3 of 4

১০৮. মানসতীর্থের প্রশংসা

১০৮তম অধ্যায়

মানসতীর্থের প্রশংসা

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কোন্ তীর্থ সৰ্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও পবিত্র, আপনি তাহা কীর্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! এই পৃথিবীতে যতগুলি তীর্থ আছে, সকলই ফলপ্রদ। তন্মধ্যে যাহা পরমপবিত্র আমি অগ্রে তাহাই কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। মনুষ্য শাশ্বত সত্য অবলম্বনপূর্ব্বক অগাধ, নির্ম্মল, বিশুদ্ধ এবং সত্যরূপ তোয় ও ধূতিরূপ হ্রদসংযুক্ত মানসতীর্থে স্নান করিবে। ঐ তীর্থে স্নান করিলে অনথিত্ব, সরলতা, সত্য, মৃদুতা, অহিংসা, অনৃশংসতা, ইন্দ্রিয়দমনশক্তি ও শান্তিগুণ লাভ হয়। যাঁহারা নির্দ্বন্দ্ব, মমতাশূন্য, অহঙ্কারবিহীন ও নিষ্পরিগ্রহ হইয়া ভিক্ষালব্ধ দ্রব্যদ্বারা দিনপাত করিয়া থাকেন, তাঁহারাই পবিত্র তীর্থ বলিয়া অভিহিত হয়েন। যিনি তত্ত্বজ্ঞানসম্পন্ন ও অহঙ্কারশূন্য, তিনিই সর্ব্বোৎকৃষ্ট তীর্থ। যাঁহাদিগের মন হইতে সত্ত্ব, রজ ও তমোগুণ অপনীত হইয়াছে, যাঁহারা বাহ্য শৌচে ও অশৌচে কিছুমাত্র বিচার না করিয়া সতত স্বধর্ম্মরক্ষণে তৎপর হয়েন, যাঁহারা সর্ব্বজ্ঞ, সর্ব্বদর্শী ও ত্যাগশীল এবং যাঁহাদিগের চরিত্র পরমপবিত্র, তাঁহারাই পবিত্র তীর্থ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হয়েন। যাঁহার দেহ সলিলদ্বারা ক্ষালিত হয়, তাহাকে স্নান বলিয়া পরিগণিত করা যায় না; যাঁহার ইন্দ্রিয়সমুদয় নিগৃহীত হইয়াছে, তিনিই যথার্থ স্নাত ও বাহ্যাভ্যন্তরশুদ্ধিসম্পন্ন। যাঁহারা অতীত বিষয়ের কিছুমাত্র অপেক্ষা রাখেন না, যাঁহারা অর্থ প্রাপ্ত হইলেও তাহা পরিগ্রহ করেন না এবং যাঁহাদিগের বিষয়লাভে কিছুমাত্র স্পৃহা নাই, তাঁহারাই পরমপবিত্র। জ্ঞান, বিষয়নিস্পৃহতা, মনঃপ্রসাদ, ইন্দ্রিয়নিগ্রহ, পাপে অনাসক্তি ও তীর্থাদিস্নান বহির্ভাব ও অভ্যন্তর উভয়ই শুদ্ধ করিতে পারে, কিন্তু ঐ সমুদয়ের মধ্যে জ্ঞানই সর্ব্বাপেক্ষা পরম শৌচ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে। মানসতীর্থে ব্ৰহ্মজ্ঞানস্বরূপ সলিলদ্বারা স্নানকেই তত্ত্বদর্শীরা প্রশস্ত বলিয়া কীৰ্ত্তন করেন। যিনি ভক্তিযুক্ত, গুণসম্পন্ন ও বিশুদ্ধস্বভাব, তিনিই যথার্থ পবিত্র।

“এই আমি শরীরস্থ তীর্থের বিষয়সমুদয় কীৰ্ত্তন করিলাম। শরীরস্থ তীর্থসমুদয় যেমন পবিত্র, সেইরূপ পৃথিবীর স্থানবিশেষ ও নদীবিশেষ পবিত্র বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হয়। তীর্থস্থানসমুদয় কীৰ্ত্তন, তীর্থে স্নান ও তীর্থে পিতৃতর্পণ পাপসমুদয় বিনাশ ও স্বৰ্গফল প্রদান করিয়া থাকে। পৃথিবীর বিশেষ বিশেষ স্থানসমুদয় পৃথিবী ও সলিলের তেজঃপ্রভাবে এবং সাধুলোকের গমনাগমননিবন্ধন পবিত্র বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হয়। যিনি ঐ সমস্ত পার্থিব তীর্থ ও শরীরস্থ তীর্থে স্নান করেন, তাঁহার অবিলম্বেই সিদ্ধিলাভ হইয়া থাকে। যেমন ক্রিয়াহীন বল ও বলহীন ক্রিয়া কোন বিষয়ই সিদ্ধ করিতে পারে না, কিন্তু ঐ উভয় একত্র মিলিত হইলে সমুদয় বিষয় সিদ্ধ করিতে পারে, তদ্রূপ পার্থিব তীর্থ ও শরীর তীর্থ এই উভয়বিধ তীর্থের সেবাদ্বারাই মনুষ্যের আশু সিদ্ধিলাভ হয়।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *