3 of 4

১৪২. বনবাসী ঋষির ধর্ম্ম

১৪২তম অধ্যায়

বনবাসী ঋষির ধর্ম্ম

‘পাব্বর্ত্তী কহিলেন, “নাথ! যে সমস্ত বানপ্রস্থাবলম্বী মহাত্মা নদীতট, নিকুঞ্জ, বন, পৰ্ব্বত ও ফলমূলসম্পন্ন অতিপবিত্র প্রদেশসমুদয়ে বাস করিয়া থাকেন, সেই স্বশরীরোপজীবী মহাত্মাদিগের নিয়ম শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ হইতেছে, আপনি উহা কীর্ত্তন করুন।”

‘মহেশ্বর কহিলেন, “দেবি! বানপ্রস্থদিগের যেরূপ ধৰ্ম্ম নির্দ্দিষ্ট আছে, অননামনে তাহা শ্রবণ করিয়া ধৰ্ম্মে মনোনিবেশ কর। বনবাসী সিদ্ধ মহাত্মাদিগের ধর্ম্মবুদ্ধিপরতন্ত্র হইয়া ত্রিকালীন অভিযেক, ইঙ্গুদী ও এরণ্ড তৈল ব্যবহার, পিতৃলোক ও দেবগণের অর্চ্চনা, অগ্নিহোত্রের অনুষ্ঠান, যজ্ঞ সম্পন্ন এবং ফলমূল ও নীবারদ্বারা জীবিকানির্ব্বাহ করা কর্ত্তব্য। তাঁহারা নিরন্তর যোগানুষ্ঠান, অরণ্যমধ্যে বীরাসনে অবস্থান, মণ্ডুকযোগসাধন, স্থণ্ডিলে শয়ন এবং শীতকালে সলিলে অবস্থান ও গ্রীষ্মে পঞ্চাগ্নিসেবন করিবেন। উঁহাদিগের অবভক্ষ [কেবল জলপায়ী], বায়ুভক্ষ, শৈলভক্ষ, অশ্মকুট্ট, দম্ভোলুখলিক বা সংপ্রক্ষালন হইয়া, চীর বল্কল বা মৃগচর্ম্ম পরিধান করিয়া ধৰ্ম্মানুসারে জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করা উচিত। হোম, পঞ্চযজ্ঞানুষ্ঠান, পোষ্যবর্গের প্রতিপালন, অষ্টকাশ্রাদ্ধ, চাতুর্ম্মাস্য যাগ, দর্শপৌর্ণমাস যাগ ও নিত্যযজ্ঞ অনুষ্ঠান করা উঁহাদের পরমধর্ম্ম। উঁহাদের মধ্যে অনেকে দারসংযোগ-বিমুক্ত হইয়া পর্য্যটন করিয়া থাকেন। স্রক ও ভাণ্ড ইঁহাদিগের পরমধন। ইঁহারা অগ্নিয়ের আরাধনা ও সৎপথে অবস্থান করিয়া পরমগতিলাভে সমর্থ হয়েন। ইঁহারাই শাশ্বত, ব্রহ্মলোক ও পবিত্র সোমলোকে গমন করিয়া থাকেন। এই আমি তোমার নিকট সংক্ষেপে বানপ্রস্থধৰ্ম্ম কীর্ত্তন করিলাম।”

‘পাৰ্ব্বতী কহিলেন, “নাথ! বনবাসী জ্ঞানবান মহাত্মাদিগের মধ্যে কেহ কেহ স্বেচ্ছাচারী ও কেহ কেহ দারবিহারী [বিবাহিত] হইয়া থাকেন; অতএব আপনি তাঁহাদিগের ধর্ম্ম কীর্ত্তন করুন।”

‘মহাদেব কহিলেন, “দেবি! যেসমস্ত তপস্বী স্বেচ্ছাচারী [সন্ন্যাসী], মস্তকমুণ্ডন ও কাষায়বস্ত্রধারণই তাঁহাদিগের ধর্ম্ম। আর যাঁহারা দারসংযুক্ত, তাঁহারা রজনী উপস্থিত হইলেই গৃহে উপস্থিত হইয়া বাস করিয়া থাকেন। সন্ন্যাসীদিগের ন্যায় যথেষ্ট বিহার উঁহাদের ধৰ্ম্ম নহে। ত্রিকালীন স্নান, স্বেচ্ছাচারী ও দারবিহারী উভয়েরই বিহিত আছে। কিন্তু ঋষিনির্দ্দিষ্ট হোমের অনুষ্ঠান, সমাধি, সৎপথে অবস্থান ও শাস্ত্রোক্ত কাৰ্য্যসাধন প্রভৃতি পূৰ্ব্বকথিত যেসমস্ত বনবাসীদিগের ধর্ম্ম আছে, তৎসমুদয় কেবল দারনিরত ব্যক্তিদিগেরই বিহিত হইয়াছে। তাঁহারা এই সমস্ত ধৰ্ম্ম অনুষ্ঠান করিলে নিশ্চয়ই তাহার ফললাভ করিতে সমর্থ হয়েন।

“স্বদারনিরত ঋতুকালাভিগামী বানপ্রস্থগণ ঋষিকৃত ধৰ্ম্মেরই অনুষ্ঠান করিবেন। স্বেচ্ছানুসারে নিয়মাতিরিক্ত কার্য্যানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হওয়া তাঁহাদের কদাপি কর্ত্তব্য নহে। যিনি সকলকেই অভয় প্রদান করেন, যিনি হিংসাদ্বেষশূন্য এবং যিনি সকল প্রাণীর প্রতি দয়া ও সরলতা প্রদর্শন ও সকল প্রাণীকে আত্মস্বরূপ বিবেচনা করেন, তাঁহারই যথার্থ ধর্ম্মলাভ হয়। সমস্ত বেদাধ্যয়নপূর্ব্বক স্নান ও সমুদয় প্রাণীকে সরলতা প্রদর্শন এই উভয়ই তুল্য, বরং বেদপাঠান্তে স্নান অপেক্ষা সরলতা প্রদর্শন অধিক ফলপ্রদ বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। সরলতাই যথার্থ ধৰ্ম্ম, কপটতাচরণ অপেক্ষা অধৰ্ম্মজনক কাৰ্য্য অতি অল্পই বিদ্যমান আছে। যে ব্যক্তি সরলতা অবলম্বন করেন, তাঁহার নিশ্চয়ই ধর্ম্মলাভ হয়। যে মহাত্মা সরলতায় সমধিক অনুরাগ প্রদর্শন করেন, তিনি দেবগণের সহিত একত্র বাস করিয়া থাকেন। অতএব যাঁহার ধর্ম্মপরায়ণ হইবার অভিলাষ থাকে, সরলস্বভাব হওয়া তাঁহার সৰ্ব্বতোভাবে বিধেয়। ক্ষমাশীল, জিতেন্দ্রিয় ও হিংসাপরিশূন্য ব্যক্তি নিশ্চয়ই উৎকৃষ্ট ধর্ম্মলাভে অধিকারী হয়েন। যিনি অনলস, সৎপথাবলম্বী ও সচ্চরিত্র, তিনি চরমে পরমপদ ব্রহ্মপদ লাভ করিতে পারেন।”

‘পার্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন্! আশ্রমপ্রতিপালননিরত তাপসেরা কিরূপ কার্য্যানুষ্ঠানদ্বারা দীপ্তিশালী হইয়া থাকেন, মহাধন রাজা বা নিৰ্দ্ধন দরিদ্রগণ কিরূপ কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে মহাফল লাভ করিতে সমর্থ হয়েন, আর বনবাসী তাপসগণ কি, কার্য্যের অনুষ্ঠানদ্বারা পরলোকে দিব্যস্থান অধিকার করিয়া দিব্যচন্দনে চর্চ্চিত হইয়া থাকেন, আমার এই সমস্ত বিষয়ে সংশয় উপস্থিত হইয়াছে, আপনি উহা ছেদন করুন।”

‘মহাদেব কহিলেন, “দেবি! যাঁহারা উপবাসব্রত অবলম্বনপূর্ব্বক ইন্দ্রিয় নিগ্রহ করেন এবং যাঁহারা অহিংসক ও সত্যবাদী হয়েন, তাহারা সিদ্ধিলাভপূৰ্ব্বক দেহান্তে নির্ব্বিয়ে গন্ধর্ব্বগণের সহিত বিহার করিয়া থাকেন। যাঁহারা মণ্ডূকযোগনিরত [ডেকের ন্যায় অনাহারে গিরিগুহাদিতে বাসনিরত] ও বিধানানুসারে নানাপ্রকার সৎকার্য্যে দীক্ষিত হইয়া থাকেন, তাঁহারা দেহান্তে নাগগণের সহিত বিহার করিতে সমর্থ হয়েন। যিনি মৃগগণের সহিত বাস করিয়া মৃগমুখোৎসৃষ্ট তৃণসমুদয় ভক্ষণ করেন, তিনি পরম-আনন্দে সুরলোকে বিহার করিয়া থাকেন। যিনি শীতক্লেশসহিষ্ণু হইয়া শৈবাল ও বৃক্ষের শীর্ণপত্র ভক্ষণপূৰ্ব্বক কালযাপন করেন, তাহার চরমে পরমগতিলাভ হয়।

“যিনি বায়ু বা ফলমূল ভক্ষণ অথবা সলিলমাত্র পান করিয়া কালাতিপাত করেন, তিনি যক্ষলোকের ঐশ্বৰ্য্যলাভ করিয়া অপ্সরাদিগের সহিত বিহার করিতে সমর্থ হয়েন। যিনি দ্বাদশ বৎসরকাল বিধানানুসারে গ্রীষ্মকালে পাঞ্চাগ্নির মধ্যস্থলে অবস্থান করেন, অথবা যিনি দ্বাদশ বৎসরকাল পান-ভোজন-পরিত্যাগী হয়েন, তাঁহার পরজন্মে পৃথিবীর সাম্রাজ্যলাভ হইয়া থাকে। যিনি অনাবৃতপ্রদেশস্থ স্থণ্ডিলে নিরাসনে উপবেশনপূর্ব্বক প্রফুল্লমনে দ্বাদশবার্ষিক ব্রতের অনুষ্ঠান করিয়া: অনশনে কলেবর পরিত্যাগ করেন, তিনি নিশ্চয়ই দেবলোকে গমনপূর্ব্বক বিবিধ যান, শয়ন ও চন্দ্রের ন্যায় শুভ্রবর্ণ গৃহসমুদয় উপভোগ করিয়া থাকেন। যিনি দ্বাদশবার্ষিক দীক্ষাবসানে মহাসাগরে দেহ পরিত্যাগ করেন, তাহার বরুণলোকলাভ হয়। যিনি দ্বাদশবার্ষিক দীক্ষা সমাপনপূর্ব্বক প্রস্তরদ্বারা আপনার চরণদ্বয় ভেদ করেন, তিনি গুহ্যকগণের মধ্যে বিহার করিতে সমর্থ হয়েন।

“যিনি নির্ব্বন্দ্ব ও নিষ্পরিগ্রহ হইয়া আত্মসাধনপূর্ব্বক দ্বাদশবার্ষিক ব্রতের অনুষ্ঠান করেন, তিনি দেহান্তে দেবলোকে গমন করিয়া দেবগণের সহিত বিহার করিয়া থাকেন। যিনি দ্বাদশবার্ষিক দীক্ষান্তে অগ্নিমধ্যে দেহত্যাগ করেন, তাঁহার ব্রহ্মলোকলাভ হয়। যে ব্রাহ্মণ আত্মাতে আত্মসমাধানপূর্ব্বক ধর্ম্মপরায়ণ ও মমতাশূন্য হইয়া দ্বাদশবার্ষিক দীক্ষা সমাপন করিয়া বৃক্ষে অগ্নি নিক্ষেপপুরঃসর সর্ব্বসমক্ষে দেহত্যাগবাসনায় গমন করেন, তিনি ইন্দ্রলোকে গমনপূর্ব্বক সৰ্ব্বকামসম্পন্ন, দিব্যপুষ্পসমাকীর্ণ ও দিব্যচন্দনচর্চ্চিত হইয়া দেবগণের সহিত পরমসুখে বাস করিয়া থাকেন। যিনি সমস্ত পরিত্যাগপূৰ্ব্বক সত্ত্বগুণাবলম্বী হইয়া দেহত্যাগে উৎসুক হয়েন, তাঁহার অক্ষয়লোকলাভ হইয়া থাকে এবং কামচারীবিমানে আরোহণ পূর্ব্বক নির্ব্বিঘ্নে দেবলোকে ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *