চার
কথামতন ঠিক একদিন বাদেই বিপ্রদাস সিমবায়োটিকের ডিরেক্টর শুভময় চ্যাটার্জির অফিসে হাজির হল। না গেলেও ক্ষতি ছিল না। সি. সি. টিভি-র ফুটেজের কপি লোক দিয়ে আনিয়ে নেওয়া যেত। বিজ্ঞানী প্রদীপ কামাথের সিভি তো ওনারা মেল করেই পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবু বিপ্রদাস নিজেই জিপ নিয়ে গেল ওখানে। ওর সিক্সথ সেন্স ওকে বলছিল যাওয়াটা প্রয়োজন।
এই সিক্সথ সেন্সের ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। বিপ্রদাস বইয়ে পড়েছে, বাঘ-শিকারে গিয়ে অনেক শিকারিই সিক্সথ সেন্সের নির্দেশ মান্য করে বাঘের আক্রমণ থেকে বেঁচে গিয়েছেন। কিছুই না, একটা অজানা অস্বস্তি। যেখানে বসে শিকারি বাঘের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন সেখান থেকে অকারণেই একটু এগিয়ে যাওয়া এবং তার পরেই ঠিক যে জায়গটায় তিনি দু-সেকেন্ড আগে বসেছিলেন, সেইখানে মানুষখেকো বাঘের লাফিয়ে পড়া।
এর আগে বেশ কয়েকটা কেসে বিপ্রদাস নিজেও সিক্সথ সেন্সকে গুরুত্ব দিয়ে ভালো ফল পেয়েছে।
গাড়িতে যেতে-যেতে বিপ্রদাস ভাবছিল, হয়তো পুরোটাই সিক্সথ সেন্স নয়। প্রদীপ কামাথ নামের ওই লোকটার অমন জড়ভরতের মতন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা, তারপর হঠাৎই অদৃশ্য কারুর কাছে সারেন্ডার করার মতন হাবভাব—এইগুলোই হয়তো তার মনের অস্বস্তিটাকে বাড়িয়ে তুলছে। রিপোর্টে সে মৃত্যুর কারণ লিখতে পারে—আত্মহত্যা। কিন্তু আত্মহত্যার কারণ লিখতে পারবে কি?
দ্বিতীয়দিন সিমবায়োটিকের অফিসে বসে এই প্রশ্নটাই সে শুভময় চ্যাটার্জিকে করল, ‘মিস্টার কামাথ কেন সুইসাইড করলেন বলতে পারবেন?’
শুভময় চ্যাটার্জি মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন, ‘আই হ্যাভ নো আইডিয়া মিস্টার মণ্ডল।’
হঠাৎই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল বিপ্রদাসের। এরা কি ভাবছে সে নিছক সময় কাটানোর জন্যে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে? সামনে খুলে রাখা প্রদীপ কামাথের পার্সোনাল ফাইলটায় চোখ রেখে সে বলল, ‘একজন মানুষ প্রায় ছ’মাস আপনাদের সঙ্গে এক ছাদের তলায় বাস করেছেন। ছুটিতে গেছেন মাত্র দুবার, সব মিলিয়ে পনেরো দিন। এই সময়ের মধ্যে তিনি আর্থিক দিক থেকে কারুর কাছে চিটেড হয়েছেন কিনা, ওঁর গবেষণায় কোনো ফেইলিওর এসেছে কিনা, ওঁর কোনো অ্যাডিকশন ধরা পড়েছিল কিনা, ওঁর ওঁর কোনো অ্যাফেয়ার তৈরি হয়েছিল কিনা—এসব সম্বন্ধে যদি আপনার না আইডিয়া থাকে, তাহলে কার আইডিয়া থাকবে মিস্টার চ্যাটার্জি?’
বিপ্রদাসের গলায় অসন্তোষের সুরটা ধরতে অসুবিধে হল না শুভময় চ্যাটার্জির। তিনি তাড়াতাড়ি টেবিলের ওদিক থেকে হাত বাড়িয়ে বিপ্রদাসের হাতটা ধরে বললেন, ‘স্যরি মিস্টার মণ্ডল। আমি আসলে নিজেই খুব ফ্রাস্ট্রেটেড। এই প্রশ্নটা তো শুধু আপনিই আমাকে করছেন না। প্রেস, মিডিয়া, আমার কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যাবাভ অল কামাথের ফ্যামিলি, সবাই আমাকে জিগ্যেস করছে, হ্যাভ ইউ এনি আইডিয়া? হ্যাভ ইউ এনি আইডিয়া? অ্যান্ড আই হ্যাভ নো আইডিয়া অ্যাটঅল।
‘আপনি যে পসিবিলিটি-গুলোর কথা বললেন, তার একটারও যদি উত্তর হত ‘হ্যাঁ’, তাহলে আমি হয়তো একটু স্বস্তি পেতাম। কিন্তু না। কামাথ ওয়াজ ফিনানসিয়ালি ভেরি স্ট্রং। হি হ্যাড টু বি। কারণ, আপনি ওর ডসিয়ার দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, ও ঠিক কলেজে পড়ানো বৈজ্ঞানিক ছিল না। গত কুড়ি বছর ধরে ও এমন সব জিনিস নিয়ে রিসার্চ করেছে যেগুলোর ইমেন্স ইকনমিক ইমপ্যাক্ট রয়েছে। ধরুন পেট্রোলিয়ামের অলটারনেটিভ। কিম্বা ইনফার্টিলিটি ট্রিটমেন্ট। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর জাদুকর ছিল কামাথ। আর সেইজন্যেই নানান মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ওকে যে রিটেনশন-মানি দিত সেটা অনেকের কাছেই অকল্পনীয়।
‘আর কোন পসিবিলিটির কথা বলছিলেন যেন? হ্যাঁ, ফেইলিওর ইন ওয়ার্ক। ওটা সায়েন্টিস্টদের কাছে কোনো ব্যাপার নয়। একশোটা রাস্তায় এগিয়ে নিরানব্বইটায় ধাক্কা খাবে, একটায় সাকসেস আসবে। এটাই নিয়ম।
‘আর অ্যাফেয়ার? না। কামাথের জীবনে একটাই ভালোবাসা ছিল, অ্যান্ড দ্যাট ওয়জ ফর মানি। টাকা টাকা টাকা। টাকার চেয়ে বেশি আর কিছুই ভালোবাসত না কামাথ। হি ওয়জ ট্যালেন্টেড, বাট অ্যাট দা সেম টাইম হি ওয়জ আ মারসিনারি। ও টাকার জন্যে কাজ করত। এ ব্যাপারে ওর কোনো লুকোছাপা ছিল না।
‘তাহলে হাতে কী রইল মিস্টার মণ্ডল? জিরো। আ বিগ জিরো। কামাথের কোনো দুঃখ কিম্বা অভাব ছিল না, তবুও সে সুইসাইড করল।’
শুভময় চ্যাটার্জি দু-হাতের মধ্যে মুখ ঢাকলেন।
এবার বিপ্রদাস সান্ত্বনার ভঙ্গিতে ওঁর হাতের ওপর হাত রাখল। বলল, ‘মিস্টার চ্যাটার্জি! যদি ওঁকে কেউ আত্মহত্যার জন্যে প্ররোচিত না করে থাকে, তাহলে এই ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের আর খুব বেশি মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। মানুষ অনেক সময় খুব তুচ্ছ কোনো দুঃখকেই বিরাট বড় করে দেখে। সাময়িক একটা আবেগ থেকে ট্রেনের চাকার সামনে ঝাঁপ মেরে দেয়, বিষ খায়। সেক্ষেত্রে তো কিছু করার থাকে না। মিস্টার কামাথের কেসটা হয়তো ওইরকমই কিছু। বাই দা ওয়ে, একটা জিনিস আমাকে একটু বলবেন? অবশ্যই যদি আপনাদের কোনো মন্ত্রগুপ্তির ব্যাপার না থাকে।’
মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে শুভময় চ্যাটার্জি বললেন, ‘পুলিশের কাছে আবার মন্ত্রগুপ্তি কী মশাই? বলুন, কী জানতে চাইছেন।’ ‘সিমবায়োটিকে ওঁর মিশনটা কী ছিল?’
‘অ্যান্টি-ইনফার্টিলিটি। জানেন কি, রিসেন্টলি একটা সেক্টরের ছেলেদের মধ্যে ইমপোটেন্সির গ্রাফ চড় চড় করে ওপরদিকে চড়ছে? আই মিন আই. টি. সেক্টর। ওদের লাইফ-স্টাইল আর ওদের ডেইলি রুটিন এমন উদ্ভট-রকমের বাজে যে, ব্যাটারা বাপ হতে পারছে না। আপনি জানেন ওদের লাইফ স্টাইল?’
বিপ্রদাস বলল, ‘একটু-একটু জানি। রাস্তায় যেতে-আসতে গলায় কার্ড-ঝোলানো ছেলেগুলোকে দেখে বুঝতে পারি। তবু আপনিই বলুন না। একজন সায়েন্টিস্টের অ্যাঙ্গেল থেকে ব্যাপারটা বুঝি।’
‘কে সায়েন্টিস্ট? আমি? ধুর মশাই!’ শুভময় চ্যাটার্জি মুখ বেঁকালেন। ‘অনেক বছর আগে বিজনেস-ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স করেছিলাম। সেসব ভুলেও গেছি।’
বিপ্রদাস মনে মনে বলল, ‘বয়সের দোষ, বেশি কথা বলা।’ মুখে বলল, ‘তাহলে অন্যদের কাছ থেকে যা শুনেছেন সেটাই বলুন।’
‘শুনেছি, আই-টি সেক্টরের ছেলেগুলো নাকি দিনে দশঘণ্টা টাইট প্যান্ট আর আন্ডারগার্মেন্টস পরে ঠায় কম্পিউটারের সামনে বসে থাকে। এতে টেস্টিকলসের ওপর যা-তা রকমের চাপ পড়ে। তা ছাড়া রাত জাগা, ফাস্ট-ফুড খাওয়া, স্মোকিং, ড্রিঙ্কিং, এসব তো আছেই। তারপর ওরা সাধারণত বিয়েটাও করে বেশি বয়সে। ফলে ওদের স্পার্মগুলো আর সেরকম চাঙ্গা থাকে না। আচ্ছা, আপনি শুনেছেন, স্পার্ম-সেলগুলোর মধ্যে একটা রেস হয়?’
বিপ্রদাস ওপর নীচে ঘাড় নাড়ল। বলল, ‘শুনেছি। একটা ডিম্বাণু-কে পেনিট্রেট করার জন্যে কোটি-কোটি শুক্রাণু যোনির মধ্যে দিয়ে, জরায়ু পেরিয়ে, ফ্যালোপিয়ান টিউবের দিকে ছুটে চলে। সাঁতার কেটে চলেই বলা ভালো, কারণ ওদের তো পা নেই যে ছুটবে। শুক্রাণুগুলোর চেহারাটা ঠিক ব্যাঙাচির মতন। ল্যাজ নাড়তে নাড়তে দৌড়ায়। যে ফার্স্ট হয় তার কপালে জোটে বরমাল্য।’
‘ও বাবা, আপনি তো অনেকটাই জানেন! বায়োসায়েন্স?’
‘হ্যাঁ। জাস্ট গ্র্যাজুয়েট। তা-ও পাশ কোর্সে।’
‘তাহলে যে স্পার্মগুলো সেকেন্ড হয়, কিম্বা থার্ড, তারা কেন ওভাম-কে পেনিট্রেট করতে পারে না তাও নিশ্চয় জানেন?’
‘জানি। একটা স্পার্মসেল ওভামের দেওয়াল ছ্যাঁদা করে মাথাটা ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া মাত্র, দেওয়ালটার চেহারাই বদলে যায়। যেটা এতক্ষণ ছিল নরম-সরম, সেটাই হয়ে যায় পাথরের মতন শক্ত। ফলে, নো সেকেন্ড এন্ট্রি। ওনলি দা ফার্স্ট কাস্টমার উইল বি সার্ভড।’
শুভময় চ্যাটার্জি বললেন, ‘রাইট। আরো অনেক ব্যাপার আছে। প্রদীপ কামাথের সঙ্গে একদিন ড্রিঙ্ক করতে বসেছিলাম। সেদিন ও বেশ মুডে ছিল। গল্প করতে-করতে এসব বুঝিয়েছিল। বলেছিল, স্পার্মের আয়ুও বাঁধা। দু’দিন না কত যেন। তার মধ্যেই ওদের ফিনিশিং-লাইনে পৌঁছতে হয়। কামাথের প্রোজেক্ট ছিল ওই স্পার্মের লাইফ-স্প্যান আর স্পিড নিয়ে। বলেছিল, স্পার্ম-সেলের মাইটোকনড্রিয়াগুলোকে মডিফাই করে এই কাজটা করা সম্ভব, কারণ মাইটোকনড্রিয়াই স্পার্ম-সেলকে শক্তি জোগায়।’
বিপ্রদাস প্রশ্ন করল, ‘ওঁর সেই কাজ শেষ হয়েছিল কি না বলতে পারবেন?’
‘না, হয়নি। আমি কাল রাতেই ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের ইলিনয়ের হেড অফিসের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কামাথ হেড অফিসে শেষ রিপোর্ট পাঠিয়েছিল তিনমাস আগে। তাতে দেখা যাচ্ছে, কাজের অগ্রগতি কিছুই প্রায় হয়নি। তার পরে কামাথ আর কোনো রিপোর্ট পাঠায়নি।’
‘উনি কি মান্থলি রিপোর্ট পাঠাতেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘শেষ তিনটে রিপোর্ট পাঠালেন না কেন? এনি গেস?’
শুভময় চ্যাটার্জি দু-পাশে মাথা নাড়লেন।
বিপ্রদাসের মাথার মধ্যে সিক্সথ সেন্সের সেই অ্যালার্মটা হঠাৎই বেশ জোরালো আওয়াজ করে বাজতে শুরু করল। তবু মুখের ভাব একচুল না পালটে সে খুব শান্তগলায় প্রশ্ন করল, ‘ওঁর এখানকার কাজের প্রগ্রেসের ব্যাপারে দু-একটা কথা যদি জানতে চাই, কার সঙ্গে কথা বলতে হবে? ওঁর কোনো অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন না?’
শুভময় চ্যাটার্জি একবার আড়চোখে বলরাম রায়ের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘দেখুন স্যার, আপনি একটা সরকারি এনকোয়ারিতে এসেছেন। আপনার কাছে কিছু লুকোনোটা অপরাধ। কিন্তু প্লিজ, যা বলছি সেটা অফ দা রেকর্ড নেবেন।’
বিপ্রদাস শুভময় চ্যাটার্জির হাবভাব দেখে অবাক হল। বলল, ‘কী ব্যাপার বলুন তো?’
‘দাঁড়ান, বলছি।’ শুভময় চ্যাটার্জি সামনের টেবিলে রাখা জলের গ্লাস থেকে এক চুমুক জল খেয়ে বললেন, ‘দেখুন মিস্টার মণ্ডল, কামাথের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল ঠিকই। তিতলি যাদব। কলকাতার মেয়ে। প্রথম থেকেই, মানে গত ফেব্রুয়ারি-মাস থেকেই সে ডক্টর কামাথের আন্ডারে কাজ করছিল। কিন্তু তিনমাস আগে থেকে সে অ্যাবস্কন্ডিং। পালিয়েছে। আমরা আর ওকে ট্রেস করতে পারছি না।’
বিপ্রদাসের চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল। সে বলল, ‘কিছু নিয়ে পালিয়েছে? কোনো ইনফর্মেশন? কোনো গ্যাজেট?’
‘না না। সেটাই তো আরো আশ্চর্যের ব্যাপার। উল্টে আমাদের কাছেই মেয়েটার শেষ তিন-মাসের স্যালারি রয়ে গেছে। ফোন করছি, সুইচড অফ। মেল করছি, ডেলিভারড হচ্ছে না। অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দিয়েছে মনে হয়।’
‘বাড়ির ঠিকানা? লোক পাঠিয়েছিলেন?’
‘পাঠিয়েছিলাম। ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সব জায়গাতেই দমদমের পটারি বস্তির ঠিকানা রয়েছে। সেখানে একজন মেসেঞ্জার গিয়েছিল। ফিরে এসে বলল, অনেকদিন আগেই তিতলি ওখান থেকে অন্য কোথাও শিফট করে গেছে।’
‘তাহলে আমাদের জানালেন না কেন? একটা মিসিং-ডায়েরি করা উচিত ছিল না?’ বিরক্ত গলায় বলল বিপ্রদাস।
‘জানাতাম নিশ্চয়। সবে তো তিনমাস হয়েছে। ফ্র্যাঙ্কলি, ডক্টর কামাথের এই মিসহ্যাপটা ঘটে না গেলে তিতলিকে নিয়ে আমাদের কীসের মাথাব্যথা ছিল বলুন তো! পালিয়েছে পালিয়েছে। ওরকম তো কতজন চাকরি ছেড়ে চলে যায়। পরে হয় নিজেরাই সে-কথা জানায় কিম্বা আমরা তাকে স্যাক করি।’
বিপ্রদাস ভেবে দেখল, মিস্টার চ্যাটার্জির কথায় যুক্তি আছে। তবু আগের মতন কঠিন-গলাতেই বলল, ‘তিতলি যাদবের পার্সোনাল-ফাইলটা আমাকে কপি করে দিন।’
ফাইলটা হাতে নিয়ে বিপ্রদাস সিমবায়োটিকের ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে এল। ঘড়ি দেখল, বিকেল সাড়ে-তিনটে। ড্রাইভার সুজিতকে বলল, ‘থানায় চল।’
থানার দালানে পা রাখতে না রাখতেই ডিউটির হাবিলদার স্যালুট ঠুকে বলল, ‘ও.সি. সাহেব বলেছেন, আপনাকে একবার দেখা করতে।’
বিপ্রদাস নিজের কামরায় না ঢুকে মাইতিসাহেবের চেম্বারেই ঢুকে পড়ল। সাহেব একাই ছিলেন। বিপ্রদাসকে দেখে গম্ভীর-গলায় বললেন, ‘কী ব্যাপার বলো তো মণ্ডল। সিমবায়োটিকের কেসটা নিয়ে এখনো পড়ে আছ কেন? ওটা তো পেটি সুইসাইডের কেস। ছাড়ো এবার। অন্য কাজে হাত দাও।’
বিপ্রদাসের ভুরুদুটো কুঁচকে গেল। বলল, ‘আপনার ওপর প্রেসার আসছে?’
মাইতিসাহেব হেসে ফেললেন। বললেন, ‘বসো। হ্যাঁ, প্রেসার আসছে। তুমি মিস্টার কামাথের ল্যাবরেটরি সিল করে রেখেছ?’
বিপ্রদাস ঘাড় হেলাল।
‘ওরা কমপ্লেন করেছে, তাতে ওদের কাজের অসুবিধে হচ্ছে। তাছাড়া কমপ্লেক্সের মধ্যে পুলিশের আনাগোনায় কর্মচারীদের মধ্যে ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি হচ্ছে। কমপ্লেনগুলো আমার কাছে আসেনি; ডাইরেক্ট হেড-কোয়ার্টারে গেছে। সিমবায়োটিকের মতন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিদের হাত অনেক লম্বা হয় মণ্ডল।’
বিপ্রদাস মাইতিসাহেবের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আমাকে আর দুটো দিন সময় দিন স্যার। কিছু-কিছু ব্যাপার আমার অস্বাভাবিক লাগছে। সেগুলোর উত্তর পেয়ে গেলেই আমি হাত গুটিয়ে নেব।’
সুধীর মাইতির মুখ থেকে এতক্ষণের ক্যাজুয়াল-ভাবটা উধাও হয়ে গেল। তিনি বিপ্রদাসকে চেনেন। জানেন, এ-ছেলে বুনো হাঁসের পিছনে দৌড়োয় না। জানের তোয়াক্কাও করে না। তিনি ওর দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘কোন ব্যাপারগুলো অস্বাভাবিক লাগছে?’
‘যেমন আত্মহত্যা করার ঠিক আগে ডক্টর কামাথের আচরণ। যেমন গত তিন-মাস ওঁর কাজের রিপোর্ট না পাঠানো। আবার ঠিক ওই তিন মাস আগেই ওঁর রিসার্চ-অ্যাসিস্ট্যান্ট তিতলি যাদবের অন্তর্ধান। তার সঙ্গে আরো একটা এইমাত্র যোগ করলাম ইনভেস্টিগেশন বন্ধ করার জন্যে আপনার ওপর চাপ।’
সুধীর মাইতি সোজা হয়ে বসলেন। বেশ অবাক-গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘ওঁর রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট পালিয়েছে? নামটা কী বললে? তিতলি? তার মানে মহিলা? তোমার হাতে ওটা কী, তিতলির পার্সোনাল ফাইল?’
বিপ্রদাস ফাইলটা সসম্ভ্রমে মাইতিসাহেবের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’
একবার দ্রুত ভেতরের কাগজগুলোর ওপরে চোখ বুলিয়ে নিয়ে মাইতিসাহেব বললেন, ‘এটা এখন আমার কাছেই থাক। আর তুমি ইনভেস্টিগেশন চালিয়ে যাও। ওসব চাপ-টাপ আমি সামলে নেব। কেউ তোমাকে কাজ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করলে বলবে আমার সঙ্গে কথা বলতে।’
বিপ্রদাস নিজের চেম্বারে ঢুকে অন্যান্য কিছু রুটিন-ওয়ার্ক সেরে সন্ধে সাড়ে-পাঁচটা নাগাদ নিজস্ব দু-চাকায় বাড়ির দিকে রওনা হল। বাড়ি থেকে বেশিরভাগ দিন এই মোটর-সাইকেলটাতেই ও যাতায়াত করে। মাঝের সময়টায় ইনভেস্টিগেশনের কাজে থানার গাড়ি ব্যবহার করে।
থানা থেকে বেরিয়ে ওর বাড়ির দিকে যেতে হলে মাঝে একটুকরো জঙ্গল পড়ে। ইস্পাত-নগরী গড়ে উঠবার আগে দুর্গাপুরে যে গহন শালবন ছিল, তার স্মৃতি হিসেবে এখন এইটুকুই অবশিষ্ট রয়েছে।
জঙ্গলটায় ঢোকার মুখেই, রাস্তার ধারে একজন মাঝবয়সি লোক দাঁড়িয়েছিল। ছোটখাটো চেহারা। খাঁকি হাফহাতা শার্ট আর ছাইরঙের ট্রাউজার। একটা গামছা দিয়ে মাথা আর মুখের অনেকখানি জড়িয়ে রেখেছে। লোকটা বিপ্রদাসকে আসতে দেখেই হাতের বিড়িটা রাস্তার ধারে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাত দেখাল। ওকে থামতে ইঙ্গিত করছে। বিপ্রদাস স্টার্ট বন্ধ না করেই মাটিতে পা রেখে লোকটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল।
লোকটা হাত জোড় করে একটা ছোট্ট নমস্কার ঠুকেই সরাসরি কাজের কথায় চলে এল। বলল, ‘আমার নাম সুরেন পালোধি। সিমবায়োটিকে সিকিউরিটি-গার্ডের কাজ করতাম। ওরা আমাকে চাকরি থেকে তাড়িয়েছে।’
শুনেই বিপ্রদাস এক লাথিতে ইঞ্জিন শাট-ডাউন করে, বাইক থেকে নেমে সুরেনবাবুর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সে জানে, চাকরি থেকে বরখাস্ত-হওয়া লোকের চেয়ে ভালো ইনফর্মার আর হয় না। কারণ, তারা একদিকে যেমন কোম্পানির ভেতরের অনেক গল্প জানে, অন্যদিকে মনের মধ্যে প্রতিহিংসার আগুন নিয়ে ঘোরে।
ও বলল, ‘সে কি! আপনার মতন ভালোমানুষের চাকরি খেল কেন?’
সুরেন পালোধির মুখ দিয়ে ভকভকে মদের গন্ধ ছাড়ছিল। বিপ্রদাসের গলার সহানুভূতিটুকু ওকে তাতিয়ে দিল। গড়গড় করে বলে গেল, ‘তাড়াল, কারণ আমি একদিন একটা খারাপ সিন দেখে ফেলেছিলাম। সেদিন নাইট-শিফটে আমি একাই ল্যাবরেটরি-বাড়ির ডেস্কে ডিউটি দিচ্ছিলাম। হঠাৎ বলরাম-স্যার ফোন করে বললেন, কামাথ সাহেবের রুমের সি.সি.টিভি শাটডাউন করে দিতে। আমি দিইনি।’
‘কেন? দেননি কেন?’ জিগ্যেস করল বিপ্রদাস।
‘কেন দেব? নিয়ম হচ্ছে, ল্যাবে কোনো লেডিস-ভলান্টিয়ার ঢুকলে তার সঙ্গে আরেকজন লেডিস অবশ্যই থাকবে। রাখতেই হবে। এটা হচ্ছে হোল-ওয়ার্ল্ডের ট্রোপোকল। ইয়ে…প্রোকোটল। না না, ধুস শালা।’
প্রচণ্ড উত্তেজনায় পালোধি মশাই আসল শব্দটা খুঁজে পাচ্ছিল না। বিপ্রদাস তাঁকে শব্দটা জুগিয়ে দিল ‘প্রোটোকল।’
‘ইয়েসস। হোল ওয়ার্ল্ডের প্রোটোকল। তাহলে নার্স-দিদিমনি নেমে আসার পরেও ওই তিতলি বলে মেয়েটা কেন রয়ে গেল? সেইটা দেখার জন্যেই সেদিন ক্যামেরা অন করে দিয়েছিলাম।’
বিপ্রদাস বলল, ‘আপনি ভলান্টিয়ার কাকে বলছেন? তিতলি যাদব তো ছিল কামাথ সাহেবের রিসার্চ-অ্যাসিস্ট্যান্ট। সে একা থাকবে না তো কি দলবল নিয়ে ঘুরবে?’
‘ধুর মশাই!’ সুরেনবাবুর মুখটা ঘৃণায় বিকৃত হয়ে গেল। ‘এইসব কোম্পানিকে আপনি চেনেন না। একটা মেয়েছেলেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে রাখলে তার ওপর আবার আরেকটা মেয়েছেলেকে ভলান্টিয়ার হিসেবে রাখবে? ওই লিট্টিকে দিয়েই দুটো কাজ করাত, বুঝলেন? এই আমিই যেমন, গার্ডের চাকরিও করতাম আবার হারামখোর বলরাম বললে বাগানের ঘাসও ছাঁটতে হত।’
বিপ্রদাস বলল, ‘লিট্টি নয় দাদা, তিতলি। কিন্তু ভলান্টিয়ারের কাজটা কী তা তো বুঝলাম না।’
‘আটটি…আটটিফিসিয়াল ইম স্যানি টেশন কাকে বলে জানেন?’
‘আর্টিফিসিয়াল ইনসেমিনেসন বলতে চাইছেন কী?’
‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, ওই হল। ইয়ের বদলে সিরিঞ্জ দিয়ে মেয়েদের গর্ভে পুরুষের বীজ্জ ঢোকানো হয়…বুঝলেন না?’।
বিপ্রদাসের মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। তার মনে পড়ল, ডক্টর কামাথের ল্যাবরেটরির একপাশে একটা সাদা-চাদরে ঢাকা হসপিটাল-কট দেখেছিল বটে। একটা ফ্রিজও ছিল ঘরের মধ্যে। এখন তো মনে হচ্ছে স্পার্মকে প্রিজার্ভ করার জন্যেই ওটা ব্যবহৃত হত। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে সে বলল, ‘আপনি তার মানে সি.সি.টিভি-তে ওই মহিলার আর্টিফিসিয়াল ইনসেমিনেশনের দৃশ্য দেখে ফেলেছিলেন। কিন্তু সেটা এমন কি বড় অপরাধ, যার জন্যে আপনার চাকরি খেতে হল?’
‘আজ্ঞে না স্যার।’ চোখ বড়-বড় করে বিপ্রদাসের মুখের কাছে মুখ এনে সুরেন বলল, ‘আটটিফিসিয়াল নয়। একেবারে অজ্জিনাল ইমস্যানিটেশন। মানে, বুঝলেন তো? কামাথ স্যার আর ওই লিট্টি দুজনেই তখন পুরো নাঙ্গা, মানে ন্যুড।’
বিপ্রদাস মুখটা সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘তারপর?’
‘আমি স্যার সেদিন একটু দারু খেয়ে ছিলাম। বেশি নয় স্যার, খুউউব অল্প। তাই ওদের ওইসব করতে দেখে মনে ভারি ফুর্তি হল। আমি সোজা গিয়ে বলরাম স্যারের জামার হাতা টেনে ধরে বললাম, ‘স্যার, স্যার! দেখবেন চলুন কী মস্তি হচ্ছে।’
‘এবং আপনার চাকরিটা গেল, তাই তো? এটা কবেকার ঘটনা, মনে আছে?’
‘হ্যাঁ স্যার। পয়লা মে। আমার নাইট শিফট ছিল।’
বিপ্রদাস মনে-মনে হিসেব করল পয়লা মে থেকে আজ বিশে নভেম্বর। তার মানে প্রায় সাত-মাস হতে চলল। সাতমাস আগেও যে-মেয়ে প্রদীপ কামাথের সঙ্গে বিছানা শেয়ার করত, সে তিনমাস আগে পালাল কেন? এবং ও পালিয়ে যাওয়ার পরে মাঝের এই তিনমাসে এমন কী ঘটল, যার জন্যে প্রদীপ কামাথকে সুইসাইড করতে হল? ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি?
সুরেনবাবুর গলার আওয়াজে বিপ্রদাসের হুঁশ ফিরল। ‘তিতলি মেয়েটা ডেঞ্জারাস। আমি আপনাকে বলছি স্যার, ওর চোখের দিকে তাকালে আপনার গা শিরশির করবে। আপনি চোখ সরাতে পারবেন না। ও কামাথ স্যারকে ফাঁসিয়েছিল। এই যে কামাথ স্যার সুইসাইড করলেন, এর পেছনেও ওই মেয়েটারই হাত আছে। আর ওকে হেল্প করছে বলরাম রায়। আপনি সিমবায়োটিকের কেসটা ধরেছেন জানতে পেরেই মনে হল আপনাকে বলে যাই, ওই মেয়েটাকে তুলুন। তুলে থার্ড ডিগ্রি দিন। সব বেরিয়ে আসবে।’
বিপ্রদাসের মুখ থেকে আরেকটু হলে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ‘থাকলে তো অ্যারেস্ট করব।’ কোনোরকমে সামলাল। তারপর সুরেনকে জিগ্যেস করল, ‘আপনি এখন কী করবেন বলে ভাবছেন?’
‘দেশের বাড়িতে চলে যাব স্যার পুরুলিয়ায়। আবার চাষবাস শুরু করব। ছ’মাস ধরে চেষ্টা করেও এখানে আর কোনো কাজ জোগাড় করতে পারলাম না।’
বিপ্রদাস বলল, ‘সেই ভালো। আমাকে বরং আপনার ফোন নম্বরটা দিয়ে যান। আর আমার নম্বরটাও রেখে দিন। আমি সময়মতন আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেব।’
সুরেনবাবু ফোন নাম্বার নিয়ে চলে যাওয়ার পরেও কয়েক মিনিট বিপ্রদাস ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। শালবনের মধ্যে খুব দ্রুত অন্ধকার নেমে আসছিল। এখন কোথায় যাবে বিপ্রদাস?
মন চাইছিল বাড়ি যেতে।
আজ বিশে নভেম্বর। টুনাইয়ের আজ জন্মদিন। প্রাণের চেয়ে প্রিয় ভাইঝিটা অপেক্ষা করে বসে আছে, কখন কাকুমণি একটা মস্ত বড় কেক আর গিফট নিয়ে বাড়ি ফিরবে। বাড়ি ফিরে কাকুমণি আগে শিকলি আর বেলুন দিয়ে ঘর সাজাবে। তারপর টুনাইয়ের বন্ধুরা আসবে। ওদের সবাইকে নিয়ে কাকুমণি খেলা শুরু করবে। কেক কাটার সময়ে কাকুমণিই গলা ছেড়ে ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’ গাইবে। টুনাইয়ের এই সব ইচ্ছের কথা জানে বিপ্রদাস।
অন্যদিকে রয়েছে সিমবায়োটিকের ক্যাম্পাস। একটা সিলড ল্যাবরেটরি, যেখানে তিন-দিন আগে এক বিশ্ববিখ্যাত গবেষক সুইসাইড করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে যে-আত্মহত্যার পেছনে কোনো স্পষ্ট কারণ নেই, কিন্তু অসঙ্গতি রয়েছে অনেক। সে কি তাহলে এখন ওই ইনস্টিটিউটতেই যাবে? শুভময় চ্যাটার্জির কাছে সরাসরি জানতে চাইবে, তিতলি যাদবের ভূমিকাটা ঠিক কী ছিল? রিসার্চ-অ্যাসিস্ট্যান্ট? ভলান্টিয়ার? কামাথের দেহসঙ্গিনী?
নাকি হুট করে এরকম কিছু করে বসার আগে আবার একবার থানাতেই ফিরে যাবে? মাইতি-সাহেবকে খুলে বলবে সবকিছু? পুলিশের নিজস্ব মেশিনারি কাজে লাগিয়ে আগে যতটা সম্ভব ইনফর্মেশন সংগ্রহ করে নিয়ে, তারপর সিমবায়োটিক-কে চার্জ করবে?
শেষমেষ বিপ্রদাস বাড়ি যাবে বলেই ঠিক করল। এক-রাতের মধ্যে সিচুয়েশন এমন কিছু বদলে যাবে না।
বাইক স্টার্ট করার আগে সে একবার বউদিকে ফোন করল, ‘টুনাই কী যেন একটা কেকের নাম বলেছিল বলো তো, ওর যেটা ফেবরিট।’
