দ্বিতীয় পর্ব – সত্যমেব জয়তে
সত্যমেব জয়তে নানৃতং সত্যেনপন্থী তিতো দেবযানঃ
সত্যেরই জয় হয়–মিথ্যার নয়। সত্যের পথই একমাত্র পথ। সত্যসাধনার দ্বারাই স্বর্গের পথ প্রশস্ত হয়।
অতঃপর অশ্বত্থামা
মহাভারতে সৌপ্তিক পর্বে আছে মস্তকের সহজ মণিটি খুলে দেওয়ার পর শাপভ্রষ্ট অশ্বত্থামা মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের অনুমতি নিয়ে গভীর অরণ্যে চলে যান।
এরপর মহাভারতের আরও ন’টি পর্ব লিখেছেন ব্যাসদেব। সৌপ্তিক পর্বের পর স্ত্রী পর্ব, দীর্ঘ শান্তিপর্ব, অনুশাসন পর্ব, অশ্বমেধিক পর্ব, আশ্রমবাসিক পর্ব, মৌষল পর্ব, অবশেষে মহাপ্রস্থানিক পর্ব। স্বর্গারোহন পর্বের পর মহাভারত শেষ হয়েছে। কিন্তু সৌপ্তিক পর্বের শেষে সেই যে শাপভ্রষ্ট অশ্বত্থামা বনযাত্রা করলেন তারপর তিনি অরণ্যমধ্যেই চিরকাল হারিয়ে গেলেন। অথচ তিনি চিরঞ্জীবী। কৃষ্ণ অবশ্য তাঁকে শাপজর্জর দেহ নিয়ে জীবস্মৃত অবস্থায় তিন হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মহাভারতের এতবড় একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে মহর্ষি বেদব্যাস চিরতরে হারিয়ে যেতে দিলেন কেন?
কিন্তু মহাভারত যে একা ব্যাসদেবের রচনা তা তো বলা যাবে না। ব্যাস তার মূল কাঠামো রচনা করেছিলেন। যুগে যুগে লেখকেরা মহাভারতের মধ্যে তাদের মনের মাধুরী যুক্ত করে তাকে পরিবর্ধিত করেছেন। আজকের মহাভারত থেকে কোনটি প্রক্ষিপ্ত তা আলাদা করা যায় না। তার ফলে কত বিচিত্র উপকাহিনি, সনাতন ধর্মের নানা ব্যাখ্যান এমনকী কঠোপনিষদের সারাংশ শ্রীকৃষ্ণের বাণী হয়ে শ্রীমদ্ভাবগতগীতায় রূপান্তরিত হয়েছে। তা যুক্ত হয়েছে মহাভারতের সঙ্গে।
কিন্তু কেউ কী বলতে পারেন গীতায় ভগবানের উপদেশগুলি মহাভারতের পক্ষে প্রাসঙ্গিক নয়—তা উড়ে এসে জুড়ে বসা অন্য প্রসঙ্গ?
মোটেই তা নয়। মহাভারত ভারতীয় লৌকিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের এক বিশ্বকোষ। তা অসংখ্য কর্ম ও জ্ঞানকাণ্ডের সংকলন। তার এক একটি চরিত্র গভীর অর্থবহ, বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন মনস্তত্ব তাতে প্রতিফলিত হয়েছে। মানুষ তার স্থান-কাল-পাত্র ও তার মানসিক বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা অনুসারে কাজ করে। কোনো মনুষ্যচরিত্রই উপেক্ষণীয় নয়। মহাকবি তাদের গতি অনুসরণ করেন মাত্র। তারা যেন মহাকালের পুতুল।
আমরা অশ্বত্থামা চরিত্রটিকে অনুসরণ করে মহাভারতের শেষ পর্ব পর্যন্ত তাকে বিনির্মাণ করে দেখাব যে প্রতিটি জীবন হচ্ছে দুর্ভাগ্যের সঙ্গে পুরুষাকারের সংগ্রাম। মানুষের সমস্ত সক্রিয়তা, তার প্রতিভা, তার কর্ম কুশলতা, তার মানসলোককে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। অশ্বত্থামার চরিত্রটিও তাই। অনেক সময় পরিবেশের নানা ঘটনা তার মানসলোকে এমন চাপ সৃষ্টি করে যে সে বিভ্রান্ত হয়। কোনটি তার প্রেয়, কোনটি শ্রেয় ধরতে পারে না। তার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে। মহাভারতের অনেক চরিত্র এমন বিভ্রান্তিতে ভুগেছে। সংকটের বিহ্বলতায় ম্রিয়মান হয়ে হত হয়েছে। কিন্তু অশ্বত্থামা চিরঞ্জীবী। তিনি শারীরিকভাবে হত হননি, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন মাত্র।
সেই আত্মবিপর্যয়, সঠিক পথ খুঁজে পেতে ব্যর্থতা, অন্যদিকে কালের কপোলতলে পিষ্ট হয়ে নামমাত্র বেঁচে থাকাটাই অশ্বত্থামার মতো ধীরোদাত্ত বীরের এক মর্মন্তুদ বিয়োগান্ত পরিণতি। আমরা সেই ট্র্যাজিক বীরকে হারিয়ে যেতে দেব না। সৌপ্তিক পর্বের শেষ দৃশ্য থেকেই তাকে অনুসরণ করব। এইটুকুই লেখকের বিনির্মাণের স্বাধীনতা। বিনির্মাণ ও পরিবর্ধনের অধিকার।
.
মহাভারতের মর্মবাণী ও মূল্যবোধ গ্রন্থটিতে আমি দেখিয়েছি মহাভারতে মর্মবাণী হচ্ছে সত্যমেব জয়তে। মিথ্যার জয় সাময়িকভাবে হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্য জয়ী হবেই। আবার উপনিষদই বলেছেন, হিরন্ময়েন পাত্রেণ সত্যাস্যপিহিতং মুখম। সত্যের মুখ সর্বদাই স্বর্ণময় পাত্রের দ্বারা ঢাকা থাকে।
সেই হিরণ্ময় পাত্র উন্মোচন করে তবে সত্যকে আবিষ্কার করতে হয়। পাত্রটির ওপর লোভ করলে চলে না। তার ভেতরে যা আছে মূল্যবান পাত্রের চেয়ে তা আরও অমূল্য।
মহাভারত সেই সত্যকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছে। দেখিয়েছে সত্যের জন্য সবকিছু ত্যাগ করা যায়। কিন্তু কোনো কিছুর জন্য সত্যকে ত্যাগ করা যায় না। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে এককথায় বনবাসে চলে যাওয়া যায়। রামচন্দ্র গিয়েছিলেন চতুর্দশ বর্ষের জন্য। পাণ্ডবেরা গেলেন দ্বাদশ বর্ষের জন্য। পরে আরও এক বছর দাসের মতো জীবন যাপন অজ্ঞাতবাসে। কিন্তু তাতেও কি সত্যের মুক্তি ঘটে? না, তার পরেও এক রক্তক্ষয়ী, মানবক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেটি ধর্মপালনের যুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধ যুদ্ধই। তার ধর্ম সর্বদা সত্যের পথ ধরে চলে না। মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু বিধাতাপুরুষ সত্যধর্মের বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি সহ্য করেন না। মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণের পাপ—’অশ্বত্থামা হত’। এই কথাটি বলার জন্য মহাভারতের সত্যসিদ্ধ নায়কের জীবনে করুণ পরিণত নেমে আসে। তাঁকে আত্মগ্লানিতে বারবার দীর্ণ হতে হয়। তিনি সশরীরে স্বর্গে গিয়েও নরকদর্শন করেন। শোকাহত হন। অবসন্ন হন। জীবনসত্য উপলব্ধি করেন। হিংসা রাজধর্ম হলেও তা যে মানসিক শান্তি আনতে পারে না, দুর্যোধন আর অশ্বত্থামাই তার প্রমাণ। দুজনেই শান্তি পাননি। অশ্বত্থামা তো দীর্ঘজীবনে তিলে তিলে মৃত্যুযন্ত্রণা অনুভব করেছেন। সেই বর্ণাঢ্য চরিত্র অশ্বত্থামাকে আমরা এত সহজে হারাতে দিতে পারি না।
