পাঁচ
সন্ধে সাড়ে আটটা। মোটামুটি যে-সময়ে টুনাই তার ছোট্ট হাতে প্লাস্টিকের ছুরি নিয়ে কেক কাটতে শুরু করল আর তার মতনই অনেকগুলো বাচ্চা বিপ্রদাসের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইতে শুরু করল ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ ডিয়ার তৃণাঞ্জনা’, সেই সময়েই তিতলি দেওয়াল-আলমারিটার পাল্লা খুলে, জামাকাপড়ের স্তূপ সরিয়ে, হাতটাকে বাড়িয়ে দিল আরো ভেতরে।
বাড়িটা জরাজীর্ণ, তাই ঠিক ওই-জায়গাটায় দেওয়ালের একটা ইট সরিয়ে ফেলতে তিতলির অসুবিধে হয়নি। এই বাড়িটায় ঢোকার পর প্রথমদিনেই গোপন ওই খুপরিটা বানিয়ে নিয়েছিল তিতলি।
ঠিক এরকমই একটা গোপন খুপরি ছিল তার পটারি-বস্তির ঘরে, দেওয়াল-আলমারির জামাকাপড়ের পেছনে। সুরেশ সিং বেহুঁশ হয়ে পড়লে মাঝেমাঝে ওর পকেট থেকে পয়সাকড়ি সরাত তিতলি। সেগুলো ওই খুপরির মধ্যে রেখে দিত সে।
ফুলবাগানের ফ্ল্যাটে দেয়াল ছিল খুব শক্তপোক্ত, তাই সেখানে তিতলি তার মূল্যবান জিনিসগুলোকে রাখত সোফার মোটা ফোমের গদির ভেতরে। তখন টাকাপয়সা আর গয়নাগাটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল একটা ষোলো জিবির পেনড্রাইভ।
ফুলবাগান থেকে সিমবায়োটিকে আসার পর মেয়েদের হস্টেলে সে যে-ঘরটা পেয়েছিল, সেখানে স্টিলের লকার ছিল। কম্বিনেশন-লক লাগানো লকার। তাই এসব ঝঞ্ঝাট পোয়াতে হয়নি। জিনিসগুলোকে সে ওই লকারেই রাখত। ততদিনে পেনড্রাইভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আরো দুটো জিনিস—
খুব স্লিক ডিজাইনের তিন ইঞ্চি বাই তিন ইঞ্চির একটা ক্রোমিয়াম প্লেটেড চ্যাপ্টা বাক্স। ওটা অরিজিনালি তাবাক ব্লন্ড পারফিউমের কৌটো। কাস্টমসের এক বড়কর্তা, যে সুরেশ সিং-এর মেহমান হওয়ার সুবাদে প্রায়ই তাকে ভোগ করত, সে তাকে ওই পারফিউমের সেটটা গিফট করেছিল। তিতলি পারফিউমের শিশি দুটো ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু কৌটোটা যত্ন করে রেখে দিয়েছিল। সিমবায়োটিকে আসার পরে ওটা ঠিক যেভাবে ভেবেছিল, সেইভাবেই তার কাজে লেগেছে। এখন ওটার মধ্যে রয়েছে তিনটে কাচের ভায়াল আর একটা ছোট সিরিঞ্জ।
দ্বিতীয় যে জিনিসটা তার গোপন সম্পদের তালিকায় যুক্ত হয়েছে, সেটা হল একটা আই-ফোন থার্টিন। এটাও তিতলির নিজের পয়সায় কিনবার ক্ষমতা হয়নি; ফুলবাগান থেকে পাততাড়ি গোটাবার সময় মরিয়া হয়ে জোগাড় করেছে। যিনি দিয়েছিলেন, তাঁকে এই রাজ্যের অনেকেই চেনে। কারণ, তুমুল স্মার্ট, সুদর্শন এবং মাঝবয়সি ওই ডাক্তারবাবু প্রায়ই টেলিভিসনে নানান আলোচনাসভায় যোগ দেন। ডাক্তারবাবুর শর্ত ছিল, তিনি সঙ্গমের আগে তিতলির পিঠে সিগ্রেটের ছেঁকা দেবেন। চেঁচানো চলবে না। তিতলি শর্তটা মেনে নিয়েছিল এবং পারিশ্রমিক হিসেবে ওই আই-ফোনটা পেয়েছিল।
আই-ফোনটা তিতলি কারুর চোখের সামনে ব্যবহার করে না। ওটা শুধু হ্যাকিং-এর কাজে লাগে।
হালকা-পাতলা ওই কৌটো, অ্যাপল ফোন এবং পেনড্রাইভ এই তিনটে জিনিস তিতলি কখনোই কাছছাড়া করত না। বাইরে বেরোলে ও জিনিসগুলোকে অন্তর্বাসের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে বেরোত।
সেদিনও জিনিসগুলোকে সঙ্গে নিয়েই সে সিমবায়োটিকের ক্যাম্পাসের বাইরে বেরিয়েছিল। ভাগ্যিস সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছিল। তাই তো ওগুলো এখনো তার কাছে আছে।
সিমবায়োটিকে তার ঘর, তার ফেলে আসা লকার, সবকিছুই নিশ্চয়ই এই তিনদিনের মধ্যে পুলিশের লোকেরা তোড়ফোড় করে দেখেছে। না দেখলে দু-একদিনের মধ্যেই দেখবে। তবে দেখলেও তিতলির কিছু যায়-আসে না। জামাকাপড়, বইখাতা আর গর্ভনিরোধক পিলের মতন নিরীহ কিছু জিনিসের বাইরে আর কিছুই পাবে না ওরা।
তিতলি একবার দেওয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল। সবে সন্ধে সাড়ে-আটটা। বিল্টুবাবু রাত দশটার আগে কোনোদিনই আসেন না। কাজেই এখন সে কিছু কাজ সেরে নিতে পারে।
সে ধীরেসুস্থে ঘরের দেওয়ালের সঙ্গে সাঁটিয়ে-রাখা চৌকিটার ওপরে একটা ল্যাপটপ খুলে বসল। ল্যাপটপ-টা সস্তার জিনিস, এখানে আসার পরে কিনেছে। এটাকে তিতলি স্লেটের মতন ব্যবহার করে। স্লেট থেকে চকখড়ির দাগ মোছবার মতন করে, এই ল্যাপটপ থেকে ও প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন ডিলিট করে দিয়ে ওঠে। যদি কিছু সেভ করে রাখবার প্রয়োজন হয় স্টোর করে রাখবার প্রয়োজন হয় তার জন্যে রয়েছে আই-ফোন কিম্বা পেনড্রাইভ।
সমস্যা হয় অন্য জায়গায়। সমস্যা করে তার নিজের স্মৃতিগুলো। নানান অপমান আর যন্ত্রণার স্মৃতি। ভাগ্যের কাছে বারবার হেরে যাওয়ার শোক। কাজ করতে বসলে তিতলির প্রথমে কিছুক্ষণ নিজের মনকে শান্ত করতে সময় লাগে। তারপর সে কাজ শুরু করতে পারে।
আজও তিতলির মনে পড়ছিল সদ্য পিছনে ফেলে আসা ঘটনাবহুল নটা মাসের কথা।
দুর্গাপুরে রওনা হবার আগে সে ফুলবাগানের ফ্ল্যাটটাকে সাঁওতালবাড়ির উঠোনের মতন নিকিয়ে পরিষ্কার করে দিয়ে বেরিয়েছিল, যাতে কেউ তার চিহ্ন না খুঁজে পায়। এমনিতে ওই ফ্ল্যাটের মালিকানা থেকে ইলেক্ট্রিক-মিটার, গ্যাসের কানেকশন সবই ছিল সুরেশ সিং-এর এক চাকরের নামে। কাজেই ওই ফ্ল্যাটের সঙ্গে তিতলির যোগাসূত্র খুঁজে বার করা কারুর পক্ষেই সম্ভব নয়।
একমাত্র যার কাছ থেকে কেউ কিছু জানতে পারত, সেই সুরেশ সিংকে যে গোরখনাথ সেদিন রাত্রেই হাপিস করে দেবে, সে-ব্যাপারে তিতলির সন্দেহ ছিল না। পটারি-বস্তিতে থাকার সময় সে অনেকবার এরকম জলজ্যন্ত ইনসানকে হাপিস হয়ে যেতে দেখেছে। ওটা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়।
তাই যদি হয়, তাহলে অংশুমান ছাড়া আর কে তাকে খুঁজবে? আর অংশুমানের দম তার জানা ছিল। ও প্রেমিকা হারিয়ে যাওয়ার শোকে ছাদে উঠে তারা গুনতে পারে, দুটো কবিতা লিখতে পারে। কিন্তু থানা-পুলিশ করা কিম্বা তিতলির সহপাঠী অথবা হেড অফ দা ডিপার্টমেন্টের কাছে গিয়ে তিতলির খোঁজ নেওয়ার দম ওর যে হবে না সেটা তিতলি জানত। এমনিতেই ও অত্যন্ত আনস্মার্ট একটা লোক; তার ওপরে রিসেন্টলি তিতলি ওকে দিয়ে যে পাপকাজটা করিয়েছিল, তারপর থেকে ধরা পড়ার ভয়ে একেবারে শামুকের মতন নিজেকে খোলশের মধ্যে গুটিয়ে নিয়েছিল অংশুমান।
অংশুমান মানে অংশুমান দত্ত। বায়োসায়েন্স ডিপার্টমেন্টের কেয়ারটেকার… তখনো অবধি যে ছিল তিতলির সবচেয়ে বড় মুরগি। সামান্য শরীরের ছোঁয়াতেই যে তার জন্যে হাট করে খুলে দিয়েছিল অ্যাডভান্সড ল্যাবরেটরির দরজা। দিনের পর দিন অংশুমানের ঠোঁটে একটা চুমু দিয়ে, নিজের ব্লাউজের মধ্যে ওর হাতদুটো একবার ঢোকাতে দিয়ে, বদলে তিতলি ওর কাছ থেকে চাবি নিয়ে ঢুকে গেছে সায়েন্স-কলেজের রিসার্চ-ফেলোদের জন্যে সংরক্ষিত ল্যাবরেটরিতে। হ্যাক করেছে একের পর এক কম্পিউটারের ক্ল্যাসিফায়েড ডাটা।
সিমবায়োটিকে জয়েন করার পরে প্রদীপ কামাথ ওকে অনেকবার আড়েঠাড়ে জিগ্যেস করেছে এসব ইনস্ট্রুমেন্টের সঙ্গে ও কোথায় পরিচিত হল? কোথায় পেল জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাম্প্রতিকতম আবিষ্কারের হদিশ? প্রত্যেকবারই তিতলি তানা-না-না করে কাটিয়ে গেছে। আসল উত্তরটা ছিল ওই বেওকুফ অংশুমানের কাছে। সবচেয়ে হাসির কথা, অংশুমান ভাবত তিতলি ওর প্রেমে পড়েছে চল্লিশোর্ধ সংসারী মানুষ অংশুমান দত্তের প্রেমে!
একা অংশুমানকে দোষ দেওয়া যায় না অবশ্য। তিতলি জানে, ওর চোখেমুখে এমন একটা গ্রাম্য সরলতা ছিল, যা দেখে অনেক পুরুষমানুষই ভেবে নিত যে, তাকে ইমপ্রেস করা খুব সহজ। অংশুমানও সেই একই ভুল করেছিল। বেচারা অংশুমান।
এইসব কথা ভাবতে-ভাবতেই তিতলি অন্যমনস্কভাবে ল্যাপটপটাকে অন করল। স্ক্রিন-সেভার হিসেবে একটা ছবি ফুটে উঠল। মাইক্রোলেন্সে তোলা ছবি একটা গঙ্গাফড়িং জলের দিকে লাফ মেরেছে, যেন সুইসাইড করছে।
সত্যিই তাই করছে কিন্তু। ওকে আত্মহত্যা করাচ্ছে যে, তার চেহারাটা প্রায় আণুবীক্ষণিক, কিন্তু নামটা রামপালতিলকসিং-এর থেকেও কঠিন। ওরা স্পিনোকর্ডোডেস্টিলিনি নামে একজাতের জলের পোকার লার্ভা একদম প্রথম-সারির এক প্যারাসাইট।
ঝিঁঝি আর গঙ্গাফড়িং-এর মতন পোকামাকড় জল খাবার সময় ওই লার্ভাগুলোকেও খেয়ে ফেলে। এরপরেই শুরু হয় স্পিনোকর্ডোডেস্টিলিনির খেলা। একবার ফড়িং-এর পেটের মধ্যে পৌঁছে গেলেই সেই সুতোর মতন লার্ভাগুলো বাড়তে শুরু করে। কিন্তু শুধু বেড়ে উঠলেই তো হবে না, বড় হওয়ার পরে তাকে তার আসল বাসা, অর্থাৎ জলে ফিরে যেতে হবে। তাই স্পিনোকর্ডোডেস্টিলিনি সত্যিকারেই গঙ্গাফড়িং বা ঝিঁঝিকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করায়। পেটের মধ্যে পরজীবী নিয়ে বেচারা ফড়িং জলে ঝাঁপ মারে আর তার শরীর থেকে বেরিয়ে জলের পোকা জলে ফিরে যায়।
‘মাইন্ড-কন্ট্রোল।’ ফিসফিস করে তার প্রিয় শব্দটাকে কয়েকবার উচ্চারণ করল তিতলি। আবার ল্যাপটপের দিক থেকে তার মন ঘুরে গেল।
কত সুন্দরভাবে এগোচ্ছিল তার মাইন্ড-কন্ট্রোলের প্রোজেক্ট; তার প্যারাসাইট হয়ে যাবার সাধনা। একদিকে প্রদীপ কামাথের জ্ঞানভাণ্ডার মামুলি হ্যাকিং-এর জোরে যার চাবি, মানে পাসওয়ার্ড, ততক্ষণে তিতলির করায়ত্ব। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় ইনস্ট্রুমেন্ট আর ‘র-মেটেরিয়াল’, সবই আসছিল সিমবায়োটিকের পয়সায়। প্রদীপ কামাথের নামেই আসছিল, কিন্তু ব্যবহার তো করছিল তিতলিই।
অতএব ফেব্রুয়ারি শেষ থেকে মে, এই তিনমাসের মধ্যে তিতলি যা চাইছিল, তা আবিষ্কার করে ফেলল। সে-এক ভয়ঙ্কর আবিষ্কার। কিন্তু তার কথা কাউকে বলা যাবে না। এমনিতেই জিন-মডিফিকেশনের ওপরে সারা পৃথিবীর বৈজ্ঞানিকদের শ্যেনদৃষ্টি থাকে, কারণ কাজটা প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ তো বটেই। তার আলটিমেট রেজাল্ট মানবজাতির পক্ষে ভালো হবে কি মন্দ, সেটা কে বলতে পারে? তার ওপরে এই-ক্ষেত্রে তিতলির উদ্দেশ্যটাকে মোটেই সৎ বলা যায় না।
না বলতে পারলে বয়েই গেল। তিতলি একা ভোগ করবে বলেই তো জিনিসটাকে বানিয়েছিল। কিন্তু তার পর থেকেই শুরু হল সমস্যা। জুনমাসের শুরুতেই একদিন প্রদীপ কামাথ নিজের ডাটা-ব্যাঙ্ক ঘাঁটতে গিয়ে হ্যাকিং-এর ব্যাপারটা ধরে ফেলল। যে-তাস তিতলি এই দেশের মধ্যে ফেলবে না বলেই স্থির করে রেখেছিল, সেই তাস তাকে ফেলে দিতে হল। একটা সাদা আরশোলার মতন সুড়সুড় করে প্রদীপ কামাথ উঠে এল নীলপরীর প্রসারিত দুই উরুর মাঝখানে।
কাজটা সম্ভব হল ওই আবিষ্কারের প্রভাবেই। নাহলে এমনিতে সম্ভব ছিল না। কারণ, প্রদীপ কামাথ লোকটা সাদা চামড়ার মেয়ে ছাড়া শুত না। নিজের বউয়ের সঙ্গেও না। তার আগের তিনমাসে কতবারই তো সে তিতলির আর্টিফিসিয়াল ইনসেমিনেসন ঘটিয়েছে। যদিও সবসময়েই পাশে একজন নার্স থাকত, তবু প্রতিবারই তার ভ্যাজাইনার মধ্যে সিরিঞ্জ দিয়ে স্পার্ম পুশ করেছে তো ওই প্রদীপ কামাথই। কই, একবারের জন্যেও তো তার হাত কাঁপেনি।
সেদিন কাঁপল।
তার আগে অবশ্য বেশ কয়েকটা ঘটনা ঘটল। প্রথমত নার্স মহিলাটি হঠাৎই কেমন যেন ঘেমেটেমে অস্থির হয়ে উঠলেন। বললেন, তিনি একটা অস্বস্তিকর গন্ধ পাচ্ছেন। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, ল্যাবরেটরির কোনো যন্ত্র থেকে গ্যাস লিক করছে, যদিও সেক্ষেত্রে অ্যালার্ম বাজার কথা। বাজেনি।
প্রদীপ কামাথ তাঁকে দাবড়ানি দিয়ে বলল, ‘কী আবোলতাবোল বকছেন! গন্ধ একটা আমিও পাচ্ছি বটে, বাট ইট ইজ কোয়াইট অ্যালিওরিং। নেশা-ধরানো গন্ধ। যাই হোক, শরীর খারাপ লাগলে আপনি চলে যান। প্রসিডিওরটা আমি একাই সামলে নেব।’
তিতলি দুধসাদা চাদরে ঢাকা বিছানার ওপরে শুয়ে সবটাই খেয়াল করছিল। তার ঠোঁটে ফুটে উঠেছিল রহস্যময় এক হাসি। নার্সটি বেরিয়ে যাবার পরে প্রদীপ কামাথ প্রতিদিনের মতন ফ্রিজ থেকে একটা কাচের ভায়াল বার করে, সিরিঞ্জের মধ্যে সংরক্ষিত পুরুষ-বীর্য টেনে নিয়েছিল। তারপর পায়ে-পায়ে তিতলির দিকে এগিয়েও এসেছিল। কিন্তু ওই অবধিই। তারপরেই তার হাতদুটো হঠাৎই থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। মুখটা রক্তচাপে লাল হয়ে উঠল আর সারা কপালে ফুটে উঠল বিন্দু বিন্দু ঘাম। সিরিঞ্জটা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, নিজের অ্যাপ্রনের বোতামগুলো দ্রুতহাতে খুলতে শুরু করল প্রদীপ কামাথ।
তিতলির ঠোঁটের হাসিটা আরো একটু প্রসারিত হল। চোখের মণির মধুবনী আকাশে ঝলসালো বিদ্যুৎ। সে বুঝতে পারছিল, তার গবেষণার প্রথমভাগকে এখনই সফল বলা যায়।
বিছানার মাথার কাছেই একটা বেসিন ছিল। মুখের ভেতর থেকে একটা চিবোনো চিউইংগাম বার করে তিতলি সেটাকে হাত বাড়িয়ে বেসিনের মধ্যে ফেলে দিল। চিউইংগামটা সাধারণ চিউইংগামই ছিল। কিন্তু ওটা চিবোনোর ফলে ওর মুখে যে-লালা জমেছিল, সেটা সাধারণ লালা ছিল না।
গত তিনমাস ধরে তিতলি নিজের শরীরটাকে নানাভাবে বদলে ফেলেছে। তাই ওর মুখের লালাতেও এখন একধরণের উদ্বায়ী অ্যালিফ্যাটিক অ্যাসিডের প্রাবল্য। পুরুষের কাম-জাগানো গন্ধটা ওই লালা থেকেই আসছিল। নার্সটি যেহেতু নারী, তাই গন্ধটা তার কাছে অসহ্য ঠেকছিল। প্রদীপ কামাথ যেহেতু পুরুষ, তাই সে গন্ধটার মাদকতায় সম্মোহিত।
চিউইংগামটা মুখ থেকে ফেলে দিয়ে, তিতলি প্রদীপ কামাথকে বলল, ‘স্যার! একটু ওয়েট করুন। আগে বলরাম রায়কে বলুন, সি.সি. টিভি অফ করতে। যদি প্রশ্ন করে কেন, বলবেন যেহেতু নার্স ভদ্রমহিলার শরীর খারাপ হয়েছে, তাই আপনাকে বাধ্য হয়েই আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ একা থাকতে হচ্ছে। আপনি চান না ঘটনাটার কোনো রেকর্ড থাকুক। আর ঘরের লাইটটাও নিভিয়ে দেবেন।’
এইখানটায় একটু ভুল হয়ে গিয়েছিল তিতলির। কটের চারিপাশে কার্টেনটা সে টেনে দেয়নি। অবশ্য ভুলও ঠিক বলা যায় না ওটাকে। কামাথ যেভাবে মুহূর্তের মধ্যে তাকে শরীরের নীচে চেপে ধরে ঠোঁটদুটো কামড়ে ধরেছিল, তাতে তার আর কিছু করার উপায় ছিল না। শুধু বিদ্ধ হওয়ার আগে নিজের পাতলা শালোয়ারটা ওই দরজার পাশের এমার্জেন্সি-লাইটটার ওপরে ছুঁড়ে দিতে পেরেছিল। ওই আলোটাকে ঘরের ভেতর থেকে নেভানো যায় না।
ওই প্রথম রাতে তিতলি যে সামান্য ভুলটুকু করে ফেলেছিল, তাই নিয়েই নাকি পরে একটু শোরগোল উঠেছিল। সিকিউরিটি ডেস্কের কোন একটা উজবুক নাকি ওদের পাপকাজটা দেখে ফেলেছিল। বলরাম রায় অবশ্য লোকটাকে সঙ্গেসঙ্গেই দূর করে দিয়েছেন। যাই হোক, এগুলো মাইনর ইস্যু। কেউ জানবে না।
যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল, প্রদীপ কামাথের পুরুষাঙ্গ তার শরীরে প্রবেশ করার চব্বিশ-ঘণ্টার মধ্যে তিতলি বুঝতে পেরেছিল, তার গবেষণার দ্বিতীয়ভাগও সফল। আর শুধু একটা পর্যায়ের কাজই বাকি ছিল। সেই কাজটুকু শেষ করতে পারলেই তিতলি যাদব বিশ্বজয়ে বেরোতে পারত। কিন্তু ভাগ্য যার খারাপ, তার কোনো কাজই কি সহজে হয়?
তিতলিরও হল না।
.
হল কি, অগাস্ট-মাসের আঠারো-তারিখ সন্ধেবেলায় তিতলি বেনাচিতি বাজারে গিয়েছিল কিছু জিনিস কিনতে। একাই। ক্যাম্পাসের অন্যান্য লোকজনের সঙ্গে সে খুব একটা মেলামেশা করত না। মানুষ বড় কৌতূহলী জীব। কৌতূহল জিনিসটা তিতলির মতন মেয়ের পক্ষে ক্ষতিকর।
বাজার করে ফেরার পথে তার মোবাইলে একটা কল এল।
স্ক্রিনে নামটার দিকে তাকিয়ে তিতলির হার্ট দুটো বিট মিস করল। গোরখনাথ! সকেট গোখরো।
এই ফোনটার জন্যেই তো সে কতদিন ধরে অপেক্ষা করছে। কতবার ভেবেছে একবার এই নম্বরে ফোন করে গোখরোকে জিগ্যেস করে, হ্যাঁ রে, সব কাজ ভালোয়-ভালোয় মিটেছে তো। তবু শেষ মুহূর্তে হাত সরিয়ে নিয়েছে। ফোন করা মানেই রেকর্ড থেকে যাওয়া।
কলটা রিসিভ করেছিল তিতলি। খুব চাপা গলায়, টিপিকাল বালিয়া জেলার জবানে গোখরো বলেছিল, ‘পাশের গলিটার মধ্যে ঢুকে পড়, তিতলি। আমি তোকে দেখতে পাচ্ছি। এতদূর ছুটে এসেছি মানে বুঝতেই পারছিস, কথাটা জরুরি।’
তিতলি সন্দেহ করেনি। ঢুকে পড়েছিল সেই অন্ধকার গলিটায়। দু-পা দূরে একটা অ্যাম্বাসাডর পার্ক করা ছিল। তিতলিকে দেখামাত্রই সেই অ্যাম্বাসাডর থেকে দুটো ছেলে নেমে এসেছিল। তাদের মধ্যে একজন ওর মাথার পেছনে ভারী কিছু দিয়ে সপাটে মেরেছিল। জ্ঞান ফেরার পর তিতলি দেখেছিল, তাকে একটা সরু কাঠের বেঞ্চির ওপরে পিছমোড়া করে বেঁধে ওরা শুইয়ে রেখেছে। আর সকেট গোখরো নয়, তার মুখের ওপরে ঝুঁকে আছে সুরেশ সিং।
‘অবাক হয়ে গেছিস, তাই না তিতলি?’ তিতলিকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে প্রাণ খুলে হাসছিল সুরেশ সিং। ‘ভেবেছিলিস, এতদিনে কোনো জলার পাঁকের নীচে পচে গলে মিশে গেছি, তাই না?’
ঘরটা ছিল ভাঙাচোরা। একটাই কম পাওয়ারের বালব জ্বলছিল। সেই আলোতে তিতলি দেখেছিল সেই ছেলেদুটোও ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ওরাও খুব মজা পাওয়ার ভঙ্গিতে হাসছিল।
তিতলি বুঝতে পারছিল কী হতে চলেছে। তবুও একবার শেষ চেষ্টা করেছিল সে। চোখেমুখে যতটা সম্ভব সরলতা ফুটিয়ে বলেছিল, ‘আপনি কী বলছেন সুরেশচাচা, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। হ্যাঁ, দুর্গাপুরে আসার আগে আপনাকে একবার বলে আসা উচিত ছিল। কিন্তু আপনি যদি বারণ করেন সেই ভয়ে…।’
‘খামোশ!’ হঠাৎই হাসি থামিয়ে চিৎকার করে উঠেছিল সুরেশ সিং। আঙুল তুলে বলেছিল, ‘ওই যে ছেলেটাকে দেখছিস, ও ছিল গোখরোর দলের মধ্যে আমার ঢুকিয়ে-রাখা ইনফর্মার। তোর সঙ্গে গোখরোর যা-যা কথা হয়েছিল, সব ও আমাকে ডিটেইলসে বলে দিয়েছিল। সেইজন্যেই সেদিন জানে বেঁচে গিয়েছিলাম। তোর মায়ের মৃত্যুদিনে গেছিলাম অবশ্য। রাত দশটাতেই ফুলবাগানে গিয়েছিলাম। তবে একা যাইনি।’
কিছুক্ষণ চুপ করে তিতলির ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল সুরেশ সিং। তারপর সাফারির বুকপকেট থেকে একটা কালার্ড ফোটোগ্রাফ বার করে তিতলির মুখের সামনে এনে বলেছিল, ‘এই নে। দেখে নে তোর নাগরের ছবি।’
তিতলি দেখেছিল, সকেট গোখরোর দুটো-চোখই সকেট থেকে বেরিয়ে দুই গালের ওপরে ঝুলছে। ওকে মারার পর নিজের হাতে ওর চোখ উপড়ে নিয়েছিল সুরেশ।
ছবিটা দেখেই তিতলির ভীষণ গা গুলোচ্ছিল। তবু কোনোরকমে বলেছিল, ‘এ কে? একে আমি চিনি না। আমার প্রেমিক যদি কেউ থাকে তাহলে সে আপনিই, সুরেশচাচা। আপনার কাছেই আমার কুমারী-মন জমা রেখেছিলাম। কতদিন আপনি আমাকে আদর করেননি। আপনি কি আজ আরেকবার?’ তিতলি প্রাণপণে চেষ্টা অরছিল মুখে লালা আনতে, কিন্তু পারছিল না। ভয়ের চোটে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল।
সুরেশ সিং মন দিয়ে ওর কথাগুলো শুনল। তারপর হাসল, তবে জোরে নয়। ওর এবারের হাসিটার মধ্যে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে একটু বিষণ্ণতাও যেন মিশে ছিল। হাসতে-হাসতেই সে বলল, ‘না রে তিতলি। তোকে যদি নিজে রেপ নাও করি, এই ছোকরা দুটোকে বলতে পারতাম করতে।
কিন্তু এই যে কোঠিটা দেখছিস, ষাট বছর আগে এখানে আমার মা শরীর বেচত। তখন স্টিল প্ল্যান্ট সবে চালু হচ্ছে। এই কোঠিতেই বেজন্মা সুরেশ সিং-এর জন্ম। তাই এই কোঠির ছাদের নীচে আমি কোনো অওরৎকে নাঙ্গা করতে পারব না। আর রেপ তো তোর মতন মেয়ের পক্ষে খুব ছোট শাস্তি, তাই না? তোকে জানে মেরে দিতে পারতাম। তবে সেটাও কিছু না। তোর জন্যে আমাদের অন্য প্ল্যান আছে। এই! শুরু কর!’
শেষের কথাগুলো সুরেশ ওর সঙ্গী ছেলেদুটোকে উদ্দেশ্য করে বলল। ওদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে তিতলির মাথার মাথার নীচে একটা প্লাস্টিকের শীট গুঁজে দিল। অন্যজন একটা বোতল নিয়ে ওর পাশে এসে দাঁড়াল। তিতলি ততক্ষণে বুঝে গেছে, কী হতে চলেছে। ও চিৎকার করতে শুরু করেছিল। তবে এক-দুবারের বেশি গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয়নি। তারপরেই সুরেশের সঙ্গীরা ওর মুখের একদিকে অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছিল।
ঠিক কতদিন বাদে জ্ঞান ফিরেছিল তা জানে না তিতলি। এই কোঠিতেই ওর জ্ঞান ফিরেছিল। কোঠির মাসিকে জিগ্যেস করলে মারতে আসে। বলে, ‘তুই কি চাস আমার মুখেও সুরেশ সিং অ্যাসিড ঢেলে দিয়ে যাক?’
তবে জ্ঞান ফেরার পরে তিতলি প্রথমেই ঘরের মধ্যে যে কমবয়সি মেয়েটিকে দেখতে পেয়েছিল, তার কাছে একটা আয়না চেয়েছিল। মেয়েটি দেয়নি। ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে তিতলি আই-ফোনটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিন-সেভার হিসেবে তার নিজের মুখের ছবিই সেভ করা আছে। অ্যাসিড অ্যাটাকের পরের মুখ।
কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তিতলি। টাইমটাও একবার ওই ফোনে স্ক্রিনেই দেখে নিল। পৌনে-দশটা। বিল্টুবাবু এখনই চলে আসবেন; আজ আর কাজ হবে না। অবশ্য কাজ আর কী? বসে বসে এটা-ওটা ডিজাইন করা। এখানে কোথায় ল্যাবরেটরি আর কোথায় ইনস্ট্রুমেন্টস?
তিতলি স্বগতোক্তি করল, ‘বেরোতে হবে, তিতলি যাদব। খুব শিগগিরই তোমাকে এখান থেকে বেরিয়ে পড়তে হবে। রসদ তো জোগাড় করেই ফেলেছ। তাহলে আর দেরি করছ কেন?’
তারপর পেনড্রাইভ, সেলফোন, ভায়ালের কৌটো সবকিছু আবার চোরাকুঠুরিতে ঢুকিয়ে রেখে সে বিছানার চাদরটা টানটান করে পাততে শুরু করল।
