শয়তানের সন্তান – সৈকত মুখোপাধ্যায়
শয়তানের সন্তান এবং পতঙ্গ সঙ্গম – একজোড়া আতঙ্কের উপন্যাস
প্রথম প্রকাশ – ফেব্রুয়ারি ২০২২
প্রচ্ছদ – সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ – ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য
SHOITANER SONTAN
Dark Fantasy Novels by Saikat Mukhopadhyay
.
প্রয়াত সাহিত্যিক
অনীশ দেবের
স্মৃতির উদ্দেশে
.
অসম্ভবের বীজ
এই সংকলনে দুটো উপন্যাস রয়েছে—শয়তানের সন্তান আর পতঙ্গ সঙ্গম। এর মধ্যে পতঙ্গ সঙ্গম লিখেছিলাম বেশ কয়েকবছর আগে। তবু সেটি এতদিন বই হয়ে বেরোয়নি। কারণ, সে অপেক্ষা করছিল তার সঠিক জুড়িদারের জন্যে। হ্যাঁ, অবশেষে গত পুজোয় তার সেই জুড়িদার এল, যার নাম শয়তানের সন্তান। এবং দুটি উপন্যাস এবারে এক-মলাটের মধ্যে পাশাপাশি ঘর বাঁধল।
কেন এতদিন অপেক্ষা করতে হল? কী ছিল পতঙ্গ সঙ্গম উপন্যাসে, যা তাকে আমার অন্য সব লেখালেখির থেকে এতটাই আলাদা করে দিয়েছিল?
তাহলে বলি, উপন্যাসটা লিখবার সময় আমি এক ঘূর্ণির মধ্যে পড়ে গেছিলাম। আমারই কল্পিত চরিত্ররা আমাকে হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল এখান থেকে সেখানে। কাচকল বস্তির অন্ধকার ঘর থেকে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির রহস্যময় রিসার্চ-ল্যাবরেটরিতে; স্টিল প্ল্যান্টের নারকীয় স্ল্যাগ-ব্যাঙ্ক থেকে বাতিল-বেশ্যার ঘরে।
ঘটনাগুলোও কেমন যেন এক অবশ্যম্ভাবিতায় ঝড়ের গতিতে ঘটে চলেছিল। লিখতে-লিখতেই দেখছিলাম, মানব-মনের অধিকার নিচ্ছে নৃশংস প্যারাসাইট! আপাতভাবে বিনা কারণেই কেউ আত্মহত্যা করছে! অ্যাসিডে পুড়ে যাচ্ছে কারুর আধখানা মুখ, গুলিতে টুকরো হয়ে যাচ্ছে কারুর পা। এর কোনোকিছুই আমি আগে থেকে ভাবিনি। অথচ সবশেষে কী নিখুঁতভাবে সবকিছুই গিয়ে একটা অন্ধকার বিন্দুতে মিশে গেল।
এ এক আশ্চর্য ঘোর, একজন লেখকের জীবনে যা মাত্র কয়েকবারই আসে। যে ঘোরের মধ্যে তার কল্পনা হয়ে ওঠে চরমতম দুঃসাহসী। যা কখনও হয়নি, হবার নয়, তাকেই তখন সে ঘটিয়ে দিতে পারে। জানতাম, ইচ্ছে করলেই এই আত্মসম্মোহনকে ডেকে আনা যায় না। তার জন্যে লেখককে অপেক্ষা করতে হয়।
আমিও অপেক্ষা করলাম। তারপর আবার এক অনুরূপ অসম্ভবের বীজ মাথায় এল। কোথা থেকে এল, কীভাবে এল জানি না। এবার আর প্যারাসাইট নয়, নারী-শরীরের দখল নিল আদিম অপদেবতা।
পতঙ্গ সঙ্গমের সঙ্গে এই শয়তানের সন্তান আরো কিছু জায়গায় মিলে গেল। আখ্যানের পরতে-পরতে যে অন্ধকার জমল, তার খোঁজে এবারেও আমাকে কোনো আমাজনীয় অরণ্যে যেতে হল না, ঢুকতে হল না কোনো মধ্যযুগীয় স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দুর্গে। সেবার যেমন দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টের আলো-আঁধারিতে নরকের দরজা খুলে গিয়েছিল, তেমনই এবার তা খুলে গেল এই কলকাতারই ট্যাংরা কসাইখানার পেছনে এক পরিত্যক্ত সেরামিকের কারখানার অন্দরে। অর্থাৎ বিশুদ্ধ আঞ্চলিক উপাদান দিয়েই তৈরি হয়ে গেল সার্বজনীন আতঙ্কের একখানি উপন্যাস।
কী বলব এই দুটো উপন্যাসকে? ডার্ক-ফ্যানটাসি? বায়ো-থ্রিলার? ক্রশ-জঁর?
না, আমি কিছুই বলব না। কারণ নিজের লেখায় লেবেল লাগানো লেখকের কাজ নয়। ওটা সমালোচকদের অভিরুচি। একজন লেখক হিসেবে বরাবরই যা চেয়ে থাকি, এই দুটো উপন্যাস লেখার সময়ও সেটুকুই চেয়েছিলাম। এরা যেন পাঠককে আনন্দ দিতে পারে; প্রথম থেকে শেষ অবধি যেন পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। তার বেশি কিছু নয়। পেরেছি কিনা, সেটা আপনারাই বলবেন। যদি পেরে থাকি, তাহলে আমার প্রতীক্ষা এবং পরিশ্রম সার্থক।
পরিশেষে একটাই কথা বলার। প্রায় আটমাস আগে আমার প্রিয় অগ্রজ এবং প্রণম্য অভিভাবক অনীশ দেব লোকান্তরিত হয়েছেন। চলে যাবার কয়েকদিন আগেও এই লেখাদুটি সম্বন্ধে আমাকে তিনি কিছু পরামর্শ দিয়ে গিয়েছিলেন। এই দুটি কাহিনির কোনো-কোনো অংশে তাঁর সেই অন্তিম সংশোধন-চিহ্ন প্রচ্ছন্ন রইল। এই শেষ। আর কখনো কোনো লেখার পাণ্ডুলিপি নিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারব না, ‘দাদা, একটু দেখে দিন।’
চোখের জলের সঙ্গে এই বইটি তাই অনীশদাকেই উৎসর্গ করলাম।
সৈকত মুখোপাধ্যায়
১২ ডিসেম্বর ২০২১






Leave a Reply