১১৮তম অধ্যায়
কীটের প্রতি ব্যাসের আশ্বাস—ক্ষত্রিয়ত্ব প্রদান
“হে ধৰ্ম্মরাজ! তখন মহর্ষি বেদব্যাস সেই কীটকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘হে কীট! তুমি তির্য্যগ্যোনি লাভ করিয়াও কেবল আমার দর্শনলাভনিবন্ধনই একেবারে মুগ্ধ হইতেছ না। আমি তপোবলে দর্শনমাত্রেই সকলকে পরিত্রাণ করিতে পারি। তপোবল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠবল আর কিছুই নাই। আমি তপোবলে বিলক্ষণ অবগত হইতেছি যে, তুমি স্বীয় পূৰ্ব্বকৃত পাপপ্রভাবে কীটত্বলাভ করিয়াছ। যদি তুমি এক্ষণে ধৰ্ম্মে আস্থা প্রদর্শন কর, তাহা হইলে নিশ্চয়ই পুনরায় ধর্ম্মলাভে সমর্থ হইবে। কি দেবতা, কি তির্য্যগযোনি, কি মনুষ্য, সকলকেই এই কৰ্ম্মভূমিতে অনুষ্ঠিত কর্ম্মের ফলভোগ করিতে হয়। মনুষ্য বিদ্বান্ হউক বা মূঢ়ই হউক, দেহান্তে কৰ্ম্মফল কখনই তাহাকে পরিত্যাগ করে না। যাহা হউক, যে ব্রাহ্মণ জীবিত থাকিয়া চন্দ্ৰসূৰ্য্যের পূজা করে, অতঃপর তুমি সেই ব্রাহ্মণকুলে জন্মপরিগ্রহ করিয়া অনায়াসে রূপরসাদি বিষয়সমুদয় উপভোগ করিতে পারিবে। ঐ সময় আমি তোমাকে ব্রহ্মবিদ্যা প্রদান করিব এবং তুমি যে লোকে গমন করিতে বাসনা করিবে, তথায় লইয়া যাইব।
‘মহর্ষি দ্বৈপায়ন এই কথা কহিলে কীট তাঁহার বাক্যে সম্মত হইয়া পথিমধ্যে অবস্থান করিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে সেই শকট তথায় সমুপস্থিত হইলে তাহার চক্রাঘাতে উহার প্রাণবিয়োগ হইল। তখন ক্রমে ক্রমে শল্লকী, গোধা, বরাহ, মৃগ, পক্ষী, চণ্ডাল, শূদ্র ও বৈশ্যযোনিতে পরিভ্রমণ করিয়া পরিশেষে ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করিল। শল্লকী প্রভৃতি পূর্ব্বোক্ত সমুদয় যোনিতেই সে বেদব্যাসের সহিত সাক্ষাৎকার করিয়াছিল। এক্ষণে ক্ষত্রিয়যোনিতে জন্মগ্রহণ করিয়া সে পূর্ব্বের ন্যায় মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়নের সমীপে গমনপূর্ব্বক তাঁহার চরণে নিপতিত হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিল, ‘ভগবন্! আমি আপনার প্রসাদবলে কীটত্ব হইতে ক্রমে ক্রমে ক্ষত্রিয়ত্ব লাভ করিয়া রাজা হইয়াছি। এক্ষণে আমি সুবর্ণমাল্যধারী মহাবলপরাক্রম কুঞ্জরগণের পৃষ্ঠে এবং কাম্বোজদেশীয় অশ্ব, উষ্ট্র ও অশ্বতরগণযুক্ত বিবিধ যানে আরোহণ করিতেছি। প্রতিদিন বন্ধুবান্ধব ও অমাত্যগণের সহিত একত্র পলান্ন ভোজন করিয়া থাকি; নিৰ্ব্বাত গৃহমধ্যে অতি উৎকৃষ্ট মহার্হ্য শয্যায় শয়ন করিয়া পরমসুখে রজনী অতিবাহিত করি। রজনীশেষে দেবতারা যেমন দেবরাজ ইন্দ্রের স্তব করেন, তদ্রূপ সূত, মাগধ ও বন্দিগণ আমার স্তব পাঠ করিয়া থাকে। হে ভগবন্! আমি এইরূপে আপনার তপোবলে ক্ষত্রিয়ত্ব লাভ করিয়া পরম সুখসম্ভোগ করিতেছি; অতএব আপনাকে নমস্কার। এক্ষণে আমি কি কার্য্যের অনুষ্ঠান করিব, তাহা আদেশ করুন।
‘তখন ব্যাসদেব তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, রাজন্! আজ তুমি বিবিধ বাক্যবিন্যাসদ্বারা আমাকে স্তব করিলে। পূৰ্ব্বে কীটযোনিতে তোমার স্মরণশক্তি কলুষিত হইয়াছিল। যাহা হউক, তুমি পূর্ব্বে শূদ্ৰযোনিতে আততায়ী ও অতি নৃশংস হইয়া যে পাপসঞ্চয় করিয়াছিলে, অদ্যাপি তোমার সে পাপ ধ্বংস হয় নাই। পূৰ্ব্বজন্মে, তোমার যৎকিঞ্চিৎ পুণ্যসঞ্চয় ছিল বলিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎকার এবং আমার অর্চ্চনাদ্বারা ক্ষত্রিয়ত্বলাভ হইয়াছে। অতঃপর তুমি গোধন ও ব্রাহ্মণের নিমিত্ত সমরাঙ্গনে প্রাণপরিত্যাগ করিয়া ব্রাহ্মণ্যলাভে সমর্থ হইবে এবং পরিশেষে সদক্ষিণ যজ্ঞসমুদয়ের অনুষ্ঠানপূৰ্ব্বক পরলোকে অক্ষয় ব্রহ্মস্বরূপ হইয়া অনন্তকাল পরমসুখে কালাতিপাত করিতে পারিবে।”
