পাঁচ
সেদিনই রাত সাড়ে আটটা নাগাদ আমি, পঙ্কজদা আর হাসিদি রাতের খাবার খেতে বসেছিলাম। বিশাখা যে কেন শুধু দুটো শুকনো রুটি নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল, তার ব্যাখ্যা আর কোনোদিন কারুর কাছে চাইবার দরকার পড়বে না আমার। পুরো খাওয়ার সময়টায় কেউ কোনো কথা বললাম না। কেউ কারুর মুখের দিকে তাকালাম না। শুধু খাওয়া শেষ হওয়ার মুখে একবার নিজের মনেই বলে ফেললাম, আজ বোধহয় আর কাপালি স্যার দেখা করবেন না। ভুলে গেছেন মনে হয়।
হাসিদি বলল, উঁহু। উনি কিছু ভোলেন না। ক’টা বাজল? পৌনে-ন’টা? এবার প্রশান্তদা চলে আসবেন। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।
হাসিদি ভুল বলেনি। খাওয়া শেষ হয়েছে কি হয়নি, বাইরে থেকে গাড়ির হর্নের আওয়াজ পেলাম। বেরোনোর আগে হাসিদিকে জিগ্যেস করলাম, তোমরা কি শুয়ে পড়বে? তাহলে আমি ঢুকব কেমন করে?
হাসিদি বলল, কেউ শোব না। তুমি নিশ্চিন্তে ঘুরে এসো।
দুপুরে যে-রাস্তা ধরে গোরে বিবি কি মহল্লার কাচ কারখানায় পৌঁছেছিলাম, সেই রাস্তা ধরেই আবার ফিরে চললাম। সেই পামার বাজার বস্তি, বেলেঘাটা খাল। শিয়ালদা স্টেশন চত্বর পেরিয়ে প্রাচী সিনেমার সামনে থেকে গাড়ি বাঁদিকে বাঁক নিল। রাস্তাটার নাম সার্পেন্টাইন-লেন।
‘সার্পেন্টাইন’ মানে যে ‘সর্পিল’ সেটা জানতাম। দেখলাম নামটা সার্থক। এত রাতেও কোলেবাজারে ব্যাপক ভিড়। সেই ভিড় কাটিয়ে ঠিক সাপের মতোই এঁকেবেঁকে চলল আমাদের ফিয়াট গাড়ি। নেড়িকুকুর, ঝাঁকামুটে, ঠেলাগাড়ি এবং পথশিশুদের বাঁচিয়ে প্রশান্তবাবু যেভাবে গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তা শুধু একজন লোকাল-ড্রাইভারের পক্ষেই সম্ভব। বাইরের ড্রাইভার হলে এতক্ষণে দশবার ভিড়িয়ে দিত।
গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সার্পেন্টাইন লেনের রাতের চেহারা দেখছিলাম। আশ্চর্য রাস্তা। আশ্চর্য তার দুদিকের পাড়াগুলো। চলতে-চলতে একসময় মনে হল, কোনো অলৌকিক উপায়ে অন্তত পঞ্চাশ-বছর পিছিয়ে গিয়েছি। কোথায় ঝলমলে ত্রিফলা-আলো আর কোথায়ই বা রোল-পরোটা, সালোয়ার-কামিজ কিম্বা মোবাইল-ফোনের দোকান?
অনেকখানি তফাতে তফাতে একটা করে মিটমিটে ল্যাম্পপোস্ট। পুরোনো আমলের দোতলা তিনতলা বাড়িগুলো গায়ে-গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে; তাদের দেয়ালে শ্যাওলার সবুজ ছোপ। রেন-ওয়াটার পাইপের খাঁজে বড়-বড় বট অশথের গাছ গজিয়ে উঠেছে। দোকান বলতে শুধু দু-একটা মুদিখানা। তিনটে ধোপাখানা দেখলাম—যেখানে কয়লার উনুনের আঁচে বসিয়ে ধোপারা আদ্যিকালের লোহার ইস্ত্রি গরম করছিল। এমনকী কতবছর বাদে সত্যিকারে একটা পাথুরে কয়লার গোলা অবধি দেখতে পেলাম।
মিনিট দশেক গড়িয়ে-গড়িয়ে গাড়ি চলল। রাস্তা পেরোলাম বোধহয় সাকুল্যে পাঁচশোমিটার, তার বেশি নয়। তারপরেই সার্পেন্টাইন লেনের গা থেকে বেরিয়ে যাওয়া আরেকটা কানা-গলির মুখে গাড়ি পার্ক করলেন প্রশান্তবাবু। গাড়ি থেকে নেমে আমার দিকে ফিরে তাকালেন।
আগেই বলেছি, কথাবার্তায় পঙ্কজদার সঙ্গে ভদ্রলোকের মিল আছে। পঙ্কজদা তবু গোঁ-গাঁ আওয়াজ করে, ইনি একেবারেই সাইলেন্ট-পিকচার। এখনও মুখে কিছু না বলে, ইশারায় ওঁকে ফলো করতে বললেন। ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় দেখতে পেলাম, মোড়ের বাড়িটার ইট বার করা দেওয়ালের গায়ে কবেকার পুরোনো একটা নীল এনামেল করা টিনের ফালির ওপরে সাদা রঙের বাঙলা হরফে লেখা আছে ‘কবিরাজ-বাড়ি বাই লেন’।
প্রশান্তবাবু গলিটার মধ্যে ঢুকে পড়লেন। আমি ওঁকে অনুসরণ করলাম। বেশি নয়, মিনিট দুয়েক হাঁটার পরেই পৌঁছে গেলাম একটা দোতলা বাড়ির সদর দরজায়। বাড়িটা বহু পুরোনো। দেখলে বোঝা যায়, এককালে বেশ পয়সা খরচা করে বানানো হয়েছিল। কিন্তু এখন একেবারেই জরাজীর্ণ দশা। রাস্তার দিকে চওড়া থামের ওপরে ঢালাই লোহার অপূর্ব কারুকার্য করা রেলিং দিয়ে ঘেরা ঝুলবারান্দা; কিন্তু সেই রেলিং জায়গায় জায়গায় হাওয়া হয়ে গেছে। নারকোল দড়ির টানা দিয়ে ফাঁকগুলো বোজানো হয়েছে। সদর দরজার দুটো পাল্লাই দু-দিকে কেতরে পড়েছে। সদর পেরিয়ে ভিতরে উঠোন। চৌকো উঠোনটাকে ঘিরে তিনদিকে ঘর। চতুর্থদিকে ঠাকুরদালান। দেয়ালের গায়ে একটা একশো-ওয়াটের বালব ঝুলছিল, কিন্তু বিশাল উঠোনের সর্বত্র আলো ফেলার পক্ষে সেটা নেহাতই কমজোরি। তাই উঠোনের এখানে-ওখানে ঘন ছায়া জমে।
একপলক দেখে মনে হল, বাড়িটার দুটো তলা মিলিয়ে অন্তত দশ-বারোটা ঘর রয়েছে। কিন্তু আলো জ্বলছে সাকুল্যে দুটো ঘরে। একটা একতলায় আর অন্যটা দোতলায়। বাকি ঘরগুলো আর ঠাকুরদালান অন্ধকারে ডুবে আছে।
একতলার ঘরটার খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে চোখ চলে যেতেই স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছি। ঘরটা বেশ বড়। দেয়ালে ক্যাটকেটে সবুজ এলাচ রঙের পোঁচ। এখানে-ওখানে রঙের চলটা খসে পড়েছে। দেয়াল থেকে খোলা তারে দুটো টিউবলাইট ঝুলছিল। অতি রদ্দি একটা সিলিং-ফ্যানও ঘুরছিল নিশ্চয় ভেতরে; তার কটকট শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।
দেখলাম, ঘরটার এককোনায় কাঠের টুলের ওপরে কুড়ি-লিটারের একটা মিনারেল-ওয়াটারের জার আর কয়েকটা প্লাস্টিকের গ্লাস রাখা আছে। দেয়ালে টান দিয়ে বেঁধে-রাখা একটা নাইলনের দড়িতে ঝুলছে মেয়েদের জামাকাপড়…অন্তর্বাস ইত্যাদি। কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার ছাড়া ঘরটায় আসবাব বলতে আর কিছু ছিল না, তবে মেঝেতে একটা টানা বিছানা পাতা ছিল। সেই বিছানার জন্যে ব্যবহৃত টুটাফুটা ফোমের গদি আর ময়লা সাদা চাদরগুলো নিঃসন্দেহে পাড়ার ডেকরেটরের সম্পত্তি। মফসসলের দিকে বরযাত্রীদের একরাত থাকার জন্যে ঠিক এইরকম ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।
তবে এই ঘরে বরযাত্রী ছিল না। তার বদলে মেঝের বিছানার ওপরে দুটি সাদা চামড়ার মেয়ে অলসভঙ্গিতে শুয়ে সেলফোন নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। আরেকজন ফরেনার, সে-ও এক উদ্ভিন্ন যুবতী, একটা চেয়ারে বসে ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছিল। গ্রীষ্মকালে আমাদের রঘুপুরের অনাথ-আশ্রমের বাইরে যেরকম পোশাকে মেমসাহেবদের গাড়ি থেকে নামতে দেখেছি, এই মেয়েগুলির পরনেও ঠিক সেইরকম খোলামেলা পোশাক। শর্টস আর গেঞ্জির বাইরে ওদের সুপুষ্ট স্তন আর উরু অনেকটাই বেরিয়েছিল।
আমি দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতেই উঠোনের এককোণের কলঘরের টিনের দরজা খুলে ঠিক ওইরকমই আরেকটি মেমসাহেব বেরিয়ে এল। চান করেই বেরোল নিশ্চয়ই। তার সোনালি চুল থেকে টপটপ করে জল ঝরছিল। কোনোরকমে একটা বড় তোয়ালে দিয়ে গলার নীচ থেকে হাঁটুর ওপর অবধি শরীরকে ঢেকে রেখেছিল মেয়েটি। আমার দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে সেও ওই হলঘরের মধ্যেই ঢুকে গেল। ঢুকেই খোলা দরজাটা চেপে বন্ধ করে দিল। আর কিছু দেখতে পেলাম না।
প্রশান্তবাবুর দিকে সপ্রশ্ন চোখে তাকিয়ে জিগ্যেস করলাম, এরা?
প্রশান্তবাবু সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, পেশেন্ট।
আমি আরেকটু ব্যাখ্যা আশা করছিলাম। এত স্বাস্থ্যবতী মেয়েরা কোন অসুখে আক্রান্ত হল? ডাক্তারই বা কে? কিন্তু প্রশান্তবাবু আমার প্রশ্নাতুর ভঙ্গিকে উপেক্ষা করে বললেন, চলুন। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
দালানের এককোনা থেকে ক্ষয়ে-যাওয়া একটা ইটের সিঁড়ি ওপরে উঠে গিয়েছিল। সেই সিঁড়ি ধরে প্রশান্তবাবু আমাকে নিয়ে সটান উঠে গেলেন বাড়ির দোতলায়। দোতলার সেই একমাত্র আলো-জ্বলা ঘরটার দরজায় একটা ভারী পর্দা ঝুলছিল। প্রশান্তবাবু বাইরে থেকে গলা তুলে বললেন, স্যার, রুদ্রবাবু এসেছেন।
ভেতর থেকে উত্তর এল, বেশ। তুমি কিন্তু ওয়েট কোরো প্রশান্ত। রুদ্রকে আবার ফিরিয়ে দিয়ে আসতে হবে।
আচ্ছা স্যার।
প্রশান্তবাবু সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেলেন।
ঘরের ভেতর থেকে ডাক এল—এসো রুদ্র। ভেতরে এসো।
এই সেই স্নিগ্ধ স্বর, যা গতকাল সকালে ফোনের ভেতর দিয়ে শুনেছিলাম। কাছ থেকে শুনে বুঝলাম, ওঁর কথার মধ্যে আরেকটা জিনিস মিশে আছে, যার নাম আভিজাত্য।
পর্দা সরিয়ে ঘরের ভেতরে মুখ বাড়ালাম। বললাম, আমার জুতো খুলতে অসুবিধে আছে। আপনি কি জুতো অ্যালাও করেন?
তোমার জন্যে করলাম। সঙ্কোচ কোরো না। চলে এসো।
পা থেকে বুক অবধি চাদর ঢাকা দিয়ে যিনি বিছানায় শুয়ে আছেন, যিনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন, তিনিই নিশ্চয়ই বিরাজ কাপালি, আমার মালিক। আমার উচিত ছিল তাঁর দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। কিন্তু সেটা সম্ভব হল না।
হল না যে, তার কারণ, কিছু পুরোনো আমলের আসবাব আর শিল্প- সামগ্রী। সিনেমার পর্দায় জমিদারবাড়ির সেট ছাড়া চর্মচক্ষে সেসব জিনিস কখনো দেখিনি, এখন দেখলাম। কাপালি স্যার যে খাটটায় শুয়েছিলেন সেটা কোন কাঠে তৈরি কে জানে! কিন্তু পাকা খেজুরের মতন চকচকে খয়েরি তার রঙ, গায়ে ভীষণ সূক্ষ্ম গোলাপ আর আঙুরলতার কারুকার্য।
তিনটে বিশাল আলমারি ভর্তি মার্বেল, চিনেমাটি আর রুপোর পুতুল। একটা কর্নার-টেবলের ওপরে প্রায় সাত-আটটা নানান মাপের টেবল ক্লক তো ছিলই, তাছাড়াও অন্য এক কোণে দাঁড়িয়েছিল মানুষ সমান উঁচু একটা গ্র্যান্ডফাদার ক্লক। চার দেয়ালে চারটে অয়েল-পেইন্টিং। ইওরোপের নিসর্গদৃশ্য। বলে দিতে হয় না যে, ইওরোপিয়ান গ্র্যান্ড-মাস্টারদেরই আঁকা।
একটা ব্যাপার পরিষ্কার বুঝতে পারলাম—এইমুহূর্তে এই ঘরে যত অ্যান্টিক ফার্নিচার আর কিউরিও রয়েছে, একসময়ে তার অন্তত দ্বিগুণ ছিল।
এদিকে-ওদিকে ছড়ানো কাঠের পেডেস্টালগুলোর ওপরে মার্বেলের মূর্তি থাকার কথা ছিল। নেই।
দেয়ালের গায়ে বেশ কিছু জায়গার রঙ তুলনামূলকভাবে কম ফিকে হয়েছে দেখছি। ওই জায়গাগুলোতে নিশ্চয়ই আরো অয়েল-পেন্টিং টাঙানো ছিল।
সব মিলিয়ে ঘরটাকে দেখে আমার একটা দাবা-বোর্ডের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল, যে-বোর্ডে খেলা প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছে। তখন যেমন বোর্ডের ওপরে বত্রিশটা ঘুঁটির মধ্যে সাতটা কি আটটা ঘুঁটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, সেইরকমই করুণ এবং ছন্নছাড়া অবস্থায় পড়ে ওই ঘরের অবশিষ্ট কিউরিওগুলো।
তবু কোলে-বাজারের পচা কপিপাতা আর পেচ্ছাপখানার নরকের মধ্যে দাঁড়িয়ে-থাকা একটা ভাঙা-বাড়ির দোতলার ঘরে হঠাৎ করেই এতগুলো অপূর্ব জিনিস দেখে থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম। ঘোর কাটিয়ে কাপালি স্যারের দিকে ফিরে তাকাতে সময় লাগল।
উনি ঠোঁটের কোণে কৌতুকের হাসি নিয়ে আমাকে লক্ষ্য করছিলেন। চোখে চোখ পড়তেই বিছানার পাশে একটা গদি-আঁটা চেয়ারের দিকে চোখের ইশারা করে বললেন, বোসো। আমার কাছে এসে বোসো। কথা বলতে সুবিধে হবে। অনেক কথাই আজ শুনতে হবে তোমাকে। একটু থেমে বললেন, তোমাকে আমার বড় প্রয়োজন রুদ্র।
আমি কিউরিওগুলোর দিকে ইশারা করে বললাম, এ সব আপনার?
উনি বললেন, না। আমার বাবা কিনেছিলেন। বিশ্বনাথ কাপালি। তাঁর কিউরিওর নেশা ছিল। বলব। তাঁর কথাও বলব তোমাকে।
এবার ওঁকে ভালো করে দেখলাম। দুটো মোটা বালিশের ওপরে হেলান দিয়ে তিনি আধশোয়া হয়ে বসেছিলেন। লেসের ফ্রিল বসানো বালিশের ওয়ারগুলো দুধের মতন সাদা। যে চাদরটা দিয়ে পা থেকে বুক অবধি ঢেকে রেখেছেন সেটা ঠিক কোন ধরনের রেশম দিয়ে বোনা বলতে পারব না, তবে চাদরটার জমি থেকে পালিশ করা হাতির দাঁতের আভা ছড়াচ্ছিল। কিন্তু…
কিন্তু সেই চাদরে পোকায় কাটার দাগ।
কত বয়স হবে কাপালি স্যারের? সত্তরের আশেপাশে বলেই মনে হল। মাথায় এখনো ঘন চুল, তবে তার আশিভাগই পাকা। গায়ের রঙের সঙ্গে ওই রেশমের চাদরের রঙ প্রায় মিশে গেছে। মানুষটি অত্যধিক লম্বা। মনে হল হাইট ছ’ফুটের কিছু বেশিই হবে। ধারালো নাক, পাতলা ঠোঁট। পরিষ্কার করে কামানো দাড়িগোঁফ। তবে ওঁর চোখদুটোই আমাকে সবথেকে বেশি টানছিল। কোনো বাঙালির চোখের তারায় এমন রঙ আমি আগে দেখিনি। অবিকল যেন দুটো মধুর ফেঁটা। শুদ্ধভাষায় বোধহয় এই রঙটাকেই পিঙ্গল বলা হয়।
মনে-মনে বললাম, আপনি স্যার সন্দেহাতীতভাবে রূপবান এবং রাজসিক। কিন্তু আপনার রাজসিকতায় ক্ষয় লেগেছে। এই ঘরটার মতনই, আপনার ভেতর থেকেও অতীতের অনেক মূর্তি, অনেক ছবি হারিয়ে গেছে। আপনি পূর্বপুরুষের সম্পত্তি বিক্রি করে দিন চালাচ্ছেন।
উনি স্নেহময় কণ্ঠে জিগ্যেস করলেন, খাওয়াদাওয়ার অসুবিধে হয়নি তো? থাকার জায়গা পছন্দ হয়েছে?
আমি বললাম, না। কোনো অসুবিধে হয়নি। তবে…
ঠিক কীভাবে বলব ভেবে পেলাম না। শেষকালে মরিয়া হয়ে যেভাবে মনের মধ্যে কথাগুলো আসছিল, সেইভাবেই বলে ফেললাম—তবে ওখানে যারা রয়েছে তারা কেউ স্বাভাবিক নয়। আপনার কারখানাটাও একটা লোক দেখানো কারবার। ওখানে কোনো প্রোডাকশন হয় না। আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেন?
ভেবেছিলাম উনি রেগে উঠবেন। কিন্তু একদমই রাগলেন না। খুব শান্ত-গলায় উত্তর দিলেন, তুমি নিজেও কি সেই অর্থে স্বাভাবিক, রুদ্রনাথ এক্কা! সত্যি করে বলো তো আমাকে। স্বাভাবিক তুমি?
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
উনি বললেন, আমার কাছে লুকোতে যেও না। আমি সব জানি। না জানলে অত দূর থেকে তোমাকে নিয়ে আসতাম না।
আমি কোনোরকমে আমতা আমতা করে বললাম, আপনি আপনি কী জানেন? কেমন করে জানলেন?
যদি বলি আমাকে একজন অপদেবতা এসে বলে গেছে, বিশ্বাস করবে? তুমি তো মিশনের ছাত্র। খ্রিস্টধর্মের নিরাকার ঈশ্বরের কথা শিখে বড় হয়েছ। পৌত্তলিকদের আদিম দেবতার কথা বললে তো তুমি বিশ্বাস করবে না।
আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম।
পরিষ্কার দেখলাম, বিরাজ কাপালি একটু কেঁপে উঠলেন। বললেন, মাথার কাছের জানলাটা একটু বন্ধ করে দাও তো। আর রিডিং-ল্যাম্পটার সুইচ রয়েছে ওই জানলাটার ঠিক পাশেই। ওটাও একেবারে জ্বেলে দিয়ে এসো।
দুটো কাজই সেরে আবার চেয়ারে এসে বসলাম। বিরাজ কাপালি বললেন, হাসি মণ্ডল নামে মেয়েটি তোমাকে কিছু বলেছে? ওই কারখানায় কারুর প্রেজেন্সের কথা?
আমি ঘাড় নাড়িয়ে বোঝালাম, হ্যাঁ।
ওখানে কিছু দেখেছ?
আমি আবার ইঙ্গিতেই বোঝালাম, হ্যাঁ।
উনি অল্প হেসে বললেন, বুঝতে পারছি, সেইজন্যেই তুমি খুব জোরালো প্রতিবাদ করতে পারছ না। তুমি ইতোমধ্যেই আমার কারখানার মধ্যে সেই অপদেবতার উপস্থিতি টের পেয়েছ। তারপর হাত বাড়িয়ে বেডসাইড-টেবলের ওপর থেকে একটা চামড়ায় বাঁধানো বই তুলে নিয়ে বললেন, তুমি জানতে চেয়েছিলে ওই কারখানায় কী হয়। আমি তোমাকে এখানে আনলাম কেন।
বললাম, তার সঙ্গে আরেকটা যোগ করে নিন। নীচের ঘরের ওই ফরেনার মেয়েগুলো কারা? ওরা নাকি পেশেন্ট! কীসের পেশেন্ট? কার পেশেন্ট?
বিরাজ কাপালি হাতের বইটার খোলা পাতা থেকে মুখ তুলে বললেন, আমি কে, আমি কী করছি, ওই মেয়েগুলো কারা এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে তোমাকে একটু পুরোনো কথা শুনতে হবে, রুদ্রনাথ। তোমার যেমন জানার ইচ্ছে, আমারও ইচ্ছে আছে তোমাকে সমস্তটা বলার। কারণ, আমার মন বলছে, গত সত্তর-পঁচাত্তর বছর ধরে আমার পূর্বপুরুষের জমিতে বসে সেই অপদেবতা যে-খেলাটা খেলে চলেছেন, সেই খেলাটা তোমাকে দিয়েই শেষ হবে।
এই অবধি বলে বিরাজ কাপালি হাতের বইটা আমার দিকে ঘুরিয়ে ফরফর করে কয়েকটা পাতা উলটে দেখালেন। দেখলাম, এতক্ষণ যেটাকে বই বলে ভাবছিলাম সেটা আসলে একটা ডায়েরি। খুদে-খুদে হাতের লেখায় পাতাগুলো ভর্তি। উনি বললেন, এরকম পাঁচটা ডায়েরি আছে। সবক’টাই আমার দাদুর ডায়েরি। এছাড়াও আরো কিছু কাগজপত্র আছে। তার থেকে আমি কাপালি-পরিবারের, আরো স্পেসিফিকালি বলতে গেলে ওই কাচ কারখানার একটা ইতিহাস গড়ে তুলেছি; যদিও সেটা সম্পূর্ণ নয়। তোমাকে আমি সেই ইতিহাসটা শোনাই। তুমি মন দিয়ে শোনো। মনে হয় সব প্রশ্নেরই উত্তর পেয়ে যাবে।
