শয়তানের সন্তান – ১

এক

আমার নাম রুদ্র। রুদ্রনাথ এক্কা। জোসেফ রুদ্রনাথ এক্কা। বয়স একুশ।

এক্কা না হয়ে টেক্কা হলেও কোনো তফাত হতো না। আসলে হওয়া উচিত ছিল ফক্কা। তার কারণ আমি একজন বাস্টার্ড, যাকে বাংলায় বলে বেজন্মা। বেজন্মাদের বাপের পদবি জানা থাকে না; আমারও ছিল না। ব্যাপটাইজ করার সময় আমাদের হোমের রেক্টর, ফাদার স্যামুয়েল, বরাবরের মতন যা-হোক একটা খ্রিস্টান নাম আর মদেশিয়া পদবি দিয়ে আমাকে দেগে দিয়েছিলেন।

যেটাকে ‘হোম’ বলছি, সেটা আসলে অরফ্যানেজ, মানে অনাথ আশ্রম। রঘুপুরের এই অরফ্যানেজটা চালায় পুরুলিয়ার লুথেরান মিশন। আমার মতন যারা এখানে মানুষ হয়, তাদের জন্ম আশেপাশের বেশ্যাপাড়ায়। কোনো বেশ্যা যদি কচি-বাচ্চা রেখে মারা যায়, তাহলে সেখানকার দালাল বা মাসিরাই বাচ্চাটাকে অনাথ-আশ্রমে জমা করে দিয়ে যায়। তাছাড়া আর কী-ই বা করবে? তবে বাচ্চাটা যদি ছেলে হয় তাহলেই অরফ্যানেজ অবধি পৌঁছয়। মেয়ে হলে মাসিরা নিজেদের কাছে রেখে দেয়। বড় হলে লাইনে নামায়।

আপনাদের কাছে এসব কথা শকিং লাগছে কিনা জানি না, আমার লাগে না। কারণ জ্ঞান হওয়ার পর থেকে এরকমই দেখছি, শুনছি। যে-বয়সে মানুষের মনে লজ্জা-ঘৃণা পাপ-পুণ্যের ধারণা জন্মায় তার ঢের আগে থেকেই আমরা মানে হোমের ছেলেরা জানি যে, আমাদের মায়েরা লছিপুরের ঢালে শরীর বেচত এবং আমাদের বাপের ঠিক নেই। ফলে তার জন্যে আমরা লজ্জা বা ঘেন্না পেতে শিখিনি।

জ্ঞান হওয়ার পর থেকে রঘুপুরের অরফ্যানেজটাকেই আমার ঘরবাড়ি বলে জানতাম। রেক্টর স্যামুয়েল মণ্ডল, মনিটর মাইকেলদা, ক্যান্টিনের জুলিয়া ওঁরাও সকলেই ছিলেন কনভার্টেড ক্রিশ্চিয়ান। সকলেই এই আশেপাশের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া কিম্বা বর্ধমান জেলার আদি বাসিন্দা। দারুন হাসিখুশি, শিক্ষিত, সুন্দর মানুষজন সব। তেমনই সুন্দর ক্যাম্পাস ছিল আমাদের। অজস্র শাল সেগুন ইউক্যালিপটাস-গাছে ভরা বাগানের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল স্কুল, লাইব্রেরি, ডিসপেন্সারি আর বয়েজ হোস্টেল। ছোট একটা চার্চও ছিল একদিকে।

পাশেই আলাদা একটা কম্পাউন্ডের মধ্যে ছিল নার্সারি-সেকসন। ওখানে সদ্যোজাত বাচ্চা থেকে ছ’বছর বয়স অবধি ছেলেরা থাকত। আমিও জীবনের প্রথম ছ’টা বছর ওখানেই কাটিয়েছিলাম।

রোববার কিম্বা পরবের দিনগুলোতে নার্সারির গেটে দেশি-বিদেশি গাড়ি এসে দাঁড়াত। আমাদের পেট্রনদের গাড়ি। ওদের অনুদানেই মিশন চলে। বেশিরভাগই সাদা চামড়ার সাহেব-মেম। জাপানিও ছিলেন বেশ কয়েকজন। এদেশিয়ও ছিলেন—তবে তাঁরা সংখ্যায় কম। পেট্রনরা নার্সারির বাচ্চাদের জন্যে জামা-কাপড়, খেলনা, টফি-লজেন্স আর ফ্রুটস নিয়ে আসতেন। তাঁরা চলে যাওয়ার পরে জুলিয়াদিদির হাত থেকে আমরা বড়রাও খাবারের ভাগ পেতাম।

এই যে সবটাই পাস্ট টেন্সে লিখছি, তার কারণ, আমি তিন বছর আগেই ওই হোম থেকে বেরিয়ে এসেছি।

‘তিন-বছর আগে’ মানে তখন আমার আঠেরো-বছর বয়স। ক’দিন পরে হায়ার-সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেব আর তারপরেই হোম থেকে কলকাতায় চলে যাবো—এইরকমই ঠিক ছিল। আঠেরো-বছর বয়সের পর আর রঘুপুরের হোমে কাউকে রাখা হয় না—কলকাতায় লুথেরান ওয়ার্ল সার্ভিসের যে কলেজ আছে সেখানে পড়াশোনা করতে পাঠানো হয়। যাদের হাতের কাজ কিম্বা মেশিনপত্রের দিকে ঝোঁক আছে তাদের জন্যে সেরকম ট্রেনিং-এর ব্যবস্থাও ওরাই করে দেন। তারপর যাও, নিজে চরে খাও। সিস্টেমটা এরকমই।

কিন্তু পরীক্ষা দেওয়া হল না। তার আগেই আমার কুষ্ঠরোগ ধরা পড়ল। সেই ধরা পড়ার গল্পটাও বেশ মজার। সেটা ছিল শীতকাল। তীব্র ঠান্ডা পড়েছিল সেবার। তারমধ্যেই সন্ধেবেলায় খেলার মাঠ থেকে ফিরে পায়ে জল ঢালছিলাম। পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন আমাদের রেক্টর, ফাদার স্যামুয়েল। কিছুক্ষণ দেখার পর উনি জিগ্যেস করলেন, তোমার শীত করছে না রুদ্র? খালি পায়ে এইভাবে মগের পর মগ জল ঢেলে চলেছ যে।

আমি বললাম, না তো। মনে হচ্ছে জলটা পায়ে লাগছেই না।

স্যামুয়েল স্যারের ভুরুদুটো কুঁচকে গেল। উনি কাছে এসে আমার কপালে হাত ছোঁয়ালেন। বললেন, হুঁ, বেশ টেম্পারেচার রয়েছে, অথচ পায়ে ঠান্ডা জল লেগে শীত করছে না। এতো অবাক ব্যাপার। তুমি সিক রুমে চলে যাও। আমি লিখে দিচ্ছি।

সেই শুরু। তারপর তো ব্লাড-টেস্ট। কনফারমেশন। হোম থেকেই আমাকে তড়িঘড়ি শর্বরী মোড়ের কুষ্ঠ আশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হল। অনাথ আশ্রম থেকে কুষ্ঠ আশ্রম। কপালটা ভাবুন একবার!

পুরোপুরি কপালের ব্যাপার নাও হতে পারে। কারুর কারুর শরীরে কুষ্ঠরোগের জীবাণু বহু-বছর ঘুমিয়ে থাকার পরে মাথাচাড়া দেয়। ভেবেছিলাম, যে-মায়ের কাছ থেকে আদর পাইনি, তার কাছ থেকেই হয়তো কুষ্ঠের জীবাণুটা পেয়েছি; আঠেরোবছর লেগেছে তাদের জেগে উঠতে।

ভুল ভেবেছিলাম। ওটা ছিল আসলে এক অভিশাপ। গল্পটা পুরোটা শুনলে বুঝতে পারবেন।

.

শর্বরী মোড়ের লেপ্রসী-সেন্টারে ডক্টর শিপ্রা ঘোষের আন্ডারে টানা দু-বছর চিকিৎসা হল আমার। রোগমুক্ত হলাম। শরীরের অন্য কোথাও রোগ ছড়ালো না, কিন্তু ওই যে পায়ের পাতা দুটোয় প্রথম অ্যাটাক করেছিল, ও দুটো বাঁচানো গেল না।

দুটো পায়ের দশটা আঙুল গুটিয়ে ছোট্ট হয়ে গেল।

শিপ্রাদি ডাক্তার হিসেবে যত ভালো, দিদি হিসেবে তার চেয়েও ভালো। কি যে ভালোবেসে ফেলেছিলেন আমায় সে বলবার নয়। মাঝে-মাঝেই ইয়ার্কি মেরে বলতেন, তোর এই ফিল্মস্টারের মতন চেহারাটা যে বাঁচাতে পারলাম রুদ্র, এটাই আমার ক্রেডিট।

আসলে আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যেই ওসব বলতেন, কারণ যতই আমার গায়ের রঙ ফরসা হোক, নাক মুখ কাটা কাটা হোক, হাইট হোক ছ’ফুট—পায়ে তো আঙুল নেই। লেপ্রসি-সেন্টার থেকে কিনে দেওয়া মোটা চামড়ার গোল-গোল জুতো পরে টলমল করে হাঁটি। একটা ল্যাংড়া ছেলেকে ফিল্মস্টারের সঙ্গে তুলনা করার আর কী কারণ থাকতে পারে?

 ঠিক দু-বছরের মাথায় বুঝতে পারলাম, আমাকে যত শীঘ্র সম্ভব ওই লেপ্রসি-সেন্টার থেকে পালাতে হবে। আমি আর চেক-আপের রিস্ক নিতে পারব না। আমার শরীরে এমন কিছু একটা ঘটে চলেছে যেটা কাউকে জানানোর মতন নয়। ডাক্তারকেও নয়। শিপ্রাদিকে বললাম, আমি তো সেরে গেছি। এবার আমাকে ছেড়ে দিন।

শিপ্রাদি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, চলে যাবি? তা যেতেই পারিস। সত্যিকথা বলতে কি আমিও সেরকমই ভাবছিলাম। তা, কোথায় যাবি কিছু ঠিক করেছিস?

আমি বললাম, ফাদার স্যামুয়েলকে একবার ফোন করে দেখবেন?

শিপ্রাদির মুখটা করুণ হয়ে গেল। উনি বললেন, করেছিলাম। ওঁরা তোকে ফিরিয়ে নেবে না। তোর নামে এককালীন কিছু সাহায্য পাঠিয়ে দিয়েছেন। দু-লাখ টাকা। বলেছেন, ওই টাকায় যেন তোর রিহ্যাবিলিটেশনের ব্যবস্থা করে দিই। ভাগ্য ভালো বলতে হবে, সবেমাত্র গত সপ্তাহেই সেরকম একটা ব্যবস্থা হয়েছে। আচ্ছা, তুই কি বিরাজ কাপালি বলে কাউকে চিনতিস?

আমি ঘাড় নাড়লাম। সত্যিই অমন অদ্ভুত নামের কাউকে আমি চিনতাম না।

শিপ্রাদি বললেন, আশ্চর্য তো! উনি কিন্তু তোর ব্যাপারে খুব ইন্টারেস্টেড। একদম বিশেষ করে তোর ব্যাপারেই। প্রথমে রঘুপুর অরফ্যানেজে তোর খোঁজ করেছিলেন। তারপর সেখান থেকে ট্রেস করতে-করতে এখানে পৌঁছেছেন। উনি আসেননি শুনলাম উনি ক্রিপলড। চলাফেরা করতে পারেন না। ওঁর ম্যানেজার এসেছিলেন। তিনি বললেন, মিস্টার কাপালি তোকে নিজের কোম্পানিতে কাজ দিতে চান।

শিপ্রাদিকে বললাম, আপনি জিগ্যেস করলেন না, হঠাৎ আমাকেই কেন?

শিপ্রাদি বললেন, জিগ্যেস করিনি কে বলল তোকে? করেছিলাম। তাতে ম্যানেজারমশাই বললেন, মিস্টার কাপালি এরকম অনেক দুঃস্থ ছেলেকেই পুনর্বাসন দিয়ে থাকেন। তবে কাজটা এমন যে, শুধু অনাথ হলেই হবে না। তাদের একইসঙ্গে লম্বা চওড়াও হতে হবে। তুই যেহেতু এই দুটো শর্তই পূরণ করছিস তাই…

আমি শিপ্রাদির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, আমাকে ওরা দেখল কোথায়?

শিপ্রাদি এইবার একটু রেগে গেলেন। বললেন, কেন? তুই কি পর্দার আড়ালে থাকিস নাকি? ম্যানেজারবাবু নিশ্চয় কখনো রঘুপুরের হোমের বাগানে তোকে বাঁদরামি করতে দেখেছিলেন। তখনই ফাদার স্যামুয়েলের কাছে তোর খোঁজখবর নিয়েছিলেন। হতে পারে না এরকম?

আমি ভয়ে ভয়ে ঘাড় হেলালাম—হতেই পারে। বুঝতে পারছিলাম, আপাতত যেটুকু খড়কুটো পাই, তাই আঁকড়ে ধরে আমার এখান থেকে বেরিয়ে পড়া উচিত। তাই শিপ্রাদিকে জিগ্যেস করলাম, আর কি বললেন পাটালি স্যারের ম্যানেজার?

পাটালি নয়, কাপালি। বললেন, আমি পারমিসন দিলে ওরা তোকে নিয়ে যাবে। ওদের কোম্পানিতে কাজ দেবে; থাকার জায়গা-টায়গা নিয়েও চিন্তা করতে হবে না। মানে এককথায় যাকে বলে ‘রিহ্যাবিলেট’ করে দেবেন তোকে।

তারপর শিপ্রাদি আমাকে জিগ্যেস করলেন, যাবি, কাপালি স্যারের ওখানে?

বললাম, অবশ্যই যাব। কিন্তু কোথায় যেতে হবে? আর যাবই বা কীভাবে?

শিপ্রাদি বললেন, সে ওদের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। আমি বললেই ওরা তোকে এখান থেকে নিয়ে যাবে। যেতে হবে কলকাতায়। তাহলে আমি ওদের খবর পাঠাচ্ছি, কেমন? সামনের সোমবারে তোর রিলিজ লিখে দেব।

.

আজকেই সেই সোমবার। ভোর ছ’টার মধ্যে ব্যাগ-ট্যাগ, কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে কুষ্ঠাশ্রম থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে এসে দেখলাম পুরো পৃথিবীটাই যেন একটা উপাসনালয় হয়ে রয়েছে। ফুলের গন্ধ, সোনালি রোদ, পাখির গান। যেন একটু আগেই ঈশ্বর এখান দিয়ে হেঁটে গেছেন। এত কনফিডেন্স পেলাম, কী বলব।

পুরোনো আমলের একটা ফিয়াট গাড়ি নিয়ে গেটের বাইরে বিরাজ কাপালির ড্রাইভার আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। যিশুর নাম নিয়ে রওনা হয়ে পড়লাম। শুনতে পেলাম শিপ্রাদি পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলছেন, ওষুধগুলো কিন্তু নিয়ম করে খাবি রুদ্র। সেরে গেছিস ভেবে বন্ধ করবি না। চোখে জল চলে এল। আবারও মনে হল, ঈশ্বর এই কুষ্ঠাশ্রমের ক্যাম্পাসের মধ্যেই থাকেন। ঈশ্বর নন, ঈশ্বরী।

চেনা জায়গা ছাড়িয়ে যেতেই কিন্তু আমার সব কনফিডেন্স উবে গিয়ে মনের ভেতরে একটা উদ্বেগ কাজ করতে শুরু করল। উদ্বেগটা ওই চাকরি নিয়েই। কেমন চাকরি—আমি সামলাতে পারব কিনা—সেসব কিছুই তো এখনো জানলাম না। ড্রাইভার-সাহেবের সঙ্গে একটু খেজুর করে কথা বার করবার চেষ্টা করলাম, লাভ হল না। ভদ্রলোক খেজুরের আঁটির চেয়েও কঠিন। তবে গাড়ি যখন আসানসোলের কাছাকাছি পৌঁছেছে তখন ড্রাইভার-সাহেবের মোবাইলটা বেজে উঠল, উনি স্টিয়ারিং-এ একটা হাত রেখেই কলটা রিসিভ করলেন। দু-একবার হ্যাঁ স্যার, না স্যার বলে পেছনদিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, ধরুন। স্যার আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।

ফোনটা কানে নিয়ে বললাম, হ্যালো।

রুদ্র বলছ? আমি বিরাজ কাপালি বলছি ভাই।

গলার স্বরটা অসম্ভব স্নিগ্ধ। আর তেমনি আন্তরিক। শুনেই মন ভালো হয়ে গেল। বললাম, বলুন স্যার।

কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো? আমি প্রশান্তকে বলে রেখেছি, তোমরা আসানসোলে ব্রেকফাস্ট করে নেবে। আর ও তোমাকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছে সেটা আমারই একটা প্রোজেক্ট। ওখানে তোমার থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছি। আজ সারাদিন বিশ্রাম নাও। আমি পরে তোমার সঙ্গে দেখা করে কাজের কথা বলে নেব, কেমন?

আচ্ছা স্যার।

ওখানে যারা রয়েছে, তারা অ্যাকচুয়ালি আউটসাইডার। কিছুদিনের জন্যে ওদের থাকতে দিয়েছি। তবে ওরা মানুষ ভালো। তবু বলছি, ওদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা কোরো না। পরে তোমাকে ডিটেলে সব বলব।

আচ্ছা স্যার।

উনি বললেন, মুশকিল হচ্ছে, ওই পুরো এরিয়াটায় মোবাইলের টাওয়ার পাওয়া যায় না। তাই এখনই কথা বলে নিলাম। আচ্ছা রাখছি তাহলে? চলো, বেস্ট অফ লাক।

থ্যাঙ্কিউ স্যার।

আমি ফোনটা প্রশান্তবাবুর হাতে ফিরিয়ে দিলাম। ওঁর ওইটুকু কথাতেই একটু আগের সেই উদ্বেগ পুরোটাই কেটে গেল। বেশ ফুরফুরে মন নিয়ে আসানসোল-বাইপাসের ধারে একটা পাঞ্জাবি ধাবায় আচার দিয়ে আলুর পরোটা আর মালাই চা খেলাম। তারপর আবার জার্নি শুরু করে, শেষমেষ দুপুর একটা নাগাদ আমাদের গন্তব্যে পৌঁছলাম।

গাড়ি থেকে নেমে কিন্তু পুরো ভ্যাবলা বনে গেলাম। এই তো কুড়ি-মিনিট আগে ভিড়ে-ঠাসা শেয়ালদা স্টেশন পার হলাম। তারপর রাস্তার ধারের সাইনবোর্ডগুলো দেখে মনে হয়েছিল বেলেঘাটা বলে একটা জায়গার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। সেটাও খুবই জমজমাট জায়গা ছিল। কিন্তু তারপর একটা খালের পাশ দিয়ে দু-একটা মোড় নিতেই এ কোন আশ্চর্য জায়গায় এসে পড়লাম! শিয়ালদা স্টেশনের এত কাছে এরকম নির্জন একটা জায়গা থাকতে পারে!

রাস্তাটার একদিকে উঁচু পাচিল দিয়ে ঘেরা টানা লম্বা একটা জমি। তার মাঝখানে একটা বন্ধ কারখানা। অন্যদিকেও একটা পাঁচিল, তবে সেটা নীচু আর জায়গায়-জায়গায় ভাঙা। নীচু পাঁচিলটার ওদিকে অনেকখানি এবড়োখেবড়ো জমি পেরিয়ে ব্যারাকবাড়ির মতন কয়েকটা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। ওগুলো কী তা তখনো জানতাম না। পরে জেনেছি, ট্যাংরা স্লটার-হাউস, মানে কসাইখানা।

তার মানে ব্যাপারটা যা দাঁড়ালো, একটাই নির্জন রাস্তা—তার একপাশে একটা বন্ধ কারখানা আর অন্যপাশে কসাইখানার পেছনদিকের পোড়ো জমি। পুরো রাস্তাটায় বাড়িঘর দোকানপাট এসব কিছুই নেই। রাস্তাটাও ভাঙাচোরা। দেখেই বোঝা যায়, বহুদিন পিচ পড়েনি।

ড্রাইভার প্রশান্তবাবু ওই বন্ধ কারখানাটার গেটের সামনে গাড়ি পার্ক করেছিলেন।

দেখেই বোঝা যাচ্ছিল কারখানাটা বহু পুরোনো। একটাই বিশাল শেড, তার পাতলা ইটের দেয়াল, আর্চ করা টালির ছাদ। দেয়ালের গা থেকে পলেস্তারার বারোআনাই খসে পড়েছে। স্কাইলাইটের কাচগুলোরও একই দশা। ছাদের মাঝ-বরাবর একটা ইটের চিমনি। ওরকম ইটের চিমনি বোধহয় একশো বছর আগে তৈরি করা হতো।

নেমে পড়ুন। ভেতরে গাড়ি ঢুকবে না। বাকিটা পায়ে হেঁটে চলে যান।

প্রশান্তবাবুর কথায় চমকে উঠলাম। উনি কি ওই পরিত্যক্ত কারখানাটার মধ্যে ঢোকার কথা বলছেন? হ্যাঁ, তাই তো। আঙুল তুলে ওইদিকেই তো দেখাচ্ছেন দেখছি।

অগত্যা হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে গাড়ি থেকে নেমে, কারখানার গেটের দিকে হাঁটা লাগালাম। প্রশান্তবাবু গাড়ি নিয়ে চলে যাবার আগে বেশ কয়েকবার হর্ন বাজিয়ে দিয়ে গেলেন। বুঝলাম, ওটা আমার আগমন বার্তা। কাদের উদ্দেশে কে জানে।

কাছে গিয়ে দেখলাম, পুরো কম্পাউন্ডটাকে ঘিরে দু-মানুষ সমান উঁচু একটা পাঁচিল, যেটাকে রিসেন্টলি মেরামত করা হয়েছে। চুন-সুরকির পাশাপাশি সিমেন্টের পলেস্তারাই তার প্রমাণ। পাঁচিলের মাথায় কাঁটাতারের বেড়া। স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি ফটকের পাল্লা-দুটোও নতুন। অর্থাৎ একটা বহু পুরোনো কারখানা ঘিরে নতুন করে সিকিউরিটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কে জানে কেন!

ফটকের পাল্লাদুটো চেন-তালা দিয়ে এমন করেই বাঁধা ছিল যে, একজন মানুষ ফাঁক দিয়ে গলে ভেতরে ঢুকতে পারে।

আমি পাল্লার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।

কারখানা-বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছিয়ে ঘাড় তুলে ওপরদিকে তাকালাম। দেখলাম ছাদের কার্নিশের নীচে পঙ্খের কারুকার্য করে রোমান হরফে লেখা আছে ‘BAVERIA PORCELAIN INDUSTRY—1949’।

পোর্সেলিন! মানে চিনেমাটি? মনে-মনে কপাল চাপড়ালাম। শেষকালে কাপ-ডিশ বানাতে হবে? মুখে কিছু বললাম না অবশ্য। জানতাম, ভিক্ষের ঝোলায় দেরাদুন রাইস পড়ল না মিনিকিট দেখতে নেই।

কারখানা-ঘরের দরজাটা এতক্ষণ বন্ধ ছিল। সামনে গিয়ে দাঁড়ানো-মাত্রই দরজা খুলে দুজন মানুষ বাইরে বেরিয়ে এল—একজন মেয়ে, একজন মরদ। মেয়েটির গড়ন ছিপছিপে, গায়ের রঙ শ্যামলা। দেখে মনে হল ত্রিশের আশেপাশে বয়স হবে। গাছকোমর বেঁধে শাড়ি পরেছিল। সিঁথিতে সিঁদুর ছিল না। বড়-বড় চোখে মেয়েটা আমাকে দেখছিল আর ঝকমকে দাঁতের আলো ছড়িয়ে হাসছিল।

পুরুষটির বয়স চল্লিশের কিছুটা ওপরে। হাইট বেশি নয়, কিন্তু চেহারাটা সলিড। শরীরের প্রতিটি পেশি যেন আলাদা করে গুনে নেওয়া যায়। আর তেমনি রোমশ। পিঠ বুক তো ছেড়েই দিলাম, কাঁধ থেকে থেকে বাহুর ওপরের অংশটা অবধি ঘন লোমে ঢাকা। মাথার কাঁচাপাকা চুল কদমছাট করে ছাটা। গায়ে জামা ছিল না, শুধু একটা নীল লুঙ্গি হাফ করে জড়ানো ছিল কোমরে।

মেয়েটা হাসতে-হাসতেই বলল, এসো রুদ্র। আমার নাম হাসি মণ্ডল। তুমি হাসিদি বলে ডেকো। আর এ হচ্ছে পঙ্কজদা। পঙ্কজ মিদ্যা।

হাসিদি? নামটা শুনেই আমার মনে হল, এটা ওর আসল নাম নয়। ওর হাসিমুখ দেখেই লোকে নিশ্চয় ওর নাম দিয়েছে হাসি।

আমাকে চমকে দিয়ে পঙ্কজ নামের লোকটি মুখ দিয়ে একটা গোঙানির মতন আওয়াজ করল। বুঝলাম, বেচারা বোবা; তবে কানে নিশ্চয় শুনতে পায়।

হাসিদি আর পঙ্কজদার সঙ্গে পায়ে-পায়ে দরজা পার হয়ে কারখানার ভেতরে ঢুকলাম। আমি ভেতরে ঢোকামাত্রই ওরা রাক্ষুসে দরজার পাল্লাদুটোকে চেপে বন্ধ করে দিল। আমার অন্তরাত্মা বলে উঠল, তোমার জীবনটা এই এক্ষুনি পালটে গেল হে রুদ্রনাথ। ভালোর দিকে পালটাল না মন্দের দিকে, বলতে পারব না। তবে পালটাল।