১৪৭তম অধ্যায়
শঙ্করকর্ত্তৃক বিষ্ণুমাহাত্ম্য কীর্ত্তন
নারদ কহিলেন, “অনন্তর মহর্ষিগণ সৰ্ব্বলোক নমস্কৃত ভূতভাবন ভগবান মহাদেবকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন! আপনার নিকট মহাত্মা বাসুদেবের মাহাত্ম্য শ্রবণ করিতে আমাদের নিতান্ত বাসনা হইয়াছে, অতএব আপনি অনুগ্রহ করিয়া উহা কীর্ত্তন করুন।’
“মহেশ্বর কহিলেন, ‘হে মহর্ষিগণ! সমুদিত সূর্য্যের ন্যায় তেজঃপুঞ্জ-কলেবর, দশবাহু, দৈত্যনিসূদন, শ্রীবৎসাঙ্ক, সৰ্ব্বদেবের পূজিত, সনাতন বাসুদেব পিতামহ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। তাঁহার মস্তক হইতে আমার, উদর হইতে ব্রহ্মার, কেশ হইতে জ্যোতিঃপদার্থসমুদয়ের, রোম হইতে দেবতা ও অসুরগণের এবং দেহ হইতে মহর্ষি ও নির্ত্যলোকন্সমুদয়ের সৃষ্টি হইয়াছে। তাঁহাকে ব্রহ্ম ও দেবগণের সাক্ষাৎ গৃহস্বরূপ বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। তিনিই স্থাবরজঙ্গমসম্বলিত পৃথিবীর সমুদয় সৃষ্টি ও সংহারকর্ত্তা। পণ্ডিতেরা তাঁহাকে দেবশ্রেষ্ঠ, দেবগণের অরাতিনিপাতন, সৰ্ব্বজ্ঞ, সৰ্ব্বসংশ্লিষ্ট, সৰ্ব্বগ, সৰ্ব্বতোমুখ, পরমাত্মা, সর্ব্বব্যাপী ও মহেশ্বর বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন। এই ত্রিলোকমধ্যে তাঁহার তুল্য আর কেহই নাই। তিনি সনাতন, মধুনিপাতন ও গোবিন্দ নামে বিখ্যাত হইয়াছেন। তিনি দেবগণের কার্য্যসিদ্ধির নিমিত্ত মনুষ্যদেহ ধারণপূর্ব্বক সংগ্রামে অসংখ্য নরপতির বিনাশসাধন করিবেন। তিনি ভিন্ন কোন দেবতারই কোন কাৰ্য্য সম্পন্ন করিবার ক্ষমতা নাই।
‘তিনি সর্ব্বনমস্কৃত ও সৰ্ব্বভূতের নায়ক রূপ। কি সৰ্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা, কি আমি, কি অন্যান্য দেবগণ আমরা সকলেই তাঁহার শরীরমধ্যে পরম সুখে বাস করিয়া থাকি। সেই শাঙ্গচক্র খড়্গধারী গরুড়ধ্বজ পুণ্ডরীকাক্ষ সতত লক্ষ্মীর সহিত একত্র বাস করিয়া থাকেন। তিনি শীলসম্পন্ন, শম, দম ও বলবীৰ্য্যসমন্বিত, পরমসুন্দর, সর্ব্বোন্নত, ধৈর্য্যশীল, সরল, অনৃশংস, অলৌকিক অসমুদয়ে সুশোভিত, যোগমায়াযুক্ত, সহস্রাক্ষ, অনিন্দনীয়, মহামনা, বীর, মিত্রদিগের প্রশংসাকারী, জ্ঞাতিবন্ধুগণের প্রিয়, ক্ষমাশীল, অহঙ্কারবিহীন, ব্রাহ্মণগণের হিতকর, বেদের উদ্ধারকর্ত্তা, ভয়ার্ত্তদিগের ভয়হৰ্ত্তা, মিত্রদিগের আনন্দবর্দ্ধক, সৰ্ব্বভূতের শরণ্য, দীনগণের প্রতিপালক, বিদ্বান, অর্থসম্পন্ন, সৰ্ব্বভূতের নমস্কৃত, আশ্রিত, শত্ৰুদিগেরও পরিত্রাতা, ধৰ্ম্মবিদ, নীতিজ্ঞ, ব্রহ্মবাদী ও জিতেন্দ্রিয়।
যাদববংশ-বিবরণ—বাসুদেবমাহাত্ম্য
‘তিনি দেবগণের মঙ্গলবিধানার্থ মহাত্মা মনুর বিশুদ্ধবংশে জন্মগ্রহণ করিবেন। প্রথমে স্বায়ম্ভূব মনু হইতে অঙ্গ, অঙ্গ হইতে অন্তর্দ্ধামা, অন্তর্দ্ধামা হইতে হবির্দ্ধামা, হবির্দ্ধামা হইতে প্রাটীনবৰ্হি, প্রাচীনবৰ্হি হইতে দশ প্রচেতা; প্রচেতা হইতে দক্ষ প্রজাপতি, দক্ষ প্রজাপতি হইতে দাক্ষায়ণী, দাক্ষায়ণী হইতে আদিত্য ও আদিত্য হইতে বৈবস্বতমনু সমুৎপন্ন হইবেন। সেই বৈবস্বতমনুর বংশে ইলা জন্মগ্রহণ করিবেন। ঐ ইলার গর্ভে ও বুধের ঔরসে পুরূরবার উৎপত্তি হইবে। পুরূরবা হইতে আয়ু, আয়ু হইতে নহুষ, নহুষ হইতে যযাতি, যযাতি হইতে যদু, যদু হইতে ক্রোষ্টা, ক্রোষ্টা হইতে বৃজিনীবান, বৃজিনীবান হইতে ঋষদণ্ড ও ঋষদগু হইতে চিত্ররথ সমুদ্ভূত হইবে। ঐ চিত্ররথের পরম পরিশুদ্ধ বংশে শূর নামে এক বলবীৰ্য্যসম্পন্ন মহাযশস্বী মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করিবেন। সেই শুর হইতে মহাত্মা বসুদেবের এবং বসুদেব হইতে বাসুদেবের উৎপত্তি হইবে।
‘ভগবান্ বাসুদেব এইরূপে ভূমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করিয়া মহারাজ জরাসন্ধকে পরাজয়পূৰ্ব্বক তাঁহার প্রভাবে গিরিগহ্বরে রুদ্ধ নরপতিদিগকে মুক্ত করিয়া দিবেন এবং পরিশেষে অপ্রতিহত বলবীৰ্য্যপ্রভাবে সমুদয় নরপতির শাসনকর্ত্তা হইয়া দ্বারকায় অবস্থানপূর্ব্বক ধর্ম্মানুসারে প্রজাপালন করিবেন। অতএব তোমরা তৎকালে শাস্ত্রানুসারে গন্ধমাল্যাদিদ্বারা ব্রহ্মার ন্যায় সেই সনাতন বাসুদেবের পূজা করিয়া তাঁহার স্তব করিও। যে ব্যক্তি আমাকে বা সৰ্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মাকে দর্শন করিতে বাসনা করিবে, সে যেন সেই সনাতন বাসুদেবের সহিত সাক্ষাৎকার করে। ভগবান্ বাসুদেবকে দর্শন করিলেই ব্রহ্মাকে ও আমাকে দর্শন করা হইবে। ভগবান্ বাসুদেব যাঁহার প্রতি প্রসন্ন হইবেন, ব্রহ্মাদি সমুদয় দেবতাই তাঁহার প্রতি প্রীতি প্রকাশ করিবেন। যে ব্যক্তি সেই মধুসূদনের আশ্রয়গ্রহণ করিবেন, তিনি কীৰ্ত্তি, জয় ও স্বর্গলাভে সমর্থ এবং ধর্ম্মোাপদেষ্টা ও ধার্ম্মিক বলিয়া পরিগণিত হইবেন। অতএব সৎকাৰ্য্যনিরত ধর্ম্মপরায়ণ মহাত্মারা সৰ্ব্বদা সেই পরম পুরুষকে নমস্কার করিবেন। তাঁহার অর্চ্চনা করিলে নিশ্চয়ই পরম ধর্ম্মলাভ হইবে।
‘মহাত্মা হৃষীকেশ প্রজাগণের হিতচিকীর্ষ হইয়া সনৎকুমার প্রভৃতি যে মহর্ষিগণের সৃষ্টি করিয়াছেন, তাঁহারা এক্ষণে গন্ধমাদন পৰ্ব্বতে বাস করিয়া তপস্যা করিতেছেন। অতএব সেই ধর্ম্মপরায়ণ সনাতন হৃষীকেশকে নমস্কার করা লোকের অবশ্য কর্ত্তব্য। তিনি সজ্জনের ন্যায় বন্দিত হইলে বন্দনা, মানিত হইলে মাননা, পূজিত হইলে প্রতিপূজা, দৃষ্ট হইলে দর্শন এবং আশ্রিত হইলে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া থাকেন। লোকপূজিত দেবগণও তাঁহাকে অর্চ্চনা করেন। বিষ্ণুভক্তিপরায়ণ ব্যক্তিদিগের ভয়ের লেশমাত্র থাকে না। অতএব প্রতিনিয়ত কায়মনোবাক্যে তাঁহার অর্চ্চনা করিয়া দর্শন করা সকলেরই কর্ত্তব্য।
বলরামের মাহাত্ম্য বর্ণন
‘হে মহর্ষিগণ! এই আমি তোমাদের নিকট বাসুদেবের মাহাত্ম্য কীর্ত্তন করিলাম। তাঁহাকে দর্শন করিলেই সকল দেবতাকে দর্শন করা হয়। আমিও সেই সৰ্ব্বলোকপিতামহ মহাবরাহমূৰ্ত্তিধর জগৎপতিকে নিয়ত নমস্কার করিয়া থাকি। তাঁহাকে দর্শন করিলে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এই মূৰ্তিত্রয়ের দর্শনলাভ হয়। আমরা সকলেই তাঁহার শরীরমধ্যে অবস্থান করি। ঐ মহাত্মা পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইবার পূর্ব্বে অনন্তদেব অবতীর্ণ হইয়া তাঁহার জ্যেষ্ঠভ্রাতা বলদেব নামে বিখ্যাত হইবেন। সেই বলদেবের রথে ত্রিশির সুবর্ণময় তালধ্বজ বিদ্যমান থাকিবে এবং তাঁহার মস্তক মহানাগগণে পরিবেষ্টিত হইবে। তিনি চিন্তা করিবামাত্র অস্ত্রশস্ত্রসমুদয় তাঁহার নিকট সমাগত হইবে। পূর্ব্বে দেবগণ কশ্যপাত্মজ বলবান গরুড়কে ঐ মহাত্মার অন্তদর্শনে অনুরোধ করাতে গরুড় তদ্বিষয়ে যত্ন করিয়াও কৃতকার্য্য হইতে পারে নাই। সেই অনন্তদেব স্বীয় শরীর দ্বারা বসুন্ধরা ধারণ করিয়া মহা আহ্লাদে রসাতলে অবস্থান করিতেছেন। যিনি বিষ্ণু তিনিই অনন্তদেব এবং যিনি রাম, তিনিই কৃষ্ণ। অতএব চক্রধারী কৃষ্ণ ও লাঙ্গলধারী বলদেব এই উভয়কে যত্নপূৰ্ব্বক দর্শন ও সম্মান করা সকলেরই কর্ত্তব্য।
‘হে তপোধন! এই আমি তোমাদিগের নিকট যত্নপূৰ্ব্বক যদুবংশাবতীর্ণ নারায়ণকে পূজা করিবার বিষয় কীর্ত্তন করিলাম।”
