3 of 4

১১৭. আত্মপ্রাণের উন্নতিকামনা—ব্যাস-কীটসংবাদ

১১৭তম অধ্যায়

আত্মপ্রাণের উন্নতিকামনা—ব্যাস-কীটসংবাদ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! সংগ্রামে প্রাণত্যাগ করা যে নিতান্ত দুষ্কর, তাহা আপনার অবিদিত নাই। ইহলোকে কি ধনবান, কি নিৰ্দ্ধন, কি পুণ্যবান, কি পাপাত্মা সকলেরই মৃত্যু হইতে ভয় উপস্থিত হইয়া থাকে; অতএব আপনি উহার কারণ এবং সমরে প্রাণত্যাগ করিলে কিরূপ গতিলাভ হয়, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! তুমি অতি উৎকৃষ্ট প্রশ্ন করিয়াছ। এক্ষণে আমি বেদব্যাস-কীটসংবাদ নামক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তনচ্ছলে উহার উত্তর প্রদান করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বকালে একদা সৰ্ব্বজন্তুর ভাষাভিজ্ঞ ও গতিজ্ঞ বেদবেত্তা বেদব্যাস কোন স্থানে ভ্রমণ করিতে করিতে এক কীটকে শকটমার্গে [গাড়ী-চলাচল করার পথে] ধাবমান হইতে দেখিয়া তাহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘হে কীট! তোমাকে নিতান্ত ভীত ও ত্বরান্বিত দেখিতেছি, অতএব তুমি স্বীয় ভয়ের কথা ব্যক্ত কর।’

“তখন কীট কহিল, ‘ভগবন্! ঐ দূরবর্ত্তী শকটের যেরূপ ভীষণ শব্দ শ্রুতিগোচর হইতেছে এবং শকটবাহী বৃষগণ সারথির কশাঘাতে তাড়িত হইয়া যেরূপ ঘন ঘন নিশ্বাস পরিত্যাগ করিতেছে, মাদৃশ ক্ষুদ্র কীট কখনই উহা শ্রবণ করিয়া সুস্থচিত্তে অবস্থান করিতে সমর্থ হয় না। আমি ঐ শব্দশ্রবণে নিতান্ত আকুলিত হইয়া প্রাণভয়ে পলায়ন করিতেছি। ইহলোকে সমুদয় প্রাণীরই জীবন সুদুর্ল্লভ এবং মৃত্যু নিতান্ত দুঃখজনক। এই নিমিত্ত মৃত্যুমুখে প্রবেশ করিতে আমার প্রবৃত্তি হয় না।

“কীট এই কথা কহিলে, মহর্ষি বেদব্যাস তাহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘হে কীট! তুমি যখন তির্য্যগযোনিতে জন্মগ্রহণ করিয়াছ, তখন তোমার সুখলাভের প্রত্যাশা কি? তুমি রূপরসাদি বিষয়সমূহের সম্যকরূপে আস্বাদগ্রহণ করিতে সমর্থ হও না, সুতরাং আমার মতে তোমার মরণই শ্রেয়স্কর।’

“তখন কীট কহিল, ‘ভগবন! জীবমাত্রেই ইহলোকে সুখভোগ করিতে সমর্থ হয়, এই নিমিত্ত আমি এই নিকৃষ্ট জন্মেও সুখলাভের প্রত্যাশা করিয়া জীবিত থাকিতে বাসনা করিতেছি। কি মনুষ্য, কি তির্য্যগযোনিগত প্রাণীগণ সকলেই জন্মাবধি পৃথক পৃথক বিষয়ভোগের অধিকারী হয়। পূর্ব্বজন্মে আমি এক বিপুল ধনশালী শূদ্র ছিলাম। ঐ জন্মে আমি সতত ব্রাহ্মণের দ্বেষ করিতাম। আমার তুল্য নৃশংস, কদর্য্যস্বভাব, বৃদ্ধিজীবী, দুর্ম্মুখ, ছলগ্রাহী, হিংসাপরতন্ত্র, বঞ্চক, পরস্বাপহারী প্রায় কেহই ছিল না। আমি ভৃত্য ও অতিথিদিগকে ভোজন না করাইয়া স্বয়ং সুস্বাদু বস্তু ভোজন করিতাম। অর্থলালসানিবন্ধন দেবপূজা বা পিতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষ্যে কখন অন্নদান করি নাই। যাহারা ভীত হইয়া আমার শরণাপন্ন হইত, আমি তাহাদিগকে পরিত্রাণ না করিয়া অকারণে পরিত্যাগ করিতাম। লোকের ধনধান্য, উৎকৃষ্ট স্ত্রী, যান ও বস্ত্র প্রভৃতি ঐশ্বর্য্য দর্শন করিলেই আমার অসূয়া উপস্থিত হইত। আমি কদাপি অন্যের সুখ বা ঐশ্বর্য্য দর্শন করিয়া সুস্থচিত্তে অবস্থান করিতে সমর্থ হইতাম না। সৰ্ব্বদা আত্মকামনা পরিপূর্ণ এবং অন্যের ধর্ম্ম, অর্থ ও কাম বিলুপ্ত করিতে চেষ্টা করিতাম। এক্ষণে আমাকে সেই পূৰ্ব্বকৃত নৃশংস ব্যবহারসমুদয় স্মরণ করিয়া যারপরনাই অনুতাপ করিতে হইতেছে। আমি এইরূপে পূৰ্ব্বজন্মে সকার্য্যের ফল পরিজ্ঞাত হইতে না পারিয়া কদাচ কোন সকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করি নাই; কেবল বৃদ্ধা জননীর সেবা ও একদিন এক কুলশীলসম্পন্ন অতিথি আমার গৃহে উপস্থিত হইলে তাহার যথোচিত সৎকার করিয়াছিলাম, সেই নিমিত্ত অদ্যাপি জন্মান্তরীণ কার্য্যসমুদয় আমার স্মৃতিপথে জাগরূক রহিয়াছে। এক্ষণে আমি সকর্ম্মদ্বারা পুনরায় সুখলাভের বাসনা করিতেছি, অতএব আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমাকে সময়োচিত হিতোপদেশ প্রদান করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *