দুই
দমদমের ইন্ডিয়ান-পটারি-ইন্ডাস্ট্রির কারখানার ঠিক পেছন থেকেই শুরু হয়েছে বিরাট লেবার-বস্তি। লেবার-বস্তির উত্তর সীমানায় পাঁক ভর্তি ড্রেনের ধারে একটা খোলার চালের ঘর। সেই এঁদো ঘরটার কথা কিছুতেই ভুলতে পারে না তিতলি। আর ভুলতে পারে না একটা পোকার কথা।
তিতলির বাপুজি মারা গিয়েছিল যখন ওর ছ’বছর বয়স। বুকের রোগ হয়েছিল ওর বাবার। লেবার-বস্তির অনেকেই তখন ওই অসুখে মারা যেত। প্রশ্বাসের সঙ্গে সারাক্ষণ ফুসফুসে সিলিকনের গুঁড়ো টানলে সেটা কিছু অস্বাভাবিক নয়।
বস্তির একশোভাগ মরদের সঙ্গে নব্বইভাগ মেয়েও কাপ-ডিশ তৈরি করার ওই কারখানাটায় কাজ করত, কিন্তু তিতলির মা সে লাইনে ছিল না। ওর মা ছিল খুব সুন্দরী। সেইজন্যেই লেবারের কাজ করতে মায়ের ঘেন্না লাগত কিনা ঠিক জানে না তিতলি। কিম্বা এরকমও হতে পারে, বাবা তার সুন্দরী বউকে আগুনের আঁচ থেকে বাঁচিয়ে রাখত। এ নিয়ে মায়ের সঙ্গে কোনোদিন কথা হয়নি তিতলির।
বাবা মারা যাওয়ার পর তিতলিরা মা-বেটিতে এক গলা জলের মধ্যে পড়ল। খেতে পায় না এমন অবস্থা। স্রেফ প্রাণে বাঁচবার জন্যেই মা ওই বস্তির রাজা সুরেশ সিং-এর রক্ষিতা হয়ে গেল।
সুরেশ সিং ছিল উত্তরপ্রদেশের বালিয়া জেলার লোক। তিতলির বাবা-মাও ওই বালিয়া থেকেই কলকাতায় এসেছিল। এই বস্তির বেশিরভাগ লেবারই আদতে বিহার কিম্বা ইউ.পি.-র লোক। সুরেশ সিং নিজে পঁচিশ-বছর বয়সে ইন্ডিয়ান পটারিতে জয়েন করেছিল। তখন ও ফার্নেসে কয়লা ঠেলত।
পরের বিশ-বছরের মধ্যে মস্তানি আর ইউনিয়নবাজি করে সে বকলমে কারখানার মালিকগোষ্ঠীর মধ্যেই ঢুকে পড়েছিল। তার অঙ্গুলিহেলন ছাড়া কারখানাতে একটা ট্রাকও ঢুকত না। কিম্বা কারখানা থেকে বেরোত না। স্ক্র্যাপ-ইয়ার্ড থেকে একটা পেরেকও কেউ নিলামে কিনতে পারত না। ড্রাইভার ইউনিয়ন, লেবার-ইউনিয়ন সবকটারই প্রেসিডেন্ট ছিল সুরেশ সিং। লোকাল এম. এল. এ. সুরেশের কথায় উঠতেন বসতেন।
চরিত্রের দিক দিয়ে সুরেশ সিংকে ছোটখাটো মাফিয়া ডন বলা চলত। আনুগত্য মেনে নিলে সুরেশ সিং তাকে রক্ষা করত কিন্তু তার বিরুদ্ধে হাত ওঠালে সেই হাত কেটে ফেলতে একটুও ভাবত না। রোগা খেঁকুরে শরীর, তোবড়ানো গালের সঙ্গে বেমানান কলপ দেওয়া চুল, দুধ সাদা সাফারি, চোখে কালো সানগ্লাস এই ছিল সুরেশ সিং-এর চেনা সুরত। এই সুরেশ সিংকেই ছ’বছর বয়সের পর থেকে তাদের পরিবারের কর্তা হিসেবে দেখেছে তিতলি।
কর্তা হলেও সুরেশ সবসময় ঘরে থাকত না, হঠাৎ হঠাৎ কোনোদিন চলে আসত। আসতো বেশিরভাগ সময় রাতের দিকে। ও এলে একটা সস্তার ক্যাসেট-প্লেয়ারে কাওয়ালির ক্যাসেট চাপিয়ে দিত মা। ছোলাসেদ্ধ আর লঙ্কা দিয়ে দেশি মদের গ্লাস সাজিয়ে দিত। সুরেশ সিং গান শুনতে শুনতে মদ খেত। তখন তিতলি চুপচাপ মেঝেয় বসে পড়াশোনা করতে পারত। ইচ্ছে করলে পুতুলও খেলতে পারত। অসুবিধে ছিল না। কিন্তু ঘণ্টাখানেক গানবাজনা চলার পরে মা ওকে ইশারা করলে যে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যেতে হবে, সেটাও জানত তিতলি। আবার ফিরতে পারত মা ভেতর থেকে দরজার খিল খুললে তবেই।
ওই ছ’-সাতবছর বয়সেই কোনো একটা সময় থেকে পটারি-বস্তির ছেলেমেয়েরা তিতলিকে এই রেন্ডির বাচ্চি, এই খানকির বেটি—এইসব বলে ডাকতে শুরু করে। ডাকত আর হাততালি দিত, সিটি বাজিয়ে হাসত। তিতলি বুঝতে পারত ওগুলো গালাগাল। কিন্তু কেন যে দাদা-দিদিরা ওকে গালাগাল দিচ্ছে সেটাই ও বুঝতে পারত না। একদিন আর সহ্য করতে না পেরে ও মা-কে জিগ্যেস করেছিল ‘মা, খানকির মেয়ে মানে কী? রেন্ডির বাচ্চি কাকে বলে? ওরা আমাকে ওইসব বলে খেপায় কেন?’
ওর মা সেদিন ওর গলা জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিল আর বলেছিল ‘আমি জানি না সোনা। নেহি জানতা হুঁ মেরি বেটি, মেরি লাল। ইয়ে সব গন্ধা বাতেঁকো মতলব নেহি জানতা হুঁ ম্যায়।’
তিতলি বুঝতে পেরেছিল, মা জানে। ভয়ঙ্করভাবে জানে। তাই সে আর কোনোদিন মাকে ও ব্যাপারে কিছু জিগ্যেস করেনি। তারপর যা হয়! ভাদ্রমাসে কুকুরের সঙ্গমদৃশ্য দেখিয়ে বস্তির ছেলেমেয়েরা ওকে শেখায় ওর মা সুরেশ সিং-এর সঙ্গে ওইরকম করে। তিতলি শান্তভাবে শোনে। বাইরে কোনো তাপ-উত্তাপ দেখায় না। আর সেইজন্যেই বোধহয় বস্তির ছেলেমেয়েরা আস্তে আস্তে ওকে খেপানো বন্ধ করে দেয়।
এইভাবে প্রায় পাঁচ-ছ’বছর কেটে যাওয়ার পর বোঝা গেল মায়ের শরীরে অনেকগুলো অসুখ বাসা বেঁধেছে। মা ভীষণ তাড়াতাড়ি বুড়ি হয়ে যাচ্ছিল। প্রায় রোজই জ্বর আসত। পেটের ব্যথাতেও মাঝে মাঝে সারারাত কাতরাতো। তিতলির তখন তেরো বছর বয়স। ওই বাচ্চা মেয়েই একদিন মাকে টানতে-টানতে নিয়ে গিয়েছিল কর্পোরেশনের বিনা পয়সার ডাক্তারখানায়। লেডি-ডাক্তার মায়ের পাতলা চুলের গোছা সরিয়ে ঘাড়ে একটা দগদগে ঘা দেখতে-দেখতে জিগ্যেস করেছিল, ‘ওই মেয়েটা তোমার কে?’
‘বেটি।’ মা উত্তর দিয়েছিল।
‘ওকে একটু বাইরে গিয়ে বসতে বলো।’
তিতলির পরিষ্কার মনে আছে, সেদিন ডাক্তারখানার বারান্দায় বসে সে লুকিয়ে-লুকিয়ে কেঁদেছিল। কেন তার মায়ের কাছ থেকে যখন-তখন যে কেউ তাকে হঠিয়ে দেবে? সুরেশ সিংতো দেয়ই, তাই বলে ডাক্তার-ম্যাডামও তাকে মায়ের অসুখের কথা শুনতে দেবে না? আর কারুর মা তো এমন নয়। তাদের মেয়েরা তো সারাক্ষণ মায়ের গায়ে গায়েই ঘোরে। কেউ তো তাদের সরিয়ে দেয় না। ওর মায়ের জীবনে এত লুকোনো কথা কেন?
বড় হওয়ার পর তিতলি দুয়ে দুয়ে চার করে বুঝতে পারে মায়ের অসুখটা ভেনারেল ডিজিজ-ই ছিল। গনোরিয়া কিম্বা সিফিলিসের মতন কিছু। সুরেশ সিং-এর দান।
যাই হোক, সেদিনের পর থেকে মাকে সপ্তাহে তিনদিন ডাক্তারখানায় সুঁই নিতে যেতে হত। মা তিতলিকে পইপই করে বলে দিয়েছিল, সুরেশচাচা যেন ঘুণাক্ষরেও সুঁই নিতে যাওয়ার কথা জানতে না পারে।
ওসব করেও উপকার বিশেষ কিছু হচ্ছিল না। মায়ের শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়ছিল। আর সেই ভাঙা শরীর ঢেকে রাখতে মা সুরেশ সিং-এর ঘরে আসার দিনগুলোয় রঙিন শাড়ি পরে, গালে রুজ-টুজ মেখে বসে থাকত। তখন মায়ের ঢঙ দেখে গা জ্বালা করত তিতলির, কিন্তু এখন সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে মায়ের জন্যে ভারি মায়া হয়। তিতলির বয়স তখন চোদ্দো। ওর মা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছিল, ওই সময়টাতেই তার বেঁচে থাকাটা সবচেয়ে জরুরি। তা না-হলে তিতলি ভেসে যাবে।
মা মাঝে-মাঝে বলত, ‘সুরেশবাবু যদি সাহারা না দেন, তাহলে আমাদের কী হবে রে তিতলি? তোর পড়াশোনার এত খরচ, স্কুলের ইউনিফর্ম, বাসভাড়া, সব কোথা থেকে জোগাড় করব?’
ছোটবেলা থেকেই তিতলি পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। বস্তির প্রাইমারি স্কুল থেকে নাগেরবাজারের বড় স্কুলে চলে যেতে তার কোনো অসুবিধেই হয়নি। সেইজন্যেই ওকে নিয়ে ওর মা অনেক স্বপ্ন দেখত। স্বপ্ন দেখত, তিতলি পড়াশোনা করে বিরাট চাকরি করবে। ওদের ঘৃণ্য জীবনে ইতি টানবে। কিন্তু সুরেশবাবুর দয়া ছাড়া তিতলি তো অতদূর যেতে পারবে না। সেইজন্যেই মায়ের কপাল থেকে চিন্তার ভাঁজ কিছুতেই সরত না।
চোদ্দো বছর মানে, তিতলি তখন বেশ বড় হয়ে গেছে। তাই সুরেশ সিং এলে সে আর রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে পারত না। সুরেশ সিং নিজেই সেই সমস্যা বুঝে একটা ব্যবস্থা করে দিল। ওদের বাড়ির পেছনেই একটা সিঙ্গল রুম ভাড়া নিয়ে নিল। ওইটা হল তিতলির নতুন পড়ার ঘর। তিতলি তখন থেকে দিনের মধ্যে বেশিরভাগ সময়টাই ওই ঘরটাতে নিজের বইখাতা নিয়ে কাটাতে শুরু করল।
ওই এঁদো ঘরটার কথাই সারাক্ষণ ভাবে তিতলি। ওই ঘরে নোংরা বিছানার ওপর বসে পড়াশোনা করতে-করতেই সে পাখির বাচ্চার সিঁইই সিঁইই ভয়ের ডাক শুনে ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখত, এত বড় দাঁড়াশ সাপ চালের বাতা বেয়ে এদিক থেকে ওদিকে চলে যাচ্ছে। পায়রার বাচ্চা খেতে আসত সাপগুলো। ঘরের মেঝেটাও ছিল আস্ত একটা চিড়িয়াখানা। ভাঙা মেঝের ফাটলে ডেঁয়োপিঁপড়ে থেকে কাঁকড়াবিছে কী না ছিল? ওই পোকামাকড়গুলো তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছিল। তবে ওদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিখিয়েছিল নীলপরী।
চোদ্দো বছর বয়সে তিতলি পোকাটাকে নীলপরী বলেই ডাকত। বড় হয়ে জেনেছে ওটার নাম কুমোরে-পোকা, ইংরিজিতে Jewel Wasp।
পোকাটা ওই এঁদো ঘরের বাসিন্দা ছিল না। ওই ঘরের স্থায়ী বাসিন্দা ছিল আরশোলারা। সেই আরশোলাদের ধরার জন্যেই ওই নীলপরী হঠাৎ-হঠাৎ খোলা জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকে আসত।
সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। ফিনফিনে সরু উজ্জ্বল নীল পোকাটা ঘরে ঢুকলেই, মেঝেয় চরে বেড়ানো আরশোলাদের মধ্যে গর্তে লুকোবার জন্যে একটা হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। কিন্তু তারা পালানোর আগেই নীলপরী পোঁওও করে উড়ে এসে কোনো একটা আরশোলার ঘাড়ে হুল ফুটিয়ে দিত। কী যে থাকত সেই কামড়ে, কে জানে! আরশোলাটা সঙ্গে সঙ্গে একেবারে হিপনোটাইজড হয়ে যেত; সে আর পালাবার কোনো চেষ্টাই করত না। নীলপরী তখন আরশোলাটার শুড় ধরে আলতো টান দিলেই সে সুড়সুড় করে যেদিকে নীলপরী তাকে নিয়ে যেতে চাইছে সেদিকে চলতে শুরু করত। এইভাবে নীলপরী নিজের চেয়ে দশগুণ বড় আরশোলাটাকে নর্দমার মধ্যে দিয়ে ঘরের বাইরে কোথাও একটা নিয়ে চলে যেত।
একদিন মেঝেয় উপুড় হয়ে শুয়ে তিতলি ওই দৃশ্যই দেখছিল। হঠাৎ তার কানে ভেসে এল মায়ের চিৎকার আর কান্নার শব্দ। মা এমনিতে খুব যন্ত্রণাতেও কাঁদত না। তাহলে? আজ কী হল মায়ের? তিতলি ওই ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে নিজেদের বাড়ির দরজায় দুমদুম করে ধাক্কা মেরে চেঁচাতে শুরু করল, ‘সুরেশচাচা, দরবাজা খুলিয়ে, সুরেশচাচা।’
দরজা খুলে গেল। তিতলি দেখল মায়ের অর্ধোলঙ্গ শরীর মেঝেয় লুটোচ্ছে। সুরেশচাচা প্যান্টের জিপার আঁটতে আঁটতে দাঁতে দাঁত চিপে বলল, ‘শুখা অওরত কাঁহিকা!’
তিতলি সুরেশচাচার পাশ কাটিয়ে মায়ের পাশে গিয়ে বসেছিল। বুঝবার চেষ্টা করছিল মায়ের চোট কতটা সিরিয়াস। দেখল গলায় পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেছে ঠিকই, কিন্তু মাথা-টাথা ফাটেনি। সে একটু নিশ্চিন্ত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে হারামি সুরেশচাচাকে কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেল। সে দেখল সুরেশচাচা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার ফ্রকের পাড় যেখানে থাইয়ের ওপর শেষ হয়েছে সেইদিকে তাকিয়ে আছে।
তিতলি উঠে যাওয়া ফ্রকটাকে সরানোর চেষ্টা না করে সুরেশ সিং-এর চোখে চোখ রেখে হাসল। তার মনে পড়ল নীলপরীর কথা। একটা সদ্য খোলশছাড়া সাদারঙের আরশোলার কথাও মনে পড়ল তার। নীল ফ্রকের তিতলির চোখে সেই মুহূর্তে সাদা সাফারি-স্যুট গায়ে চড়ানো সুরেশচাচাকে ওই সাদা আরশোলাটার মতনই মনে হচ্ছিল। তিতলি ভাবছিল, সুরেশচাচা সবদিক দিয়েই তার চেয়ে অনেক অনেক বড়। কিন্তু তাতে কী এসে যায়? তার কি বিষ নেই?
মায়ের পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সে সুরেশ সিং-এর কানে কানে বলল, ‘বাবলুর দোকান থেকে কনডোম কিনে আনুন। আমি ও ঘরে ইন্তেজার করছি।’
সুরেশ সিং তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল। তিতলি ঘরের দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় দেখল, মায়ের ভুরুর ভাঁজগুলো এতদিন বাদে মিলিয়ে গেছে। মা মেঝেতে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমন্ত ঠোঁটের কোণে নিশ্চিন্ততার হাসি।
নীলপরী আরো অনেক কিছুই শিখিয়েছিল তিতলিকে। তিতলি একদিন নীলপরীকে ফলো করে পৌঁছে গিয়েছিল রাস্তার নালির ধারে ভিজে মাটিতে ওর বাসার গর্তে। গর্তের মুখ খুলে ও খুঁড়ে বার করেছিল একটা আরশোলা। অবাক হয়ে দেখেছিল আরশোলাটা দিব্যি বেঁচে আছে, শুঁড় নাড়ছে। কিন্তু ওর বেঁচে থাকার কথা নয়, কারণ, ওর পেটের মাংস কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে নীলপরীর বাচ্চারা। তখনও বাচ্চাগুলোর শরীর কৃমির মতন। বড় হলে ওরাই কুমোরে-পোকার সৌন্দর্য পাবে।
তিতলি বুঝতে পেরেছিল, নীলপরীর বিষে ওই আরশোলাটা হয়ে গেছে একটা জিন্দা লাশ। এইভাবেই নিজের বাচ্চাদের জন্যে টাটকা মাংসের ব্যবস্থা করেছে নীলপরী। সেদিন পুরো দৃশ্যটা দেখে একটা গা শিরশিরে আনন্দে ভেসে গিয়েছিল তিতলির শরীর, ঠিক যেরকম আনন্দে সে ভেসে যেত সুরেশ সিং-এর সঙ্গে সঙ্গমের চূড়ান্ত মুহূর্তগুলোয়। আধখাওয়া আরশোলাটাকে হাতের তালুতে তুলে নিয়ে দাঁতে দাঁত চিপে তিতলি বলেছিল, ‘সুরেশ সিং, তুমি আমাকে এইভাবে ক্যারি করবে। যতদিন বেঁচে থাকবে, ইউ মাস্ট ক্যারি মি।’
এর পাঁচ বছরের মাথায় তিতলির মা মারা গিয়েছিল। তিতলি তখন বি.এস.সি সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। শেষের ওই পাঁচ বছর সুরেশ সিং আর মাকে ছোঁয়নি। নিজের শরীরের বিনিময়ে মায়ের জন্যে ওই শান্তির ব্যবস্থাটুকু করতে পেরেছিল তিতলি।
মা মারা যাওয়ার পরে-পরেই তিতলিকে সুরেশ সিং পটারি-বস্তি থেকে তুলে নিয়ে গেল ফুলবাগানের একটা নিরিবিলি এক-কামরার ফ্ল্যাটে। তিতলি হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কলেজে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার নজর হয়ে গিয়েছিল উঁচু। পটারি-বস্তিটাকে মনে হত নরক।
সপ্তাহে দুদিন সুরেশ সিং ফুলবাগানের ফ্ল্যাটে আসত। সব মিলিয়ে ঘণ্টা চারেক হয়তো সুরেশ সিং-কে সঙ্গ দিতে হতো; তা ছাড়া বাকি দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্ত তিতলি বই, সি.ডি. আর ল্যাপটপের মধ্যে ডুবে থাকত।
সঙ্গী হবার আগ্রহ নিয়ে আর কেউ কি এর মধ্যে আসেনি তিতলির কাছে?
এসেছিল বইকি। কলকাতা মহানগরীতে একলা এক তরুণী। বর্ষার নতুন মেঘের মতন তার গায়ের রং, বাঁশির মতন তার নাক, দোপাটিফুলের পাপড়ির মতন ঠোঁট আর ডাঁশা পেয়ারার মতন চিবুক। খয়েরি চোখের মণিতে জন্মসূত্রে পাওয়া মধুবনী রহস্য। এমন মেয়েকে কেউ পেতে চাইবে না তাই কী হয়? তবে তারা বেশিরভাগই তিতলির সহপাঠী। নাদান লড়কা সব। তিতলির মনের বয়স যে তাদের থেকে অনেক বেশি, সেটা তিতলিই সবথেকে ভালো বুঝত। বুঝত আর মনে মনে হাসত। শরীর নিয়ে কত রোমান্টিকতা ওদের! মেয়েদের শরীরের রহস্য নিয়ে কত কবিতা লেখে বাঙালি ছেলেগুলো। হুঃ! শরীরের যন্ত্রণা কাকে বলে তা যদি ওরা জানত।
সেই যন্ত্রণা জানে তিতলি পনেরো বছর বয়সে যার সতীচ্ছদ ছিঁড়ে রক্তারক্তি হয়েছে।
কবিতা শুনলে তাই তিতলির চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। প্রেমের কথা শুনলে তার মাথায় খুন চেপে যায়। নিদ্রাহীন রাতে বালিশে মুখ গুঁজে সে ভাবে বেকার বেকার। ধরতিমাঈ, অর্থাৎ মাদার-নেচার এসব কিছুই চান না। ধরতীমাঈ মন বোঝেন না, শরীর বোঝেন।
কেন বোঝেন?
অন্ধকার ঘরে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে তিতলি ডারউইনিজমের প্রথম পাঠ আওড়ায়। প্রকৃতি চায় এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে জিনের মসৃণ সঞ্চালন। যে স্পিসিস যত নিপুনভাবে এবং ব্যাপক-হারে নিজের জিনকে ছড়িয়ে দিতে পারবে, সেই স্পিসিস তত সাকসেসফুল। শরীর হচ্ছে সেই জিনের ক্যারিয়ার মাত্র, তার চেয়ে একটুও বেশি কিছু নয়।
তিতলি ভাবে সেই ফলের মাছির কথা, জীবনের পুরোটাই প্রায় মাটির নীচে পিউপা অবস্থায় ঘুমিয়ে কাটানোর পর, যে-পোকা একদিনের জন্যে মাটির ওপরের আকাশে ডানা মেলে। ওই একদিনই লক্ষ-লক্ষ মাছিতে আকাশ ছেয়ে যায়। কয়েকঘন্টার আলোর জীবন। তার মধ্যেই তাদের সঙ্গম, তাদের প্রসব। তাদের মরে যাওয়া।
বিস্ময়টা সেখানে নয়। বিস্ময় মাদার-নেচারের কিপটের মতন হিসেবিপনায়। যেহেতু ওই একদিনের জীবনে তাদের খাওয়া-দাওয়ার প্রয়োজন হয় না, তাই মাটি ফুঁড়ে বেরোনোর আগেই ওই ফলের মাছিদের ডাইজেসটিভ-সিস্টেম লোপ পেয়ে যায়। তাদের ছোট্ট শরীরের সবটুকু জুড়ে মাদার-নেচার সাজিয়ে দেন জননতন্ত্র। শুধুই জননতন্ত্র।
আজ যদি প্রকৃতি বুঝত, মানুষ না খেয়েও চল্লিশবছর কাটিয়ে দিতে পারবে, তাহলে মানুষের শরীরেও অন্ত্র, অগ্ন্যাশয় কিম্বা পাকস্থলী বলে কিছু থাকত না। কিন্তু অবশ্যই থেকে যেত লিঙ্গ শুক্রাশয়, যোনি ডিম্বাশয় আর জরায়ু।
কিছুদিন আগে একটা সায়েন্স-জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধের পাতায় তিতলির চোখ আটকে গিয়েছিল। নামিবিয়ার দুর্ভিক্ষ-পীড়িত নারী-পুরুষদের পরীক্ষা করে দুজন বিজ্ঞানী দেখেছেন যে, তাদের শরীরের অন্য সব সিস্টেম পুষ্টির অভাবে ভোগে চলে গেছে। কিন্তু টানা উপোসের পরেও প্রায় অক্ষত থেকে গেছে দুটি সিস্টেম—মস্তিষ্ক আর যৌনাঙ্গ।
আপনমনেই হেসে ওঠে তিতলি। এর পরে কোথায় থাকে কবিতা আর কোথায় থাকে প্রেম? তার সহপাঠী যুবকদের মুখ মনে পড়লে তাই হাসি পায় তিতলির। বরং সুরেশবাবুর যৌন-উন্মাদনাকে তার অনেক ন্যাচারাল লাগে।
