শেষ কৌরব
শল্যপর্বের গোড়ায় মহাভারতের অনুবাদক কালীপ্রসন্ন সিংহ লিখছেন, কর্ণের মৃত্যুর পর কৌরবপক্ষের নৈতিক বল একেবারে তলানিতে এসে ঠেকল। অর্জুন যেভাবে রণভূমি কাঁপিয়ে সিংহনাদ করতে লাগলেন তা শুনেই ক্ষত-বিক্ষত কৌরব সেনাদের মধ্যে এমন ভীতি দেখা দিল যে সমুদ্রে নৌকা ভগ্ন হলে বণিকেরা যেমন একটি ভেলায় করেও বাঁচার অভিলাষ করে তেমনি কৌরব সেনারা শীর্ণভ্রষ্ট টরগের মতো (বিষদাঁত ভাঙা সাপের মতো) সিংহাদ্দিত মৃগযূথের মতো (সিংহের আক্রমণে হরিণদের মতো) তারা একযোগে রণভূমি ছেড়ে যে যেখানে পারল পালাতে শুরু করল। ভীত সৈন্যদের মধ্যে ধারণা হতে লাগল এই অর্জুন বুঝি আমাকেই বধ করতে আসছেন, এই বুঝি ভীম আমাকে ধরতে আসছেন। এই সব কথা ভাবতে ভাবতেই অনেকে মাটিতে পড়ে মূর্ছা যেতে লাগলেন। কেউ হাতিতে চড়ে, কেউ রথের মুখ ঘুরিয়ে দিয়ে দলে দলে কৌরব সৈন্য ও বিভিন্ন রাজ্য থেকে আগত রাজারা পালাতে লাগলেন। অনেকে নিকটবর্তী বনে তস্কর ও বন্য জন্তুদের মধ্যে আশ্রয় নিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে পদাতিক সৈন্যরা তখনও লড়ে যাচ্ছিল। দুর্যোধন যুদ্ধভূমে দাঁড়িয়ে সব কিছুই দেখছিলেন। তখনও তিনি হতোদ্যম নন। বলে চলেছেন সমুদ্র যেমন তীরভূমি আতিক্রম করতে পারে না, তেমনি পাণ্ডব সৈন্যরাও আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। সারথিকে বললেন, তুমি অবিলম্বে অশ্বচালনা করো। আজ আমি অর্জুন, বাসুদেব অভিমানী (অহংকারী) বৃকোদর এবং অবশিষ্ট শত্রুদের নিহত করে সূতপুত্র কর্ণের ঋণ থেকে মুক্ত হব। রণক্ষেত্রে তখনও কৌরবদের ৫০ হাজার পদাতিক বাহিনী পড়েছিল। তারা রণভূমি ত্যাগ করেনি। দুর্যোধন তাদের নিয়ে আবার আক্রমণ হানতে চললেন।
দৈবক্রমে দুর্যোধন বৃকোদরের সামনে পড়ে গেলেন। ভীম রথ থেকে গদা নিয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন। কখনও খঙ্গ হাতে নিয়ে সবাইকে বিনাশ করতে এগিয়ে গেলেন। তার সঙ্গে যোগ দিলেন স্বয়ং ধনঞ্জয়, নকুল, সহদেব, সাত্যকি। অর্জুনকে দেখে ২৫ হাজার পদাতিকের বাহিনী এগিয়ে গেল। প্রতিরোধে এগিয়ে এলেন মহাবীর মাদ্রীতনয় নকুল। দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্র ও শিখণ্ডী। সবাই মিলে কৌরবপক্ষের অসংখ্য সৈন্যকে নিঃশেষ করে ফেলল।
শেষে ধনঞ্জয় এসে এমন হুঙ্কার ছাড়লেন যে তা শুনে বাকি সৈন্যরাও পালাতে শুরু করল। রাজা দুর্যোধন তাই দেখে ভীত না হয়ে একাই সংগ্রামে নামলেন। দুর্যোধন পলায়মান কৌরব সেনাদের উদ্দেশে শুধু বললেন, হে যোদ্ধাগণ, তোমরা যেখানেই পালাও না কেন, পাণ্ডবদের চোখ এড়াতে পারবে না। তারা তোমাদের ধরে বিনাশ করবেই। তবে পলায়নের প্রয়োজন কী? তোমরা কি দেখছ না, পাণ্ডব সৈন্যরা কীভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। ওদের সাত অক্ষৌহিণী সেনা ছিল। এখন তাদের মধ্যে গুটিকয়েক মাত্র জীবিত আছে। দেখছ না কৃষ্ণ ও অর্জুনও কীরকম ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন। এখনই তোমাদের উপযুক্ত সময়, এইবার একত্র হয়ে একবার আঘাত হানো। তোমরা পাণ্ডবদের হাতে বিনষ্ট না হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের মতো প্রাণ দাও। সংগ্রামে মৃত্যু হলে আর মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করতে হবে না। পরলোকেও সমস্ত সুখ-সম্ভোগের অধিকারী হওয়া যায়। দুরাত্মা ভীমসেনের সঙ্গে সংগ্রাম করাই তোমাদের কর্তব্য। ক্ষত্রিয়কুলের ধর্ম পালন করে তোমরা যুদ্ধ করো। ক্ষত্রিয়ের পক্ষে রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন মহাপাপ।
দুর্যোধনের কথা শুনে পলায়ন্মুখ কিছু রাজা আবার ঘুরে দাঁড়ালেন।
.
কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে আর একদিকে দাঁড়িয়ে কৌরবদের অস্ত্রগুরু কৃপাচার্য যুদ্ধক্ষেত্রটি নিরীক্ষণ করছিলেন। কৃপাচার্য দ্রোণাচার্যের শ্যালক। অস্ত্রগুরু দ্রোণের সহকারী। তিনিও একজন ব্রাহ্মণ অস্ত্রগুরু। যুদ্ধের প্রথম দিন থেকে তিনি কৌরবদের হয়ে লড়াই করছেন। কিন্তু যুদ্ধের গতি যেদিকে চলেছে, মহারথীদের মৃত্যু, লক্ষ লক্ষ সৈন্যের জীবনাবসান; সেই জনারণ্যে ভরা কুরুক্ষেত্রে আজ মাত্র কয়েক সহস্র মানুষ এখনও লড়াই করে চলেছে।
কৃপাচার্য ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। এখন দ্বিপ্রহরের সূর্যালোক অস্তমিত হয়ে আসছে। যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে পড়ে রয়েছে শত শত ভগ্ন রথ। ছোট ছোট পর্বতের মতো শত শত হস্তির মৃতদেহ। পদাতিক সৈন্যদের মৃতদেহ ঠেলে এক পা হাঁটার মতো জায়গা নেই। গৃধিনীরা আকাশে উড়ছে আর মাঝে মাঝে মৃতদেহ থেকে মাংস তুলে মুখে দিয়ে আবার উধাও হয়ে যাচ্ছে।
কৃপাচার্য মৃতদেহ ঠেলে কোনোক্রমে কুরুক্ষেত্রের আর এক প্রান্তে পৌঁছলেন। সেখানে ভগ্নহৃদয় দুর্যোধন পলায়মান যোদ্ধাদের শেষ মিনতি করছেন, তোমরা ফিরে এসে যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের মতো আত্মাহুতি দাও। আমি স্বয়ং ভারত ঈশ্বর দুর্যোধন তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি। এই আহ্বান মৃত্যুর আহ্বান। ভীমসেনের ক্রীতদাস রূপে বেঁচে না থেকে তোমরা এই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়ে অক্ষয় স্বর্গলাভ করো। সবাই বলো ভারতেশ্বর দুর্যোধনের জয়’। মহাবীর ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণ, জয়দ্রথ, সবাই অন্যায় যুদ্ধে মৃত। তাদের আত্মার নামে শপথ নিয়ে আমি তোমাদের আহ্বান করছি।
সেই সময় কৃপাচার্য দুর্যোধনের কাছে এসে বললেন, হে দুর্যোধন, আমি যা বলছি একবার শোনো। দেখো যুদ্ধধর্ম ছাড়া ক্ষত্রিয়দের শ্রেষ্ঠ পথ কিছু নেই। তারা এই ধর্ম আশ্রয় করেই পুত্র-মাতা-পিতা ও স্বামীর একান্ত বান্ধবদের সঙ্গেও যুদ্ধ করে থাকে। ক্ষত্রিয়দের বাঁচার জন্য পলায়ন করা যারপরনাই অধর্ম। দেখো এই যুদ্ধে মহাবীর ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ—সবাই নিহত হয়েছেন। তোমার ভাইরাও নিহত। তোমার নিজের ছেলে লক্ষ্মণ—সেও মৃত। আমরা যে সমস্ত বীরের হাতে যুদ্ধভার অর্পণ করে নিষ্কণ্টক রাজ্যভোগ করার অভিলাষী হয়েছিলাম তারা সকলেই মৃত। আমরাই কিন্তু তাদের মৃত্যুর কারণ। তবে একথা ভুলে যেও না, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ জীবিত থাকতেও কেউ পাণ্ডবদের পরাজিত করতে পারেননি। এর কারণ ওই বাসুদেব। তিনি অর্জুনের চক্ষু। দেবগণও তাকে পরাজিত করতে পারবে না। ওই দেখো অর্জুনের গাণ্ডীব নির্ঘোষ, পাঞ্চজন্যের আওয়াজ, ভীমসেনের সিংহনাদ আমাদের অন্তকরণে ভীতির সঞ্চার করার জন্য তাদের কি কুশলী প্রচেষ্টা। ওই দেখো অর্জুনের গাণ্ডীব শরাসন আকাশে অলাতচক্রের মতো (কুমোরের চাকের মতো) শোভাধারণ করেছে। জলধর মধ্যস্থিত চপলার মতো (মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের মতো) চতুর্দিকে বিরজিত হয়েছে। সবার দৃষ্টি সেদিকে। দাবানল যেমন অরণ্যের তৃণরাশিকেও দগ্ধ করে তেমনি ধনঞ্জয়ের শরানলে আমাদের সৈন্যরা দগ্ধ হচ্ছে। তুমি ওদের সঙ্গে কিছুতেই পেরে উঠবে না। তাই তোমায় বলছি, তুমি এঁদের নতুন করে ডেকে এনে যুদ্ধ করতে বলায় সকলেরই প্রাণ সঙ্কট উপস্থিত হয়েছে। অতএব তুমি আত্মরক্ষার যত্নশীল হও।
আত্মাই সকলের মূল। আত্মা না থাকলে কেউই আর বশীভূত থাকবে না। আমি দেবগুরু বৃহস্পতির উপদেশ অনুসারে বলি, যদি শত্রুর চেয়ে দুর্বল হও, বা তার সমান হও তাহলে তার সঙ্গে সন্ধি করবে। আর শত্রু যদি তোমার চেয়ে প্রবল হয়, তাহলে তুমি তার সঙ্গে যুদ্ধ করবে। এখন আমরা পাণ্ডবদের চেয়ে বিক্রমে ন্যূন হয়ে পড়েছি। অতএব তাদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করাই আমাদের কর্তব্য। এখন আমরা রাজা যুধিষ্ঠিরের কাছে বিনত হয়ে রাজ্যটি যদি রক্ষা করতে পারি তাতেই আমাদের মঙ্গল।
দুর্যোধন বললেন, আপনি কী বলছেন আচার্য। আমি যুধিষ্ঠিরকে রাজ্য দিয়ে তার দাসত্ব করে বাকি জীবন নির্বাহ করব? এইজন্যই কি আমার ভাইদের উৎসর্গ করলাম? পিতামহ ভীষ্ম, পরম সুহৃদ কর্ণ, গুরু দ্রোণকে হারালাম?
কৃপাচার্য বললেন, দেখো, যুধিষ্ঠির অত্যন্ত দয়ালু। তিনি রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কথায় এবং বাসুদেবের উপদেশে তোমাকেই রাজ্য ফিরিয়ে দেবেন। আমি তোমায় একরকম প্রতিশ্রুতিই দিচ্ছি। তুমিই ভারতেশ্বর থাকবে। ধৃতরাষ্ট্র অনুরোধ করলে কৃষ্ণ কিছুতেই না করতে পারবেন না। অতএব পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি করাই তোমার কর্তব্য। আর যুদ্ধ নয় মহারাজ। অনেক হয়েছে। আমি প্রাণরক্ষার জন্য একথা বলছি না। আমি যা হিতকর তাই বলছি। এটি শ্রেয় কি না, তা তুমি মৃত্যুর পর উপলব্ধি করবে।
দুর্যোধন কৃপাচার্যের কোনো কথার উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন, আপনার ভাগিনেয় অশ্বত্থামা এখন কোথায়? তিনি কী জীবিত? আমি তো তাঁকে আমার পাশে দেখতে পাচ্ছি না। তিনি কুশলে আছেন তো?
কৃপাচার্যের প্রস্তাবে দুর্যোধনের ভাবাত্তর লক্ষ্য না করে কৃপাচার্য আবার বললেন, আমিও তাঁর খোঁজ পাইনি মহারাজ। এই অসংখা মৃতদেহস্তূপের মধ্য থেকে কারও দেহ শনাক্ত করা সম্ভব নয়। তবে তিনি নিশ্চয়ই কুশলে আছেন। হয়তো কোথাও একাই দ্বৈরথ লড়ছেন। তিনি জীবিত থাকলে নিশ্চয়ই তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
কৃপাচার্য অপেক্ষা করছিলেন দুর্যোধন তাঁর প্রস্তাবে কী বলেন তার জন্য। দুর্যোধন একটু পরে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আচার্য, আপনি অমিত পরাক্রম। আপনি যেসব কথা বললেন, তা উৎকৃষ্ট এবং হিতকর। কিন্তু মুমুর্ষু ব্যক্তির যেমন ঔষধে অভিরুচি হয় না তেমনি আপনার হিতবাক্যে আমার কোনো অভিরুচি হচ্ছে না। কেননা যে মহাবল নরপতিকে আমি রাজ্যছাড়া করেছিলাম, দ্যূতক্রীড়ায় পরাজিত করেছিলাম তিনি আমাদের কথায় বিশ্বাস করবেন কেন? বিশেষ করে আমরা একটা ভুল করেছি। বাসুদেব কৃষ্ণ যখন পাণ্ডবদের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে নিতে বলেছিলেন তখন আমরা রাজি হইনি। তিনি এখন আমাদের বাক্য কীভাবে গ্রহণ করবেন? সভাস্থলে দ্রৌপদীর রোদন এবং পাণ্ডবদের রাজ্য হরণ বাসুদেবের মনে বড় লেগেছে এটা বুঝতে পারছি। অভিমন্যুর বিনাশবার্তা শ্রবণের পর বাসুদেব খুব দুঃখ পেয়েছেন শুনেছি। মহাবীর অর্জুনও অভিমন্যুর বিনাশে শোকার্ত হয়ে রয়েছেন। তিনি কীভাবে আমাদের হিতসাধনে তৎপর হতে পারেন আমি বুঝে উঠতে পারছি না। আর ভীমসেন তো অত্যন্ত উগ্র স্বভাবের। সে আমাদের বিনাশের জন্য ঘোরতর প্রতিজ্ঞা করেছে। সে স্বয়ং ধ্বংস হবে তবু প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন করবে না। কালান্তক যমের মতো নকুল-সহদেব। মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন ও শিখণ্ডী আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করে আসছে। তারা কীভাবে আমাদের হিতসাধনে প্রয়াসী হবে তা আমার মাথায় আসছে না। দুঃশাসন সভামধ্যে রজস্বলা দ্রৌপদীকে বিবস্ত্রা করতে চেষ্টা করেছিল, পাণ্ডবরা দ্রৌপদীর সেই ক্লেশ ভুলে যায়নি। আপনি কখনই তাদের নিবৃত্ত করতে পারবেন না। দ্রৌপদী আমাদের হাতে অপমানিত হয়ে আমাদের বিনাশ কামনায় নিত্য তৃণশয্যায় শয়ন করে দুশ্চর ব্রত পালন করে আসছেন। যতক্ষণ না আমাদের বিনাশ হচ্ছে ততক্ষণ তিনি ব্রতভগ্ন করবেন না। কৃষ্ণের বোন সুভদ্রা নিতান্ত দাসীর মতো সর্বসুখ জলাঞ্জলি দিয়ে দ্রৌপদীর সেবা করছেন। দ্রৌপদীর অপমান ও অভিমন্যু বধের জন্য পাণ্ডবেরা সবাই রোষানলে জ্বলছে। এই রোষানল এত সহজে নির্বাপিত হওয়ার নয়। আমি সসাগরা ধরিত্রীর অধিপতি হয়ে কীভাবে পাণ্ডবদের অনুগ্রহে রাজ্যভোগ করব? আমি সূর্যের মতো প্রখর তেজে সাজ্বল্যমান ছিলাম, এখন কীভাবে দাসের মতো যুধিষ্ঠিরের অনুগমন করব আর কীভাবেই বা এতদিন বিপুল ধনভোগ করে সুখভোগে জীবন কাটিয়ে শেষ জীবনে দীনজনের মতো দিন কাটাব? হে আচার্য, আপনি যা বললেন, তা হিতকর। আমি আপনার একটি বাক্যও উপেক্ষা করছি না। কিন্তু আমি অনেক চিন্তা করেই বলছি পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি করা সমুচিত হবে না। যুদ্ধ করাই আমার পক্ষে শ্রেয়। দেখুন আচার্য, আমি কিন্তু শ্রেয় জীবনযাপন করে এসেছি। আমি যা চেয়েছি সব পেয়েছি। আমি বেদ অধ্যয়ন করেছি। আমার সব বিরোধীদের পদানত করেছি। বহুবিধ যজ্ঞ করে ব্রাহ্মণদের সেবা করেছি। আমার ভৃত্যেরা সবাই উচ্চ বেতনে প্রতিপালিত হচ্ছে। আমি সর্ববিধ রাজধর্ম পালন করে আসছি। আমার রাজ্যে কেউ অসুখী নেই, আমি দুঃখিতদের দুঃখ দূর করি। আমি পররাষ্ট্রদের পরাজিত করেছি। আন্তরিকভাবে স্বরাজ্যে প্রজা উন্নয়নে যাবতীয় অর্থ বিনিয়োগ করেছি। বিভিন্ন ভোগ্যদ্রব্য তারা উপভোগ করে, আমি নিজে অকুণ্ঠ চিত্তে ধর্ম অর্থ ও কামের সেবা করেছি। আমার সমস্ত পিতৃঋণ আমি পরিশোধ করেছি। পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি করা আমার কদাচ সুখের হবে না। এই পৃথিবীতে কীর্তি স্থাপন করে যাওয়াই একমাত্র সুখ। যুদ্ধ ছাড়া তা সম্ভব নয়। ক্ষত্রিয়দের কাছে গৃহে মৃত্যু অধম এবং নিন্দনীয়। যে ক্ষত্রিয় বিভিন্ন যজ্ঞ করে অরণ্যে অথবা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দিতে পারেন তিনিই গৌরব লাভ করে থাকেন। আমি যুদ্ধ করে দেবলোকে প্রবেশের অধিকার দাবি করি। আমার জন্য যুদ্ধ করে ক্ষত-বিক্ষত ও নিহত হয়ে শোণিত কলেবরে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে রয়েছেন কত বীরেরা। তাঁরা সবাই স্বর্গে গেছেন। আমি আমার পিতামহ ও ভ্রাতাদের মৃত্যুর মুখে ফেলে নিজের জীবন যদি রক্ষা করি তাহলে লোকে আমায় কি বলবে! হে আচাৰ্য, আমি বন্ধু-বান্ধবহীন হয়ে ধর্মরাজের কাছে নত হয়ে তাঁর অনুগ্রহে রাজ্যলাভ করলে সেটি আমার কাছে প্রীতিপ্রদ হবে না। দেখুন আমার জন্যই সবার পরাভব হয়েছে। অতএব ধর্মানুসারে যুদ্ধে নিহত হয়ে স্বর্গলাভ করাই আমার শ্রেয়বোধ হচ্ছে। রাজ্যলাভে আমার কোনও অভিরুচি নেই।
দুর্যোধন তাঁর পরাজয়ে বিন্দুমাত্র অনুতাপ প্রকাশ করলেন না দেখে কৃপাচার্য বিস্মিত হলেন। তিনি খণ্ড বিক্ষিপ্ত অবশিষ্ট কৌরব সেনা নিয়ে জয়ের জন্য নয়, মৃত্যুর জন্য যুদ্ধ করায় আগ্রহী হয়ে উঠলেন। তিনি সরস্বতীর তীরে গিয়ে অবগাহন করে নিলেন। অঞ্জলি ভরে জলপান করলেন। রাজা দুর্যোধনের বাক্যে উৎসাহিত হয়ে অবশিষ্ট ক্ষত্রিয়রাজরা অপেক্ষা করতে লাগলেন দুর্যোধনের প্রত্যাবর্তনের।
দুর্যোধন স্নান করে ফিরলেন। ততক্ষণে কৌরব সেনাপতিদের মধ্যে খবর চলে গেছে মহারাজ দুর্যোধন দ্বিপ্রহরে তাঁদের উদ্দেশে কিছু বলবেন।
তখন অশ্বত্থামা
যুদ্ধক্ষেত্রের অদূরে বিষণ্ন মনে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা। পিতার মৃত্যুর পর থেকে তিনি ক্রুদ্ধ, বিমর্ষ। পিতৃহতাদের শাস্তি দেবার জন্য তিনি ভেতরে ভেতরে আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত হচ্ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের স্তিমিত গতি, লাখ লাখ কৌরব সেনাদের পিঁপড়ের মতো মরে যেতে দেখে তিনি ভাবছিলেন এই মৃত্যুমিছিলে তিনি যোগ দেবেন না। যুদ্ধ করেও প্রাণ বিসর্জন দেবেন না। বৃথা আত্মক্ষয় না করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্য সুযোগের অপেক্ষা করবেন। তিনি খবর পেলেন আজ দ্বিপ্রহরে দুর্যোধন তাঁর অবশিষ্ট বান্ধব ও যোদ্ধাদের ডেকেছেন। তিনি সন্ধি করবেন না। যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দেবেন। এই ঘোষণাই করবেন।
অশ্বত্থামা দ্রুত অশ্ব সঞ্চালন করলেন দুর্যোধনের শিবিরের দিকে।
যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিকে বিষণ্নতায় মন ভরে এলো অশ্বত্থামার। পিতার মৃত্যুর পরও তিনি প্রবল বিক্রমে পাণ্ডব সৈন্যদের নিধন করেছেন। তখনও যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে দু’পক্ষেই বিক্রম উদ্দীপনা ছিল। ঝড়ের সময় প্রবল ধ্বংসের মধ্যেও প্রকৃতির উদ্দীপনা থাকে। মহীরুহের সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট গাছগুলির পাতাও আন্দোলিত হয়। যখন বর্ষণ হয় নদী স্ফীততর হয়ে ওঠে, কিন্তু সমতল পথও জলপ্লাবিত হয়ে যায়। কিন্তু আজ তিনি দেখলেন স্থানে স্থানে খণ্ডযুদ্ধ হচ্ছে। কিন্তু অন্যত্র নিঃসীম নীরবতা। শুধু মৃতদেহের স্তূপ জমছে। অশ্বত্থামার রথ তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলল।
