প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব : সত্যমেব জয়তে

শেষ দৃশ্যে : শ্রীকৃষ্ণ

শেষ দৃশ্যে : শ্ৰীকৃষ্ণ

কৃষ্ণকে বেশিদূর যেতে হল না। একটু ভেতরে ঢুকেই তিনি দেখলেন পাহাড় থেকে নেমে আসা একটি শীর্ণ নদী উপলখণ্ডের ওপর দিয়ে বহে চলেছে। তার স্বচ্ছ জল তিন মাথায় ঠেকালেন। হাত-মুখ-পা ধুয়ে তিনি চলে এলেন একটি মহীরুহের নীচে। জায়গাটির চতুর্দিক গাছপালায় ঢাকা। সবুজ ঘাসের ওপর তিনি যোগাসনে বসে চক্ষু মুদে ধ্যানস্থ হলেন। তাঁর আত্মশুদ্ধির তপস্যা শুরু হল। এই পৃথিবীতে এসে কর্তব্য সম্পাদনের জন্যও তাঁকে কিছু কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়েছে। প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন করে তিনি ভীষ্মের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন। দ্রোণ হত্যায় যুধিষ্ঠিরের মিথ্যা ভাষণ অনুমোদন করেছেন। জরাসন্ধ হত্যার সময়ও তিনি ছলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। শিশুপালকে রাজসূয় যজ্ঞ মঞ্চে হত্যা না করে তিনি কিছুদিন অপেক্ষা করতে পারতেন। ক্ষমা ক্ষীণ দুর্বলতা—কিন্তু নিষ্ঠুর হবারও স্থান, কাল, পাত্র আছে। সবশেষে দুর্যোধনকে মল্লযুদ্ধের রীতি লঙ্ঘন করে হত্যা করার প্ররোচনা দিয়েছিলেন ভীমকে। তিনি যদি নির্দোষ হতেন, গান্ধারীর অভিশাপ তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারত না। কিন্তু সে অভিশাপ তো ফলেছে, ফলতে চলেছে।

আত্মশুদ্ধির জন্য কৃষ্ণ প্রায়োপবেশনে কঠোর তপস্যা করবেন। তপস্যার ফলশ্রুতি হিসাবে কী উপলব্ধি ঘটে সেটাই ঠিক করবে তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা। নতুন সৃষ্টির জন্য তিনি বাঁচবেন, না তাঁর কাজ শেষ হয়েছে বলে তিনি চিরবিদায় নেবেন? কিন্তু কাজ তো শেষ হয়নি। শেষের পরে যে শুরু সে তো জীবনের আর এক অধ্যায়। তিনিই তো বলেছেন, কর্মফলে মানুষের অধিকার নেই, শুধু কর্মতেই অধিকার। তবে কেন তিনি তাঁর কর্মফল একটা বিরাট শূন্য বলে দুঃখ পাচ্ছেন? তিনি তো তত্ত্বকথা বলে তাঁর কর্তব্য শেষ করেননি। তিনিই একমাত্র দেবতা, যিনি মনুষ্যজন্ম ধারণ করে তত্ত্ব ও কর্মের মধ্যে যে মেলবন্ধন ঘটানো যায় তা জীবন দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন। তিনি জীবনধর্ম প্রেমকে তুচ্ছ করেননি। মানুষকে সন্ন্যাসী হতে বলেননি। বলেছেন, শুধু যোগী হতে। যোগী মানে

বিশুদ্ধ কর্মযোগী। তিনি অর্জুনকে বলেছিলেন, অর্জুন তুমি রাজসিক সুখ নয়, সাত্ত্বিক সুখ অনুভব করো।

যয়া তু ধর্মকামার্থান্ বৃত্যা ধারয়তেহর্জুন।
প্রসঙ্গেন ফলাকাঙ্ক্ষী ধৃতিঃ সা পার্থ রাজসী।।*

*গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৩৪ নং শ্লোক। হে অর্জুন যে ধৃতির দ্বারা মানুষের প্রাণ, মন ও ইন্দ্রিয়ের সমস্ত চেষ্টা কোনো ফল প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষায় ধর্ম, অর্থ, ও কাম্য বিষয়ের উপভোগে আপনাকে সর্বদা নিযুক্ত রাখে তাহাই রাজসী ধৃতি। অর্থাৎ রাজসিকভাবে জীবনধর্মকে ধারণ করা।

রাজসিকভাবে নয়, তামসিকভাবেও নয়—প্রাণ, মন ও ইন্দ্রিয়ের সমস্ত চেষ্টা কোনো পুরুষার্থ লাভের জন্য নয়, উচ্চ অভিলাষ বা আকাঙ্ক্ষার জন্য নয়। শুধু ইন্দ্রিয় চরিতার্থের জন্য।’ ইন্দ্রিয় সুখ, তামসিক সুখ যা তিনি কৌরবদের মধ্যে দেখেছেন, যাদবদের মধ্যে দেখেছন। ‘যা বিমুঞ্চতি দুর্মেধা ধৃতিঃ সা পার্থ তামসী।’

অবিবেকী দুর্বুদ্ধি তামসী ধৃতি ব্যক্তিদের মধ্যেই বর্তমান। সে জন্য তিনি অর্জুনকে বলেছিলেন, আত্মপ্রসন্নতা থেকে উৎপন্ন এবং বাইরের কোনো ঘটনা যার ওপর প্রভাব ফেলে না, সেটাই সাত্ত্বিক সুখ। আসল সুখ। ‘তৎ সুখং সাত্তিকং প্রোক্তমাত্ম বুদ্ধি প্রসাদজম।’*

[* গীতা, অষ্টাদশ অধ্যায়। ৩৭তম শ্লোক।]

এই সাত্ত্বিক সুখের সন্ধান তিনি দিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বারকাবাসী শুধু রাজসিক ও তামসিক সুখে মগ্ন হয়ে থাকল। একমাত্র যুধিষ্ঠির আর অর্জুনই সাত্ত্বিক সুখে সুখী করতে চেয়েছিলেন রাজ্যবাসীকে। এটাই সনাতন ধর্ম। এরই জন্য তিনি মানবজন্ম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সফল হয়েছেন কী? তাঁর মনে হল বড় তাড়াতাড়ি তিনি তাঁর লীলা শেষ করতে চলেছেন। আরও কিছুদিন ধৈর্য ধরতে পারতেন না কি? আরও কিছু কাল অপেক্ষা। দ্বাপর যুগে মানুষ তো দুশো বছর বাঁচে। তাঁর বয়স মাত্র ১০৭ বছর।

ভাবতে ভাবতে তিনি চক্ষু মুদে দেবাদিদেব মহাদেব ও সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার স্মরণে চক্ষু মুদলেন। চোখ বন্ধ করার আগে একবার বনভূমির দিকে তাকালেন। সূর্যাস্তের আভা ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে। আকাশে নানা রঙের হোলি খেলা চলছে। এক একটি মেঘ যেন এক একটি আলেখ্য। পাখিরা সারাদিনের কর্ম সেরে কুলায় পরিজনদের মাঝে ফিরে এসেছে। শোনা যাচ্ছে ছোট নদীর নিত্য প্রবাহের ঝিরঝির শব্দ। কৃষ্ণ সেই নগ্ন নির্জন পৃথিবীটাকে বড় ভালোবেসে ফেললেন। মনে মনে বললেন, হত্যা নয়, ক্লেদ নয়, গ্লানি নয়, যুদ্ধ নয়—শুধু শান্তি। এ পৃথিবী বড় মধুময়। মধুময় পৃথিবীর ধূলি, মধুময় পৃথিবীর বাতাস। আসলে কর্মের প্লাবনে ভাসতে ভাসতে পৃথিবীকে ভালো করে দেখারই সুযোগ হয়নি তাঁর। সারাজীবন শুধু কাজ আর কাজ। কথা আর কথা। কিছু মুহূর্ত যদি নিজের জন্য একান্ত করে রাখতেন।

কৃষ্ণ এই কথা ভাবছেন, প্রাণ-মন তাঁর নিবিড় সুধায় ভরে উঠেছে। হঠাৎ গাছের আড়াল থেকে বিষমিশ্রিত তীক্ষ্ণ একটি তীর এসে কৃষ্ণের একটি পা বিদ্ধ করল। কৃষ্ণ অস্ফুট আর্তনাদ করে মূর্ছিত হয়ে পড়লেন। গলগল করে রক্তস্রোত বইতে লাগল। পাখির কুজন অরণ্যের মর্মরধ্বনি আর শীর্ণা খরস্রোতা নদীর কলতানের মধ্যে কৃষ্ণের ক্ষীণ আর্তনাদ মিশে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে গিয়ে পৌঁছলেন অশ্বত্থামা। দেখলেন তিরবিদ্ধ কৃষ্ণ মাটিতে পড়ে রয়েছেন সংজ্ঞাহীন হয়ে। তিনি দ্রুত গিয়ে কৃষ্ণের চরণকমল থেকে তিরটি তুলে ফেললেন। তাঁর গৈরিক শিরাবরণ খুলে কৃষ্ণের পায়ের কাছে ধরলেন। রক্তে কাপড়টি ভিজে গেল।

—আমায় ক্ষমা করুন প্রভু। অশ্বত্থামা তাকিয়ে দেখলেন এক ব্যাধ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। তার পিঠে বাঁধা তূণ। তাতে কতগুলি শাণিত তির।

অশ্বত্থামা তার দিকে বজ্রদৃষ্টিতে তাকাতেই ব্যাধ বলল, আমার নাম জরা। এই বনেই আমার বাস। আমি সারাদিন কোনো শিকার পাইনি। গোধূলির আঁধারে দেখলাম যেন এক শ্বেতবর্ণের হরিণ এই গাছের তলায় শুয়ে আছে। আমি তাকে লক্ষ্য করে তির ছুড়লাম। ছুটে এসে দেখি মানুষ

অশ্বত্থামা বললেন, তুমি কী করেছ জানো? কাকে তুমি তিরবিদ্ধ করেছ?

—না প্রভু। আমি তো ভেবেছিলাম কোনো শ্বেত মৃগ।

—ইনি কৃষ্ণ। স্বয়ং ভগবান। তুমি তাকে তিরবিদ্ধ করে হত্যা করলে!

জরা নামী ব্যাধ বলল, প্রভু, আপনি আমায় যে শাস্তি দিতে চান দিন। আপনি সন্ন্যাসী। আপনি আমায় কঠোর অভিশাপ দিন।

অশ্বত্থামা বললেন, অভিশাপ আমি আমার প্রবলতম শত্রুকেও দেব না। অভিশাপ ও এক ধরনের হিংসা। আমি জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছি, হিংসা দিয়ে হিংসাকে নির্মূল করা যায় না। ঘৃণা দিয়ে ভালোবাসা পাওয়া যায় না। ক্রোধের দ্বারা কখনও ক্রোধ জয় করা যায় না। তোমার তির কি বিষমিশ্রিত ছিল?

—না প্রভু। আমরা পশুকে হত্যা করি তার মাংস ভক্ষণের জন্য। তাই তিরে বিষ মিশ্রিত করি না।

—তাহলে কৃষ্ণের বাঁচার সম্ভাবনা আছে। আচ্ছা, তোমরা কোনো ভেষজের সন্ধান জানো যা দিয়ে ওঁর রক্তক্ষরণ বন্ধ হতে পারে?

ব্যাধ বলল, জানি। একটু সময় দিন। এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখন ভেষজ খুঁজে পাওয়া অসুবিধাজনক, তবু চেষ্টা করছি প্রভু।

এই বলে ব্যাধ চলে গেল।

অশ্বত্থামা উদ্বিগ্ন মুহূর্ত গুনছেন। কৃষ্ণের বেঁচে ওঠার ওপর তাঁর মৃত্যুবর নির্ভর করছে। তিনি একান্ত মনে চাইছেন কৃষ্ণ কিছুক্ষণের জন্য বেঁচে উঠুন। অশ্বত্থামা তাঁর গায়ের চাদরটি খুলে ফেলে নদীর জলে ভিজিয়ে ফিরে এসে কৃষ্ণের মুখে ধরলেন। কয়েক ফোঁটা জল তাঁর জিভে এসে ঠেকল। কৃষ্ণ ধীরে ধীরে চোখ মেললেন। ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, কে তুমি?

অশ্বত্থামা বললেন, আর্য, আমি সেই অশ্বত্থামা। যাকে আপনি তিন হাজার বছর বেঁচে থাকার অভিশাপ দিয়েছিলেন। যাকে আপনি রোগগ্রস্ত হয়ে আজীবন বনবাসী থাকার অভিশাপ দিয়েছিলেন।

—তুমি এখানে কী করে এলে অশ্বত্থামা? কৃষ্ণ ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন।

—আমি আপনার জন্যই সেই দম্যক বন থেকে এতদূর পথ অতিক্রম করে এসেছি। গতকাল প্রভাসে আপনার হত্যালীলা দেখেছি। ভাই ভাইকে হত্যা করছে। সন্তান পিতাকে হত্যা করছে। স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে উপগত হচ্ছে। মদিরা স্রোতে ভেসে যাচ্ছে জীবন, যৌবন, ধন, মান। এর কি কোনও প্রয়োজন ছিল প্রভু?

কৃষ্ণ বললেন, আমি কিছুই করিনি। আমি নিমিত্ত মাত্র। সবই দ্বারকাবাসীর কর্মফল। নিয়তি তাদের দিয়ে সব কিছু করিয়ে নিয়েছেন। আমি শুধু নির্লিপ্ত দর্শকমাত্র।

অশ্বত্থামা বললেন, আমি বিশ্বাস করি না কাল যে জঘন্য গৃহযুদ্ধ ঘটে গেল তা দ্বারকাবাসীর কর্মফল। এ তো আপনারই অপকৌশল।

কৃষ্ণ বললেন, তুমি বিশ্বাস করো বা না করো, কালচক্র অনুসারে মানুষ জন্মায়। কর্ম শেষ হলে আবার চলে যায়। আবার নতুন প্রজন্ম এসে তার স্থান পূর্ণ করে। মানুষ যেমন কর্ম করে তেমনই তার ফল পায়। পাপের বেতন চিরকালই মৃত্যু।

অশ্বত্থামা বললেন, আপনি বলছেন দ্বারকাবাসী তার পাপের ফল পেয়েছে। আপনি তাদের সবাইকে প্ররোচিত করে দ্বারকা থেকে প্রভাসে নিয়ে আসেননি? এ এক পরিকল্পিত হত্যা এবং এই হত্যার নায়ক আপনি।

কৃষ্ণের যন্ত্রণাকাতর ঠোঁটে হাসির রেখা দেখা দিল। তিনি চক্ষু মোদা অবস্থায় বললেন, মানুষ যে তার কৃতকর্ম অনুসারে শাস্তি পায়, তার প্রমাণ তুমি নিজে। তুমি প্রায় কয়েকশত মানুষকে নিদ্রারত অবস্থায় হত্যা করেছ। উত্তরার গর্ভস্থ সন্তানকেও রেহাই দাওনি। আমার অভিশাপ অকারণে নয়। পৃথিবীতে কোনো অন্যায়কারী শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারেনি, পারে না। হয় সে রাজদণ্ড পায়, না হয় বিবেকের যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত হয়। কর্মফল থেকে কারও রেহাই নেই। কাল কাউকেই ক্ষমা করে না।

অশ্বত্থামা বললেন, মিথ্যা কথা। পৃথিবীতে প্রতিদিন সহস্র সহস্র মানুষ পাপাচার করছে, তাদের সকলের কি শাস্তি হচ্ছে? আমার দুর্ভাগ্য যে আমি ধরা পড়ে গিয়েছি। নয়তো আমারও আপনি কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারতেন না।

কৃষ্ণ বললেন, কিন্তু তুমি বিবেকের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হতে পারতে না।

অশ্বত্থামা ব্যঙ্গের স্বরে বললেন, বিবেকের যন্ত্রণা, মানসিক দুর্বলতা, তা ভীরুদের জন্য। দুর্বলকে দাবিয়ে রাখার জন্য ক্ষমতাবানদের পরিকল্পিত নিষেধবাক্য। যুদ্ধে এত মানুষকে যোদ্ধা হত্যা করে। তাতে যোদ্ধার বিবেক তাকে উৎসাহই দেয়। তাকে গর্বিত করে। যদি বিবেকযন্ত্রণা বলে কিছু থাকত, তাহলে কোনো মানুষই নৃশংস হত না। আত্মরক্ষা কিংবা প্রতিশোধের জন্য হিংসার আশ্রয় নিলে বিবেক তাকে যন্ত্রণা দেয় না, বরং তাকে গর্বিত করে। প্রতিহিংসা না নিতে পারাটাই বরং কাপুরুষতা। আপনি অর্জুনকে আত্মীয় বধে প্রেষিত করেননি?

কৃষ্ণ বললেন, আমি তোমার সঙ্গে বিতর্কে যাব না। আমার সময় বড় কম। তুমি অর্ধশিক্ষিত। অর্ধশিক্ষা মূর্খের চেয়েও ভয়াবহ। ন্যায়-অন্যায় বোঝবার জন্য যে জ্ঞানের দরকার হয়, আত্মনকে উপলব্ধি করার প্রয়োজন হয়, সেই উপলব্ধি ও শিক্ষা তোমার নেই। বিচারককে সবার আগে শিক্ষিত হতে হয়। সে শিক্ষা তোমার নেই ব্রাহ্মণ। তুমি শাস্ত্র পড়েছ, কিন্তু ‘তোমার উপলব্ধি হয়নি। অথবা সাধারণ দুর্বৃত্তদের মতো হিংসার পক্ষে তুমি তোমার নিজস্ব যুক্তি খাড়া করেছ। আমি মানুষ, মনুষ্যোচিত নানা ভ্রান্তির শিকার। হয়তো আমার বিচারও সর্বত্র অভ্রান্ত নয়। আমাকেও ভুলের জন্য মহাকালের কাছ থেকে দণ্ড পেতে হতে পারে।

—আপনি যথেষ্ট ভুল করেছেন। কৌরববংশ ধ্বংস করেছেন অপকৌশল করে। ধৃষ্টদ্যুম্নকে দিয়ে আমার পিতাকে হত্যা করিয়েছেন, দুর্যোধনকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন।

কৃষ্ণ বললেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন তোমার পিতাকে হত্যা করেননি। তোমার পিতা আগেই স্বেচ্ছায় যোগ মৃত্যুবরণ করেছিলেন। ধৃষ্টদ্যুম্ন সেই মৃত ব্যক্তিরই মস্তকচ্ছেদন করে। ধৃষ্টদ্যুম্ন কিন্তু যজ্ঞ থেকে আবির্ভূত হয়েছিল দ্রোণকে হত্যা করার জন্য। তোমার পিতা যা ভবিতব্য, তা হয়েছে। সে কথা থাক। তুমি কী চাও বলো। আমার আর সময় নেই যে তোমার কথা শুনি। বলো, এতদূর থেকে তুমি কী জন্য এসেছ? আমার কাছে কী চাও তুমি? তুমি তো দীর্ঘজীবন পেয়েছ। মানুষের তো সবারই কামনা দীর্ঘজীবন।

অশ্বত্থামা বললেন, আর্য, আমি কিন্তু জীবন চাইতে আপনার কাছে আসিনি। আমি মৃত্যু চাইতে এসেছি। আপনি আমায় মৃত্যুবর দিন।

কৃষ্ণ বললেন, সেটা আমি পারব না। আমার অভিশাপ আমি ফিরিয়ে নিতে পারি না।

—কিন্তু এই রোগগ্রস্ত যন্ত্রণাকাতর এ শরীর নিয়ে বেঁচে থাকা, তাও তিন হাজার বছর যে কী যন্ত্রণার তা আমি বুঝতে পারি।

কৃষ্ণ বললেন, তুমি তো শিবের বরে চিরঞ্জীবী হয়ে জন্মেছ। তুমি তো মৃত্যুহীন। আমি শুধু তোমার আয়ুকে তিন হাজার বছরের সীমার মধ্যে এনেছি। তিন হাজার বছর পরে তুমি মুক্তি পাবে। চিরঞ্জীবী হয়ে তোমায় চিরকাল বেঁচে থাকতেই হত।

—তাহলে আমার মৃত্যু দিন। আর যদি মৃত্যু না দেন, আমায় নিরাময় করে দিন।

কৃষ্ণ এবার বললেন, সেটি আমি পারি অশ্বত্থামা। আমি তোমার দেহ স্পর্শ করছি, তোমার সমস্ত অসুখ নির্মূল হয়ে যাবে। তবে হিংসার চিন্তা যদি মাথায় আনো, তাহলে আবার তুমি অসুখে জর্জরিত হবে। তুমি জীবত হয়ে পড়ে থাকবে।

কৃষ্ণের করস্পর্শে অশ্বত্থামার মনে হল তার শৈশবে মা কৃপী যেমন জ্বর হলে তাঁকে শয্যায় শুইয়ে করস্পর্শ করে তার রোগযন্ত্রণা অপনোদন করতেন, সেইভাবে কৃষ্ণ তাঁর দেহস্পর্শ করে তার সমস্ত যন্ত্রণা শুষে নিচ্ছেন। তাঁর মনের সমস্ত ভার, দেহের সমস্ত ক্লান্তি ধীরে ধীরে দূর হয়ে যাচ্ছে।

এক আশ্চর্য শান্তিতে অশ্বত্থামা বিষণ্ণ, ক্ষুব্ধ, ক্লান্ত। চোখে-মুখে পরম তৃপ্তি দেখা দিল। স্নিগ্ধ সমীরণের ঝাপটা এসে লাগল তাঁর সর্বাঙ্গে। ঝাউবন বীথিতে তখন মর্মর জেগেছে।

অশ্বত্থামার মনে হল তিনি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন। আকাশে-বাতাসে মধু ঝরছে। মধু বাতা ঋতায়তে, মধু ক্ষরতি সিন্ধবঃ। ওঁ মধু ওঁ মধু। এ জীবন মধুময়।

কৃষ্ণ স্নেহের সুরে বললেন, এখন কেমন বোধ করছ অশ্বত্থামা?

অশ্বত্থামার চোখ জলে ভরে এলো। তিনি জীবনে কখনও কাঁদেননি। প্রচণ্ড দারিদ্রের মধ্যে কেটেছে তাঁর জীবন। বাল্যে শুধু দরিদ্র বলে ব্রাহ্মণকুলে জন্ম হওয়া সত্ত্বেও বন্ধুদের কাছে পেয়েছেন অবহেলা। শুধু একমাত্র মা কৃপী তাঁকে ভালোবাসা দিয়ে, তাঁর স্নেহচ্ছায়া দিয়ে তাঁর সমস্ত অভাবকে আড়াল করে রেখেছিলেন। বাবা ছিলেন তাঁর প্রতি কঠোর এবং উদাসীন। তাঁর বেপরোয়া স্বভাবের জন্য তিনি ছেলের সঙ্গে বরাবর দূরত্ব রেখে চলতেন। তাঁর সব ভালোবাসা নিজের ছেলেকে বঞ্চিত করে দিয়ে দিতেন অর্জুনকে। একটা ভালো কিছু উপহার পেলে অশ্বত্থামাকে না দিয়ে অর্জুনকে দিয়ে আসতেন। সেই অর্জুন তো গুরুকে হত্যার জন্য অস্ত্র ধরেছিল।

দুর্যোধনও ক্ষত্রিয় নয় বলে তাঁকে তাচ্ছিল্য করেছেন। ব্রাহ্মণপুত্র যুদ্ধের কী বোঝে এই মনে করে গুরুপুত্র হিসাবে যতটুকু সম্মান দেওয়া দরকার তার বেশি দেননি। অশ্বত্থামা সারাজীবন ধরে শুধু অবহেলা আর উপেক্ষা পেয়েছেন। সেদিন অরণ্যের অসংখ্য মহীরুহের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়া ফিকে জ্যোৎস্নার আলোকে এক মৃত্যুপথযাত্রী দেব মানুষের করস্পর্শে যেন তাঁর জন্মান্তর ঘটল।

অশ্বত্থামা কৃষ্ণের পা জড়িয়ে ধরলেন। কৃষ্ণ তাঁর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, এখন কেমন বোধ করছ অশ্বত্থামা?

—অনেক ভালো। আমি সুস্থ হয়ে গিয়েছি প্রভু।

—তুমি বারবার বলো, আমার কোনো অসুখ নেই। আমি সুস্থ, আমি নীরোগ। আমি অমৃতের পুত্র। আমি গর্বিত। আমি নির্মল। আমি সৎ থাকব। সততার চেয়ে মনের বড় বন্ধু আর নেই। শুচিতার চেয়ে বড় শক্তি আর নেই। পবিত্রতার চেয়ে বড় অস্ত্র আর নেই। এখন বলো অশ্বত্থামা, তোমার মধ্যে এখনও মানুষকে হনন করার ইচ্ছা জাগছে না ভালোবাসার পদ্মকমল হৃদয়ে ফুটে উঠছে?

অশ্বত্থামা বললেন, আমার হৃদয় তো এতদিন প্রতিহিংসার আগুনে দগ্ধ হচ্ছিল। আজ মনে হচ্ছে আমি মুক্ত।

কৃষ্ণ বললেন, পাঁক থেকেই পঙ্কজ জন্মায়। তোমার হৃদয়ের কর্দম থেকে পদ্মফুল ফোটাও। যা ছিল বিদ্বেষ তা শান্তিতে পরিণত হোক।

যদৃচ্ছালাভ সন্তুষ্টো দ্বন্দ্বাতীতো বিমৎসবঃ

তুমি যা অনায়াসে পাবে তাতেই সন্তুষ্ট থাকো। রাগ, দ্বেষ, দ্বন্দ্ব যেন তোমার মনকে কলুষিত না করে। এখন বলো, তুমি কী দীর্ঘজীবন চাও না? তুমি কি এখনও মৃত্যুবর কামনা করো?

—না প্রভু। আমার রোগমুক্তি ঘটেছে। আমি বাঁচতে চাই। কিন্তু আমার জিজ্ঞাসা, আপনি নিজে স্থিতপ্রজ্ঞ হয়ে, স্বয়ং ভগবান হয়ে এই মৃত্যু বেছে নিলেন কেন? যিনি আমার মৃত্যুবাণ থেকে উত্তরাপুত্রকে বাঁচিয়েছেন, তিনি ব্যাধের একটি সামান্য তীরে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছেন কেন? সত্যি কথা আমায় বলুন প্রভু। আমি আপনার কাছে মৃত্যু চেয়েছিলাম জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল বলে। কিন্তু আপনি মৃত্যু চাইলেন কেন? আপনি কী চান প্রভু? জীবন না মৃত্যু?

কৃষ্ণ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তাঁর ঘন ঘন নিশ্বাস পড়তে লাগল। তিনি এবার বললেন, তোমাকে সত্যি কথাটা বলব অশ্বত্থামা। আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম। যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এসেছিলাম, ধর্ম সংস্থাপন, তা আমার পূর্ণ হয়নি। লোকে যাগযজ্ঞকেই ধৰ্ম বলে মনে করল। রাজধর্ম শুধু কতগুলি প্রথা আর মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল। ধর্ম কিন্তু পূজা নয়, উপাসনা নয়। ধর্ম হল শুদ্ধ আচরণশীল মনন। একটি জীবনবোধ ও বিশুদ্ধ জীবনচর্চা। প্রতিটি মানুষকে আসক্তিহীন হয়ে তার কর্ম করে যাওয়াই ধর্ম। সাত্ত্বিক, তামসিক ও রাজসিক গুণগুলির মধ্যে সমন্বয় করে বেঁচে থাকা। আর কতগুলি নীতির প্রতি অবিচল থাকাই ধর্ম। সেই নীতি হল সত্য, অহিংসা আর শুচিতা।

আর একটা বড় ভুল আমি করেছিলাম, যে ভুল তুমিও করতে যাচ্ছিলে। তোমার মনেও এবার এসেছিল সন্ত্রাস করে, গুপ্তহত্যা করে অতি সহজে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা যায়। তুমি তা করবে, রাজা হয়ে বসবে। কিন্তু তাতে হয়তো রাজা হতে। কিন্তু তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী এসে তোমায় হত্যা করে তোমার সিংহাসনে বসত। রাজা বদল করে রাজ্য বদল করা যায় না।

এমনকী, আজ যিনি ভালো রাজা আছেন, কাল তিনি না থাকলে সিংহাসনে অন্য লোক বসলে তাঁর সমস্ত পরিকল্পনা সমুদ্রগর্ভে ডুবে যায়। এমনকী, রাজা যুধিষ্ঠিরের পরবর্তীকালে হস্তিনাপুরের অবস্থা কী হবে কেউ বলতে পারে না।

—তাহলে আপনি বলছেন একজন মহান সৎ প্রজাপালক রাজার কোনো মূল্য নেই?

কৃষ্ণ বললেন, রাষ্ট্র মানুষ তৈরি করে না। মানুষই রাষ্ট্র তৈরি করে। যথার্থ ধার্মিক মানুষ তৈরি না হলে ধর্মরাজ্য তৈরি হতে পারে না। দ্বারকার ওপর এই ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার পরীক্ষায় আমি অসফল হয়েছি। দ্বারকার পথভ্রষ্ট ইন্দ্রিয়াসক্ত তামসিক মানুষদের দিয়ে আর যাই হোক, ধর্মরাজ্য তৈরি হয় না। আমি আদর্শ নেতা তৈরি করতে গিয়েছিলাম, পারিনি। সবাই মুখে কৃষ্ণভক্ত বলে আমার কাছে এসে অন্যের নিন্দা করে যাচ্ছে। কেউ পর্যাপ্ত ভোগবিলাসেও সন্তুষ্ট নয়, তারা আরও পেতে চাইছে। আমি তাই যদুবংশকে ধ্বংস করে গেলাম। ধ্বংসস্তূপ থেকে যদি প্রকৃত মানুষদের জন্ম হয়।

আমি অর্জুনকে ধর্মযুদ্ধে প্রবৃত্ত করেছিলাম। এ যুদ্ধ করতে গেলে সবার আগে যোদ্ধাকে আত্মশুদ্ধ নির্মোহ ও স্থিতপ্রজ্ঞ হতে হয়। এসব তোমার মাথায় ঢুকবে না। একটি কথা জেনে রাখো, ধর্মযুদ্ধ হয় বীরের সঙ্গে বীরের। তা প্রকাশ্যে, ঘোষণা করে। তুমি যা করেছ তা সন্ত্রাস, গুপ্তহত্যা। কাপুরুষ, দুর্বল, ভীরু, ক্ষমতালোভী অথবা প্রতিহিংসাপরায়ণ উন্মত্তের আচরণ। তোমার এই গুপ্তহত্যাকে যতই দর্শনতত্ত্ব দিয়ে সাজাও না কেন, তা কেউ মেনে নেবে না।

অশ্বত্থামা বললেন, তাহলে কীসে রাষ্ট্রের মুক্তি?

কৃষ্ণ বললেন, মানুষের মুক্তিই রাষ্ট্রের মুক্তি। সমস্ত মানুষকে ধর্মরাজ্যের উপযোগী হয়ে উঠতে হবে জীবনধর্মকে জীবনের ধ্রুবতারা করে।

—এ তো বড় কঠিন কাজ প্রভু। কে করবে এ কাজ?

কৃষ্ণ বললেন, এ জন্যই আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম। এজন্যই আমি দীর্ঘজীবন চেয়েছিলাম। নতুন প্রজন্মের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেব বলে।

—কীভাবে?

—সমস্ত মানুষকে প্রকৃত শিক্ষিত করে। জ্ঞানই শিক্ষার উদ্দেশ্য।

অপি চেদসি পাপেভ্যঃ সর্বেভ্য পাপরু ওমঃ
সর্বং জ্ঞানলবনৈব বৃজিনাং সন্তরিষ্যমি। *

[*তুমি যদি সমস্ত পাপীদের চেয়েও পাপী হও, তথাপি তুমি জ্ঞানরূপ নৌকা দ্বারা নিখিল পাপ সমুদ্রে উত্তীর্ণ হতে পারবে। শ্রীমদ্ভাগবত গীতা।]

আমি দীর্ঘজীবন পেলে শুধু এই জ্ঞানের আলো মানুষকে দিতাম। তাদের মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে চরিত্র গঠন করতাম। মানুষের ইন্দ্রিয়াসক্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, অসূয়া তোমার ব্রহ্মশির অস্ত্রের চেয়ে তীক্ষ্ণ। যতক্ষণ না মানুষ প্রকৃত জ্ঞানলাভ করবে, ততদিন তোমার সন্ত্রাস শাস্ত্র বলো আর অহিংসার বাণী বলো, দেশের কোনো পরিবর্তন আনবে না।

অশ্বত্থামা, তুমি আমার অভিশাপকে বরে পরিণত করো। সামনে কলিযুগ এসে পড়ল বলে। অনেকে বলেন এসে গেছে। তুমি তিন হাজার বছর ধরে শান্তির কথা মানুষকে বলে যাও। দুধকেই বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিক্রি করতে হয়। মদ এক জায়গায় বসে বিক্রি হয়।

অশ্বত্থামা কৃষ্ণের পদতলে কপাল ঠুকে বললেন, আপনি বাঁচুন প্রভু। আমার অক্ষয় পরমায়ু আপনি নিন। কী হবে আমার মতো মানুষের দীর্ঘদিন বেঁচে থেকে? আমি তো অস্ত্র ছাড়া আর কিছুতে পারদর্শী নই। আমার বেদবিদ্যা অতি সামান্য। তা দিয়ে বিশ্বভুবনকে জ্ঞান দেওয়া যায় না। আপনি সর্বজ্ঞ, আপনি নারায়ণ। আপনিই পারেন প্রাসাদ থেকে কুটিরে কুটিরে গিয়ে প্রকৃত আত্মজ্ঞানের বিস্তার ঘটাতে। আপনি ইচ্ছা করলেই দেশবাসীকে বাঁচাতে পারেন।

ধীরে ধীরে মৃত্যু তার প্রশান্ত বেশে এসে কৃষ্ণকে অধিকার করছিল। তিনি মুদিত চোখে বললেন, তা হয় না অশ্বত্থামা। আমার যতটুকু প্রাপ্য, আমি তা পেয়েছি। যতটুকু করণীয়, ততটুকু করেছি। আমি অজস্র আশীর্বাদ যেমন পেয়েছি, অভিশাপও তেমন পেয়েছি। দুটোই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। অভিশাপই প্রমাণ করে সে যা করেছে তার মূল্য কতটুকু

তাছাড়া সবাই তার নির্ধারিত আয়ু নিয়ে জন্মায়। আমার আয়ু শেষ। তবে আমার ইচ্ছার কোনো মূল্য আর নেই। আমি বেঁচে থাকব আমার অনুগামীদের মধ্যে। তুমি তোমার তিন হাজার বছরের আয়ু নিয়ে যতটুকু পারো মানুষের জন্য কিছু করে যাও। দেখবে এত শান্তি পাচ্ছ, এত তৃপ্তি পাচ্ছ, তিন হাজার বছরকে তখন তিন বছর বলে মনে হবে। তুমি নিজের জন্য বেঁচে নেই, অপরের জন্য বেঁচে আছো—এই ভাবনাই বেঁচে থাকার সার্থকতা। অশ্বত্থামা, তুমি হত নও। কোনোদিন হত হবে না। মননের সঙ্গে যে বাঁচে, অপরের জন্য যে বাঁচে, তার মৃত্যু নেই

কৃষ্ণ আর কথা বলতে পারলেন না। তাঁর দেহ নিস্তব্ধ নীরব হয়ে গেল। অন্ধকারে ঝিঁঝিরা ক্রমাগত ডেকে চলেছে। অশ্বত্থামা দেখলেন, এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক কৃষ্ণের দেহ থেকে বেরিয়ে হাওয়াই বাজির মতো বনস্পতির মাথা ছাড়িয়ে ঊর্ধ্বাকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডলের দিকে এগিয়ে চলেছে।

‘প্রভু’ বলে কৃষ্ণের দেহের উপর প্রায় আছড়ে পড়লেন অশ্বত্থামা। আর ঠিক সেই মুহূর্তে জরা ব্যাধ প্রবেশ করল হাতে একগুছ গুল্ম নিয়ে। সে এসে বলল, প্রভু, আমি ভাগ্যবান, দুর্লভ ভেষজ সংগ্রহ করে এনেছি। এর নির্যাস ক্ষতের ওপর দিলে ক্ষত শুকিয়ে যাবে। উনি নিরাময় হয়ে উঠবেন।

অশ্বত্থামা বললেন, তুমি বড় দেরি করে ফেললে বন্ধু। তাঁর পুণ্য আত্মা এখন আকাশে গিয়ে লীন হয়েছে। তিনি আর ফিরবেন না। তোমার কাছে অনুরোধ, তাঁর এই দেহটি তোমরা সবাই মিলে দ্বারকায় শেষকৃত্যের জন্য পৌঁছে দিও।

জরা নামক সেই নিষাদ দেখল গৈরিক বসন পরা সেই দীর্ঘদেহী সন্ন্যাসী ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছেন।

আর তার সামনে শায়িত পক্ককেশ এক অনিন্দ্যকান্তি এক প্রবীণ চক্ষু মুদে চিরনিদ্রায় শায়িত। ম্রিয়মাণ জ্যোৎস্নার আলোকে মৃতের মুখটি জুড়ে বিষাদ ব্যথা যন্ত্রণা থেকে মুক্তির চিরশান্তি। যা জরা নামক ওই নিষাদ তিরবিদ্ধ সমস্ত মৃতদের মুখে লক্ষ করে এসেছে। মৃতের উত্তরীয়টা দিয়ে সে মৃতের মুখ ঢেকে দিয়ে দ্রুতপদে বেরিয়ে গেল কিছু শববাহককে ডেকে আনার জন্য। মৃতদেহটি বহু যোজন দূরে দ্বারকায় পৌঁছে দিতে হবে।

শেষ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *