3 of 4

১৩০. অরুন্ধতীবর্ণিত গোমাহাত্ম্য

১৩০তম অধ্যায়

অরুন্ধতীবর্ণিত গোমাহাত্ম্য

“হে ধৰ্ম্মরাজ। অনন্তর মহর্ষি, পিতৃলোক ও দেবগণ তপঃপরায়ণা ভগবতী অরুন্ধতীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘ভগবতি! আপনি মহর্ষি বশিষ্ঠের ন্যায় ব্রতচারিণী, সচ্চরিত্রা ও তপোবৃদ্ধা। এই নিমিত্ত আমরা আপনার নিকট ধৰ্ম্মরহস্য শ্রবণ করিতে একান্ত অভিলাষী হইয়াছি। অতএব আপনি ধৰ্ম্মের নিগুঢ়তত্ত্বসমুদয় কীৰ্ত্তন করিয়া আমাদিগকে পরিতৃপ্ত করুন।

“তখন, অরুন্ধতী কহিলেন, ‘মহানুভবগণ! আপনারা যে আমার নিকট আগমন করিয়াছেন, ইহাতেই আমার তপঃ পরিবর্দ্ধিত হইয়াছে। এক্ষণে আমি আপনাদিগের অনুগ্রহে ধর্ম্মের নিগূঢ়তত্ত্বসমুদয় কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।

যাঁহারা শ্রদ্ধাসম্পন্ন এবং যাঁহাদিগের মন অতিশয় পবিত্র, তাঁহাদিগের নিকট ধৰ্ম্মরহস্য প্রকাশ করা কর্ত্তব্য। আর যাহারা অশ্রদ্ধান্বিত, অভিমানী, ব্রাহ্মণঘাতক ও গুরুতল্পগামী, তাহাদিগের নিকট ধর্ম্মতত্ত্ব প্রকাশ করা কর্ত্তব্য নহে। যিনি দ্বাদশ বৎসর প্রতিদিন এক-একটি কপিলাদান, প্রতিমাসে যজ্ঞানুষ্ঠান এবং শ্রেষ্ঠ পুষ্করতীর্থে শতসহস্র গোদান করিয়া থাকেন, তিনিও অতিথির সন্তোষসম্পাদক মহাত্মার সদৃশ উৎকৃষ্ট ফলভাগী হইতে পারেন না। এক্ষণে মনুষ্যগণের সুখাবহ আর একটি ধর্ম্মতত্ত্ব কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। যে মনুষ্য প্রভাতে গাত্রোত্থান করিয়া সলিলের সহিত কুশগ্রহণপূৰ্ব্বক গোশৃঙ্গ অভিষিক্ত করেন এবং নিরাহারে সেই গোশৃঙ্গস্খলিত সলিল আপনার মস্তকে ধারণ করিয়া থাকেন, তাঁহার ত্রিলোকমধ্যে সিদ্ধচারণসেবিত যেসমস্ত পবিত্র তীর্থ বিদ্যমান রহিয়াছে, তৎসমুদয়ে স্নান করা হয়, সন্দেহ নাই। অতএব পরমশ্রদ্ধাসহকারে এই কার্য্যের অনুষ্ঠান করা কর্ত্তব্য।

“মহানুভবা অরুন্ধতী এই কথা কহিবামাত্র তত্ৰত্য যাবতীয় দেবতা, পিতৃলোক ও অন্যান্য প্রাণীগণ তাঁহার প্রতি পরম পরিতুষ্ট হইয়া তাঁহাকে বারংবার সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। ঐ সময় ভগবান্ প্রজাপতি তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ভদ্রে। তুমি অত্যাশ্চর্য্য ধৰ্ম্মরহস্য কীৰ্ত্তন করিয়াছ। অতএব আমি প্রীতমনে বরপ্রদান করিতেছি, তোমার তপস্যা প্রতিনিয়ত পরিবর্দ্ধিত হউক।’

যমকর্ত্তৃক বিবিধ দানধর্ম্ম-কীৰ্ত্তন

‘যম কহিলেন, “ভদ্রে! তুমি যে ধর্ম্মতত্ত্ব কীৰ্ত্তন করিলে, তাহা পরমরমণীয় সন্দেহ নাই। এক্ষণে চিত্রগুপ্ত যাহা কহিয়াছেন, আমার প্রীতিকর সেই সমস্ত ধৰ্ম্মানুগত বাক্য শ্রবণ কর। মহর্ষি ও অন্যান্য মনুষ্যদিগের শ্রদ্ধাসহকারে ঐ সমুদয় শ্রবণ করা অবশ্য কর্ত্তব্য।

‘এই জীবলোকে মনুষ্য যেসমস্ত পাপপুণ্য সঞ্চয় করে, তৎসমুদয় কিছুমাত্র বিনষ্ট হয় না। ঐ সমুদয় পূৰ্ব্বকালে সূর্য্যমণ্ডলে সংক্রামিত হইয়া অবস্থান করিয়া থাকে, মনুষ্য লোকান্তরিত [পরলোকপ্রাপ্ত] হইলে সূর্য্যদেব তাহার শুভাশুভ কার্য্যের সাক্ষ্য প্রদান করিয়া থাকেন। তিনি সাক্ষ্য প্রদান করিলে মনুষ্যকে আপনার পাপপুণ্যের ফলভোগ করিতে হয়। অতঃপর যারা মনুষ্যের ধর্ম্মসঞ্চয় হয়, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।

‘মনুষ্য সতত পানীয়, দীপ, পাদুকাযুগল ও ছত্র প্রদান করিবে। পুষ্করতীর্থে বেদপারগ ব্রাহ্মণকে কপিলাদান ও পরমযত্নসহকারে অগ্নিহোত্র রক্ষা করা অতীব কৰ্ত্তব্য। কালক্রমে সকলকেই মৃত্যুমুখে নিপতিত হইয়া লোকান্তরে প্রস্থান করিতে হয়। তথায় অহঙ্কারপরিপূর্ণ অল্পবুদ্ধি মনুষ্যেরা ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় একা নিপীড়িত হইয়া যারপরনাই ক্লেশপ্রাপ্ত হইয়া থাকে। সেই দুর্গতি হইতে মুক্ত হওয়া তাহাদের কোনরূপেই সাধ্যায়ত্ত নহে। অতএব ইহলোকে যে কার্য্য করিলে পরলোকে ঐ বিপদ হইতে উত্তীর্ণ হইতে পারা যায়, তাহার উপায় কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পানীয়দানই ঐ বিপদ উদ্ধারের উৎকৃষ্ট উপায়। উহা অল্পব্যয়েই সম্পাদিত হইতে পারে। পানীয়দান পরলোকে সুখজনক ও উহার ফল অতি মহৎ। যাঁহারা পানীয় দান করেন, তাহাদিগের নিমিত্ত পরলোকে পবিত্রসলিলা নদী প্রস্তুত হইয়া থাকে। উহার জল অক্ষয়, শীতল ও অমৃতের ন্যায় তৃপ্তিকর। পানীয়দাতা পরলোকে সেই নদীর জল পান করিয়া থাকেন।

‘এক্ষণে প্রদীপদান করিলে যে ফল উৎপন্ন হয়, তাহাও কহিতেছি, শ্রবণ কর। যে ব্যক্তি দীপদান করেন, তাঁহাকে আর তমোময় প্রদেশ নিরীক্ষণ করিতে হয় না। চন্দ্র, সূর্য্য ও হুতাশন তাঁহাকে অত্যুৎকৃষ্ট প্রভা প্রদান করিয়া থাকেন। দেবগণ তাঁহার চতুর্দ্দিক উজ্জ্বল দর্শন করেন এবং তিনি স্বয়ং ভাস্করের ন্যায় প্রভাসম্পন্ন হয়েন। অতএব মনুষ্যমাত্রেরই দীপদান করা অবশ্য কৰ্ত্তব্য। অতঃপর বেদপারগ ব্রাহ্মণকে কপিলাদান, বিশেষতঃ পুষ্করতীর্থে কপিলাদানের ফল কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যিনি পুষ্করতীর্থে কপিলাদান করেন, তাঁহার বৃষের সহিত একশত গাভীদানের ফললাভ হয়। পুষ্করতীর্থে একমাত্র কপিলাদানে ব্রহ্মহত্যাসদৃশ ভীষণ পাতকসমুদয় বিলুপ্ত হইয়া থাকে। অতএব পুষ্করতীর্থে কার্ত্তিকী-পূর্ণিমাতে কপিলাদান করা সৰ্ব্বতোভাবে বিধেয়। যিনি সদাচারপরায়ণ ব্রাহ্মণকে পাদুকাযুগল দান করেন, তাঁহার দুঃখ বা বিঘ্ন কিছুই থাকে না। যিনি ছত্রদান করেন তিনি পরলোকে সুখজনক ছায়ালাভ করিয়া থাকেন। ফলতঃ মনুষ্য পাত্ৰাপাত্র বিচার করিয়া যাহা দান করে, তাহার ফল অবশ্যই ফলিত হয়।’

‘তখন ভগবান্ দিবাকর যমের মুখে চিত্রগুপ্তকথিত বাক্য শ্রবণ করিয়া দেবতা ও পিতৃগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘মহানুভবগণ! আপনারা মহাত্মা চিত্রগুপ্তের ধৰ্ম্মরহস্য শ্রবণ করিলেন। যে সমস্ত মনুষ্য শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইয়া ব্রাহ্মণগণকে এই সমস্ত বস্তু প্রদান করেন, তাঁহাদিগের আর কিছুমাত্র ভয় উপস্থিত হয় না। যাহারা ব্রাহ্মণঘাতী ভোঘ্ন, পরদারপরায়ণ, বেদে শ্রদ্ধাশূন্য ও মায়াজীবী, সেই সমস্ত পাপাচারনির পামরদিগের সহিত কথোপকথন করাও অনুচিত। যাহারা অতিশয় কদাচারী তাহাদিগের সহিত সংস্রব রাখিতে নাই। উহারা লোকান্তরিত হইয়া নিশ্চয়ই পূয়শোণিতভোজী কৃমির ন্যায় নরকে নিপতিত হইয়া থাকে। পিতৃগণ, দেবতাগণ, স্নাতক ব্রাহ্মণ ও তপোধনগণ এরূপ দুরাচারদিগের সহিত বাক্যালাপ পরিহার করিতে সতত যত্নবান্ হইবেন।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *