১৪৩তম অধ্যায়
ক্ষত্রিয়াদি জাতির উৎকর্ষ-অপকর্ষের কারণ
‘পার্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন! আপনি সুৰ্য্যের নেত্র ও দম্ভ উৎপাটন এবং দক্ষযজ্ঞ ধ্বংস করিয়াছেন। আপনার তুল্য ক্ষমতাশালী আর কেহই নাই। এক্ষণে আমার এক সংশয় উপস্থিত হইয়াছে, আপনি তাহা অপনোদন করুন। ভগবান ব্রহ্মাই পূর্ব্বে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারিবর্ণের সৃষ্টি করিয়াছেন। কিন্তু বৈশ্য কি দুষ্কর্ম্ম করিয়া শূদ্রত্ব ও কোন্ সুকৰ্ম্মবলে ক্ষত্রিয়ত্ব লাভ করে? ব্রাহ্মণের ক্ষত্রিয় বা শূদ্ৰযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিবার কারণ কি? কি নিমিত্ত ক্ষত্রিয়ের শূদ্রত্বলাভ হইয়া থাকে এবং ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই প্রকৃতিসিদ্ধ বর্ণত্রয় কিরূপেই বা ব্রাহ্মণ্যলাভ করে, তাহা কীর্ত্তন করুন।”
মহেশ্বর কহিলেন, “দেবি! ব্রাহ্মণ্যলাভ করা নিতান্ত সুকঠিন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারিবর্ণই প্রকৃতসিদ্ধ; ব্রাহ্মণ কেবল স্বীয় দুষ্কৰ্ম্মনিবন্ধন ব্রাহ্মণ্য হইতে পরিভ্রষ্ট হয়েন, অতএব সর্ব্বোৎকৃষ্ট ব্রাহ্মণ্যলাভ করিয়া তাহার রক্ষার নিমিত্ত সাবধান হওয়া সৰ্ব্বতোভাবে বিধেয়। যদি ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য ব্রাহ্মণ্যধর্ম্মে অবস্থানপূর্ব্বক ব্রাহ্মণের অনুষ্ঠান করে, তাহা হইলে তাহাদিগের পরজন্মে ব্রাহ্মণত্বলাভ হয়। যে ব্রাহ্মণ স্বধর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্ম অথবা লোভমোহবশতঃ বৈশ্যধর্ম্মের অনুষ্ঠান করেন, তাঁহার ক্ষত্রিয়ত্ব বা বৈশ্যত্ব লাভ হয়। যে ব্রাহ্মণ লোভমোহপ্রভাবে স্বধর্ম্মপরিভ্রষ্ট হইয়া শূদ্ৰধৰ্ম্ম আশ্রয় করেন, তিনি নিশ্চয়ই দেহান্তে অশেষ নরকযন্ত্রণা ভোগ করিয়া পরিশেষে শূদ্রযোনি প্রাপ্ত হয়েন। যদি ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য স্বধর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া শূদ্ৰানুষ্ঠেয় কার্য্যের অনুষ্ঠান করে, তাহা হইলে তাহারা পরজন্মে স্বজাতি পরিভ্রষ্ট হইয়া শূদ্রত্বলাভ করিয়া থাকে।।
“হে দেবি! ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যগণের এইরূপে শূদ্ৰত্বলাভ হয়। যে বিজ্ঞানসম্পন্ন বুদ্ধিমান ব্যক্তি স্বধৰ্ম্মে একান্ত অনুরক্ত হয়েন, তাঁহার অবশ্যই অতি উৎকৃষ্ট ফললাভ হইয়া থাকে। সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা কহিয়াছেন যে, ধর্ম্মপ্রার্থী সাধুদিগের আত্মতত্ত্ব অন্বেষণ করা অবশ্য কর্ত্তব্য। উগ্রজাতির অন্ন, বহুজনের আহারার্থ পরিপক্ক অন্ন, আদ্যশ্রাদ্ধীয় অন্ন, অশৌচান্ন, দূষিতান্ন ও শূদ্ৰান্ন ভোজন করা কদাচ কৰ্তব্য নহে। যদি সাগ্নিক ব্রাহ্মণ শূদ্ৰান্ন ভোজন করিয়া ঐ অন্ন পরিপাক না হইতে হইতেই কালকবলে নিপতিত হয়েন, তাহা হইলে নিশ্চয়ই ব্রাহ্মণ্য হইতে পরিভ্রষ্ট হইয়া তাঁহাকে শূদ্রযোনিতে জন্মগ্রহণ করিতে হয়। এইরূপে ব্রাহ্মণ যে যে নিকৃষ্ট বর্ণের অন্নভোজন করিয়া সেই অন্ন উদরে থাকিতে থাকিতে মত্তলীলা সংবরণ করেন, তাঁহার সেই সেই যোনিতে জন্মপরিগ্রহ হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি সুদুর্ল্লভ ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিয়া মোহবশতঃ তাহাকে অবজ্ঞা প্রকাশপূর্ব্বক অভোজ্য অন্ন ভোজন করেন, তিনি নিশ্চয়ই ব্রাহ্মণ্য হইতে পরিভ্রষ্ট হয়েন। ব্রাহ্মণ সুরাপায়ী, ব্রহ্মঘ্ন, ক্ষুদ্রাশয়, তস্কর, ভগ্নব্রত, অপবিত্র, বেদবিবর্জ্জিত, পাপাত্মা, লুব্ধ, শঠ, শূদ্ৰাপতি, কুণ্ডাশী, সোমবিক্রয়ী, নীচসেবানিরত, গুরুদ্বেষী ও গুরুদারাপহারী হইলে নিশ্চয় তাঁহার ব্রাহ্মণ্য বিনষ্ট হয়।
“বৈশ্য সদাচারনিরত হইলে পরজন্মে ক্ষত্রিয়ত্ব এবং শূদ্র সদাচারনিরত হইয়া স্বীয় কর্ত্তব্যকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিলে পরজন্মে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিতে সমর্থ হয়। সতত সৎপথে অবস্থান করিয়া অবিচলিতচিত্তে ব্রাহ্মণের শুশ্রূষা করা শূদ্রের অবশ্য কর্ত্তব্য। শূদ্র যদি দেবতা ও ব্রাহ্মণের পূজা, অতিথির প্রতি সমাদর, ঋতুস্নানের পর পত্নীর সহবাস, নিয়মিত ভোজন, শৌচাবলম্বন, শুচি ব্যক্তির অন্বেষণ, পরিবারবর্গের আহারান্তে ভোজন ও বৃথামাংস পরিত্যাগ করে, তাহা হইলেই তাহার পরজন্মে বৈশ্যত্বলাভ হয়। বৈশ্য যদি সত্যবাদী, অহঙ্কারপরিশূন্য, সুখদুঃখাদিবিহীন, শাক্তিগুণাবলম্বী, যজ্ঞপরায়ণ, বেদানুরক্ত, পবিত্র ব্রাহ্মণের সৎকর্ত্তা ও সমুদয় বর্ণের পুষ্টিসাধক হয় এবং গার্হস্থ্যধৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়া নির্দ্দিষ্ট দুই সময়ে সকলের ভোজনের পর স্বয়ং ভোজন, কামনাপরিত্যাগ, অগ্নিহোত্র অনুষ্ঠান, অতিথিসৎকার ও গার্হপত্যাদি অগ্নিত্রয়ের উপাসনা করে, তাহা হইলেই সে অতিপবিত্র ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করিয়া যদি জন্মাবধি সমুদয় সংস্কারদ্বারা সংস্কৃত হইয়া ব্রত ও ভূরিদক্ষিণ যজ্ঞের অনুষ্ঠান, দান অধ্যয়ন, গার্হপত্যাদি অগ্নিত্রয়ের উপাসনা, আর্ত্তব্যক্তিদিগকে সাহায্যদান, ধর্ম্মানুসারে প্রজাপালন, সত্যবাক্যপ্রয়োগ, সৎকার্য্যের অনুষ্ঠান, ধৰ্ম্মানুসারে দণ্ডবিধান, ধৰ্ম্মকাৰ্য্যের উপদেশ প্রদান, বিবিধ, সৎকার্য্যের অনুষ্ঠান, প্রজাদিগের শস্যের যষ্ঠাংশগ্রহণ, পরশ্রীগমনবাসনা পরিত্যাগ, ঋতুকালে পত্নীতে গমন, দিবসে একবার ও রজনীযোগে একবারমাত্র আহার, বেদাধ্যয়ন, অগ্নিহোত্রগৃহে কুশোপরি শয়ন, সমাহিতচিত্তে ত্রিবর্ণ সেবা, শূদ্রমাত্রকে অনুদান, পিতৃলোক, দেবতা ও অতিথির তৃপ্তিসাধন, স্বীয় গৃহে অতিথির ন্যায় বাস, ত্রিকালে হুতাশনে আহুতি প্রদান এবং গোব্রাহ্মণের জীবনরক্ষাৰ্থ সমরাঙ্গনে প্রাণত্যাগ করে, তাহা হইলে সে স্বীয় কৰ্ম্মপ্রভাবে পরজন্মে অনায়াসে ব্রাহ্মণকুলে জন্মপরিগ্রহ করিয়া বিজ্ঞান ও বেদশাস্ত্রে বিলক্ষণ পারদর্শী হয়।
“হে দেবি! এইরূপে অতি হীনবর্ণোদ্ভব শূদ্রও স্বীয় সৎকৰ্ম্মপ্রভাবে অনায়াসে বেদজ্ঞানসম্পন্ন ব্রাহ্মণকুলে এবং ব্রাহ্মণ নীচবর্ণের অভক্ষণাদি অসৎকৰ্ম্মপ্রভাবে ব্রাহ্মণ্য হইতে পরিভ্রষ্ট হইয়া শুদ্ৰকুলে জন্মপরিগ্রহ করে। ব্রহ্মা কহিয়াছেন যে, শূদ্রও যদি পবিত্র কার্য্যানুষ্ঠানদ্বারা বিশুদ্ধাত্মা ও জিতেন্দ্রিয় হয়, তাহা হইলে তাহাকে ব্রাহ্মণের ন্যায় সমাদর করা কর্ত্তব্য। ফলতঃ আমার মতে শূদ্র সৎস্বভাবসম্পন্ন ও সৎকৰ্ম্মানুরক্ত হইলে ব্রাহ্মণ অপেক্ষা প্রশংসনীয় হয়। কেবল জন্ম, সংস্কার, শাস্ত্রজ্ঞান ও কুল ব্রাহ্মণত্বের কারণ নহে, সদাচারই ব্রাহ্মণত্বের প্রধান কারণ। সদ্বব্যহারদ্ধারা সকলেই ব্রাহ্মণ্যলাভ করিতে পারে। ব্রহ্মজ্ঞান সকলের পক্ষেই সমান। যাহার হৃদয়ে নির্ম্মল নির্গুণ ব্রহ্মের ভাব প্রকাশিত হয়, সেই ব্রাহ্মণ। লোকস্রষ্টা ব্রহ্মা স্বয়ং কহিয়াছেন যে, ব্রাহ্মণাদি বর্ণভেদ শ্রেণীবিভাগমাত্র। বেদপরায়ণ ব্রহ্মজ্ঞাননিরত ব্রাহ্মণাচরণবিশিষ্ট জঙ্গম ক্ষেত্রস্বরূপ। ঐ ক্ষেত্রে বীজবপন করিলে পরলোকে নিশ্চয়ই তাহার ফললাভ হয়। যে ব্রাহ্মণ আপনার মঙ্গলবাসনা করেন, তাঁহার সাগ্নিক, বিঘসাশী, সৎপথাবলম্বী, সংহিতাধ্যায়ী ও বেদাধ্যয়নসম্পন্ন হওয়া উচিত। অধ্যয়নজীবী হওয়া তাঁহার কদাপি বিধেয় নহে। ব্রাহ্মণ এইরূপ গুণসম্পন্ন ও সৎপথাবলম্বী হইলেই ব্রহ্মত্ব লাভ করিতে পারেন। দুর্ল্লভ ব্রাহ্মণ্যলাভ করিয়া শূদ্ৰাদি নীচজাতির সংসর্গ পরিত্যাগ, দান, প্রতিগ্রহে অস্বীকার ও বিবিধ সৎকাৰ্য্যের অনুষ্ঠানদ্বারা যত্নপূৰ্ব্বক তাহা রক্ষা করা কর্ত্তব্য।
“হে দেবি! এই আমি তোমার নিকট শূদ্র যেরূপে ব্রাহ্মণত্ব এবং ব্রাহ্মণ যেরূপে শূদ্ৰত্বলাভ করে, তাহা কীর্ত্তন করিলাম।”
