3 of 4

১০১. ব্রাহ্মণের ধনাপহরণে দুর্গতি

১০১তম অধ্যায়

ব্রাহ্মণের ধনাপহরণে দুর্গতি

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! যে সমুদয় নৃশংস মূঢ় ব্যক্তি ব্রাহ্মণস্ব [ব্রাহ্মণের ধন] অপহরণ করে, তাহাদিগের কিরূপ গতিলাভ হয়, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি এই উপলক্ষ্যে চণ্ডালক্ষত্রিয় সংবাদনামক এক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। একদা এক ক্ষত্রিয় এক চণ্ডালকে গাত্রলগ্ন দুগ্ধক্ষালন করিতে দেখিয়া কহিলেন, ‘হে নিষাদ! আমি তোমার বৃদ্ধদশায় বালকের ন্যায় কার্য্য করিতে দেখিয়া নিতান্ত বিস্ময়াপন্ন হইলাম। তোমার সর্ব্বাঙ্গ কুক্কুর ও গর্দ্দভের ধূলিপটলে সমাচ্ছন্ন রহিয়াছে; কিন্তু তুমি আপনার পবিত্রতাসম্পাদনের নিমিত্ত গাত্রলগ্ন গোদুগ্ধ ক্ষালিত করিতেছ। এখন বুঝিলাম, সাধু ব্যক্তিরা এই নিমিত্তই চণ্ডালের কার্য্য গর্হিত বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন।’

“তখন চণ্ডাল কহিল, ‘মহারাজ! আমার গাত্রে ব্রাহ্মণের গাভীর দুগ্ধ লগ্ন হইয়াছে, সেই নিমিত্তই আমি উহা ক্ষালন করিতেছি। আমার পূৰ্ব্বজন্মে একদা এক নরপতি এক ব্রাহ্মণের গোধন অপহরণ করিয়া স্বীয় রাজধানীতে গমন করিতেছিলেন। ঐ সময় গোসমুদয়ের দুগ্ধ ক্ষরিত হয়। তৎপরে কতকগুলি ব্রাহ্মণ সোমলতার রস পান করিয়া ঐ গোধনহৰ্ত্তা নরপতির যজ্ঞাদি সম্পাদন করেন। ঐ যজ্ঞানুষ্ঠাননিবন্ধন ঐ ভূপতি, সেই সোমপায়ী ব্রাহ্মণগণ অচিরাৎ নরকে নিপতিত হইলেন এবং রাজার পুত্রপৌত্রাদি বিনষ্ট হইল। ঐ যজ্ঞে যেসমুদয় ব্যক্তি সেই অপহৃত গোসমুদয়ের দুগ্ধ, দধি ও ঘৃত পান করিয়াছিলেন, তাঁহাদিগকেও নিরয়গামী হইতে হইল।

‘যে স্থানে ঐ অপহৃত গোসমুদয়ের দুগ্ধ ক্ষরিত হইয়া সোমলতায় নিপতিত হয়, দুর্ভাগ্যবশতঃ আমি সেই স্থানে ব্রহ্মচারী ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া বাস করাতে আমার ভিক্ষান্নসমুদয় সেই দুগ্ধে আর্দ্র হইয়াছিল। আমি সেই ভিক্ষান্ন ভোজন করিয়াই এই চণ্ডালত্ব প্রাপ্ত হইয়াছি; অতএব ব্রাহ্মণস্ব অপহরণ কদাপি কর্ত্তব্য নহে। ঐ অপহৃত গাভীর দুগ্ধে সোমলতা আর্দ্র হইয়াছিল বলিয়া সেই অবধি পণ্ডিতেরা সোমরস বিক্রয় করাও নিতান্ত গর্হিত বলিয়া জ্ঞান করিয়া থাকেন। অতএব যাহারা সোমরস ক্রয় বা বিক্রয় করে, তাহারা যমলোক প্রাপ্ত হইয়া রৌরব-নরকে নিপতিত হয়। যে ব্যক্তি শ্রোত্রিয় হইয়া সোমরস বিক্রয় করে, তাহাকে নিরগামী হইয়া ত্রিশতবার বিষ্ঠাভোজী কীটাদিরূপে জন্মগ্রহণ করিতে হয়।

‘হে মহারাজ! অভিমানই ব্রহ্মস্বাপহরণের মূল কারণ; অতএব অভিমানের তুল্য উৎকট পাপ আর কিছুই নাই। নীচসেবা, অভিমান ও মিত্রের দারাপহরণ এই তিন পাপ তুলাদণ্ডে ধারণ করিলে অভিমানই গুরুতর পাপ বলিয়া নির্ণীত হয়। পূর্ব্বজন্মে আমার এই সহচর কুক্কুর মনুষ্য ছিল; কেবল অভিমানবশতঃই কুক্কুরযোনি প্রাপ্ত হইয়া এরূপ কৃশ ও কদাকার হইয়াছে। আমি পূৰ্ব্বজন্মে ধনাঢ্যবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলাম; বিজ্ঞানশাস্ত্রেও আমার বিলক্ষণ দৃষ্টি ছিল। আমি অভিমানকে দোষ বলিয়া অবগত ছিলাম না, এমন নহে; কিন্তু তথাপি সেই অভিমাননিবন্ধন আমি প্রাণীদিগের প্রতি ক্রোধ প্রকাশ ও অভক্ষ্য মাংসভোজন করিতাম। আমি সেই সমুদয় অসদ্ব্যবহার ও অভক্ষ্যভক্ষণনিবন্ধন এক্ষণেই এইরূপ দুর্দ্দশাগ্রস্ত হইয়াছি। বস্রান্তে অগ্নি সংলগ্ন হইলে যেমন ক্রমশঃ উহা দগ্ধ হয়, তদ্রূপ পাপপ্রতাপে আমার শরীর দগ্ধ হইতেছে। আমার বোধ হয়, যেন ভ্রমরে আমাকে দংশন করিতেছে। আমি সেই যন্ত্রণার নিমিত্ত ক্রোধভরে ধাবমান হইতেছি।

‘গৃহস্থ ব্যক্তিরা বেদাধ্যয়ন ও বিবিধ দানদ্বারা পাপ হইতে মুক্ত হয়। ব্রাহ্মণ হইলে বীতসঙ্গ [আসক্তিহীন] হইয়া আশ্রমে অবস্থানপূর্ব্বক বেদাধ্যয়ন করিয়া পাপ হইতে মুক্ত হয়েন। কিন্তু আমি অতি পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করিয়াছি; সুতরাং আমি কিরূপে পাপ হইতে মুক্ত হইব, তাহা কিছুমাত্র অবগত হইতে পারিতেছি না। আমি পূৰ্ব্বকৃত পুণ্যবলে জাতিস্মর হইয়াছি, এই নিমিত্ত আমার শুভকৰ্ম্মানুষ্ঠানদ্বারা মুক্ত হইবার বাসনা হইতেছে। অতএব এক্ষণে যাহাতে আমি এই চণ্ডালযোনি হইতে মুক্ত হইতে পারি, আপনি তাহার উপায় কীৰ্ত্তন করুন।’

তখন ক্ষত্রিয় কহিলেন, ‘নিষাদ! ব্রাহ্মণের নিমিত্ত সমরাঙ্গনে কলেবর পরিত্যাগ করিয়া ক্ৰব্যাদগণের তৃপ্তিসাধন করিলেই অনায়াসে পাপ হইতে মুক্ত হইয়া অভিলষিত গতিলাভে সমর্থ হইবে। ইহা ভিন্ন সদগতিলাভের উপায়ান্তর নাই।’

“হে ধৰ্ম্মরাজ! ক্ষত্রিয় এই কথা কহিলে চণ্ডাল ব্রাহ্মণের হিতসাধনাৰ্থ প্ৰাণ পরিত্যাগ করিয়া অভিলষিত গতিলাভ করিয়াছিল। অতএব যদি শাশ্বতী গতিলাভের বাসনা থাকে, তাহা হইলে যত্নপূৰ্ব্বক ব্রহ্মস্ব রক্ষা করা তোমার অবশ্য কর্ত্তব্য।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *