প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব : সত্যমেব জয়তে

অশ্বত্থামার সেনাপতি পদ প্রত্যাখ্যান

অশ্বত্থামার সেনাপতি পদ প্রত্যাখ্যান

কর্ণের মৃত্যুর পর, কৌরবপক্ষের বিশিষ্ট সেনাপতিদের কেউ কেউ যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে হিমালয়ের কোলে গিয়ে লুকিয়েছিলেন। কিন্তু এইভাবে আত্মরক্ষা করায় তাঁরা কেউ শান্তি পাচ্ছিলেন না। এক বিবেকবোধে তাড়িত হচ্ছিলেন।

দুর্যোধনের বার্তাবহরা গিয়ে সকলের কাছে পৌঁছে দুর্যোধনের আহ্বান জানালেন। তখন তারা ঠিক করলেন দুর্যোধনের সঙ্গে তারাও যুদ্ধ করে প্রাণ বিসর্জন দেবেন। দুর্যোধন তাঁদের আহ্বান পাঠিয়েছেন, আসুন, মৃত্যুর জন্য যুদ্ধ করুন।

পলাতক সেনারা আবার ফিরে এসে দুর্যোধনকে একে একে অভিনন্দন জানালেন। জীবিতদের মধ্যে তখন ছিলেন মদ্ররাজ শল্য, চিত্রসেন, শকুনি, কৃপাচার্য, কৃতবর্মা, অরিষ্টসেন, ধৃতসেন, জরিৎসেন আর অশ্বত্থামা।

দুর্যোধন তখন শিবিরে ছিলেন না। যথাসময় অশ্বারূঢ় হয়ে তিনি শিবিরে ফিরতেই দেখলেন মহারথীরা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। প্রথমেই তাঁর চোখ পড়ে গেল অশ্বত্থামার দিকে। দ্রোণপুত্রে মুখ পদ্মপাতার মতো বিকশিত। ক্লান্তি বা উদ্বেগের ছাপ কোথাও নেই। তার কোমর ব্যাঘ্রের মতো। সমস্ত দেহ পর্বতের মতো সুকঠোর। তার স্কন্ধ, নেত্র, গতি ও কণ্ঠস্বর মহাদেবের বৃষভের মতো। তাঁর বাহুযুগল পুষ্ট ও আয়ত, বক্ষস্থল দৃঢ় ও বিশাল। তিনি তেজে দিবাকর। বুদ্ধিতে শুক্রাচার্য। রূপে সুধাকর চন্দ্রের মতো। তাঁর উরুদেশ কটিদেশ ওঁ জঙ্ঘা অতি সুবৃত্ত।

তাঁর বীরসুলভ এই সুপুরুষ তেজস্বীরূপ ব্রাহ্মণপুত্রের পক্ষে দুর্লভ। বিধাতা যেন তাঁর গুণাবলীকে বারবার স্মরণ করে তবেই তাঁকে নির্মাণ করেছেন। তিনি সকল কাজে দক্ষ এবং বিদ্যার সাগর। শত্রুগণ কদাচ তাঁকে পরাস্ত করতে পারেনি। অস্ত্রবিদ্যা, চার বেদ তাঁর কণ্ঠস্থ। উপবেদ[১] ও আখ্যান[২] বিশেষ রূপে অবগত। অযোনিজ দ্রোণাচার্য মহাচার্য দ্রোণ মহাদেবের আশীর্বাদে তাঁকে লাভ করেন। তিনি অদ্ভুতকর্মা ও অলৌকিক গুণসম্পন্ন[৩]।

[১.  উপবেদ, বেদের ছয়টি অংশ। শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ

২. ইতিহাস। প্রাচীন ভারতে ইতিহাস চর্চাও হত।

৩. অশ্বত্থামার গুণাবলী বর্ণনায় মহাভারতকার উদার ও উচ্ছ্বসিত। অশ্বত্থামা চরিত্র মহাভারতে কোথাও মুখ্য চরিত্র রূপে বর্ণিত হয়নি। মাঝে মাঝে তাঁর প্রসঙ্গ উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু একটি অপ্রধান চরিত্র বর্ণনা করতে শল্যপর্বে মহাভারতকার প্রায় দু’ হাজার শব্দ ব্যয় করেছেন।]

রাজা দুর্যোধন সেই সরতিনিপাত (শত্রু নিধনকারী) অশ্বত্থামার কাছে সোজা গিয়ে তাঁকে বললেন, হে গুরুপুত্র, আপনিই আমাদের অনন্যগতি। অতএব কাকে সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করব আমায় আদেশ করুন।

অশ্বত্থামা দুর্যোধনের কথা শোনামাত্র এক কথায় বললেন, মহারাজ মদ্রাধিপতি শল্য বলবীর্য স্ত্রী ও যশে অশেষ গুণসম্পন্ন এবং সৎকুল সম্ভূত। অতএব ওই কার্তিকেয় সদৃশ মহাবীরই আমাদের সেনাপতি পদে অভিষিক্ত হন।

দুর্যোধন সঙ্গে সঙ্গে অশ্ব থেকে নেমে শল্যরাজের বাহু ধরে বললেন, হে মিত্রবৎসল, যে দুঃসময় মিত্র ও অমিত্রের পরীক্ষা হয়, সেই সময় এখন উপস্থিত। আপনি আমাদের প্রকৃত বন্ধু। আপনি সেনাপতি পদে অভিষিক্ত হোন। আপনি যুদ্ধে নামলে পাণ্ডব ও পাঞ্চালরা যুদ্ধে হতোদ্যম হয়ে পড়বে।

শল্য সেনাপতির পদ গ্রহণে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে বললেন, দুর্যোধন তুমি আমাকে যে সম্মান দিলে আমি তার মর্যাদা রক্ষার প্রাণপণ চেষ্টা করব। আমার রাজ্য, ধন, প্ৰাণ যা আছে আমি সবই তোমার প্রিয় কাজে নিবেদিত করব। শল্য সম্পর্কে কুরুপুত্রদের মাতুল। দুর্যোধন তাই বললেন, হে মাতুল, আপনাকেই আমি সেনাপতি পদে বরণ করছি। কার্তিকেয় যেমন যুদ্ধে দেবগণকে রক্ষা করেছিলেন, আপনিও তেমনি আমাদের রক্ষা করুন। দেবরাজ ইন্দ্র যেমন পাণ্ডবদের বিনাশ করেছিলেন আপনিও তেমনি দানব পাণ্ডবদের নির্মূল করুন। আমাদের শত্রুদের সংহার করুন।

শল্য তখন বললেন, দুর্যোধন তোমায় কী বলব, তুমি ধনঞ্জয় ও বাসুদেবকে সবচেয়ে বড় রথী বলে মনে করো তাই না? আমি যদি ক্রোধাবিষ্ট হই, তাহলে ধনঞ্জয় ও বাসুদেব তো ছার, আমি সারা পৃথিবী আমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাইলে আমি অনায়াসে তাদের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে পারি। আমি তোমাদের সেনাপতি হয়ে সমস্ত পাণ্ডবদের যে পরাস্ত করব, তাতে আর সন্দেহ নেই।

শল্য সেনাপতি পদে অভিষিক্ত হলেন। শল্য প্রতিজ্ঞা করলেন, আমি পাণ্ডবদের সবাইকে নিহত করব, না হয় স্বয়ং নিহত হয়ে দেবলোক যাত্রা করব। সৈন্যদের বললেন, সৈন্যগণ এসো আবার আমরা দুরাত্মা পাণ্ডবদের বিনাশের জন্য শেষবারের মতো লড়াই করি। আমাদের মধ্যে এখনও শকুনি, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য, বিচিত্রবীর্য, চিত্রসেনরা জীবিত আছেন। সবচেয়ে বড় কথা অমিত পরাক্রম, অনমনীয় তেজের অধিকারী মহারাজ দুর্যোধন রয়েছেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় আমরা অসাধ্য সাধন করব। বলো ‘জয় মহারাজ দুর্যোধনের জয়’।

যদিও আগের মতো সেই মহাসমুদ্রের কল্লোল ধ্বনি শোনা গেল না, তবু সমস্বরে রব উঠল ‘জয় মহারাজ দুর্যোধনের জয়’।

.

পাণ্ডব শিবিরে সেই জয়ধ্বনি এসে পৌঁছলে যুধিষ্ঠির খুব একটা বিচলিত ছিলেন না। কৌরব শক্তি যে দ্রুত নিঃশেষিত হয়ে আসছে সে বিষয়ে তার কোনও সন্দেহ ছিল না। তবে তিনি মনে মনে আশঙ্কিত ছিলেন দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা সম্পর্কে। শৈশব থেকে অশ্বত্থামার সঙ্গে একসঙ্গে বড় হয়ে উঠেছেন। গুরুপুত্রের অমিতবীর্য ও দুঃসাহস সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত ছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল যে অশ্বত্থামাকে দুর্যোধন এবার সেনাপতি করবেন। যদিও কর্ণের মৃত্যুর পর কুরুসৈন্যরা ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে শুরু করেছিল তবু তাঁর আশঙ্কা ছিল অশ্বত্থামা সেনাপতি হলে মরা গাঙে আবার জোয়ার বইতে পারে। কিন্তু না, তাঁর ধারণা অমূলক করে শল্য সেনাপতি হয়েছেন। যুধিষ্ঠির মনে মনে আশ্বস্ত হলেন।

কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বললেন, মহারাজ, আমি মদ্ররাজকে বিশেষভাবে অবগত আছি। ওই বীর বিপুল বলশালী, মহাতেজস্বী, বিচিত্রযোদ্ধা ও ক্ষিপ্রহস্ত। আমার মনে হয় উনি মহাবীর। ভীম, দ্রোণ ও কর্ণের সদৃশ বা তাঁদের চেয়ে সমধিক রণ বিশারদ। উনি শিখণ্ডী, অর্জুন, ভীম, সাত্যকি, ধৃষ্টদ্যুম্ন অপেক্ষা অধিক বলশালী এবং হস্তী ও সিংহের মতো তাঁর বিক্রম। এই ত্রিলোক মধ্যে একমাত্র আপনি ছাড়া আর কেউ তাঁকে বধ করতে পারবেন না। ওই মহাবীর নিহত হলে নিশ্চয়ই সমুদয় কৌরব সেনা বিনষ্ট হবে। আপনার জয়লাভ হবেই।

.

কুরুক্ষেত্রের শেষ দিন

সেদিন ছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের অষ্টাদশ দিবস। কৌরব সৈন্যদের মধ্যে পলায়ন প্রবণতা দেখে পরদিন যুদ্ধ শুরুর আগে কৃতবর্মা, অশ্বত্থামা, শল্য ও শকুনি একযোগে একটি নিয়ম প্রবর্তন করলেন যে এখন থেকে একা কেউ পাণ্ডবদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে না। সবাই মিলে যুদ্ধ করবে। যে একা যুদ্ধ করবে বা কোনো পাণ্ডবকে কারও সঙ্গে যুদ্ধ করতে দেখলে তার পাশে না দাঁড়িয়ে পালিয়ে যাবে সে পঞ্চপাতক ও উপপাতকে নিমগ্ন হবে। পঞ্চপাতক হল সুরা পান, ব্রহ্মহত্যা, ব্রাহ্মণের সোনা চুরি, গুরুপত্নী গমন এবং ওই পাপকারীদের সংসর্গ করা। আর উপপাতক হল, পরদার গমন, আত্মবিক্রয়, মাতা-পিতা-পুত্র ত্যাগ, ঋণ পরিশোধ না করা, নাস্তিকতা ও গো-বধ। সকলে মিলে এই সিদ্ধান্তে এলেন যে, সবাই মিলিত হয়ে পরস্পরকে রক্ষা করবেন। আবার ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।

কিন্তু পাণ্ডবদের তুমুল শরজালে ছিন্নভিন্ন হয়ে কৌরব সৈন্য আবার পালাতে শুরু করল। শল্য দেখলেন তাঁর সৈন্যরা পালাচ্ছে। তিনি সারথিকে বললেন, আমাকে যুধিষ্ঠিরের কাছে নিয়ে চলো।

অন্যদিকে তখন যুদ্ধ চলছে নকুলের সঙ্গে কর্ণপুত্র চিত্রসেনের। চিত্রসেন নকুলকে শরবিদ্ধ করেছেন। নকুল সেই অবস্থায় তাঁর রথ থেকে নেমে নকুলের রথে উঠে চিত্রসেনের মুকুট কুণ্ডলধারী, আয়ত চক্ষু বিশিষ্ট মস্তক তরবারির এক কোপে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে নকুল কর্ণের আর এক পুত্র সুযেণকে বধ করলেন।

অশ্বত্থামার এই যুদ্ধে আসল লক্ষ্য ছিল পিতৃহন্তা যুধিষ্ঠিরকে বধ করা। যুধিষ্ঠিরের কথায় বিশ্বাস করেই পিতা অস্ত্র ত্যাগ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যুধিষ্ঠির কখনও মিথ্যা বলতে পারে না। সেই ‘কপটচারী, ধর্মের মুখোশধারী’ যুধিষ্ঠিরকে হত্যা করার জন্য মশ্বত্থামা অধীর হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে তাঁকে অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হল। এই যুদ্ধে কৌরবপক্ষ সমবেতভাবে অর্জুনের রথে এত বিপুল পরিমাণ বাণ হানলেন যে অর্জুনের রথের পাটাতনের কাঠ এবং রথের নানা অংশ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ধনঞ্জয় ও বাসুদেব দুজনেই ক্ষত-বিক্ষত। অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন অশ্বত্থামা আর ত্রিগর্ত দেশগুলি থেকে আসা রাজারা। এই যুদ্ধে ধনঞ্জয় দু’ হাজার কৌরব রথীকে বধ করেন।

অশ্বত্থামা সুতীক্ষ্ণ দ্বাদশ বাণে এবং আরও দশ বাণে বাসুদেবকে বিদ্ধ করলেন। অর্জুনের রথ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল। এই প্রবল যুদ্ধে অর্জুন ও বাসুদেব যেমন অসংখ্য বাণের দ্বারা আহত হলেন তেমনি তাঁর চারপাশে রাশি রাশি রথচক্র, তৃণীর, পতাকা, ধ্বজ, ঈষা, অক্ষ, যোক্ত, প্রত্যেদ* ও সেই সঙ্গে নিহত যোদ্ধাদের ছিন্ন মস্তক, হাত, কাঁধ, ছাতা, চামর, মুকুট মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। শোণিতের স্রোতে কদমাক্ত হয়ে উঠল কুরুক্ষেত্রের মাটি। দু’ হাজার কৌরবযোদ্ধাকে নিহত করে অর্জুন ফিরে যাচ্ছিলেন। অশ্বত্থামা তাঁর পথরোধ করলেন। এইবার দ্বৈরথ সমর শুরু হল অর্জুন ও অশ্বত্থামার মধ্যে। কিন্তু কেউ কাউকে পরাজিত করতে পারলেন না।

[* সবই রথের নানা অংশ। প্রত্যেদ মানে হচ্ছে ঘোড়াকে চালনার চাবুক।]

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষ সেনাপতি শল্য যেভাবে সমবেত পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তা অতুলনীয়। শল্যকে দুর্যোধনও তেমন গুরুত্ব দেননি। পাণ্ডবরা তো নয়ই। ভীষ্ম, দ্রোণ ও কর্ণের তুলনায় মদ্ররাজকে সবাই অকিঞ্চিৎকর জ্ঞান করেছিলেন। একমাত্র কৃষ্ণই জানতেন শল্যের অসাধারণ বীরত্বকথা।

একদিকে সমগ্র পাণ্ডব সেনা অন্যদিকে একাই শল্য। মহাভারতকার বলেছেন, যখন যুধিষ্ঠির শল্যের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন তখন মনে হচ্ছিল যেন শশধর সমীপে শনিগ্রহ’ পাণ্ডব সৈন্যরা শল্যের শরে নিপীড়িত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে লাগল। যুধিষ্ঠির তখন ক্রুদ্ধ হয়ে প্রতিজ্ঞা করলেন হয় জয়লাভ করব, না হয় বিনষ্ট হব। এই মনে করে তিনি শল্যকে নিহত করার জন্য এগিয়ে গেলেন।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য মদ্ররাজ শল্য মাদ্রীর আপন ভ্রাতা। নকুল-সহদেবের আপন মাতুল। যুধিষ্ঠির তাঁর ভাইদের ডেকে বললেন, ক্ষত্রিয়ধর্ম অনুসারে আমি মাতুলের সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছি। এতে আমার জয় হোক, বা পরাজয় হোক, আমি চাই এ যুদ্ধে আমার ভাইরা শুধু আমার সঙ্গে থাকুক।

যুধিষ্ঠির যমদণ্ডতুল্য শর নিক্ষেপ করে শল্যের প্রাণ সংহার করেন। ওই বাণ সংবর্তক ও অনলের মতো (প্রলয়কালীন অগ্নির মতো)। বিশ্বকর্মা ভগবান শঙ্করের জন্য ওই শক্তি নির্মাণ করেছিলেন। এটি অতি সুদৃশ্য। ঘণ্টা, পতাকা, মণি-হীরক সমলঙ্কৃত ও সুবণ বৈদুর্যখচিত। মহারাজ যুধিষ্ঠির সেই সুবর্ণ বৈদুর্যখচিত মণি-হীরক সমলঙ্কৃত সেই ব্রহ্মশক্তি বাণটি মন্ত্রপুতঃ করে খুব নিপুণভাবে মহাবেগে সেটি ছুড়লেন। রুদ্রদেবের শরের মতো তা মদ্ররাজের বক্ষস্থলের মর্মভেদ করে মাটিতে গিয়ে পড়ল।

শল্য ইন্দ্রধ্বজের মতো রথ থেকে নিচে পড়ে গেলেন। বসুন্ধরাকে শেষবারের মতো গাঢ় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে মদ্ররাজের অনুজও নিহত হলেন। সমরাঙ্গণে শুধু রক্ত আর রক্ত। মহারাজ কৃপাচার্য ও কৃতবর্মার রথ বিনষ্ট হয়ে গেল। কৃতবর্মা সাত্যকির শরে গুরুতর আহত। তার রথ সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয়ে গেল। কৃপাচার্য সে সময় এসে পড়ে কৃতবর্মাকে নিজের রথে তুলে না নিয়ে গেলে আহত কৃতবর্মার মৃত্যু অনিবার্য ছিল।

এদিকে কৃতবর্মাকে রথহীন দেখে কৌরব সৈন্যরা পালাতে শুরু করে দিল। শল্যের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে সাতশত কৌরব রথী এসে পাণ্ডবদের আক্রমণ করল। পাণ্ডবদের সঙ্গে তখন যোগ দিয়েছেন সাত্যকি, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী ও দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্ৰ।

শকুনি দুর্যোধনকে বললেন, তুমি থাকতে এই মদ্র সৈন্যরা সবাই নিহত হল। তুমি নিয়ম করেছিলে কৌরবেরা সমবেতভাবে যুদ্ধ করবে। তা তো কেউ মানল না। প্রত্যেকে নিজেদের মতো করে লড়তে গিয়ে এই বিপত্তি বাধিয়ে বসল।

দুর্যোধন নিরুপায় হয়ে বললেন, মাতুল, আমি বারবার ওদের একাকী যুদ্ধ করতে বারণ করেছিলাম। ওরা না শুনলে কী করব বলুন। আপনি রাগ করবেন না। চলুন আমরা মদ্র সৈন্যদের সাহায্য করতে যাই।

কিন্তু শল্যের মৃত্যুর পর কৌরব সৈন্যদের আর ধরে রাখা গেল না। দুর্যোধন দেখলেন কৌরব সৈন্যরা দলে দলে পালাচ্ছে।

দুর্যোধন চিৎকার করে বললেন, তোমরা পালিয়ে বাঁচবে ভেবো না। পাণ্ডবরা তোমাদের যেখানে পাবে সেখানেই তোমাদের সংহার করবে।

সমস্ত কৌরব সেনাধ্যক্ষরা নিহত বা পলাতক। কিন্তু সেই সমরাঙ্গণে একাই যুদ্ধ করতে লাগলেন দুর্যোধন। শুধু কৃতবর্মাকে তিনি সঙ্গে পেলেন। তিনি যুধিষ্ঠিরকে একশো, ভীমকে ৭০টি, সহদেবকে সাতটি, নকুলকে ৬৪টি, ধৃষ্টদ্যুম্নকে সাতটি দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্রকে সাত-সাতটি করে বাণে বিদ্ধ করলেন। অন্যদিকে দ্রৌপদীর পাঁচপুত্রকে ৭০টি, যুধিষ্ঠিরকে পাঁচটি, ভীমসেনকে আশিটি, সাত্যকিকে একশোটি করে বাণে বিদ্ধ করলেন।

দুর্যোধনও পাণ্ডবদের বাণে বিদ্ধ। কিন্তু দুর্যোধন অচল-অটল। এই সময় কিছু পলায়মান কৌরব সৈন্য আবার ফিরে এলো। দুর্যোধনের পাশে এলেন অশ্বত্থামাও।

শকুনিও প্রবল যুদ্ধে যুধিষ্ঠিরের চার অশ্বকে নিহত করলেন। সহদেব শকুনির শরে আহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করলেন। শকুনির পুত্র উলুক সহদেবের অনুসরণ করলেন। অন্যদিকে সাত্যকি ও কৃতবর্মার মধ্যে যুদ্ধ চলছে। পাঞ্চালীর পাঁচপুত্রের সঙ্গেও যুদ্ধ চলছে কৃতবর্মার। দুর্যোধন ধৃষ্টদ্যুম্নের শরাসন ছিন্ন করে দিয়েছেন। পদাতিকগণ পদাতিকগণকে, গজথ গজথকে, অশ্ব সকল অশ্ব সকলকে আক্রমণ করছে।

তখন অর্জুন উৎসাহিত হয়ে কৃষ্ণকে বললেন, ‘সখা, তুমি আক্রমণকারী কৌরব সেনাদের মধ্যে আমার রথ নিয়ে চলো। আজ যুদ্ধের অষ্টাদশ দিবস। কৌরব সেনা এখন গোষ্পদের মতো হয়ে গিয়েছে। কিন্তু দৈবের কি অনির্বচনীয় প্রভাব। মহাবীর ভীষ্ম নিহত হলে আমাদের সঙ্গে সন্ধি করাই দুর্যোধনের উচিত ছিল। দুর্যোধন তা করেনি। ভীষ্ম শরশয্যায় এখনও শয়ান রয়েছেন। এরপর কেন কৌরবরা যুদ্ধ করছে আমি বুঝে উঠতে পারছি না। তুমি আমাকে কৌরব সেনাদের মধ্যে নিয়ে চলো। আমি এখনই দুর্যোধনকে বিনাশ করব।

আবার সেই একই দৃশ্য। অর্জুনের শরাঘাতে পতঙ্গের মতো অবশিষ্ট কৌরব সৈন্যদের মৃত্যু হচ্ছে। আবার সেই পলায়নের দৃশ্য। আহতরা তো পালাচ্ছেই। যারা আহত হয়নি, তারাও যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করছে।

দুর্যোধন একাই লড়ে যাচ্ছেন। দুর্যোধনের সঙ্গে প্রথম যুদ্ধ হল ধৃষ্টদ্যুম্নের। দুর্যোধনের শরাঘাতে ধৃষ্টদ্যুম্ন অঙ্কুশ আহত মাতঙ্গের মতো ক্রুদ্ধ হয়ে দুর্যোধনের চারটি অশ্বকেই নিহত করলেন। তাঁর সারথির মস্তকচ্ছেদন করলেন।

রথবিহীন হয়ে দুর্যোধন একটি অশ্বের পিঠে চড়ে শকুনির কাছে চলে গেলেন।

.

শকুনির মৃত্যু

শকুনি শুধু দুর্যোধনের কূট পরামর্শদাতা ছিলেন না। গান্ধাররাজ একজন উৎকৃষ্ট বীর যোদ্ধাও ছিলেন। তাঁর নিজের দশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য ছিল। তাদের আক্রমণে পাণ্ডব সৈন্যরা অভ্রজালের মতো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। যুধিষ্ঠির চোখের সামনে দেখলেন তাঁর সৈন্যরা শকুনির গান্ধার সৈন্যেদের বিক্রমের কাছে টিকতে পারছে না। তিনি তখন সহদেবকে আদেশ করলেন, তুমি শকুনিকে সংহার করো। সহদেব তখন দ্রৌপদীর পাঁচপুত্রদের নিয়ে, সাতশো হাতি, পাঁচ হাজার ঘোড়া ও তিন সহস্র পদাতিক সৈন্যদের নিয়ে শকুনির প্রতি ধাবমান হলেন।

আবার তুমুল যুদ্ধ। সহস্র সহস্র অশ্বখুরের ওড়ানো বালুকাময় যুদ্ধক্ষেত্রের সেই স্থান অন্ধকারে ঢেকে গেল। সেই অন্ধকারের মধ্যে কৌরবদের অসংখ্য যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করতে লাগল। সহদেবের শরে বিপর্যস্ত শকুনি নিজেও পালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সহদেব তাঁকে অনুসরণ করে ধরে ফেললেন। তারপর কার্মুকে জ্যা আরোপ করে মাহুত যেমন অঙ্কুশ দ্বারা হস্তীকে আঘাত করে তেমনি শরাঘাত হানলেন শকুনির ওপর। আহত শকুনিকে উদ্দেশ করে সহদেব বললেন, দ্যূতক্রিড়ার সময় তুমি যে আনন্দ উপভোগ করেছিলে আজ তা কোথায়? সেদিনের আহ্লাদের আজ ফল ভোগ করো। পূর্বে যেসব দুরাত্মা আমাদের উপহাস করেছিল তারা সকলেই নিহত হয়েছে। শুধু কলাঙ্গার দুর্যোধন ও তুমি—তোমরা দুজন জীবিত আছ। লাঠি দিয়ে যেমন বৃক্ষ থেকে ফল পাড়া হয়, তেমনি আজ তোমার মাথাটাও আমি পেড়ে ফেলব।

তারপর শকুনির প্রতি অসংখ্য শর নিক্ষেপ করতে লাগলেন সহদেব। তিনটি বিশেষ বাণ ছুড়ে শকুনির দুটো হাত কেটে ফেললেন। তারপর একটি লৌহভল্ল নিক্ষেপ করলেন শকুনির দিকে। এর আঘাতে শকুনি ছিন্নমস্তক হয়ে ধরায় লুটিয়ে পড়লেন।

.

এদিকে অর্জুন অবশিষ্ট কৌরব সেনাদের আক্রমণ করে ভল্ল দ্বারা কারও মস্তক ছেদন করলেন। কাউকে শরাঘাতে নিহত করলেন।

দুর্যোধন সৈন্যদের উৎসাহ দেবার জন্য চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন, তোমরা পাণ্ডবদের বনাশ করো। ধৃষ্টদ্যুম্ন যেন পার না পায়। তাকে যেখানে পাও হত্যা করো।

কিন্তু কৌরব সৈন্যরা আর পেরে উঠল না। একাদশ অক্ষৌহিণী কৌরব সৈন্যের প্রায় সবাই শেষ হয়ে গেল। পাণ্ডবদের অবশিষ্ট রইল দু’ হাজার রথী, পাঁচ হাজার অশ্বারোহী আর দশ হাজার পদাতিক। সেই রণভূমিতে দাঁড়িয়ে দুর্যোধন দেখলেন তিনি একা। চারিদিক থেকে পাণ্ডবেরা তাঁকে ঘিরে ধরতে এগিয়ে আসছে।

তিনি একবার মনে মনে ভাবলেন এমন একটা অবস্থা আসতে পারে বিদুর তাঁকে আগেই বলেছিলেন। তিনি কর্ণপাত করেননি। করেননি, তাই বলে তিনি আত্মসমৰ্পণ করবেন না। তিনি দ্রুত অশ্বের মুখ ফিরিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করলেন। পিছনে অনুসরণ করছিল বিপুল পাণ্ডব সৈন্য। তিনি উপায়ন্তর না দেখে অদূরে একটি হ্রদ দেখে তার মধ্যে ঝাঁপ দিলেন। সেই হ্রদের নাম দ্বৈপায়ন হ্রদ।

পাণ্ডব সৈন্যরা হ্রদের জলে নেমে অনেক খোঁজাখুঁজি করল। কিন্তু দুর্যোধনকে ধরতে পারল না। ততক্ষণে দ্বৈপায়নের বুকে অন্ধকার নেমেছে। অস্ত গেছে সন্ধ্যাসূর্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *