১০৫তম অধ্যায়
ভ্রাতৃগণের পরস্পর ব্যবহার নির্ণয়
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার কনিষ্ঠের সহিত ও কনিষ্ঠ ভ্রাতার জ্যেষ্ঠের সহিত যেরূপ ব্যবহার করিতে হয়, তাহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! তুমি ভীমসেনাদির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। অতএব গুরু শিষ্যদিগের প্রতি যেরূপ ব্যবহার করেন, তোমারও ভীমাদির প্রতি সেইরূপ ব্যবহার করা কর্ত্তব্য। অগ্রজভ্রাতা অকৃতজ্ঞ হইলে অনুজ কখনই তাঁহার বশীভূত হয় না। অগ্রজের দীর্ঘদর্শিতা থাকিলে অনুজেরও দীর্ঘদর্শিতালাভের বিলক্ষণ সম্ভাবনা থাকে। অগ্রজভ্রাতা জ্ঞানবান্ হইলেও অনুজদিগের কার্য্যবিশেষে তাঁহাকে অন্ধ ও জড়ের ন্যায় ব্যবহার করিতে হয়। অনুজেরা কুপথগামী হইলে ছলক্রমে তাহাদিগের চরিত্র সংশোধন করিতে চেষ্টা করা অগ্রজের অবশ্য কর্ত্তব্য। যদি অগ্রজভ্রাতা প্রকাশ্যে অনুজদিগকে দমন করিতে চেষ্টা করেন, তাহা হইলে পরশ্রীকাতর শত্রুগণ বিবিধ কুমন্ত্রণা দ্বারা তাহাদিগের ভেদোৎপাদন করিতে পারে; অতএব সাবধান হইয়া কৌশলক্রমে অনুজদিগের দমন করা কর্ত্তব্য। অগ্রজ হইতেই কুল সমুজ্জ্বল থাকে আবার অগ্রজ হইতেই কুল বিনষ্ট হইয়া থাকে। যিনি অগ্রজ হইয়া অনুজদিগকে বঞ্চনা করেন, তিনি অগ্রজপদবাচ্য ও অগ্রজাংশের [সমস্ত পৈত্রিক ধনের কুড়ি ভাগের এক ভাগ জ্যেষ্ঠের সর্ব্বাগ্রে প্রাপ্য; ইহার নাম অগ্রজাংশ। এই বিংশোদ্ধার উদ্ধৃত হইলে সমস্ত সম্পত্তি আবার ভ্রাতৃগণের মধ্যে তুল্যরূপে বিভক্ত হওয়া উচিত, ইহাই প্রচীন প্রথা।] অধিকারী নহেন; রাজদ্বারে তাঁহার দণ্ড হওয়াই উচিত। যে ব্যক্তি অন্যকে বঞ্চনা করে, তাহাকে অশেষ পাপে লিপ্ত হইতে হয়, সন্দেহ নাই।
“বেতসপুষ্পের ন্যায় বঞ্চক ব্যক্তির জন্ম নিতান্ত নিরর্থক। যে কুলে পাপাত্মারা জন্মগ্রহণ করে, সেই কুলের কীৰ্ত্তি বিলুপ্ত ও অকীৰ্ত্তি চতুর্দ্দিকে সঞ্চারিত হইয়া থাকে। কনিষ্ঠ সহোদরগণ কুপথগামী হইলে তাহাদিগকে পৈতৃক ধনের অংশ প্রদান করা অগ্রজের কর্ত্তব্য নহে; কিন্তু তাহারা সচ্চরিত্র হইলে জ্যেষ্ঠভ্রাতা তাহাদিগকে যৌতুকলব্ধ ধনের অংশও প্রদান করিবেন। জ্যেষ্ঠ যদি পৈতৃক ধনের সাহায্য ব্যতীত স্বয়ং ধন উপার্জ্জন করেন, তাহা হইলে তিনি সেই স্বোপার্জ্জিত ধন কনিষ্ঠকে প্রদান না করিলে তাহাকে পাপভাগী হইতে হয় না। যদি পিতা জীবিত থাকিতে ভ্রাতৃগণ পরস্পর মিলিত হইয়া পৈতৃক ধন বিভাগ করিতে ইচ্ছা করে, তাহা হইলে পিতা তাহাদিগকে সমান অংশে ধন বিভাগ করিয়া দিবেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পাপনিরত ও দুরাত্মা হইলেও তাহাকে যথোচিত সম্মান করা কনিষ্ঠের অবশ্য কর্ত্তব্য। স্ত্রী অথবা অনুজসহোদর দুশ্চরিত্র হইলে তাহাদিগের শ্ৰেয়োলাভের নিমিত্ত যত্ন করা নিতান্ত আবশ্যক। ধৰ্ম্মবিদ পণ্ডিতেরা শ্রেয়ঃ সাধনকেই ধৰ্ম্ম বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন। আচার্য্য অপেক্ষা উপাধ্যায়ের, উপাধ্যায় অপেক্ষা পিতার এবং পিতা ও সমুদয় পৃথিবী অপেক্ষা জননীর গৌরব দশগুণ অধিক, অতএব জননীর তুল্য গুরু আর কেহই নাই। লোকে এই নিমিত্তই নিয়ত জননীর উপাসনা করিয়া থাকে। পিতার পরলোকলাভ হইলে অগ্রজ পিতৃস্বরূপ হইয়া অনুজদিগকে প্রতিপালন করেন; অতএব পিতার ন্যায় অগ্রজের আজ্ঞা প্রতিপালন ও তাহার প্রতি ভক্তিপ্রদর্শন করা অনুজদিগের পরমধর্ম্ম। জনক-জননী অচিরস্থায়ী শরীর-নির্ম্মাণের হেতুমাত্র, কিন্তু আচার্য্য হইতে অজর [অচল] ও অমর [যাবজ্জীবনস্থায়ী] জ্ঞান লাভ করা যায়; অতএব আচার্য্যকে সম্মান করা অবশ্য কর্ত্তব্য। যিনি বাল্যকালে স্তন্যদ্বারা দেহের পুষ্টিসম্পাদন করেন, তাঁহাকে এবং অগ্রজা ভগিনী ও ভ্রাতৃভাৰ্য্যাকে মাতৃতুল্য জ্ঞান করা সৰ্ব্বতোভাবে বিধেয়।”
