যেটুকু সংবাদ বহন করে আনেন। আশ্রমের বাইরে আমরা কোনো কিছুর সংবাদ রাখি না। লোকালয় এখান থেকে অনেক দূরে।
অশ্বত্থামা বললেন, আমার পিতা দ্রোণ নিহত হয়েছেন। তাঁকে অন্যায়ভাবে মিথ্যা কথা বলে ছল করে হত্যা করা হয়েছে।
এই বলে অশ্বত্থামা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তাঁকে দিয়ে বললেন, যুদ্ধ শেষে রাতের অন্ধকারে পাণ্ডব শিবিরে ঢুকে তিনি কীভাবে পাণ্ডবপুত্রদের হত্যা করেছেন। সে কথাও অকপটে বলে গেলেন।
সোমক শুনে বললেন, সে কী, আপনি তো গর্হিত কাজ করেছেন দ্রোণপুত্র। এ তো কপট হিংসা। সনাতন ধর্ম বিরোধী। আমাদের পরম গুরু মহর্ষি ব্যাস বলেন, অহিংসাই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। আমাদের আশ্রমিকদের মধ্যে এই অহিংসা ধর্মই আমরা প্রচার করি।
অশ্বত্থামা উত্তেজিত হয়ে বললেন, আচার্যদেব, এই যে অষ্টাদশ দিবস ধরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয়ে গেল, তাকে অষ্টাদশ অক্ষৌহিনী সৈন্যের মৃত্যু হল। আপনি তাকে হিংসা বলবেন না?
সোমক বললেন, সেটি ঘোষিত যুদ্ধ। সেটি ছিল ধর্মযুদ্ধ। বীর যোদ্ধারা স্বেচ্ছায় সে যুদ্ধে এসেছেন। যুদ্ধে জয়-পরাজয় আছে। মৃত্যুও আছে। তা স্বেচ্ছামৃত্যু। ক্ষত্রিয়রাই যুদ্ধ করে। এটি তাঁদের ধর্ম। একে কোনো পাপ বর্তায় না। যুদ্ধে মৃতরা বরং দেবলোকে যায়। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে কোনো হত্যা দস্যুতা। তা ভারতীয় সনাতন ধর্মের বিরোধী। আর যুদ্ধ ক্ষত্রিয়ের ধর্ম। ব্রাহ্মণের ধর্ম ক্ষমা। শান্তি। আপনি, আপনার পিতা ও আপনার মাতুল কৃপাচার্য, আপনারা জাতি-ধর্ম পরিত্যাগ করে কেন ক্ষত্রিয়দের নৃশংস ধর্মকে বেছে নিলেন জানি না।
অশ্বত্থামা বললেন, কৃষ্ণ আমাকে অভিশাপ দিয়েছেন আমার জীবনে করুণ পরিণতি নেমে আসবে। আমি রোগজীর্ণ হয়ে পড়ব। আমার দেহ ক্ষত ও পুরীযে ভর্তি হয়ে যাবে।
—আপনি এজন্য ভগ্ন হৃদয় হবেন না গুরুপুত্র। আচার্যদেব যখন আপনাকে এখানে পাঠিয়েছেন তখন নিশ্চয়ই এই মনে করে পাঠিয়েছেন ক্ষত্রিয়ের হিংসা ধর্ম থেকে আপনি ফিরে এসে আশ্রম জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন। অহিংস ধর্ম গ্রহণ করে আপনার শাপমোচন হয়ে যাবে। যজ্ঞ, অধ্যয়ন ও ব্রহ্মচর্যের মধ্যে জীবন যাপন করলে আপনি শুদ্ধ হয়ে উঠবেন। অহিংস ও তাপসের জীবন যাপন করলে আপনি অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবেন। আপনি সর্বদা সেই পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের ভজনা করুন। তিনি পরম করুণাময়। তিনি মূককে বাচাল করে তুলতে পারেন, পঙ্গুকেও গিরি লঙ্ঘনে সাহায্য করবেন। আশ্রমে আপনার নতুন জীবন শুরু হোক।
একটু থেমে সোমক আবার বললেন, আমাদের আশ্রমের বিধি-বিধান অতি কঠোর আমরা আশ্রমিকরা এখানে সবাই সর্বত্যাগী। আমরা প্রতিদিন বনের ফলমূল ও আশ্রমের জমিতে উৎপন্ন ফসল ও ফলমূল খেয়ে প্রাণ ধারণ করি। শস্যক্ষেত্র থেকে নীবার ধান্য সংগ্রহ করি। আমাদের কারও কোনো নিজস্ব সম্পদ নেই। আমরা সঞ্চয়ও করি না! আপনি এখানে সব ত্যাগ করে এসেছেন তো? আপনি তো সারাজীবন অকৃতদার, তাই না?
অশ্বত্থামা বললেন, আমার একমাত্র সম্পদ ছিল আমার মাথার একটি মণি। আমি সেটিও মহর্ষির আদেশে পাণ্ডবদের দান করে এসেছি। আজ আমি সম্পূর্ণ রিক্ত। আমি সারাজীবন ব্রহ্মচর্য পালন করে এসেছি।
আচার্য বললেন, সর্বস্ব দান করেও কেউ রিক্ত হয় না। বরং বিই চিত্তকে ক্রমশ অপ্রশস্ত করে। ত্যাগের দ্বারা যে ভোগ, সেই ভোগই কিন্তু সচ্চিদানন্দ দান করে। আপনি তো ক্ষত্রিয়রাজ সঙ্গ করে দেখলেন আচার্যপুত্র। এত লোকক্ষয় করে কী পেলেন? শুধু প্রতিশোধ নিয়ে হৃদয় পূর্ণ করা যায় না। ক্ষমাতেই সমস্ত আনন্দ। হিংসা সব সময় প্রতিহিংসার জন্ম দেয়। প্রতিহিংসার ভয় হিংসাকারীকে একমুহূর্ত দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করতে পারে না।
অশ্বত্থামা বললেন, আচার্যদেব, যদিও আমি মহর্ষির কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আশ্রমের সমস্ত বিধি ও সংস্কৃতি আমি মেনে চলব। তবে আমার মনকে তৈরি করতে একটু সময় দিন। শৈশব থেকে আমি যুদ্ধবিদ্যা ও শাস্ত্রচর্চা দুটোই করেছি। কিন্তু যুদ্ধবিদ্যাই আমার জীবন সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গেছে। এই ব্যাপারে আমি পিতার প্রশ্রয় পেয়েছি। তিনি আমায় অর্জুন ও দুর্যোধনের সমকক্ষ করেই তৈরি করেছেন।
আমার শৈশব দারিদ্রের মধ্যে কেটেছে, কিন্তু কৈশোরকালে আমার পিতা ভীষ্মের অনুগ্রহ লাভ করেন। আমি একরকম রাজকীয় স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেই মানুষ হই। মহাদেবের আশীর্বাদে আমি এক তেজোময় মণি নিয়ে জন্মেছিলাম। ওই মণির প্রভাবে আমি প্রবল বীর্যশালী হয়ে উঠেছিলাম। মহর্ষি যখন আমায় বললেন, সর্বস্ব ত্যাগ করে তবেই তিনি আমাকে তাঁর আশ্রমে স্থান দেবেন, তখন আমি সেই মণিটিও ত্যাগ করে এসেছি। এখন আমি মানসিক দিক থেকে দুর্বল। আমি সব ত্যাগ করেছি, কিন্তু আমার মনকে অহিংসার জন্য কিছুতেই তৈরি করতে পারছি না। বরং আজও আমার মনে হচ্ছে পাণ্ডবদের মতো শূন্য থেকে শিখরে উঠতে গেলে যুদ্ধের প্রয়োজন আছে। যুদ্ধ মানেই হিংসা। আর যুদ্ধে যে কোনো ন্যায়-নীতি খাটে না, পাণ্ডবেরাই তা প্রমাণ করেছে।
আর আমার মনে হয়েছে সম্মুখ যুদ্ধে জয়ের পথ বড় দীর্ঘায়িত। তাকে আরও নাতিদীর্ঘ করে রাজ্যক্ষমতা দখল করার জন্য আরও সহজ ও ক্ষিপ্রগতি দরকার। আমি সেই পথ অবলম্বন করে সফল হয়েছিলাম। আমি পাঞ্চালবংশ বিনষ্ট করেছি। পাণ্ডববংশও ধ্বংস করেছি। আমার ব্রহ্মশির অস্ত্র পাণ্ডবদের ভবিষ্যৎ বংশধরকেও বিনষ্ট করবে। আমি নিশ্চিত অভিমন্যুবধূ উত্তরা মৃত পুত্রের জন্ম দেবে। কৃষ্ণ দাবি করছেন তিনি মৃত পুত্রকে আবার বাঁচিয়ে তুলবেন। দেখা যাক তিনি কতদূর সফল হতে পারেন। যদি পারেন, আমি তাঁর অভিশাপ বহন করে বেড়াব। আমি খুশি যে আমার সঙ্কল্প সিদ্ধ হয়েছে। আমি মহর্ষিকে কথা দিয়েছি, আমি নতুন জীবন যাপন করব।
অশ্বত্থামা বললেন, কিন্তু অহিংসা পরম ধর্ম এই তত্ত্ব প্রচার করতে আমার একটু সময় লাগবে আচার্যদেব। আমি মন থেকে অহিংসাকে মেনে নিতে পারছি না। আমায় একটু সময় দিন।
সোমক বললেন, মানুষ তার পরিবেশের দাস। পরিবেশ তার জীবনের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। আপনি হিংসার পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছেন। রাজারা নিজেদের সাম্রাজ্যক্ষুধা মেটানোর জন্য, ভোগ-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য যুদ্ধ করে, লুণ্ঠন করে, দুর্বলদের দাসে পরিণত করে। আর তাদের সাম্রাজ্য লিপ্সার বেতনভুক সহকারী তৈরির জন্য সহস্ৰ সহস্ৰ শবের প্রয়োজন হয়। এই শবদের তারা গৌরবান্বিত করে বীর বলে।
আচার্যপুত্র, প্রকৃত বীর কিন্তু সর্বত্যাগী ব্রাহ্মণেরা। আমাদের অরণ্যবাসী ঋষিরা। যাঁরা স্বেচ্ছায় অরণ্যবাসী হয়ে চরম দারিদ্র বরণ করে নিয়েছেন। প্রকৃত বীর শবর চণ্ডাল, সমস্ত বর্ণের সেবাদানকারী শূদ্রেরা। যাদের ধন সঞ্চয়ের পর্যন্ত অধিকার নেই। কিন্তু তারা তাদের ভাগ্যকে দোষারোপ করে না। সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদও করে না। তাদের কাছে জীবনটাই রণক্ষেত্র। বাঁচাটাই সংগ্রাম। তার আপন আপন অহিংস সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে থাকে। তাদের মুখের হাসি কেউ কেড়ে নিতে পারে না।
আচার্যপুত্র, রাজপ্রাসাদ থেকে বেদ রচিত হয়নি। বেদ, নিরুক্ত, কল্প, জ্যোতিষ, বেদান্ত, এ সবই অরণ্যবাসী সর্বত্যাগী ঋষিদের সৃষ্টি। আপনি ব্রাহ্মণপুত্র হয়ে কেন স্বধর্মে নিধন না হয়ে, পরোধর্ম ক্ষাত্রধর্ম গ্রহণ করেছিলেন বলেই এত কষ্ট পেয়েছেন। আজ মণিহারা হয়ে ভস্ম অপমান শয্যা থেকে আপনার জলদর্চি তনু নতুন করে জেগে উঠুক। আমি শুনেছি আপনি চিরজীবী। আপনার সম্মুখে আগামী পৃথিবী পড়ে রয়েছে। আমরা ক্ষণিকের জন্য এসেছি, আমাদের কাল শেষ হলে চলে যাব। আপনি কিন্তু আগামী পৃথিবীর জন্য বেঁচে থাকবেন। সেই পৃথিবীতে ভারতের শাশ্বত অহিংসা মন্ত্র প্রচারের ভার কিন্তু আপনার ওপর বর্তাবে। ভারতের ধর্ম, ত্যাগ, সত্য ও অহিংসা। এটিই সনাতন ধর্ম।
অশ্বত্থামা বললেন, আচার্য, আমার মন থেকে সন্দেহ কিছুতেই দূরীভূত হচ্ছে না। আপনারা যে যজ্ঞানুষ্ঠান করেন সেখানেও তো পশুবলি দেন। সেটি কি হিংসা নয়? এই যে রাজারা অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন, একটি পালিত ও শিক্ষিত অশ্বকে সারা দেশ সযত্নে ঘুরিয়ে আনার পর তাকে যজ্ঞে বলি দেওয়া হয়। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদি হোমাগ্নিতে আহুতি দেওয়া হয়। তার মেধকে ঘৃত হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এর চেয়ে বড় হিংসা আর কী হতে পারে?
সোমক বললেন, আমরা আশ্রমে যে যজ্ঞ করি তাতে পশুবলি দিই না। কিন্তু যারা পশুবলি দেন তাঁরা বলেন, এতে পশুরই লাভ হয়। সে পশুজন্ম থেকে মুক্ত হয়ে সে মনুষ্যজন্ম লাভ করে।
অশ্বত্থামা হেসে বললেন, এতে যদি পশুরই লাভ হয় তাহলে মানুষের যজ্ঞানুষ্ঠানে প্রয়োজন কী! এই পশু বাকহীন, দুর্বল, প্রতিবাদ করতে পারে না। সে কি নিজে এই মুক্তি চায়? আপনারা তার ওপর আপনাদের পশুবল খাটান। আর যদি বলির দ্বারা পশুর মুক্তি হয়, তাহলে তো বলি দ্বারা মানুষেরও মুক্তি হতে পারে। তবে নরবলি দেন না কেন? জরাসন্ধ তো রাজাদের বন্দি করে এনে নরবলি দিতে চেয়েছিলেন। জরাসন্ধের এই নরবলির বিরুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ ও পাণ্ডবেরা প্রতিবাদ করে জরাসন্ধকে বধ করেছিলেন। আপনারা জানেন, নরবলি দিলে তাদের আত্মীয়স্বজন প্রতিবাদ করবে। কিন্তু পশুরা অসহায়। পশুদের হয়ে প্রতিবাদ করার কেউ নেই।
সোমক বলল, আপনি কী বলতে চান? পশুবলি তো শাস্ত্র বিহিত।
অশ্বত্থামা বললেন, এই শাস্ত্র তো আপনারাই তৈরি করেছেন। মানুষ শাস্ত্র তৈরি করে তার নিজের প্রয়োজনে, না হয় সমাজের প্রয়োজনে। আমিও হিংসার সপক্ষে একটি শাস্ত্র রচনার কথা ভেবে এসেছিলাম। মানুষ কীভাবে অতি সহজে হিংসা ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করে রাজ্যলাভ করবে।
—আপনি কি এখনও সেসব ভাবছেন নাকি দ্রোণপুত্র? তাহলে কিন্তু এই আশ্ৰম আপনার স্থান নয়। এখানে হিংসা অচল।
অশ্বত্থামা বললেন, না, আমি মহর্ষির কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি আশ্রম বিধি মেনে চলব। আমি শুধু তর্কের খাতিরে আপনাকে বলতে চাই অহিংসা একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী শব্দ। প্রভু, এই জগতের সমস্ত পদার্থেরও প্রাণ আছে। আপনি যখনই এই পৃথিবীর গন্ধঘ্রাণ, রসাস্বাদন, রূপদর্শন, বায়ুসেবন, শব্দসেবন ও কর্তব্য-অকর্তব্য অবধারণ করবেন তখন হিংসা ছাড়া আপনি এক-পা অগ্রসর হতে পারবেন না। আপনার প্রতি নিশ্বাসে যে বাতাস নেন তার মধ্যেই লক্ষ লক্ষ জীবাণু আপনার দেহের ভেতর গিয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। আপনার প্রতি পদভারে লক্ষ লক্ষ কীট বিনষ্ট হচ্ছে। আপনাকে যে কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রতিবন্ধক শক্তিকে চূর্ণ করে এগিয়ে যেতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন তিনি ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্ম বিরোধী কৌরবদের হনন করাকেই ধর্ম বলেছেন। আমিও সে কথা মনে করে পাণ্ডবদের হনন করেছিলাম। তবে ধর্মযুদ্ধের নামে প্রতারণা না করে। আমি যে হিংসার কথা ভেবেছিলাম তা সরাসরি হিংসা। যার যা অস্ত্র আছে তা নিয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করো, হত্যা করো। কোনো মমতা নয়, নিষ্ঠুর আঘাতে তাদের বিনাশ করো। প্রতিটি নগর, প্রতিটি পল্লীই যুদ্ধক্ষেত্র। সেখানে শত্রুদের চিহ্নিত করো। অতর্কিতে আঘাত করে তাদের বিনষ্ট করো।
আচার্য সোমক শুনে রোমাঞ্চিত হলেন। এ কাকে পাঠালেন মহর্ষি! এই সেই দ্রোণপুত্ৰ অশ্বত্থামা। যে নাকি বেদজ্ঞ, শাস্ত্রজ্ঞ, অথচ বাহুবলী। কিন্তু তার মুখে তো বাহুবলী দস্যুর কথার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এ তো দুদিনেই এই আশ্রম বিনষ্ট করে দেবে।
অশ্বত্থামা লক্ষ্য করলেন তার কথায় সোমকের কপালে ভাঁজ পড়েছে। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। অশ্বত্থামা হেসে বললেন, আপনি চিন্তিত হবেন না আচার্য। আমি প্ৰতিশ্ৰুতি দিচ্ছি, কুরুক্ষেত্রের অশ্বত্থামা আজ সত্যিই হত। আমাকে আজ যে মূর্তিতে দেখেছেন তা অভিশপ্ত, মণিহারা, অস্ত্রহীন আর এক নতুন অশ্বত্থামা। আমি মহর্ষিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, আপনাকেও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমি আমার নতুন জীবনদর্শনকে বিসর্জন দিচ্ছি। আমি এখন থেকে আপনাদের মতোই সর্বত্যাগী ব্রাহ্মণের জীবন বরণ করব। আশ্রমের যে কোনো কর্মে আমায় নিয়োগ করুন। আমার শৈশবে পড়া বেদ আমি এখনও ভুলে যাইনি। এই দেখুন, আমার প্রিয় উপনিষদের বাণী আমার আজও কণ্ঠস্থ আছে।
অশ্বত্থামা তাঁর উদাত্ত কণ্ঠ থেকে আবৃত্তি করলেন—
মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি
সিন্ধবঃ মাধ্বীর্ণ সন্তোষধীঃ
আর রক্তক্ষরণের কথা বলব না আচার্য—এখন থেকে মধুক্ষরণের কথাই বলব। কিন্তু সর্বদা আমার বুকে বাজে কৃষ্ণের অভিশাপ। আমি কী শাপমুক্ত হবো?
সোমক বললেন, সদ্ কর্ম সদ্ আচরণের দ্বারাই একমাত্র পাপের স্খলন হতে পারে। শিক্ষাদানের মতো পুণ্য আর কিছুতেই নেই। আপনি সর্বপাপ থেকে মুক্তি পাবেন।
.
সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। ইতিমধ্যে একটি আশ্রম বালক একটি প্রদীপ পিলসুজের মাথায় বসিয়ে দিয়ে চলে গেল। আসার সময় সে সন্তর্পণে একহাত দিয়ে আড়াল করে প্রদীপটি নিয়ে আসছিল।
প্রদীপের মৃদু আলোয় আচার্য দেখলেন দীর্ঘদেহী মানুষটির চোখে-মুখে অসীম বেদনা ফুটে উঠেছে। আচার্য তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর হাতদুটি ধরে বললেন, আর্যপুত্ৰ, আপনি এইমাত্র দেখলেন ওই আশ্রমিক বালকটি কত সাবধানে এই প্রদীপটি নিয়ে এল। আলোকশিখার শক্তি অসীম, কিন্তু অন্যদিকে সে ভীষণ দুর্বল, একটু দমকা বাতাস তাকে নিভিয়ে দিতে পারে। তাই তাকে এত সাবধানে নিয়ে আসতে হয়। মৃত্যুর কোনো দায় নেই। সেটি দমকা হাওয়ার মতো এক ঝটকায় নিভে যেতে পারে। জীবনের দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। তাঁকে বেঁচে থাকার জন্য সচেষ্ট থাকতে হয়। জীবনের ধর্মগুলি প্ৰেম, প্রীতি, ভালোবাসা, অনৃশংসতা, জ্ঞানচর্চা দিয়ে বহু কষ্ট করে অব্যাহত রাখতে হয়। আপনি হত্যার কৌশলের কথা ভেবে এসেছেন। এখানে, এই আশ্রমে জীবন যাপনের কৌশল আপনাকে শিখতে হবে। আপনি মৃত্যু উপত্যকা থেকে জীবনের এই সমভূমিতে নেমে এসেছেন আর্য। এখানে ভোগবাসনা নেই, শুধু জ্ঞান বাসনা আছে। জ্ঞানচর্চাতেই দিন কাটে আমাদের। জ্ঞানই শক্তির উৎস, অস্ত্রের ঝনঝনা নয়। সামগানই আমাদের শক্তির উৎস। এই অরণ্যই বিশ্বমানবকে ডাক দিয়েছিল অমৃতের পুত্র বলে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আপনি এই শান্তিকুঞ্জে চলে এসেছেন।
আত্মা দু’রকম। ক্ষর ও অক্ষর। উপাধিযুক্ত আত্মা ক্ষর। উপাধিহীন আত্মা অক্ষর। যার আত্মা মায়ার সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রাণ, ইন্দ্রিয়, মন, ও বুদ্ধিরূপে ব্যবহৃত হয়, সেই ব্যক্তিরই হিংসা থেকে ভয় উৎপত্তি হয়। কিন্তু যে ব্যক্তির আত্মা প্রাণ থেকে পৃথকভাবে অবস্থিত থাকে, যে নির্দ্বন্দ্ব ও সমভূতে সমদর্শী হয়, তাকে আর হিংসার ভয় গ্রাস করে না। দ্রোণপুত্র, তুমি তোমার প্রাণকে ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধির ওপরে উঠিয়ে অবস্থান করো। দেখবে হিংসা তোমাকে স্পর্শ করছে না। আত্মাকে কোনো কিছুর মধ্যে লিপ্ত রেখো না। প্রাণাদি থেকে পৃথকভাবে অবস্থান করাই অহিংসা।
অশ্বত্থামা এতক্ষণ নির্বাক হয়ে শুনছিলেন। আশ্রমের মাটির ঘরের দেওয়ালে দুটি দীর্ঘ ছায়া।
সন্ধ্যা নামতে না নামতেই ঘন কৃষ্ণ অন্ধকারে চারিদিক ঢেকে গেছে। ঝিঁঝিপোকার ডাক শুরু হয়েছে। পাশের ঘরে আশ্রমিক বালকেরা তখনও প্রার্থনা করছে। তাদের সমবেত কণ্ঠে আবৃত্তি শোনা যাচ্ছে।
অগ্নেনয় সুপথা বায়ে অস্থান
বিশ্বানি দেব রঘুনানি বিদ্বান
যুয়োধ্যান্মজ জুহুরাণমেনো
ভূয়িষ্ঠাংতে নম উক্তিং বিধেম*
[* হে মাৰ্গদর্শক প্রভু, বিশ্বের সব তত্ত্বই তুমি জানো। সরলপথে আমাদের সেই পরম আনন্দের অভিমুখে নিয়ে যাও। যে পাপ বক্রপথে ঘুরছে তাকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাও। অথর্ব বেদ।]
আচার্য সোমক তাকে নিয়ে সহ আচার্যদের ঘরে গেলেন। এটিও মাটির ঘর। ওপরে খড়ের চাল। নিকানো মেঝে। এই মেঝেতেই একটি করে কম্বল পেতে কোনো উপাধান ছাড়াই চার আচার্য শয়ন করেন। অশ্বত্থামার জন্য একটি অতিরিক্ত শয্যার আয়োজন করতেই ঘরটা ভরে গেল।
ঘরের একদিকে কাঠের তাক ভর্তি কাপড়ে সন্তর্পণে মোড়া অজস্র পুঁথি। আড়াআড়িভাবে টাঙানো রজ্জুতে আচার্যদের কয়েকটি গৈরিক বস্ত্র ঝুলছে।
আচার্য সোমক সহ আচার্যদের ডাকলেন। সকলের সঙ্গে একে একে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ইনি ব্রহ্মচারী গৌতম, ইনি ব্রহ্মচারী শারদ্বত, আর ইনি হলেন ব্রহ্মচারী বিশ্বরূপ। ইনি ব্রহ্মচারী শৈলেন্দ্ৰ।
অশ্বত্থামাকে দেখিয়ে সোমক পরিচয় করিয়ে দিলেন, ইনি দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা। মহর্ষি একে আমাদের আশ্রমে পাঠিয়েছেন। ইনি আমাদের সঙ্গে আশ্রমিক হয়ে বাস করবেন।
চার সহ আচার্যই করজোড়ে অশ্বত্থামাকে প্রণাম জানিয়ে বলল, আর্য, আপনি দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা? আপনি যে আমাদের মধ্যে আসবেন, তা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না। আমরা শুনেছি দ্রোণাচার্য কৌরবদের হয়ে লড়াই করছেন। যুদ্ধের কী গতি? আমরা এখানে বসে তার কোনো খবর পাই না। এই অরণ্যে বার্তাবহ কোথায় পাব? আপনার পিতার খবর কুশল তো? যুদ্ধ চলছে? সহ আচার্য বিশ্বরূপ বললেন।
অশ্বত্থামা বললেন, আমার পিতা এই যুদ্ধে অন্যায়ভাবে হত হয়েছেন।
–কে আপনার পিতাকে নিধন করল? তিনি তো অপরাজেয় অস্ত্রগুরু ছিলেন। অশ্বত্থামা বললেন, সে অনেক গল্প। আমার পিতাকে মিথ্যা কথা বলে হত্যা করা হয়েছে। তাঁকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।
–কে এই হীন কার্য করল?
আবার সেই একই প্রশ্ন এল।
অশ্বত্থামা বললেন, কে আবার? ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির।
ব্রহ্মচারী গৌতম বলল, তিনি তো মহা শাস্ত্রজ্ঞ। পুত চরিত্রের মানুষ। তিনি তো কখনও মিথ্যা বলেন না।
উত্তরে অশ্বত্থামা কী বলতে যাচ্ছিলেন। সোমক তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আর্য, আমরা আশ্রমে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করি না। এই আশ্রম জ্ঞান তপস্যা কেন্দ্র। এটি বিদ্যামন্দির। রাজনীতিচর্চা মানে অন্যের সমালোচনা। যিনি এখানে উপস্থিত নেই, তাঁর নিন্দা। রাজনীতি ক্ষত্রিয়দের ধর্ম। ব্রাহ্মণদের নয়। ব্রাহ্মণদের কাজ শুধু যজন যাজন, বিদ্যাদান, বিদ্যাচর্চা। জ্ঞান মানুষকে মুক্ত করে, উদার করে। কিন্তু রাজনীতি মনকে সংকীর্ণ করে, অনুদার করে। শেষ পর্যন্ত হিংসার জন্ম দেয়। বিশেষ করে বিদ্যামন্দিরকে আমরা রাজনীতির কলুষ থেকে দূরে রাখতে চাই। মহর্ষি বলেন, তপোবন লোকালয় থেকে যত দূরে হবে তত বেশি তা জ্ঞানভাণ্ডার হয়ে উঠবে। মধুচক্র মৌমাছিরা নিভৃতে অরণ্যমধ্যে গড়ে তোলে। আমাদের সুকুমার মতি বিদ্যার্থীদের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনতে চাই না। এরা ভবিষ্যতে বেদজ্ঞ হয়ে অরণ্যে নিজ নিজ আশ্রম গড়ে তুলবে। এদের আমরা চিরকাল রাজপ্রাসাদ ও রাজপ্রসাদ উভয় থেকে দূরে রাখতে চাই।
আর্যপুত্র, আপনি অমিত বলশালী, বাহুবলী, বীরবাহু, বহু বিধ্বংসী সৃষ্টি বিনাশকারী অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। আপনি বাহুবলে সুরক্ষিত করে এসেছেন রাজ সিংহাসন। আমরা তপোবনে সুরক্ষিত করি মানুষের বিবেক, তার চিন্তাশক্তি। বিদ্যায়তনে যদি রাজনীতি প্রবেশ করে, শাসকের অঙ্গুলি লেহনে যদি বিদ্যালয় চালিত হয়, অথবা আচার্য ও ছাত্ররা যদি রাজপুরুষদের স্বার্থের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে তাহলে বিদ্যা তার গুরুত্ব হারায়।
অশ্বত্থামার তীব্র প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা করল কিন্তু তিনি নীরব হয়ে গেলেন। শুধু বললেন, আমি এখানে নির্মোকের মতো পুরাতন জীবন ত্যাগ করে নতুন জীবনে দীক্ষিত হতে এসেছি। আমাকে আপনারা কাজ দিন। যত শ্রমসাধ্য কাজ হোক, আমি তা পালন করার চেষ্টা করব।
আচার্য সোমক বললেন, আর্যপুত্র, আপনি তো পিতার কাছে বেদ অধ্যয়ন করেছেন। আপনি বেদের যে কোনও শাখা পড়াতে পারেন। আপনার প্রিয় বেদ কোনটি?
অশ্বত্থামা বললেন, অথর্ব বেদ।
সোমক বললেন, আমাদের আশ্রমের আচার্যদের তিনজনের মধ্যে ব্রহ্মচারী গৌতম চতুর্বেদী, ব্রহ্মচারী শারদ্বত ত্রিবেদী ও বিশ্বরূপ দ্বিবেদী। আমি চতুর্বেদের সঙ্গে শ্রৌত্য ও গৃহ্য নিয়েও কিছু অধ্যয়ন করেছি। এসবই মহর্ষি বেদব্যাসের কৃপায়। ছয় বৎসর বয়স থেকে আমি তাঁর আশ্রমিক। এই আশ্রম তো মাত্র পাঁচ বৎসর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি মহর্ষির আদেশে এই আশ্রম গড়ে তুলেছি। আমি দীর্ঘদিন হিমালয়ে ছিলাম। সেই নির্জনে আমার শাস্ত্র পাঠ।
তারপর অশ্বত্থামার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি যখন এই আশ্রমে প্রবেশ করলেন তখন আশ্রমিকরা যে প্রার্থনা করছিল, আপনার মনে আছে?
অশ্বত্থামা বললেন, হ্যাঁ, অগ্নেনয় সুপথা বায়ে অস্মান।
সোমক বললেন, না, শেষ প্রার্থনাটা।
তখন অশ্বত্থামা বললেন, ‘আরে সাবস্মদস্তু হোতি দেবামো অসৎ। আরে অশ্মা যমস্যথ।’ সোমক তার পরের পঙক্তি যুক্ত করলেন-
সখাসাবস্মভ্যমস্তু রাতিঃ সখেন্দ্রো।
ভগঃ সবিতা চিত্ররাধাঃ।।
যুয়ং নঃ প্রবতোনপান্মিরুতঃ সূর্যত্বচসঃ
শর্ম্ম যচ্ছাথ সপ্রথাঃ।।
সযুদত মূড়ত মূড়য়া নস্তভ্যো।
ময়স্তোকেভ্য স্কৃধি।।
অথর্ব বেদের ১ম কাণ্ডের এই পঞ্চম অনুবাকটির চতুর্থ সূক্ত আমরা বিশেষভাবে বেছে নিয়েছি কারণ এই প্রার্থনাই আমাদের আশ্রমের শিক্ষা। এর অর্থটি বড় সুদূরপ্রসারী। শত্রুর উদ্দেশে ছোড়া হননকারী অস্ত্রসকল দূরে চলে যাক, তা যেন আমাদের স্পর্শ না করে। ভাগ্যপ্রদাতা পরম ঐশ্বর্যযুক্ত ইন্দ্রদেবতা আমাদের মিত্র হোক। সবিতাদেব আমাদের মিত্র হোক। বিবেকরূপী মরুদেবগণ তোমরা আমাদের সুখ দাও। হে দেব অনিষ্ট দূর করে আমাদের তুষ্ট করো, আমাদের শরীর ও পুত্র-পৌত্রাদির জীবনে সুখ এনে দাও।
আচার্যপুত্র, আমরা যুদ্ধের কথা, মৃত্যুর কথা কখনও বলি না। যুদ্ধ অনিষ্ট আনে। সুখ আনে না। আপনাকেও এই প্রার্থনায় যুক্ত হতে হবে। যুদ্ধ নয়। যুদ্ধ মানুষকে ক্লেশ ছাড়া আর কিছু দিতে পারে না। হত্যা নয় জীবন। হত্যা রাজপ্রাসাদের নীতি। তপোবনের নীতি শান্তি ও সুখ। ইন্দ্রকে হবি দিয়ে তাই আমরা বলি—
ত্বং নঃ পূনীহি পশুভির্বিশ্বরুপেঃ
সুধায়াং মা ধেহি পরমেব্যমন।
অশ্বত্থামা বললেন, হে আচার্যদেব, শত্রু নির্মূল না হলে তো শান্তি-সুখ কিছুই আসতে পারে না। যুদ্ধ মানে লুণ্ঠন নয়, শত্রু বিনাশ। অথর্ব বেদ তো ষষ্ঠ কাণ্ডেই বলেছেন, যে শত্রু আমাদের হানি করতে চায় তাকে বিনাশ করো। হানিকারক শত্রুর মস্তকের মধ্যদেশ বিদীর্ণ করো।
যে জিনাতি তমন্বিচ্ছ যে জিনতি তমিজ্জহি।
জিনতো বজূত্বং সীমন্তমন্বঞ্চমনুপাতয়।
শত্রু নাশ না হলে, দেশে শান্তি আসতে পারে না। সেজন্য স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যও যুদ্ধের প্রয়োজন হয়। যুদ্ধ ও যোদ্ধারাই জাতির প্রাণস্বরূপ। তারা আছে বলেই দেশে শান্তি আছে। আমার পিতা যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা দিতেন দুষ্টের দমন করে শান্তি স্থাপনের জন্য।
গৌতম বলে উঠলেন, আমি আপনাদের এতটুকুও অসম্মান করছি না। কিন্তু আপনারা তো দুষ্টের পক্ষেই অস্ত্র ধরেছিলেন। আপনার পিতা অন্যায় যুদ্ধে নিহত হয়েছেন মানছি কিন্তু তিনি ব্রাহ্মণের কাজ ছেড়ে দুষ্টের ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন। সেইজন্যই তো তাঁর মৃত্যু হল। তিনি যদি আমাদের মতো ব্রাহ্মণ্যধর্মে লিপ্ত থাকতেন, বহুজন হিতায় বহুজন সুখায় মহর্ষি বেদব্যাসের মতো দিন যাপন করতেন, তাহলে তাঁকে প্রাণ দিতে হত না। আপনিও মণিহারা হতেন না। আচার্যপুত্র, আপনাকে আমাদের আশ্রমে স্বাগত। আপনি স্বধর্মে ফিরে এসেছেন। এজন্য আপনাকে অভিনন্দন। কিন্তু আপনি এতদিন রাজ-অন্নে পুষ্ট হয়েছেন, সমৃদ্ধ হয়েছেন। আমাদের এই আশ্রমের জীবন বড় কঠোর। এখানে সবাইকে কঠোর কর্ম করতে হয়। আমরা রাত্রির শেষ প্রহরে উঠে পড়ি। আমাদের প্রার্থনা সেরে সকালের প্রথম প্রহরটি কাটে যজ্ঞের সমিধ সংগ্রহের জন্য, পানীয় জল আনার জন্য। নীবার ধান্য সংগ্রহ অথবা ফলমূল সংগ্রহের জন্য। আমাদের আশ্রমের ভেতরেই কিছু ফলবান বৃক্ষ আছে। আমাদের উৎপাদিত ধান্য পর্যাপ্ত নয়। কিছু তণ্ডুল আমরা বহুদূর লোকালয়ে গিয়ে ভিক্ষা করে সংগ্রহ করে আনি। আমরা কোনো রাজকীয় বৃত্তির প্রত্যাশী নই। এই সহজ জীবনযাত্রায় আমরা অভ্যস্ত। আচার্য থেকে বিদ্যার্থীরা সবাই একই জীবনযাত্রায় আবদ্ধ। এরই মাঝে দ্বিপ্রহরিক আহারের পর আমাদের পাঠন শুরু হয়। আচার্য আপনি বীর, বলশালী, আপনি পরিশ্রমে পটু বুঝতে পারি। আপনার যদি মনোবল অটুট থাকে আপনি পারবেন।
আচার্য সোমক আবার বললেন, আর্য, আপনি বিচলিত হবেন না। আপনি শীঘ্রই আশ্ৰম জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন। মানুষ অভ্যাসের দাস। আপনি এতদিন একরকম জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। এটি আর এক ধরনের জীবন। আমরা সেজন্য মনে করি প্রত্যেক মানুষের বাল্যকাল বিশেষ করে তার বিদ্যার্থী জীবন কঠোর ব্রহ্মচর্যের মধ্যে কাটানো উচিত। যৌবন সে মহাসুখে যাপন করুক, কিন্তু বর্ষার আকাশের মতো জীবনও ক্ষণেক মেঘ-রৌদ্রের খেলা। কখন বৃষ্টি আসবে, রোদ্দুর স্থায়ী হবে কি না কেউ তা বলতে পারে না। তাই সব সময় দুর্যোগের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হয়। চিত্তবৃত্তিকে সংযত রাখতে হয়। দুর্যোগের অভিজ্ঞতাই মানুষকে দুর্যোগ প্রতিরোধের শক্তি এনে দেয়। এই যে আমাদের বিদ্যার্থীরা বালক বয়স থেকে যে জীবন ভাবনার মধ্য দিয়ে মানুষ হয়ে উঠছে, এদের মধ্যে ধীরে ধীরে ভোগবাদী মন অন্তর্হিত হয়ে যাচ্ছে। যৌবনে এরা ভোগ করবে কিন্তু ভোগী হবে না। বাণপ্রস্থের সময় সব কিছু হেলায় ত্যাগ করে বনে চলে আসবে।
দ্রোণপুত্র, আপনার সহজ মণি বিসর্জন দিতে হয়েছে বলে মনঃকষ্ট পাবেন না। রিক্ততারও একটা অহংকার আছে। কোনও অদৃশ্য শক্তির সাহায্য ছাড়া আপনি আপন শক্তির ওপর এখন থেকে নির্ভর করতে শিখবেন। আমরা ছাত্রদের শেখাই কাল সর্ব অপহারক। কিন্তু সে যা হরণ করে তা পার্থিব। বাইরের সম্পদ। তা আপনার অর্থ, যশ, প্রতিপত্তি, যৌবন। কিন্তু সে যা নিতে পারে না, তা হল আপনার মনোবল, আত্মশক্তি। আপনি তো বেদজ্ঞ। আপনি জানেন একমাত্র সৎকর্মই মানুষের মনোবল অটুট রাখে। মানুষ যে কর্ম করে সেই কর্মফলই তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করে।
‘যথাক্রতুর ময়ান্মলোকে
পুরুষো ভবতি তযেতঃ প্ৰেত্য
ভবতি স ক্রতুং কুর্বীত।’*
[* সামবেদীয় ছন্দোগ্য উপনিষৎ।
তৃতীয় প্রপাঠ চতুর্দশ খণ্ড।
অর্থ : ইহলোক পুরুষ যেমন কর্ম করে, পরলোকে তেমনই ফল ভোগ করে।
সম্ভূতি = সম্ভূত, উৎপন্ন]
আপনি যোদ্ধা হিসাবে আপনার কর্ম করেছেন। এইবার একজন বোদ্ধা হিসাবে আপনার কর্ম করুন। আর্য, পরজন্ম আছে, কিন্তু আপনি তো অমর। আপনার তো মৃত্যু নেই। আপনার এই একই জন্মের মধ্যে জন্মান্তর ঘটুক। ইশোপনিষৎ বলছেন, কারণ থেকে কার্য এই জ্ঞানই সম্ভূতি।* আপনি কারণ থেকে কার্যে ব্ৰতী হোন।
রাতের আহার সেরে আচার্যরা রাত্রির প্রথম প্রহরের শেষেই ঘুমিয়ে পড়লেন। অশ্বত্থামার জন্যও বরাদ্দ হল একটি কম্বল। এখানে শয্যায় কোনো উপাধান ব্যবহারের প্রচলন নেই।
এখন চৈত্র মাস। ঘরের দরজা বন্ধ করে শুতে হয়। কেননা কোনো বন্য জন্তুরা চলে আসতে পারে। চৈত্রের রাত। যদিও বাইরে বাতাস বইছিল কিন্তু দরজা বন্ধ করে দেওয়ায় অশ্বত্থামার বেশ গরম বোধ হতে লাগল। কিন্তু সহ আচার্যরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছেন। এতক্ষণ একটি স্তিমিত প্রদীপ জ্বলছিল, সেটিও নিভে গেলে খোলা বাতায়ন দিয়ে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ঘরে ঢুকে পড়ল।
অশ্বত্থামার পাশেই শুয়েছিল শারদ্বত। সে বলল, আর্য, শেষ প্রহরে আপনার ঘুম ভাঙবে তো? আমাদের প্রার্থনা সেই চতুর্থ প্রহরেই শুরু হয়।
অশ্বত্থামা বললেন, আজ আমি অনেকটা পথ পদব্রজে এসেছি। তাই পথশ্রমে ক্লান্ত। আমার যদি নিদ্রাভঙ্গ না হয়, আমাকে তুমি ডেকে দিও।
অশ্বত্থামা দেখল দুজন সহ-আচার্য তখনও বসে ধ্যান করছেন। অশ্বত্থামা শুয়ে পড়লেন। তার চোখ ঘুমে ঢুলে আসছে।
এই তপোবনে আসার সঙ্গে গত কয়েকদিন ধরে তিনি মহর্ষি ব্যাসের আশ্রমে বাস করছিলেন। মহর্ষির ভাগীরথী তীরের আশ্রমটি অনেক বড়। সেখানে সারি সারি অনেকগুলি কুটির। মহাচার্য তাঁকে অতিথি আবাসের একটি কুটিরে থাকতে দিয়েছিলেন। ব্যাসের আশ্রমেও শেষ রাতে উঠে প্রার্থনা হত। মহর্ষি প্রার্থনা শেষে গঙ্গাস্নান সেরে নিয়ে ধ্যানে বসতেন।
অশ্বত্থামা কোনোদিনই প্রার্থনায় যোগ দেননি। সূর্যোদয়ের পর তিনি আশ্রম চত্বর থেকে ভাগীরথীর পাড়ে গিয়ে ব্যায়াম করতেন। ফেরার সময় দেখতেন মহর্ষি নিজহাতে ফুলের গাছে জল সিঞ্চন করছেন। কত বিচিত্র বর্ণের ফুল সেখানে ফুটে রয়েছে। মহর্ষির আদেশে তিনি আজ প্রভাতে দম্যক বনের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে যান। মণিহারা হয়ে এখন তিনি অবসন্ন। কোনোক্রমে এতখানি পথ পা চালিয়ে চলে এসেছেন। সন্ধ্যার মধ্যে পৌঁছতে পেরেছেন এই রক্ষে। নয়তো সন্ধ্যার অন্ধকার নামলে অরণ্যমধ্যে তিনি কী করতেন বলতে পারেন না। তাঁর কাছে কোনো অস্ত্র নেই। তাঁর তরবারি, তৃণ, ধনুর্বাণ, তিরসমূহ যা এতদিন সূর্য কিরণের মতো লক্ষ্যভেদ করেছে তার সব কিছুই তিনি ছেড়ে এসেছেন।
মহর্ষি বলেছিলেন, অশ্বত্থামা যা ঘটে গেল তার জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। নাটকের পরিচালকেরও কিছু করার থাকে না। আমরা আগে থেকে নির্দেশ দিয়ে রাখতে পারি, কিন্তু মঞ্চে দাঁড়িয়ে কুশীলবরাই তাদের নিয়ন্তা। তুমি যা করেছ, আপন বুদ্ধি দিয়ে যা ভালো মনে করেছ তাই করেছ। দ্রোণপুত্র, মানুষ কোনো ভুল করে না। সে যথার্থ মনে করেই সব কাজ করে। পরে প্রমাণিত হয় তার কাজটা ভুল ছিল। তখন আর ফেরার কোনো উপায় থাকে না। কোনো মানুষই অভ্রান্ত নয়। তাকে ভ্রান্ত পথ থেকে সঠিক পথে চালিত করে ধর্ম। কিন্তু তুমি সেই ধর্মভ্রষ্ট হয়েছ। কিন্তু প্রকৃতিই শ্রেষ্ঠ বিচারক তিনি কৃপাপাত্রকেও কৃপা করেন না। ভুল করলে তার কোনো ক্ষমা তাঁর হাতে নেই। তা ভোগ করতেই হয়। তোমার ভুলের দায়ভাগ তোমাকেই নিতে হবে। কৃষ্ণের অভিশাপ তোমাকে বহন করতেই হবে। কৃষ্ণও তাঁর ভুলের জন্য অভিশাপের শিকার। সময়কালে তাঁকেও ফলভোগ করতে হবে। কিন্তু আমি তোমাকে জানি। তুমি এক মহান বীর। তোমার সমকক্ষ শুধু কর্ণ আর অর্জুন। কিন্তু মনুষ্যজীবন নানা ভুলে ভরা। ভুলের জন্য প্রতিভাবানরাও পদদলিত হয়। আবার দৈবও ধর্মপরায়ণকে সাময়িকভাবে ধর্মভ্রষ্ট করে তুলতে পারে।
ভুল যারা করে তারাই তাদের বৈরী হয়। আত্মঘাতের অস্ত্র তাদের তৈরি থাকে। তোমাকে অভিশাপ ভোগ করতেই হবে। তবে তুমি যখন আমার আশ্রয় ভিক্ষা করেছ তখন আমি তোমায় আশ্রয় দেব। তুমি দম্য বনে আমার আশ্রমে গিয়ে বাস করো। ওখানে আচার্য সোমক তোমাকে দেখবেন। সেখানে গিয়ে তুমি নবজীবন লাভ করো। তোমার মৃত্যু নেই। তিন হাজার বছর তোমাকে এই অভিশাপের বোঝা টেনে চলতে হবে। আমরা সবাই কালের কবলে চলে যাব। তুমি বেঁচে থাকবে। কে জানে অনাগত যুগের মানুষ কীভাবে তোমায় গ্রহণ করবে। হয়তো তারা তোমার ভুলকেই সঠিক, অভ্রান্ত পথ বলে গ্রহণ করবে। কিন্তু যতদিন আমি জীবিত আছি, তোমার কোনো ভয় নেই।
মহর্ষির কথাতেই অশ্বত্থামার নতুন জীবন শুরু হয়েছে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে তাঁর নিদ্রা এসে গিয়েছিল তা তিনি জানেন না।
