১০৩তম অধ্যায়
তপস্যাপ্রসঙ্গে উপবাসের শ্রেষ্ঠতা কথন
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি বহুবিধ দান, শান্তি, সত্য, অহিংসা, স্বারনিরতি ও দানফল যথানিয়মে কীর্ত্তন করিলেন; এক্ষণে উৎকৃষ্ট তপস্যা কি, তাহা কীর্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! মনুষ্য যেরূপ তপানুষ্ঠান করে, তদনুরূপ লোক লাভ করিয়া থাকে, কিন্তু ইহলোকে অনশনের তুল্য উৎকৃষ্ট তপস্যা আর কিছুই নাই। আমি এই উপলক্ষ্যে ব্রহ্মভগীরথসংবাদ নামক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। মহাত্মা ভগীরথ দেহান্তে দেবলোক, গোলক ও ঋষিলোক অতিক্রমপূৰ্ব্বক ব্রহ্মলোক লাভ করিয়াছিলেন।
“একদা সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা তাঁহাকে সম্বোধন পূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘ভগীরথ! কি দেবতা, কি গন্ধৰ্ব্ব, কি মনুষ্য কঠোর তপানুষ্ঠান না করিলে কেহই এই লোক লাভ করিতে সমর্থ হয় না; অতএব তুমি কি পুণ্যে, এই দুর্ল্লভ লোক লাভ করিলে, তাহা আমার নিকট সবিস্তর কীৰ্ত্তন কর।’
“তখন ভগীরথ কহিলেন, ‘ভগবন্! আমি ব্রহ্মচর্য্যব্রত আশ্রয় করিয়া ব্রাহ্মণদিগকে লক্ষ লক্ষ সুবর্ণমুদ্রা প্রদান করিয়াছিলাম। দশবার একরাত্রিনিষ্পন্ন ও পঞ্চরাত্রিনিষ্পন্ন যজ্ঞ, একাদশবার একাদশরাত্রি-নিষ্পন্ন যজ্ঞ এবং শতবার জোতিষ্টোমযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলাম, এক শত বৎসর জাহ্নবীতীরে বাস করিয়া কঠোর তপানুষ্ঠানপূৰ্ব্বক ব্রাহ্মণগণকে সহস্র অশ্বতরী ও অসংখ্য কন্যা প্রদান করিয়াছিলাম। পুষ্করতীর্থে ব্রাহ্মণগণকে এক লক্ষবার এক লক্ষ অশ্ব, দুই লক্ষ গাভী এবং সুবর্ণচন্দ্রসমলঙ্কৃত সহস্র ও সুবর্ণাভরণভূষিত ষষ্টিসহস্র কন্যা প্রদান করিয়াছিলাম। গোসব যজ্ঞের অনুষ্ঠানপূর্ব্বক দশ অর্ব্বুদ দুগ্ধবতী সবৎসা ধেনু উৎসর্গ করিয়া এক এক ব্রাহ্মণকে সুবর্ণ ও কাংস্যময় দোহনপাত্রের সহিত ধেনু প্রদান করিয়াছিলাম। সোমযজ্ঞে দীক্ষিত হইয়া এক এক ব্রাহ্মণকে দশ দশ সকৃৎপ্রসূতা ধেনু [এক বিয়ানের গাভী] ও শত শত রোহিণী গাভী [৯ বৎসরের গাভীর] প্রদান করিয়াছিলাম। ঐ যজ্ঞে আমি শত প্রভূত-দুগ্ধবতী ধেনু বিপ্রসাৎ করি।
‘আমি, এক একবার ব্রাহ্মণগণকে বাহ্লীকদেশোদ্ভব হেমমালাবিভূষিত শুক্লবর্ণ লক্ষ অশ্ব ও আট কোটি সুবর্ণমুদ্রা প্রদান করিয়াছিলাম। প্রভূতদক্ষিণ দশটি বাজপেয়যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়া সপ্তদশ কোটি সুবর্ণমালাসমলঙ্কৃত শ্যামকৰ্ণযুক্ত হরিদ্বর্ণ অশ্ব, সপ্তদশ সহস্র কাঞ্চনমালা-বিভূষিত দীর্ঘহস্ত বৃহকায় হস্তী, সুবর্ণালঙ্কারসমলঙ্কৃত দশ সহস্র এবং অলঙ্কৃত অশ্বযুক্ত সপ্তসহস্র রথ ব্রাহ্মণসাৎ করিয়াছিলাম। যুদ্ধে ইন্দ্রতুল্য প্রভাবশালী সুবর্ণহারসম্পন্ন ভূপতিগণকে পরাজিত করিয়া ব্রাহ্মণবাক্যে তাঁহাদিগকে স্বাধীনতা প্রদান করিয়াছিলাম। সমুদয় ভূপতিকে পরাজিত করিয়া আটটি রাজসূয়-যজ্ঞ সম্পাদনপূর্ব্বক প্রত্যেক ব্রাহ্মণকে গঙ্গাস্রোত অপেক্ষা অধিক দক্ষিণা প্রদান করিয়াছিলাম। এক এক ব্রাহ্মণকে তিনবার নানালঙ্কার-বিভূষিত দুই সহস্র অশ্ব এবং শত উৎকৃষ্ট গ্রাম দান করিয়াছিলাম। নিয়তাহার ও বাগ্যত [মৌনী] হইয়া সুরধুনী গঙ্গার তীরে দীর্ঘকাল তপস্যায় নিরত ছিলাম। শমীক্ষেপসহকারে বেদিনির্ম্মাণপূর্ব্বক [শমীকাষ্ঠ অত্যন্ত দৃঢ়, অতি বেগে নিক্ষেপ করিলেও ভগ্ন হয় না। তাদৃশ শমী বৃক্ষের কাষ্ঠখণ্ড সবেগে নিক্ষেপ করিলে উহা যত দূর যায়, তত দূরব্যাপী যজ্ঞস্থান নির্ম্মাণ] অসংখ্য যজ্ঞ, নিযুত একাহনিম্পন্ন যজ্ঞ এবং এয়োদশ দ্বাদশাহনিষ্পন্ন পুণ্ডরীক-যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়া দেবগণের অর্চ্চনা করিয়াছিলাম।
‘ব্রাহ্মণগণকে অষ্টসহস্র কাঞ্চনশৃঙ্গসম্পন্ন শুক্লবর্ণ বৃষ দান ও তাঁহাদিগের বিবাহক্রিয়া সম্পাদন করিয়াছিলাম।’
‘বিবিধ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়া ব্রাহ্মণদিগকে রাশি রাশি সুবর্ণ, রত্ন, ধনধান্যপরিপূর্ণ সহস্র সহস্র গ্রাম এবং দশসহস্র সকৃৎপ্রসূতা সবৎসা গাভী প্রদান করিয়াছিলাম। একবার একাদশাহনিষ্পন্ন যজ্ঞ, দুইবার দ্বাদশাহনিষ্পন্ন যজ্ঞ ও ষোড়শবার আকরিণযজ্ঞ ও অনেকবার অশ্বমেধ-যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলাম। ব্রাহ্মণগণকে একযোজনবিস্তৃত রত্নবিভূষিত কাঞ্চনপাদপের বন প্রদান করিয়াছিলাম। ক্রোধবিহীন হইয়া ত্রিংশৎ বৎসর পবিত্র পারায়ণব্রতের অনুষ্ঠানপূর্ব্বক প্রতিদিন ব্রাহ্মণগণকে নয় শত ধেনু প্রদান করিয়াছিলাম। একদিনও পয়স্বিনী ধেনু ও বৃষ দান করিতে বিরত হই নাই।
‘ত্রিংশৎ অগ্নিচয়ন, আটটি সর্ব্বমেধ, সাতটি নরমেধ ও এক সহস্র অষ্টাদশ বিশ্বজিৎ অনুষ্ঠান করিয়াছিলাম এবং সরযূ, বাহুদা, গঙ্গা ও নৈমিষ তীর্থে দশ লক্ষ গোদান করিয়াছিলাম। কিন্তু ঐ সমুদয় পুণ্যফলে আমার এই দুর্ল্লভ লোকলাভ হয় নাই। আমি কেবল পরম অনশন ব্রতের অনুষ্ঠান করিয়াই এই সুদুর্ল্লভ ব্রহ্মলোক লাভ করিয়াছি।
পূর্ব্বে দেবরাজ ইন্দ্র ঐ অনশন ব্রতের অনুষ্ঠানপূৰ্ব্বক উহা গোপনে রাখিয়াছিলেন, তৎপরে মহাত্মা শুক্রাচার্য্য তপোবলে উহা প্রাপ্ত হইয়া প্রকাশিত করেন। আমি যখন ঐ নিগূঢ় অনশনব্রতের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম, সেই সময় সহর্ষ মহর্ষি ও অসংখ্য ব্রাহ্মণ আমার নিকট সমুপস্থিত হইয়া প্রীতমনে ‘তোমার ব্ৰহ্মলোকলাভ হউক’ বলিয়া আমাকে আশীৰ্ব্বাদ করিয়াছিলেন। আমি তন্নিবন্ধন এই সুদুর্ল্লভ লোকে আগমন করিয়াছি। এই আমি আপনার নিকট আমার পবিত্র অনশনব্রতের বিষয় সবিস্তর কীৰ্ত্তন করিলাম। ইহলোকে অনশন অপেক্ষা উৎকৃষ্ট তপস্যা আর কিছুই নাই।’
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! মহাত্মা ভগীরথ এইরূপ কহিলে সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান ব্রহ্মা তাঁহার যথোচিত সম্মান করিয়াছিলেন। অতএব সর্ব্বদা অনশনব্রতের অনুষ্ঠান করিয়া ব্রাহ্মণদিগের অর্চ্চনা করা তোমার অবশ্য কর্ত্তব্য। কি মনুষ্য, কি দেবতা, সকলেরই অন্ন, বস্ত্র ও গোদান করিয়া ব্রাহ্মণদিগকে পরিতুষ্ট করা উচিত। অতএব তুমি লোভবিহীন হইয়া অনশনব্রতের অনুষ্ঠানপূর্ব্বক ব্রাহ্মণদিগের উপাসনা কর। ব্রাহ্মণগণের প্রসাদে কি ইহলোক, কি পরলোক সৰ্ব্বত্র সকল কাৰ্য্যে সিদ্ধিলাভ করা যায়।”
