3 of 4

১১২. স্বর্গাদিজনক কর্ম্মকীর্ত্তন

১১২তম অধ্যায়

স্বর্গাদিজনক কর্ম্মকীর্ত্তন

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “ভগবন্! আপনি অধর্ম্মের ফল সবিস্তর কীৰ্ত্তন করিলেন, এক্ষণে ধৰ্ম্মের ফল শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে, অতএব লোকে বিবিধ পাপকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াও কিরূপে উৎকৃষ্ট গতিলাভ করে এবং কি কি কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে স্বর্গাদিলাভে সমর্থ হওয়া যায়, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”

বৃহস্পতি কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! যাহারা সৰ্ব্বদা বুদ্ধিপূর্ব্বক পাপকার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া অধর্ম্মের বশীভূত হয়, তাহারা নিরয়গামী [নরকগামী] হইয়া থাকে, আর যাঁহারা অজ্ঞানবশতঃ অধর্ম্মাচরণ করিয়া পরিশেষে মনঃসংযমপূর্ব্বক অনুতাপিত হয়েন, তাঁহাদিগকে কখনই স্বীয় দুষ্কৃতের ফলভোগ করিতে হয় না। যে ব্যক্তির মন যে পরিমাণে স্বীয় দুষ্কৃতের নিন্দা করে, সে সেই পরিমাণে অধৰ্ম্ম হইতে বিমুক্ত হয়। যে ব্যক্তি ধর্ম্মপরায়ণ ব্রাহ্মণগণের নিকট স্বীয় দুষ্কৃত ব্যক্ত করে, অবিলম্বে তাহার অধৰ্ম্মকৃত অপবাদ তিরোহিত হইয়া যায়। মনুষ্য সম্যকরূপে স্বীয় অধৰ্ম্ম ব্যক্ত করিলে নির্ম্মোক [খোলস] নির্ম্মুক্ত ভুজঙ্গের ন্যায় পাপবিমুক্ত হইতে পারে। যে ব্যক্তি মোহবশতঃ পাপানুষ্ঠান করিয়া সমাহতিচিত্তে ব্রাহ্মণগণকে বিবিধ বস্তু দান করে, তাহার পরলোকে নিশ্চয়ই উৎকৃষ্ট গতিলাভ হয়।

“এক্ষণে মনুষ্য পাপাচার করিয়াও যে যে বস্তু দান করিলে পাপ হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারে, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। অন্নদান সমুদয় দান অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, অতএব সরল হৃদয়ে অন্নদান করা ধৰ্ম্মাকাঙ্ক্ষীদিগের অবশ্য কর্ত্তব্য। অন্ন মানবগণের প্রাণস্বরূপ; অন্ন হইতেই প্রাণীগণ সমুদ্ভূত হয় এবং অন্নেই সমুদয় লোক প্রতিষ্ঠিত থাকে; সুতরাং অন্নদান অপেক্ষা আর শ্রেষ্ঠ দান কিছুই নাই। দেবতা, পিতৃগণ ও মানবগণ অন্নদানেই ভূরি ভূরি প্রশংসা করিয়া থাকেন। মহারাজ রন্তিদেব অন্নদান করিয়াই স্বর্গে আরোহণ করিয়াছেন। অতএব প্রহৃষ্টমনে স্বাধ্যায়নিরত ব্রাহ্মণগণকে ন্যায়লব্ধ অন্ন প্রদান করা অবশ্য কর্ত্তব্য।

“যে ব্যক্তি সন্তুষ্টচিত্তে সহস্র ব্রাহ্মণকে অন্নভোজন করান, তাঁহাকে তির্য্যগযোনি লাভ করিতে হয় না। পাপনিরত ব্যক্তিও দশসহস্র ব্রাহ্মণকে ভোজন করাইলে অধৰ্ম্ম হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারে। বেদবেত্তা ব্রাহ্মণ স্বাধ্যায়নিরত ব্রাহ্মণগণকে ভিক্ষালব্ধ অন্নদান করিলে নিশ্চয়ই ইহলোকে সুখভোগ করিতে সমর্থ হয়েন। যে ক্ষত্রিয় ব্রহ্মস্বগ্রহপরাঙ্মুখ হইয়া ন্যায়ানুসারে প্রজাপালনপুৰ্ব্বক সমাহিতচিত্তে বেদবেত্তা ব্রাহ্মণগণকে ভুজলার্জ্জিত অন্ন প্রদান করেন, তাঁহাকে কখনই পূৰ্ব্বকৃত অধর্ম্মের ফলভোগ করিতে হয় না। যে-বৈশ্য কৃষিলব্ধ দ্রব্য ছয় ভাগে বিভক্ত করিয়া এক ভাগ ব্রাহ্মণসাৎ করে, সে সমুদয় পাপ হইতে বিমুক্ত হয় আর যে শূদ্র প্রাণপণে ভারবহনাদিদ্বারা অর্থোপার্জ্জন করিয়া ব্রাহ্মণদিগকে অন্নদান করে, তাহার সমুদয় পাপ বিনষ্ট হইয়া যায়। যে ব্যক্তি হিংসাবিহীন হইয়া পরিশ্রমদ্বারা অন্ন উপার্জ্জনপূৰ্ব্বক ব্রাহ্মণদিগকে প্রদান করে, সে কখনই দুঃখে অভিভূত হয় না। মনুষ্য ন্যায়ানুসারে অন্ন উপার্জ্জনপূর্ব্বক হৃষ্টচিত্তে ব্রাহ্মণগণকে দান করিলে সমুদয় পাপ হইতে বিমুক্ত হইতে পারে।

“যে ব্যক্তি নিরন্তর অন্নদান করে, সে সৎপথাবলম্বী, বলশালী ও নিষ্পাপ হয়। পণ্ডিত ব্যক্তিরাই দানশীল ব্যক্তিদিগের পথ অবলম্বন করেন। অন্নদাতাকে প্রাণদাতা বলিয়া নির্দ্দেশ করা যাইতে পারে। সনাতনধর্ম্ম অন্নদাতাকেই আশ্রয় করিয়া থাকে। অতএব ন্যায়ানুসারে অন্ন উপার্জ্জন ও সৰ্ব্বদা সৎপাত্রে দান করা মনুষ্যের অবশ্য কর্ত্তব্য। অন্নই লোকের পরমগতি। অন্নদান করিলে কখনই মনুষ্যকে নিরয়গামী হইতে হয় না। গৃহস্থ প্রথমে ব্রাহ্মণদিগকে ভোজন করাইয়া পরিশেষে স্বয়ং ভোজন করিবেন। অন্নদানদ্বারা দিবসকে সফল করা সৰ্ব্বতোভাবে বিধেয়। যে ব্যক্তি বেদ, ধর্ম্ম, ন্যায় ও ইতিহাসবেত্তা সহস্র ব্রাহ্মণকে ভোজন করান, তাঁহাকে কখনই সংসারযন্ত্রণা ভোগ করিতে হয় না। তিনি নিশ্চয়ই পরলোকে অশেষ সুখভোগ এবং পরজন্মে রূপবান, কীৰ্ত্তিমান ও ধনবান হইয়া পরমসুখে কালহরণ করিতে সমর্থ হয়েন। হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট সমুদয় ধৰ্ম্ম ও দানের মূলস্বরূপ অন্নদানের মাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিলাম।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *