পতঙ্গ সঙ্গম – ৯

নয়

মোবাইলটা সাইলেন্ট-মোডে রাখা ছিল ঠিকই, তবু বিপ্রদাস মাঝে-মাঝেই সেটা পকেট থেকে বার করে দেখছিল। সব থেকে ভালো হত যদি ব্যাক-আপ টিমটা চলে আসত। যদি কোনো কারণে দেরিও হয়, সেটাই একটু ফোন করে জানাতে পারে তো। অবশ্য জানাবেই বা কেমন করে? টাওয়ারই তো নেই।

হঠাৎই দশটা নাগাদ বিপ্রদাস দেখল টাওয়ার ফিরে এসেছে। খুবই উইক-সিগনাল যদিও, তবু এসেছে। সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, যদি মাইতিসাহেব কিম্বা সুজিতের কোনো মেসেজ ঢোকে। না। ঢুকল না। ব্যাপারটা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না বিপ্রদাস। সুজিতকে দিয়ে থানায় খবর পাঠিয়েছে, সেও তো প্রায় একঘণ্টা হয়ে গেল। হাতের চেটোর আড়ালে ফোনটাকে লুকিয়ে সে খুব দ্রুত মাইতিসাহেবকে কয়েকটা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ পাঠাল কী হল স্যার আপনাদের? আমি যে লিখে পাঠালাম, আর্জেন্ট চলে আসুন। ওরা তো পালাবার প্ল্যান করছে।

সত্যিই তখন মিশিরজির কোঠার ভেতরে-বাইরে কিছু ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছিল। কিছু-কিছু ঘরে আলো জ্বলে উঠছিল। নিভেও যাচ্ছিল একটু পরেই। দুয়েকজন মেয়ে দরজা দিয়ে বাইরে উঁকি মেরেই আবার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। বিপ্রদাস আরেকটা হোয়াটস-অ্যাপ মেসেজ পাঠাল। এবার সুজিতকে। ‘সুজিত, তুই কি মাইতিসাহেবের হাতে চিঠিটা দিতে পেরেছিস?’

দিব্যদৃষ্টি থাকলে বিপ্রদাস বুঝতে পারত, এই মেসেজটা বৃথা গেল। সুজিতের গাড়িটা তখন মিশিরজির কোঠা থেকে বড়জোর এক মাইল দূরে, ওয়ারিয়া স্ল্যাগ-ব্যাঙ্কের একটা বড় খানার মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। গাড়ির পেছনের সিটে পিছমোড়া বাঁধা অবস্থায় শুয়েছিল সুজিত। জ্ঞান ছিল না তার। কানের পেছন থেকে রক্তের একটা সরু ধারা নেমে এসে সিট-কাভারটাকে ভিজিয়ে তুলছিল। রাস্তা থেকে গাড়ি কিম্বা ড্রাইভার, কাউকেই দেখা যাচ্ছিল না। ওই খানাটার উল্টোদিকে একটা স্ল্যাগের টিলার ওপরে কালো অয়েল-ক্লথে মাথা মুখ ঢেকে বসেছিল তিনজন লোক। তারা কেউই নিরস্ত্র ছিল না। পুলিশের গাড়ির কনভয়ের জন্যে অপেক্ষা করছিল তারা।

সাড়ে-দশটার সময় বিপ্রদাস ওদিক থেকেই প্রথম বোম চার্জের নীল ঝিলিকটা দেখতে পেল। পেটো ফাটার ভোঁতা শব্দটাও কানে এল প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই। চালাঘরটার ভেতর থেকে ঘুমন্ত কুকুরটা ছিটকে বাইরে বেরিয়ে গেল। তারপর এলাকার বাকি কুকুরদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারস্বরে ডাকতে শুরু করল। বস্তির বাসিন্দারা কেউ বেরোলো না। ওরা এধরণের বোমবাজির শব্দে জন্ম থেকেই অভ্যস্ত।

বিপ্রদাস ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, অনেকগুলো জোরালো টর্চের আলোর রশ্মি বৃষ্টির চাদরের গায়ে এলোমেলো ছুরি চালাতে শুরু করেছে। থ্রি-নট-থ্রির ফায়ারিং-এর আওয়াজও কয়েকবার কানে এল। একটু নিশ্চিন্ত হল বিপ্রদাস। টিম এসে গেছে। কিন্তু এটাও বোঝা যাচ্ছে যে, বিল্টুবাবুর লোকেরা ওদের রেজিস্ট্যান্স দিচ্ছে। ওই রেজিস্ট্যান্স পেরিয়ে এখানে পৌঁছতে ঠিক কতটা সময় নেবেন মাইতিসাহেব?

সময় যে বড় কম।

ওই তো, দশাসই বিল্টুবাবুর কনুইটা আঁকড়ে ধরে তিতলি দৌড়ে মিশিরজির কোঠা থেকে বেরিয়ে এল। এত অন্ধকারের মধ্যেও তিতলির চুমকিগাঁথা শাড়িটা ঝিকমিক করে উঠল। বিল্টুবাবু আর মেয়েটা উঠে গেল পেছনের ল্যান্ড-রোভারটায়। ওদের পেছন পেছন-পেছনই বেরিয়ে এল আরেক ছোকরা। রোগা, লম্বা। এ কি কোঠির পাহারাদার? তাই হবে। অন্ধকারে ঠিক বোঝা গেল না, মনে হল ছেলেটার হাতে একটা অ্যাটাচিকেস রয়েছে। সেটা নিয়ে ও মার্সিডিজটায় উঠে বসতেই দুটো গাড়িরই ইঞ্জিন রাগি চিতাবাঘের মতন গুড়গুড় আওয়াজ করে উঠল।

পরক্ষণেই মার্সিডিজটা স্টার্ট নিল। ল্যান্ডরোভারটাও রাস্তায় উঠবার আগে ব্যাকগিয়ারে একটু পিছিয়ে গেল।

চুলোয় যাক ব্যাক-আপ-ফোর্স। চুলোয় যান মাইতিসাহেব। বিপ্রদাস ট্রাউজারের পেছনে ভিজে হাতের চেটোদুটো মুছে নিয়ে দু-মুঠোয় সার্ভিস-রিভলবারটা চেপে ধরে রাস্তায় উঠে এল। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই গাড়ির পেছনের সিটের ডানদিকের দরজা খুলে একটা ছেলে নেমে এল। ক্রুদ্ধস্বরে জিগ্যেস করল, ‘কওন বে? নাশেমে হ্যায় কেয়া?’

বিপ্রদাস চোখের কোন দিয়ে দেখল মার্সিডিজটা তিরবেগে ছুটে পালাচ্ছে। ওদিক দিয়েও জি.টি. রোড ধরা যায়, তবে সেক্ষেত্রে জি.টি. রোডে উঠতে হয় দুর্গাপুর শহর ছাড়িয়ে। ওই গাড়িটাকে ওরা আর হাতে পাবে না।

না পাক, ক্ষতি নেই। ওই গাড়িটায় সেরকম কেউ নেই। বিল্টুবাবু আর তিতলি দুজনেই আছে এই ল্যান্ডরোভারটায়। এটাকে আটকে রাখতে হবে অ্যাট এনি কস্ট।

কে যেন বিপ্রদাসের কানে কানে প্রশ্ন করল, ‘ইভন অ্যাট দা কস্ট অফ ইয়োর লাইফ, বিপ্র?’

বিপ্রদাস মনে-মনে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। দরকার হলে তাই। ওই দুগগিবাজ মেয়েটাকে আমি পালাতে দেব না’।

তারপরেই সে চিৎকার করে গাড়ি থেকে নেমে-আসা গুন্ডাটার কথার উত্তর দিল। বলল, ‘জানিস তো ভালো করেই আমি কে। হাত তোল। হাত তুলে রাখ শয়তানের বাচ্চা! এই! তোমরাও গাড়ি থেকে এক এক করে নেমে আমার সামনে দাঁড়াও। কোনো চালাকির চেষ্টা করবে না। তোমাদের পেছনে কিন্তু আমাদের আরো ফোর্স আছে।’

মিথ্যে বলেনি বিপ্রদাস। সত্যিই দূরে কয়লাবস্তির রাস্তা-বরাবর তখন চার-পাঁচটা গাড়ির হেডলাইট দেখা যাচ্ছিল। তার মানে বিল্টুবাবুর পোষা-গুন্ডাদের হঠিয়ে দিয়ে থানার ফোর্স এইবার এদিকে আসছে। তবে আসছে খুব ধীরে। গাড়ির দুলুনির সঙ্গে-সঙ্গে হেডলাইটের আলোগুলো একেকবার আকাশের দিকে উঠছে, আবার পাতালের দিকে নামছে।

তবু, কতক্ষণ আর লাগবে ওদের এখানে পৌঁছতে। পাঁচ মিনিট। সাত মিনিট বড়জোর। সেই সময়টুকু কি বিপ্রদাস বিল্টুবাবুদের আটকে রাখতে পারবে না?

বিল্টুবাবু গাড়ির কাচ নামিয়ে মাথা বাড়াল। বলল, ‘এই আখতার। এসব নৌটঙ্কি দেখবার সময় নেই আমাদের। চল, গাড়িতে ওঠ।’

বিপ্রদাস দেখল, আখতারের একটা হাত, যেটা এতক্ষণ শরীরের পেছনে রাখা ছিল, সেটা সামনে চলে এল। ওই একহাতেই একটা খতরনাক টাইপের লম্বাটে বন্দুক বিপ্রদাসের বুকের দিকে তাক করে রেখে ও এক-পা, দু-পা করে গাড়ির দিকে পেছোতে শুরু করল। পেছোতে-পেছোতে যেই অন্যহাতটা দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেছে, সেই এক-মুহূর্তের অন্যমনস্কতার সুযোগে বিপ্রদাস আখতারের কাঁধে একটা গুলি করেই রাস্তা ধরে দৌড় দিল। চারটে পুলিশ-জিপের প্রথমটা তখন ওর থেকে মাত্র একশোমিটার দূরে।

বিপ্রদাস নিজের টিমের নিরাপত্তায় অনায়াসেই পৌঁছে যেতে পারত, যদি না একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতো। যদি না দেখত যে, গুলি খাওয়ার পরেও গাড়িটা থেকে কেউ নামেনি। বরং ওরা পালাতে শুরু করেছে। ও পরিষ্কার বুঝতে পারল, পুলিশের পুরোনো উইলি-জিপগুলো কিছুতেই আর ওই ল্যান্ডরোভারের নাগাল পাবে না।

দৌড় থামিয়ে বিপ্রদাস উল্টোদিকে ফিরে হাঁটু ভাঁজ করে খোলা-রাস্তার ওপরে বসে পড়ল। তারপর উরুর ওপরে কনুইটাকে সাপোর্ট দিয়ে ল্যান্ডরোভারের পেছনের একটা টায়ারকে টিপ করে গুলি চালাল।

কিন্তু বিপ্রদাস যেটা দেখেনি, সেটা হল, শীতল নামের সেই দ্বিতীয় হেঞ্চম্যানটি ড্রাইভারের পাশের সিটের জানলা থেকে অর্ধেক শরীর বাইরে ঝুঁকিয়ে দিয়ে ওর দিকে বন্দুক তাক করেছে। নিজেকে বাঁচানোর কোনো সুযোগই পেল না বিপ্রদাস। বুলেটটা সরাসরি এসে ওর ভাঁজ করে রাখা ডানদিকের সিনবোনটাকে কয়েকটা টুকরো করে দিয়ে বেরিয়ে গেল।

প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই সামনের গাড়িটা থেকে সুধীর মাইতি নেমে এসে ওকে জড়িয়ে ধরলেন। জ্ঞান হারানোর আগে প্রবল নসিয়ার মধ্যেও বিপ্রদাস একটা কথাই মাইতিসাহেবকে বলতে পারল। ‘ল্যান্ডরোভারটাকে আটকান। ওটার মধ্যে তিতলি যাদব আছে।’

একটা গাড়ি অচৈতন্য সুজিত আর বিপ্রদাসকে নিয়ে দুর্গাপুর হাসপাতালের দিকে রওনা হয়ে গেল। অন্য তিনটে গাড়ি চেজ করল ল্যান্ডরোভারটাকে। ওটা তখন ফুলস্পিডে হাইওয়ে ধরে কলকাতার দিকে দৌড়চ্ছিল। গাড়িটাকে ওরা ধরতে পারল প্রায় দেড়ঘণ্টা বাদে, ডানকুনি টোলগেটে।

ইতিমধ্যে হাইওয়ে পেট্রলের কাছেও খবর পৌঁছে গিয়েছিল। সুধীর মাইতির টিম ওখানে পৌঁছনোর আগেই ওরা ল্যান্ডরোভারের আরোহীদের বেঁধেছেঁদে রাস্তার পাশের একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। সুধীর মাইতি ঘরটায় ঢুকে দেখলেন, আখতার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। ওর বাঁ-কাঁধে একটা মেকসিফট ব্যান্ডেজ। শীতল আর গাড়ির ড্রাইভার হাতকড়া বাঁধা অবস্থায় এককোনে বসে আছে। বিল্টুবাবু উকিলকে ফোন করছে। তবে এসব গৌণ। যাকে দেখে সুধীর মাইতির বুক খালি করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল, সে হচ্ছে গাড়ির মহিলা আরোহিনীটি যাকে ধরার জন্যে আজ তিনজন মানুষের রক্তপাত হল।

না, এ তিতলি যাদব নয়। এও লম্বা, এও শ্যামলা। তিতলির মতোই এরও পিঠের ওপরে দীর্ঘ বিনুনি। কিন্তু এর মুখের চামড়া ঝকঝকে পরিষ্কার। কোথাও অ্যাসিড-অ্যাটাকের চিহ্ন নেই। মেয়েটি নাকি ইতিমধ্যেই বলেছে তার নাম জিনা ছেত্রী। সে মিশিরজির কোঠায় গত দশবছর ধরে শরীর বিক্রি করছে। আজ বিল্টুবাবু আর কোঠার মাসির হুকুমে তাকে এই গাড়িতে চাপতে হয়েছিল। বাকি আর কিছুই সে জানে না।

তুমুল ক্ষোভে সুধীর মাইতি তাঁর পায়ের কাছে পড়ে-থাকা একটা বিয়ারের খালি ক্যানকে লাথি মেরে উড়িয়ে দিলেন। এমনভাবেই ওড়ালেন যাতে সেটা গিয়ে বিল্টুবাবুর মাথার পেছনে লাগে। তারপর বাইরে বেরিয়ে এলেন। নভেম্বরের রাত তিনটের ঠান্ডা হাওয়াতেও তাঁর মাথার আগুন নিভছিল না। তিনি মনে-মনে ভাবছিলেন, পুরুষের পোশাক পরা তিতলি যাদবকে নিয়ে এতক্ষণে মার্সিডিজটা কতদূরে গেল? খুব বেশিদূর যাবার দরকার নেই অবশ্য। দুর্গাপুর থেকে মাত্র আধঘন্টার দূরত্বে অন্ডাল-এয়ারপোর্ট। রাত একটা-কুড়িতে মুম্বইয়ের প্রথম ফ্লাইট ছাড়ে।

তিনি নিজের টিমকে রিট্রিটের অর্ডার দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন। ড্রাইভারকে বললেন সোজা সিমবায়োটিকে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে। তারপর দুর্গাপুর ডিভিশনের অ্যাডিশনাল এস পিকে ফোনে আজকের পুরো ঘটনাটা ব্রিফ করে বললেন, যদি মুম্বই এয়ারপোর্ট থেকে তিতলিকে অ্যারেস্ট করা যায় একটু দেখুন।

এস পি বললেন, ‘চার্জশিট বানিয়েছেন? মিস যাদবের ক্রাইমটা কী? আমার তো আপনার আগের দিনের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, উনি নিজেই অ্যাসিড অ্যাটাকের ভিকটিম। তাহলে মুম্বাই পুলিশকে কোন গ্রাউন্ডে বলব ওকে আটকাতে?’

সুধীর মাইতি চুপ করে রইলেন।

এস.পি. বিরক্ত গলায় বললেন, ‘আজকে আপনার টিমের ওপরে অ্যামবুশের সময় সিনে উনি ছিলেন? ছিলেন না। শুনুন মাইতিসাহেব, আপনি আগে কেসটা সাজান। তারপর আমি দেখছি।’ এই বলে ফোন রেখে দিলেন।

.

ভোর পাঁচটায় সুধীর মাইতি আবার প্রদীপ কামাথের ল্যাবরেটরিতে ঢুকলেন। চোখদুটো লাল, চুল উস্কোখস্কো। ইউনিফর্ম তখনো ভিজে এবং জায়গায় জায়গায় কাদা মাখা। ঘরে ঢুকেই উনি ঘুমন্ত হরিনাথ পালের কাঁধে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে তাকে বিছানা থেকে নামিয়ে দিলেন। বললেন, ‘নীচে গাড়ি আছে। ওটা নিয়ে বেরিয়ে যাও।’ তারপর সত্যপ্রিয় বসাকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘স্যরি স্যার। বড্ড ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিলাম। বলুন, এদিকে আপনাদের প্রোগ্রেস কী? কী বুঝলেন?’

 সত্যপ্রিয় বসাক কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে মাইতিসাহেবের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘বুঝতে পারছি আপনার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তাই যতটা সম্ভব সংক্ষেপে বলে শেষ করছি। প্রথমে একটা কথা বলে দিই। এই ল্যাবরেটরির মধ্যে ক্রাইম একটা ঘটে গেছে এ-কথা ঠিক। তার এভিডেন্স হিসেবে যা-যা আপনাদের কাজে লাগতে পারে, আমি আর অনির্বাণ মিলে সব গুছিয়ে রেখেছি। তার মধ্যে ওই ল্যাপটপ আর দুটো সি.পি.ইউ. ও থাকবে। আর থাকবে ওই ক্রায়োজেনিক কন্টেনারটার মধ্যে যা-যা গুছিয়ে রেখেছি, সব। সবক’টা আইটেমেই সিরিয়াল-নাম্বার দিয়ে মার্কিং করে রেখেছি, যাতে আপনার সিজার-লিস্ট বানাতে অসুবিধে না হয়।

‘এবার বলি শুনুন। ডক্টর কামাথ ইনফার্টিলিটির লাইনে কোনো কাজই করেননি। জানি না, উনি সিমবায়োটিকের কর্তৃপক্ষের কাছে কী রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে উনি ওই কাজ করেননি।’

সুধীর মাইতি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে গত ছ’মাস ধরে উনি কী নিয়ে এত কাজ করেছেন? কী নিয়ে পাতার পর পাতা ওয়ার্কিং শিট বানিয়েছেন?’

প্রফেসর বসাক কম্পিউটারের সামনের চেয়ারটা ছেড়ে উঠে গেলেন ঘরের এক কোণে রাখা সেই হিমায়িত পাত্রটার সামনে, যেটার ভেতরে রাখা টেস্টটিউবগুলো দেখতেই তিনি এর আগে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন। ঢাকনাটা খুলতেই ভেতর থেকে সাদা ভাপ বেরিয়ে এল। উনি ঝুঁকে পড়ে পাত্রের ভেতর থেকে খুব সাবধানে চার-পাঁচটা টেস্টটিউব তুলে নিয়ে অনির্বাণ আর সুধীর মাইতির সামনে ফিরে এলেন। বললেন, ‘ওই ওয়ার্কিং-শিটে এদের কথাই আছে। নাও আই অ্যাম শিওর অ্যাবাউট দেয়ার আইডেনটিটি।’

উনি আবার কিছুক্ষণ মন দিয়ে টেস্টটিউবের গায়ের কোডেড লেবেলগুলো দেখলেন। তারপর সেগুলো ওদের দুজনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যদি জিন-এডিটিং কিছুমাত্র বুঝে থাকি, তাহলে ওঁরা কাজ করছিলেন এইগুলোর ওপরে। যদিও এরা স্পার্মের চেয়ে অনেক ছোট, কিন্তু অনেক হাজার বছর ধরে এদেরও বিচরণভূমি স্ত্রীলোকের যোনিপথ।’

আলাভোলা মানুষটার গলার স্বরে সেই মুহূর্তে এমন একটা কিছু ছিল যে, সুধীর মাইতির শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। সে শুকনো গলায় জিগ্যেস করল, ‘ওগুলো কী স্যার?’

টেস্টটিউবগুলো যথাস্থানে রেখে দিয়ে উনি বললেন, ‘কয়েকটা মারাত্মক যৌন রোগের ব্যাকটেরিয়া। তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে সিফিলিস। ডক্টর কামাথ, কিম্বা তিতলি, মোস্ট প্রোব্যাবলি তিতলিই, এগুলোকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু বদলে দেওয়ার পরে এদের চরিত্র যে কী দাঁড়িয়েছে, তা তো মানুষের শরীরে প্রয়োগ না করে বলা যাবে না। আর সেই পারমিশন কেউ দেবেও না। বাট ইট ইজ আ ডেঞ্জারাস গেম। সাক্ষাত মৃত্যুদূতদের নিয়ে তিতলি এখানে খেলা করছিল।’