মণিহারা অশ্বত্থামা
পাণ্ডব শিবিরে কয়েক সহস্র মানুষের মধ্যে একমাত্র ব্যক্তি যিনি অশ্বত্থামার গণহত্যা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথি উতঙ্ক। তিনি শিবিরের নিকটবর্তী একটি গুল্মের আড়ালে আত্মগোপন করেছিলেন। এমন আত্মগোপনকারী অনেক ব্যক্তি শুধু পলায়মান হস্তী ও অশ্বের পদভারে পিষ্ট হয়ে মারা যায়। কিন্তু সারথি উতঙ্ক দৈববলে অক্ষত থাকেন।
ভোরের আলো ফুটলে তিনি একবার শিবিরে প্রবেশ করে দেখলেন চতুর্দিকে রক্তাক্ত মৃতদেহের স্তূপ। কোথাও প্রাণের স্পন্দন নেই। তিনি পঞ্চপাণ্ডবদের খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। বেশিদূর যেতে হল না। দেখলেন পাণ্ডবদের রথ আসছে। তাঁরা রাত্রিবাস সেরে ফিরে আসছেন। সামনেই যুধিষ্ঠিরের রথ।
ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথির আলুলায়িত বৈশ+পরনে রাত্রির পোশাক। তাও আলুথালু। তাঁর চোখে-মুখে আতঙ্ক। তিনি হাত নেড়ে রথ থামাতেই যুধিষ্ঠির রথ থেকে নেমে এলেন।
—তুমি ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথি না? কী হয়েছে তোমার? উদ্বিগ্ন যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন।
উতঙ্ক করজোড়ে প্রণাম করে বলল, হ্যাঁ মহারাজ। আমি ধৃষ্টদ্যুম্নসারথি উতঙ্ক। সর্বনাশ হয়ে গেছে মহারাজ। পাণ্ডব শিবিরে কেউ আর জীবিত নেই। একমাত্র আমিই দৈববলে বেঁচে গেছি।
ইতিমধ্যে পিছনের রথগুলি থেকে পাণ্ডব ভ্রাতারাও নেমে পড়েছেন।
উতঙ্ক রোদন করতে করতে বলে চলেছে, আপনার পুত্রদের কেউ বেঁচে নেই মহারাজ। ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, দ্রুপদতনয়গণসহ সমস্ত পাণ্ডব সৈন্য নিহত।
—কে এমন কাজ করল? যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন।
—দুরাত্মা কৃপাচার্য, কৃতবর্মা আর অশ্বত্থামা। অশ্বত্থামাই রাত্রির শেষ প্রহরে শিবিরে ঢুকে নিদ্রিত সবাইকে পশুর মতো হত্যা করেছে। তাঁর সঙ্গে ভূত, প্রেত, রাক্ষসেরাও ছিল। তারা বহু মৃতদেহ ভক্ষণ করেছে। আমি রাতে কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে লুকিয়েছিলাম। ভোরে উঠে শিবির দেখে এলাম। সে এক মহাশ্মশান। ওই দুরাত্মারা শুধু মানুষ নয়, অসংখ্য হস্তী ও অশ্বকেও নিহত করেছে।
যুধিষ্ঠির ও পাণ্ডব ভ্রাতাগণ শিবিরে প্রবেশ করেই সেই বীভৎস শ্মশানভূমি দেখে সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। মহাবীর সাত্যকি অর্জুন ও ভীমসেন তাড়াতাড়ি তাঁকে ধরে শুশ্রূষা করে একটি ভগ্নপ্রায় খাটের ওপর কোনোক্রমে বসালেন।
ধর্মরাজ অতিকষ্টে জ্ঞান ফিরে পেয়ে বললেন, হায়, আমরা যে শত্রুদের পরাজিত করলাম, সেই তারাই আমাদের পরাজিত করল। বিধাতার কার্যগতি দিব্যজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিরও নিতান্ত দুয়ে। আমরা কৌরবদের গুরু, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, বন্ধু, বয়স্য ও অমাত্যদের সবাইকে পরাজিত ও বিনাশ করলাম। এখন আমরা নিজেরাই পরাজিত হলাম। দৈব প্রভাবে অনর্থ অর্থ, ও অর্থ অনর্থ হয়ে ওঠে। আমাদের এই বিজয়–বিজয়ই নয়, তা নিদারুণ পরাজয়। এই জয়-পরাজয় তুল্য। বিপক্ষদেরই জয় হল। যে জয়ের জন্য পরে অনুতাপ করতে হয়, সে জয় জয়ই নয়। হায়, আমরা যাদের জন্য বন্ধু, বান্ধব, আত্মীয়দের বিনাশ করে পাপাচার করলাম, তারাই আমার জয়ী পুত্রদের হত্যা করল। যারা অজেয় বীর দ্রোণাচার্যের কোপ থেকে বেঁচে গিয়েছিল। প্রবল বীর কর্ণের হাত থেকেও তারা মুক্তি পেয়েছিল। আমার সেই অজেয় পুত্ররা আজ নিহত হল। নিশ্চয়ই তাদের আচরণে কোনো ভুল হয়েছিল। মর্ত্যলোকে প্রমাদই মানুষের নিধনের একমাত্র কারণ। অসাবধানতার জন্যই তাদের মৃত্যু হল। সতর্ক না থাকলে মানুষ প্রমাদবশে ছোট একটি নদীতেও ডুবে যেতে পারে। পুত্রশোকে দ্রৌপদী জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়বে। হায়, আজ তার কি দুর্দশা।
যুধিষ্ঠির বিলাপ করতে করতে নকুলকে বললেন, মাদ্রীনন্দন, তুমি গিয়ে দ্রৌপদীকে এখানে নিয়ে এসো।
নকুল গিয়ে দ্রৌপদী ও তার মা পাঞ্চাল মহিষীকে নিয়ে এলেন। দ্রৌপদী এসে দেখলেন সেই মৃত্যুপুরীতে শয়ন শিবিরে সারি সারি তাঁর নিহত পাঁচ পুত্রের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ। দ্রৌপদী সেই দৃশ্য দেখে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে রইলেন। বৃকোদর দ্রৌপদীকে ধীরে ধীরে মাটি থেকে তুললেন।
দ্রৌপদী নারীজীবনের যতরকম দুঃখ আছে সব দুঃখই ভোগ করেছেন। একাধিকবার নির্যাতিতা হয়েছেন। স্বামী তাঁকে বিনিময়যোগ্য পণ্য বলে গণ্য করেছেন। রাজকন্যা হয়ে জন্মগ্রহণ করে, দেশের সমস্ত মহাবীরদের দ্বারা আরাধ্য হয়েও কপর্দকশূন্য স্বামীর পর্ণকুটিরে নিজের দেহকে পঞ্চস্বামীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েও কোনোদিন সীতার মতো ধরিত্রীর নিচে পাতাললোকে আশ্রয় মাগেননি। বনবাসের চরম দুঃখ সহ্য করেছেন। সেখানেও জয়দ্রথের হাতে বন্দিনী হয়েছেন। কীচকের হাতে শ্লীলতাহানি ঘটেছে। দ্রৌপদী এক সর্বংসহা নারী শেষ পর্যন্ত তাঁর পুত্রদের মধ্যে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন। তাঁর সপত্নীপুত্র, আদরের অভিমন্যুর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তাঁর পঞ্চপুত্র এই সর্বগ্রাসী যুদ্ধেও অক্ষত ছিল। দ্রৌপদীর বিশ্বাস কৃষ্ণ তাঁকে যেমন দ্যূতসভায় বস্ত্রহরণ থেকে বাঁচিয়েছিলেন, তেমনই তাঁর পঞ্চপুত্রকে যুদ্ধে মৃত্যু থেকে রক্ষা করবেন। গতকাল সারাদিন তিনি পুত্রদের সঙ্গে কাটিয়েছেন। তারা মাকে বলেছিল, মা, যুদ্ধের জন্য অষ্টাদশ দিবস ধরে রাত্রে ভালো করে ঘুমোতে পারিনি। আজ আমরা পরম সুখে নিদ্রা যাব। দ্রৌপদীকে প্রণাম করে তারা বিদায় নিয়েছিল।
যুধিষ্ঠির বলছেন তারা কেউ সতর্ক ছিলেন না। দ্বাররক্ষীরাও নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়েছিল। আততায়ীরা বিনা বাধায় ঢুকে পড়ে। কিন্তু তাদেরই বা দোষ কী। শত্রুদের কেউই তো জীবিত ছিল না। মাত্র তিনজন জীবিত, তারাও তো পলাতক। কোনো বীর সেনাপতি যে রাত্রিতে নিদ্রিত ব্যক্তিদের হত্যা করতে পারে এ তো ধর্মবিরুদ্ধ, প্রথাবিরুদ্ধ, সম্পূর্ণ অশ্রুত। তাই পুত্রদের ও রক্ষীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। প্রবল যুদ্ধে তারা বিধ্বস্ত-ক্লান্ত হয়ে নিদ্রা যেতেই পারে। কিন্তু ব্রাহ্মণপুত্র অশ্বত্থামা ও কৃপাচার্য যে এই গর্হিত ঘৃণ্য কাজ করতে পারে তা তো অভাবনীয়।
সেই মৃত্যু শিবিরে আচ্ছন্নের মতো প্রায়োপবেশনে বসেছিলেন পুত্র শোকাতুরা মধ্যবয়সি এক নারী। জীবন সংগ্রামের উত্তাল তরঙ্গে তিনি ভেসে যাননি, তলিয়ে যাননি। অচঞ্চল পর্বতের মতো দ্বাদশ বর্ষ বনবাস ও এক বৎসর অজ্ঞাতবাসের অগ্নিপরীক্ষা অতিক্রম করে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বীভৎসতা নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন। সেই যুদ্ধে বৃকোদর দুঃশাসনের রক্ত পান করেছিল। রক্ত হাতে করে নিয়ে এসে দ্রৌপদীর মুক্তকেশে লাগিয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘ চতুর্দশ বর্ষ পরে দ্রৌপদী আবার আলুলায়িত কেশ মার্জনা করে খোঁপা বেঁধেছেন। অলকে কুসুম দিয়েছেন। সেই খোপা আজ আবার আলুলায়িত হয়ে গেছে।
যুধিষ্ঠির বললেন, পাঞ্চালী, তুমি ধর্মের মর্ম অবগত আছ। তোমার পুত্র ও ভ্রাতারা সবাই ধর্মযুদ্ধে নিহত হয়েছে। তাদের জন্য আর অনুতাপ কোরো না। দ্রোণপুত্র মনে হচ্ছে কোনো দুর্গম অরণ্যে পালিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমরা তাঁকে খুঁজে বার করব। বাসুদেব গতকাল হস্তিনাপুর গিয়েছেন গান্ধারীর সঙ্গে দেখা করতে। মনে হয় তিনি আজই ফিরবেন। তিনি এলে তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেবই।
দ্রৌপদী বললেন, মহারাজ, শুনেছি দ্রোণপুত্রের কপালে একটি শত্রুনাশক মণি আছে?
—হ্যাঁ, এই মণি নিয়েই সে মহাদেবের বরে জন্মগ্রহণ করে। আচার্যদেব পুত্রকামনায় মহাদেবের উদ্দেশে দীর্ঘ তপস্যা করেছিলেন। ওই মণিটিকে বলা হয় ‘সহজ মণি’ অর্থাৎ শত্রুনাশক মণি। ওই মণির প্রভাবে অশ্বত্থামাকে কেউ পরাস্ত করতে পারে না।
দ্রৌপদী তখন কঠিন কঠোর দৃষ্টি হেনে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, ওই ‘সহজ মণি’-টি আমি চাই। ওই পাপাত্মাকে পরাজিত করে যদি ওই মণিটি আমায় এনে দিতে পারেন, ওটি আমি মস্তকে ধারণ করে আমার এই দুঃখ শোকতপ্ত জীবনে বাঁচার কিছুটা শক্তি অর্জন করতে পারি।
চারুদর্শনা যাজ্ঞসেনী ধর্মরাজকে এই কথা বলে ভীমসেনকে বললেন, হে নাথ, ক্ষাত্রধর্ম স্মরণ করে আমাকে পরিত্রাণ করা তোমার কর্তব্য। সুররাজ ইন্দ্র যেমন দৈত্য শম্বরকে নিহত করেছিলেন, তেমনি তুমি অশ্বত্থামাকে নিহত করো। এ পৃথিবীতে তোমার মতো বীর আর কে আছে? তুমি বারণাবত নগরে বিপন্ন পাণ্ডবদের একমাত্র আশ্রয় ছিলে। হিড়িম্ব রাক্ষসের হাত থেকে তোমার ভাই ও মাকে উদ্ধার করেছিলে। দুরাত্মা কীচকের হাত থেকে আমাকে তুমিই বাঁচিয়েছ। এইভাবে তুমি দুরাত্মা অশ্বত্থামাকেও সংহার করো।
ভীম দ্রৌপদীকে কথা দিলেন। পাঞ্চালীকে স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করলেন, হে প্রিয়ে, আমি সর্বদা তোমার দুঃখ মোচনের চেষ্টা করেছি। এই মুহূর্তে প্রতিজ্ঞা করছি আমি, আমি এখনই সেই দুরাত্মার সন্ধানে পাপিষ্ঠ অশ্বত্থামাকে হত্যা করব। এখনই যাত্রা করছি। এই বলে ভীম হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন।
তাঁরা যখন কথা বলছিলেন মহাশ্মশানে পরিণত সেই পাণ্ডব শিবিরে বসে, এমন সময় কে এসে খবর দিল বাসুদেব এসে গেছেন।
রাত্রি জাগরণের ক্লান্তি নিয়ে কৃষ্ণ হস্তিনাপুর থেকে কুরুক্ষেত্রে পৌঁছে শুনলেন গতকাল রাতে পাণ্ডব শিবিরে গণহত্যা ঘটে গেছে। পাণ্ডবেরা এখন সেখানে।
কৃষ্ণ এই আশঙ্কাই করছিলেন। তিনি দ্রুত পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশ করলেন। দেখলেন, ভীম হন্তদন্ত হয়ে তাঁর রথ নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। কৃষ্ণকে আসতে দেখে যুধিষ্ঠির এগিয়ে এসে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন। বললেন, বাসুদেব, আপনি নেই। এক রাতের মধ্যে কী সর্বনাশ হয়ে গেছে দেখুন। অশ্বত্থামা তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিয়েছে। অসংখ্য মানুষকে নিদ্রিত অবস্থায় হত্যা করেছে। কেউ জীবিত নেই।
কৃষ্ণ বিচলিত না হয়ে বললেন, আমি এইরকম কিছু একটা আশঙ্কা করছিলাম। আমি রাতেই হস্তিনাপুর থেকে রওয়ানা দিয়েছি। কিন্তু পথে আমার রথচক্র বিকল হয়ে যায়। তাই আসতে সকাল হয়ে গেল। ধর্মরাজ, কালের গতি বড় কুটিল। মনে করুন এটিও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির একটি অংশ। আপনারা পাঁচ ভ্রাতা জীবিত আছেন। ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হতে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না। মহারাজ, কোনো যুদ্ধই শুধু সহস্র সহস্র শহিদের রক্তের বিনিময়ে জেতা যায় না। ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠাও এক বিরাট সংগ্রাম। আপনি ভাগ্যবান যে মাত্র অষ্টাদশ দিবসের মধ্যে তা সমাপ্ত হয়েছে। এ যুদ্ধ শতবর্ষ ধরেও চলতে পারত। ভবিষ্যতে হয়তো চলবেও। আপনি পুত্রদের জন্য দুঃখ করবেন না। তাদের কাল হয়তো উত্তীর্ণ হয়েছে। মহারাজ, মহাকালই এই বিশ্বলোকের বিধাতা। তিনি প্রত্যেকের জীবনের আয়ু নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। সেই সময় উত্তীর্ণ হলে কেউ তাকে রাখতে পারবে না। কত শিশুর অকাল মৃত্যু হচ্ছে। যেমন অভিমন্যু তো অকালেই নিধন হল। কিন্তু আপনারা পঞ্চ ভ্রাতা এখন যৌবন অতিক্রম করে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেছেন। আপনারা জীবিত আছেন। এই দেখুন না, আমিও তো বৃদ্ধ হতে চললাম। কিন্তু আমি জীবিত। ধৃতরাষ্ট্রকে দেখে এলাম, তিনি শতবর্ষ অতিক্রম করেছেন। তাঁকে শতপুত্রের মৃত্যুশোক সহ্য করতে হচ্ছে। যুধিষ্ঠির বললেন, আমরা বংশহীন হয়ে পড়লাম বাসুদেব। এ রাজত্ব আমাদের পরে ভোগ করার কেউ থাকল না।
বাসুদেব বললেন, অর্জুনের পুত্রবধূ অভিমন্যুবধূ উত্তরা এখন অন্তঃসত্ত্বা। তার পুত্রই ভারতেশ্বর হবে। কিন্তু আসার সময় দেখলাম বৃকোদর কোথায় রথ নিয়ে দ্রুতবেগে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলেন। কোথায় গেলেন তিনি?
যুধিষ্ঠির বললেন, বৃকোদর কঠোর প্রতিজ্ঞা পালনে পটু। সে অশ্বত্থামাকে নিধন করতে গেছে।
বাসুদেব শুনে চমকে উঠলেন। এ কি হঠকারিতা করলেন মহারাজ? আপনি ওকে যেতে দিলেন? কেন নিবৃত্ত করলেন না?
যুধিষ্ঠির বললেন, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না বাসুদেব। ভীমসেন পারে না এমন কোনো কাজ নেই। দ্রৌপদী ওকে আদেশ করেছে অশ্বত্থামাকে হত করে তার মস্তকের সহজ নণিটি এনে সে দ্রৌপদীকে উপহার দেবে। এতে তার পুত্রশোকের কিছুটা লাঘব হবে।
কৃষ্ণ মনে মনে ভাবলেন, এই হল নারী। প্রবল শোকের মধ্যেও তার অলংকার বাসনা গেল না। সে অশ্বত্থামার মস্তকের বিখ্যাত মণিটি চায়, মণি পেলেই সে পুত্রশোক ভুলে যাবে।
কৃষ্ণ মনের ভাব চেপে রেখে যুধিষ্ঠিরকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, কিন্তু আপনি জানেন মহারাজ, অশ্বত্থামার কাছে কালান্তক ‘ব্রহ্মশির’ অস্ত্র আছে। তা প্রয়োগ করলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কোনো কৌশল না করে সরাসরি তার সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলে সে এই অস্ত্র প্রয়োগ করে ভীমসেনকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে। আপনারা অশ্বত্থামাকে কিছুই নিবৃত্ত করতে পারবেন না। সে মহাদেবের বরে চিরঞ্জীবী। অর্জুনকে শীঘ্র ডাকুন। আমরা সবাই মিলে গিয়ে ভীমসেনকে নিবৃত্ত করি।
যুধিষ্ঠির সবাইকে ডাকলেন। পাণ্ডবদের চার ভ্রাতাই দ্রুত চলে এলেন।
কৃষ্ণ বললেন, এখনই রথ প্রস্তুত করে চলো। বৃকোদরকে নিবৃত্ত করতে হবে। নইলে সমূহ বিপদ। তোমরা ভীমসেনকে ফিরিয়ে আনো। আর অর্জুন, তোমার কাছে যে দিব্যাস্ত্র আছে তা নিয়ে চলো, আমরা বৃকোদরের সন্ধানে যাই। তারপর অশ্বত্থামার সন্ধান করব।
কিছুক্ষণের মধ্যে যুধিষ্ঠির ও অর্জুন কৃষ্ণের গরুঢ়ধ্বজ রথে আরোহণ করে রওয়ানা হলেন। বাসুদেবের দুপাশে দুজন বসলেন। কৃষ্ণ নিজেই সেই রথ চালিয়ে বিপুল বেগে ছুটতে লাগলেন। পাখিরা আকাশে দলবেঁধে ওড়ার সময় যেমন ডানা ঝটপট করে শব্দ তোলে, শ্রীকৃষ্ণের রথের অশ্বখুর থেকে তেমনি ঘোরতর শব্দ বার হতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁরা ভীমকে ধরে ফেললেন।
কৃষ্ণ অনেক করে বুঝিয়ে ভীমকে নিবারণ করতে চাইলেন। কিন্তু কিছুতেই কৃতকার্য হতে পারলেন না। মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন কৃষ্ণের সমস্ত অনুরোধ উপেক্ষা করে ভাগীরথী তীরে উপস্থিত হয়ে দেখলেন সেখানে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন অবস্থান করছেন। আর তাঁর সামনে ক্ষৌমবসন পরে বসে আছেন অশ্বত্থামা।
অশ্বত্থামাকে দেখে ভীম হাতে শরাসন তুলে নিয়ে ‘থাক থাক’ বলে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে আছেন। অশ্বত্থামা দেখলেন কালান্তক যমের মতো এগিয়ে আসছেন ভীমসেন। পিছনে স্বয়ং বাসুসেব। সঙ্গে যুধিষ্ঠির ও অর্জুন।
অশ্বত্থামা উপায়ান্তর না দেখে তাঁর ব্রহ্মশির অস্ত্র ধনুকে যোজনা করলেন। তারপর ‘পাণ্ডব বংশ ধ্বংস হোক’ এই কথা উচ্চারণ করে ব্রহ্মশির অস্ত্র ছুড়লেন।
সেই অস্ত্র যেন ত্রিভুবন ধ্বংস করার জন্য ছুটে চলল। সেই অস্ত্র থেকে নির্গত হচ্ছে অগ্নি। তা সমস্ত সৃষ্টিকে ধ্বংস করার জন্য উদ্যত। আসন্ন প্রলয়ের অপেক্ষা করছে পৃথিবী।
কৃষ্ণ সঙ্গে সঙ্গে অর্জুনকে বললেন, সখে, তোমার কাছে দ্রোণের দেওয়া যে দিব্যাস্ত্র আছে, সেই ব্রহ্মশির অস্ত্র দিয়ে তুমি অশ্বত্থামার ব্রহ্মশির অস্ত্র নিবারণ করো।
অর্জুন যে অস্ত্র কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও প্রয়োগ করেননি সেই মারাত্মক দিব্যাস্ত্র ছুড়লেন। মন্ত্রোচ্চারণ করলেন, ‘হে দিব্যাস্ত্র, তুমি অশ্বত্থামার ব্রহ্মশিরকে প্রতিহত করো।’
তখন দুই অস্ত্রের সংঘর্ষে আকাশপথে যেন সহস্র সূর্যের জ্যোতি বিস্তার ঘটল। আকাশ থেকে সহস্র সহস্র উল্কা ঝরে পড়তে লাগল। সমুদয় জীবজন্তু ভয়ে কাঁপতে লাগল। তেজোমণ্ডল মণ্ডিত দুই অস্ত্র সহসা যুগান্তকালীন অগ্নির মতো দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। গিরিকানন ও সসাধরা ধরিত্রী ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল।
মহাবীর ধনঞ্জয় কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের উদ্দেশে বললেন, মহর্ষি, আমি অশ্বত্থামার অস্ত্র প্রতিহত করার জন্যই দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছি। আমার এই দিব্যাস্ত্র ইন্দ্ৰ ও প্রতিসংহার করতে পারবেন না। এই দিব্যাস্ত্র ব্রহ্মতেজ দ্বারা বিনির্মিত। ব্রহ্মচারী ভিন্ন অন্য ব্যক্তি প্রয়োগ করলে একে প্রতিহত করা যায় না। ব্রহ্মচর্যহীন ব্যক্তি এটি প্রয়োগ করলে উলটে তারই মুণ্ড কাটা যায়। আমি আমার দিব্যাস্ত্র ফিরিয়ে নিচ্ছি। অশ্বত্থামা যাতে তার অস্ত্র প্রতিসংহার করে তার জন্য চেষ্টা করুন।
কিন্তু অশ্বত্থামা কিছুতেই তাঁর ব্রহ্মশির অস্ত্র ফিরিয়ে নিতে পারলেন না। তখন তিনি বিষণ্ণ হয়ে দ্বৈপায়নকে বললেন, মুনিবর, আমি ভীমসেনকে দেখে ভয় পেয়ে এই অস্ত্র প্রয়োগ করে ফেলেছি। ভীমসেন অন্যায়ভাবে দুর্যোধনকে পরাজিত করেছে। তাই আমি এই পৃথিবী পাণ্ডবশূন্য করার জন্য এই অস্ত্র প্রয়োগ করেছি। কিন্তু এখন আর এটি ফিরিয়ে নিতে পারছি না। এই অস্ত্র পাণ্ডবদের বিনাশ করবেই।
বেদব্যাস অশ্বত্থামাকে বললেন, অর্জুন কিন্তু তোমার ব্রহ্মশির অস্ত্রের প্রতিক্রিয়ার কথা জানেন। কিন্তু তিনি তোমার বিনাশের জন্য তাঁর দিব্যাস্ত্র এখনও প্রয়োগ করেননি। শুধু তোমার অস্ত্র প্রতিরোধ করার জন্যই অন্য অস্ত্র প্রয়োগ করেছেন। মহাবীর অর্জুন ধৈর্যশীল, সাধু ও সর্বশাস্ত্র বিশারদ। তুমি কী জন্য তাকে ও তার ভাইদের বিনাশ করতে চাইছ? যে রাজ্যে দিব্যাস্ত্র দ্বারা ব্রহ্মাণ্ড নিরাকৃত হয় সে রাজ্যে বারো বৎসর ধরে অনাবৃষ্টি চলে। এই জন্য মহাবীর অর্জুন ক্ষমতাসম্পন্ন হয়েও প্রজাদের হিতের জন্য তাঁর দিব্যাস্ত্র ফিরিয়ে নিয়েছেন। দ্রোণতনয়, পাণ্ডবদের রাজ্য রক্ষা করা তোমার কর্তব্য। অতএব তুমি অবিলম্বে তোমার ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রত্যাহার করো। ক্রোধ ত্যাগ করো। পাণ্ডবরা নিরাপদ হোক। রাজর্ষি যুধিষ্ঠির অধর্মের পথে রাজ্যলাভ করতে চান না। তুমি পাণ্ডবদের তোমার মস্তকের মণিটি দিয়ে দাও। সেই মণির বদলে তাঁরা তোমায় প্রাণ দান করবেন।
অশ্বত্থামা মণি ত্যাগের কথায় ভীষণভাবে বিচলিত হয়ে উঠলেন। বললেন, মহর্ষি, পাণ্ডব ও কৌরবদের সমস্ত ধনরত্ন একত্র করলে যে দাম হবে তার চেয়ে এই মণির দাম অনেক বেশি। এই মণি ধারণ করলে অস্ত্রভয়, ব্যাধিভয়, ক্ষুধা তিরোহিত হয়ে যায়। দানব, রাক্ষস, তস্কর থেকে শঙ্কা থাকে না। এই মণি আমি কিছুতেই দিতে পারব না। এখন আপনি আপনার যা ইচ্ছা হয় করুন। তবে আপনি যা বলছেন তাও আমার মেনে চলা সর্বতোভাবে কর্তব্য। আপনি যদি বলেন তাহলে আমার অস্ত্র গিয়ে পড়বে পাণ্ডব বধূর গর্ভস্থ সন্তানের ওপর। আমার নিক্ষিপ্ত অস্ত্র প্রতিনিবৃত্ত করার ক্ষমতা আমার নেই।
তখন বেদব্যাস বললেন, তবে তাই হোক। পাণ্ডবদের কামিনীর গর্ভের ওপরেই তোমার অস্ত্র গিয়ে পড়ুক।
অশ্বত্থামা তাঁর অস্ত্রকে নির্দেশ দিলেন, যাও পাণ্ডব রমণীদের কারও গর্ভে সন্তান থাকলে তার গর্ভপাত করে এসো।
কৃষ্ণ দিব্যচক্ষে দেখতে পেলেন অশ্বত্থামার ব্রহ্মশির অস্ত্র গর্ভিনী পাণ্ডববধূ উত্তরার গর্ভ লক্ষ্য করে ছুটে যাচ্ছে।
কৃষ্ণ তখন বললেন, অশ্বত্থামা, তুমি যা চাইছ তা হবে না। পাণ্ডবদের পরীক্ষিৎ নামে একটি পুত্র হবার কথা। এটি একজন ব্রাহ্মণ অভিমন্যুর বধূ উত্তরাকে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ‘রাজকুমারি, কৌরববংশ ধ্বংস হবার মুখে তোমার গর্ভে এক পুত্র জন্মগ্রহণ করবে। তার নাম হবে পরীক্ষিৎ।’ সেই সাধু ব্রাহ্মণ যা বলে গিয়েছেন তা অন্যথা হবার নয়। নিশ্চিত পাণ্ডবদের পরীক্ষিৎ নামে এক বংশধর জন্মাবে।
তখন অশ্বত্থামা খুব রাগত স্বরে বললেন, কেশব, তুমি পাণ্ডবদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। তুমি যা বললে তা সফল হবে না। আমি যা চাইছি তাই হবে। আমার অস্ত্র অচিরেই উত্তরার গর্ভে গিয়ে পড়ে তার গর্ভপাত ঘটাবে।
বাসুদেব বললেন, দ্রোণতনয়, তোমার বিষ অস্ত্র যে কখনও ব্যর্থ হবে না এটি সত্যি। কিন্তু সেই গর্ভস্থ বালক পুনরায় জীবিত হবে। সে সুদীর্ঘকাল বসুন্ধরা শাসন করবে।
তারপর অশ্বত্থামার দিকে তাকিয়ে বললেন, হে দ্রোণপুত্র, মনীষীরা তোমাকে পাপপরায়ণ ও কাপুরুষ বলে জানেন। তুমি শিশুঘাতী। এ কারণেই তোমাকে ফলভোগ করতে হবে। তুমি অসহায় হয়ে মৌনভাবে তিন হাজার বছর ধরে শুধু নানা দেশ ঘুরে ঘুরে বেড়াবে। কখনও লোকালয়ে অবস্থান করতে পারবে না। তোমাকে সর্বপ্রকার ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে হয়ে পুরীষরক্ত দুর্গন্ধে পরিব্যাপ্ত হয়ে দুর্গম অরণ্যের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে হবে।
ব্যাসদেব বললেন, হে দ্রোণপুত্র, তুমি আমাদের নিষেধ না শুনে এই নিদারুণ কাজ করলে। উত্তরার গর্ভকে নষ্ট করলে। তুমি ব্রাহ্মণ হয়ে ব্রাহ্মণের ধর্ম ক্ষমাকে মান্যতা দিলে না। ক্ষত্রিয়ধর্ম অবলম্বন করে কুকর্ম করলে তোমাকে এর ফল ভোগ করতেই হবে।
অশ্বত্থামা নীরবে ব্যাসের সমস্ত কথা শুনলেন। কানে বাজতে লাগল কৃষ্ণের অভিশাপ, তিন হাজার বছর ধরে ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে তাকে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে হবে। পরক্ষণেই তাঁর মনে হল তিনি তাঁর প্রতিজ্ঞা পালন করেছেন। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিয়েছেন। কৃষ্ণ যাই বলুন, ভারতকে তিনি নিষ্পাণ্ডব করেছেন। তাঁর কাজ শেষ। এখন তাঁর অরণ্যে যেতে আর কোনো আপত্তি নেই। তিনি কোনো কথা না বলে মস্তকের সহজ মণিটি খুলে ব্যাসদেবের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, মহর্ষি, বাসুদেবের অভিশাপ আমি মাথা পেতে নিলাম। আজ আমার চেয়ে বড় সুখী কেউ নেই। কারণ আমার প্রতিজ্ঞা আমি পালন করেছি। আমার পিতার হত্যাকারীদের হত্যা করেছি। তাদের নির্বংশ করে ছেড়েছি। আমার সর্বস্ব দিয়েও আমার প্রতিজ্ঞা পালন করেছি।
অশ্বত্থামা তারপর কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, হে কেশব, আপনি চিরকালই পাণ্ডবদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। তাই তাদের অন্যায় আপনার সর্বদা চোখ এড়িয়ে যায়। সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলে ছলনা করে যারা আমার ধর্মশীল সত্যনিষ্ঠ পিতাকে হত্যা করেছিল, আপনিই তাদের প্ররোচিত করেছেন। আপনি অধর্মের পথ নিয়েছেন। আমিও আপনাকে অভিশাপ দিচ্ছি, আপনি কোনোদিন পুত্রসুখ পাবেন না। বরং পুত্র থেকে চরম দুঃখই পাবেন। আর আপনার অভিশাপকে আমি ভয় করি না। মহাদেবের বরে আমি চিরঞ্জীবী। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেওয়াতে পিতার আশীর্বাদ আমার প্রতি বর্ষিত হচ্ছে। সেই আশীর্বাদের জোরে আমি সব কিছু বিপর্যয় কাটিয়ে উঠব। আর আমার এই সন্ত্রাসবাদী যুদ্ধ কৌশল একদিন এই ভারতে মুক্তির উপায় বলে মান্যতা পাবে।
কৃষ্ণ বললেন, হে নির্বোধ, পরীক্ষিৎ তোমার সামনেই পৃথিবীর অধিপতি হয়ে রাজ্যশাসন করবে। তুমি তাকে অস্ত্রবলে দগ্ধ করলেও আমি তাঁকে আবার বাঁচিয়ে তুলব। তুমি আমার তপস্যা ও সত্যের পরাক্রম দর্শন করো।
ব্যাসদেব অশ্বত্থামাকে বললেন, তুমি আমাদের অগ্রাহ্য করে গর্ভস্থ শিশু হত্যার মতো নিদারুণ কাজ করলে। ব্রাহ্মণ হয়েও তুমি ক্ষত্রিয়ধর্ম গ্রহণ করে কুকর্মে প্রবৃত্ত হলে। এখন বাসুদেব যা বললেন, তা তোমাকে অবশ্যই ভোগ করতে হবে।
ব্যাসদেব এর পর বললেন, তোমার সন্ত্রাসবাদী ভাবনা কোনোদিনই ভারতে মান্যতা পাবে না। কিছু মানুষকে তা ভ্রান্তপথে চালিত করতে পারলেও, কিছু স্বার্থান্বেষীর প্রশংসা লাভ করলেও দেশের জনগণ সন্ত্রাসবাদকে ঘৃণা করবে। হে পামর, শুধু প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করে, নিরীহ নিরস্ত্র বিপন্ন কিছু মানুষকে তার অসতর্ক মুহূর্তে হত্যা করা কখনই বীরের কাজ নয়। তা কাপুরুষের ধর্ম। কাপুরুষেরাই কাপুরুষদের জয়গান গেয়ে থাকে। ইতিহাস সব সময় ধর্মজ্ঞদের চিরজীবী করে রাখে। প্রেম, অহিংসা ও সন্জীবন যাপনই সুখী থাকার একমাত্র উপায়। তুমি কিন্তু চিরকাল জীবিত থাকলেও মানুষের চোখে মৃত থাকবে।
চিরজীবন শুধু নয়, দীর্ঘজীবনও মানুষের অভিশাপ। মানুষ যতদিন বাঁচবে সুখের জন্য বাঁচবে। জীবন মূল্য আয়ুতে নয় কল্যাণপ্লুত কর্মে। মানুষের কল্যাণে নয়, মানুষকে ধ্বংসের জন্য যদি তোমার আয়ুকে ব্যয় করো, তাহলে প্রকৃতিই তার প্রতিশোধ নেবে। অশ্বত্থামা, তুমি একজন মহান মানুষের সন্তান। নিজেও যেমন শস্ত্রজীবী, তেমনি বুদ্ধিজীবীও। কিন্তু তোমার সব বুদ্ধি নেতিবাচক। তোমার চিন্তাভাবনা সমাজের পক্ষে শুধু বিপজ্জনক নয়, তোমার পক্ষেও বিপজ্জনক। কৃষ্ণের পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাও। প্রতিজ্ঞা করো তোমার সমস্ত ভাবনা ইতিবাচক হবে। তা মানুষের ভালোবাসার জন্য ব্যয় হবে, মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়।
অশ্বত্থামা নীরবে শুনছেন। ব্যাসদেব আবার বললেন, দ্রোণপুত্র, বাসুদেব হৃদয়বান, দয়ালু। তিনি তোমাকে ক্ষমা করবেন। অভিশাপ তুলে নিয়ে আশীর্বাদ করবেন। মহাভারতের ধর্ম হিংসা নয়। কুরুক্ষেত্রের এই বিধ্বংসী যুদ্ধ শেষ যুদ্ধ হোক। এ যুদ্ধ ছিল শান্তির জন্য যুদ্ধ। শান্তি আসুক, ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হোক। দুষ্কৃতীদের চিরবিনাশ ঘটুক। আর যুদ্ধের প্রয়োজন হবে না। অশ্বত্থামা, বাসুদেবের কাছে তুমি নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করো।
অশ্বত্থামা অকম্পিত স্বরে বললেন, আমি যা করেছি তার জন্য বিন্দুমাত্র দুঃখিত নই মহর্ষি। আমি আমার পিতার তৃপ্তির জন্যই ব্রহ্মশির অস্ত্র ছুড়েছি। পাণ্ডববংশ নির্বংশ করাই আমার লক্ষ্য। কেশব যদি পক্ষপাতিত্ব করে অগ্রাধীদের পক্ষে দাঁড়ায় আমি আর কী করতে পারি। তবে আমি এইটুকু বলতে পারি যে, মহাকাল বা নির্ধারণ করবেন তাই হবে। কপট অহিংসা জয়লাভ করবে, না বাহুবল জয়ী হবে তা মহাকালই স্থির করবে। আমি সবার অলক্ষে তা অন্তরাল থেকে দেখব কার শক্তি বেশি—অহিংসার না সন্ত্রাসী হিংসার? যার বলে কয়েকজন সাহসী মানুষ লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। আমি শুধু আপনাকে অনুরোধ করব। আপনার তপোবনে আমায় আশ্রয় দিন। আমি কথা দিচ্ছি আমি আর নিজে কোনো হিংসামূলক কাজে অংশ নেব না। কিন্তু আমি কৃষ্ণের দয়া ভিক্ষা করতে পারব না।
ব্যাস বললেন, বেশ তাই হবে। তবে তোমায় তোমার মাথার মণি বাসুদেবকে দিয়ে রিক্ত হতে হবে। একমাত্র সর্বত্যাগী ভিন্ন আমার আশ্রমে আমি কাউকে রাখতে পারি না।
অশ্বত্থামা কথা না বলে তাঁর মাথার মণি পাণ্ডবদের হাতে তুলে দিলেন। ব্যাসদেব অশ্বত্থামাকে বললেন, কুরুক্ষেত্র থেকে আরও উত্তরে অরণ্যমধ্যে আমার একটি তপোবন বিদ্যাপীঠ আছে। তুমি সেখানে যাত্রা করো। সেখানে গিয়ে মহাচার্য সোমকের কাছে গিয়ে বলো আমি তোমায় পাঠিয়েছি।
পাণ্ডবেরা সহজ মণি নিয়ে বায়ুবেগগামী অশ্বরথে অতি দ্রুত দ্রৌপদীর উদ্দেশে রওয়ানা হলেন।
.
বৃকোদর তাঁর প্রতিশ্রুতি মতো দ্রৌপদীর হাতে মণিটি তুলে দিয়ে বললেন, প্রিয়ে, তুমি যা চেয়েছিলে তা এনে দিলাম। এখন তুমি শয্যা ছেড়ে ওঠো। শোক পরিত্যাগ করো। ধর্মরাজ যখন সন্ধি স্থাপনের প্রস্তাব দিয়ে বাসুদেবকে দুর্যোধনের কাছে পাঠিয়েছিলেন, তুমি কৃষ্ণকে বলেছিলে, ‘হে মধুসূদন, ধর্মরাজ এখন শান্তি স্থাপন করতে ইচ্ছুক। আমার প্রতি অন্যায়ের আর প্রতিশোধের কথা উচ্চারণ করছেন না। এখন মনে হচ্ছে আমার পতি, পুত্র, ভ্রাতা কেউ নেই। তুমিও বিনষ্ট হয়ে গিয়েছ, তাই এই সন্ধি প্রস্তাব নিয়ে দুর্যোধনের কাছে যাচ্ছ।’ তুমি সে সময় যেসব কঠোর বাক্য বলেছিলে তা একবার স্মরণ করো। তুমি বলেছিলে, আমি দুর্যোধনের বিনাশ সাধন করেছি। দুঃশাসনের শোণিত পান করেছি। এখন আমাদের বিষানল নির্বাপিত হয়ে গিয়েছে। এখন আর কেউ আমাদের নিন্দা করতে পারবে না। আমি অশ্বত্থামাকে পরাজিত করেও ব্রাহ্মণ ও গুরুপুত্র বলে তাকে ছেড়ে দিয়েছি। তার সমস্ত সুনাম আজ ধরায় লুণ্ঠিত হয়েছে। এ সব করেছি তোমার জন্য।
দ্রৌপদী শয়ন ছেড়ে উঠে বসলেন। ভীমের কথার প্রত্যুত্তরে বললেন, নাথ, আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হল। দেখো, গুরুপুত্র আমারও গুরু। অতএব তিনি যে মণি ধারণ করতেন, আমি চাই ধর্মপুত্র স্বয়ং সেটি তাঁর মস্তকে ধারণ করুন।
দ্রৌপদীর অনুরোধে ধর্মরাজ সেই মণি তাঁর মস্তকে ধারণ করলেন। সেই মণি ধর্মরাজের মস্তকে চন্দ্রমণ্ডল শোভিত পর্বতের মতো শোভা পেতে লাগল। তাই দেখে পুত্রশোকাতুরা দ্রৌপদী আবার উঠে দাঁড়ালেন।
কিন্তু মণিশোভিত যুধিষ্ঠির কিছুতেই পুত্রশোক ভুলতে পারছিলেন না। তিনি বাসুদেবকে বারবার জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, নরাধম অশ্বত্থামা কীভাবে আমার পুত্রদের বিনাশ করল? যে মহাবীর দ্রুপদনন্দন লক্ষবীরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারত। তিনি কীভাবে একক অশ্বত্থামার হাতে নিহত হলেন?
বাসুদেব বললেন, মহারাজ, দ্রোণপুত্র নিশ্চই দেবাদিদেব মহাদেবের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তাঁরই অনুগ্রহে তিনি একাকী সমুদয় বীরদের নিপাতিত করতে পেরেছেন। মহারাজ, রুদ্র প্রসন্ন হলে বল-বীর্য তো দূরের কথা অমরত্বও প্রদান করতে পারেন।
যুধিষ্ঠিরের চিত্ত প্রসন্ন হল না, তিনি ভাবতে লাগলেন দেবাদিদেব মহাদেব এত বিচার শূন্য কী করে হল? নৃশংস অধর্মচারীকে তিনি কী ভাবে সমর্থন করেন? দেবতা যদি ধর্মকে রক্ষা না করে অধার্মিকের স্তুতিতে ভূলে এক বড় গণহত্যা ঘটাতে সাহায্য করেন তাহলে তো দেবমহিমা বোঝা দুঃসাধ্য। পরক্ষণেই ভাবলেন, ধর্ম কৃপা করেন না কৃপাপাত্রকে। শ্রেয়কে বরং দুর্মূল্য করে তোলেন। এটি ধর্মের কঠিন কঠোর পরীক্ষা। ধৈর্যের পরীক্ষা, ত্যাগের পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তিনি জয়ী হয়ে এসেছেন। এবারও হবেন।
