প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব : সত্যমেব জয়তে

অশ্বত্থামার গল্প শুরু

অশ্বত্থামার গল্প শুরু

দুর্যোধন যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অশ্বারোহণে পালাচ্ছিলেন তখন বেশ কিছুটা দূরে একাকী যুদ্ধ করছিলেন অশ্বত্থামা। দুর্যোধন সবাইকে একা যুদ্ধ করতে বারণ করেছিলেন, সমবেতভাবে প্রতিরোধ করতে বলেছিলেন। কিন্তু কেউ শোনেননি। অশ্বত্থামা যখন অর্জুনের সঙ্গে দ্বৈরথ যুদ্ধে অর্জুনের রথ ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিলেন, অর্জুন ও বাসুদেব দুজনকেই আহত করেছিলেন তখন কৌরব রথীরা কেউ তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। একাই অশ্বত্থামা যুদ্ধ করে গেছেন। শেষে আর না পেরে নিজে গিয়ে সংশপ্তক বাহিনীকে তাঁর সাহায্যের জন্য ডেকে এনেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে যুদ্ধ অসমাপ্ত থেকে গেছে। অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি নিজেও গুরুতর আহত হয়েছেন। সারথি তাঁকে একরকম জোর করে তাঁকে শুশ্রূষা শিবিরে নিয়ে গেছে।

সে রাতটি ভিষকাচার্যদের পরামর্শমতো ক্ষত চিকিৎসার জন্য শুশ্রূষা শিবিরে কাটিয়েছেন অশ্বত্থামা। শিবিরে আহতদের এত ভিড় যে সেনাধ্যক্ষদের জন্য কোনো আলাদা সেবা শিবির তখন আর চালু ছিল না। যুদ্ধের প্রথম দিকে সোনধ্যক্ষদের জন্য স্বতন্ত্র শিবির ছিল। কর্ণের মৃত্যুর পর হতাহতের সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে ভিযক ও সেবকদের পক্ষে হাজার হাজার আহতদের শুশ্রূষা করা অসম্ভব হয়ে ওঠে।

আহতদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করার জন্য একদল সহায়ক বাহিনী ছিল। কিন্তু সে বাহিনীও বিপর্যস্ত হয়ে যায়। হাজার হাজার মৃতদেহ, ছিন্ন পদ, ছিন্ন বাহু, ছিন্ন মুণ্ড যুদ্ধক্ষেত্রে গড়াগড়ি খেতে থাকে। সাধারণত সন্ধ্যার পর যুদ্ধ শেষ হলে মশাল হাতে এই উদ্ধার অভিযান চলত। কিন্তু লোকাভাবে ও আহতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। আহতরা বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে থাকে।

গুরুতর আহত অশ্বত্থামাকে এনে তাঁর সারথি ভিষকাচার্যের কাছে নিয়ে যায়। ভিবকাচার্য তাঁকে করজোড়ে বলেন, আচার্যদেব, আপনাকে সাধারণ শিবিরে থাকতে হবে। কারণ সমস্ত শিবির ভর্তি। আমাদের কয়েকজন ভিষক ও সেবাকর্মীও পাণ্ডবদের লক্ষ্যভ্রষ্ট বাণের আঘাতে মারা গেছে। আমাদের রসদও ফুরিয়ে এসেছে। ঔষধ, প্রলেপাদি ও ক্ষতবন্ধনের বস্ত্রাদিও অপ্রতুল হয়ে পড়ছে। এসব কিছু সরবরাহই হস্তিনাপুর থেকে আসে। কিন্তু সেখানে প্রশাসন দেখবার কেউ নেই। মহারাজ দুর্যোধনের তিন ভ্রাতা এগুলি তদারক করতেন। এখন তাঁর ভ্রাতাদের সবাই নিহত। শুধু মহারাজ দুর্যোধন জীবিত। কিন্তু আমরা তাঁর কাছে পৌঁছতে পারছি না।

অশ্বত্থামা তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, আপনি কোনো সঙ্কোচ করবেন না। এটি যুদ্ধক্ষেত্র। কোনো প্রমোদ উদ্যান নয়। আমি সাধারণের মধ্যেই থাকব। কিন্তু আমি আরোগ্যশালায় বাস করতে আসিনি। আমাকে আগামিকাল যুদ্ধ করার মতো সুস্থ করে দিন। আমার প্রচণ্ড রুধিরপাত হয়েছে। রুধির স্রোত বন্ধ করে দিন। আমি কিন্তু মনের দিকে থেকে সতেজ আছি। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত আমি রণক্ষেত্র ছাড়ব না।

অশ্বত্থামার স্কন্ধে অর্জুনের নিক্ষিপ্ত ভল্ল লেগে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তার সারা অঙ্গ সুতীক্ষ্ণ তিরে ক্ষত-বিক্ষত। তিরগুলি তিনি নিজেই বার করে নিয়েছেন। আশু রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য রথের মধ্যেই কিছু ঔষধি থাকে। সেগুলি লাগালে ক্ষরণ বন্ধ হয়। কিন্তু অনেক জায়গা থেকে রক্ত তখনও পড়ছে। অশ্বত্থামা দীর্ঘদেহী, উন্নত স্কন্ধ, শ্মশ্রুগুম্ভ মণ্ডিত মানুষ। তিনি অর্জুনের চেয়ে বয়সে কিছু বড়। তাঁর কেশ ও শ্মশ্রুগুম্ভে পাক ধরতে শুরু করেছে। কিন্তু এখনও সোজা হয়ে চলেন। বীরত্বে তাঁর তুলনা শুধু তিনি। তাই পঞ্চাশের তেজ তাঁর দেহে চির অম্লান।

এত ক্ষতের যন্ত্রণাতেও তাঁর মধ্যে আচরণগত কোনো পরিবর্তন নেই। তিনি অবিচলিত, স্বাভাবিক। তিনি শুধু সেবা শিবিরে আহত সৈন্যদের দেখছিলেন। পরপর অনেকগুলি শিবির। ভিষকদের পরনেও যুদ্ধের পোশাক। শুধু তাঁরা শ্বেতবস্ত্র পরেন ও প্রত্যেকে শ্বেত উষ্ণীষ ব্যবহার করেন, যাতে বোঝা যায় তাঁরা যোদ্ধা নন, ভিষক। কিন্তু প্রয়োজনে তাঁরা অসিযুদ্ধ করতে জানেন। অশ্বত্থামা দেখছিলেন, শত শত আহত সৈনিককে। কেউ অন্ধ হয়ে গেছে জন্মের মতো। কারও দুটো পা-ই নষ্ট হয়ে গেছে। দু-হাত কাটা গেছে। উদর থেকে নাড়ি-ভুঁড়ি বেরিয়ে পড়ছে। কেউ সমানে রক্তবমন করে যাচ্ছে। কারও বা শল্য চিকিৎসা করতে হচ্ছে। অর্ধছিন্ন বাহু বা পদ কেটে দিতে হচ্ছে, ধারালো শল্যছুরিকা দিয়ে। সজ্ঞানে এইসব অস্ত্রোপচার হচ্ছে। তাই আহতরা যন্ত্রণায় প্রবল চিৎকার করছে।

অশ্বত্থামার চোখে ঘুম নেই। তবে বিছানায় শুয়ে তিনি যেন একটু বিশ্রাম পাচ্ছেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যুদ্ধের ভয়াবহতার দিকে তিনি কখনও নজর দেননি। তিনি শুধু আঘাত হেনেছেন। আঘাত সহ্য করেছেন। তার ভয়াবহতার প্রতি, পরিণতির প্রতি কখনও দৃষ্টিপাত করেননি। তাঁর পিতা অস্ত্রবিদ্যা শেখাবার সময় বলতেন, যুদ্ধ হচ্ছে শত্রুকে পরাভবের বিদ্যা। যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো দয়া, মায়া, করুণা, বিষাদ বলে কিছু নেই। এখানে শুধু দুজন। তুমি ও তোমার প্রতিপক্ষ। তোমার প্রতিপক্ষই তোমার শত্রু। প্রথম দর্শনেই তোমায় শত্রু সংহার করতে হবে। তুমি যদি তাকে সংহার না করো, তাহলে সে তোমাকে সংহার করবে। রণক্ষেত্র দয়ালু, ভাবালু আর তন্দ্রালুর জন্য নয়। এখানে কোনো দয়া নেই। ক্ষমার অর্থ ক্ষীণ দুর্বলতা। নিষ্ঠুরতাই যুদ্ধের ধর্ম। তোমাকে অত ভাবলে চলবে না। মুহূর্তের মধ্যে তোমায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেই সিদ্ধান্ত হল তুমি শত্রুকে হত্যা করবে কি করবে না। শুধু তা নয়, তুমি কোন অস্ত্র প্রয়োগ করবে? তির, না ভল্ল? খড়্গ না মূষল? শূল না গদা? নারচ, তোমর না জ্বলিত আলাত? (গোলাকার অগ্নিশিখা) যুদ্ধ মানে প্রহার, প্রহার মানে নিধন। নিধন অর্থে বিনাশ। শুধু একজনকে নয়, সমগ্র শত্রুকুলকে বিনাশ করো। হত্যা করো। নির্মূল করো। যুদ্ধ মানে হয় জয় করো, না হয় নিহত হও।

যোদ্ধার কাছে বিজয় কোনো লক্ষ্য নয়—উপলক্ষ্য। যোদ্ধার লক্ষ্য শুধু যুদ্ধ। শত্রু বিনাশ করা। যে তোমার বন্ধু নয়, যে তোমার প্রতিপক্ষ—সে-ই তোমার শত্রু। পাণ্ডব ভ্রাতারা তো তাঁর পিতা দ্রোণেরই ছাত্র। অশ্বত্থামার শৈশবের সহপাঠী, সহযোদ্ধা, খেলার সাথী। কৌরব-পাণ্ডব তারা তো একই পিতামহের উত্তরাধিকার। তাদের দেহে একই রক্তধারা প্রবাহিত। কিন্তু দুই সমুদ্র মহাসমুদ্রে পড়ার সময় তাদের জলধারাকে স্বতন্ত্র রাখে। তাদের পার্থক্য বোঝা যায়। দুর্যোধন ও যুধিষ্ঠির এক নয়, এক হতে পারে না। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যই তাদের বৈশিষ্ট্য। মানব জাতির বৈশিষ্ট্য। কেউ কারও আপন নয়। প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র। আর তাই তাদের জীবনদর্শন আলাদা হতে বাধ্য। দুর্যোধন সবসময়ই ঠিক। কারণ রাজত্ব বাপের নয়, দাপের। ক্ষাত্রধর্ম মানেই বীরত্ব। বীর চায় নিঃসত্ব অধিকার। চায় আধিপত্য। বীরত্ব শুধু দৈহিক বীরত্ব নয়, তা কৌশলও। দুর্যোধনের বীরত্ব আছে, বুদ্ধি আছে, কৌশলও আছে। রাজনীতির মধ্যে এই কৌশলই অগ্রগণ্য। ছল, বল ও কৌশল। এই তিনটিই রাজনীতির শক্তি। রাজনীতির ত্রিপাদভূমি।

পিতা দ্রোণ ধৃতরাষ্ট্রের বেতনভূক কর্মচারী ছিলেন। তিনি বিশ্বস্ত ভৃত্যের সমস্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু অশ্বত্থামার সেদিক থেকে যুদ্ধবিদ্যা গ্রহণ করার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। বাবা তাঁকে বেদ-বেদ্যাস্ত শিখিয়েছেন, আবার যুদ্ধবিদ্যাও শিখিয়েছেন। দুটোই উত্তম রূপে শিখেছেন। তিনি মনে-প্রাণে ক্ষত্রিয় অথচ উপবীতধারী ব্রাহ্মণের জীবন যাপন করেন। তিনি অকৃতদার, অতি সাধারণ স্বচ্ছ জীবন যাপন করেন। সারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের রাজারা তাঁকে মহামন্ত্রী করে নিয়ে যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু বৃদ্ধ পিতাকে ছেড়ে তিনি কোথাও যেতে চাননি। দুর্যোধনের অন্যতম সৈন্যাধ্যক্ষ হয়ে আছেন। এটিও অর্থের জন্য নয়, পিতার ধর্ম বলে পিতার উত্তরাধিকারকে তিনি সম্ভ্রমের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন বলেই।

গত আঠারো দিন ধরে তিনি যুদ্ধ করেছেন। প্রতিদিন অজস্র পাণ্ডব সৈন্যকে নিহত করেছেন। কিন্তু পাণ্ডব ভ্রাতাদের কাউকে নিহত করতে পারেননি। উলটে যুধিষ্ঠিরের ষড়যন্ত্রে পাণ্ডবপক্ষই তাঁর পিতাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। তিনি এখনও প্রতিশোধ নিতে পারলেন না। যুদ্ধ এক চরম হাহাকারের মধ্য দিয়ে শেষ হতে চলল। একাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্য সাত অক্ষৌহিণীর কাছে পরাজিত হল। তিনি দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা আজ আরোগ্যশালায় শুয়ে আছেন। পাণ্ডবপক্ষ বিজয় দিবস পালনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। রক্ত খেলার পর সবুজ আবিরের খেলায় তারা মেতে উঠবে।

অশ্বত্থামা ভাবতে লাগলেন, কাল সকালেই তিনি আবার যুদ্ধে নামবেন। যুধিষ্ঠিরের ও ধৃষ্টদ্যুম্নের ছিন্ন মুণ্ড দেখা ছাড়া তাঁর যন্ত্রণার মুক্তি নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *