১৩৫তম অধ্যায়
অন্নগ্রহণের ও বর্জ্জনের ক্ষেত্রনির্ণয়
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চতুৰ্ব্বিধ বর্ণের মধ্যে কোন্ কোন্ বর্ণের অন্ন ভোজন করা কর্ত্তব্য, তাহা কীর্ত্তন করুন।
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় ইঁহারা পরস্পর পরস্পরের অন্ন ভোজন করিতে পারেন, কিন্তু কুকর্ম্মান্বিত শূদ্রের অন্ন ভোজন করা কাহারও বিধেয় নহে। বৈশ্য যদি সাগ্নিক ও চাতূর্ম্মাস্যনিরত না হয়, তাহা হইলে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় তাহার অন্ন ভোজন করিবেন না। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য ইহারা শূদ্ৰান্ন ভোজন করিলে ইহাদিগের পৃথিবীর, জলের ও মনুষ্যগণের মল ভক্ষণ করা হয়।
“ব্রাহ্মণাদি বর্ণত্রয় সন্ধ্যাবন্দনাদি কাৰ্য্যের একান্ত অনুরক্ত হইয়াও যদি শূদ্ৰানুষ্ঠেয় কার্য্যে প্রবৃত্ত হয়েন, তাহা হইলে উঁহাদিগকে নিশ্চয়ই চরমে নরকে নিপতিত হইতে হয়। ব্রাহ্মণের বেদাধ্যয়ন ও মানবগণের স্বস্ত্যয়ন [মঙ্গলচিন্তা], ক্ষত্রিয়ের প্রজাপালন ও বৈশ্যের কৃষাদি কাৰ্য্যদ্বারা লোকের পুষ্টিসাধন করাই প্রধান ধর্ম্ম ও কর্ত্তব্য বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে। যদি বৈশ্য কৃষি, বাণিজ্য, গোরক্ষণাদি কর্ত্তব্য কাৰ্য্যদ্বারা জীবিকানিৰ্ব্বাহ করে, তাহা হইলে তাহাতে তাহাদিগের কিছুমাত্র নিন্দা নাই। কিন্তু যে বৈশ্য স্বধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া শূদ্ৰানুষ্ঠেয় কার্য্যে প্রবৃত্ত হয়, সে শূদ্রস্বরূপ তাহার অন্ন ভোজন করা কদাচ কর্ত্তব্য নহে। যেসকল ব্রাহ্মণ অস্ত্রজীবী, চিকিৎসক, পুরাধ্যক্ষ, দৈবজ্ঞ ও দেবল এবং যাঁহারা বেতন গ্রহণপূর্ব্বক অধ্যাপনা করেন, তাঁহারা শূদ্রতুল্য বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকেন। অতএব ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যগণের মধ্যে যাঁহারা তাঁহাদিগের অন্ন ভোজন করেন, তাঁহাদিগকে নিশ্চয়ই অভোজ্যভোজননিবন্ধন ঘোরতর বিপদে নিপতিত হইতে হয় এবং দেহান্তে তাঁহারা কুক্কুরের ন্যায় বীর্য্য, তেজ ও নিকৃষ্ট যোনি লাভ করেন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের পক্ষে চিকিৎসকের অন্ন বিষ্ঠা, পুংশ্চলীর [বেশ্যার] অন্ন মূত্র, বিদ্যোপজীবীর অন্ন, শূদ্রার এবং শিল্পজীবী ও নিন্দিত ব্যক্তির অন্ন শোণিতসদৃশ; ঐ সকল লোকের অন্ন ভক্ষণ না করা সাধুব্যক্তিদিগের অবশ্য কর্ত্তব্য। খলের অন্ন ভক্ষণ করিলে পাপে লিপ্ত হইতে হয়। ব্রাহ্মণ অসৎকৃত ও অবজ্ঞাত অন্ন ভোজন করিলে সহসা তাঁহার পীড়া ও কুলক্ষয় উপস্থিত হয়; অতএব তাহা ভোজন করা কদাচ কৰ্তব্য নহে। পুরাধ্যক্ষের অন্ন ভোজন করিলে চণ্ডালগৃহে, গোহন্তা, ব্রহ্মঘাতক, সুরাপান-নিরত ও গুরুতল্পগামীর অন্ন ভোজন করিলে রাক্ষসকুলে এবং অর্পিত-ধনাপহারী ও কৃতঘ্নের অন্ন ভক্ষণ করিলে দেশবহিষ্কৃত শবরের [শবমাংসভোজর] গৃহে জন্মপরিগ্রহ হয়।
“হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট যাহার অন্ন ভোজন করা কর্ত্তব্য এবং যাহার অন্ন ভোজন করা নিষিদ্ধ, তাহা কীর্ত্তন করিলাম, এক্ষণে আর কি শ্রবণ করিতে তোমার অভিলাষ আছে, তাহা প্রকাশ কর।”
