পতঙ্গ সঙ্গম – ১০

দশ

এইসব ঘটনার পরে তিনটে বছর কেটে গেছে। তিন বছরে বাইরের দুনিয়ায় অনেক অদল-বদল ঘটে যায়। মানুষের মন অত সহজে বদলায় না।

দুর্গাপুরের কোক আভেন থানায় পুরোনো স্টাফেরা প্রায় কেউই আর নেই। সুধীর মাইতি এখন হুগলিতে পোস্টেড। বিপ্রদাস কলকাতায়।

প্রদীপ কামাথের ল্যাবরেটরি থেকে সেদিন পুলিশ যা-যা সিজ করে এনেছিল, কোর্টের নির্দেশে সবই রিলিজ করে দিতে হয়েছে। দীর্ঘদিন মামলা চলেছিল এবং হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ অবধি গড়িয়েছিল সেই মামলা। কিন্তু মহামান্য হাইকোর্টের বক্তব্য ছিল খুব পরিষ্কার। গবেষণার মধ্যবর্তী স্তরে একজন বিজ্ঞানীর হাত দিয়ে ক্ষতিকারক কোনো বাইপ্রোডাক্ট তাঁর অজান্তে তৈরি হয়ে যেতেই পারে। কিন্তু তিনি কি সেই ক্ষতিকারক প্রোডাক্ট বাজারে ছেড়েছেন? প্রয়োগ করেছেন কারুর ওপরে? তা যদি না হয়, তাহলে অপরাধটা কোথায়? দ্বিতীয়ত, ল্যাবরেটরিটার দায়িত্বে যখন ছিলেন প্রদীপ কামাথের মতন একজন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী, তখন তিতলি যাদবকে এর জন্যে দায়ী করা কষ্টকল্পনা করা ছাড়া আর কিছু নয়। আর, তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় ঘটনা হল ডক্টর কামাথ আর ইহলোকেই নেই। ফলে মামলার অভিযুক্ত কে?

মামলা ডিসমিস হয়ে গিয়েছিল। সামান্য হলেও কালো দাগ লেগেছিল সুধীর মাইতি এবং ইনভেস্টিগেটিং অফিসার বিপ্রদাস মণ্ডলের সার্ভিস রেকর্ডে।

বিজন উপাধ্যায় সেই শুট-আউটের ঘটনার তিন-মাসের মাথায় মারা গিয়েছিলেন। মৃত্যুটা এসেছিল বেশ আশ্চর্যজনক ভাবে।

সেদিনের শুট-আউটের পরে বিজন উপাধ্যায় ওরফে বিল্টুবাবুকেও বেশিদিন হাজতে ধরে রাখা যায়নি। পুলিশের ওপরে গুলি চালানোর অভিযোগে তার দুজন শাগরেদের সাজা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু বিল্টুবাবুর বিরুদ্ধে সেরকম জোরালো চার্জশিট দেওয়া যায়নি। কারণ প্রথম গুলিটা তার দলের লোকেরা চালায়নি, চালিয়েছিল থানার সেকেন্ড অফিসার বিপ্রদাস মণ্ডল। বিল্টুবাবু যে-তিনজন দুঁদে উকিলকে নিয়োগ করেছিলেন তাঁরা সওয়াল করেছিলেন, ভয় পেয়ে, আত্মরক্ষার জন্যে ওর সঙ্গীরা গুলি চালিয়েছিল। উপরন্তু অস্ত্রগুলোর লাইসেন্স ছিল।

তিনমাসের মাথায় জামিন পেয়েছিলেন বিল্টুবাবু। তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে মহা উৎসাহে কয়েকজন চ্যালাচামুণ্ডাও গাড়ি নিয়ে জেলখানার গেটে হাজির ছিল। কিন্তু বিল্টুবাবু সেদিন জেলখানার গেট থেকে বেরিয়ে, সোজা একটা চলন্ত ট্রাকের সামনে দু-হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। লোহার ট্রাকের চাকার নীচে তার শরীরটা পিষে গিয়েছিল।

বিপ্রদাস সেদিনের কাগজটা হাতে নিয়ে সুধীর মাইতির ঘরে ঢুকেছিল। বলেছিল, ‘খবরটা দেখেছেন, স্যার? আবার সুইসাইড। এও তিতলির সঙ্গে শুয়েছিল কিন্তু।’

সুধীর মাইতি বিপ্রদাসের দিকে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘ভুলে যাও। আউট অফ প্রোপোরশন কথাটা শুনেছ? এই কেসটা ছিল আউট অফ প্রোপোরশন। আমাদের নাগালের বাইরে। আমাদের মুঠোর চেয়ে অনেক বড়। আমরা কেন, পৃথিবীর ক’টা পুলিশ-ডিপার্টমেন্ট এই কেসকে সলভ করতে পারবে আমার সন্দেহ আছে। কাজেই জাস্ট ফরগেট ইট।’

বিপ্রদাস খবর পেয়েছিল, মৃত বিজন উপাধ্যায়ের ধর্মপত্নী যমুনা দেবী উপাধ্যায় আসানসোল কোর্টে মামলা দায়ের করেছেন, তিতলি যাদব নামে এক গণিকা তাঁর মৃত স্বামী বিজন উপাধ্যায়কে ভুল বুঝিয়ে তাঁর কয়েক কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছে। যমুনাদেবীর উকিলেরা তিতলির এগেইনস্টে জোর করে সম্পত্তি লিখিয়ে নেওয়ার এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ সাজিয়েছিলেন, কিন্তু কিছুই প্রমাণ করতে পারেননি। বরং উল্টোদিকে এমন অনেক প্রমাণ ছিল, যার থেকে মনে হয়, বিজন উপাধ্যায় তার বেশিরভাগ টাকা সজ্ঞানে বিদেশের কোনো গোপন অ্যাকাউন্টে ট্র্যান্সফার করে দিয়েছেন। কার নামে তা জানা যায়নি আর অভিযুক্তা তিতলি যাদবও নিখোঁজ। ফলে সেই কেসটাও ডিসমিস হয়ে গেছে।

তারপরেও তিন বছর কেটে গেল। তবু বিপ্রদাস কিছুতেই তিতলি যাদবের কথা ভুলতে পারে না। সমস্ত কাজের মধ্যে, সব অবসরের বেলায়, তাকে খেপিয়ে তোলে একটাই চিন্তা। তিতলি তাকে শুধু বোকাই বানিয়ে যায়নি, সারা জীবনের জন্যে খোঁড়া করে দিয়ে গেছে। গুঁড়িয়ে যাওয়া পায়ের হাড়গুলো কোনোদিনই আর আগের অবস্থায় ফিরবে না আর সে-ও কোনোদিন অ্যাক্টিভ-পুলিশ-সার্ভিসে যোগ দিতে পারবে না। তাকে ট্রেনিং-অ্যাকাডেমিতে ক্লাস নিতে হবে কিম্বা আর্মারির মতন নিরাপদ জায়গার দায়িত্ব নিয়ে একটা ঘরে চুপ করে বসে থাকতে হবে।

সে ভাবে, যদি কোনোভাবে একবার জানতে পারতাম আত্মহত্যাগুলোর সঙ্গে ওর যোগ ঠিক কোথায়, তাহলে দেখিয়ে দিতাম কত ধানে কত চাল।

শুধু এইজন্যেই বিপ্রদাস কাউকে না জানিয়ে একটা কাজ করেছিল। সে পটারি-বস্তিতে পয়সা দিয়ে একজন ইনফর্মারকে ফিট করেছিল। কাজটা সে পুলিশ হিসেবে করেনি। এটা তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা, খরচটাও সে করত নিজের পকেট থেকে। কারণ, কীভাবে যেন তার মনে হয়েছিল, যখন হোক, তিতলি একবার ওই ছেড়ে যাওয়া এঁদো ঘরটায় ফিরবে। একবছর হোক, দু-বছর হোক, দশবছর হোক। দরকার হলে সারা জীবন বিপ্রদাস অপেক্ষা করবে। ওই ঘরটায় একবার তিতলির মুখোমুখি হতে চাইছিল সে।

সেইজন্যেই বলেছিলাম, মানুষের মনের ভেতরটা অত সহজে বদলায় না।

তিনবছরের মাথায়, যখন বিপ্রদাস প্রায় হতাশ হয়ে পড়েছে, তখন একদিন বিকেলে সেই ইনফর্মার ছোকরা চুপিচুপি তার অফিসঘরে ঢুকে বলল, ‘স্যার, একজন মেয়েমানুষ ঘরটার তালা খুলে ঢুকেছে। কিন্তু তিতলিদিদি কিনা বলতে পারছি না।’

বিপ্রদাস অবাক হয়ে বলল, ‘সেকি রে! তোর তিতলিদিদিকে তো তিন মাইল দূর থেকে দেখলে চেনা যায়। চিনতে পারছিস না মানে?’

‘না স্যার। আপনি একবার গিয়ে দেখুন। অনেকটা তিতলিদিদির মতোই তো লাগল, কিন্তু।’ ছেলেটা আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা না করে বেরিয়ে চলে গেল। বিপ্রদাস তার দক্ষিণ কলকাতার অফিস থেকে মেট্রো ধরে দমদমে এসে নামল। তখন সন্ধে হয়ে গেছে। বছরের যে-ক’টা দিনে এই বস্তির গলিগুলোর মধ্যেও হাওয়া ঢোকে, সেরকম এক বসন্তের সন্ধে। বিপ্রদাস ঘরটার দরজায় নক করল। ভেতর থেকে নারীন্ট্রে উত্তর এল, ‘খোলা আছে। ঢুকে পড়ুন।’

বিপ্রদাস ভেজানো দরজাটা ঠেলে ঘরে ঢুকে আবার সাবধানে পাল্লাদুটো ভেজিয়ে দিল। ঘরে একটামাত্র চৌকি। তার ওপরে সস্তার বেডকাভার। আর একটা কাঠের চেয়ার। মহিলাটি ওই চৌকির ওপরে উপুড় হয়ে শুয়ে বই পড়ছিলেন। পা দুটো হাঁটু থেকে ভাঁজ করে রেখেছিলেন, তাই শাড়ি নেমে গিয়ে নিটোল দুই জঙ্ঘা উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল। যেন নরম পলিমাটি দিয়ে গড়া দুটো প্রদীপের পিলসুজ। তিনি একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। তারপরেই ধড়মড় করে উঠে বসলেন। বললেন, ‘ছোটবাবু! আপনি এই অভাগা তিতলিকে ভোলেননি? তাকে দেখতে এসেছেন! এ আমার কি সৌভাগ্য ছোটবাবু!’

বিপ্রদাস অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি তিতলি!’

‘বিশ্বাস হচ্ছে না? আমি যদি তিতলি না হই, তাহলে আপনাকে চিনলাম কেমন করে? বসুন। ওই চেয়ারটায় বসুন।’

বিপ্রদাস চেয়ারটায় বসে রুমাল বার করে কপালের ঘাম মুছল।

মহিলা বললেন, ‘আমিই তিতলি যাদব। অবশ্য এখন সমস্ত কাগজপত্রে আমার নাম টিমোথি র‌্যান্ডেল। মুখটা দেখে সন্দেহ করছেন তো। ও কিছু না। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি একটা ইনস্টিটিউটে প্লাস্টিক সার্জারি করিয়েছিলাম। সে-ও হয়ে গেল প্রায় আড়াইবছর।’

সত্যিই তিতলির মুখের সেই বিভৎস পোড়া দাগ অনেকটাই মিলিয়ে গেছে। এমনকি ডান চোখের খোবলানো জায়গাটাও খুব সুন্দর একটা নকল চোখ দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। খুব সুন্দর দেখতে লাগছে ওকে।

ব্যাপারটা বোধগম্য হওয়ামাত্র বিপ্রদাসের হতচকিত ভাবটা কেটে গিয়ে ফিরে এল সেই জমিয়ে-রাখা ঘৃণা। সে বলল, ‘দামি ইনস্টিটিউটে অপারেশনটা বিল্টুবাবুর টাকায় করিয়েছিলেন তো?’

‘ঠিক বলেছেন। তাছাড়াও মেলবোর্নে একটা ছোট বাড়ি আর লাইব্রেরি বানানোর খরচও উঠে গিয়েছিল। তবে তারপরেই হাত খালি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি তো প্যারাসাইট। নতুন হোস্ট খুঁজে বার করতে আমাদের সময় লাগে না। আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো, আপনি টিমোথি র‌্যান্ডেল কিম্বা হ্যারিস র‌্যান্ডেলের নাম শোনেননি, তাই না?’

বিপ্রদাস ঘাড় নাড়ল। বলল, ‘শোনা উচিত ছিল কি?’

তিতলি বলল, ‘না। আমারই ভুল। আপনার তো বায়োসায়েন্সের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। তবে প্যারাসাইটোলজির ফিল্ডে আমি আর আমার স্বামী দুজনে মিলে অনেকগুলো পাথ-ব্রেকিং কাজ করেছি। আমার স্বামীর নাম ছিল হ্যারিস র‌্যান্ডল। বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড় ছিলেন। ওঁর আন্ডারেই মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চ করেছিলাম।’

‘পাস্ট টেন্স ইউজ করছেন কেন?’ প্রশ্ন করল বিপ্রদাস।

‘উনি রিসেন্টলি মারা গেছেন। খুব প্যাথেটিক ডেথ। নিজের ল্যাবরেটরিতেই একটা জারের মধ্যে শ-খানেক পাহাড়ি কাঁকড়াবিছে রাখা ছিল। সেগুলো কীভাবে যেন ছাড়া পেয়ে ওঁকে ছেঁকে ধরেছিল। আশ্চর্যের বিষয়, উনি চেঁচাননি। আমি অবশ্য পুলিশকে বলেছিলাম, উনি প্রবল চিৎকার করেছিলেন। বলেছিলাম, আমি নিজেও বিছেগুলোকে তাড়াবার অনেক চেষ্টা করেছিলাম। আসলে করিনি। করিনি, কারণ হ্যারিস নিজেই জার খুলে ওগুলোকে নিজের গায়ে ঢেলে নিয়েছিল।’

বিপ্রদাস ব্যঙ্গের সুরে বলল, ‘তিননম্বর আত্মহত্যা?’

‘এগজ্যাক্টলি। প্রদীপ কামাথ। বিজন উপাধ্যায়। হ্যারিস র‌্যান্ডেল। তিনজন।’

‘তারপর?’

‘তারপর আর কী? আবার আমি কয়েক-লাখ ডলারের মালিক।’ তিতলি খিলখিল করে হেসে উঠল।

.

হাসতে-হাসতেই তিতলির মুখটা যেন কেমন করুণ হয়ে উঠল। সে এই প্রথম বিপ্রদাসকে ‘তুমি’ সম্বোধন করে বলল, ‘তুমি এত বেশি বোঝো কেন বিপ্রদাস? যদি বুঝতেই পারো, তাহলে এই সামান্য মুখপোড়া মেয়েটার ওপরে এত রাগই বা পুষে রেখেছ কেন? তুমি বুঝতে পার না, প্যারাসাইটদের নিজের ক্ষমতা নেই বলেই তারা প্যারাসাইট হয়। আমার নিজের কী ছিল বলো। কিছুই না। তাহলে আমি কী করব? আমার কি ভালো থাকার ইচ্ছে থাকবে না?’

বিপ্রদাস বলল, ‘শোনো তিতলি। ইচ্ছে থাকলেও আমি আর তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারব না। বুঝতে পারছি, তুমি এখন অনেক উঁচুতে উঠে গেছ আর আমি ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছি। শুধু একটা উপকার কর। একবার শুধু বলে যাও, আমি যা সন্দেহ করেছিলাম তা সত্যি। আজ কোলিগদের মধ্যে অনেকেই আমাকে ব্যঙ্গ করে। আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। বলে, আমি নাকি একটা গল্প বানিয়ে সবাইকে ছুটিয়ে মেরেছিলাম। তুমি বলো, ওগুলো গল্প ছিল না।’

তিতলি বিপ্রদাসের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘একেবারেই গল্প ছিল না। এবং আমি তোমাকে বলছি বিপ্রদাস, তোমার মতন ইনটেলিজেন্ট মানুষ, তোমার মতন স্টিলের নার্ভওলা পুরুষমানুষ আমি জীবনে দেখিনি। তুমি যা ভেবেছিলে সবই সত্যি। তোমার জন্যেই আমাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হল। এখানে থাকলে তুমি একদিন না একদিন আমাকে ধরতেই। তুমি জানো, আর কোথাও কোনো প্রমাণ না থাকুক, আমার শরীরের ভেতরে সব প্রমাণ পাওয়া যাবে। তুমি সেই রাস্তাই নিতে।’

বিপ্রদাসের মুখে অনেকদিন বাদে সুখের হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, ‘আমার ধারণাগুলো আমি বলে যাই, তিতলি। কোথাও যদি ভুল করি, তুমি আমাকে ধরিয়ে দিও।’

‘তুমি প্রথমে সিমবায়োটিকের ল্যাবরেটরিতে যৌনরোগের বীজাণুর জিন-এডিটিং করেছিলে। সেই বীজাণুগুলো হয়ে গেছিল অন্যরকমের ক্ষমতাসম্পন্ন প্যারাসাইট। তুমি নিজের শরীরে ওদের ঢুকিয়ে নিয়েছিলে।’

‘ওরা যৌনরোগের বীজাণুর মতনই তোমার যোনির মধ্যে বাস করে আর সঙ্গমের পর ছড়িয়ে পড়ে পুরুষমানুষের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে। তখন সেই পুরুষ শুধু তোমার কথাই শোনে। তোমার মঙ্গলকামনা ছাড়া তার মাথায় আর কিছুই থাকে না; নিজের ভালোমন্দের কথাও ভুলে যায়। অথচ বাইরে থেকে তাদের দেখলে কিছুই বোঝা যায় না।’

তিতলি সম্মতি জানিয়ে ঘাড় হেলাল।

বিপ্রদাস বলে চলল, ‘তুমি হয়তো অত তাড়াতাড়ি নিজের শরীরে ওদের ঢুকতে দিতে না। আরো কিছু সময় নিতে। চেষ্টা করতে, কোনো ভলান্টিয়ারের শরীরে অল্পমাত্রায় ওদের প্রয়োগ করে দেখতে। কিন্তু আমার ধারণা, তার আগেই প্রফেসর কামাথ তোমাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছিলেন।’

তিতলি বলল, ‘হ্যাঁ, আমি যে ওনার অ্যাবসেন্সে ল্যাবরেটরিটা ব্যবহার করছিলাম, সেটা উনি সেটা ধরে ফেলেছিলেন।’

বিপ্রদাস বলল, ‘বাধ্য হয়েই প্রফেসর কামাথকে বশ করার জন্যে ওর সঙ্গে তুমি সহবাস শুরু করলে। এটাও হয়তো ওই প্যারাসাইট-প্রদত্ত ক্ষমতা। তুমি কোনো পুরুষকে ডাকলে সে না করতে পারে না। তারপর তোমার শরীর থেকে বীজাণু ছড়িয়ে পড়ল ওঁর মাথায়। উনি তখন আর সবদিক দিয়ে স্বাভাবিক, শুধু তোমার কাছে ভেতরে-ভেতরে উনি ক্রীতদাস। এবার তুমি নিশ্চিন্তে তোমার গবেষণার বাকি কাজটা শেষ করার দিকে মন দিলে।’

তিতলির ঠোঁটের কোনায় একটা বিষাক্ত হাসি ছড়িয়ে পড়ল। বলল, ‘এইটুকুই চেয়েছিলাম বিপ্রদাস। যে বীজানুগুলো আমার মাকে মেরে ফেলেছিল, সেই বীজাণুগুলোকে দিয়েই আমি আমার একটার পর একটা ইচ্ছে পূরণ করব। ছোটবেলায় আমার মা যখন সুরেশ সিংকে শরীর দিত, তখন আমি এই নোংরা ঘরটার মেঝেয় উপুড় হয়ে শুয়ে দেখতাম, কেমন করে একটা ছোট্ট বোলতা তার চেয়ে দশগুণ বড় একটা আরশোলাকে শুঁড় ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আরশোলাটা বুঝতেও পারছে না যে, তার জন্যে কী বীভৎস মৃত্যু অপেক্ষা করছে। আমি চেয়েছিলাম ওই প্যারাসাইটদের মতনই মাইন্ড কন্ট্রোলের ক্ষমতা। এবং সেটা পেয়েছিলাম।’

বিপ্রদাস বলল, ‘কিন্তু ভাগ্য তোমাকে তখনই আরেকবার মারল। সুরেশ সিং তোমার মুখটা অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে গেল। লাকিলি, তুমি যেখানে গিয়ে উঠলে সেটা একটা প্রস-কোয়ার্টার এবং আবারো লাকিলি, সেখানে তুমি পেয়ে গেলে তোমার দ্বিতীয় শিকার বিজন উপাধ্যায়।’

তিতলি বলল, ‘বেচারা বিল্টুবাবু। সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র পুরুষ, যে একজন কুৎসিত মেয়ের জন্যে প্রাণ দিল।’

বিপ্রদাস তিতলির নিষ্ঠুর মন্তব্যটা হজম করতে একটুসময় নিল। তারপর বলল, ‘এইমাত্র জানলাম, শুধু টাকা নয়, তোমার ছোটবেলার স্বপ্ন পাণ্ডিত্য তার অধিকারও তুমি পেয়ে গিয়েছ তোমার এই প্যারাসাইটের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে। এনটিমোলজিস্টদের জগতেও তুমি আর ব্রাত্য নও। অবশ্য জানি না, ঠিক কোন পাপে মিস্টার র‌্যান্ডেলকে মরতে হল। ওঁর কানে কেন তুমি সুইসাইডের মন্ত্র দিলে। কেন উনি কাঁকড়াবিছের জারের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিলেন।’

তিতলি বলল, ‘উনি বীজাণুগুলোকে চিনে ফেলেছিলেন যে। নিজের শরীর থেকে ওদের সংগ্রহ করে ওদের জিন অ্যানালিসিস করিয়েছিলেন। আর বেশি দেরি করলে উনি আমাকে ধরিয়ে দিতেন।’

‘বুঝলাম। শুধু আজও যেটা বুঝতে পারি না, ওরা সুইসাইড করে কেন?’

তিতলির মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, ‘এটাই আমার আবিষ্কারের একমাত্র দুর্বল জায়গা। আমি অনেক চেষ্টা করেও এটাকে ঠিক করতে পারিনি। তিনমাসের বেশি আমার শরীরের স্বাদ না পেলে, প্যারাসাইট-আক্রান্ত পুরুষের শরীরের ভেতরের জীবাণুগুলো একরকমের হর্মোন ক্ষরণ করতে শুরু করে, যে-হর্মোন মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়। এটা আমি আন্দাজ করেছিলাম প্রদীপ কামাথের ঘটনায়। ভেবে দেখো, মৃত্যুর আগের তিনমাস উনি আমাকে পাননি। কনফার্মড হলাম বিল্টুবাবুর আত্মহত্যার কথা জেনে। হিসেব করো, আমার পালিয়ে যাওয়ার ঠিক তিনমাসের মাথাতেই ও সুইসাইড করেছিল। আর এই ফেনোমেননটাকে কাজে লাগালাম মিস্টার র‌্যান্ডেলের বেলায়। তিনটে মাস আমি ইচ্ছে করেই ওকে আমার শরীর ছুঁতে দিইনি। তারপরেই ও সুইসাইড করল।’

বিপ্রদাস চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বন্ধ ঘর। কোথাও কোনো জানলা দরজা খোলা নেই, তবু হঠাৎই একটা নেশা-ধরানো গন্ধে ঘরটা ভরে উঠল। তিতলির ডানচোখের নকল মনির ভেতর দিয়ে একটা নীলচে আলোর ঝলক বেরিয়ে এল।

বিপ্রদাস নাক কুঁচকে বলল, ‘এটা কীসের গন্ধ? সঙ্গমের রাসায়নিক আহ্বান? তোমার ব্যাকটেরিয়া-ইনফেক্টেড শরীর থেকে বেরোচ্ছে? ডাকছ আমাকে?’

তিতলি বোধহয় এই প্রথম নিজের অস্ত্রকে বিফল হতে দেখল। সে অবাক হয়ে বিপ্রদাসের দিকে তাকিয়ে রইল। বিপ্রদাস বলল, ‘শোনো তিতলি। মনে হচ্ছে, তোমার এই সম্মোহন তাদের ওপরেই কাজ করে যারা তোমাকে পেতে ইচ্ছুক। প্রফেসর কামাথ ছিলেন কামুক ধরনের মানুষ। বিজন উপাধ্যায়ও তাই। আর বৃদ্ধ প্রফেসর র‌্যান্ডেল তো তোমার মতন তরুণীর প্রেমে পাগল হয়েই ছিলেন। কিন্তু আমি তো তোমাকে ঘৃণা করি। আমার ওপরে তোমার সম্মোহন কাজ করবে না।’

তিতলি দু-পা এগিয়ে এসে বিপ্রদাসের হাত ধরে বলল, ‘এখন তাহলে কী করবে? তুমি কি আমাকে ধরিয়ে দেবে?’

বিপ্রদাস বলল, ‘জানি না কী করব। শরীরের অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। তার-ওপরে তুমি নিশ্চয় এখন আর ভারতের নাগরিকও নও। তোমার অনিচ্ছায় তোমার শরীরের পরীক্ষা তো আমরা কেউ করতে পারব না। আর সেটা না করলে প্রমাণও করা যাবে না যে তুমি আসলে একটি প্যারাসাইট।’

তিতলি হঠাৎ পাগলের মতন হাসতে শুরু করল। খিলখিল হাসিতে লুটিয়ে পড়ল বিছানার ওপরে। বিপ্রদাস ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল। অবাক হয়ে বললে, ‘কী হল?’

কোনোরকমে হাসি থামিয়ে তিতলি বলল, ‘তুমি আমাকে যত বড় গবেষক ভাবছ, তত বড় গবেষক আমি নই স্যার। আর তুমি নিজে যতটা মনস্তত্ত্ব বোঝো বলে ভাবছ, ততটা বোঝো না। না-হলে আমাকে একবার অন্তত জিগ্যেস করতে, আমি এই ঘরটায় আজ ফিরে এসেছি কেন।’

বিপ্রদাস অবাক হয়ে বলল, ‘এসব কথার মানেই তো আমি বুঝছি না।’

‘এই দেখো।’ তিতলি বিপ্রদাসের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে, ঘাড়ের ওপর থেকে চুলের গুছিটা দু-হাতে সরিয়ে ধরল। বিপ্রদাস দেখল, তিতলির ঘাড়ে একটা দগদগে ঘা। সে প্রশ্ন করল ‘এর মানে?’

‘মানে? মানে হচ্ছে, জেনেটিকালি মডিফাই করেও যৌনরোগের বীজানুগুলোর মধ্যে থেকে তাদের মূল চরিত্র পালটাতে পারিনি। হয়তো তারা প্যারাসাইটের মতন মাইন্ড-কন্ট্রোল শিখেছে, কিন্তু একইসঙ্গে মেয়েদের কুরে কুরে খেয়ে নিতেও পারে। আমার মাকে যেমন খেয়েছিল, আমাকেও ঠিক সেইভাবেই খাচ্ছে।

‘আমি খুব অসুস্থ বিপ্রদাস, বিশ্বাস কর। পৃথিবী জয়ের স্বপ্ন এ জীবনে আর পূরণ হবে না। কতদিন আর বাঁচব? এক মাস, বড় জোর দু-মাস। মরার আগে একবার আমার মায়ের ঘরটা দেখতে এসেছিলাম।’

তারপর হঠাৎই আকুল হয়ে বিপ্রদাসের বাহুটা আঁকড়ে ধরে তিতলি বলল, ‘আচ্ছা, আমি মরে যাওয়ার পরে তুমি কি সবাইকে সব কিছু বলে দেবে? আমার শরীরটা নিয়ে তোমরা কাটা ছেঁড়া করবে?’

বিপ্রদাস এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর খুব নিরাসক্ত গলায় বলল, ‘নাঃ! তার আর দরকার কী? শরীরটা ছাই হয়ে গেলে তার ভেতরের প্যারাসাইটগুলোও তো মরে যাবে, তাই না?’

তিতলির বাঁ-চোখ থেকে একটা জলের ফোঁটা গাল বেয়ে গড়িয়ে নামছিল। সেই অবস্থাতেই সে বলল, ‘ঠিক। ঠিক।’

.

সমাপ্ত