সাত
গল্প জমে গিয়েছিল। আমি জিগ্যেস করলাম, তারপর?
লোকদুটো চলে যাওয়ার পর চটপট স্নান-আহ্নিক সেরে দাদু কারখানার দিকে রওনা হয়ে গেলেন। পকেটে কারখানার চাবির গোছা।
বাঁ-দিকের ব্যারাক বাড়িটায় ইভা আর স্টিফেন থাকতেন। স্টিফেনের মৃত্যুর পর তখন ইভা একাই থাকেন। ব্যারাক বাড়ির দিকে যেতে গিয়েও দাদু থেমে গেলেন। কারণ, ভেতরদিক থেকে এঁটে বন্ধ করা দরজা-জানলাগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছিল, ইভা তখনো ঘুম থেকে ওঠেননি। দাদু ঘড়ি দেখলেন—বারোটা বাজতে তখনো কয়েক মিনিট দেরি ছিল। তিনি ভাবলেন, থাক। আর কিছুক্ষণ বাদে উনি হয়তো নিজেই উঠে পড়বেন। তখনই না হয় কথা বলব। আপাতত কারখানাটা একটু দেখে আসা যাক।
তোমাকে আগেই বলেছি, কারখানার প্রোডাকশনের ব্যাপারে দাদু কোনোদিন মাথা ঘামাননি। সত্যি কথা বলতে কি ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির তিনি ছিলেন স্লিপিং-পার্টনার।
কিন্তু সেই-দিনটার কথা ছিল স্বতন্ত্র। স্টিফেন মারা গেছেন, কারিগরেরাও কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেল। ইভার অবস্থা তিনি চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছিলেন। মাত্র বছরখানেক আগেই যে প্রাণোচ্ছল এবং আত্মবিশ্বাসী যুবতী তাঁর সঙ্গে কারখানা কেনার ‘ডিল’ করেছিলেন, তিনি কি আর আগের মতন আছেন?
সোমেশ্বর কাপালির বয়স তখন বাহান্ন। দুনিয়াদারি অনেকটাই দেখে নিয়েছেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এখনো যদি তিনি ব্যাভেরিয়া ইন্ডাস্ট্রির ব্যাপারে মনোযোগ না দেন তাহলে তাঁর শেষ বয়সের অবলম্বন এই ব্যবসাটাও ডুববে।
এইসব চিন্তা করতে-করতেই সোমেশ্বর কাপালি সেদিন, পাঁচই মার্চ উনিশশো-একান্ন, বেলা বারোটার সময়, জীবনে প্রথমবারের জন্যে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানা-ঘরের দরজার গা-তালা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। তারপর বাড়ি ফিরে তিনি সেদিন যা-যা করেছিলেন, যা-যা দেখেছিলেন, সবটাই পরিষ্কার করে ডায়েরিতে লিখে রাখলেন।
কারখানা-ঘরের ভেতরে সেদিনও কোনো বৈদ্যুতিক আলো জ্বলেনি। তবু হালকা সবুজ একটা আভায় পুরো ঘরটাই ভরে ছিল। সোমেশ্বর কাপালি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলেন, ঘরটায় তিনি ছাড়াও আরেকজন কেউ রয়েছেন। না, কাউকে দেখতে পাননি। কোনো শব্দও শোনেননি। তবু তাঁর মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাঁর ওপরে নজর রাখছে।
বেশ কিছুক্ষণ বেঞ্চের নীচে, ফার্নেসের ভেতরে উঁকিঝুঁকি মারার পরেও বুঝতে পারলেন না যে, সে রয়েছে কোথায়! শুধু যে দেখছিল তাই নয়, সোমেশ্বর কাপালি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, সেই অদৃশ্য অস্তিত্ব ক্রমাগত তাঁর কানে বলে চলছিল, আর বেশি এগিও না সোমেশ্বর। তুমি এখানে অবাঞ্ছিত। ভালো চাও তো এইমুহূর্তে এখান থেকে বেরিয়ে যাও।
বেরিয়েই আসছিলেন সোমেশ্বর কাপালি।তার আগেই একটা ভারি অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল তাঁর। যতদিন কারখানা-ঘরে জটাকেশী ফার্মেসির ওষুধপত্র তৈরি হত, ততদিন জিনিসটা ওখানে ছিল না। সেটা আর কিছুই নয়, ফার্নেসের কাছাকাছি মেঝের ওপরে একটা চৌবাচ্চা। হঠাৎ করে দেখলে বোঝা যায় না যে, ওখানে চৌবাচ্চাটা রয়েছে। কারণ, ঠিক ম্যানহোলের ঢাকনার মতন একটা গোলাকার ঢালাই-লোহার ঢাকনা দিয়ে চৌবাচ্চাটার মুখ এঁটে বন্ধ করা ছিল।
সোমেশ্বর পাশ দিয়ে যেতে-যেতেই কী মনে হতে ঢাকনাটার আংটা ধরে একটা টান দিয়ে সেটাকে খুলে ফেললেন, আর খোলামাত্রই বীভৎস পচা গন্ধে তিনি প্রায় জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। অলৌকিক সবুজ আলো সেই চৌবাচ্চার ভেতরেও নেচে বেড়াচ্ছিল! সেইজন্যেই তিনি দেখতে পেলেন চৌবাচ্চাভর্তি রক্ত। তিনি বুঝতে পারলেন, কসাইখানা থেকে পশুর রক্ত এনে এই মেঝের নীচের চেম্বারেই জমানোর বন্দোবস্ত করেছিলেন ইভা আর স্টিফেন।
সোমেশ্বরের চোখের সামনেই সেই রক্তের চৌবাচ্চার মধ্যে একটা ঢেউ উঠল। পুকুরের মধ্যে বড় কোনো মাছ ঘাই মেরে জলের নীচে ডুবে গেলে তার মাথার ওপরের জলটুকু যেমন একমুহূর্তের জন্যে ফুলে ওঠে, ঠিক সেইরকম। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারলেন, ওই রক্তের সঞ্চয়ের মধ্যে বাস করছে বৃহদায়তন কোনো জীব। সেটা যে কী, তা নিয়ে তদন্ত করার সাহস তাঁর ছিল না।
তিনি তড়িঘড়ি ম্যানহোলের ঢাকনাটা নামিয়ে দিয়ে কারখানা-ঘরের ভেতর থেকে আবার উঠোনে বেরিয়ে এলেন। উঠোন পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন বাঁ-দিকের ব্যারাক বাড়ির দালানে। হ্যাঁ রুদ্র, যে-বাড়িটায় এখন তোমার থাকবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তোমাকে তো একটু আগেই বললাম, সত্তর বছর আগে ওই চারটে ঘরের মধ্যেই কোনো একটায় থাকতেন ইভা স্টাইনবেক। স্টিফেন মেয়ার মারা যাওয়ার পরে তিনি একাই থাকতেন।
শূন্য কারখানা। শূন্য উঠোন। এবং ব্যারাক বাড়ি দুটোতেও তখন থাকার কথা একমাত্র ইভার। সোমেশ্বর একবার কব্জিতে বাঁধা ঘড়িটায় সময় দেখলেন। সাড়ে বারোটা। তিনি চিন্তা করলেন, ডাকব কি ইভাকে? পায়ে-পায়ে ইভার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেনও তিনি।
কিন্তু দরজায় নক করার আগেই তাঁর কানে এল ইভার গলা। একঘেয়ে সুরে এবং অচেনা-ভাষায় ইভা কিছু বলে যাচ্ছিলেন। সোমেশ্বরের মনে হয়েছিল সুরটা সাপুড়ে-বাঁশির সুরের মতন—যার মধ্যে একইসঙ্গে আদিমতা এবং সম্মোহন মিশে ছিল। সেই গান কিছুক্ষণ শুনলেই মন অবশ হয়ে যায়; অন্তত সোমেশ্বর কাপালির সেদিন তাই হয়েছিল।
ইভা কি মন্ত্র পড়ছেন? কোনোরকম প্রার্থনায় ব্যস্ত রয়েছেন? এইসময় তাঁকে ডাকা কি ঠিক হবে? কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না সোমেশ্বর।
ঠিক তখনই তাঁর চোখে পড়ল, ঘরের একটা জানলার পাল্লা অল্প একটু খোলা রয়েছে। হয়তো ছিটকিনি আলগা থাকায় জানলাটা সামান্য ফাঁক হয়ে গিয়েছিল। ইভা কী করছেন দেখার জন্যে সোমেশ্বর সেই ফাঁকটায় চোখ লাগালেন! যা দেখলেন তা কোনো জীবিত মানুষের দেখার কথা নয়!
আমি একটু অধৈর্য হয়েই কাপালি স্যারকে জিগ্যেস করলাম, কী দেখলেন?
দেখলেন, ইভা স্টাইনবেক মেঝের ওপরে হাঁটু মুড়ে বসে আছেন। দালানের দিকেই মুখ ফিরিয়ে বসেছিলেন, তাই দাদু তাঁকে সামনের দিক থেকে দেখেছিলেন। গায়ে একটা সুতোও ছিল না মহিলার—সম্পূর্ণ নগ্ন। আধো অন্ধকার ঘরটার মধ্যে সেই শ্বেতাঙ্গিনীকে দেখে মনে হচ্ছিল একটা মোমের মূর্তি। সোনালি চুলের রাশি পিঠের ওপরে লুটোচ্ছিল। চোখদুটো আধবোজা। তিনি ওই অবস্থাতেই দুর্বোধ্য ভাষায় একটানা মন্ত্র পড়ে যাচ্ছিলেন।
দাদু লিখছেন—ইভার তলপেটের দিকে একপলক তাকিয়েই বুঝতে পারলাম যে, তিনি গর্ভবতী। আমি একজন চিকিৎসক। গর্ভলক্ষণ চিনতে আমার ভুল হয় না। অন্তত পাঁচমাসের গর্ভভার বহন করছেন তিনি।
আর যা দেখলাম তা আমার সমস্ত অভিজ্ঞতা এবং সমস্ত অধ্যায়নের অতীত। চিকিৎসা-শাস্ত্র অথবা শরীরবিদ্যার কোনো গ্রন্থে এমন কোনো লক্ষণের কথা আমি পড়িনি। দেখলাম, ইভার স্বাভাবিক দুই স্তনের মাঝখানে, ওঁর সম্পূর্ণ স্তনসন্ধি জুড়ে তৃতীয় একটি স্তন। বাকি দুটি স্তনের মতই সেটি পরিপূর্ণ, নিটোল এবং অপরূপ।
আমার পা কাঁপতে শুরু করল। আমার মনে হল ওই তৃতীয় স্তনটির শীর্ষে যা আছে, তা সাধারণ বৃন্ত নয়—চোখ। অদ্ভুত এক সম্মোহক-দৃষ্টিতে সেই চোখটি আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। এমনই সেই সম্মোহনের টান যে, প্রবল উচ্ছা সত্তেও আমি সেই জানলার সামনে থেকে এক-ইঞ্চিও নড়তে পারলাম না।
ঠিক তখনই মন্ত্রপাঠ থামিয়ে ইভা আমার দিকে তাকালেন। বিন্দুমাত্র অবাক হলেন না, সঙ্কুচিতও নয়। যেন সত্যিই ওই স্তনের চোখ দিয়েই তিনি আমাকে অনেক আগেই দেখে নিয়েছিলেন। তিনি বললেন, প্লিজ কাম ইন মিস্টার কাপালি। আই নিড ইউ। আই নিড ইয়োর হেল্প ব্যাডলি। অফকোর্স ইউ উইল বি রিওয়ার্ডেড ফর ইট।
এরপর দাদু লিখছেন, ইভা আমাকে সমস্ত কথা খুলে বলেছেন। লেবেনসবর্ন-প্রোগ্রামের কথা শুনে আমি তো হতভম্ব। উনি এখন এই কারখানায় সেই প্রোগ্রাম চালিয়ে যেতে চান। উনি যে-পথে হাঁটছেন সেই পথে হাঁটার জন্যে জার্মানিতে নাকি অসংখ্য মেয়ে অপেক্ষা করে রয়েছে। সেই মেয়েদের পেছনে আবার রয়েছে নাৎসিদের গোপন সংগঠন। যুদ্ধ শেষ হলেও তারা শেষ হয়নি। সংগঠনের ধনকুবের সদস্যেরা আমাকে সোনা দিয়ে মুড়ে দেবে, শুধু যদি ইভা স্টাইনবেকের সঙ্গে থাকি।
শুধু মুখের কথা নয়, ইভা আমাকে আজকেই একটা বিশাল হিরের ব্রোচ দিয়েছে, যেটার দাম কয়েক লক্ষ টাকা হবে। আমি ওকে বলেছি, আমার বাড়ি-জমির বিলি-বন্দোবস্ত করে কয়েকদিন বাদেই আমি ফিরে আসছি। কারণ, আমি জানি এই আগুন নিয়ে খেলায় আমি যেমন বড়লোক হতে পারি, তেমনি আমার প্রাণটাও চলে যেতে পারে। আমার পরিবারকে তো আর পথে বসিয়ে যেতে পারি না।
এই ঘোষণা দিয়েই সোমেশ্বর কাপালি তাঁর ডায়েরির লেখা শেষ করেছিলেন। ডায়েরির শেষ এন্ট্রি বলতে যা বোঝায়, তা হল এই। তবে বাবার কাছে শুনেছি, পরের দিনই তিনি আবার ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানায় ফিরে গিয়েছিলেন। তারপর আবার বারবার। এবং তার মাসখানেক পরেই সার্পেন্টাইন-লেনের পাট চুকিয়ে ওই কারখানার ব্যারাক বাড়িতেই থাকতে শুরু করেছিলেন। একবছরের কিছু বেশি সময় তিনি ওখানেই ছিলেন।
.
বিরাজ কাপালি কথা শেষ করে পর-পর দু-গ্লাস জল খেলেন। তারপর ডায়েরিগুলো গোছা করে তুলে বেডসাইড টেবলে নামিয়ে রাখলেন।
ফ্রেঞ্চ-উইন্ডোর কাচের বাইরে শিয়ালদার স্টেশনবাড়ির চুড়োগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। কান পাতলে শুনতে পাচ্ছিলাম, ফ্লাই-ওভারের ওপর দিয়ে ছুটে চলা ট্রামের চাকার ঘর্ঘর শব্দ। সবই কত সহজ, কত স্বাভাবিক।
কিন্তু এও জানি যে, মাত্র কুড়ি-মিনিটের দূরত্বে অন্ধকারে ডুবে আছে গোরে বিবি কি মহল্লা। সেখানে সন্ধের অন্ধকারে গাছের ওপরে ফুলের মতন ফুটে থাকে সুন্দর এক মৃত-মেয়ে—বিশাখা। সেখানে দ্বৈতসত্তা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় হাসি মণ্ডল।
এসব তো আমার নিজের চোখেই দেখা।
আর যা দেখিনি, তার কথা এখন শোনালেন বিরাজ কাপালি। তিনি বললেন ইভা স্টাইনবেকের তৃতীয় স্তনের কথা।
প্রকৃতির রাজ্যে মানবীর তৃতীয় স্তনের মতন কিছু কি হয়? নাকি, ওই স্তনও সেই সমান্তরাল পৃথিবী থেকে কালো হাওয়ায় ভর করে ভেসে এসেছিল?
.
কোলের ওপরে নামিয়ে-রাখা একটা ছোট রুমাল দিয়ে ঠোঁটের কোনগুলো মুছে নিয়ে বিরাজ কাপালি আবার কথা শুরু করলেন। তাঁর মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম, তিনি আজ এই রাতের মধ্যেই আমাকে সব কিছু বলে যেতে চাইছেন। যেন তাঁর হাতে আর বেশি সময় নেই।
তিনি বলে চললেন…
সেই উনিশশো-একান্নর মার্চমাসে পাকাপাকিভাবে গৃহত্যাগের আগে দাদু তাঁর সমস্ত সম্পত্তি চার ছেলেমেয়ের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। স্থাবর-সম্পত্তি বলতে ছিল সার্পেন্টাইন-লেনের এই বাড়ি আর দমদমের কাছে ন’বিঘে জমি। দমদমের জমি তিনি তিন মেয়ে-জামাইয়ের নামে লিখে দিয়েছিলেন। বাবাকে দিয়ে গিয়েছিলেন এই বাড়ি, তবে বলে গিয়েছিলেন, সেটা তিনি পাবেন ঠাকুমা মারা যাওয়ার পরে। বাবা তাই পেয়েছিলেন। তার জন্যে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। দাদুর গৃহত্যাগের লজ্জা সহ্য করতে না পেরেই সম্ভবত, ঠাকুমা ঠিক তার পরেপরেই মারা যান।
এই বাড়ি ছাড়াও তিনি আমার বাবা বিশ্বনাথ কাপালিকে একটা বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। শুনেছি পরিমাণটা ছিল ন’লক্ষ। এত টাকা পেয়ে বাবা তো অবাক। কারণ, ব্যাভারিয়া ইন্ডাস্ট্রি যে খুব ভালো চলছে না সেটা তিনি জানতেন। তাহলে সোমেশ্বর কাপালি এতগুলো টাকা পেলেন কোথা থেকে? ছেলের প্রশ্নের উত্তরে দাদু বলেছিলেন, এনিমি প্রপার্টি ট্র্যান্সফারের ফলে তিনি সবেমাত্র ঢাকার কারখানা আর জমি বাবদ পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে ওই টাকা পেয়েছেন। তবে মনে হয় কথাটা মিথ্যে। আসলে তিনি হিরের ব্রোচ বিক্রি করে পেয়েছিলেন ওই টাকা।
এই ডায়েরিগুলো দাদু সঙ্গে করে কবরডাঙার কারখানায় নিয়ে গিয়েছিলেন এবং বহুদিন সেখানেই পড়েছিল। কাজেই আরও অনেক রহস্যের মতন ওই ন’লক্ষ টাকার রহস্যও আমার বাবার কাছে রহস্যই থেকে গিয়েছিল, যতদিন না তিনি নিজে ওই কারখানায় ঢুকে তত্ত্বতালাশ করে এগুলো হাতে পেয়েছিলেন।
যাই হোক, দাদু চেয়েছিলেন, ওই টাকায় বাবা নিজের ব্যবসা শুরু করুন। কিন্তু তা হয়নি। বাবা সারাজীবনে আর কোনো কাজই করেননি; বাবুয়ানি করেছেন। তবে সুরা, নারী বা ঘোড়দৌড়ের তামসিক বাবুয়ানি নয়। তাঁর ছিল সাত্ত্বিক নেশা। বইয়ের নেশা। পেন্টিং আর ভাস্কর্যের নেশা। দামি-দামি সুগন্ধী আর দেশি-বিদেশি পাখি পোষার নেশা। এইসবের পেছনেই তিনি অকাতরে ওই টাকা উড়িয়েছেন।
বাবার কথা পরে বলছি। আগে দাদুর কথা বলে নিই।
ওই যে বললাম, দাদু সার্পেন্টাইন-লেনের এই বাড়ির পাট চুকিয়ে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির ব্যারাকবাড়িতেই থাকতে শুরু করেছিলেন, কথাটা এতটুকু মিথ্যে নয়। প্রথম-প্রথম বাবা এবং আমার তিন পিসেমশাই অনেকভাবে তাঁকে ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কিছুতেই সেই কাজে সফল হননি।
তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবা এবং পিসেমশাইদের সেই চেষ্টায় ভাঁটা পড়েছিল।
স্বাভাবিক। টাকাকড়ি আর সম্পত্তির বিলিবন্দোবস্ত করে দিলে সংসারে একজন প্রৌঢ়ের আর কী দাম থাকে? আছেন তিনি নিজের মতন, থাকুন না। বরং পাড়ায় ফিরলেই তাঁর পরিবারকে আরো অস্বস্তিকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হত। এমনিতেই ‘সোমেশ্বর কবিরাজ বুড়োবয়সে একটি মেম-মাগির পাল্লায় পড়েছে’—এটাই ছিল তখন বৈঠকখানা বাজারের সবচেয়ে মুখরোচক কেচ্ছা। লোকটা চোখের আড়ালে থাকলে সেই কেচ্ছা থিতিয়ে আসবে, এরকমটাই সকলে ভেবেছিলেন।
খুব একটা ভুলও ভাবেননি। কারণ দেখা গেল সত্যিই, বছর ঘুরবার আগেই লোকজন সোমেশ্বর কাপালির কেচ্ছা ভুলে নতুন-নতুন বিষয়ে মেতে উঠল। পিসি আর পিসেমশাইদের এ-বাড়িতে আসা-যাওয়া কমতে-কমতে একরকম বন্ধই হয়ে গেল। বাবা তাঁর পড়ে-পাওয়া বড়লোকি নিয়ে মেতে রইলেন। ঠাম্মা বুকে পাথর বেঁধে এককোণে পড়ে থাকতে-থাকতেই একদিন হঠাৎ করে স্বর্গে চলে গেলেন আর আমার মা, তখন নতুনবউ, মনের সুখে একেশ্বরীর মতন সংসার করতে লাগলেন।
সেই-দাদু তাঁর নিজের বাড়িতে আবার ফিরে এলেন উনিশশো বাহান্নর জুলাই মাসে। অর্থাৎ পাক্কা একবছর চারমাস বাদে।
সেদিন সকাল থেকেই নাকি প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। এমন-যে জমজমাট কোলে-মার্কেট, সেই বাজারেও সেদিন জনমানুষ ছিল না। রাস্তায় এক কোমর জল। ট্রাম-বাস বন্ধ। তার মধ্যেই আমার মা শুনলেন, সদর দরজায় কে যেন কড়া খটখটাচ্ছে।
দরজা খুলে মা দেখলেন শ্বশুরমশাই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কিম্বা শ্বশুরমশাইয়ের প্রেত—অন্তত আমার মা সেরকমই ভেবেছিলেন। রক্তহীন ফ্যাকাশে চেহারা। তার ওপরে শরীরের ওপর দিয়ে ক্রমাগত বৃষ্টির জল বয়ে যাওয়ার ফলে গোটা গায়ের চামড়া যেন হেজে গিয়েছে। ধুতি আর পাঞ্জাবি গায়ের সঙ্গে লেপটে গেছে। দাদু সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টলছিলেন। মা দরজা খোলা মাত্রই দাদুর প্রাণহীন শরীরটা ওইখানেই লুটিয়ে পড়েছিল।
.
পুরো দৃশ্যটা মাথার মধ্যে থিতোতে একটু সময় লাগল। খুব স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল। কাপালি স্যারকে জিগ্যেস করলাম, মাঝের একবছর চারমাস আপনার দাদু কী করেছিলেন? ইভা স্টাইনবেকের বা তার সন্তানের কী হয়েছিল? কারখানাটারই বা কী হল তারপরে?
বিরাজ কাপালি বললেন, তোমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না। কারণ দাদু যখন মারা যান, তখন আমার বয়স মাত্র একবছর। কাজেই আমার স্মৃতিতে কিছুই ধরা নেই। আর বাবা-মা কখনো আমার সামনে সেসব কথা আলোচনা করেননি। মনে হয়, ওই কারখানায় বসবাসের সময়টুকুতে দাদু আর ইভা কী করেছিলেন না করেছিলেন তা বাবা কিম্বা মাও জানতেন না। এখানে বসে ওদের পক্ষে জানা সম্ভবও ছিল না।
ইভা স্টাইনবেকের কী হয়েছিল জিগ্যেস করছ? তিনি মারা গিয়েছিলেন। কীভাবে মারা গিয়েছিলেন কেউই সঠিক বলতে পারে না। তবে ওই কবরডাঙা রোডের ধারেই একজায়গায় তাঁর কবর আছে। আমার দাদুই বস্তির লোকেদের কাজে লাগিয়ে ওই কবর বানিয়েছিলেন।
মনে পড়ল সেদিনই সন্ধেবেলায় হাসিদি আমাকে একটা ইটে বাঁধানো বেদির কাছে নিয়ে গিয়েছিল। ওখানেই আমরা বসেছিলাম। তখন অবশ্য ওটাকে কবর বলে বুঝতে পারিনি।
কাপালি স্যার বলে চলেছিলেন—যারা কবর বানানোয় হাত লাগিয়েছিল, তাদের মধ্যে দু-একজন এখনো বেঁচে আছে। ট্যাংরা বস্তিতে সেরকম একজনের খোঁজ পেয়েছিলাম, নাম নাসিরুদ্দিন মিস্ত্রি। এখন তার বয়স প্রায় নব্বই-বছর, স্মৃতি অনেকটাই ঝাপসা হয়ে গেছে। তবু তার কথা শুনে মনে হল, দাদু যেদিন মারা গিয়েছিলেন, তার আগের দিনই মারা গিয়েছিলেন ইভা স্টাইনবেক। ইভাকে সমাধি দিয়ে দাদু শূন্য কারখানা থেকে নিজের সংসারে ফিরতে চেয়েছিলেন। পারলেন না। দরজার বাইরেই মারা গেলেন।
ইভার পেটের সন্তানটিও নিশ্চয় মারা গিয়েছিল। জন্মের আগে না পরে, জানি না। হয়তো আগেই।
বস্তির বাসিন্দাদের কাছে শুনবে, ইভা স্টাইনবেক এখনো ওই রাস্তায় ঘোরাফেরা করেন। মাঝরাতে ওই কবরের ওপরে তাঁকে বসে থাকতে দেখা যায়। সেই থেকেই লোকের মুখে-মুখে রাস্তাটার নাম হয়ে গেছে গোরে বিবি রোড।
আর কারখানার কথা জিগ্যেস করছ? ওই অভিশপ্ত কারখানার যা হবার কথা, তাই হয়েছিল। গত সত্তর-বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল। মজার কথা কী জানো, কলকাতার যে কুখ্যাত চোরেরা সুযোগ পেলে রেলগাড়ির কামরা অবধি পিস পিস করে খুলে নিয়ে গিয়ে বেচে দেয়, তারাও কখনো গোরে বিবি কি মহল্লার ওই কারখানার একটা ইটেও হাত দিতে সাহস পায়নি।
সত্তর-বছরের মধ্যে একবারই মাত্র সেই সাহস দেখিয়েছিলেন আমার বাবা—বিশ্বনাথ কাপালি। আমার তখন সতেরো বছর বয়স। তখনো স্কুলে যাতায়াত করতে পারতাম। জানতাম না, আর কয়েক-বছর বাদেই এই অসুখে পঙ্গু হয়ে যাব…
কথা বলতে-বলতে হঠাৎই তিনি থেমে গেলেন। চোখের দৃষ্টিতে শূন্যতা ঘনিয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম, নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভাবছেন। বাধ্য হয়ে বললাম, কী হয়েছিল?
কীসের কী হয়েছিল? চমকে উঠলেন বিরাজ কাপালি।
বললাম, আপনার সতেরো বছর বয়সে কী হয়েছিল?
হ্যাঁ। আমার যেহেতু তখন সতেরো বছর বয়স, কাজেই অনেককিছুই মনে আছে। বাবা-মার কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারতাম, চরম আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা। দাদুর দান করে-যাওয়া টাকা তলানিতে ঠেকেছে। ন্যাচরালি, বাবার তখন মনে পড়েছিল গোরে বিবি মহল্লার কারখানাটার কথা। নিজে ব্যবসা চালাবার কথা ভাবেননি, কারণ সেটা তিনি পারতেন না। অভিজ্ঞতা ছিল না। জমিটা বিক্রি করার কথাই ভেবেছিলেন।
মনে আছে, বাবা প্রসঙ্গটা উত্থাপন করা মাত্র মা প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিছুতেই তিনি বাবাকে ওই ভুতুড়ে জায়গায় যেতে দিতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু বাবা শোনেননি মায়ের কথা। তিনি দালাল-টালাল নিয়ে ওদিকে যাতায়াত শুরু করেছিলেন। কিন্তু তারপরে হঠাৎই তিনি খুব ভয় পেয়ে গেলেন।
ভয় পেয়ে গেলেন! কেন? কিছু দেখেছিলেন?
কিছু দেখেছিলেন কিনা জানি না। তবে ওই কারখানা-ঘরেই তিনি এই ডায়েরিগুলো ছাড়াও আরো কয়েকটা জিনিস খুঁজে পেয়েছিলেন। আর এইসব পড়ে আর দেখেই তিনি প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।
