শয়তানের সন্তান – ২

দুই

দিনেরবেলা বলে তখন ঘরের সিলিং থেকে ঝোলানো বালবগুলো নেভানো ছিল। ছাদের দুটো স্কাইলাইট ছাড়া বাইরের আলো ঢোকার আর কোনো রাস্তা ছিল না, তাই বেলা একটার সময়েও সন্ধেবেলার মতন ছায়া জমে ছিল ঘরটার মধ্যে।

সেই ছায়ায় চোখ সয়ে আসার পরে বিশাল এবং আয়তাকার ঘরটাকে ভালো করে দেখতে পেলাম। পায়ের নীচে পাথরের ইট দিয়ে বাঁধানো মেঝে। বিশ-ফুট উঁচুতে উল্টোনো জাহাজের খোলের মতন অবতল সিলিং, যার গা থেকে লোহার চেনে একসারি ল্যাম্পশেড ঝুলছে। ল্যাম্পশেডের পাশাপাশি ঝুলছে কম্বলের মতন পুরু ঝুলকালির চাদর। মেঝের মাঝ বরাবর খড়খড়ে অমসৃণ কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো, লম্বা একটা টেবিল। চওড়ায় সেটা হবে প্রায় পাঁচ ফুট। টেবিলের নিচে ওইরকমই পালিশ-ছাড়া কাঠের তৈরি লো-বেঞ্চ। টেবিলের ওপরে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে লোহার বড়-বড় চিমটে, কাঁচি আর ব্লো-পাইপ। বুঝতে অসুবিধে হয় না, ওটা ওয়ার্কিং-টেবল। ওই বেঞ্চে বসেই কারিগরেরা কাজ করেন…কিম্বা করতেন।

দূরের দেওয়ালে লোহার পাল্লা দিয়ে যে আলমারি-সাইজের ফোকরটা ঢাকা দেওয়া রয়েছে সেটা নিঃসন্দেহে একটা ফার্নেস—কারণ, চারপাশের দেয়ালের পাথরের লাইনিং পুড়ে কালো হয়ে গেছে।

তার মানে এতক্ষণ যেটাকে বন্ধ কারখানা ভাবছিলাম, সেটা পুরোপুরি বন্ধ নয়। কিছু কাজকর্ম এখনো হয় এখানে!

সবচেয়ে বেশি চোখ টানল ঘরটার চার-দেয়ালের গায়ে সারিসারি কাঠের র‌্যাকের ওপরে সাজিয়ে-রাখা চিনেমাটির বাসনপত্র আর ভাস্কর্য। ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির প্রোডাক্টই হবে নিশ্চয় ওগুলো। প্রশ্ন হচ্ছে কবেকার প্রোডাক্ট?

কাছাকাছি যে র‌্যাকটা ছিল, সেটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। র‌্যাকটার ওপরে স্তূপ করে সাজানো ছিল নানান সাইজের নানান শেপের পোর্সেলিনের প্লেট। সামনে যে প্লেটটা ছিল সেটার গায়ে আলতো করে একবার আঙুল বুলিয়ে আনলাম। আমার আঙুলের ডগায় উঠে এল পুরু ধুলোর সর। তার মানে আমার সন্দেহটা ঠিক। এগুলো বহুদিন না ভুল বললাম, বহুবছর ধরে এখানে পড়ে আছে।

এখন তাহলে কী তৈরি হয় এখানে? কী বানায় হাসিদি আর পঙ্কজদা? অবশ্য কাপালি স্যার তো বললেন, ওরা আউটসাইডার। সেক্ষেত্রে ওরা কারখানার কাজে হাত লাগাবে না সেটাই স্বাভাবিক।

বোধহয় আমার কোঁচকানো ভুরুদুটো দেখেই হাসিদি আবার হেসে উঠল। বলল, ভাই, কারখানা-ঘর পরে একসময় ভালো করে দেখিয়ে দেব তোমায়। এখন চান খাওয়া সেরে নেবে চল। সেই কোন সকালে বেরিয়েছ। এই পঙ্কজদা, রুদ্রকে ওর ঘর দেখিয়ে দাও।

পঙ্কজদা মুখে গোঁ-গোঁ আওয়াজ করে আর হাত-মুখ নেড়ে ওর পেছন-পেছন যাওয়ার জন্যে আমাকে ডাকল। ইশারাতেই বুঝিয়ে দিল, যেহেতু আমি খোঁড়া, তাই আমাকে সাবধানে পা ফেলতে হবে, না-হলে মেঝের উঁচু-নীচু পাথরের ইটে ঠোক্কর খেয়ে পড়ে যাব। ও নিজে অবশ্য দিব্যি তুড়িলাফ মেরে চোখের পলকে ঘরটার পেছনের দেয়ালে আরেকটা যে দরজা ছিল, সেটা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

ওর পেছন-পেছন আমিও সেই দরজা পেরিয়ে উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটা বিশাল উঠোনের মধ্যে গিয়ে পড়লাম। মনে হল অন্তত দুটো টেনিস-কোর্ট অনায়াসে ওই উঠোনটার মধ্যে এঁটে যাবে।

ফাঁকা উঠোন। তার শেষ-প্রান্তে দু-খানা লম্বাটে একতলা বাড়ি। বাড়িদুটোর দেওয়ালে সাদা চুনকাম, লাল টালির ছাদ। মাঝখানে কুঁয়োতলা আর ছোট একটা ফুলের বাগান। বাঁ-দিকের বাড়িটার বারান্দার গায়ে সার-সার চারখানা ঘর। দু-প্রান্তের দুটো ঘরের দরজা খোলা, মাঝের ঘরদুটোর দরজা তালাবন্ধ। পঙ্কজদাকে ফলো করে, খোলা ঘরদুটোর মধ্যে একটায় ঢুকে পড়লাম।

দিব্যি ঘরখানা। চারটে বড় বড় জানলা। পঙ্কজদা জানলাগুলো খুলে দিতেই লাল সিমেন্টের মেঝের ওপরে রোদ্দুরের চারটে চৌখুপি খুলে গেল আর তাদের বুকে বাগানের পেঁপে পাতার ইকড়ি-মিকড়ি ছায়া নাচতে শুরু করল। ঘরটার একপাশে নতুন বেডকাভারে ঢাকা তক্তপোশের বিছানা। তা ছাড়াও টেবিল-চেয়ার, দেয়াল-আয়না আর একটা ছোট আলমারিও ছিল। বুঝতে অসুবিধে হল না, সবটাই কাপালি স্যারের নির্দেশে হয়েছে।

পঙ্কজদা ইশারায় বুঝিয়ে দিল, অন্য প্রান্তের খোলা ঘরটায় ও নিজে থাকে।

আমি জিগ্যেস করলাম, আর হাসিদি?

পঙ্কজদা আঙুল তুলে বাগানের ওপাশের বাড়িটার দিকে দ্যাখাল।

মনে-মনে বললাম, এই পাঁচিলঘেরা স্বর্গের বাগানে কি শুধু অ্যাডাম আর ইভই থাকে নাকি? এরা দুজন কি স্বামী-স্ত্রী? না তো। হাসিদি তো ওকে ‘পঙ্কজদা’ বলে ডাকছে।

ভাগ্যিস মনে-মনে বলেছিলাম, কারণ, কখন যে হাসিদি আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে ছিল খেয়ালই করিনি। হাসিদি বলল, রুদ্র! চান করার জন্যে কিন্তু ও বাড়িতে যেতে হবে। এ-বাড়ির দালানের শেষ-মাথায় একটা বাথরুম আছে ঠিকই, তবে ওখানে চৌবাচ্চা নেই।

আমি ঘাড় হেলালাম। হাসিদি আবার বলল, আমাদের রান্নাঘর, খাবার ঘর, এই কাচ-কারখানার স্টোররুম, সব ওই বাড়িতে। আরো দুটো ঘর আছে—একটা আমি থাকি আর অন্যটায় বিশাখা।

বিশাখা?

সে আছে একজন। খাবার সময় তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। এখন তুমি চল, চান করে নেবে।

বললাম, যাও। আমি আসছি। তারপর একটু ইতস্তত করে যে-প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছিল, সেটা করেই ফেললাম। বললাম, ইয়ে…বিশাখা কি পঙ্কজদার বউ?

হাসিদির এবারের হাসিটা আর অতটা সোজাসাপটা লাগল না। কেমন যেন বাঁকা হেসে বলল, তাহলে দুজনে দু-বাড়িতে থাকে? তোমার বিয়ে হয়নি, তাই না?

মনে-মনে জিভ কাটলাম। প্রশ্নটা বোকার মতন হয়ে গেছে সত্যি।

হাসিদি একটু চাপা-গলায় বলল, কেউ কারুর বর নয়। কেউ কারুর বউ নই। তারপরেই যে-কথাটা বলল, সেটার জন্যে একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। বলল, যে খারাপ চিন্তাটা করছ সেটা মাথা থেকে সরিয়ে ফেল। কারণ পঙ্কজদা পুরুষমানুষ নয়।

আমি বিছানার ওপরে ব্যাগটা রেখে গামছা, পাজামা এইসব বার করছিলাম। হাসিদির শেষ কথাটা শুনে ওই অবস্থাতেই স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। হাসিদি সেটা খেয়াল করল কিনা জানি না, আর কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের বাড়ির দিকে চলে গেল। কিন্তু আমার মাথার মধ্যে ওর শেষ কথাটা রাগি-ভিমরুলের মতন পাক খেতে লাগল—পঙ্কজদা পুরুষমানুষ নয়…পঙ্কজদা পুরুষমানুষ নয়।

আমার মাথা থেকে একটা খারাপ-চিন্তা সরাতে গিয়ে হাসিদি আরো খারাপ একটা চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়ে গেল। হাসিদি কেমন করে বুঝল পঙ্কজদা পুরুষমানুষ নয়? বোঝার চেষ্টা করেছিল নিশ্চয়ই। নাকি, অন্য কারুর কাছ থেকে শুনেছে? কিন্তু কার কাছ থেকেই বা শুনবে? বিরাজ কাপালির মতন একজন বড়মাপের মানুষ কি এইসব নিয়ে আলোচনা করবেন?

ঘাড় ঘুরিয়ে খোলা-দরজার ভেতর দিয়ে দালানের দিকে তাকালাম। দেখলাম, আমার দিকে পিছন ফিরে, বুকের ওপরে দু-হাত জড়ো করে পঙ্কজদা দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি পেছনদিক থেকে ওর বাদামি লোমে ঢাকা চওড়া কাঁধ পিঠ আর কোমর দেখতে পাচ্ছিলাম।

যাই হোক, শরীরটা খুব ক্লান্ত ছিল বলেই বোধহয় ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির নৈতিক পরিবেশ নিয়ে আর ভাবতে ভালো লাগছিল না। চটপট স্নান সেরে খাবার ঘরে গিয়ে বসলাম।

আমি ঘরে ঢোকামাত্রই পঙ্কজদা আর হাসিদি দুজনেই অবাক হয়ে আমার পায়ের দিকে তাকাল। হাসিদি বলল, একি! তুমি পাজামার সঙ্গে জুতো পরে আছ কেন? একজোড়া চটি পরলে আরাম লাগত না?

আমি ক্লিষ্ট হেসে বললাম, পারি না গো দিদি। চটি পরে হাঁটতে পারি না।

পঙ্কজদা ইশারায় প্রশ্ন করল, সবসময় জুতো পরে থাকো?

আমি বললাম, হ্যাঁ, চব্বিশঘণ্টা। শোয়ার সময়েও। ডাক্তারবাবু সেরকমই বলেছেন। তবে তোমরা ভয় পেও না। আমার শরীরে আর রোগ নেই। ইনফেকশন ছড়াব না।

হাসিদি তাড়াতাড়ি বলল, না না। ভয় পাইনি। কাপালি স্যার আমাদের সব বলেছেন। আমি তোমার আরামের কথা ভেবে বলছিলাম আর কি। যাই হোক, বসে পড়ো।

রান্না করা ভাত ডাল তরকারি আর মাছের পাত্রগুলো টেবিলের মাঝখানে নামানো ছিল। আমি, হাসিদি আর পঙ্কজদা যখন যে যার নিজের থালায় ভাত তুলে নিচ্ছি, তখনই পাশের কিচেন থেকে একটা মেয়ে হাতে একটা প্লেটে স্রেফ একটু ফ্যানেভাত নিয়ে বেরিয়ে এল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে, টেবলে নয়, মেঝের এককোনায় উবু হয়ে বসল। একগ্রাস ভাত মুখে পুরে আবার তাকাল আমার দিকে। সেই-দৃষ্টিতে কেমন অদ্ভুত এক মায়া ছিল। মনে হচ্ছিল ও যেন দৃষ্টি দিয়েই আমাকে আদর করছে।

হাসিদি বলল, রুদ্র, এই হচ্ছে বিশাখা।

বুঝতে পারছিলাম অন্যায় হচ্ছে, তবু আমি বিশাখার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিলাম। বিশাখাও আমাকে দেখছিল। এমনভাবে দেখছিল যেন বহুদিন পরে কোনো আপনজনকে দেখছে।

আমার মুগ্ধ হওয়ার মধ্যে অন্যায় কিছু ছিল না। বিশাখাকে এককথায় বলা যায় পরমা-সুন্দরী। আমারই মতন বয়স হবে ওর; কিম্বা দু-একবছর বেশি। দুধে-আলতা গায়ের রঙ, দেবীপ্রতিমার মতন গড়ন। মাথাভর্তি কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল পিঠ ছাপিয়ে কোমর অবধি নেমে এসেছে। সবথেকে আশ্চর্য ওর চোখদুটো। টানা-টানা দুই চোখের পাতা যেন ভারী হয়ে চোখের মাঝখান অবধি নেমে এসেছে, আর তাই মণিদুটো কখনোই পুরোটা দেখা যায় না। একেই বোধহয় ‘মদালসা আঁখি’ বলে—দেখলে মনে হয় যেন নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন।

একটা সাদারঙের কোরা কাপড় দিয়ে গলা থেকে পা অবধি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছিল মেয়েটা। শুধু কনুই থেকে হাতদুটো বাইরে বেরিয়েছিল। শাড়ি পরার অমন ধরণ আমি কখনো দেখিনি।

ঘোর কাটিয়ে ওকে জিগ্যেস করলাম, তোমার বাড়ি কোথায়, বিশাখা?

বিশাখা ভাতের থালার দিকে মুখ নামিয়ে উত্তর দিল, শিয়ালদায়।

বললাম, তুমি ওরকম সাদা ভাত খাচ্ছ কেন? শরীর খারাপ? নাকি ব্রতআচ্চা আছে?

বিশাখা উত্তর তো দিলই না, বরং আমাকে চরম অপ্রস্তুত করে, ভাতের থালা নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে গেল। বোধহয় নিজের ঘরে বসেই খাওয়া শেষ করবে।

আমি কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। তারপর হাসিদির দিকে তাকালাম। দেখলাম ও মুখ নীচু করে বসে আছে। একটু বাদে ও মুখ তুলে খুব আন্তরিকভাবে বলল, কিছু মনে কোরো না রুদ্র। বিশাখা ওইরকমই। হঠাৎ হঠাৎ ওর মুড চেঞ্জ হয়।

শান্ত হওয়ার বদলে আমার মাথার ভেতরটা রাগে কিরকির করে উঠল। বললাম, কেন? অ্যাবনর্মাল নাকি?

হাসিদি বলল, না। অ্যাবনর্মাল নয়। তোমাকে পরে বলব।

কথাটা শুনেই মাথার মধ্যে কী যেন একটা হয়ে গেল। আমি হাতের থালাবাটিগুলো ঝড়াং করে টেবিলের ওপরে নামিয়ে রেখে হাসিদির দিকে ঝুঁকে পড়ে চিৎকার করে বললাম, এর মানে কী বলো তো। কী হচ্ছে এখানে? এটা ঢপের কারখানা; এখানে কিচ্ছু তৈরি হয় না। আর তোমাদের মধ্যে একজন বোবা, একজন খেপি। ওই কাওয়ালি না কি যেন লোকটা, ও কি এখানে পাগলাগারদ বানাচ্ছে নাকি?

পঙ্কজদা এতক্ষণ চুপ করে খেয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎই সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে, বাঁ-হাতের চেটো দিয়ে আমার বুকে আলতো করে একটা ঠেলা মারলো। এত জোর ছিল সেই সামান্য ঠেলাটুকুর মধ্যে যে, আমি এই ছ’ফুটিয়া শরীর নিয়েও টলমল করে চার-হাত পিছিয়ে গেলাম।

হাসিদি পঙ্কজদার দিকে তাকিয়ে ধমকে উঠল, আঃ! কী হচ্ছে কী পঙ্কজদা? পঙ্কজদা ততক্ষণে আবার খাওয়ায় মন দিয়েছে। মুখ দেখে মনে হচ্ছিল কিছুই হয়নি।

হাসিদি এবার আমার দিকে তাকিয়ে শান্তগলায় বলল, কাল তো কাপালি স্যারের সঙ্গে তোমার দেখা হবেই। উনি বলে গেছেন তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন। যা জানার তাঁর কাছ থেকেই জেনে নিও। তবে একটা জিনিস জেনে রাখো, আমি, পঙ্কজদা বা বিশাখা হয়তো আর দশজন লোকের মতন নই। কিন্তু তার মানেই আমরা অ্যাবনর্মাল নই।

তখনকার মতন কথাগুলো বিশ্বাস করে নেওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। ভাবলাম, সত্যিই যদি কাপালি স্যারের সঙ্গে দেখা হয় তাহলে আর এদের চাপ দিই কেন। তাঁর সঙ্গেই হেস্তনেস্ত করা যাবে। তখনই ঠিক করব এখানে থাকব কি থাকব না।

কিচেনের সিঙ্ক থেকে বাসনগুলো ধুয়ে নিয়ে আবার যখন ডাইনিং-রুমে ফিরলাম, তখনো হাসিদি আর পঙ্কজদার খাওয়া শেষ হয়নি। আমি ওদের সঙ্গে আর একটাও কথা না বলে, আমার জন্যে নির্দিষ্ট ঘরটায় ঢুকে ভেতর থেকে খিল তুলে দিলাম। তারপর বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে আজ ভোর থেকে যা-যা ঘটে চলেছিল সেগুলোকে মাথার মধ্যে সাজাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। খুব ক্লান্ত ছিলাম বলেই একটু বাদেই দু-চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল।

সেই ঘুম ভাঙল একেবারে সন্ধে ছ’টায়। তাড়াহুড়ো করে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলাম, হাসিদি আর পঙ্কজদা রান্নাঘরের সামনের বারান্দায় চুপ করে বসে আছে। আমাকে দেখে হাসিদি বলল, এসো রুদ্র, বসো। চা খাও।

হাসিদি আমার হাতে কাগজের কাপ ধরিয়ে দিল। পঙ্কজদা রান্নাঘর থেকে কেটলিতে চা গরম করে এনে কাপে ঢেলে দিল। তারপর বাগানের গাছে জল দিতে উঠে গেল। কিন্তু আমার চোখ খুঁজছিল বিশাখাকে। ওকে কোথাও দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিছুক্ষণ দোনামোনা করে হাসিদিকে জিগ্যেস করেই ফেললাম, সেই অহঙ্কারী মেয়েটা কোথায়?

হাসিদি আমার কথা শুনে হেসে ফেলল। বলল, এখনও রাগ পুষে রেখেছ ওর ওপরে? আশ্চর্য ছেলে তো তুমি! ও যে কতটা অসহায়, সেটা নিজের চোখে দেখলে বুঝতে পারবে। যাও, দেখে এসো।

কোথায় যাব? আমি জিগ্যেস করলাম।

হাসিদি বলল, আসবার সময় খেয়াল করেছ নিশ্চয়, কারখানা-ঘরের বাইরের জমিটায় কয়েকটা বড় গাছ আছে। ওখানেই বিশাখাকে পেয়ে যাবে।

এমনিতে যেতাম না। একজন প্রায় অপরিচিত মেয়ের সম্বন্ধে অত কৌতূহল দেখাবই বা কেন? কিন্তু ওই যে, হাসিদি বলল, ও কতটা অসহায় বুঝতে পারবে, ওই কথাটা মনে হল বিশেষ ইঙ্গিতপূর্ণ। মনে হল, ও আমাকে যাওয়ার জন্য ইনসিস্ট করছে। আমি চায়ের কাপটা ময়লার বালতির মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, উঠোন পেরিয়ে কারখানা-ঘরের মধ্যে ঢুকলাম।

দুপুরে যখন প্রথমবার ঢুকেছিলাম এই ঘরে, তখন যতটুকু আলো ছিল, এখন তাও নেই। আকাশের আলো নিভে গেছে বলে স্কাইলাইটের আলো নেই। সুইচবোর্ড কোথায় জানি না। সঙ্গে একটা টর্চ নিয়ে আসার কথা বলা উচিত ছিল হাসিদির।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এটাই যে, ঘরটায় কোনোরকমের আলো না থাকলেও আমি সবকিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। ওয়ার্কিং-টেবলের পায়া, দেওয়ালের র‌্যাকে সাজিয়ে রাখা পুরোনো পোর্সেলিনের বাসনকোসন আর মূর্তি, এমনকী আমার পায়ের কাছে পাথরের মেঝের ওপরে পড়ে-থাকা একটা মরা আরশোলা অবধি। একবার সন্দেহ হল, কোনো অজ্ঞাত কারণে বেড়ালের মতন অন্ধকারে দেখবার ক্ষমতা পেয়ে গেলাম না তো? তারপরেই বুঝতে পারলাম, তা নয়। আসলে এই ঘরের প্রত্যেকটা জিনিস থেকে ফসফরাসের মতন খুব হালকা একটা আভা বেরোচ্ছে।

কিছুক্ষণ লাগলো সেই ঘোর কাটিয়ে উঠতে। তারপর সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলাম বাইরের বাগানে। দেখলাম হাসিদি কিছু ভুল বলেনি। ঢুকবার সময় অন্যান্য চিন্তায় খেয়াল করিনি, কিন্তু সত্যিই বিশাল কারখানা-ঘরটাকে ঘিরে ইতস্তত নানারকমের গাছের জটলা রয়েছে। ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের মধ্যে গাছগুলোকে ভূতের মতন দেখতে লাগছিল। মাঝে মাঝে একটা দমকা হাওয়া আসছিল রাস্তার উল্টোদিকের ওই পোড়ো জমিটার দিক থেকে—সঙ্গে নিয়ে আসছিল পচা মাংসের গন্ধ, পরে যেটাকে জেনেছি ট্যাংরা স্লটার-হাউসের আবর্জনার গন্ধ বলে।

কিন্তু এসবের মধ্যে বিশাখা কোথায়? বিশাখাকে খুঁজে না পেলে জানব কেমন করে কী রহস্য লুকিয়ে আছে ওই মেয়েটার মধ্যে?

হঠাৎই দেখলাম, খুব উঁচু একটা গাছের গুঁড়ির কাছে ঊর্ধ্বমুখে একটা নেড়িকুকুর বসে আছে। ব্যাটা খুব নিবিষ্টমনে ঘাড় উঁচু করে কী যেন দেখছিল। আমার পায়ের শব্দ পেয়ে একবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে করুণস্বরে ডেকে উঠল। বেচারা যে-কোনো কারণে ভীষণ ভয় পেয়েছে, সেটা ওর মুখ দেখেই বুঝতে পারলাম। মনে হল ভয়ের চোটে অল্প-অল্প কাঁপছে। আমি কুকুরটার দিকে এগিয়ে গেলাম। তারপর ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে গাছটার মগডালের দিকে তাকালাম।

ওটা বোধহয় অর্জুনগাছই হবে। মসৃণ সাদা বাকল। খুব উঁচু, তবে ডালপালার ঝাড় কিম্বা পাতার গোছা তেমন ঘন নয়। বাগানের জমিতে অন্ধকার নেমে এলেও গাছটার মাথার কাছে তখনো একটু সূর্যাস্তের আলো লেগে ছিল। সেই আলোয় দেখলাম একটা খুব সরু ডালের ওপরে বিশাখা দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আমার প্রথমেই মনে হল এ বিশাখা নয়। ভূত। না-হলে যে সরু ডালে একটা কাক অবধি বসার আগে দুবার ভাববে, সেই সরু ডালের ওপরে ও কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? তাও আবার দু-হাত ছেড়ে? নেড়িকুকুরটা আবার চাপা কান্নার মতন আওয়াজ করে ডেকে উঠল।

হঠাৎই আমার বুকের রক্ত হিম করে দিয়ে বিশাখা ওই গাছের মগডাল থেকে সড়সড় করে নীচে নেমে এল।

ওর নেমে-আসার ধরনটা ছিল অদ্ভুত। কীভাবে বোঝাব জানি না। যেভাবে মোমবাতির গা বেয়ে গলন্ত মোমের ফোঁটা গড়িয়ে নামে, সেইভাবেই চোখের পলকে গাছের গুঁড়ি বেয়ে নেমে এলো বিশাখা। আমি দিব্যি দিয়ে বলতে পারি, সেই সময়টুকুতে ওর আকৃতি কোনো মানবীর মতন ছিল না। ওর মুখ, ঘাড়, বুক, পেট সব মিলেমিশে একটা বিশাল মোমের ফোঁটার মতনই গোল হয়ে গিয়েছিল। তবে মাটিতে পড়ামাত্রই সেই বিন্দুটা আবার বিশাখা হয়ে উঠে দাঁড়াল। আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।

কুকুরটা পেটের মধ্যে ল্যাজ ঢুকিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে কোথায় যে পালিয়ে গেল, বুঝতে পারলাম না। আমি কোনোরকমে তোতলাতে তোতলাতে বিশাখাকে বললাম, তুমি তুমি ওখানে কেমন করে? মানে এটা তো বিপজ্জনক মানে, পড়েও তো যেতে পারতে।

বিশাখা আমার কথার কোনো জবাব তো দিলই না। উলটে একটা অদ্ভুত কাণ্ড করল। হঠাৎই আমার কাছে এগিয়ে এসে নিজের গালটা আমার গালে কিছুক্ষণ ঠেকিয়ে রেখে আবার পায়ে-পায়ে পিছিয়ে গেল। কি ঠান্ডা ওর গালটা। একেবারে বরফের মতন ঠান্ডা। তাছাড়া ওর গা থেকে একটা সুগন্ধ ভেসে আসছিল। গন্ধটা খুব চেনা। কিন্তু এতই তীব্র যে, আমার নাক জ্বালা করছিল।

এই হঠাৎ আদরে আমি স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম। আমি হুঁশ ফিরে পাবার আগেই বিশাখা কারখানা ঘরের দরজার দিকে হাঁটা লাগাল। সেই চলে যাওয়ার মধ্যেও কোনোরকম ব্যস্ততা ছিল না। মনে হচ্ছিল ও যেন ঘুমের মধ্যে হাঁটছে।

হাসিদি বলেছিল, দেখে এসো বিশাখাকে। বুঝতে পারবে ও কত অসহায়।

আমি দেখলাম। কিন্তু ওর অসহায়তাটা যে কোথায় এখনো বুঝতে পারলাম না। মনে হল, আবার হাসিদির কাছেই ফিরে যাই। এইমাত্র যা দেখলাম আর বিশাখা যা করল সবটাই ওকে বলে জিগ্যেস করি, এসবের মানে কী? কিন্তু তার দরকার পড়ল না।