নয়
তারপর আরো তিনটে দিন কেটে গেছে। কারখানা আর ব্যারাকবাড়ির পরিবেশটা উত্তরোত্তর কেমন যেন গুমোট হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনটা যে আমার কল্পনা নয়, সেটা ওদের তিনজনকে দেখলে বুঝতে পারি। যেমন, কয়েকদিন আগে হাসিদি হঠাৎ আমাকে বলল, সবকিছু কেমন যেন বদলে যাচ্ছে, তাই না?
আমি বললাম, মানে?
ও বলল, কিছুদিন আগে অবধিও মনে হত আমার শরীর-মনের মালিক আমি নিজে। এখন মনে হয় কে যেন ভেতর থেকে আমার দখল নিয়ে নিচ্ছে।
হাসিদির কথা শুনে আমি চট করে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পঙ্কজদা আর বিশাখার দিকে তাকালাম। সেটা হাসিদির চোখ এড়ালো না। হাসিদি আজকাল খুব কমই হাসে। তবু তখন একবার হেসে উঠল। হাসতে-হাসতেই বলল, হ্যাঁ, ওরাও। ওরা আমাকে বলেছে, মনে হচ্ছে যেন কেউ খুব কাছে…একেবারে বুকের ভেতরে এসে দাঁড়িয়েছে। তোমারও কি এরকমই মনে হচ্ছে, রুদ্র?
আমি বললাম, আমার ভেতরে একজন তো অনেক আগেই থেকে রয়েছেন। তবে হ্যাঁ। ইদানিং তাঁকে খুব স্পষ্ট করে টের পাই।
কাল থেকে মাঝে-মাঝে শুধু কাচ কারখানার মাথার ওপরের আকাশে বারুদ-রঙের মেঘ জমা হচ্ছে। পঙ্কজদার শরীরের ঘন বাদামি লোমের ভেতরে চিরচির শব্দ করে স্ট্যাটিক-ইলেকট্রিসিটির নীল আগুন দৌড়োদৌড়ি করে। বোবা মানুষটা অসহায়ের মতন আকাশে মুখ তুলে আর্তনাদ করে ওঠে—ওওওউউউ ওহ ওহ ওহ!
সুন্দরী বিশাখা মাথা নীচু পা ওপরে করে বিশাল টিকটিকির মতন কুঁয়োর দেয়াল বেয়ে সরসর করে নীচে নেমে যায়। একটু বাদে আবার ঠিক টিকটিকির মতই দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠে আসে। তখন ওর সর্বাঙ্গ ভিজে সপসপ করে। ওর চুল থেকে, ওর সাদা কাপড়ের থান থেকে মোটা হয়ে জলের ধারা ঝরে পড়ে। সেই অবস্থাতেই ও কারখানা-ঘরের দরজা ঠেকে ভেতরে ঢুকে যায়।
কেন যায়, কার কাছে যায়, কে জানে। তবে তখনকার মতন মেঘ কাটে। শুধু কারখানা-চত্বরের মধ্যে স্থায়ী একটা গুমোট ভাব থেকেই যায়। ঝড়ের আগে যেমন গুমোট হয়ে থাকে, ঠিক সেইরকম।
দুদিন আগেও পালাবার কথা ভেবেছি। কাল থেকে আর তাও ভাবতে পারছি না। মনে হয় ওরাও পারে না। পারলে পালাতো।
ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির এই ভাঙাচোরা বাড়িটাকে মনে হচ্ছে একটা বিরাট মাকড়শা। বিশ্বনাথ কাপালি মারা যাওয়ার পরেও, গত পঞ্চাশ বছর ধরে মাকড়শাটা গোরে বিবির রোডের একধারে, এই পোড়ো জমির মাঝখানে বসে, বিষাক্ত জাল বুনে যাচ্ছিল। তারপর সেই জালে জড়িয়ে টেনে এনেছে বিরাজ কাপালি, হাসিদি, পঙ্কজ, আর বিশাখাকে। ওই জার্মান মহিলাদের। এবং শেষমেষ আমাকেও—এই রুদ্রনাথ দত্তকে। এরপর সে কী করবে? আমাদের রক্ত শুষে খাবে?
.
শেষমেষ সেই দিনটা এল। শুক্রবার, এগারোই এপ্রিল। রাত বারোটা। কাপালি স্যার খবর পাঠিয়েছিলেন, ওই মহিলারা আসবেন। ঠিক বারোটার সময় কারখানার গেটের বাইরে একটা কালো স্টেশন-ওয়াগন এসে দাঁড়াল। ওদের নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা আর দাঁড়াল না, দ্রুত উধাও হয়ে গেল।
কারখানা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, কালো গাউন, কালো লেসের ভেল দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে চারটে মেয়ে বাগানের রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে। ওদের মধ্যে সামনের মেয়ে দুটি একটা হুইল-চেয়ার ঠেলে নিয়ে আসছে। চেয়ারটায় বসে আছেন বিরাজ কাপালি। আমি পঙ্কজদা আর হাসিদি ওদের অনুসরণ করে কারখানা ঘরে ঢুকলাম। আজ সন্ধে থেকেই ফার্নেসের আগুন দ্বিগুণ তেজে জ্বলছে। এখন শুনলাম, মেঝের নীচের রক্তের চৌবাচ্চার ভেতর থেকে জোরালো একটা ঘাই মারার শব্দ।
চারটে মেয়েই ঝটকা মেরে যে যার মুখের ভেল সরিয়ে দিল। দেখলাম ওদের নীল চোখের মণি প্রাইমাস স্টোভের শিখার মতন উজ্জ্বল। ওদের ঠোঁট রক্তরাঙা আর উদ্ধত চিবুকে একইসঙ্গে আগুনের কমলা আলো আর ইহুদি-ক্রকারির সবুজ ফসফোরেসেন্সের আলো দাপাদাপি করে বেড়াচ্ছে।
ঘরের ঠিক মাঝখানে কাপালি স্যারের হুইল চেয়ারটাকে খুব সাবধানে দাঁড় করিয়ে রেখে এমা, হানা, সোফিয়া, লীনারা একটু সরে দাঁড়াল। এতক্ষণে কাপালি স্যারকে ভালো করে দেখতে পেলাম। উনিও আজ একটা লম্বা ঝুলের কালো পাঞ্জাবি পরে এসেছেন। কোলের ওপরে পাতা রয়েছে একটা গাঢ় লাল চাদর। সেটা পায়ের পাতাদুটোকে ঢাকা দিয়ে মাটি অবধি লুটিয়ে পড়েছে। তফাতের মধ্যে আজ ওঁর গলায় একটা মোটা সোনার চেন—যেটা হয়তো সোফিয়াদের উপহার। সব মিলিয়ে সেদিন সার্পেন্টাইন লেনের বাড়িতে বিরাজ কাপালির চেহারা আর কথাবার্তার মধ্যে যে ক্লিষ্ট ভাব লক্ষ্য করেছিলাম, আজ তার কোনো চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। মানুষটিকে একটা পালিশ করা পেতলের মূর্তির মতন ঝকমকে লাগছিল।
দেখলাম, উনি সেই কাঠের বাক্সটা নিয়ে এসেছেন। দু-হাতে আলতো করে ওটাকে কোলের ওপরে ধরে রেখেছেন।
হঠাৎই কাপালি স্যার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন হাসিদি আর পঙ্কজদা ওঁর ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। উনি খুব রূঢ় গলায় বললেন, গেট আউট। বেরিয়ে যাও এখান থেকে। না ডাকলে ঢুকবে না।
ওরা দুজন মাথা নীচু করে বেরিয়ে গেল।
আমিও ওদের পেছন-পেছন বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। কাপালি স্যার খুব অবাক হয়ে বললেন, একি রুদ্রনাথ। তুমি কোথায় যাচ্ছ? তুমি তো আজকের যজ্ঞের ঋত্বিক। এসো, আমার পাশে এই বেঞ্চটায় বসো। ন্যুড মেয়েদের দেখতে ভালো লাগে না তোমার? দ্যাখো, এই জার্মান ছুঁড়িগুলোর জিনিসপত্র অসাধারণ।
এমা, লীনা, সোফিয়ারা ইতোমধ্যে কাপালি স্যারের কাছ থেকে সেই বাক্সটা নিয়ে ভেতরের জিনিসগুলোকে ফার্নেসের সামনে মেঝের ওপরে সাজিয়ে ফেলেছিল। সেই ঘট, সেই ছুরি আর আসন। তাছাড়াও আরো অনেক কিছুই ছিল ওদের সঙ্গে। তার মধ্যে যেটা সবচেয়ে চোখ টানছিল, সেটা হল একটা তারের বাজনা। মেলায় যেরকম মাটির বেহালা কিনতে পাওয়া যায়, তারই একটা বড় সংস্করণ। সেটার তারে কয়েকবার টান দিল সোফিয়া বলে মেয়েটা। কান্নার মতন একটা আওয়াজ উঠল।
একটা কাচের বোতল থেকে ঘন সবুজ একটা আরক ওরা গলায় ঢেলে নিল। তারপর মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে যে যার গাউন খুলে ফেলল। গাউনের নীচে কোনো অন্তর্বাস ছিল না। কাপালি স্যারের শ্বাস টানার শব্দ পেলাম।
নারীশরীর সম্বন্ধে আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তবু ওদের সরল তলপেট আর স্তনের গড়ন দেখে মনে হল ওরা কেউই আগে কখনো সন্তান ধারণ করেনি।
ওরা চারজনেই সুন্দরী। অসম্ভব সুন্দরী। ওদের অলিভ তেলের মতন সোনালি ত্বকে আগুনের আভা খেলা করে বেড়াচ্ছিল। আবছা অন্ধকারের মধ্যেও ভুট্টার কেশরের মতন ঝলমল করছিল ওদের যোনিকেশ। তবু আমার মনে কাম জাগছিল না। উল্টে প্রচণ্ড ঘৃণা হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এরা সুযোগ পেলে একজন কালো মানুষকে নীলনদীর জলে কুমিরের মুখে ফেলে দিয়ে মজা দেখতে পারে।
অবশ্য, খুব বেশিক্ষণ এসব ভাবতে পারলাম না। কারণ, এরমধ্যে ওরা চারজন নাচতে শুরু করেছিল। ওদের মধ্যে তিনজন মেঝেয় সাজিয়ে রাখা উপকরণগুলোকে ঘিরে গোল হয়ে ধীর লয়ে ঘুরে ঘুরে নাচছিল। আর চতুর্থজন সেই বেহালার মতন যন্ত্রটায় সুর তুলছিল।
আস্তে আস্তে ওদের নাচের গতি বাড়তে শুরু করল। একটা সময় এলো, যখন ওদের আর আলাদা করে দেখতে পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল তিনটে দীঘল ইউক্যালিপটাস ঝড়ের মুখে দোল খাচ্ছে। ঠিক তখনই ফার্নেসের দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল। কী এক অদ্ভুতভাষায় রিনরিনে গলায় ওরা জয়ধ্বনি করে উঠল। কিন্তু ওদের নাচ থামল না। শুধু যে-মেয়েটি এতক্ষণ বেহালার মতন যন্ত্রটা বাজাচ্ছিল, সে বাজনাটা মাটিতে নামিয়ে রেখে তাক থেকে একপাঁজা চিনেমাটির প্লেট তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিল ফার্নেসের ভেতরে। কাচ ভাঙার ঝনঝন শব্দকে ছাপিয়ে আগুনের শিখার ভেতর থেকে তৃপ্তির নিশ্বাসের মতন একটা শব্দ ভেসে এল।
আরো কিছুটা সময় চলে গেল। একবার স্কাই-লাইটের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আকাশে কাগডিমে রঙ লেগেছে আর…আর একটা মাত্র বিশাল তারা সেই স্কাইলাইটের ভেতর দিয়ে এই কারখানা ঘরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। শুকতারাই, কিন্তু আমার হাতের মুঠির মতন বড়।
ঠিক তখনই লেলিহান আগুনের শিখার আড়ালে একটা গ্র্যানাইট রঙের মূর্তির আদল ফুটে উঠল। দু-হাত দিয়ে আগুনের পর্দা সরিয়ে ফার্নেসের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল বৃষমানুষ!
ওরা আবার জয়ধ্বনি করে উঠল এবং এবার নাচের পরিবর্তে যেটা শুরু করল সেটাকে এককথায় বলা যায় কামুক অঙ্গভঙ্গি। ফার্নেসের সামনের মেঝেয় শুয়ে বসে ওরা নানানভাবে নিজেদের স্তন উরু এবং যোনিকে মেলে ধরছিল সেই বৃষপুরুষের সামনে।
কিছুক্ষণ আগে অবধি ওরা একটা গান গাইছিল। ভারি দোলা লাগানো একটা সুর। হঠাৎ সেই গানের পর্দাও উচ্চগ্রাম থেকে অশ্লীল এক ফিসফিসানিতে নেমে এল। ভাষা না বুঝলেও, ওদের অঙ্গভঙ্গির কারণে সেই গানের অর্থ বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না!—এসো। আমাকে তোমার প্রবল শিশ্ন দিয়ে বিদ্ধ করো। দেববীর্য উৎক্ষিপ্ত হোক আমার জরায়ুমুখে।
অনেক দূর থেকে মেঘের ডাক ভেসে এলে যেমন শোনায়, ফার্নেসের গভীর কোনো তলদেশ থেকে ঠিক সেইরকম একটা গর্জন ভেসে এল। চার নাৎসি তনয়ার মুখে ফুটে উঠল পরিষ্কার হতাশা। ওরা একসঙ্গেই ফিরে তাকাল কাপালি স্যারের মুখের দিকে। ওদের মধ্যে একজন ভাঙা ভাঙা ইংরিজিতে বলল, হি ইজ এগেইন আস্কিং ফর হিজ সন।
কাপালি স্যার জোর গলায় উত্তর দিলেন, ইয়েস, ইট হ্যাজ বিন অলরেডি অ্যারেঞ্জড।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, রুদ্রনাথ! জুতোটা খোলো। তারপর ফার্নেসের দিকে হেঁটে যাও।
আমি?
হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি। তোমাকে বলেছিলাম না, আজ বলব কেন তোমাকে পুরুলিয়া থেকে এখানে নিয়ে এসেছি। তুমি ওই শয়তানের বাচ্চা। তোমাকে আমি অর্ধেক সত্য বলেছিলাম। দু-বছর আগে নয়, আমি এখানে প্রথম এসেছিলাম আজ থেকে বাইশ বছর আগে। আমার সঙ্গে একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছিলাম, আমাদের পাড়ারই গরিব ঘরের মেয়ে। অসামান্য সুন্দরী এবং ভার্জিন।
অনেক টাকার লোভ দেখিয়ে ওকে রাজি করিয়েছিলাম। তবে ও সবটা জানত না। আসলে আমি দেখতে চেয়েছিলাম, ইভা স্টাইনবেক যেটা করতে পেরেছিলেন, সেটা তখনো সম্ভব কিনা। সম্ভব হয়েছিল। তুমি জন্ম নিয়েছিলে। কিন্তু তারপরেই মেয়েটি মারা গেল। মনে হয় সেটাই নিয়ম। শয়তানের বাচ্চার জন্ম দেওয়ার পরে মায়েরা বেশিদিন বাঁচে না। বড়জোর একবছর, যতদিন বাচ্চা দুগ্ধপোষ্য থাকে। তারপর সে মারা যায়।
আমি, হ্যাঁ, আমিই তোমাকে শর্বরী মোড়ের অনাথ আশ্রমে রেখে এসেছিলাম। জানতাম, একদিন না একদিন তোমাকে কাজে লাগবে।
আমার কাছে কাপালি স্যারের কথাগুলো একটুও নতুন ঠেকছিল না। মাথার ভেতরে সেই গুটিপোকাটা গত তিনদিন ধরে এইসবই আমার কানে ফিসফিস করে বলে গেছে। তাই বরফ গলায় বললাম, আমাকে আবার এর মধ্যে টানছেন কেন? আপনি নিজেই তো যেতে পারেন।
মানে! উনি চমকে উঠলেন।
মানে হচ্ছে—
বলতে বলতে একঝটকায় বিরাজ কাপালির কোলের ওপর থেকে লাল চাদরটা টেনে ফার্নেসের দিকে ছুড়ে দিলাম। হাওয়ায় ভাসতে-ভাসতেই সেটা আগুনের তাপে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। তার মধ্যে আমি লাথি মেরে ওঁর দু-পায়ের দুটো জুতো খুলে ফেলে দিয়েছি। জ্বলন্ত চাদরটা তখনো হাওয়ায় ভাসছিল। সেই আলোয় আমরা সকলেই দেখতে পেলাম কাপালি স্যারের দুই পায়ের কোনোটাতেই আঙুল নেই। পায়ের পাতাও না। তার জায়গায় রয়েছে অবিকল ষাঁড়ের খুরের মতন দুটো চ্যাটালো খুর।
চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম, অনেক কিছুই বলেননি আমাকে। লুকিয়ে গিয়েছিলেন। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার হল, ইভা স্টাইনবেকের গর্ভে ওই বৃষদেবতার ঔরসে আপনারই জন্ম হয়েছিল। আপনিই ইভার সেই হারানো ছেলে, যার সম্বন্ধে আপনি নিজেই সেদিন বলেছিলেন, ‘হয়তো মারা গেছে’। আসলে ইভা স্টাইনবেক মারা যাওয়ার পরে সোমেশ্বর কাপালি আপনাকে বুকে আঁকড়ে ধরে বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে সার্পেন্টাইন লেনের বাড়িতে পৌঁছেছিলেন। তারপর নিজের পুত্রবধূর হাতে আপনাকে তুলে দিয়েই মারা যান। আপনি যাদের বাবা-মা বলছেন, তারা কেউ আপনার জন্মদাতা নন, পালক বাবা-মা।
কথা বলতে-বলতেই আমি আমার নিজের পায়ের জুতোদুটোও খুলে একপাশে ছুড়ে ফেলে দিলাম। মুহূর্তে যে দৃশ্য বেরিয়ে এল, সে আমি জানি। দেখলেই মনে হয়, পাগল হয়ে যাব। তবু আজ অনেকদিন বাদে ফের দেখতে হল।
আসলে, সেই যে আঙুলগুলো কুষ্ঠ হয়ে খসে গেছিল, তারপর থেকে আমার চামড়ার জুতোর আড়ালে ক্রমশ পায়ের পাতাদুটোও বদলে গেল। রক্তমাংসের পাতাই রইল না পায়ে। তার বদলে গজিয়ে উঠেছিল হাড়সর্বস্ব দুটো খুর। ঠিক ওই কাপালি স্যারের মতন। আমরা দুজনেই তো আসলে শয়তানের বাচ্চা।
কাউকে বলিনি এতদিন, কাউকে দ্যাখাইনি। তবু এই খুরদুটো এখন আমাকে দেখতেই হবে। দেখাতে হবে ওদের—ওই নিও-নাৎসি মেয়েগুলোকে।
হ্যাঁ, ওরা দেখছে। আমি নিশ্চিন্তে খুরওলা পা দুটো ওয়ার্কিং বেঞ্চের ওপরে তুলে আরাম করে বসি। ওরা চারজনেই ছেড়ে ফেলা গাউনগুলো তুলে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে। এবার এগিয়ে আসছে।
হঠাৎই ওদের মধ্যে একজন, সোফিয়াই বোধহয় ওর নাম, কথথেকে একটা রিভলভার বার করে কাপালি স্যারের কপালে সাঁটিয়ে ভাঙা ইংরেজিতে চেঁচিয়ে উঠল—ইউ স্কাউন্ড্রেল! ইউ নেভার টোল্ড আস অ্যাবাউট দিস কার্স।
আমি হাসলাম। আমি জানতাম কাপালি স্যার এই খুঁতো পায়ের কথা ওদের বলবেন না। বললে ওরা তো এত পয়সা ঢালতে রাজিই হত না। তাই এখন ওঁর মুখটা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
এবার মেয়েগুলো আমার পায়ের দিকে তাকাল। বলল, অ্যান্ড হি ইজ অলসো আ কার্সড ওয়ান।
আমি বললাম, ইয়েস ডার্লিং, এভরি চাইল্ড ইউ বিগেট হিয়ার উইল আলটিমেটলি আর্ন টু হুভস, ফ্রি অফ কস্ট। এখান থেকে যে বাচ্চাই পেটে ধরো, শেষ অবধি সে পায়ে দুটো খুর পাবেই পাবে, একেবারে বিনিপয়সায়। বাট ডোন্ট ইউ থিঙ্ক দে উড মেক আ ফাইন নিও-নাৎসি রেজিমেন্ট?
সত্যি, দৃশ্যটা কল্পনা করে আমার নিজেরই বেদম হাসি পাচ্ছিল। সারি সারি যুবক অটোমেটিক মেশিনগান এবং আরো নানান ভয়ানক অস্ত্র নিয়ে রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে আছে। তারা প্রত্যেকেই আমার আর কাপালি স্যারের মতনই শয়তানের সন্তান—এককথায় বেজন্মা। আমাদের মতনই রূপবান এবং বুদ্ধিমান—অভিজাত আর্য।
কম্যান্ডার হুকুম দিলেন, মার্চ। যুবকরা একবার ইউনিফর্মের বুকে আঁকা স্বস্তিকা চিহ্নে হাত বুলিয়ে নিল। তারপর পা ফেলল—লেফট রাইট লেফট! লেফট রাইট লেফট!
ব্যস! তারপরেই এলোমেলো কিছু খটখট আওয়াজ। পাথরের সঙ্গে জোড়া জোড়া খুরের সংঘাত। খিস্তি খেউড় হট্টগোল। একে-একে তারা হুমড়ি খেয়ে পড়তে শুরু করল।
কারণ তারা আমার এবং বিরাজ কাপালির মতোই খোঁড়া।
নিজের কল্পনাতে নিজেই কিছুক্ষণের জন্যে ডুবে গিয়েছিলাম। হঠাৎ কপালের ওপরে ঠান্ডা মেটালের চাপে সম্বিৎ ফিরল। সোফিয়া তার রিভলভারটা ঘুরিয়ে আমার কপালে চেপে ধরেছে। মেয়েটার চোখে খুনের ঝলক। ও দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, মিশন অ্যাবান্ডনড। ডেভিলকে আমরা আর কোনোদিনই ডাকবো না। আমরা চলে যাব। তবে তার আগে তোমাদের লাশ দুটো ওই বাইরের মাঠে ফেলে দিয়ে যাব। নাও মুভ!
আমি উঠে দাঁড়ালাম। এমা, হানা, লীনারা সেই কাঠের বাক্স আর শয়তান-পুজোর উপকরণগুলো টান মেরে ফার্নেসের ভেতরে ছুঁড়ে দিল। সঙ্গে-সঙ্গে আগুনের আড়াল থেকে ভেসে এল সেই মন্দ্র মেঘগর্জন অথবা খ্যাপা ষাঁড়ের ডাক। তিনি চাইছেন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হোক। আমাদের ধুলোমাটির পৃথিবীতে পা রাখতে চাইছেন। কিন্তু চার জার্মান যুবতী সেই গর্জনের তোয়াক্কা করল না।
তবে ওরা তোয়াক্কা না করলেও অন্য কেউ করল।
আচমকা কারখানা ঘরের পেছনের দরজাটা খুলে গেল। একটা বিদ্যুৎ রেখা! শব্দহীন ছায়াশরীর নিয়ে ফার্নেসের মধ্যে লাফিয়ে পড়েছে একটা নেকড়ে বাঘ। তার শরীর নিমেষে জ্বলে উঠল। নেকড়েটা একটাও শব্দ করল না। জ্বলতে জ্বলতে ফার্নেসের মুখে শুয়ে পড়ল। মাংস পোড়ার গন্ধ উঠল।
নেকড়ে-পোড়া ছাইয়ের ওপরে একটা পা পড়ল। আমার মতোই খুরওলা পা। যার পা, তার বাকি শরীর তখনো আগুনের আড়ালে।
প্রায় নেকড়ের মতনই বিদ্যুৎবেগে ছুটে এসে আগুনের মধ্যে লাফিয়ে পড়ল হাসিদি। আবারও তৈরি হল একটা ছাইয়ের স্তূপ! বাতাসে ভেসে এল কিছুটা পোড়া মাংসের গন্ধ।
ভয়ংকর দেবতার দ্বিতীয় পা-টা এসে পড়ল হাসিদির ভস্মাবশেষের ওপরে। এখন তার বিশাল শরীরের অর্ধেকটা দেখা যাচ্ছে। পেশল দুই পা, রোমশ তলপেট আর সরু কোমর।
ওই জার্মান মেয়েগুলোর মধ্যে কে একটা গোঙানির গলায় বলে উঠল, হায় ভগবান! ও যে বেরিয়ে আসছে।
আমি আর বিরাজ কাপালি তো বটেই, মেয়েরা সকলেই তখন তাকিয়ে রয়েছে খোলা দরজাটার দিকে। আর কি কেউ রয়েছে ওর ছাইয়ের সিঁড়ি সম্পূর্ণ করার জন্যে?
এইসময় ওদের সম্বিৎ ফিরে এল। চারটে মেয়েই একসঙ্গে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে উঠোনের দরজাটা বন্ধ করে, ভেতর থেকে খিল তুলে দিল। তারপরে দুজনে এসে ধরল কাপালি স্যারের হুইল চেয়ারের দুটো হাতল। ঠেলে নিয়ে যেতে শুরু করল সামনের দরজার দিকে। সোফিয়া আমার পিঠে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, মুভ মুভ মুভ। ডোন্ট স্টপ! থামলেই গুলি করব।
হোঁচট খেতে খেতে দরজার দিকে এগোচ্ছি। ওরা জিতে যাবে? একবার শুধু ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে গ্রানাইটের খোদাই করা মূর্তির মতন দুটো পা স্থির হয়ে রয়েছে। কোমরের ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছে আর একটা সিঁড়ি পেলেই সে বাইরে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু ওকে আনবে কে?
