পতঙ্গ সঙ্গম – ৩

তিন

তিতলি সেদিন জানত না, তার হাসির আয়ু আর একবছর।

একবছর বাদে বি.এস.সি.-র রেজাল্ট বেরোল। তিতলি শুধু প্রথমই হয়নি, অনেকগুলো পেপারে রেকর্ড-মার্ক পেয়েছে। এই নম্বর নিয়ে কি ও কলকাতাতেই পড়াশোনা করবে, নাকি বিদেশের কোনো ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার চেষ্টা করবে? ওর রেজাল্ট দেখে কলেজের অনেক অধ্যাপক ওকে এই প্রশ্ন করছিলেন। তিতলি নিজেও প্রবলভাবে চাইছিল বিদেশের, বিশেষত আমেরিকার কোনো ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স এবং পি. এইচ. ডি. করে আসতে। গবেষণার বিষয়ও ততদিনে ঠিক করে ফেলেছিল তিতলি। সে হবে প্যারাসাইটোলজিস্ট। পরজীবীদের নিয়ে গবেষণা করবে সে।

তিতলির এই সিদ্ধান্তের মূলে ছিল ওর ছোটবেলার সেই নীলপরী। ততদিনে তিতলি জেনে গেছে, ওই জুয়েল-ওয়াস্প হচ্ছে একধরনের প্যারাসাইট, যাকে বাংলায় বলে পরজীবী। আর আরশোলারা হচ্ছে তার হোস্ট, অর্থাৎ পালক। একেক পরজীবীর একেক নির্দিষ্ট পালক থাকে। প্যারাসাইটরা হোস্টদের যেভাবে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করে, যেভাবে তিলে-তিলে তাদের মারে, তা অকল্পনীয়। সাধে কি স্বয়ং ডারউইন বলেছিলেন যে, আমি কিছুতেই নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারি না, করুণাময় ঈশ্বর জেনেবুঝে ওই পিশাচ পরজীবীগুলোকে সৃষ্টি করেছিলেন!

তিতলি বুঝতে পারত না, ডারউইন সাহেবের কেন এমন মনে হয়েছিল।

সারভাইভাল। বেঁচে থাকা। তার ওপরে যে কিছু নেই সেটা ডারউইনের থেকে বেশি কে বুঝত? প্যারাসাইটরা যা করে তা তো বেঁচে থাকার জন্যেই করে। তিতলিও বাঁচতে চায়। শুধু বাঁচতে চায় না, রানির মতন বাঁচতে চায়। তার মতন নিঃসঙ্গ নির্যাতিত এক মেয়ের পক্ষে সেটা তখনই সম্ভব, যখন সে প্যারাসাইট হয়ে যেতে পারবে। যখন তার হোস্ট হবে পুরুষরা, পুরুষদের মাইন্ড কন্ট্রোল করবে সে—তিতলি যাদব।

তাই কলেজে অ্যাডমিশন নেওয়ার পর থেকেই তিতলি বইয়ের পাতায়, কম্পিউটারের স্ক্রিনে কিম্বা ফর্ম্যালিনে চোবানো স্পেসিমেনের জারে একের পর এক পরজীবী আক্রান্ত পশু-পতঙ্গের অবাক করা কাহিনি খুঁজে বেড়াত।

যেমন এককোষী এক পরজীবী, নাম তার Toxoplasma gondii। সে জীবন কাটায় ইঁদুরের অন্ত্রে! কিন্তু বাচ্চা পয়দা করার জন্যে তাকে ঢুকতে হয় বেড়ালের খাদ্যনালীতে। এর জন্যে Toxoplasma gondii করে কি, ইঁদুরের ব্রেনটাকেই পালটে দেয়! ইঁদুর তখন আর বেড়ালকে ভয় পায় না, বরং বেড়ালের গন্ধ শুঁকে শুঁকে তার কাছে গিয়ে ঘোরাফেরা করতে শুরু করে। আশ্চর্য ব্যাপার! আর সব দিক দিয়ে কিন্তু ইঁদুরটা তখনো নর্মাল থাকে, শুধু তার মনে বেড়াল সম্বন্ধে ভয়ের বদলে ভালোবাসা জেগে ওঠে। তারপরে আর কি? বেড়ালে ইঁদুর খায় আর ইঁদুরের পেটের মধ্যে থেকে Toxoplasma চালান হয়ে যায় বেড়ালের পেটে।

 কিম্বা Dicrocoelium dendriticum নামে আরেক পরজীবী! জীবনচক্রের একটা স্টেজে ওই আণুবীক্ষণিক জীবটি পিপড়েদের অন্ত্রের ভেতরে বেড়ে ওঠে। কিন্তু পরের স্টেজে তাকে আবার পৌঁছতে হয় গরু, ছাগলের মতন তৃণভোজী প্রাণীদের পেটে। সেখানে ওদের মেটিং হয়, ওরা ডিম পাড়ে। পিপড়ের পেট থেকে গোরু ছাগলের মতন প্রাণীর পেটে পৌঁছনোর তো একটাই উপায়। গরু, ছাগলকে ওই Dicrocoelium বয়ে নিয়ে বেড়ানো পিপড়েকে ঘাসের সঙ্গে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে হবে। আর তার জন্যে পিপড়েগুলোকে চড়ে বসে থাকতে হবে ঘাসের ডগায়।

কিন্তু ঘাসের ডগায় চড়ে বসে থাকার জন্যে তো পিপড়েদের জন্ম হয়নি।

আশ্চর্যের ব্যাপার, Dicrocoelium নামে সেই পরজীবী পিপড়েদের দিয়ে ঠিক সেই কাজটাই করিয়ে নেয়। দেখা গেছে পিপড়ের শরীরে ঢোকার পরেই দু-তিনটে Dicrocoelium তার ব্রেনে গিয়ে কেমিকাল ছড়াতে শুরু করে। পিপড়েরা তখন সকাল হলেই ঘাসের ডগায় চড়ে বসে থাকে। কিন্তু রোদ চড়ার পরেও যদি সেই পিপড়ে ঘাসের ডগায় বসে থাকে তাহলে তার রোদে ঝলসে মরে যাওয়ার চান্স থাকে আর সেই সঙ্গে তার পেটের মধ্যে বাসা বেঁধেছে যে Dicrocoelium-গুলো তাদেরও মরার সম্ভাবনা থাকে। তাই দুপুরবেলায় তারা পিপড়েদের স্বাভাবিকভাবে ছায়ায় ঘোরাফেরা করতে দেয়, কিন্তু রাত হলেই ভূতের মতন আবার তাদের ঘাড়ে চেপে বসে।

তিতলির এসব কথা পড়তে পড়তে কান গরম হয়ে যেত। সে কেবলই ভাবত, বীজাণুর মতন ছোট প্যারাসাইটগুলোর কী কম্যান্ড! কী নির্মম, কী নিখুঁত ওদের অপারেশন! ওরা মাইন্ড কন্ট্রোল জানে। মনকে মুঠোয় পুরে নেওয়ার জাদু জানে ওরা।

আসলে তো জাদু নয়, জটিল বায়োকেমিস্ট্রি। প্যারাসাইটের শরীরের কেমিক্যালের প্রভাবে তার হোস্ট অবশ হয়ে যায়। সম্মোহিত অবস্থায় যা করার নয়, তাই করে। যদি প্যারাসাইটদের কাছ থেকে এই রণনীতি শিখে নেওয়া যায়! পারবে না? পারবে না তিতলি মানুষকে চাকর বানাতে?

পরেরদিন যখন সুরেশ সিং ওর ফ্ল্যাটে এল, তখন তাকে আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার ইচ্ছের কথাটা বলেই ফেলল তিতলি। সুরেশ শান্তস্বরে জিগ্যেস করল, ‘কত টাকা লাগবে?’

তিতলি ইতস্তত করে বলল, ‘ইনিশিয়ালি পনেরো লাখ মতন।’

‘কতদিনের মধ্যে লাগবে?’

তিতলি হিসেব করে বলল, ছ’মাস।

বিছানা ছেড়ে উঠে সুরেশ সিং বলল, ‘তার মানে মাসে আড়াই-লাখ। দিনে দশ হাজারের একটু কম। ঠিক আছে, হয়ে যাবে।’

তিতলি ওই দৈনিক হিসেবের মানে বুঝতে পারল না, তবে তাই নিয়ে আর ঘাঁটালোও না। সুরেশ সিং বলেছে, আমেরিকা যাওয়ার টাকা দেবে, এতেই সে মনে-মনে নাচছিল।

সুরেশ সিং ফুলবাগানের ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে যাবার পরে তিতলি চান-টান করে আরাম করে চৌকির ওপরে পা ছড়িয়ে বালিশে হেলান দিয়ে বসেছিল। অনেকদিন বাদে সে নিজেই নিজেকে পড়াশোনার থেকে ছুটি দিয়েছিল সেদিন। তার মনে হচ্ছিল, এটা সেলিব্রেট করার মতন একটা সন্ধে। কোল্ডড্রিংকস আর পোট্যাটো-চিপস সহযোগে তিতলি ওয়েব- সিরিজ দেখতে বসল।

এইভাবে বড়জোর ঘণ্টাদুয়েক কেটেছে। রাত তখন সাড়ে-ন’টা। যখন সবে সে ভাবছে এবার উঠে রাতের খাবারগুলো গরম করবে, তখনই দরজায় কলিংবেল বাজল। আই-হোলে চোখ রেখে তিতলি দেখল সুরেশ সিং ফিরে এসেছে। ওর পেছনে আরেকজন কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভারি অবাক হয়ে তিতলি দরজা খুলে দিল। জিগ্যেস করল, ‘কী ব্যাপার? ফিরে এলেন যে?’

সুরেশ সিং ওর কথার উত্তর না দিয়ে পেছনের লোকটাকে বলল, ‘আইয়ে। অন্দর আইয়ে।’

ওরা দুজনে তিতলিকে প্রায় ধাক্কা মেরেই ভিতরে ঢুকে এল। সুরেশ সিং দরজায় ছিটকিনি তুলে দিয়ে তিতলিকে ঠেলে ঘরের একদিকে নিয়ে গেল। তারপর হিসহিস করে বলল, ‘ইয়ে হ্যায় দ্বিবেদীসাব। মেরা মেহমান। রেভিনিউ ডিপাটের বড় অফিসার। ঠিকঠাক খাতিরদারি করবি। কোনো লাফড়াবাজির কথা শুনলে জানে মেরে দেবো, মনে থাকে যেন।’

তিতলিকে ছেড়ে দিয়ে সুরেশ সিং দ্বিবেদীর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি তাহলে চললাম, দ্বিবেদীসাহেব। আপ মস্তি মানাইয়ে। ফ্রেশ গার্ল চেয়েছিলেন, দিয়ে গেলাম। একটু দেখবেন ওকে।’

রাত এগারোটা নাগাদ পরিতৃপ্ত দ্বিবেদীসাহেব বেরিয়ে যাবার পরে তিতলি ওর ফ্ল্যাটের দরজা লাগিয়ে খাটের ওপরে এসে বসল। বালিশের পাশে একটা পাঁচশোর নোটের বান্ডিল পড়েছিল। ওটা হাতে না নিয়েও তিতলি বুঝতে পারছিল, ওর মধ্যে দশহাজারই রয়েছে—ওর একরাতের রেট। এইভাবেই ওকে আগামী ছ’মাসে আমেরিকা যাওয়ার পনেরো লাখ টাকা তুলতে হবে।

বান্ডিলটাকে হাতের এক ঝটকায় মেঝেতে ফেলে দিয়ে, দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে বসে রইল তিতলি। ও বুঝতে পারছিল, আমেরিকায় পড়তে যাবার কথায় সুরেশ সিং খেপে গেছে। যেতে তো দেবেই না, বরং ওকে বেশ্যা বানিয়ে ফেলবে।

ভোরের দিকে বিছানা ছেড়ে উঠে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল তিতলি। রাস্তায় লোক চলাচল শুরু হয়ে গেছে। কলকাতা জেগে উঠছে। রাতজাগা লাল চোখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে তিতলি নিজের মনেই বলল, ‘সেটা তো হবে না সুরেশ সিং। তুমি বুঝতে পারছ না, বাজারি-বেশ্যা হবার জন্যে তিতলি যাদবের জন্ম হয়নি।’

.

ফুলবাগানে থাকলেও বেঙ্গল পটারির হালের খবর সবই তিতলির কাছে নিয়মিত পৌঁছে যেত। ওখানকার সাথী-সহেলিরাই তিতলিকে ফোনে সব খবরাখবর দিত। সেইভাবেই তিতলি জানতে পেরেছিল, বাজারে সুরেশ সিং-এর একজন প্রতিদ্বন্দ্বী চড়চড় করে উঠে আসছে।

ইন্ডিয়ান পটারির রাজত্বে সে নতুন ডন। সে-ও বালিয়া জেলার বাহুবলী সম্প্রদায়ের ছেলে। ত্রিশ বছরের তরতাজা যুবক গোরখনাথ সিং। মুখে মুখে নামটা হয়ে গিয়েছিল গোখরো। সকেট গোখরো। ‘সকেট’, মানে দেশি পিস্তল চালাতে সিদ্ধহস্ত ছিল গোখরো।

সকেট গোখরো এককালে সুরেশ সিংএরই চ্যালা ছিল। এসব ক্ষেত্রে তাই হয়ে থাকে। সুরেশের তেজ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সকেট গোখরো তোলাবাজি, মালচুরি, ড্রাগের পেডলিং ইত্যাদি সবকটা ব্যবসাতেই হিস্যা মারতে শুরু করল। এমনকি নিজের একটা আলাদা গ্যাঙ অবধি তৈরি করে ফেলেছিল গোখরো।

গোখরোর দল আর সুরেশের দলে গতমাসে যে কয়েকদিন ব্যাপক বোমাবাজি হয়েছে, সেটাও তিতলির কানে এসেছে। ও জানে, গোখরো এখন বেশ ব্যাকফুটে, কারণ, সুরেশ তো শুধু নিজের গ্যাঙ নিয়ে লড়ছে না সুরেশের হয়ে লড়ছে লোকাল থানার ঘুষখোর দারোগা, লোকাল এম.এল.এ.-র চ্যালাচামুন্ডা, সবাই। ইতিমধ্যেই গোখরোর দলের বেশ কয়েকজনকে পুলিশ লক-আপে ঢুকিয়ে দিয়েছে।

সুরেশ সিং-এর সঙ্গে কীভাবে টক্কর নেওয়া যায় সেই কথা ভেবে যখন গোখরো মাথার চুল ছিঁড়ছে, তখনই একদিন তার কাছে পৌঁছে গেল তিতলি যাদবের টেলিফোন কল। তিতলি তাকে বলে দিল, ফুলবাগানের ফ্ল্যাটের হদিশ। কবে, কোন সময়ে সুরেশ সিং ওই ফ্ল্যাটের দিকে যাবে সেটাও খুব শিগগিরই জানাবে বলল।

সকেট গোখরো হাতে চাঁদ পেল। সে তিতলিকে আশ্বাস দিল, সুরেশ সিং-এর সদগতি হয়ে যাওয়ার পর তিতলিকে সে নিজের পার্টনার করে নেবে। তিতলি ফোঁস করে উঠল। বলল, খবরদার, ওসব কথা যেন সে স্বপ্নেও না ভাবে। সে শুধু সুরেশ সিং-এর হাত থেকেই মুক্তি চায় না, পুরো পটারি বস্তির হাত থেকেই মুক্তি চায়। পিছনের জীবনটাকে একেবারে মুছে ফেলে সে চলে যাবে নতুন জীবন শুরু করতে আমেরিকায়।

পরদিন তিতলি একবার কলেজে গেল। ডিপার্টমেন্টাল-হেড প্রফেসর সত্যপ্রিয় বসাক কিছুদিন আগে তাকে একটা চাকরির কথা বলেছিলেন। উনি জানতেন, তিতলির বাবা-মা নেই। আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। অথচ মেয়েটা ব্রিলিয়ান্ট। সেইজন্যেই তিনি ওর জন্যে একটা চাকরির চেষ্টা করছিলেন।

সেদিন তিতলি প্রফেসর বসাকের সঙ্গে দেখা করে বলল, ‘স্যার। সেই যে চাকরিটার কথা বলেছিলেন, সেটা কি পাব?’

প্রফেসর বসাক ভারি খুশি হয়ে বললেন, ‘আরে তিতলি, আমি তো কথাবার্তা অনেক দূর এগিয়ে রেখেছিলাম। তুমি ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছিলে না বলে ফাইনাল করিনি।’

কথাটা সত্যি। ক’দিন আগে অবধিও তিতলি জানত, বিদেশে পড়তে যাওয়ার জন্যে তার টাকার অভাব হবে না। সুরেশ সিং ব্যবস্থা করবে। গত কয়েকদিনে সিচুয়েশন আমুল বদলে গেছে।

তিতলি ওড়নার পাড়টা আঙুলে জড়াতে-জড়াতে মুখ নীচু করে বলল, ‘করব স্যার। চাকরিটা আমার খুব দরকার।’

প্রফেসর বসাক বললেন, ‘এটা ঠিক সাধারণ চাকরি নয়। এটা একটা সুবর্ণ সুযোগ। তুমি ভালো স্যালারি তো পাবেই, তার সঙ্গে পাবে একজন বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিকের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে একটা স্টেট অফ দা আর্ট ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সুযোগ। ডক্টর প্রদীপ কামাথের নাম শুনেছ?’

নামটা শুনেই তিতলির হৃদপিণ্ডে দামামা বেজে উঠল। ডক্টর প্রদীপ কামাথ! তিনি তো ভগবান। সারা পৃথিবীতে হাতে গোনা যে কয়েকজন বৈজ্ঞানিক CRISPR টেকনোলজির নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে ডক্টর কামাথ অগ্রগণ্য। CRISPR টেকনোলজিকে জিনোম অপারেশনের সূক্ষ্মতম ছুরি বলা যায়। একবার এই টেকনোলজিকে ঠিকঠাক আয়ত্ব করতে পারলে জিন-ঘটিত বহু রোগকে নির্মূল করে দেওয়া যাবে। সে কোনোরকমে বলল, ‘শুনেছি স্যার!’

তিতলির মুখের চেহেরা দেখে প্রফেসর বসাক হেসে ফেললেন। বললেন, ‘ফরচুনেটলি, ডক্টর কামাথ খুব শিগগিরই দুর্গাপুরের একটা ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে আসছেন। কোম্পানিটার নাম সিমবায়োটিক—আমেরিকান কোম্পানি। আমাদের এই সাব-কন্টিনেন্টের টিপিকাল কিছু অসুখের ওষুধ বার করার চেষ্টা করছে ওরা। সেইজন্যেই দুর্গাপুরে ল্যাবরেটরি আর রিসার্চ-সেন্টার বানিয়েছে।

‘ডক্টর কামাথ আমার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেন। উনি কিছুদিন আগে আমাকে একজন মহিলা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টের খোঁজ দিতে বলেছিলেন।’

তিতলির মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, ‘মহিলাই কেন?’

প্রফেসর সত্যপ্রিয় বসাক প্রথমটায় একটু আমতা-আমতা করলেও নিজের নামের প্রতি সেদিন সুবিচার করেছিলেন। সত্য কথাই বলেছিলেন তিনি তিতলিকে। বলেছিলেন, ‘শুধু রিসার্চ-অ্যাসিস্ট্যান্ট নয়, উনি চান ওঁর এক্সপেরিমেন্টের জন্যে একজন ভলান্টিয়ার; যার ওপরে উনি এক্সপেরিমেন্ট করে রেজাল্টগুলো দেখতে পারবেন। এবং সেটা এমন কোনো এক্সপেরিমেন্ট, পুরুষের শরীরে যেটা টেস্ট করা যাবে না। এর বেশি আমাকে কিছু বলেননি উনি। আর বুঝতেই পারছ, গবেষণার এই স্টেজে আমার পক্ষেও বেশি কিছু জানতে চাওয়াটা ডিসেন্ট নয়। বাট আই সাজেস্টেড ইওর নেম। এবার বলো, কাজটা করবে?’

‘করব স্যার। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি জয়েন করতে চাই। বেঁচে থাকার জন্যে আমার টাকার খুব দরকার, স্যার’।

নিজের সেলফোনে প্রদীপ কামাথের নাম্বার ডায়াল করতে-করতে, প্রফেসর বসাক বলেছিলেন, ‘শুধু টাকা নয়। তোমার কাজ, তোমার কোয়ালিটিজ যদি ডক্টর কামাথের পছন্দ হয় হবেই আমি শিওর, তাহলে উনিই তোমার ভবিষ্যৎ তৈরি করে দেবেন। পরের ধাপে হয়তো তোমাকে বিদেশের… কোনো নামকরা ল্যাবরেটরিতে।’

ডক্টর কামাথ কল রিসিভ করলেন, ‘গুড-ইভনিং মিস্টার বসাক। বলুন, কী খবর।’

প্রফেসর বসাক কিছুক্ষণ কথা বলে ফোনটা রেখে দিলেন। তারপর তিতলির দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বললেন, ‘ডান। উনি ঠিক এক-সপ্তাহ বাদে দুর্গাপুর সিমবায়োটিকে জয়েন করছেন। তোমাকে যেতে বললেন দশদিন বাদে, মানে দেয়ালে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে প্রফেসর বসাক বললেন, তেইশে ফেব্রুয়ারি।’

তিতলি প্রফেসর সত্যপ্রিয় বসাকের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলল, ‘আপনার ঋণ জীবনে শোধ করতে পারব না, স্যার।’

প্রফেসর বসাক তিতলির মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘ভালো থেকো। যোগাযোগ রেখো।’

কলেজ থেকে বেরিয়ে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির পাশের একটা টেলিফোন বুথ থেকে তিতলি পরপর দুটো ফোন করল। প্রথমটা সুরেশ সিংকে। সুরেশকে বলল, আগামী তেইশ-তারিখ সে কোনো গেস্টকে এনটারটেইন করতে পারবে না। কিন্তু সুরেশ নিজে যেন ওইদিন রাত দশটার সময় অবশ্যই আসে।

সুরেশ একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘কী ব্যাপার? হঠাৎ এত পেয়ার?’

তিতলি কান্নাভেজা গলায় বলল, ওদিন তার মায়ের জন্মদিন। এই পৃথিবীতে সুরেশ ছাড়া তার মায়ের আর কোনো আপনজন ছিল না। তাই সেদিন সুরেশকে সঙ্গে নিয়ে ও একটু মায়ের ছবির সামনে বসতে চায়।

প্রত্যাশামতই সুরেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ভারী গলায় বলল, ‘আয়েঙ্গে। জরুর আয়েঙ্গে।’

তিতলি জানে ওর মায়ের জন্যে সুরেশ সিং-এর মনে সত্যিই কিছুটা ভালোবাসা ছিল। সেইজন্যেই মায়ের জন্মদিনের টোপটা দিয়েছিল।

সুরেশ সিং-এর সঙ্গে কথা বলার পর তিতলি সকেট গোখরোকে ফোন করল। বলল, ‘তেইশে ফেব্রুয়ারি রাত দশটায় পৌঁছে যাবি। আমি থাকব না, তবে সুরেশ সিং ওইসময়ে আসবে। আর শোন, যা করার করবি বড় রাস্তায়। আমার ফ্ল্যাটের ধারে-কাছে খুনখারাপির কোনো চিহ্ন যেন না থাকে।’

উল্টোদিক থেকে সকেট গোখরোর প্রাণখোলা হাসি ভেসে এল। ‘বেফিকর রহে তু তিতলি। কাম বন যায়েগা। মগর সাচমুচ মিস করেঙ্গে তুঝকো।’

.

.

তেইশে ফেব্রুয়ারি সকালে তিতলি সিমবায়োটিকে ডক্টর কামাথের আন্ডারে ল্যাবরেটরি-অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে জয়েন করল। বিকেল চারটে অবধি ডক্টর কামাথ এই একুশ বছরের তরুণীকে বাজিয়ে দেখলেন এবং সত্যিই অবাক হয়ে গেলেন। প্রফেসর বসাক তাঁর এই ছাত্রীটি সম্বন্ধে কোনো অতিশয়োক্তি করেননি। এ সত্যিই জিনিয়াস।

শুধু একটা জিনিসকেই তিনি জিনিয়াস দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারছিলেন না। তিতলির মতন একজন সাধারণ গ্র্যাজুয়েট-স্টুডেন্ট কেমন করে জিন ট্র্যান্সপ্ল্যান্টের টেকনিকাল খুঁটিনাটির দিকটায় এতটা পারঙ্গম হয়ে উঠল? এর জন্যে যে সব ইন্সট্রুমেন্টের ব্যবহার করতে হয়, গ্র্যাজুয়েশন-লেভেলের ল্যাবরেটরিতে তো সেসব থাকবারই কথা নয়। অথচ এই তিতলি যাদবের কাছে সেসব মেশিন কিম্বা ইনস্ট্রুমেন্ট মোটেই অপরিচিত নয়। এটা কীভাবে সম্ভব হল?

মনে-মনে শ্রাগ করলেন ডক্টর কামাথ। বোঝাই যাচ্ছে, তাঁদের স্টুডেন্ট-লাইফে যেমন ছিল, তার থেকে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক এগিয়ে গেছে।

যাই হোক, দুর্গাপুরের একটা ল্যাবরেটরিতে যে এরকম দক্ষ একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট পাওয়া যাবে এটা ডক্টর কামাথ আশা করেননি। মনে-মনে প্রফেসর বসাককে একটা থ্যাঙ্কস দিলেন তিনি, আর সিমবায়োটিকের ডিরেক্টর শুভময় চ্যাটার্জিকে টেলিফোনে খুব সংক্ষিপ্ত একটা নির্দেশ দিলেন ‘রিটেইন দিস গার্ল, দিস তিতলি যাদব, অ্যাট এনি কস্ট। হার সার্ভিস ইজ এসেনসিয়াল ফর মাই রিসার্চ।’

ল্যাবরেটরি থেকে ডিরেক্টরের অফিস ঘুরে তিতলি সেদিন সোজা লেডিজ-হস্টেলে নিজের ঘরে ফিরে এসেছিল। শুভময় চ্যাটার্জি যে স্যালারি এবং পার্কসের কথা তাকে বলেছিলেন, অন্তত পাঁচ বছর চাকরি না করলে সিমবায়োটিকের মতন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে সেই বেনিফিট পাওয়া যায় না। তিতলি মনে-মনে একটু হেসেছিল। এর পিছনে যে ডক্টর কামাথের রেকমেন্ডেশন কাজ করছে সেটা বুঝতে তার দেরি হয়নি।

কিন্তু এই সাফল্যকে সে ঠিকমতন উপভোগ করতে পারছিল না। তার কারণ, দিনটা ছিল তেইশে ফেব্রুয়ারি। রাত দশটার পর সকেট গোখরোর হাতে সুরেশ সিং-এর কোতল হওয়ার কথা।

দশটার পর থেকেই তিতলি ছটফট করতে শুরু করল। সকেট গোখরোর ফোনটা এবার আসার কথা নয়? কিন্তু না। ফোন এল না। সারা রাত জেগে রইল তিতলি। ভোরের দিকে অবশেষে সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছল যে, তার নিরাপত্তার কথা ভেবেই গোখরো তাকে তার মোবাইলে ফোন করছে না। মোবাইলের কল থেকে দুজনের যোগসাজশের কথা ধরা পড়ে যায়। এই কথাটা মাথায় আসার পর সে একটু শান্ত হল এবং তারপর ঘণ্টা চারেকের জন্যে ঘুমোতে পারল।