নিষাদ পল্লিতে একদিন
অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা দ্বৈপায়ন থেকে বেরিয়ে কোথায় যাবেন ঠিক করতে পারছিলেন না। দুর্যোধনকে একা ফেলে রেখে কোথাও যেতে মন চাইছিল না। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হবার পর এই সমগ্র এলাকাটি তাদের কাছে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। পাণ্ডবদের চরেরা তাদের সন্ধানে চারিদিক ছড়িয়ে পড়েছে। যে কোনও মুহূর্তে তারা বন্দি হতে পারেন। বন্দি হলে অশ্বত্থামা ও কৃপাচার্য ব্রাহ্মণ বলে হয়তো মৃত্যুদণ্ড পাবেন না। কিন্তু কৃতবর্মাকে হয়তো মৃত্যুদণ্ড দেবে। অথবা কৃষ্ণের প্রভাবে কৃতবর্মা ক্ষমাও পেতে পারেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হল, তাঁরা ধরা পড়লে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে না।
দ্বৈপায়ন হ্রদের সন্নিহিত অরণ্যে প্রমোদ বিহারে ও মৃগয়ায় অভিজাতরা এখানে প্রায়ই আসেন বলে রথ চলার রাস্তা তৈরি আছে অরণ্য চিরে। কিন্তু অশ্বত্থামা আর ওই রাস্তা ধরলেন না। তাঁরা অশ্ব নিয়ে আরও গভীর বনের ভেতর প্রবেশ করলেন। বনে ঘুরতে ঘুরতে পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। এর মধ্যে কখন অপরাহ্ণ হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ক্ষুধায় তাঁরা তিনজনই অবসন্ন হয়ে পড়েছেন। অশ্বরা অবশ্য দ্বৈপায়নে প্রচুর ঘাস খেয়ে নিয়েছে এই রক্ষা। সেই সময় তিনি অরণ্যের মধ্যে অরণ্যবাসী নিষাদদের কয়েকটি পর্ণকুটির দেখতে পেয়ে কিছু আহার্যের জন্য সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তখন নিষাদপল্লিতে যুবকেরা কেউ শিকার থেকে ফেরেনি। শিশু, বধূ ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা কুটিরে রয়েছেন। তাদের দেখে একজন বয়স্ক নিষাদ কুটিয়ে থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি পল্লির নেতা।
—আপনারা এই অরণ্যে? আপনারা কে? আপনাদের পরিচয়। বৃদ্ধ জানতে চাইলেন।
কৃপাচার্য বললেন, আমরা ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ। পথ হারিয়ে এই অরণ্যে চলে এসেছি। আমরা বহুদূর থেকে দ্বৈপায়ন হ্রদ দেখতে এসেছিলাম।
ওদের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ বললেন, আপনারা ব্রাহ্মণ বলছেন। কিন্তু আপনাদের পরনে দেখছি যোদ্ধার পোশাক। আপনারা কি কুরুক্ষেত্র থেকে আসছেন? সত্য কথা বলুন। আপনারা কি পলাতক সৈনিক?
অশ্বত্থামা বললেন, আপনাদের কাছে মিথ্যা কথা বলব না। আমরা কুরুক্ষেত্র থেকেই আসছি।
—আমরা কয়েকদিন থাকার মতো একটু নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছি। অশ্বত্থামা বললেন। তারপর অন্য কোনও মিত্ররাজ্যে চলে যাব।
—আমরা নিষাদ। আপনারা ব্রাহ্মণ। আমাদের এই কুটিরের অবস্থা দেখছেন। তাছাড়া আমরা মাংসাসী, ব্রাহ্মণরা নিরামিষভোজী। আপনাদের আতিথেয়তা করা আমাদের পক্ষে দুরূহ কার্য।
অশ্বত্থামা বললেন, আপনাদের বিব্রত করা আমাদের মোটেই ইচ্ছা ছিল না। আপনারা হয়তো জানেন না, আমার পিতা অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের কথা। তিনি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় অস্ত্রশিক্ষাদাতা। পাণ্ডব ও কৌরব সব ভ্রাতাদেরই তিনি অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছেন।
প্রবীণ বললেন, তাহলে ভাইয়ে ভাইয়ে এই যুদ্ধের অর্থ কী? এ তো আমাদের নিষাদ গোষ্ঠীর গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের মতো। আপনাদের ক্ষেত্রে শুধু সিংহাসনে বসার লড়াই।
অশ্বত্থামা বললেন, যুদ্ধ করা ক্ষত্রিয়দের একটা ধর্ম। যেন তেন প্রকারেন একটা যুদ্ধ বাধাবার জন্য তারা মুখিয়ে থাকে। আমরা ব্রাহ্মণ। যুদ্ধ আমাদের ধর্ম নয়। আমরা শুধু রাজার ভৃত্য মাত্র। রাজ-আজ্ঞা পালনের জন্য আমি ও আমার পিতা এই যুদ্ধে নেমেছি। আমার মাতুলও তাই। কিন্তু যুদ্ধ করতে গিয়ে দেখলাম ক্ষত্রিয়রা যাকে ধর্মযুদ্ধ বলে, তার মধ্যে ধর্ম নেই। এই যুদ্ধে প্রতি পদে পদে যুদ্ধের ধর্ম লঙ্ঘন করা হয়েছে।
—কারা লঙ্ঘন করেছে?
—দু’পক্ষই। তবে পাণ্ডবদের অন্যায়ই সবচেয়ে বেশি। তারা আমার পিতাকে মিথ্যা কথা বলে হত্যা করেছে। আর মিথ্যাটা বলেছে কে? আমার পিতা যাকে ধার্মিক ও সত্যপরায়ণ বলে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন সেই যুধিষ্ঠির। আমি তাই পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে চাই। আপনাদের সাহায্য আমার চিরকাল মনে থাকবে। আপনারা আমাদের কটাদিন এখানে আত্মগোপন করে থাকতে দিন। আপনাদের এই ঋণ আমরা সারাজীবন ভুলব না। আপনাদের যথাযথ পুরস্কৃত করব। আমাদের আহারের জন্য কিছু ভাবতে হবে না। আমি ব্রাহ্মণ হলেও প্রবাসে ও যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো বিধান মানি না। আমার মাতুল স্বপাক আহার করে নেবেন। এই কৃতবর্মা একজন ক্ষত্রিয়। তিনিও আমার মতো মাংসাশী। আমার মতো যত্রতত্র আহারে তাঁরও আপত্তি নেই। ইনি শুধু অন্ন ও একটা ব্যঞ্জন পেলেই খুশি। আমরা খুব ক্ষুধার্ত।
বৃদ্ধ শশব্যস্ত হয়ে বললেন, আপনারা এখানে বিশ্রাম করুন। আমি মহিলাদের বলছি। আমরা দরিদ্র নিষাদ। অতিথি অভুক্ত অবস্থায় ফিরে গেলে আমাদের ঈশ্বর পাপ দেবেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে নিষাদবধূরা সমবেত হয়ে ওদের জন্য রান্না করে অন্ন পরিবেশন করল। কৃপ বললেন, এক যাত্রায় পৃথক ফল করে লাভ কী। আমিও আহার করব।
কিন্তু প্রবীণেরা বারবার বলতে লাগলেন, আপনারা ব্রাহ্মণ হয়ে নিষাদের গৃহে ভোজন করবেন, এতে আমাদের কোনো পাপ জন্মাবে না তো?
অশ্বত্থামা বললেন, আমরা স্বেচ্ছায় এই অন্ন খাচ্ছি। এতে কোনো পাপ নেই। কারণ আপনাদের অসীম পুণ্য। আপনারা তিন পলাতক সৈন্যকে ক্ষুধার অন্ন দিয়েছেন। বিদেশে কোনো নিয়ম চলে না। আমরা নিজেরাই তো ব্রাহ্মণ হয়ে বর্ণাশ্রম ধর্ম লঙ্ঘন করেছি। আমরা এখন ক্ষত্রিয়ই বলতে পারেন।
ওরা তিনজন আহার করে উন্মুক্ত আকাশের নীচে নিষাদদের তৈরি কাষ্ঠশয্যায় শয়ন করে বিশ্রাম করতে লাগলেন। অশ্বত্থামার পক্ষে শয্যাটি একটু ছোট। তার পদযুগল মাটিতে গিয়ে পড়ল।
অশ্বত্থামা শুধু ভাবছেন অতঃকিম। এই স্থানটি থেকে দ্বৈপায়ন বেশি দূরে নয়। মহারাজ দুর্যোধনকে দ্বৈপায়ন থেকে সরিয়ে না নিয়ে গেলে তাঁর সমূহ বিপদ। অশ্বত্থামা ভাবলেন দুর্যোধন যদি কোনো মিত্ররাজ্যে আশ্রয় পান তাহলে সৈন্য সংগ্রহ করে তিনি পাণ্ডবদের আক্রমণ করবেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর পাণ্ডবদের সৈন্য সংখ্যা নিদারুণভাবে কমে গেছে। নতুন করে সৈন্য সংস্থানের আগেই তাদের আক্রমণ করতে হবে। যে করেই হোক পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে হবে। দুর্যোধনকে সিংহাসনে বসিয়ে, মাতুল কৃপাচার্যকে সৈন্যাধ্যক্ষ করে তিনি প্রবজ্যা নেবেন। ক্ষত্রিয়োচিত কর্মে তাঁর আর রুচি নেই। তিনি হিমালয়ে গিয়ে আশ্রম তৈরি করে তপস্যা আর অধ্যয়ন করে জীবন কাটাবেন। তবে এই মুহূর্তে যেটি দরকার সেটি হল দুর্যোধনের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ করে তাঁকে অনুপ্রাণিত করা। আর এইজন্য এই নিষাদপল্লিতে কয়েকদিন থাকা দরকার। দুর্যোধনকে দরকার জীবিত রাখা, তাঁকে অনুপ্রাণিত করা এখন অত্যন্ত প্রয়োজন। অশ্বত্থামা মাতুলের সঙ্গে আলোচনা করে নিলেন। ঠিক করলেন সন্ধ্যায় ব্যাধেরা ফিরলে তাঁদের অনুরোধ করবেন কয়েকদিনের জন্য তাঁদের আশ্রয় দেবার জন্য।
অশ্বত্থামার একটু তন্দ্রা এসেছিল। কোলাহলের শব্দে তন্দ্রা টুটে গেল। দেখলেন তরুণ ব্যাধেরা শিকার থেকে ফিরে এসেছে। সারাদিন অন্বেষণ করে শুধু একটিমাত্র মৃগ শিকার করতে পেরেছে। নিষাদের বিভিন্ন গোষ্ঠী যুদ্ধ চলাকালীন আশপাশের জঙ্গলে শিকার করে অরণ্য পশুহীন করে তুলেছে। কারণ সৈন্যদের সরবরাহ করার জন্য দলে দলে নিষাদ শিকারে নেমে পড়েছে। সমস্ত অরণ্য পশুশূন্য হয়ে পড়ায় তাদের কপালে ভাঁজ পড়েছে। যুদ্ধ তো শেষ হয়ে গেল। এরপর তাদের কি হবে?
অশ্বত্থামা, কৃপ ও কৃতবর্মা তাদের শয্যায় উঠে বসেছেন। তিন অতিথিকে দেখে নিষাদপুত্রেরা অবাক
বৃদ্ধ নিষাদ ওঁদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয় দেওয়া আমাদের পবিত্র কর্তব্য। এই পলাতক সেনাপতিদের আমরা অভয় দিয়েছি।
নিষাদদের যুবনেতাদের একজন বলল, আপনারা কোন পক্ষের? কারণ আমরা উভয়পক্ষের পলাতক সৈন্যদের দেখেছি।
অশ্বত্থামা বললেন, আমরা কৌরবপক্ষের। মহারাজ দুর্যোধন আমাদের নেতা। আমার নাম অশ্বত্থামা। আমি আচার্য দ্রোণের পুত্র। ইনি আমার মাতুল। ইনি ক্ষত্রিয়বীর কৃতবর্মা। যুব নিষাদ বললেন, মহাত্মন, আপনাকে জানাতে খারাপ লাগছে, দুর্যোধন এখন উরুভঙ্গ হয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে আছেন। তাঁর মৃত্যু আসন্ন।
—বলেন কী? অশ্বত্থামা যেন আর্তনাদ করে উঠলেন। কোথায় তিনি?
নিষাদ তার কাছে আজ দুপুরের যাবতীয় ঘটনা বর্ণনা করল। বলল, তাঁকে মৃতপ্রায় দেখে দ্বৈপায়ন তীরে একা ফেলে রেখে পাণ্ডবেরা সবাই শিবিরে চলে গেছেন। এখন তিনি মৃত্যুর অপেক্ষা করছেন। মহাশয়, আমরা মহারাজার পাশে বেশিক্ষণ থাকিনি। কারণ আমরা দরিদ্র নিবাদ। পাণ্ডবেরা এখন রাজা। তাদের শত্রুর প্রতি আমরা সমবেদনা প্রকাশ করছি জানলে বৃকোদর আমাদের সমস্ত নিষাদপল্লিতে আগুন লাগিয়ে দিতে পারেন। বৃকোদরের রাগ আপনারা তো জানেন। আমরা শুনেছি তিনি দুঃশাসনের রক্তপান করেছিলেন। ভাবতে পারেন একজন মানুষ রাক্ষসের মতো রক্তপান করছেন। আমরা নিষাদরাও একথা কখনও শুনিনি। বৃকোদরের পত্নী শুনেছি এক রাক্ষসী। তিনি পত্নীর কাছ থেকে এই অভ্যাস রপ্ত করে থাকবেন। দুর্যোধনকে তিনি দুই জানুভঙ্গ করে দিয়ে গদাঘাতে অর্ধমৃত করে রেখে চলে গেছেন।
একটু থেমে যুবক বলতে শুরু করল, তোমরা মৃতপ্রায় রাজাকে ফেলে চলে এলে? পরাজিত হলেও দুর্যোধন তোমাদের রাজা। রাজা ঈশ্বরের প্রতিভূ। প্রজার কাছে পিতার মতো। রাজা কোনো অপরাধ করতে পারে না। প্রজার কর্তব্য বিপদের দিনে রাজার পাশে দাঁড়ানো।
নিষাদতনয় বলল, যুদ্ধ হয় রাজায় রাজায়। প্রাণ যায় তৃণদের। আমরা সেই তৃণ। কুরু-পাণ্ডব যেই রাজা হোন আমাদের কিছু যায় আসে না। তবে মহারাজ দুর্যোধনের
ওই কষ্ট দেখেও আমরা চলে এলাম। কিছুই আমাদের করার নেই।
অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা তিনজনই দুর্যোধনের আসন্ন মৃত্যুর কথা শুনে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তাঁরা তখনই প্রস্তুত হয়ে নিষাদদের বললেন, আমরা চলি। আপনাদের কথা চিরদিন মনে থাকবে।
তারপর প্রায়ান্ধকার বনপথ ধরে তিন অশ্বারোহী দ্বৈপায়নের দিকে অগ্রসর হলেন।
