পতঙ্গ সঙ্গম – ১

এক

নভেম্বর-মাসের সতেরো-তারিখ ছিল রবিবার। ওইদিন ভোররাতের দিকে দুর্গাপুরের ‘সিমবায়োটিক ইনটারন্যাশনাল’-এর একটা ঘরে বৈজ্ঞানিক প্রদীপ কামাথ আত্মহত্যা করেন। কোক-আভেন থানার সাব-ইনস্পেক্টর বিপ্রদাস মণ্ডল খবরটা পায় বেলা দশটা নাগাদ, কারণ সেদিন সে ছুটির মুডে বাড়িতেই ছিল। ওদের বাড়িটা দুর্গাপুরের গোপালমাঠ অঞ্চলে।

বিপ্রদাস তখন খাটের ওপর বালিশে হেলান দিয়ে বসে, সাদা-তরকারি দিয়ে লুচি খাচ্ছিল। বালিশের পাহাড় বেয়ে তার ঘাড়ে মাথায় উঠে খেলা করছিল চারবছরের দস্যি ভাইঝি টুনাই। এমন আদর্শ ছুটির সকালটা মুহূর্তের মধ্যে ভণ্ডুল হয়ে গেল থানার ওসি সুধীর মাইতির একটা ফোনে। সুইসাইডের ঘটনাটা জানিয়ে মাইতিসাহেব বললেন, ‘দুজন কনস্টেবলকে দিয়ে জিপ পাঠিয়ে দিয়েছি। পনেরো-মিনিটের মধ্যে ওই ইনস্টিটিউটে চলে যাও। ইট ইজ আর্জেন্ট।’

বিপ্রদাস একটু সন্দেহের সুরে জিগ্যেস করল, ‘সুইসাইড যে, সেটা ঠিক তো স্যার? নাকি?’

‘একদম কনফার্মড সুইসাইড। ইনসটিটিউটের ডিরেক্টর নিজেই ফোন করেছিলেন। বললেন, লোকটা ভেতর থেকে ঘরের দরজা আটকে বিষ খেয়েছে। তার ওপরে সি. সি. টিভির ফুটেজও রয়েছে। জলের মতন সহজ কেস। মর্গে চালান দেওয়া ছাড়া তোমার আর কোনো কাজ নেই। তবে আবারও বলছি, দেরি কোরো না। বড্ড চাপ আছে।’

বিপ্রদাস জিগ্যেস করল, ‘চাপ কেন স্যার? লোকটা কি ভি.আই.পি.?’

‘তাই তো মনে হচ্ছে। সায়েন্টিস্ট হিসেবে নাকি ওয়ার্ল-ফেমাস। অনেক অ্যাওয়ার্ড-ট্যাওয়ার্ড পেয়েছে। তাছাড়া ”সিমবায়োটিক” হচ্ছে আমেরিকান কোম্পানি। সেইজন্যেই চারদিক থেকে ক্রমাগত কোয়ারি আসছে—কী হল? কেমন করে হল?’

একটু দম নিয়ে মাইতিসাহেব বললেন, ‘শোনো মণ্ডল, হাসপাতালের সুপার-কে একটু বলে দেখো, যাতে ইনকোয়েস্টটা দুপুরের মধ্যে সেরে দেওয়া যায়। তাহলে দমদম থেকে বডিটাকে রাতের ফ্লাইট ধরিয়ে দিতে পারব।’

‘বডি কোথায় যাবে স্যার?’

‘পুণে। ওখানেই মিস্টার কামাথের ফ্যামিলি থাকে। ওঁর এক ভাই অলরেডি বডি নিয়ে যাওয়ার জন্যে রওনা হয়ে গেছেন।’

মোবাইলটা নামিয়ে রেখে বিপ্রদাস শেষ দুটো লুচি একসঙ্গে মুখে পুরে বিছানা থেকে লাফিয়ে নামল। বিপ্রদাসের বউদি মৌসুমী প্রায় ওর সমবয়সি। সে একটা থালায় আরো কয়েকটা লুচি নিয়ে ঘরে ঢুকছিল। বিপ্রদাস হাত নেড়ে জানাল আর লাগবে না। তারপর বেসিনের দিকে হাত ধুতে দৌড়ল।

মৌসুমী অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘ব্যাপার কী? বেরোতে হবে?’

মুখভর্তি লুচি নিয়ে বিপ্রদাস কথা বলতে পারছিল না। ইশারায় জানাল, ‘হ্যাঁ।’

মৌসুমী মুখ কালো করে বলল, ‘খুরে দণ্ডবৎ বাবা এমন চাকরির। রোববারেও একটু শান্তি নেই গো? দুপুরে বাড়িতে খেতে আসা হবে, না কি?’

‘খাব, খাব। আমার ফিরতে দু-তিনঘণ্টার বেশি সময় লাগবে না।’ বলতে-বলতেই বিপ্রদাস আলনা থেকে ধরাচুড়ো টেনে নিয়ে বাথরুমের দিকে পা চালাল এবং ঠিক পনেরো মিনিটের মাথাতেই জিপে চেপে রওনা হয়ে গেল দুর্গাপুর এক্সপ্রেস-ওয়ের দিকে। বছর তিনেক হল ওই রাস্তার ধারে চার-একরের ওপর জায়গা নিয়ে তৈরি হয়েছে সিমবায়োটিক ইন্টারন্যাশনালের রিসার্চ ইনস্টিটিউট।

আগে কখনো এই ইনস্টিটিউটের ভেতরে পা রাখেনি বিপ্রদাস। গেট আগলে দাঁড়িয়ে-থাকা প্রাইভেট সিকিউরিটি-এজেন্সির লোকেরা পুলিশের গাড়ি দেখে স্যালুট দিয়ে সরে দাঁড়াল। তারাই বুঝিয়ে দিল, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ- বিল্ডিংয়ের দিকে কীভাবে যেতে হবে।

সিকিউরিটির লোকেরাই নিশ্চয়ই ইন্টারকমে পুলিশ আসার কথা জানিয়ে দিয়েছিল। গাড়িটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং-এর পোর্টিকোর নীচে দাঁড়াতেই দুজন ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। পরিচয় হওয়ার পরে বিপ্রদাস জানতে পারল, ওঁদের মধ্যে একজন এই ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর শুভময় চ্যাটার্জি। অন্যজন সিকিউরিটি অফিসার বলরাম রায়।

মিস্টার চ্যাটার্জির বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে। নির্মেদ ছিপছিপে চেহারা, ছফুট লম্বা। তীক্ষ্ন নাক, পুরু চশমার পেছনে বড়-বড় চোখ আর ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো কাঁচা-পাকা চুলের জন্যে মনে হচ্ছিল, ডিরেক্টরের এই রোলটা প্লে করার জন্যেই তিনি মেক-আপ নিয়ে বেরিয়েছেন।

বলরাম রায় এক্স-সার্ভিসম্যান। মজবুত চেহারা, চ্যাপটা নাক, সাবধানি চোখ। গায়ের রং কুচকুচে কালো। বয়স আন্দাজ করা কঠিন, তবে চল্লিশের ওপরে তো বটেই।

নিজের পরিচয় দিয়ে বিপ্রদাস বলল, ‘ইনসিডেন্ট-টা যেখানে হয়েছে আগে সেখানেই চলুন।’

‘চলুন স্যার।’ বলরাম রায় ওদের নিয়ে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে, ডানদিকের রাস্তাটা ধরে হাঁটা লাগালেন। শুভময় চ্যাটার্জিও সঙ্গে চললেন। থানার ড্রাইভার সুজিত একবার গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে প্রশ্ন করেছিল, ‘গাড়িটা নিয়ে আসব স্যার?’ বলরামবাবু হাত তুলে বললেন,’দরকার হবে না। জাস্ট পেছনের বিল্ডিংটাতেই যাচ্ছি।’

রাস্তা ধরে হাঁটতে-হাঁটতে বিপ্রদাস সামনের দিকে তাকাল। একটা বড় মাঠকে ঘিরে ছ’টা বাড়ি মৌচাকের কুঠুরির স্টাইলে সাজানো। তার মধ্যেই একটার দিকে ওদের ছোট্ট মিছিলটা মোড় নিয়েছে। কোথাও কোনো মানুষের মুখ দেখা যাচ্ছিল না। বিপ্রদাস অনেকক্ষণ ধরে যে প্রশ্নটা করবে ভাবছিল, সেটা করেই ফেলল, ‘লোকজন এত কম দেখছি কেন বলুন তো?’

উত্তরটা দিলেন মিস্টার চ্যাটার্জি। বললেন, ‘এমনিতে আমাদের এখানে এতটাই স্পেস প্রোভাইড করা হয়েছে যে, কখনোই আপনার মনে হবে না ভিড়ের মধ্যে কাজ করছেন। সেকেন্ডলি, আমাদের জুনিয়র সায়েন্টিস্টস, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টস এরকম প্রায় পঞ্চাশজন স্টাফ নানান ফিল্ড-ওয়ার্ক নিয়ে বাইরে ঘুরছেন। সেইজন্যেই জায়গাটা আরো ফাঁকা লাগছে।’

‘আই সি।’

ওরা প্রথম-বাড়িটার স্যুইং-ডোর ঠেলে ভেতরের লাউঞ্জে পা দিল। মোট চারজন সিকিউরিটি গার্ড ডেস্কে বসে ডিউটি করছিলেন—দুজন মহিলা, দুজন পুরুষ। ওদের দেখে চারজনেই উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বলরামবাবু হাতের ইশারায় তাদের মধ্যে একজনকে ডেকে নিয়ে বাকিদের নিজের ডিউটি করে যেতে বললেন। যাকে ডেকে নিলেন সেই ছেলেটি একটা চাবির গোছা হাতে নিয়ে ওদের সঙ্গে যোগ দিল। তারপর সবাই মিলে এগিয়ে চলল করিডরের শেষে লিফটের দিকে।

বাড়িটার ভেতরে পা দিতেই একটা চেনা গন্ধ বিপ্রদাসের নাকে এসে লেগেছিল। স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়াশোনা করার সেই দিনগুলো থেকেই আরো অনেকের মতন বিপ্রদাসের স্মৃতিতেও এই গন্ধটা জড়িয়ে গেছে। অনেকগুলো আলাদা আলাদা গন্ধের যোগফল এই বিশেষ গন্ধটা। ক্লোরিন, বেঞ্জিন, হাইড্রোজেন সালফাইড, বুনসেন-বার্নারের গ্যাস, ফর্মালিন সব মিলিয়ে এই গন্ধটা পৃথিবীর যে-কোনো ল্যাবরেটরির গন্ধ। দেয়ালের বোর্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে বিপ্রদাস নিশ্চিন্ত হল, সে ভুল করেনি। প্রাণী ও উদ্ভিদ-বিজ্ঞানের নানান শাখাপ্রশাখার নাম লেখা ছিল বোর্ডগুলোর গায়ে। তীরচিহ্ন দিয়ে দেখানোও ছিল কোন দিকে কোন বিদ্যার হাতেকলমে চর্চা হয়। অর্থাৎ, এই বাড়িটাই সিমবায়োটিকের মূল ল্যাবরেটরি।

করিডরের শেষে দুটো লিফট। প্রত্যেকটায় ষোলো জনের ক্যাপাসিটি। আপাতত একটা লিফটে উঠল মাত্র ছজন। দুজন কনস্টেবল, এই বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটি গার্ড, বলরাম রায়, শুভময় চ্যাটার্জি আর বিপ্রদাস।

থার্ড ফ্লোরের যে ঘরটার সামনে গিয়ে ওরা দাঁড়াল সেই ঘরের দরজার মতন দরজা বিপ্রদাস এতদিন দেখেছে শুধু ব্যাঙ্কের লকার-রুমে। চওড়া স্টিলের পাল্লা, তার গায়ে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের মতন একটা ব্যাপার। দরজার পাল্লায় চাবি ঢোকানোর পরে সিকিউরিটি গার্ড সেই স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে কম্বিনেশন লক খুলে দিল।

ঘরের ভেতর ঢুকে আরো অবাক হল বিপ্রদাস। প্রথাগত ল্যাবরেটরির সঙ্গে এই ঘরের যন্ত্রপাতির কোনো মিল নেই। চারিদিকে যে সব ইলেক্ট্রনিক সাজসরঞ্জাম সাজানো রয়েছে সেগুলো দেখলে ল্যাবরেটরির বদলে কোনো বড় হসপিটালের রেডিওলজি-রুমের কথাই মনে পড়ে। কম্পিউটার, ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ, সেন্ট্রিফিউজ মেশিন, রেফ্রিজারেটর ইত্যাদি কয়েকটা মামুলি যন্ত্র চিনতে পারল বিপ্রদাস। বাকি সমস্তই তার অচেনা। একদিকে দেয়ালের গা ঘেঁষে একটা হসপিটাল-কট রাখা ছিল ডাক্তারদের চেম্বারে যেমন থাকে। সরু লোহার একটা খাট। ওপরে টান-টান করে সাদা চাদর বেছানো রয়েছে। খাটটাকে ঘিরে পর্দা ফেলে দেওয়ার বন্দোবস্তও রয়েছে ঠিক হাসপাতালের মতোই।

ঘরের জানলাগুলো ভেতরদিক থেকে এঁটে বন্ধ করা ছিল। এ.সি. মেশিন চলছিল বলে ঘরটা ঠান্ডা এবং মৃতদেহজনিত দুর্গন্ধ ছিল না। দিনের বেলা হলেও ঘরে জোরালো আলো। মিস্টার চ্যাটার্জি বললেন, চব্বিশঘণ্টাই জ্বলে। এমনকী অন্য সব আলো ঘরের ভেতর থেকে সুইচ টিপে নিভিয়ে দিলেও, দরজার পাশের দেয়ালে যে চৌকোনা আলোটা, সেটা জ্বলতেই থাকবে। কারণটা বোঝা কঠিন নয়। প্রাকৃতিক আলো ঢুকবার উপায়ই তো নেই।

ওই ল্যাবরেটরি ঘরেই একদিকে একটা চেয়ারের ওপর বসে ছিলেন প্রদীপ কামাথ। তাঁর মাথাটা সামনের টেবিলের ওপর নামানো। মনে হতে পারত ঘুমোচ্ছেন। কিন্তু আসলে ঘুমোচ্ছেন না। মারা গেছেন।

একটা চকোলেট কালারের কাচের শিশি কামাথের হাত থেকে মেঝের ওপর পড়ে কয়েক টুকরো হয়ে গিয়েছিল। ভেতরের লিকুইডটা যেখান-যেখান দিয়ে গড়িয়ে গেছে সেখানে-সেখানে মেঝের ভিনাইল ফ্লোরিং জ্বলে ছাই হয়ে গেছে। কিছুটা লিকুইড কামাথের হাতের ওপরে পড়েছিল। সেই জায়গার মাংস পুড়ে হাড় বেরিয়ে গিয়েছে। ওই তরল আগুন যে প্রদীপ কামাথের শরীরের ভেতরের যন্ত্রপাতিগুলোর কী হাল করেছে সে কথা ভেবে বিপ্রদাস কিছুক্ষণের জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। হুঁশ ফিরল পকেটের মোবাইল ফোনটার রিং টোনে।

কলটা রিসিভ করে সে বুঝল ফোন করেছেন ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের একজন অফিসার। মাইতি সাহেবের কাছ থেকে অর্ডার পেয়ে ওঁরা এখানে চলে এসেছেন। বলরাম রায় ওঁদের এই ঘরে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন।

পরের এক ঘণ্টায় ফরেনসিকের লোকেরা নিখুঁত পেশাদারিত্বের সঙ্গে নানান অ্যাঙ্গেল থেকে মৃতদেহের ছবি তুললেন, ভাঙা বোতল আর লিকুইডের স্যাম্পেল কালেকশন করলেন। এমনকী বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, ফাইল-কভার, গ্লাস, প্লেট, এইসবের সারফেস থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট অবধি নিয়ে নিলেন।

কাজ শেষ করে সকলকে নিয়ে নীচে নেমে আসতেই বিপ্রদাস দেখল অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে। বিপ্রদাস মনে মনে স্বীকার করল, মাইতি সাহেবের ব্যবস্থাপনা নিয়ে জাস্ট কোনো কথা হবে না। ডেডবডিটাকে কফিন-ব্যাগে পুরে নিয়ে কনস্টেবল দুজন দুর্গাপুর মেন হাসপাতালের দিকে রওনা হয়ে গেল। ওরা গেল অ্যাম্বুলেন্সে। সুজিতের জিপগাড়িটা রয়ে গেল বিপ্রদাসের জন্যে।

সিকিউরিটি অফিসার বলরাম রায়, ডিরেক্টর শুভময় চ্যাটার্জি আর বিপ্রদাস পায়ে হেঁটেই আবার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিংয়ে ফিরে এল। বলরাম রায় আর বিপ্রদাসকে নিয়ে চ্যাটার্জিসাহেব নিজের চেম্বারেই বসলেন। বিপ্রদাস চট করে চারদিকটা একবার দেখে নিল। বাকি ক্যাম্পাসের সঙ্গে মানানসই বিশাল চেম্বার। ঝকঝকে স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, নানান শেডের মার্বেল, ভিনাইল আর টেন্টেড গ্লাসের এক নিখুঁত অর্কেস্ট্রা। সিল্ক ফিনিশড দেওয়ালে ঝুলছে এম এফ হুসেনের ঘোড়া। দেখে তো অরিজিনালই মনে হল। বিপ্রদাস মনে-মনে বলল, কর্পোরেট সেক্টরের ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা।

ইতিমধ্যে ওঁদের তিনজনের জন্যে অত্যন্ত দামি চা আর স্যান্ডউইচ এসে গিয়েছিল। চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বিপ্রদাস প্রশ্ন করল, ‘ডক্টর চ্যাটার্জি, মিস্টার কামাথ যে সুইসাইড করেছেন সেটা কখন বোঝা গেল?’

‘যখন সুইসাইড করেছেন, সেই মুহূর্তেই। রাত চারটে সতেরোয়।’

‘তার মানে? ওঁর সঙ্গে কেউ ছিলেন?’

এবার উত্তরটা দিলেন বলরাম রায়। তিনি বললেন, ‘আমাদের নাইট-ডেস্কের লোকেরা সারা-রাত সি.সি. টিভি-র মনিটরে চোখ রেখে বসে থাকে। ওরা অ্যাকচুয়ালি মিস্টার কামাথকে সুইসাইড করতে দেখেছিল। অ্যান্ড ইনস্ট্যান্টলি দে রাশড টু দা স্পট। কিন্তু’ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাতের পাতা দুটো ওলটালেন বলরাম রায়।

বিপ্রদাসের চোখের সামনে আরেকবার ভেসে উঠল পোড়া মেঝে আর মিস্টার কামাথের হাতের চেহারাটা। সত্যি। ওই অবস্থায় কারুরই আর কিছু করার থাকে না। বিপ্রদাস প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, যেটা উনি গলায় ঢেলেছেন, সেই জিনিসটা কী?’

মিস্টার চ্যাটার্জি উত্তর দিলেন, ‘ডাই-মিথাইল সালফোক্সাইড। দুর্দান্ত সলভেন্ট, তাই যে-কোনো ল্যাবরেটরিতেই দু-এক শিশি পাবেন। প্রায় সবকিছুকেই মুহূর্তের মধ্যে গলিয়ে ফেলে। তার মধ্যে মানুষের চামড়া আর মাংসও আছে।’

রুমাল বার করে কপালের ঘাম মুছল বিপ্রদাস। তারপর বলল, ‘সি.সি. টিভি-র ফুটেজটা একটু দেখা যাবে?’

বলরাম রায় বললেন, ‘শিওর। এই ঘরেই তো একটা টার্মিনাল রয়েছে, ফর দা বেনিফিট অফ দা ডিরেক্টর। আসুন স্যার এই চেয়ারটায় বসুন।’ তিনি ঘরের কোনায় একটা কম্পিউটারের সামনে বিপ্রদাসকে বসিয়ে মনিটর অন করলেন। কিছু অ্যাডজাস্টমেন্টের পরে স্ক্রিনে ওই ল্যাবরেটরির ছবি ফুটে উঠল। ঘরটার চেহারা একটু আগে বিপ্রদাস যেমন দেখে এসেছে, সেইরকমই। শুধু প্রদীপ কামাথ বসে আছেন ঘরের অন্য কোনায় একটা রিক্লাইনিং-চেয়ারের ওপরে। অত্যন্ত এলিয়ে পড়া ভঙ্গি। হাবভাবের মধ্যে গবেষণার কোনো উদ্যোগই চোখে পড়ছে না।

বিপ্রদাস মনিটরের নীচের দিকে ডিজিটাল অক্ষরে ফুটে ওঠা সময় দেখে প্রশ্ন করল, ‘রাত একটা?’

বলরামবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, গতকাল রাত একটার ছবি এটা। একটু ফাস্ট ফরোয়ার্ড করি স্যার? এই ধরুন আধ ঘণ্টা?’

‘করুন।’ মনিটরের দিকে ঝুঁকে উত্তর দিল বিপ্রদাস।

রাত দেড়টার ছবির সঙ্গে একটার ছবির কোনো তফাত ছিল না, যেমন তফাত ছিল না দেড়টার সঙ্গে সাড়ে তিনটের। দশ মিনিট পনেরো মিনিট আধঘণ্টা এগিয়ে পিছিয়ে অনেকগুলো ফ্রেম দেখল বিপ্রদাস। সবকটা ফ্রেমেই দেখা গেল ওই বৈজ্ঞানিক প্রদীপ কামাথ জড়ভরতের মতন রিক্লাইনিং-চেয়ারটার ওপর বসে আছেন। কখনো মাথাটা একটু পেছনে হেলিয়ে দিলেন, কখনো হাত দিয়ে কপালটা মুছে নিলেন, কিম্বা দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরলেন—ব্যস, এইটুকুই।

সারা রাতের মধ্যে এর চেয়ে বেশি নড়াচড়া করলেন না ভদ্রলোক। প্রথমবার চেয়ার থেকে যখন উঠে দাঁড়ালেন তখন ডিজিটাল-ক্লক সময় দেখাচ্ছে চারটে বেজে পাঁচ মিনিট। ওই সময়েই প্রদীপ কামাথ হঠাৎ মাথাটা তুলে সামনে তাকালেন, যেন দরজার বাইরে থেকে তাকে কেউ ডাকছে।

বিপ্রদাস ঘাড় ফিরিয়ে বলরাম রায়ের মুখের দিকে তাকাল। বলরাম রায় ফিসফিস করে বললেন, ‘আপনি কী ভাবছেন বুঝতে পারছি স্যার। আমিও প্রথমে তাই ভেবেছিলাম। বন্ধ দরজার ওপাশে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু না। দরজার বাইরেও একটা সি.সি. টিভি আছে। তার করেসপন্ডিং ফুটেজ আমি চেক করেছি। এই দেখুন।’

মাউসের দুটো ক্লিকে ল্যাবরেটরির চৌখুপির পাশে আরেকটা চৌখুপি এসে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। এটা দরজার বাইরের ভিডিও ক্লিপিং। ওই চারটে বেজে পাঁচ মিনিট থেকেই শুরু হয়েছে। না, ওখানে কেউ নেই। শূন্য করিডর।

বলরাম রায় আবার ল্যাবরেটরির ভেতরের দৃশ্যে ‘জুম ইন’ করলেন। প্রদীপ কামাথ উঠে দাঁড়িয়েছেন। চোখ বড় বড় করে কিছু শুনছেন। ওপরে নীচে ঘাড় নাড়ছেন। একবার বুকের কাছে হাতদুটো জোড় করে আবার নামিয়ে নিলেন। যে কেউ দেখলে ভাববে, ওঁর সামনে, ক্যামেরার লেন্সের আওতার বাইরে, আরেকজন কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছে যার সঙ্গে ওঁর কথোপকথন চলছে। অথচ সি.সি. টিভি দেখাচ্ছে কেউ কোথাও নেই। উনি শুধু ছায়ার সঙ্গে কথা বলছেন। হাওয়ার সামনে হাতজোড় করছেন। অন্ধকারের আদেশ পালন করছেন।

ভোর চারটে বেজে পনেরো মিনিট। ছবিতে দেখা গেল প্রদীপ কামাথ পেছন ফিরে কোথায় যেন চলে গেলেন। বলরাম রায় বললেন, ‘ওই কেমিকালটা আনতে গেলেন। অ্যান্টি-চেম্বারটা দেখলেন না, ওই জায়গাটা ক্যামেরায় ধরা পড়ে না।’

ঠিক দু-মিনিটের মধ্যে আবার চেয়ারে এসে বসলেন ডক্টর প্রদীপ কামাথ। এখন ওঁর হাতে সেই ডাই-মিথাইল-সালফোক্সাইডের বোতল। তারপর হঠাৎই উনি বোতলের ঢাকনা খুলে ঢকঢক করে মুখের মধ্যে চালান করে দিলেন এক-বোতল সলভেন্ট।

বিপ্রদাস তার পাঁচ বছরের পুলিশের চাকরিতে অনেক বীভৎস দৃশ্য দেখেছে। তবু তার মুখ দিয়েও একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল।

ডিরেক্টর শুভময় চ্যাটার্জি আর্তনাদ করলেন না, তবে দাঁতে দাঁত চিপে কোনোরকমে বললেন, ‘ওহ, স্টপ ইট, স্টপ ইট, মিস্টার রয়। আই ক্যাননট বেয়ার দিস এনি মোর।’ সত্যিই, শুভময় চ্যাটার্জিকে দেখে মনে হচ্ছিল উনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন।

বলরাম রায় কম্পিউটার শাট ডাউন করে বললেন, ‘এই দৃশ্য দেখেই আমার লোকেরা ল্যাবরেটরিতে দৌড়ে যায়। দরজা ভেতর থেকে লক করা ছিল। কিন্তু সিকিউরিটির কাছে কোডনাম্বার ছিল। দরজা খুলতে অসুবিধে হয়নি। সি.সি. টিভির ফুটেজ দেখে বুঝতে পারছি, ইনসিডেন্টের পরে দরজা খুলে ঘরে ঢুকতে ওদের ঠিক ছ’মিনিট সময় লেগেছিল। কিন্তু ততক্ষণে মিস্টার কামাথ মারা গেছেন। সেটা বুঝতে পেরেছিলাম বলেই আমরা কেউ আর ডেডবডিতে হাত ছোঁয়াইনি। আমাদের এখানে একজন রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান আছেন, ডাক্তার এ কে সামন্ত। উনি খবর পাওয়ার দশমিনিটের মধ্যেই স্পটে গিয়ে ভিকটিমকে এগজামিন করেন। তবে উনিই বা কী করবেন?’

বিপ্রদাস ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবছিল। একটু বাদে বলরাম রায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একটা কথা জিগ্যেস করব মিস্টার রায়?’

বলরাম রায় বললেন, ‘বলুন স্যার।’

‘এই যে একজন বৈজ্ঞানিক আপনাদে ল্যাবরেটরিতে সারা রাত একা বসে ছিলেন, এর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না? আপনার লোকেরা কেউ খোঁজ নিতে গেল না কেন?’

সিকিউরিটি অফিসার মুখ খুলবার আগেই শুভময় চ্যাটার্জি বললেন, ‘উত্তরটা আমি দিই মিস্টার মণ্ডল? ইফ ইউ পারমিট।’

‘শিওর।’

‘দেখুন, মিস্টার কামাথ ছিলেন একজন সিনিয়র সায়েন্টিস্ট। হি ওয়জ আ জিনিয়াস। একজন জিনিয়াসের কাজের প্যাটার্ন ইনস্টিটিউটের ডিসিপ্লিনের সঙ্গে মিলবে এরকম কোনো কথা নেই। ইন ফ্যাক্ট গত প্রায় একবছর ধরে মিস্টার কামাথকে আমরা দেখেছি, উনি রাত জেগে কাজ করতেই পছন্দ করতেন। কাজেই কাল রাতেও ওঁর ল্যাবরটরিতে থাকাটা কারুর কাছেই আনইউজুয়াল মনে হয়নি।

‘আর চুপ করে বসে থাকার কথা বলছেন? আমাদের এই ক্যাম্পাসে চড়াইপাখির থেকে সায়েন্টিস্টের সংখ্যা বেশি। আমি দেখেছি, সায়েন্টিস্টরা সকলেই ওইভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপ করে বসে থাকতে পারেন। থাকেনও। কথা বলে জেনেছি, কাজের কাজগুলো ওঁরা ওইসময়েই করে ফেলেন—ব্রেন-স্টর্মিং-এর কাজ, মাথা তোলপাড় করে একটা রহস্যের উত্তর খুঁজে আনার কাজ, এলোমেলো চিন্তাগুলোকে গুছিয়ে একটা প্যাটার্নে সাজিয়ে ফেলার কাজ।’

 ‘বুঝলাম।’ চায়ের কাপটা সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল বিপ্রদাস। বলল, ‘আমি এখন চলি। পরশু আরেকবার আসব। অন্য কিছু নয়, মিস্টার কামাথের বায়োডেটা, উনি কী কাজে এখানে এসেছিলেন, এইসব একটু জানার প্রয়োজন হবে।’

‘ইউ আর অলওয়েজ ওয়েলকাম।’ শুভময় চ্যাটার্জি এবং বলরাম রায় দুজনেই পর পর বিপ্রদাসের সঙ্গে শেক হ্যান্ড করলেন। ডক্টর চ্যাটার্জি নিজের ভিজিটিং-কার্ড বার করে বিপ্রদাসের হাতে দিলেন। বিপ্রদাসও নিজের পার্সোনাল মোবাইলের নম্বর ওদের দুজনকে দিয়ে বলল, কোনো প্রয়োজন হলেই যেন ওর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

পোর্টিকোয় পৌঁছে যখন বিপ্রদাস গাড়ির দরজায় হাত রেখেছে তখন বলরাম রায় জিগ্যেস করলেন, ‘আমরা কি কেসটাকে ক্লোজড বলে ধরব, স্যার?’

বিপ্রদাস বলল, ‘আগে ফরেনসিক আর ইনকোয়েস্টের রিপোর্টগুলো পাই, তারপর বলব। ভালো কথা, কাইন্ডলি ওই সি.সি. টিভির ফুটেজের একটা কপি করিয়ে রাখবেন। আমি পরশুদিন এসে নিয়ে যাব।’

.

হাসপাতাল এবং থানা ঘুরে বিপ্রদাস যখন নিজের বাড়িতে ঢুকল তখন বাজে সাড়ে তিনটে। মৌসুমী বাইরের ঘরের সোফায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলল। বিপ্রদাস অপরাধীর মতন মুখ করে বলল, ‘না খেয়ে বসে আছ নাকি?’

উত্তর এল, ‘যতদিন কাউকে বিয়ে করে ঘরে না নিয়ে আসছ ততদিন থাকতেই হবে। তাড়াতাড়ি চান সেরে এসো। নমিতাদির বাসন মাজতে আসার সময় হয়ে গেল।’