১২৭তম অধ্যায়
সূর্য্যপ্রমুখ অঙ্গিরা-আদি-মহর্ষিগণের মহোপদেশ
“সূর্য্য কহিলেন, ‘পূর্ণিমাতে চন্দ্রোদয় হইলে যে ব্যক্তি ভগবান্ নিশানাথের অভিমুখীন হইয়া তাঁহার উদ্দেশে এক অঞ্জলি জল ও ঘৃতমিশ্রিত আতপতণ্ডুল প্রদান করেন, তাঁহার গার্হপত্যাদি অগ্নিত্রয়ে আহুতি-প্রদানের ফললাভ হয়। অমাবস্যাতে ফলপুষ্পপরিশোভিত পাদপের কথা দূরে থাকুক, একটিমাত্র পত্রসম্পন্ন বৃক্ষচ্ছেদন করিলেও ব্রহ্মহত্যাপাপে লিপ্ত হইতে হয়। অমাবস্যায় দন্তকাষ্ঠদ্বারা দন্তধাবন করিলে চন্দ্রমার হিংসা করা হয়। যে ব্যক্তি ঐরূপ কার্য্য করে, পিতৃগণ তাহার প্রতি নিতান্ত ক্রূদ্ধ হয়েন। দেবগণ পৰ্ব্বকালে তাহার প্রদত্ত হবিঃ পরিগ্রহ করেন না এবং তাহার বংশ ক্রমশঃ ক্ষীণ হইয়া যায়।
শ্রী কহিলেন, ‘যে ব্যক্তির গৃহে মহিলাগণ প্রহারযন্ত্রণা ভোগ করে এবং পানভোজনপাত্র ও আসনসমুদয় ইতস্ততঃ বিকীর্ণ হইয়া থাকে, দেবতা ও পিতৃগণ পৰ্ব্ব-উপলক্ষ্যে তাহার সেই পাপময় গৃহে কদাচ হব্যকব্য ভোজন করেন না।
“অঙ্গিরা কহিলেন, ‘যে ব্যক্তি সংবৎসরকাল সুবর্চ্চলা লতার [সূর্য্যমুখী পুষ্পবৃক্ষের লতার] মূল হস্তে ধারণপূর্ব্বক করঞ্জক [করঞ্জা] বৃক্ষের মূলে দীপ প্রদান করেন, তাঁহার প্রজাগণ পরিবর্দ্ধিত হয়।’
“গার্গ্য কহিলেন, ‘অতিথিসঙ্কার, যজ্ঞশালায় দীপদান, পূষ্করতীর্থের নামকীর্ত্তন এবং দিবানিদ্রা, মাংসভোজন ও গোব্রাহ্মণের হিংসা পরিত্যাগ করা অবশ্য কর্ত্তব্য। পণ্ডিতেরা ঐ সমুদয় কার্য্যকে মহাফলপ্রদ শ্রেষ্ঠ ধর্ম্ম বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন। শত শত যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলেও তৎসমুদয়ের ফল ক্ষীণ হইতে পারে, কিন্তু শ্রদ্ধান্বিত হইয়া নিরন্তর পূর্ব্বোক্ত অতিথিসৎকারাদি ধর্ম্ম প্রতিপালন করিলে তাহার ফল কদাচ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। কোন ব্যক্তি শ্রাদ্ধ, দৈবকার্য্য, তীর্থযাত্রা বা পর্ব্ব উপলক্ষ্যে হবনীয় দ্রব্য আহরণ করিলে যদি রজঃস্বলা, শ্বিত্ররোগগ্ৰস্তা বা পুত্রিবিহীনা স্ত্রী উহা দর্শন করে, তাহা হইলে দেবগণ নিশ্চয়ই তাহার ঐ দ্রব্যভোজনে পরাঙ্মুখ হয়েন এবং পিতৃগণ ত্রয়োদশ বর্ষ তাহার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন। শুক্লবস্ত্র পরিধানপূর্ব্বক পবিত্ৰমনে ব্রাহ্মণদ্বারা স্বস্তিবাচন ও ভারত পাঠ করাইয়া যজ্ঞানুষ্ঠান করিলে অক্ষয়ফল লাভ হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই।
“ধৌম্য কহিলেন, ‘ভগ্নভাণ্ড [ভাঙ্গা পাত্র], ভগ্নখট্বা [ভাঙ্গা খাট], কুক্কুর, কুক্কুট ও আবাসমধ্যে সঞ্জাত বৃক্ষ নিতান্ত অমঙ্গলজনক। যে ব্যক্তির গৃহে ভগ্নভাণ্ড থাকে, তাহাকে সতত কলহে কালাতিপাত করিতে হয়; যাহার গৃহে ভগ্নখট্বা থাকে, তাহার ধনক্ষয় হয় এবং যে ব্যক্তি স্বীয় গৃহে কুক্কুট ও কুক্কুরদিগকে পোষণ করে, দেবগণ তাহার হবনীয় দ্রব্য পরিত্যাগ করিয়া থাকেন। অতএব ভগ্নভাণ্ড ও ভগ্নখট্বা পরিত্যাগ করা এবং কুক্কুর ও কুক্কুটদিগের পোষণ না করা সৰ্ব্বতোভাবে বিধেয়। আর বৃক্ষমূলে সর্প ও বৃশ্চিকাদি বাস করিবার সম্ভাবনা, সুতরাং আবাসমধ্যে বৃক্ষ রোপণ করা কদাপি কৰ্ত্তব্য নহে।
“জমদগ্নি কহিলেন, ‘যে ব্যক্তির হৃদয় অপবিত্র, সে এক অশ্বমেধ, শত বাজপেয় ও অন্যান্য নানাবিধ কঠোর যজ্ঞের অনুষ্ঠান অথবা অধঃশিরা হইয়া তপস্যা করিলেও তাহাকে নিরয়গামী হইতে হয়। মনের শুদ্ধি, যজ্ঞ ও সত্যের সমান বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। পূর্ব্বকালে এক উঞ্ছবৃত্তি ব্রাহ্মণ বিশুদ্ধমনে ব্রাহ্মণকে একপ্রস্থ শক্তুদান করিয়া ব্রহ্মলোক লাভ করিয়াছিলেন।’ ”
