পতঙ্গ সঙ্গম – ৭

সাত

মিনিট দশেক বসে থাকার পরে ঘরের দরজায় একটি মেয়ে এসে দাঁড়ালো। মুখ দেখার আগেই তার ফিগার দেখে বিপ্রদাসের বুকটা কেঁপে উঠল। তন্বী শ্যামা বলতে যা বোঝায় একেবারে তাই। একটা সাধারন সুতিশাড়ি পরে আছে মেয়েটা। সাপের মতন লম্বা বিনুনি বুকের ওপর এনে আঙুল দিয়ে ডগাটা একবার জড়াচ্ছে, একবার খুলছে। মেয়েটার মুখটা তখনো দরজার পাল্লার ছায়ায় ঢাকা। বিপ্রদাস বলল, ‘আপনি তিতলি যাদব? ভেতরে আসুন। কয়েকটা কথা জিগ্যেস করার আছে।’

মেয়েটা জড়তাহীন পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে এল। বিপ্রদাসের বুক দ্বিতীয়বারের জন্যে কাঁপল, তবে এবার রিখটার স্কেলে তার মাপ অনেকটাই বেশি। সে দেখল, তিতলির মুখের বাঁ-পাশটা অপূর্ব সুন্দর কিন্তু ডানদিকটা পুড়ে ঝামাপাথরের মতন কুঁকড়ে গেছে। বাঁ-দিকে হরিণের চোখ, ডানদিকে চোখের জায়গায় একটা মাংসরঙের ছোট গর্ত। ভুরু নেই, পলক নেই। এমনকী ডানদিকের কানের পাতাটা অবধি গুটিয়ে সাজা পানের মতন ছোট্ট হয়ে গেছে।

‘কী করে হল?’ কথাগুলো যেন আপনা থেকেই বিপ্রদাসের মুখ থেকে বেরিয়ে এল।

তিতলি মাসির ছেড়ে যাওয়া মোড়াটা টেনে নিয়ে বসল। তারপর বলল, ‘সুরেশ সিং-এর নাম শুনেছেন কি?’

‘সুরেশ সিং মানে পটারি-বস্তির সুরেশ সিং? সে আপনাকে কোথায় পেল?’

‘দুর্গাপুর বাজারে। দেখুন স্যার, আপনি আমার কাছে এসেছেন মানে ডক্টর প্রদীপ কামাথের মৃত্যুর তদন্তের ব্যাপারেই এসেছেন, তাই তো! কিন্তু ওটা সুইসাইড। ওর পেছনে আমার কোনো হাত নেই। বরং বলতে পারেন, সকেট গোখরোর মৃত্যুর ব্যাপারে পরোক্ষে আমার হাত ছিল। কীভাবে ছিল, আমি না বললে আপনি জানতে পারবেন না। কারণ আর যে জানে, অর্থাৎ সুরেশ সিং, তার কাছে আপনার মতন ছোটমাপের অফিসার কোনোদিন পৌঁছতে পারবেন না। আপনি যদি চান আমি পুরো ঘটনাটাই বলতে পারি।’

কিছুটা রেখেঢেকে প্রায় পুরোটাই বলল তিতলি। রুগ্না মায়ের কথা থেকে শুরু করে তার নিজের সুরেশ সিং-এর রক্ষিতা হয়ে যাওয়ার কথা, বি এস সি-তে তার ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করার কথা, তার আমেরিকায় যাবার স্বপ্নের কথা সবই বলল ধীরে-ধীরে। বলল, অকপটভাবে, শান্তস্বরে। বাচনভঙ্গি আর শব্দ নির্বাচনের মধ্যে বিপ্রদাস ওর শিক্ষার পরিচয় পাচ্ছিল; আর একইসঙ্গে ওর মনে হচ্ছিল, একটা মেয়ের কপালে এত দুর্গতি থাকতে পারে?

সবশেষে তিতলি বিপ্রদাসকে বলল ওর স্বপ্নের কথা জানবার পরে সুরেশ সিং কীভাবে ওকে বেশ্যাবৃত্তিতে নামিয়ে দিয়েছিল তাও।

এতক্ষণ তিতলি শিরদাঁড়া সোজা করে বসেছিল। এবার বিপ্রদাসের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে খুব করুণ-গলায় বলল, ‘কিন্তু বিশ্বাস করুন, খুনটা আমি করাইনি। গোখরো আমার এক সহেলির কাছ থেকে জানতে পেরে গিয়েছিল যে, আমার ফ্ল্যাটে সুরেশ সিং-এর নিয়মিত যাতায়াত আছে। সুরেশকে মারতে এসে ও নিজেই বলি হয়ে গেল, কারণ, গোখরোর দলের মধ্যে সুরেশ সিং-এর ইনফর্মার ছিল। ব্যস, এই ঘটনায় আমার ভূমিকা এইটুকুই।

‘আর আমার দুর্গাপুরে আসার দিনটার সঙ্গে গোখরোর মৃতুদিন যে মিলে গিয়েছিল, সেটা নিতান্তই কো-ইনসিডেন্স।’

বিপ্রদাস উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘গোরখনাথের মার্ডারের কেসটা রি-ওপেন করাব। তখন আপনার এজাহার লাগবে। আপনি পালাবেন না আশা করি।’

তিতলি তার ভালো চোখটায় একরাশ বিস্ময় ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘আমি পালাব! কোথায় পালাব? পালালেও লুকোব কীভাবে? এই কোঠির মালকিন সুরেশ সিং-এর নিজের লোক বলে আমাকে লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছে। না-হলে বেশ্যাবাড়িতেও তো আমার স্থান হত না। আর শুনুন স্যার। আজ এই-মুহূর্তে আমার হাতে ঠিক পাঁচশোটি টাকা আছে।’

তিতলি ব্লাউজের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটা নোট বার করে বিপ্রদাসকে দেখিয়ে আবার ঢুকিয়ে রাখল। বলল, ‘বিল্টুবাবুর থেকে চেয়েচিন্তে নিয়েছিলাম। মাসির নজর থেকে লুকিয়ে রেখেছি। তবে এখন ভাবছি, এটা নিয়েই বা কী করব? বাজারে বেরিয়ে শখের কেনাকাটা তো করতে পারব না। এখন আমার জীবনে একটাই ইচ্ছে পূরণ হতে বাকি আছে। সুরেশ সিংকে ফাঁসিকাঠে ঝুলতে দেখা। আপনি যদি আমার সেই শখটা মিটিয়ে দেবেন বলেন, তাহলে আপনার জন্যে আগামী একশোবছর আমি এখানেই অপেক্ষা করব।’

বিপ্রদাস বলল, ‘ঠিক আছে। আমি দু-একদিনের মধ্যেই আবার আসব। তবে আজ আর একটা কথাই জেনে যেতে চাই। প্রদীপ কামাথের আত্মহত্যা সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা? কেন উনি আত্মহত্যা করলেন? অন্য কিছু না, আপনি দীর্ঘদিন ওনার সহকারী ছিলেন, তাই আপনাকে জিগ্যেস করছি।’

তিতলি ভাবতে সময় নিল না। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই উত্তর দিল, ‘জিনিয়াসরা অনেক সময়েই এক্সেন্ট্রিক হন, উনিও তাই ছিলেন। যখন-তখন মুড স্যুইং করত। এই হাসছেন তো এই গবেষণার কাগজপত্র হাওয়ায় উড়িয়ে দিচ্ছেন। এক্সেন্ট্রিক না হলে কেউ মৃত্যুর আগের মুহূর্তে ওরকম ক্রীতদাসের মতন ব্যবহার করে? হাতজোড় করছেন, ঘাড় নাড়ছেন, অদৃশ্য কারুর সঙ্গে কথা বলছেন। এসব দেখেও আপনাদের মনে কোনো সন্দেহ হয়নি? আশ্চর্য!’

বিপ্রদাস তিতলিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এসে প্রথমেই বুক ভরে শ্বাস টানল। হোক সালফারে আর পাঁকের গন্ধ মেশা হাওয়া; তবু সেই হাওয়াটাকেই তখন তার বসন্তের বাতাসের মতন মিষ্টি লাগছিল। তিতলির ঘরের মধ্যে, তিতলির সামনে বসে তার কথা শুনতে-শুনতে মন যেন অসাড় হয়ে গিয়েছিল বিপ্রদাসের। কিছুটা সাড় ফিরল।

সিঁড়ির নীচে মাসি দাঁড়িয়েছিল। বিপ্রদাস যাবার সময় তাকে বলে গেল, ‘তিতলি যাদবের মুখে যখন অ্যাসিড ঢালা হচ্ছিল, তখন তুমি এইখানে, এইভাবেই দাঁড়িয়েছিলে তো? কান খুলে শোনো মাসি! এমনিতে তুমি বাঁচবে না। তবে আমি তোমাকে বাঁচিয়ে নেব যদি কথা দাও কাল কিম্বা পরশু আমি যখন ফিরছি, তার আগে একটা মাছিও এই কোঠি থেকে বেরোবে না।’

মাসির থলথলে মুখটা নিমেষের মধ্যে কাগজের মতন সাদা হয়ে গেল। সে বোধহয় ভাবতে পারেনি, তিতলি পুলিশকে সবকথা বলে দেবে। তাই বিপ্রদাসের কথা শুনে মাসি কোনোরকমে শুধু ঘাড়টাকে একদিকে হেলাতে পারল।

অবশ্য পাঁচমিনিটের মধ্যে ওই মাসিই সুরেশ সিংকে ফোন করে বলল, ‘আব হামারা কেয়া হোগা? তিতলিনে পোলিশবালোকো যো সবকুছ বাতা দিয়া।’

সবকিছু শুনে সুরেশ সিং উত্তর দিল, ‘কিঁউ আপ ঝুটমুট ঘাবড়াতি হ্যায় বুয়া? বেফিকর রহিয়ে। হাম সবকুছ সামহাল লেঙ্গে। বিল্টুবাবু আভি উধারই হ্যায় না? বাহার তো নেহি গিয়া?’

.

মিশিরজির কোঠি থেকে বেরিয়ে একটা মোড় ঘোরার পর বিপ্রদাস পকেট থেকে মোবাইল বার করল। সুধীর মাইতি সাহেবের সঙ্গে এক্ষুনি একবার কথা বলাটা ভীষণ জরুরি। কিন্তু পাঁচ-সাত মিনিট ধরে ক্রমাগত চেষ্টা করেও কনেক্ট করতে পারল না। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। টাওয়ারের কানেকশন এখানে মাঝে-মাঝেই এরকম গড়বড় করে।

ইতিমধ্যে সে সুজিতের গাড়ির কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। কী যেন ভেবে নিয়ে বিপ্রদাস সুজিতকে বলল, ‘গ্লাভস কম্পার্টমেন্টে একটা রাইটিং-প্যাড আছে, দে তো।’

সুজিতের হাত থেকে প্যাডটা নিয়ে খসখস করে কাগজে লিখল, ‘ফোনে আপনাকে কানেক্ট করতে পারছি না। তিতলি প্রদীপ কামাথের আত্মহত্যার ব্যাপারে অনেক কিছু জানে, যেগুলো বলছে না। ওকে এক্ষুনি কাস্টডিতে নেওয়া দরকার। আপনি স্যার একটা টিম পাঠান। সেই টিমে অন্তত দুজন হলেও লেডি-অফিসার রাখবেন। অ্যারেস্ট ওয়ারেন্টও পাঠাবেন। বিপ্রদাস।’

কাগজটা ভাঁজ করে সুজিতের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বিপ্রদাস গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। বলল, ‘যা। এটা বড়সাহেবের হাতে দিবি। অন্য কাউকে নয়।’

সুজিত ভয়ার্ত স্বরে বলল, ‘আপনি? আপনাকে একা রেখে আমি যাব না স্যার।’

বিপ্রদাস কঠিন গলায় বলল, ‘আমার যাবার উপায় নেই। চিন্তা করিস না। আমার কিছু হবে না। তুই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘুরে আয়।’

সুজিত আর কথা না বাড়িয়ে দুর্গাপুরের দিকে রওনা হয়ে গেল। বিপ্রদাস একবার চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিল, কেউ ওকে দেখছে কিনা। না। আপাতত ধারে কাছে কেউ নেই। ঘড়ি দেখল। রাত ন’টা। বৃষ্টিটা এবার জোরে নেমেছে। সেটা একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। রাস্তায় লোক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তবে অন্যদিকে ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটায় তার কাঁপুনি লেগে যাচ্ছিল।

কিছু করার নেই। আজ ভিজতে হবে।

ভিজতে-ভিজতেই আবার মিশিরজির কোঠির দিকে ফিরে চলল বিপ্রদাস। তবে পুরোটা গেল না। কোঠি থেকে কিছুটা দূরে একটা চালাঘর ছিল। এমনিতে সেটার নীচে নিশ্চয় কোনো চায়ের দোকান-টোকান বসে; তবে তখন শুধু একটা নেড়িকুকুর শুয়ে ঘুমোচ্ছিল। বাড়িটার দিকে লুকিয়ে নজর রাখবার পক্ষে এত ভালো জায়গা আর হয় না। বিপ্রদাস মাথা নীচু করে চালাটার মধ্যে ঢুকে পড়ল। কুকুরটা ওকে দেখে ভুক-ভুক করে দুবার ডাকল। তারপর আবার থাবার মধ্যে মাথা গুজে ঘুমিয়ে পড়ল।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই একটা কালো মার্সিডিজ খানাখন্দের ওপর দিয়ে টলতে টলতে বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল। নেড়িটা যেভাবে একবার মাত্র ঘাড় তুলে গাড়িটাকে দেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ল, তাতে বিপ্রদাসের মনে হল গাড়িটা ওর চেনা।

গাড়ির দরজা খোলা আর বন্ধ করার আওয়াজে বিপ্রদাস বুঝতে পারল গাড়ি থেকে কেউ নামল।

মিসিরজির কোঠির ভাঙাচোরা সদর দরজার ঠিক মাথার কাছে খোলা তার থেকে একটা বালব ঝুলছিল। স্বাভাবিক-রাতে ওই আলোতেই নিশ্চয় এ-বাড়ির খরিদ্দাররা জিনিস পছন্দ করে। আজ বাদলার রাতে না আছে খরিদ্দার, না বিক্রেতা। গাড়ি থেকে যে নেমেছিল, সে ওই আলোর বৃত্তের মধ্যে দিয়েই কোঠির মধ্যে ঢুকল। তখনই কয়েক সেকেন্ডের জন্যে বিপ্রদাস লোকটাকে দেখতে পেল। বেঁটে মোটা কদাকার একটা অবয়ব। কিন্তু আয়তনের তুলনায় অসম্ভব চটপটে পায়ে ছোট্ট একটা লাফে উঁচু চৌকাঠ ডিঙিয়ে লোকটা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।

এ-ই নিশ্চয়ই বিল্টুবাবু! কোল-মাফিয়া বিজন উপাধ্যায়। ওর অপারেশনের জায়গা রানিগঞ্জ, তাই বিপ্রদাস ওর সুরত কখনো দেখেনি।

হঠাৎই বিপ্রদাসকে অবাক করে দিয়ে আরো একটা গাড়ি প্রায় নিঃশব্দে বিল্টুবাবুর গাড়িটার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। এতটা নিঃশব্দে যে আসতে পারল, তার কারণ, গাড়িটা বিদেশি। অন্ধকারের মধ্যে গাড়ির মেক কিম্বা মডেল কিছুই বুঝতে পারছিল না বিপ্রদাস। তবে ল্যান্ডরোভার হবার সম্ভাবনা বেশি। কোনো দেশি গাড়ির চাকায় অত চওড়া রেডিয়ালের টায়ার লাগানো থাকে না। এসব গাড়ি জাঙ্গল-সাফারির পক্ষে উপযুক্ত, কিম্বা পাথর ছড়ানো পাহাড়ি উপত্যকা র‌্যাফলিতে। ওয়ারিয়ার খানাখন্দে ভরা রাস্তা তো এই-গাড়ির কাছে রাজপথ।

ওই দ্বিতীয়-গাড়িটা থেকে কিন্তু কেউ নামল না উঠলও না। ততক্ষণে অন্ধকারে চোখদুটো অনেকটা সয়ে এসেছে বলেই বিপ্রদাস বুঝতে পারল, গাড়িটায় ড্রাইভার ছাড়াও আরো দুজন লোক রয়েছে। একজন ড্রাইভারের পাশের সিটে। আরেকজন পেছনের সিটে। তার মানে বিল্টুবাবু একা আসেননি। সঙ্গে খুনখারাপির জন্যে হেঞ্চম্যান নিয়ে এসেছেন।

ব্যাপারটা বোঝামাত্রই বিপ্রদাস শেলটার নিল। চালাঘরটার ভেতরে এককোণায় একটা পাকাপোক্ত মাটির উনুন আর তার ঠিক পাশেই একটা লোহার তৈরি জলের ড্রাম নামানো ছিল। বিপ্রদাস খুব সাবধানে বেঞ্চি ছেড়ে ওই উনুন আর জলের ড্রামের পেছনে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসল। তারপর পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে দেখল, যদি মাইতি-সাহেবকে একটা মেসেজ অন্তত পাঠানো যায়।

নাঃ, চান্স নেই। এখনো টাওয়ারের নাগাল পায়নি ওর সেলফোন।

বেকার-যন্ত্রটাকে পকেটে ভরে রেখে কোমরের হোলস্টার থেকে কাজের যন্ত্রটাকে বার করে মুঠোর মধ্যে চেপে ধরল বিপ্রদাস। দুটো খুনে গুন্ডা যখন দশফিট দূরত্বে বসে জমি মাপে, তখন মোবাইলের চেয়েও একটা কোল্ট রিভলভার যে অনেক বেশি ভরসা জোগায় সে-ব্যাপারে সন্দেহ নেই।

.

মিশিরজির কোঠার দোতলার সবচেয়ে বড় ঘরটা মাসি তিতলির জন্যে ছেড়ে দিয়েছে। দিতেই হয়েছে। বিল্টুবাবু যে কেন ওই মুখপোড়া মেয়েটার জন্যে এরকম পাগল হল, পঞ্চাশ বছরের ওপর কাম-রিপুর কারবারি হয়েও মাসি তা বুঝতে পারে না। মাঝে-মাঝে মনে হয় যাদুটোনা জানে মেয়েটা।

সত্যিই জানে। মাসি নিজে অনেকবার বিল্টুবাবুকে নিয়ে দরজা বন্ধ করার পর তিতলির ঘরের জানলায় কান পেতেছে। কানে কিছু শুনতে পায়নি কখনো, তবে প্রতিবারই মাসির নাকে ভারি অদ্ভুত একটা গন্ধ এসেছে। গন্ধটা কোনো জানোয়ারের শরীরের গন্ধের মতন। মাদি-জানোয়ারের। সহ্য করা যায় না।

কিছুক্ষণ পরেই সেই গন্ধ মিলিয়ে গেছে। তারপর শুরু হয়েছে শীৎকার আর ঘন শ্বাসের শব্দ। সেগুলো তো স্বাভাবিক। কিন্তু তার আগের ওই গন্ধটা কিসের? একদিন আর না পেরে মাসি তিতলিকে গন্ধটার উৎস জিগ্যেস করে বসেছিল। ধূর্ত মেয়েটা বাঁকা হাসি হেসে বলেছিল, অমন কোনো গন্ধের কথা তার জানা নেই।

ওই ঘরেই এখন তিতলি শুয়ে আছে। তার পেটিকোট আর শাড়ি পায়ের কাছে জড়ো করা রয়েছে, ব্রা আর ব্লাউজ মাথার পাশে। বকফুলের পাপড়ির মতন মসৃণ বুক পেট আর উরু থেকে নাইটল্যাম্পের নীল আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। মনে হচ্ছে ওই নীল আলো যেন তার শরীরের চামড়া ফুঁড়েই ফুটে বেরোচ্ছে। এই অবস্থায় তিতলির পোড়ামুখের দিকে তাকালে তাকে মনে হবে এক অন্য গ্রহের প্রাণী, যার অনিন্দ্যসুন্দর শরীরটা মানবীর কিন্তু মুখটা দুঃস্বপ্ন দিয়ে তৈরি।

তিতলি অন্যমনস্কভাবে হাতের ফোনটা নিয়ে খেলা করতে-করতে একটা কথাই ভাবছিল। এত বড় বোকামিটা সে কেমন করে করে বসল? কেমন করে সে বিপ্রদাসের সামনে বলে বসল প্রদীপ কামাথের শেষ প্রতিক্রিয়াগুলোর কথা। তার তো জানার কথা নয়। যদি ইনস্টিটিউটের ওরা সি.সি. টিভির ফুটেজ দেখে থাকে তাহলে আলাদা কথা। না-হলে ওদেরও জানার কথা নয়।

সে জানত, কারণ প্রদীপ কামাথের শরীরে যে-জাতের মডিফায়েড প্যারাসাইট সে ঢুকিয়েছে, তাতে হ্যালুসিনেসনের ধরনটা ওরকমই হবার কথা।

ঠিক আছে। জানত তো জানত। পুলিশ অফিসারের সামনে বলতে গেল কেন?

এর একটা উত্তর তিতলির কাছে আছে। সে নার্ভাস হয়ে পড়েছিল। বাইরে যতই শান্ত-ভাব দেখাক, বিপ্রদাস মণ্ডল নামে ওই অফিসারটির সামনে বসে থাকতে তার ভয় করছিল। সে পরিষ্কার বুঝতে পারছিল, নামটা মান্ধাতার বাবার আমলের হলেও ছেলেটা আধুনিক। সাজপোশাকে নয়, দৃষ্টিভঙ্গিতে। ও এই জমানার ব্যুরোক্রাট যে ব্যুরোক্রেসির সঙ্গে কর্পোরেট-ওয়ার্ল্ডের খুব বেশি তফাত নেই। এরা আগের চেয়ে অনেক বেশি ইনফর্মড, অনেক বেশি টেক-স্যাভি। এরা প্রয়োজনে বাঁধা গতের বাইরে বেরিয়ে ভাবতে পারে। যাকে বলে ‘প্যারালাল থিঙ্কিং’।

ওর সামনে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সে, যে প্রদীপ কামাথের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো কেমন হতে পারে সেটা বলে ফেলেছিল।

এবং ওর সেই কথাগুলো শোনামাত্রই বিপ্রদাসের ভুরুদুটো এক মুহূর্তের জন্যে কুঁচকে গিয়েছিল। একমুহূর্তের জন্যে কিন্তু সেটাই তিতলির পক্ষে ছিল যথেষ্ট। সে বুঝতে পেরেছিল যে, ধরা পড়ে গেছে।

যাগগে। যা হবার তা হয়ে গেছে। এখন এই জায়গাটা ছেড়ে পালাতে হবে। পালাতে হবে অনেক দূরে, শুরু করতে হবে জীবনের নতুন একটা চ্যাপটার। তারই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে ওখানে।

তিতলি কনুইয়ের ওপরে ভর দিয়ে রতিক্লান্ত শরীরটাকে একটু তুলল। দেখল, ঘরের অন্যদিকে একটা টেবিলের ওপরে টেবিল-ল্যাম্পের আলোয় বিল্টুবাবু একটা একটা করে কাগজ চেক করে অ্যাটাচি-কেসের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখছেন। ওখানেই রয়েছে তার স্টুডেন্ট-ভিসা, পাসপোর্ট, প্লেনের টিকিট, মেলবোর্ন-ইউনিভার্সিটির রিসার্চ ফেলোশিপের কাগজপত্র। বিজন উপাধ্যায়ের মতন একজন মাফিয়া ছাড়া মাত্র তিনমাসের মধ্যে এই জিনিসগুলো জোগাড় করা কোনো ভদ্রলোকের সাধ্য ছিল না।

বেচারা বিজন উপাধ্যায়! বেচারা বিল্টুবাবু। তিতলির সঙ্গে গত তিনমাসের সহবাসে যার শরীর ভরে গিয়েছে প্যারাসাইটে। প্যারাসাইটগুলো যতই ওর সেন্ট্রাল-নার্ভাস সিস্টেমের মধ্যে জমিয়ে বসছে, ততই ওর কাজকর্ম হয়ে উঠছে আরো নিখুঁত, আরো একমুখী। পয়সার লালচ নয়, প্রতিপত্তির গরম নয়। এখন বিজন উপাধ্যায়ের সমস্ত অ্যাক্টিভিটির অভিমুখ শুধু তিতলির কেরিয়ার।

তিতলির মাথার মধ্যে একটা ছবি ভেসে উঠল। কতবার কতরকমের মিডিয়ায় যে সে ছবিটা দেখেছে তার সীমা-পরিসীমা নেই। বইয়ে দেখেছে, ইন্টারনেটে দেখেছে, অ্যানিমেটেড ফিল্মে দেখেছে। চাক্ষুষ দেখেনি কখনো। তবে সেই শখটাও মিটে গেছে বিল্টুবাবুকে দেখে।

ছবিটা আর কিছুই না একটা গাছের ডালে ছোট-ছোট মুড়ির দানার মতন অনেকগুলো পোকার লার্ভা, আর সেই ডালেই, লার্ভাগুলোর পাশে বসে রয়েছে একটা শুয়োপোকা। দেখলে মনে হবে কী সুন্দর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কিন্তু পেছনের গল্পটা অন্যরকম।

Glyptapanteles হচ্ছে এক-জাতের পরজীবী বোলতা, যারা শুয়োপোকাদের শরীরে ডিম পেড়ে যায়। তারপর শুয়োপোকার সঙ্গে-সঙ্গে তার পেটের মধ্যে বোলতার লার্ভাগুলোও বাড়তে শুরু করে। পুরোপুরি বেড়ে উঠলে লার্ভাগুলো শুয়োপোকার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে আসে, কিন্তু তার আগে লার্ভাগুলো শুয়োপোকাটার ওপর কি জাদু করে আসে কে জানে, দেখা যায় শুয়োপোকাটা মায়ের মতন ওই বোলতার বাচ্চাগুলোকে আগলাচ্ছে।

মুখের লালা দিয়ে তাদের ঢেকে রাখছে, পিপড়ে-টিপড়ের মতন ক্ষতিকর জীবরা কাছে এলে প্রবলভাবে মাথা নেড়ে তাদের তাড়া করছে। সহজ কথায়, যে-লার্ভাগুলোর জন্যে সে মরতে বসেছে, মৃত্যুর আগের মুহূর্ত অবধি তাদের বাঁচানোর জন্যেই সম্মোহিত শুয়োপোকাটা প্রাণপাত করে যায়।

বিল্টুবাবুও বাঁচবে না। কিন্তু মরার আগে অবধি ও তিতলিকে বাঁচিয়ে যাবে।

কাকে বাঁচাবে? না, সেই তিতলিকে, যার অর্ধেকটা মুখ অ্যাসিডে পোড়া।

কে বাঁচাবে? না, সেই বিজন উপাধ্যায়, যে কিনা কয়েকমাস আগেও তার গলফগ্রিনের ফ্ল্যাটে, মাসে অন্তত একদিন, টালিগঞ্জের কোনো না কোনো রূপবতী উঠতি নায়িকার সঙ্গে রাত কাটাত।

ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই তিতলি তাড়াহুড়ো করে শাড়িটা কোনোরকমে গায়ে জড়িয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে এল। তারপর অর্ধনগ্ন-শরীরেই বিল্টুবাবুর পেছনে দাঁড়িয়ে, ওর মাথাটা দু-হাতে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, ‘শোনো ডার্লিং! থানার ওই ছোটবাবু মোস্ট প্রোব্যাবলি হারুদার ঝুপড়ির নীচে বসে এই বাড়ির ওপরে নজর রাখছে। তুমি এসে পৌঁছবার একটু আগে কুকুরটা কয়েকবার ডেকে উঠেছিল। তখন এই জানলার ফাঁক দিয়ে ভেতরে মানুষের নড়াচড়াও দেখতে পেয়েছিলাম। সেইজন্যেই বলছি, ছোটবাবুর সঙ্গে একটু ট্রিক্স খেলতে হবে। পারবে তো?’

বিল্টুবাবু অ্যাটাচি-কেসটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। তেতো-গলায় বলল, ‘ওসব ট্রিক্স-ফিক্স আমার লাইন নয়। পেছনের গাড়িতে আখতার আর শীতলের হাতে দুটো আমেরিকান মেশিন আছে। ওরা আমাদের কভার করে নিয়ে যাবে। বস্তিতে ঢোকার মুখেও একটা দলকে দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি। বলে রেখেছি বিপ্রদাস মণ্ডলের গাড়ি যেন এখান থেকে দুর্গাপুরে ফেরত না যায়।’

‘গাড়ি তো আটকাবে। ফোন-কল আটকাতে পারবে? ও তো ফোন করে ফোর্স ডেকে নেবে।’

বিল্টুবাবু মুচকি হেসে বলল, ‘এখান থেকে ফোনের কানেকশন পাওয়া অত সহজ? জবরদখল বস্তিকে গভর্মেন্ট কতভাবে কোনঠাসা করে রেখে দিয়েছে জানো না।’

তিতলি কিছুক্ষণ দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে কী যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘উঁহু। আমি সিওর, থানা থেকে আরো ফোর্স আসছে। শোনো, মুখে যাই বল, ওদের সঙ্গে তুমি পেরে উঠবে না। তাই একটু মন দিয়ে আমার প্ল্যানটা শোনো।’

বেশ কিছুক্ষন ধরে তিতলি বিল্টুবাবুকে কী যেন বোঝাল। তারপর অ্যাটাচড ওয়াশ-রুমে ঢুকে ড্রেস পরে বেরিয়ে এল। ওকে দেখে বিল্টুবাবু একবার হেসে উঠেই চুপ করে গেল।

জলের ড্রামটার পেছনে বসে বিপ্রদাস সেই হাসির শব্দটা পরিষ্কার শুনতে পেল। সে মনে-মনে বলল, ‘আর কিছুক্ষণ এইভাবে হেসেখেলে কাটা শুয়োরের বাচ্চা। আর একটু সময় দে আমাকে। তারপর তোদের নিয়ে কী করতে হয় আমি দেখে নিচ্ছি।’