3 of 4

১০৭. উপবাসে যজ্ঞফল সিদ্ধি

১০৭তম অধ্যায়

উপবাসে যজ্ঞফল সিদ্ধি

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ। আপনি যে সকল যজ্ঞের বিষয় কীৰ্ত্তন করিলেন, তৎসমুদয়ের অনুষ্ঠান দরিদ্র ব্যক্তিদিগের নিতান্ত দুঃসাধ্য। যজ্ঞীয় বিবিধ উপকরণ আয়োজনপূৰ্ব্বক যজ্ঞানুষ্ঠান করা ধনসম্পন্ন গুণবান্ রাজা বা রাজপুত্র ভিন্ন আর কাহারও সাধ্যায় নহে। অতএব এক্ষণে দরিদ্র ব্যক্তিরা যেরূপ নিয়মের অনুষ্ঠান করিলে রাজকৃত যজ্ঞের তুল্য ফললাভ করিতে পারে, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! মহর্ষি অঙ্গিরা কহিয়াছেন যে, উপবাসদ্বারা যজ্ঞের তুল্য ফললাভ হইয়া থাকে। যিনি হিংসাপরিশূন্য ও নিত্যহোমানুষ্ঠান নিরত হইয়া প্রতিদিন দিবসে একবার ও রজনীযোগে একবারমাত্র ভোজন করেন; তদ্ভিন্ন আর কখন কিছুমাত্র আহার করেন না, তাঁহার ছয় বৎসরের মধ্যে সিদ্ধিলাভ হয় এবং তিনি তপ্তকাঞ্চনসদৃশ বিমানে আরূঢ় হইয়া নৃত্যগীতসংযুক্ত দেবাঙ্গনাগণ পরিপূর্ণ ব্রহ্মলোক গমনপূৰ্ব্বক পদ্মসংখ্যক বৎসর তথায় অবস্থান করেন। যিনি ক্ষমাশীল, জিতেন্দ্রিয়, সত্যবাদী, দানশীল, ব্রাহ্মণানুরক্ত, অসূয়াপরিশূন্য ও ধর্ম্মপত্নীনিরত হইয়া ক্রমাগত তিন বৎসর একাহারে অতিবাহিত করেন, তাঁহার অগ্নিষ্টোম ও বহুসুবর্ণক যজ্ঞের ফললাভ এবং দেবরাজ ইন্দ্রের প্রীতিসাধন করা হয়। তিনি হংসযুক্ত দিব্যবিমানে আরোহণপূৰ্ব্বক উৎকৃষ্ট লোক গমন করিয়া দুই পদ্মপরিমিত বৎসর অপ্সরাদিগের সহিত একত্র অবস্থান করেন। যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল একদিন উপবাসের পর দ্বিতীয় দিবসে একাহার করেন ও প্রতিদিন প্রত্যুষে গাত্রোত্থান করিয়া হুতাশনে আহুতি-প্রদানে প্রবৃত্ত হয়েন, তাঁহার অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি হংসসারসযুক্ত দিব্যবিমানে আরোহণপূৰ্ব্বক ইন্দ্রলোকে গমন করিয়া দিব্যাঙ্গনাদিগের সহিত একত্র অবস্থান করেন। যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল দুই দিন উপবাসের পর তৃতীয় দিবসে একবারমাত্র আহার ও পরদিন প্রাতঃকালে গাত্রোত্থান করিয়া অনলে আহুতি প্রদান করেন, তাঁহার অতিরাত্র যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি হংসময়ূরযুক্ত বিমানে আরোহণপূর্ব্বক সপ্তর্ষিলোকে গমন করিয়া তিন পদ্মপরিমিত বৎসর অপ্সরাদিগের সহিত অবস্থান করেন। যে ব্যক্তি একশত বৎসরকাল তিনদিন উপবাসের পর চতুর্থ দিনে একবার মাত্র আহার ও প্রতিদিন হুতাশনে আহুতি প্রদান করেন, তাঁহার বাজপেয় যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি দেবকন্যাধিষ্ঠিত দিব্য বিমানে আরূঢ় হইয়া ইন্দ্রলোকে গমনপূৰ্ব্বক এক কল্প পর্য্যন্ত প্রতিনিয়ত ইন্দ্রের ক্রীড়া সন্দর্শনে সমর্থ হয়েন।

“যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল লোভপরিশূন্য, সত্যবাদী, ব্রাহ্মণভক্ত ও হিংসাদ্বেষাদিপাপবিবর্জ্জিত হইয়া চারি দিন উপবাসের পর পঞ্চম দিবসে একবারমাত্র আহার ও প্রতিদিন অনলে আহুতি প্রদান করেন, তাঁহার বাজপেয় যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি সূর্য্যপ্রভাসদৃশ সমুজ্জ্বল, হংসযুক্ত, সুবর্ণময়, দিব্যবিমানে আরোহণপূর্ব্বক স্বর্গে গমন করিয়া তথায়। একপঞ্চাশৎ পদ্মবৎসর অবস্থান করেন। যে মহর্ষি এক বৎসরকাল ত্ৰিকালস্নায়ী, ব্রহ্মচারী ও অসূয়াশূন্য হইয়া পাঁচদিন উপবাসের পর ষষ্ঠ দিবসে একবার মাত্র আহার ও প্রতিদিন হুতাশনে আহুতিপ্রদান করেন, তাঁহার উৎকৃষ্ট গোমেধ যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি হংসময়ূরযুক্ত, অগ্নির ন্যায় সমুজ্জ্বল সুবর্ণময়, দিব্যবিমানে আরূঢ় হইয়া ব্রহ্মলোকে গমনপূর্ব্বক তথায় দুই মহাপদ্ম, অষ্টাদশ পদ্ম, এক সহস্র তিন শত কোটি পঞ্চাশৎ অযুত এবং এক শত ভল্লুকচর্ম্মে যে পরিমাণ লোম থাকে, তাবৎসংখ্যক বৎসর বাস করিয়া অঙ্গরাদিগের সহিত এক শয্যায় নিদ্রিত ও তাঁহাদের নুপুর ও মেখলাশব্দে প্রতিবোধিত হইয়া থাকেন।

“যে ব্যক্তি বাগ্‌যত, ব্রহ্মচারী এবং স্রক [মালা], চন্দন ও মধুমাংসাদি পরিত্যাগী হইয়া এক বৎসরকাল ছয় দিন উপবাসের পর সপ্তম দিবসে একবারমাত্র আহার ও প্রতিদিন হুতাশনে আহুতি প্রদান করেন, তাঁহার বহুসুবর্ণ যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি দেবলোক ও ইন্দ্রলোক লাভ করিয়া অসংখ্য বৎসর অবস্থানপূৰ্ব্বক দেবকন্যাগণকর্ত্তৃক অর্চ্চিত হয়েন। যে ব্যক্তি ক্ষমাশীল হইয়া এক বৎসরকাল সাতদিন উপবাসের পর অষ্টম দিবসে আহার ও প্রতিদিন দেবকার্য্যপরায়ণ হইয়া হুতাশনে আহুতি প্রদান করেন, তাঁহার পৌণ্ডরীক যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি পদ্মবর্ণ দিব্যবিমানে আরোহণপূৰ্ব্বক সুরলোকে গমন করিয়া হাবভাবশালিনী নবযৌবনসম্পন্না কামিনীগণের সহিত পরমসুখে বিহার করিতে সমর্থ হয়েন। যে ব্যক্তি এক বৎসর অষ্টাহ [আটদিন] উপবাসের পর নবম দিবসে ভোজন ও প্রতিদিন অগ্নিতে আহুতি প্রদান করেন, তাঁহার সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং পুণ্ডরীকসমপ্রভ দিব্যবিমানে সমারূঢ় হইয়া সূর্য্য ও অনলের ন্যায় তেজঃপুঞ্জ, দিব্যমালাসমলঙ্কৃত, রুদ্রলোকবাসিনী অপ্সরাদিগের সহিত রুদ্রলোকে গমনপূৰ্ব্বক তথায় এক কল্প এবং এক কোটি, এক লক্ষ অষ্টাদশ সহস্র বৎসর পরমসুখে বিহার করিতে পারেন।

“যে ব্যক্তি এক বৎসর দশ দিন উপবাসের পর একাদশাহে ভোজন ও প্রতিদিন হুতাশনে আহুতি প্রদান করেন, তাঁহার সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং নীলরক্তোৎপল সদৃশ স্ফটিকস্তম্ভ যুক্ত, বেদিসম্পন্ন, চিত্রিত মণিমালা-সমলঙ্কৃত, শঙ্খনিনাদনিনাদিত [বহু শঙ্খধ্বনিযুক্ত], হংসসারসংযুক্ত, দিব্যবিমানে সমারূঢ় হইয়া দেবলোকে গমনপূৰ্ব্বক তথায় অর্ব্বুদ বৎসর বাস করিয়া রূপবতী অপ্সরাদিগের সহিত পরম সুখে বিহার করিতে সমর্থ হয়েন। যিনি এক বৎসর দশ দিন উপবাসের পর একাদশাহে ঘূত ভোজন ও প্রতিদিন হুতাশনে আহুতি প্রদান করেন এবং যিনি প্রাণান্তেও পরস্ত্রী গমনের বাসনা ও জনকজননীর হিতার্থেও মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ না করেন, তাঁহার সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল ও বিমান দেবদেব মহাদেবের সহিত সাক্ষাৎকারলাভ হয় এবং তিনি হংসযুক্ত দিব্যবিমানে আরূঢ় হইয়া রূপলাবণ্যবতী অপ্সরাগণের সহিত রমণীয় রুদ্রলোকে গমনপূৰ্ব্বক তাঁহাদিগের সহিত অসংখ্য বৎসর পরমসুখে বিহার ও প্রতিদিন ভগবান রুদ্রকে নমস্কার করিতে সমর্থ হয়েন; যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল একাদশ দিন উপবাসের পর দ্বাদশ দিনে ঘৃত ভোজন করেন, তাঁহার সর্ব্বমেধ যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি দ্বাদশ আদিত্য সদৃশ সমুজ্জ্বল দিব্যবিমানে আরোহণপূর্ব্বক মণিমুক্তা-প্রবালাদিখচিত, হংসময়ুর চক্রবাক-পরিশোভিত, শ্রীপুরুষসমাকীর্ণ, ব্রহ্মালোক দিব্যধামে গমন করিয়া বহুকাল বাস করিতে পারেন। যে ব্যক্তি এক বৎসর দ্বাদশ দিন উপবাস করিয়া ত্রয়োদশ দিবসে ঘৃত ভোজন করেন, তাঁহার দেবদত্ত নামক যজ্ঞফললাভ হয় এবং তিনি দেবকন্যাগণ সমাকীর্ণ নানারত্ন-বিভূষিত সুবর্ণময় দিব্যবিমানে আরোহণপূর্ব্বক দিব্যগন্ধযুক্ত পবিত্র বায়ুলোকে গমন করিয়া অসংখ্যকাল ভেরী ও পণব প্রভৃতি বাদিত্ৰসমুদয়ের মনোহর ধ্বনি, গন্ধৰ্ব্বদিগের গান ও অপ্সরাগণের শুশ্রূষাদ্বারা যারপরনাই প্রীতিলাভ করেন।

“যে ব্যক্তি এক বৎসর ত্রয়োদশ দিন উপবাসের পর চতুর্দ্দশ দিবসে ঘৃত ভোজন করেন, তাঁহার অশ্বমেধ যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি অসামান্য রূপযৌবনসম্পন্না, দিব্যাভরণভূষিতা, মার্জ্জিতকেয়ুরধারিণী দেবকন্যাগণের সহিত দিব্যবিমানে আরূঢ় হইয়া সুরলোকে গমনপূৰ্ব্বক তথায় অসংখ্যকাল বাস করিয়া দেবনারীদিগের কলহংসরবসদৃশ কণ্ঠস্বর এবং মেখলা ও নূপুরনিনাদে জাগরিত হয়েন। যে ব্যক্তি এক বৎসর চতুর্দ্দশ দিবস উপবাসের পর পঞ্চদশ দিবসে একবারমাত্র ভোজন ও প্রতিদিন হুতাশনে আহুতি দান করেন, তাঁহার সহস্র রাজসূয় যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি হংসময়ূরযুক্ত, দিব্যাভরণভূষিত দেবাঙ্গনাগণে সমাকীর্ণ, একস্তম্ভ, চতুদ্বার, সপ্তবেদিসমন্বিত, সহস্রপতাকাসম্পন্ন, সঙ্গীতশব্দমুখরিত মণিমুক্তাপ্রবালাদিখচিত সেই সুবর্ণময় বিমানে আরূঢ় হইয়া দেবলোকে গমনপূর্ব্বক সহস্রযুগ তথায় বাস করেন। ঐ স্থানে খড়গী ও কুঞ্জরগণ তাঁহার বাহন হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি এক বৎসর পঞ্চদশ দিন উপবাসের পর যোড়শ দিবসে একবারমাত্ৰ আহার করেন, তাঁহার সোমযজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি চারুদর্শনা সুরকামিনীগণের সহিত চন্দ্রলোকে গমনপূৰ্ব্বক অসংখ্যকাল তাহাদের সহবাস ও দিব্যগন্ধে সমাযুক্ত হইয়া স্বেচ্ছাক্রমে ভ্রমণ করিতে পারেন।

“যে ব্যক্তি এক বৎসর যোড়শ দিন উপবাসের পর সপ্তদশ দিবসে ঘৃতভোজন ও প্রতিদিন হুতাশনে আহুতি প্রদান করেন, তাঁহার বরুণ, ইন্দ্র, রুদ্র, বায়ু, শুক্র ও ব্রহ্মালোকলাভ হইয়া থাকে। তথায় দেবকন্যাগণ আসন প্রদানপূর্ব্বক তাঁহার পরিচর্য্যা করেন। তিনি তথায় ভূর্ভুলোকে দেবর্ষি ও বিশ্বরূপ সন্দর্শনে সমর্থ হয়েন এবং যত কাল গগনমণ্ডলে চন্দ্রসূর্য্য বিদ্যমান থাকেন, তত কাল সুধাপান করিয়া দ্বাত্রিংশদ্বিধ রূপধারিণী দিব্যাভরণভূষিতা দেবকুমারীদিগের সহিত পরম সুখে বিহার করিয়া থাকেন। যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল সপ্তদশ দিন উপবাসের পর অষ্টাদশ দিবসে একবার মাত্র ভোজন করেন, তিনি সিংহব্যাঘ্রাদিযুক্ত মেঘগম্ভীরনিঃস্বন বিমানে আরোহণপূর্ব্বক ভূর্ভুব প্রভৃতি সপ্তলোক পরিভ্রমণ এবং অমৃততুল্য সুধারস পান করিয়া সহস্রকল্প দেবকন্যাদিগের সহিত পরম সুখে বিহার করিতে সমর্থ হয়েন। তাঁহার গমনকালে দেবকন্যাগণ বন্দিঘোষনিনাদিত অলঙ্কার সমুজ্জ্বল রথসমুদয়ে আরোহণপূর্ব্বক তাঁহার অনুগমন করেন। যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল অষ্টাদশ দিবসে একবারমাত্র ভোজন করেন, তাঁহারও ভূর্ভুব প্রভৃতি সপ্তলোক দর্শন হইয়া থাকে। তিনি গন্ধৰ্ব্বগণের গীতশব্দে মুখরিত সূর্য্যসঙ্কাশ বিমানে আরোহণ করিয়া, ক্লেশপরিশূন্য ও দিব্যাম্বরধারী হইয়া অপ্সরাগণসমাকীর্ণ উৎকৃষ্ট লোকে গমনপূর্ব্বক দশ কোটি বৎসর দেবাঙ্গনাদিগের সহিত পরম সুখে বিহার করেন।

“যে ব্যক্তি মাংসপরিত্যাগী, ব্রহ্মচারী, সৰ্ব্বভূতহিতৈষী, সত্যবাদী ও ব্রতধারী হইয়া এক বৎসরকাল ঊনবিংশতি দিবস উপবাসের পর সাত দিবস ভোজন করেন, তাঁহার অতি সুবিস্তীর্ণ আদিত্যলোক লাভ হয়। দিব্যমাল্য ও দিব্যানুলেপনধারী গন্ধৰ্ব্ব ও অপ্সরাগণ কাঞ্চনময় দিব্যবিমান লইয়া তাঁহার অনুগমন করেন। যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল বিংশতি দিবস উপবাসের পর একবিংশ দিবসে ভোজন ও প্রতিদিন হুতাশনে আহুতি প্রদান করেন, তিনি দিব্যবিমানে আরোহণপূৰ্ব্বক পরম সুখে দেবাঙ্গ নাদিগের সহিত বিহার করিতে করিতে শুক্র, ইন্দ্র, বায়ু ও অশ্বিনীকুমারদিগের লোকে গমন করিয়া থাকেন। যে ব্যক্তি হিংসাপরিশূন্য, সত্যবাদী ও ঈর্ষাবিহীন হইয়া এক বৎসরকাল একবিংশতি দিবস উপবাসের পর দ্বাবিংশতি দিবসে একবার ভোজন ও প্রতিদিন হুতাশনে আহুতি প্রদান করেন, তিনি কামাচারী হইয়া দিব্যবিমানে আরোহণপূর্ব্বক বসুদিগের লোকে গমন করিয়া পরমসুখে সুধা ভক্ষণ ও দেবকন্যাদিগের সহিত বিহার করেন। যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল দ্বাবিংশ দিবস উপবাসের পর এয়োবিংশ দিবসে একবারমাত্র ভোজন করেন, তিনি কামাচারী হইয়া দিব্যবিমানে আরোহণপূৰ্ব্বক অপ্সরাগণের সহিত শুক্র ও রুদ্রলোকে গমন করিয়া দেবকন্যাদিগের সহিত পরম সুখে বিহার করেন।

“যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল এয়োবিংশতি দিবস উপবাসের পর চতুর্বিংশতি দিবসে ঘৃত ভোজন ও প্রতিদিন হুতাশনে আহুতি প্রদান করেন, তিনি দিব্যমাল্য, বস্ত্র ও গন্ধদ্রব্য ধারণপূর্ব্বক অনন্তকাল মহা আহ্লাদে আদিত্য লোকে অবস্থান এবং হংসসংযুক্ত সুবর্ণময় দিব্যবিমানে আরোহণপূৰ্ব্বক অযুত সহস্র দেবকন্যার সহিত পরম সুখে বিহার করিয়া থাকেন। যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল চতুর্ব্বিংশতি দিবস উপবাসের পর পঞ্চবিংশতি দিবসে একবারমাত্র ভোজন করেন, তিনি দিব্যবিমানে আরূঢ় হইয়া সুরলোকে গমনপূর্ব্বক তথায় সহস্র কল্প সুধাপান ও শত শত দেবাঙ্গনার সহবাসে কালাতিপাত করেন এবং তাঁহার গমনকালে দেবকন্যাগণ সিংহব্যাঘ্রাদিযুক্ত, মেঘগম্ভীরনিঃস্বন, কাঞ্চনময় দিব্যরথে আরোহণপূর্ব্বক তাহার অনুগামিনী হয়। যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল পঞ্চবিংশতি দিবস উপবাসের পর ষড়বিংশতি দিবসে একবারমাত্র ভোজন এবং জিতেন্দ্রিয় ও বীতস্পৃহ হইয়া প্রতিদিন হুতাশনে আহতি প্রদান করেন, তিনি স্ফটিকনির্ম্মিত, বিবিধ রত্নসমলঙ্কৃত, দিব্যবিমানে আরোহণপূর্ব্বক সপ্তমরুৎ ও অষ্টবসুর লোকে গমন করিয়া দেবপরিমাণের দ্বিসহস্র বৎসর গন্ধৰ্ব্ব ও অপ্সরাগণ কর্ত্তৃক সৎকৃত হইয়া পরমসুখে কালযাপন করেন।

“যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল ষড়বিংশতি দিবস উপবাসের পর সপ্তবিংশতি দিবসে একবারমাত্র ভোজন ও প্রতিদিন হুতাশনে আহুতি প্রদান করেন, তাঁহার অতি উৎকৃষ্ট ফল ও দেবলোকে সম্মানলাভ হয়। তিনি দিব্যবিমানে আরোহণপূর্ব্বক দেবলোকে গমন করিয়া তথায় অসংখ্যকাল সুধাভক্ষণ ও মনোহারিণী রমণীগণের সহিত পরমসুখে বিহার করেন। যে ব্যক্তি জিতেন্দ্রিয় হইয়া এক বৎসরকাল সপ্তবিংশতি দিবস উপবাসের পর অষ্টবিংশ দিবসে একবারমাত্র ভোজন করেন, তাহার সূর্য্যসদৃশ তেজস্বিতালাভ হয়। তিনি সূর্য্যসন্নিভ দিব্যবিমানে আরূঢ় হইয়া দেবলোকে গমনপূর্ব্বক অযুতশতকল্প নিবিড়নিতম্বিনী, দিব্যাভরণভূষিতা, পীনপয়োধরশালিনী কামিনীকুলের সহিত পরমসুখে ক্রীড়া করিয়া থাকেন। যে ব্যক্তি সত্যপরায়ণ হইয়া এক বৎসরকাল অষ্টবিংশতি দিবস উপবাসের পর একোনবিংশ দিবসে একমাত্র ভোজন করেন, তাঁহার দেবতা ও রাজর্ষিপূজিত বসু, মরুৎ, সাধ্য, রুদ্র, ব্রহ্মা ও অশ্বিনীকুমারদিগের লোকলাভ হয়; তিনি দিব্যশরীরসম্পন্ন ও অগ্নির ন্যায় তেজস্বী হইয়া সুবর্ণময় বিবিধ রত্নবিভূষিত, গন্ধ ও অপ্সরাগণে পরিপূর্ণ, চন্দ্রসূর্য্যসদৃশ সমুজ্জ্বল দিব্যবিমানে আরোহণপূর্ব্বক মনোহারিণী কামিনীগণের সহিত পরমসুখে বিহার করেন।

“যে ব্যক্তি এক বৎসরকাল একোনত্রিংশৎ দিবস উপবাসের পর ত্রিংশৎ দিবসে একবারমাত্র ভোজন করেন, তাঁহার ব্ৰহ্মালোকলাভ হইয়া থাকে। তিনি সূর্য্যের ন্যায় তেজ ও অতিমনোহর মূর্ত্তি ধারণপূর্ব্বক সুধারস পান, দিব্যমাল্য ধারণ, দিব্যবস্ত্র পরিধান ও দিব্যগন্ধ অনুলেপন করেন, তাঁহার দুঃখের লেশমাত্রও থাকে না। নানা রূপধারিণী মধুরভাষিণী রুদ্রকন্যা ও দেবর্ষিকন্যাগণ সতত তাঁহার অর্চ্চনা করেন। তিনি অপ্সরাদিগের সহিত পশ্চাদ্ভাগে চন্দ্রসন্নিভ, বামভাগে মেঘসদৃশ, দক্ষিণভাগে রক্ত, অধোভাগে নীল ও ঊর্দ্ধভাগে বিচিত্রবর্ণে সুশোভিত, সূর্য্যকান্ত ও বৈদূর্য্যমণিসন্নিভ দিব্যবিমানে আরোহণপূর্ব্বক বিচরণ করিয়া থাকেন। জম্বুদ্বীপে বর্ষাকালে আকাশ হইতে যে পরিমাণে জলবিন্দু নিপতিত হয়, তিনি তত বত্সর ব্রহ্মলোকে বাস করেন। যে ব্যক্তি দমগুণসম্পন্ন, জিতেন্দ্রিয় ও জিতক্রোধ হইয়া এক মাস উপবাসের পর একত্রিংশ দিবসে ভোজন এবং নিয়ত সন্ধ্যাপোসনা ও হুতাশনে আহুতি প্রদানাদি বিবিধ নিয়মানুষ্ঠান করেন, তিনি দশ বৎসরের পর মহর্ষিত্ব লাভপূর্ব্বক মেঘনির্ম্মুক্ত সূর্য্যসদৃশ কাভিসম্পন্ন হইয়া অমরের ন্যায় অনায়াসে সশরীরে স্বর্গে গমন করিয়া তথায় স্বেচ্ছানুসারে সমুদয় সুখসম্ভোগে সমর্থ হয়েন।

“হে ধৰ্ম্মরাজ। এই আমি তোমার নিকট দরিদ্র ব্যক্তিরা যেরূপে নিয়মশীল, অপ্রমত্ত, শুচি, বিশুদ্ধবুদ্ধি, দম্ভদ্রোহশুন্য হইয়া উপবাসদ্বারা যজ্ঞফল ও উৎকৃষ্ট গতি লাভ করিতে পারেন, তাহা আনুপূর্ব্বিক কীৰ্ত্তন করিলাম। তুমি এ বিষয়ে কোন সংশয় করিও না।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *