দশ
একটা কর্কশ আওয়াজে কানে তালা ধরে গেল। প্রথমে কেউ বুঝতে পারিনি শব্দটা কোথা থেকে এল। সবাই হতবুদ্ধির মতন তাকাচ্ছি। তারপরে একসঙ্গেই সবাই বুঝলাম।
মেঝের ওপরে বসানো ম্যানহোলের ঢাকনাটা বিশাল এক বিস্ফোরণে ছাদের দিকে উড়ে গেল। রক্তের চৌবাচ্চা থেকে প্রথমে উঠে এল একটা মাথা। একঢাল কালো চুলে ভরা একটা নিটোল মুণ্ডু! তারপর শুভ্র সুন্দর দুটো কাঁধ…বাহু…নগ্ন পিঠ। সাটিন-মসৃণ ত্বকের ওপর দিয়ে পিছলে যাচ্ছিল পশুরক্তের ধারা।
পরক্ষণে চৌবাচ্চার কিনারায় তার নগ্ন-শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়াল বিশাখা। একবার পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল আমার মুখের দিকে।
না না—এ তো বিশাখা নয়। আমার মা! আমার মৃতা মা।
এই মুহূর্তে আমার চেয়ে সুখী এই পৃথিবীতে আর কে আছে? আমার ডানদিকে আমার জনক—ডেভিল। আমার বাঁ-দিকে আমার মা। তার বুকে ওই যে পরিপূর্ণ তিনটি স্তন! ওই মাঝের স্তনটির দুধ পান করে আমি জীবনের প্রথম একটা বছর বেঁচে ছিলাম, যতদিন না বিরাজ কাপালি আমাকে পুরুলিয়ার অরফ্যানেজে রেখে দিয়ে এসেছিলেন।
দু-এক মুহূর্তমাত্র। অথচ আমার মনে হচ্ছিল, কত যুগ ধরে যেন মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তারপর খুব নিশ্চিত-ভঙ্গিতে আমার মা আগুনের ভেতরে ঢুকে গেল। বাইশ বছর আগে যে মৃতদেহের সৎকার হয়নি, বাইশ বছরে যে-মৃতদেহের বয়স বাড়েনি, আজ, এইমুহূর্তে তার দাহকার্য সম্পন্ন হল।
তারপর যে ঠিক কী হল, বুঝিয়ে বলতে পারব না। চেতন-অচেতনের মাঝামাঝি এক অবস্থায় আমি দেখলাম ফার্নেস থেকে এক কালো আগুনের শিখার মতন বেরিয়ে এল সেই বৃষমানুষ। মুহূর্তে একহাজার চিনেমাটির প্লেট ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল মেঝের ওপরে। স্প্রিন্টারের মতন ছুটে যাওয়া অসংখ্য কাচের টুকরোর আঘাতে যুবতী-শরীরগুলি মুহূর্তের মধ্যে রক্তের আঁকিবুঁকি রেখায় ভরে গেল।
ওরা কি তখন আর্তনাদ করছিল? জানি না। জানা সম্ভব নয়। কারণ, পশুমানুষের ক্রুদ্ধ নিশ্বাস সেই মুহূর্তে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির অত বড় ঘরটাকে ঝাঁকিয়ে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। সেই শব্দকে ছাপিয়ে আর কিচ্ছু শোনা যাচ্ছিল না।
শুধু সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম! অবর্ণনীয়! বীভৎস!
দেখতে পাচ্ছিলাম, সোফিয়ার পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক দিয়ে বেরিয়ে গেছে বৃষমানুষের একটা শিং। তার ডানহাতে তখনো রিভলভারটা ধরা। অবিশ্বাসী চোখে তখনো বিস্ময়। তাঁর মরতে তখনো কয়েক সেকেন্ড দেরি।
পরমুহূর্তেই ওর সঙ্গীর ঘাড়-মটকানো শরীরটা দেয়ালে আছড়ে পড়ল। বাকি দুজনকে যখন সে ধারালো খুরের নীচে থেঁতলে দিচ্ছিল, তখন আমি আর তাকিয়ে থাকতে পারিনি, আতঙ্কে চোখ বুজে ফেলেছিলাম।
একটু বাদে যখন চোখ খুললাম, তখন স্কাইলাইট দিয়ে ঘরের ভেতরে আলো এসে পড়েছে। আমাদের জনক, বৃষমানুষ, ফিরে গেছেন ফার্নেসের ভিতরে। সেখানে ধিকধিক করে অল্প একটু আগুন জ্বলছে যার বেশিরভাগটাই জ্বলছে হাসিদি, পঙ্কজদা আর আর আমার মায়ের অবশিষ্ট রক্তমাংসের ইন্ধনে। জার্মান মেয়েগুলোর ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ এখানে-ওখানে নিথর পড়ে আছে। কাচ কারখানার ঘরটাকে দেখে মনে হচ্ছিল, বন্ধ ঘরটার মধ্যে একটা বিরাট বোমা ফেটেছিল।
বিরাজ কাপালি আমার পাশেই তাঁর হুইল-চেয়ারে নেতিয়ে পড়ে ছিলেন। আমাকে চোখ খুলতে দেখে ক্ষীণ গলায় বললেন, আমরা কি এই যাত্রায় বেঁচে গেলাম, রুদ্র?
আমার মাথার ভেতরের পোকাটা আমাকে যা বলেছিল, আমি ওঁকে তাই বললাম। বললাম, তিনি আমাদের ফিরে পেতেই চেয়েছিলেন। বাঁচা-মরা জানি না। ওঁর সঙ্গে আমাদের চলে যেতে হবে। ওই দেখুন, তিনি আমাদের টানছেন। নানা, হুইল-চেয়ারের হাতল চেপে ধরে কোনও লাভ নেই। আমাদের যেতেই হবে।
ভ্যাক্যুম-ক্লিনার যেভাবে ধুলোবালিকে টানে, ফার্নেসের ভেতর থেকে সেইভাবে এক প্রবল শূন্যতা আমাদের ধরে টান দিল। সেই টানে আমরা দুজন চারাগাছের মতন উপড়ে গেলাম।
তারপর থেকেই আমার চারিদিকে স্বর্গ নরক, পাপ পুণ্য, জন্ম মৃত্যু কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। ছুটে চলেছি মহাশূন্যের অনন্ত অন্ধকারে।
