১১৪তম অধ্যায়
অহিংসধৰ্ম্মব্যাখ্যাচ্ছলে দানাদির প্রশংসা
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! সুরাচার্য্য প্রস্থান করিলে ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির শরশয্যায় শয়ান শান্তনুতনয়কে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, “পিতামহ! ব্রাহ্মণ ও মহর্ষিগণ বেদপ্রমাণানুসারে অহিংসধৰ্ম্মেরই সবিশেষ প্রশংসা করেন। এক্ষণে জিজ্ঞাস্য এই, মনুষ্য কায়মনোবাক্যে হিংসা করিয়া কিরূপে দুঃখ হইতে বিমুক্ত হইতে পারে?”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! কোন জীবকে বিনাশ ও ভক্ষণ, মনোমধ্যে তদ্বিষয়ের আন্দোলন ও অন্যকে তদ্বিষয়ে উপদেশ প্রদান না করা সৰ্ব্বতোভাবে কৰ্ত্তব্য। ব্রহ্মবাদীরা এই কারণে অহিংসধৰ্ম্মকে চারি প্রকার বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছেন। ঐ চারিটির মধ্যে অন্যতরের অভার উপস্থিত হইলে অহিংসধৰ্ম্ম আর আস্পদ[স্থান—ক্ষেত্র]লাভে সমর্থ হয় না। চতুষ্পদ জন্তু যেমন এক পদের অভাব উপস্থিত হইলে ক্ষণকালও দণ্ডায়মান থাকিতে পারে না, সেইরূপ এই অহিংসধৰ্ম্মের একাংশ হীন হইলে ইহার স্থায়িতার বিলক্ষণ ব্যাঘাত জন্মে। যেমন হস্তীর পদচিহ্নে অন্যান্য জন্তুর পদচিহ্ন অন্তর্ভূত হইয়া থাকে, সেইরূপ এই অহিংসধৰ্ম্মে অন্যান্য ধৰ্ম্মসমুদয় সম্পূর্ণরূপে সমাবিষ্ট হয়। মনুষ্য কায়মনোবাক্যে হিংসা করিলে তাহাকে তজ্জনিত পাপে লিপ্ত হইতে হয়। আর যিনি কায়মনোবাক্যে প্রাণীহিংসায় প্রবৃত্ত হয়েন না এবং কদাপি মাংসভক্ষণ করেন না, তিনি সর্ব্বপাপ হইতে বিমুক্ত হইয়া থাকেন। মাংসভক্ষণাভিলাষ, মাংসভক্ষণে উপদেশ প্রদান ও মাংসভক্ষণদ্বারা হিংসাজনিত পাপ জন্মে, এই নিমিত্ত তপঃপরায়ণ, মহর্ষিগণ মাংসাহার করেন না। এক্ষণে মাংসভক্ষণের দোষ কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।
“যে ব্যক্তি মোহপ্রভাবে পুত্ৰমাংসসদৃশ অন্য জীবের মাংস ভক্ষণ করে, সে অতি নীচাশয় বলিয়া পরিগণিত হয়। স্ত্রীপুরুষের সংযোগ যেমন সন্তানোৎপত্তির অদ্বিতীয় কারণ, সেইরূপ হিংসাই বহুবিধ পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করিবার একমাত্র কারণ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে। যেমন জিহ্বই রসজ্ঞানের কারণ, সেইরূপ মাংসের আস্বাদনই মাংসানুরাগের হেতু বলিয়া অভিহিত হয়। পাকের তারতম্যানুসারে মাংস মনুষ্যের চিত্ত আকর্ষণ করে। যাহাদিগের মাংসে অতিশয় আসক্তি জন্মে, মাংসভক্ষণে তাহাদের যেরূপ আমোদ হয়, ভেরী, মৃদঙ্গ ও তন্ত্রী শ্রবণে কখনই তাদৃশ আমোদ হয় না। সংসারাভিলাষী ব্যক্তিরা মাংসের যেরূপ প্রশংসা করে, তাহা অন্যের অচিন্তিত, অসংকল্পিত ও অনির্দ্দিষ্ট সন্দেহ নাই। ফলতঃ মাংসের প্রশংসাও দোষাবহ। পূৰ্ব্বে অনেকানেক মহাত্মা আপনার মাংস প্রদানপূর্ব্বক অন্যের দেহ রক্ষা করিয়া স্বর্গে গমন করিয়াছেন। হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট অহিংসধৰ্ম্ম কীৰ্ত্তন করিলাম।”
