3 of 4

১৪৫. পুণ্য-পাপজনক কাৰ্য্যাবলী

১৪৫তম অধ্যায়

পুণ্য-পাপজনক কাৰ্য্যাবলী

‘পার্ব্বতী কহিলেন, “দেব! মনুষ্য কিরূপ স্বভাবসম্পন্ন, কি প্রকার কার্য্যানুষ্ঠাননিরত ও কি প্রকার দানশীল হইলে তাহার স্বর্গলাভ হয়, তাহা কীর্ত্তন করুন।”

‘মহেশ্বর কহিলেন, “দেবি! যিনি ব্রাহ্মণগণকে যথোচিত সৎকার এবং দীন, অন্ধ প্রভৃতি কৃপাপাত্রদিগকে অন্নপান ও বস্ত্রপ্রদান করিয়া থাকেন, যিনি গৃহ, সভা, কূপ ও পুষ্করিণী প্রস্তুত করিয়া দেন এবং যিনি প্রীতমনে আসন, শয্যা, যান, রত্ন, ধন, ধেনু, ক্ষেত্র ও স্ত্রী প্রভৃতি প্রার্থনীয় বস্তুসকল অকাতরে দান করেন, তিনি দেহান্তে দেবলোকে গমনপূৰ্ব্বক তথায় বহুকাল বিবিধ ভোগ্যবস্তু উপভোগ ও অপ্সরাদিগের সহিত নন্দনকাননে বিহার করিয়া পরিশেষে পুনরায় জীবলোকে সুসমৃদ্ধ ব্যক্তির গৃহে জন্মগ্রহণ করিয়া থাকেন। ঐ জন্মে তাঁহার সমস্ত অভিলাষই পূর্ণ হয়। তিনি ধনী ও ভোগশীল হইয়া পরমসুখে কালযাপন করিতে সমর্থ হয়েন। ভগবান্ প্রজাপতি মহাত্মাদিগের এইরূপ সৌভাগ্যের বিষয় নির্দ্দেশ করিয়াছেন।

“এই ভূমণ্ডলমধ্যে যাহারা নিতান্ত অল্পবুদ্ধি, তাহারাই ধনসত্ত্বে ব্রাহ্মণকর্ত্তৃক প্রার্থিত হইয়াও তাঁহাদিগকে অর্থপ্রদানে পরাঙ্মুখ হইয়া থাকে। উহাদিগকে দানকৃপণ বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। ঐ সমস্ত লুব্ধস্বভাব পামরের নিকট দীন, অন্ধ, ভিক্ষুক, অতিথি প্রভৃতি যথার্থ কৃপাপাত্র ব্যক্তিগণ প্রার্থনা করিয়াও ধন, বস্ত্র, সুবর্ণ, গো ও কোনপ্রকার খাদ্যদ্রব্য কদাপি প্রাপ্ত হয় না। ঐ সকল দানপরাঙ্মুখ অধার্ম্মিক নিশ্চয়ই দেহান্তে নরকে নিপতিত হইয়া বিবিধ কষ্টভোগের পর পরিশেষে নিৰ্দ্ধন লোকের গৃহে জন্মগ্রহণ করে। ঐ জন্মে উহারা পৃথিবীর সকল প্রকার ভোগে বঞ্চিত হইয়া নিতান্ত নিকৃষ্ট জীবিকা অবলম্বন করিয়া থাকে; উহারা ক্ষুৎপিপাসায় একান্ত কাতর হইয়া লোকের দ্বারে গমন করিলেও লোকে উহাদিগকে বহিষ্কৃত করিয়া দেয়। হে দেবি! অদাতা কৃপণদিগের এইরূপই দুর্গতিলাভ হয়। যাহারা ধনমদমত্ত হইয়া আসনার্হ ব্যক্তিদিগকে আসন, পাদ্যাৰ্থ ব্যক্তিকে পাদ্য, অর্ঘ্যার্হ ব্যক্তিকে অর্ঘ্য, আচমনীয়ের উপযুক্ত ব্যক্তিকে আচমনীয় ও পথপ্রদানের উপযুক্ত ব্যক্তিকে পথপ্রদান না করে; আর যাহারা অভ্যাগত গুরুর প্রতি প্রীতিপূৰ্ব্বক যথোচিত সম্মান প্রদর্শনে বিরত, অভিমানসম্ভূত লোভের একান্ত বশীভূত এবং মান্য ব্যক্তির অবমাননা ও বন্ধুবর্গের পরাভবে প্রবৃত্ত হয়, তাহারা নিশ্চয়ই নিরয়গামী হইয়া থাকে। এই পামরেরা যদি কোনক্রমে বহুকালের পর নরকযন্ত্রণা হইতে মুক্তিলাভ করে, তাহা হইলেও উহাদিগকে অতি নিকৃষ্ট চণ্ডালাদির বংশে জন্মগ্রহণ করিতে হয়, সন্দেহ নাই।

“যে ব্যক্তি অভিমানপরতন্ত্র নহেন, যিনি দেবতা ও ব্রাহ্মণদিগকে যথোচিত অর্চ্চনা করেন, যিনি লোকের পূজনীয়, বিনয়ী, মধুরভাষী ও সকল বর্ণের প্রিয়কার্য্যে নিরত, যিনি কখনও কাহারও প্রতি দ্বেষ প্রকাশ করেন না এবং যিনি সকলকে স্বাগত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া অভ্যর্থনা, সকলকেই যথোচিত সৎকার, পথপ্রদানের উপযুক্ত ব্যক্তিকে পথপ্রদান, গুরুকে যথোচিত সম্মান ও সতত অতিথিসংগ্রহে যত্ন প্রকাশ করেন, তিনি নিশ্চয়ই দেহান্তে স্বর্গে গমনপূর্ব্বক বহুকাল সুখভোগ করিয়া পরিশেষে ভূলোকে অতি উৎকৃষ্ট কুলে সমুৎপন্ন হয়েন। ঐ জন্মে তিনি অতিশয় ভোগশালী, ধৰ্ম্মপরায়ণ, সকলের নমস্য ও আদরণীয় হইয়া থাকেন এবং দানের উপযুক্ত ব্যক্তিদিগকে যথোচিত দান করেন। বিধাতা স্বয়ং এই ধৰ্ম্মফল নির্দ্দেশ করিয়াছেন।

“যে ব্যক্তি সকল প্রাণীর মনোমধ্যে ভয় উত্তেজিত করিয়া থাকে, যে নরাধম হিংসাপরবশ হইয়া হস্ত, পদ, রঞ্জু, দণ্ড ও লোষ্ট্র প্রভৃতি দ্বারা প্রাণীগণকে যন্ত্রণা প্রদান এবং ভীষণ মূর্ত্তি ধারণপূৰ্ব্বক জন্তুগণকে আক্রমণ করে, সে পাপাত্মা নিশ্চয়ই নিরয়গামী হইয়া থাকে। ঐ দুরাত্মা বহুকালের পর যদি কালক্রমে পুনরায় মনুষ্যযোনি পরিগ্রহ করে, তাহা হইলে উহাকে বিপজ্জালপরিপূর্ণ অতি নীচবংশে উদ্ভূত হইয়া সকলের বিদ্বেষভাজন হইতে হয়। আর যিনি জিতেন্দ্রিয়, শত্রুতাবিহীন, সকলের পিতৃতুল্য ও দয়াবান হইয়া সকলকে স্নেহদৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করেন, যিনি হস্তপদাদিদ্বারা কোন জন্তুকেই যন্ত্রণা প্রদান করেন না এবং যিনি সকলেরই বিশ্বাসপাত্র, তিনি নিশ্চয়ই স্বর্গে গমন করিয়া দিব্যভবনে দেবতার ন্যায় পরমসুখে বাস এবং পরিশেষে মনুষ্যযোনিতে জন্মগ্রহণপূৰ্ব্বক নির্ব্বিঘ্নে সুখভোগ করিয়া থাকেন। তাঁহাকে আর কখনই বিপদগ্রস্ত হইতে হয় না। হে দেবি? এই আমি তোমার নিকট সাধুদিগের গতির বিষয় কীর্ত্তন করিলাম।”

কৰ্ম্মবশে বিভিন্ন প্রকৃতির লোকউৎপত্তি

‘পাৰ্ব্বতী কহিলেন, “নাথ! এই জীবলোকে কতকগুলি তর্কবিতর্কসুনিপুণ জ্ঞানবিজ্ঞানসম্পন্ন পণ্ডিত ও কতকগুলি লোক প্রজ্ঞাবিহীন মূর্খ হইয়া থাকে, ইহার কারণ কি? আর কি নিমিত্তই বা কতকগুলি লোক জন্মাবধি অন্ধ, রোগার্ত্ত ও ক্লীব হইয়া থাকে? আমার এই সমস্ত বিষয়ে অতিশয় সংশয় উপস্থিত হইয়াছে, আপনি উহা ছেদন করুন।”

মহেশ্বর কহিলেন, “দেবি! যে সকল মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি বেদবিৎ ধর্ম্মপরায়ণ সিদ্ধ ব্রাহ্মণগণের উপদেশানুসারে অশুভ কাৰ্য্য পরিত্যাগপূৰ্ব্বক সতত শুভকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করেন, তাঁহারা উহার প্রভাবে ইহলোকে সুখ ও দেহান্তে স্বর্গলাভ করিয়া থাকেন। ঐসকল মহাত্মাই কৰ্ম্মক্ষয়ের পর পুনরায় মনুষ্যযোনি লাভ করিয়া প্রজ্ঞাবান ও কল্যাণভাজন হইয়া থাকেন। যে সমস্ত মূঢ় ব্যক্তি পরস্ত্রীর প্রতি কামভাবে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে, তাহাদিগকে পরজন্মে জন্মান্ধ হইতে হয়, সন্দেহ নাই। যাহারা অসৎ অভিসন্ধি করিয়া বিবসনা কামিনীকে নিরীক্ষণ করে, তাহারা পরজন্মে নিরন্তর রোগে নিপীড়িত হইয়া থাকে। যে সকল দুরাত্মারা পশ্বাদির সহিত মৈথুনে প্রবৃত্ত ও নিরন্তর স্ত্রীসংসর্গে অনুরক্ত হয় এবং যাহারা গুরুদারাপহরণ ও গুরুহত্যা করে, তাহারা পরজন্মে ক্লীব হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে।”

‘পার্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন্! মনুষ্য কোন্ কার্য্যের অনুষ্ঠানদ্বারা শ্রেয়োলাভ করিয়া থাকে?”

‘মহাদেব কহিলেন, “দেবি! যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণকে সতত শ্রেয়োলাভের পথ জিজ্ঞাসা করেন এবং যিনি ধৰ্ম্মজিজ্ঞাসু ও গুণাকাঙ্ক্ষী হয়েন, তিনি দেহান্তে নিশ্চয়ই স্বর্গে গমনপূর্ব্বক বহুকাল সুখভোগ করিয়া পরিশেষে মনুষ্যযোনিতে সমুৎপন্ন হইয়া অসাধারণ মেধাবী ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন হয়েন। হে দেবি! এই আমি তোমার নিকট মনুষ্যগণের হিতার্থ শুভফলজনক ধৰ্ম্ম কীর্ত্তন করিলাম।”

‘পার্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন্‌! এই ভূমণ্ডলে কতকগুলি মনুষ্য ধর্ম্মবিদ্বেষী, স্বল্পজ্ঞানসম্পন্ন, ব্ৰতহীন, নিয়মভ্রষ্ট, রাক্ষসসদৃশ, হিংসাপরায়ণ ও অযাজ্ঞিক হয়, উহারা প্রাণাস্তেও বেদবিদ ব্রাহ্মণগণের নিকট ধর্ম্মজিজ্ঞাসার্থ গমন করে না। আর কতকগুলি লোক ধর্ম্মপরায়ণ, ব্রতনিরত, শ্রদ্ধাবান ও যাজ্ঞিক হইয়া থাকেন, ইহার কারণ কি, আপনি তাহা কীর্ত্তন করুন।”

‘মহেশ্বর কহিলেন, “দেবি! বেদে লোকধর্ম্মের মর্য্যাদা স্থাপিত হইয়াছে। যাঁহারা সেই বেদোক্ত ধর্ম্মের অনুসরণ করেন, তাঁহারাই পরজন্মে ব্ৰতশীল হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়া থাকেন। আর যাহারা মোহের বশবর্ত্তী হইয়া অধৰ্ম্মকে ধৰ্ম্ম বলিয়া বিশ্বাস করে, সেই সমস্ত ব্রহ্মরাক্ষস সদৃশ পাপাত্মা দেহান্তে নরকভোগের পর কোনক্রমে মনুষ্যত্ব লাভ করিয়া হোম, বষট্‌কার ও ব্রতবিহীন হইয়া কালযাপন করিয়া থাকে। হে দেবি! এই আমি তোমার নিকট মনুষ্যগণের শুভাশুভ বিষয়সমুদয় কীর্ত্তন করিলাম।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *