১২৬তম অধ্যায়
বিষ্ণুপ্রীতিকর কতিপয় কার্য্য
“হে ধৰ্ম্মরাজ! পিতৃগণ এই কথা কহিয়া তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলে দেবরাজ ইন্দ্র বিষ্ণুকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! কোন্ কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিলে আপনি প্রীত হইয়া থাকেন, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।’
‘“বিষ্ণু কহিলেন, ‘পুরন্দর! ব্রাহ্মণের নিন্দা আমার নিতান্ত অসহ্য। ব্রাহ্মণগণকে পূজা করিলেই আমি সাতিশয় সন্তুষ্ট হই। যাহারা নিয়ত ব্রাহ্মণদিগের অভিবাদন, ভোজনান্তে আমার পদদ্বয় বন্দন ও চক্রপূজা করে, আমি তাহাদিগের প্রতি পরম পরিতুষ্ট থাকি। যাহারা উৎখাত মৃত্তিকা মস্তকে ধারণ এবং বামন ব্রাহ্মণ ও সলিলোত্থিত বরাহ দর্শন করিয়া নমস্কার করে, তাহাদিগের অমঙ্গল বা পাপের লেশমাত্রও থাকে না। যাহারা অশ্বত্থবৃক্ষ, গোরোচনা ও গাভীকে পূজা করে, তাহাদিগের জগৎসংসার পূজা করা হয়। আমি ঐ সমুদয় পদার্থেই অধিষ্ঠান করিয়া পূজা গ্রহণ করি। যত দিন জগৎ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, তত দিন অবধি আমি ঐ প্রকার পূজাতে প্রীতিলাভ করিয়া থাকি। যাহারা অশ্বত্থবৃক্ষ, গোরোচনা ও গাভীর পূজায় পরাঙ্মুখ হইয়া অন্য প্রকারে আমার পূজা করে, আমি কখনই তাহাদিগের পূজাগ্রহণ করি না; সুতরাং তাহাদের কিছুমাত্র ফললাভের সম্ভাবনা নাই।
“ইন্দ্র কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি প্রজাবর্গের সৃষ্টি ও সংহার করিয়া থাকেন। আপনি সমুদয় ভূতের প্রকৃতিস্বরূপ; তবে কি নিমিত্ত কেবল বামন ব্রাহ্মণ, সলিলোত্থিত বরাহ, চক্র, উৎখাত মৃত্তিকা ও পাদদ্বয়ের প্রশংসা করিলেন?
“তখন ভগবান বিষ্ণু ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, ‘আমি চক্ৰদ্বারা দৈত্যগণের সংহার, চরণদ্বারা পৃথিবী আক্রমণ, বরাহমুৰ্ত্তি ধারণ করিয়া হিরণ্যকশিপুকে বিনাশ এবং বামনরূপ ধারণ করিয়া বলিকে পরাজয় করিয়াছি। এই নিমিত্ত ঐ সমুদয়ের সৎকার করিলে আমি পূজিত ও পরম পরিতুষ্ট হইয়া থাকি। যাহারা ঐরূপে আমার পূজা করে, কুত্রাপি তাহাদিগের পরাভব নাই। ব্রহ্মচারী ব্রাহ্মণকে সমাগত সন্দর্শন করিয়া তাহাকে অগ্রভাগ প্রদানপূর্ব্বক ভোজন করিলে অমৃতভোজন করা হয়। যে ব্যক্তি প্রাতঃসন্ধ্যার উপাসনা করিয়া সূৰ্য্যাভিমুখে অবস্থান করে, তাহার সমুদয় তীর্থস্নানের ফললাভ হয় এবং পাপের লেশমাত্রও থাকে না। এই আমি পরম গুহ্য বিষয় ব্যক্ত করিলাম। এক্ষণে আর কি কহিতে হইবে, তাহা কীৰ্ত্তন কর।’
“বিষ্ণু এই কথা কহিয়া নিরস্ত হইলে, বলদেব কহিলেন, ‘এক্ষণে মানবগণের এক সুখাবহ রহস্য কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। নির্ব্বোধ ব্যক্তিরা ঐ রহস্য অবগত না হইয়া নিতান্ত ক্লেশে নিপতিত হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি প্রাতঃকালে গাত্রোত্থান করিয়া গাভী, ঘৃত, দধি, সর্ষপ ও প্রিয় স্পর্শ করে, তাহার পাপের লেশমাত্রও থাকে না। অগ্র ও পশ্চাদ্ভাগস্থিত ভূতগণের অপসারণ করা এবং শূদ্রের উচ্ছিষ্ট দর্শন না করা তপোধনগণের অবশ্য কৰ্ত্তব্য।
ধৰ্ম্মাদি দেবগণনির্দ্দিষ্ট বিবিধ সৎকার
“দেবগণ কহিলেন, ‘যে ব্যক্তি উদকপূর্ণ তাম্ৰপাত্র গ্রহণ করিয়া উপবাস ও ব্রতের সংকল্প করে, আমরা তাহার প্রতি প্রীত হইয়া। থাকি এবং তাহার সমুদয় কামনা সফল হয়। অল্পবুদ্ধি মানবগণই ইহার অন্যথাচরণ করিয়া ফললাভে বঞ্চিত হয়। উপবাসের সঙ্কল্প এবং বলিপ্রদানবিষয়ে তাম্ৰপাত্ৰই প্রশস্ত। তাম্রপাত্রে করিয়াই বলি, ভিক্ষা, অর্ঘ্য ও পিতৃলোকের উদ্দেশ্যে তিলোদক দান করা কর্ত্তব্য। ইহার অন্যথাচরণ করিলে অপেক্ষাকৃত অল্পফললাভ হয়। আমরা যাহাতে সন্তুষ্ট হইয়া থাকি, এই তাহা কীৰ্ত্তন করিলাম।
“ধৰ্ম্ম কহিলেন, ‘ব্রাহ্মণ রাজপুরুষ, স্তুতিপাঠক, পরিচারক, গোরক্ষক, বণিক, শিল্পী, নট, মিত্রদ্রোহী, বেদাধ্যয়নবিমুখ বা শূদ্ৰাপতি হইলে তাহাকে হব্যকব্য প্রদান করা কদাচ কর্ত্তব্য নহে। ঐরূপ ব্রাহ্মণকে শ্রাদ্ধীয় অন্ন প্রদান করিলে শ্রাদ্ধকর্ত্তার পিতৃগণ কখনই পরিতৃপ্ত হয়েন না; প্রত্যুত বংশনাশ হইয়া থাকে। যাহার গৃহ হইতে অতিথি পরাঙ্মুখ হইয়া প্রস্থান করে, তাহার গৃহ হইতে অগ্নি, দেবতা ও পিতৃগণও নিরাশ হইয়া প্রতিনিবৃত্ত হয়েন। যে ব্যক্তি অতিথির সমাদর না করে, তাহাকে স্ত্রীহত্যা, গোহত্যা, ব্রহ্মহত্যা, গুরুপত্নীহরণ ও কৃতঘ্নতাজনিত পাপে লিপ্ত হইতে হয়।’
“অগ্নি কহিলেন, ‘এক্ষণে ব্রাহ্মণ, গাভী ও অনলের উপর পদাঘাত করিলে যে দোষ হয়, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, অবহিতচিত্তে শ্রবণ কর। যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণ, গাভী ও অনলের উপর পদাঘাত করে, তাহার অযশের পরিসীমা থাকে না। তাহার পিতৃগণ ভীত এবং দেবগণ তাহার প্রতি বিরক্ত হইয়া থাকেন। হুতাশন কখনই তাহার আহুতি গ্রহণ করেন না। তাহাকে শতজন্ম নরকভোগ করিতে হয় এবং কিছুতেই তাহার নিষ্কৃতিলাভ হয় না। অতএব মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তির ব্রাহ্মণ, গাভী ও অনলে পদাঘাত করা কদাচ কর্ত্তব্য নহে।
“বিশ্বামিত্র কহিলেন, ‘যে ব্যক্তি ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষীয় মঘাত্রয়োদশীতে গচ্ছায়াযোগে মধ্যাহ্নকালে দক্ষিণাভিমুখে উপবিষ্ট হইয়া পিতৃগণকে পরমান্ন প্রদান করে, তাহার ত্রয়োদশ বৎসরকৃত শ্রাদ্ধের ফললাভ হয়।’
“গাভীগণ কহিল, ‘যে ব্যক্তি “হে সমঙ্গে! হে অকুতোভয়ে! হে ক্ষেমে! হে সখি! হে ভূয়সি! তুমি বৎসের সহিত বিদ্যমান হইয়া ব্ৰহ্মপুরে ইন্দ্রের যজ্ঞস্থলে অবস্থান করিয়াছিলে; তুমি আকাশপথ ও অগ্নিপথে অবস্থান করিলে দেবগণ নারদের সহিত একত্র হইয়া তোমাকে সৰ্ব্বসহা নাম প্রদান করিয়াছেন” এই বলিয়া যে গাভীর অর্চ্চনা করে, তাহার পাপের লেশমাত্রও থাকে না। সে ইন্দ্রলোক, গোলোক ও চন্দ্রসদৃশ কান্তি লাভ করিতে সমর্থ হয়। যে ব্যক্তি পৰ্ব্বসময়ে গোষ্ঠমধ্যে ঐ পূৰ্ব্বোক্ত বাক্য উচ্চারণ করে, তাহার পাপ, ভয় ও শোকের লেশমাত্রও থাকে না এবং সে অনায়াসে ইন্দ্রলোকে গমন করিয়া থাকে। গাভীগণ এই কথা বলিয়া নিরস্ত হইল।
“ঐ সময়ে বশিষ্ঠ প্রভৃতি জগদ্বিখ্যাত সপ্তমহর্ষি কমলযোনি ব্ৰহ্মাকে পরিবেষ্টন করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে অবস্থান করিতেছিলেন। তন্মধ্যে দ্বিজবর বশিষ্ঠ তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! ইহলোকে যেসকল ব্যক্তি সচ্চরিত্র অথচ দরিদ্র, তাহাদিগের কিরূপে যজ্ঞফললাভ হইবে, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।’
“তখন প্রজাপতি ব্রহ্মা তাঁহাদিগের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, ‘তপোধনগণ! তোমরা মানবগণের শ্রেয়স্কর অতি উৎকৃষ্ট গূঢ় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়াছ। এক্ষণে মানবগণ যেরূপে যজ্ঞফল লাভ করে, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যে ব্যক্তি পৌষমাসে শুক্লপক্ষে রোহিণীনক্ষত্রে স্নাত ও পবিত্র হইয়া একবস্ত্র পরিধানপূর্ব্বক অনাবৃত প্রদেশে নির্ম্মিত মঞ্চাদির উপর শয়ন করিয়া সমাহিতচিত্তে চন্দ্রের কিরণ পান করে, তাহার নিশ্চয়ই মহর্ষিজ্ঞের ফললাভ হয়। হে তপোধনগণ! তোমরা আমাকে যে পরমরহস্য জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে, এই তাহা কীৰ্ত্তন করিলাম।”
