১২১তম অধ্যায়
সৎপাত্রে দানের প্রশংসা
“হে ধৰ্ম্মরাজ! মহর্ষি বেদব্যাস এই কথা কহিলে, মহামতি মৈত্রেয় তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি যাহা কহিতেছেন, তদ্বিষয়ে আর কিছুমাত্র সংশয় নাই। এক্ষণে আপনি যদি অনুমতি করেন, তাহা হইলে আমিও এই বিষয়ে কিছু করিতে ইচ্ছা করি।’
“ব্যাস কহিলেন, ‘মৈত্রেয়! এই বিষয়ে তোমার যাহা কিছু বক্তব্য আছে, তাহা অসঙ্কুচিতচিত্তে প্রকাশ কর। তোমার বাক্য শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ হইয়াছে।’
“তখন মৈত্রেয় কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি বিদ্বান ও তপঃপরায়ণ; আপনি যে-দানসংক্রান্ত কথা কহিয়াছিলেন, উহা নির্দ্দোষ ও বিশুদ্ধ। আপনি অতি সদাশয় ও পবিত্র স্বভাব। আপনি আমার আলয়ে আতিথ্যস্বীকার করাতে আমি কৃতার্থ হইয়াছি। এক্ষণে আমি বুদ্ধিবলে আপনাকে সিদ্ধ তপস্বী বলিয়া জ্ঞান করিতেছি। আপনার দর্শনমাত্রেই যে আমাদিগের অভ্যুদয় লাভ হয়, কেবল আপনার অনুগ্রহই তাহার কারণ। আর আমার প্রতি আপনার যে অনুগ্রহদৃষ্টি নিপতিত হইয়াছে, তাহাও আমার কৰ্ম্মফলনিবন্ধন সন্দেহ নাই।
‘যিনি তপপানিরত, বেদজ্ঞানসম্পন্ন ও বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণকুলে সমুদ্ভূত, তাঁহাকেই যথার্থ ব্রাহ্মণ বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। ব্রাহ্মণের তৃপ্তি উৎপাদন করিতে পারিলেই দেবতা ও পিতৃগণ তুষ্টিলাভ করেন। ব্রাহ্মণ ব্যতিরেকে জ্ঞানবাদিগের আরাধ্য আর কেহ নাই। ব্রাহ্মণ না থাকিলে সমুদয় জগৎ অন্ধকারময় হইয়া থাকে এবং বর্ণচতুষ্টয়-বিচার, ধর্ম্মাধর্ম্ম ও সত্যাসত্য কিছুই বিদ্যমান থাকে না। যেমন উৎকৃষ্ট ক্ষেত্রে বীজ বপন করিলে কৃষক উৎকৃষ্ট ফল লাভ করে, সেইরূপ জ্ঞানবান্ ব্রাহ্মণকে দান করিলে দাতা উৎকৃষ্ট ফললাভে সমর্থ হয়েন, সন্দেহ নাই। শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন, সচ্চরিত্র ও দানগ্রহণের উপযুক্ত ব্রাহ্মণ যদি বিদ্যমান না থাকিতেন, তাহা হইলে ধনীদিগের ধন নিতান্ত অনর্থক হইত। অবিদ্বান্ ব্রাহ্মণকে অন্ন প্রদান করিলে সেই অন্নদ্বারা দাতার কিছুমাত্র ধর্ম্মলাভ হয় না, প্রত্যুত উহা দাতা ও গ্রহীতা উভয়েরই অধৰ্ম্ম উৎপাদন করিয়া থাকে।
‘ব্রহ্মচারী ও সন্ন্যাসীরা গৃহস্থের অন্ন ভোজন করিলে তাহার শ্রীবৃদ্ধি হয়, এই নিমিত্ত উঁহারা গৃহস্থের অন্ন ভক্ষণ করিবেন; কিন্তু গৃহস্থের পরান্ন ভোজন করা কদাপি বিধেয় নহে। কারণ, গৃহস্থ। যাহার অন্ন ভোজন করিয়া যে-সন্তান উৎপন্ন করে, সে-সন্তান সেই অন্নদাতারই হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই। গ্রহীতা অন্ন গ্রহণ না করিলে অন্নের বৃদ্ধি হয় না এবং অন্নের বৃদ্ধি না হইলে দাতারও দানে প্রবৃত্তি জন্মে না। সুতরাং দাতা ও গ্রহীতা উভয়েই উভয়ের উপকার সম্পাদন করিয়া থাকে। ফলতঃ শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন সচ্চরিত্র ব্রাহ্মণদিগকে অন্নাদি দান করিলেই উহা ইহলোক ও পরলোকে পবিত্র ফল প্রসব করিয়া থাকে। যাঁহারা সদ্বংশজাত, তপপানিরত, দাতা ও অধ্যয়নশীল, তাঁহারাই সকলের পূজ্য। যাঁহারা সেই সমস্ত স্বর্গপ্রদ সাধুগণের নির্দ্দিষ্টপথে বিচরণ করিয়া থাকেন, তাহাদিগকে কদাচই মোহিত হইতে হয় না।’ ”
