আট
বিপ্রদাস ওয়ারিয়ার কয়লা-বস্তির উদ্দেশে বেরিয়ে যাবার একঘণ্টার মধ্যে ও.সি. সুধীর মাইতি থানা থেকে বেরিয়ে দুর্গাপুর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। একাই। আপ অগ্নিবীণা এক্সপ্রেসের এ.সি. কোচ থেকে যারা নামলেন তাঁদের মধ্যে দুজন ছিলেন তাঁর অতিথি। তাঁরই রিকোয়েস্টে ওদের আজ এখানে আসা।
অ্যারেঞ্জমেন্টটা এখনো অবধি তিনি যথাসাধ্য গোপন রেখেছেন। এমনকী বিপ্রদাসকেও এ-ব্যাপারে কিছু বলেননি। কারণ আছে। এই ধরনের কাজে হঠাৎ স্ট্রাইক করতে হয়; না-হলে সব ঘেঁটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিছুদিন আগে এক ট্রান্সপোর্ট-কোম্পানির অফিসে রেইড করার সময় তিনি নিজের চোখে দেখেছেন, পুলিশ এসেছে এই খবরটা পাওয়া মাত্রই চেন্নাইয়ের মেন-সার্ভার থেকে এখানে দুর্গাপুরের টার্মিনালগুলোর সব ডেটা কীভাবে উড়িয়ে দিয়েছিল। আজকে তাই তাঁর প্ল্যান, যতক্ষণ না প্রদীপ কামাথের ল্যাবরেটরির কম্পিউটারগুলোর কন্ট্রোল হাতে পাচ্ছেন, ততক্ষণ শুভময় চ্যাটার্জি আর বলরাম রায়কে চোখের আড়াল হতে দেবেন না। মোবাইলে হাত ঠেকাতেও দেবেন না।
গেস্ট দুজনের মধ্যে একজনের নাম নাম অনির্বাণ মিত্র। বয়স ত্রিশের নীচে। রোগা ছোটখাটো চেহারা। পিঠে ল্যাপটপের ব্যাগ, কানে ইয়ারপ্লাগ। উপরন্তু চুলের রগ-চাঁছা ছাট এবং ঠোঁটের নীচে ছাগলদাড়ি দেখলে তাকে কোনো ব্যাক-অফিসের আই-টি ভাই ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় না। কিন্তু যারা জানে শুধু তারাই জানে, অ্যানিমিটারের মতন এথিকাল-হ্যাকার ইস্টার্ন রিজিয়নে খুব কমই আছে (ওর মেল অ্যাকাউন্টের নাম অ্যানিমিটার)। ক্যালকাটা পুলিশের সাইবার-ক্রাইম শাখা বিশেষ-বিশেষ ক্ষেত্রে ওর সাহায্য নিয়ে থাকে। আজ সেরকমই একটা বিশেষ কাজে অনির্বানের দুর্গাপুরে আগমণ।
দ্বিতীয়জনের কথা আমরা আগে একটু শুনেছি। সায়েন্স কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সত্যপ্রিয় বসাক। বয়স সাতান্ন। গোলগাল বেঁটেখাটো চেহারা। ছটফট করে ঘুরে বেড়ান, তড়বড় করে কথা বলেন। পোশাক-আশাক সবসময়েই গুরুচণ্ডালী দোষে দুষ্ট। তখনও যেমন, খুব দামি স্ট্রাইপড ফর্মাল শার্টের ওপরে একটা ক্যাটকেটে হলুদ সস্তার উইন্ডচিটার চাপিয়ে প্লাটফর্মের চা-ওলার থেকে ভাঁড়ের চা খাচ্ছিলেন।
সুধীর মাইতি খুঁজেপেতে দুজনকেই কালেক্ট করে নিজের গাড়িতে তুললেন। গতকালই হেড-কোয়ার্টারের পারমিশন নিয়ে উনি এই দুজনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেছিলেন। পুলিশের ডাক বলে কথা, কাজেই বিস্তারিত কিছু না জেনেও দুজনেই আসতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন।
তবে তারপরেও মাইতি-সাহেবের একটা দায়িত্ব থাকে কাজের নেচারটা সম্বন্ধে আগে থেকে ওদের একটু ওয়াকিবহাল করে রাখা।
স্টেশন থেকে সিমবায়োটিকের ক্যাম্পাসে পৌঁছতে যে মিনিট কুড়ি সময় লাগে, সেই সময়টুকুই মাইতিসাহেব কাজে লাগালেন। প্রদীপ কামাথের আশ্চর্য আত্মহত্যার কথা বললেন। তাঁর রিসার্চ-অ্যাসিস্ট্যান্ট তিতলি যাদবের অন্তর্ধানের কথা বললেন। এমনকী ফুলবাগানের এক উঠতি মাফিয়ার সঙ্গে যে তিতলি যাদবের যোগাযোগ থাকতে পারে, সে-কথাও লুকোলেন না।
এই অবধি শুনে গাড়ির জানলা দিয়ে পানমশলার পিক ফেলে অনির্বাণ মিত্র বলল, ‘আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি স্যার?’
সুধীর মাইতি বললেন, ‘সিমবায়োটিকের ক্যাম্পাসে যাচ্ছি ব্রাদার। ডক্টর কামাথের ল্যাবরেটরিটা কালকের মধ্যে আনসিল করে দিতে হবে। ওপরতলা থেকে হেভি চাপ আসছে। আপনাদের দুজনের কাছে অনুরোধ, তার আগে ওই ল্যাবরেটরি থেকে যতটা সম্ভব ইনফর্মেশন আমাকে জোগাড় করে দিন। ল্যাবরেটরির নোটবুক, ইনস্ট্রুমেন্টস, স্যাম্পল, স্লাইড এগুলো, প্রফেসর বসাক, আপনি দেখে নিন। আর অনির্বাণ ভাই! তুমি ওই রুমের কম্পিউটারগুলো থেকে ডাটা রিকভার করো।’
‘ওক্কে’। অনির্বাণ আবার ইয়ারপ্লাগ দুটো কানে গুঁজে, ফেডেড জিনসের হাঁটুর ওপরে আঙুল দিয়ে র্যাইপের বোল তুলল।
সত্যপ্রিয় বসাকের প্রতিক্রিয়াটা অত সহজ হল না। সুধীর মাইতির কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই তিনি বললেন, ‘তিতলি নামে মেয়েটি ছিল আমার স্টুডেন্ট। আমিই ওকে ডক্টর কামাথের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে সিমবায়োটিকে রেফার করেছিলাম। আপনি সেটা জানেন নিশ্চয়ই।’
সুধীর মাইতি বললেন, ‘জানি স্যার। ওর পার্সোনাল ফাইলে সেই রেকমেন্ডেশন লেটার দেখেছি।’
‘আই সি।’ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে রইলেন প্রফেসর বসাক। তারপর বললেন, ‘তারপরেও আমাকেই এই কাজের জন্যে ডাকলেন কেন? অ্যাম আই আন্ডার ইওর স্ক্যানার? আমাকে কি আপনারা কোনোভাবে সন্দেহ করছেন?’
‘হা-হা’ করে উঠলেন সুধীর মাইতি। ‘কী বলছেন স্যার? আপনাকে ডাকলাম কারণ আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ডক্টর কামাথের কাজের যে ফিল্ড, জিন গ্র্যাফটিং না জিন এডিটিং কী যেন বলেন আপনারা, ও-ব্যাপারে আপনিও একজন অথরিটি। ইন-ফ্যাক্ট, আপনারা দুজনে কিছুদিন আমেরিকার একই ইনস্টিটিউটে পড়িয়েছিলেন। দ্বিতীয় একটা কারণও আছে অবশ্য। আমার সন্দেহ তিতলি যাদব কলকাতা থেকে এখানে আসার সময়, আপনাদের সায়েন্স কলেজ থেকে কিছু ডাটা, কিছু নো-হাও চুরি করে এনেছিল। আপনি যদি সার্চ-টিমের মধ্যে থাকেন, তাহলে চট করে সেগুলোকে আইডেন্টিফাই করতে পারবেন।’
প্রফেসর বসাক একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে বসলেন। নিজের মনেই বললেন, ‘তিতলি একটা অদ্ভুত মেয়ে ছিল, জানেন। ওরকম ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট আমি আমার এই পঁচিশ-বছরের টিচিং-লাইফে কমই দেখেছি। যেমন ব্রিলিয়ান্ট তেমনি পরিশ্রমী। জিন গ্র্যাফটিং-এর ফিল্ডে দেশ-বিদেশের কোথায় কী ইন্টারেস্টিং কাজ হচ্ছে, সব খবর যেন ওর নখদর্পণে থাকত। কিন্তু একইসঙ্গে কী বলব একটু যেন অস্বাভাবিকও লাগত ওকে।’
‘কেন বলুন তো।’ প্রশ্ন করলেন মাইতিসাহেব।
‘আমি এর আগে কাউকে এত তৃপ্তি নিয়ে প্যারাসাইটোলজির চর্চা করতে দেখিনি। আপনি জানেন কিনা জানি না, প্যারাসাইটরা যেভাবে হোস্টদের তিলে-তিলে খুন করে সেটা এক বীভৎস ব্যাপার। দেখলে গা গুলিয়ে যায়। আমরা তো কোন ছাড়, স্বয়ং চার্লস ডারউইন অবধি একবার বলেছিলেন, ঈশ্বর প্যারাসাইট সৃষ্টি করেছেন এটা ভাবতে পারি না। অথচ ওই মেয়েটা, ওই তিতলি যাদব, বিশ্বাস করুন ওকে আমি নিজের চোখে দেখেছি হাতের পাতায় বোলতার লার্ভা নিয়ে তাদের চুমু খাচ্ছে। এই প্যাশনটা আমার অস্বাভাবিক লাগত।’
সুধীর মাইতি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘যাদের খুব টর্চারড চাইল্ডহুড থাকে স্যার, তাদের মনটা কোনো না কোনোভাবে বিকৃত হয়েই যায়। তিতলির শৈশব আর কৈশোর কেটেছিল নরকের মধ্যে। ওর পক্ষে এই অস্বাভাবিকতাটাই তাই স্বাভাবিক। চলুন দেখবেন, হয়তো ডক্টর কামাথের ল্যাবরেটরির মধ্যে ওর প্যাশনের আরো কিছু চিহ্ন খুঁজে পাবেন আপনি।’
প্রফেসর বসাক বললেন, ‘সম্ভব। খুবই সম্ভব। সেকেন্ড-ইয়ারের শেষদিকে ও আমাদের ইনস্টিটিউটের মধ্যেই এমন একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছিল, যেটা অন্য কোনো স্টুডেন্ট করলে আমি তাকে রাস্টিকেট করতাম। ওকে যে করিনি তার প্রথম কারণ, ও ছিল আউটস্ট্যান্ডিং। চিরকালই মাস্টারমশাইরা ক্লাসের ফার্স্টবয় কিম্বা ফার্স্টগার্লের দুষ্টুমিকে একটু ক্ষমার চোখে দেখেন। কী? দেখেন না? আর দ্বিতীয়ত, আমরা জানতাম ও খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করছে।’
সুধীর মাইতি সামনের সিট থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কী করেছিল স্যার।’
‘আপনি বিশ্বাস করবেন না, ওই বয়সের একটা মেয়ে, যে তখনো মাস্টার্স করেনি, সে একটা পোকার জিনকে প্রায় এডিট করে ফেলেছিল। তিতলি এটা করেছিল একদম কারেন্ট একটা টেকনোলজি কাজে লাগিয়ে, যেটাকে বলে ক্রিস্পার এনজাইম টেকনোলজি। চিন্তা করতে পারেন, সেই কাজে ভাইরাসের আর.এন.এ.-র বদলে ”লিপিড-ন্যানো-পার্টিকল” ইউজ করেছিল!’
‘সেটা কী জিনিস?’
‘সহজ করে বলছি। ধরুন আপনি একটা সেলের জিন-এডিটিং করতে চাইছেন। নতুন জিনটাকে সেলের ভেতরে ঢোকানোর জন্যে আপনি কোনো একটা ভাইরাসের আর.এন.এ.-কে ইউজ করলেন। তখন হবে কি, মাদার-সেলের ইমিউনিটি-সিস্টেম ওই বাইরের ভাইরাসকে চিনতে পেরে সঙ্গে-সঙ্গে তাকে মেরে ফেলবে। আপনার এক্সপেরিমেন্টটা ফেল করবে। লিপিড-ন্যানো-পার্টিকল সেদিক থেকে অনেক বেটার ক্যারিয়ার। ইমিউনিটি-সিস্টেম লিপিড-ন্যানো-পার্টিকলকে আউটসাইডার বলে বুঝতে পারে না।’
সুধীর মাইতি বললেন, ‘তিতলি কী যেন একটা অপরাধ করেছিল বলছিলেন।’
‘হ্যাঁ, সেটাই তো বলছি। যখনকার কথা বলছি, তার মাত্র মাস-দুয়েক আগে জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটিতে বসে ডক্টর প্রদীপ কামাথ এই লিপিড টেকনোলজিকে ঘসে মেজে কাজে লাগানোর মতন জায়গায় নিয়ে এসেছিলেন। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা মাস্টারমশাইরাও পুরোপুরি জানতাম না সেই টেকনোলজির কথা। অথচ আমাদের ওই ছাত্রীটি মাত্র বাইশ বছর বয়সে সেই টেকনোলজির কথা জেনেছিল শুধু তাই নয়, আমাদের সায়েন্স-কলেজের ল্যাবরেটরিতে বসেই সেই টেকনোলজি কাজে লাগিয়ে ফেলেছিল।
‘ভাবতে পারছেন, একটা জিনকে প্রায় এডিট করে ফেলেছিল ওই মেয়ে। এটা তো অপরাধ। জিন-এডিটিং তো ছেলেখেলা নয়। আমাদের অজান্তেই একটা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তৈরি হয়ে যেতে পারত কিনা বলুন। ভাগ্যিস একেবারে শেষ মুহূর্তে আমাদের এক লেকচারারের চোখে পড়ে যায় ব্যাপারটা, তাই ওগুলোকে নষ্ট করে ফেলা গেছিল।’
সুধীর মাইতির পরের কথাগুলো শুনে বোঝা গেল, তাঁর ভাবনা নিজের লাইন ধরেই এগোচ্ছে। তিনি বললেন, ‘তাহলে সিমবায়োটিকের মতন একটা অ্যাডভান্সড ল্যাবরেটরি যদি ওই মেয়ের হাতে এসে যায়, এবং তার সঙ্গে ডক্টর কামাথের লুকোনো নো-হাও, তাহলে ও কী করতে পারে বলে আপনার ধারণা?’
সত্যপ্রিয় বসাক মাথাটা দু-দিকে নাড়লেন। বললেন, ‘সেটা আমি ভাবতে পারছি না। ভাবতে চাইছিও না। দেখুন মিস্টার মাইতি, সিমবায়োটিকের নিজস্ব একটা ইন্টার্নাল-সিকিউরিটি সিস্টেম তো থাকবেই। যে-কেউ ওদের ল্যাবরেটরির মধ্যে যা ইচ্ছে করে যাবে আর ওরা তা জানতে পারবে না, তা তো হয় না।
‘আর তাছাড়া ডক্টর কামাথকে আমি খুব ভালো করে চিনতাম। উনি অনেক বছর ধরে বিভিন্ন বণিক-সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন। ওইসব কাজে মন্ত্রগুপ্তি হচ্ছে প্রথম শর্ত। না-হলে সুযোগ পেলেই এক সংস্থার কাজ অন্য সংস্থা চুরি করে নিয়ে পালাবে। তাই ডক্টর কামাথ নিজের নো-হাও সামান্য একজন রিসার্চ-অ্যাসিস্ট্যান্টের হাতে তুলে দেবেন এটাও অভাবনীয়।’
সুধীর মাইতি বললেন, ‘যদি এরকম হয় যে, তুলে দিয়েছিলেন বলেই ওঁকে সুইসাইড করতে হল।’
সত্যপ্রিয় বসাক কিছুক্ষণ চোখ বড়-বড় করে মাইতিসাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আপনমনেই বললেন, ‘সেখানে ক্রাইমের অ্যাঙ্গেল চলে আসছে। দ্যাট ইজ নট মাই কাপ-অফ-টি। ও-ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না।’
রাত ন’টার সময় সুধীর মাইতির পুলিশকার জোরালো হর্ন মেরে সোজা পোর্টিকোর নীচে গিয়ে দাঁড়াল। সিকিউরিটির লোকজন কাউকে কিছু জানানোর সুযোগই পেল না। চটপটে পায়ে শুভময় চ্যাটার্জির অফিসে ঢুকে মাইতি-সাহেব দেখলেন, ভাগ্য ভালো। বলরাম রায়ও ওখানেই বসে আছেন। আলাপ পরিচয়ের পালা সাঙ্গ হতেই মাইতি-সাহেব বলে দিলেন, আমি পারমিসন না দেওয়া অবধি কম্পিউটারের দিকে হাত বাড়াবেন না। মোবাইলগুলোও টাচ করবেন না। সোজা আমাদের নিয়ে কামাথের ল্যাবরেটরিতে চলুন। আপনাদের সামনে সিল খুলব, আমার এই সহকারীরা কম্পিউটারের কন্ট্রোল নিজেদের হাতে নেবেন। তারপরে ফোনে হাত ঠেকাবেন। ক্লিয়ার?’
চ্যাটার্জি আর রায় দুজনেই হতভম্বমুখে ঘাড় হেলালেন এবং মাইতিসাহেবের টিমকে নিয়ে প্রদীপ কামাথের ল্যাবরেটরিতে ঢুকলেন। অনির্বাণ চটপট দুটো ডেস্কটপ চেক করে নিয়ে মাইতিসাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘প্রবলেম নেই স্যার। মেন-সার্ভার এখানেই আছে। বাইরে থেকে কেউ কিছু করতে পারবে না।’
এতক্ষণে শুভময় চ্যাটার্জি গলার আওয়াজ খুঁজে পেলেন। বললেন, ‘অত্যন্ত আঘাত পেলাম স্যার। আমাদের একটা রেপুটেশন আছে। ওসব ছ্যাঁচড়ামি আমরা করব না।’
সুধীর মাইতি বাঁকা হেসে বললেন, ‘সে তো বটেই। রেসপেক্ট আছে বলেই না প্রদীপ কামাথ যখন তিতলির সঙ্গে এই ঘরে শুত, তখন সি.সি. টিভি অফ করে রেখে দিতেন। যাই হোক, এখন আপনারা থাকতেও পারেন, কেটেও পড়তে পারেন। যাবার আগে যখন ঘরটা আনসিল করব, তখন আবার কিছু কাগজপত্রে সই লাগবে। তার আগে অবধি আপনারা ফ্রি।’
ওরা দুজন এক-পা দু-পা করে পিছিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেলেন। সেখান থেকেই শুভময় চ্যাটার্জি বললেন, ‘আমরা তাহলে নিজেদের ঘরে গিয়ে বসছি স্যার। এখানে বিজয় রইল, আমাদের সিকিউরিটি গার্ড। খুব ভালো ছেলে। যদি কিছু প্রয়োজন হয় ওকে বলবেন।’
সুধীর মাইতি মুচকি হেসে বললেন, ‘বিপ্রদাস বলছিল, আপনারা নাকি খুব দামি চা খান। মাঝে-মাঝে আপনাদের সেই চা-টা পাঠিয়ে দেবেন; আর ঘণ্টাখানেক বাদে ডিনার। আর কিছুর প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না। আপনাদের দুজনেরই ফোন নম্বর আমার কাছে আছে। দরকার হলে ফোনেই জানাব।’
‘আওয়ার প্লেজার স্যার। এক্ষুনি এক রাউন্ড চা পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ এই বলে শুভময় চ্যাটার্জি বলরাম রায়কে সঙ্গে নিয়ে লিফটের দিকে পা বাড়ালেন।
.
সুধীর মাইতি খেয়াল করেছিলেন ল্যাবরেটরিতে ঢোকামাত্রই প্রফেসর সত্যপ্রিয় বসাকের চোখেমুখে এক-ধরনের মুগ্ধতা ফুটে উঠেছিল। উনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, কোন যন্ত্রের দাম কতখানি আর তাদের দিয়ে কী-কী কাজ করানো যায়। তিনি প্রফেসরের পাশে দাঁড়িয়ে গলা নামিয়ে বললেন, ‘একধার দিয়ে সবকিছু দেখে যান স্যার। আউটকাম অফ এক্সপেরিমেন্টটা কিছু বুঝতে পারেন কিনা দেখুন।’
প্রফেসর বসাক একবার আড়চোখে মাইতি-সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অত সহজ নয়। এসব জায়গায় কোডেড ল্যাঙ্গুয়েজে ছাড়া কেউ কিছু লেখে না। কম্পিউটারাইসড ইনভেন্ট্রির সঙ্গে মিলিয়ে না দেখলে, শুধু টেস্টটিউব কিম্বা স্লাইড দেখে কিছুই বুঝতে পারব না।’
ওদিকে অনির্বাণ ততক্ষণে ঘরের দুটো ডেস্কটপ কম্পিউটারের মধ্যে একটার সামনে বসে গেছে। একটার পর একটা উইন্ডো ওর মাউসের ক্লিকে খুলে যাচ্ছিল।
একটু বাদে সে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে মাইতি-সাহেবের দিকে তাকালো। মাইতিসাহেব জিগ্যেস করলেন, ‘কী হল?’
‘এই ফাইলটা সিকিওর করা ছিল দেখে খুললাম। খুলে দেখছি রিসার্চ-সংক্রান্ত কিছু নয়; সবই মিস্টার কামাথের পার্সোনাল ট্রানজাকশনস। তবে ইন্টেরেস্টিং। ভদ্রলোক প্রতিভাবান ছিলেন নিশ্চয়ই, কিন্তু জীবনটাকেও উপভোগ করতে জানতেন। মাস্টারমশাই ফস করে এদিকে চলে আসবেন না তো?’
মাইতিসাহেব বললেন, ‘আরে না, না। উনি ওইদিকে একটা ইলেকট্রিক গিটারের মতন মেশিনের সামনে বসে তন্ময় হয়ে কী যেন দেখছেন। কী দেখাবে দেখাও না।’
কী-বোর্ডের ওপরে দু-চার ঠোক্করে একটা ফোটো অ্যালবাম খুলে গেল। হালকা দাড়ি এবং শার্প নাক-মুখ নিয়ে প্রদীপ কামাথ সুদর্শনই ছিলেন। ছবিতে তার পরনে ছোট ট্রাঙ্ক আর কাঁধে রঙিন টাওয়েল। চোখে শেডস। সঙ্গে মানানসই এক বিকিনি-সুন্দরী। পটভূমি মনে হয় গ্রীস কিম্বা ইতালির কোনো সমুদ্রসৈকত।
একটা ন্যুডিস্ট-বীচেও অন্য এক সুন্দরীর সঙ্গে প্রদীপ কামাথের বেশ ঘনিষ্ট মুহূর্তের অনেকগুলো ছবি দেখা গেল। সেই সুন্দরীর শরীরে সানক্রিম ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
প্রফেসর বসাকের সাড়া পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে অনির্বাণ ওই অ্যালবাম থেকে বেরিয়ে কেমন করে যেন অবলীলায় কামাথের সিকিওরড ব্যাঙ্ক-অ্যাকাউন্টে ঢুকে পড়ল এবং মন্তব্য করল, ‘তবে সমস্ত একস্ট্রাভ্যাগেন্স সত্বেও প্রদীপ কামাথ স্টিল রিমেইনড আ রিচ ম্যান। ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স তো তাই বলছে।’
মাইতি-সাহেব তাই শুনে স্বগতোক্তি করলেন, ‘অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয় আরো এক বিপণ্ণ বিস্ময়। লোকটার জীবনে পয়সার অভাব ছিল না। প্রেমের অভাব ছিল না। তাহলে সুইসাইড করল কেন? জ্যোৎস্নায় দেখিল সে কোন ভূত?’
অনির্বাণ কথাগুলো ঠিকমতন বুঝতে না পেরে শ্রাগ করল। তারপর অন্য ফোল্ডারগুলো চেক করতে শুরু করল। করতে-করতে একটা ফাইলে এসে সে আটকে গেল। মিনিট পনেরো কাজ করার পরেও ফাইলটা ওপেন করতে পারল না। এমনিতেই শীতকাল। উপরন্তু ঘরে হালকা করে এসি চলছিল। তবু ওর কপালে ফোঁটা-ফোঁটা ঘাম জমে উঠল। সুধীর মাইতি কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরে বললেন, ‘কী হয়েছে ব্রাদার?’
অনির্বাণ বলল, ‘মনে হচ্ছে এই কম্পিউটারটা আগেই কোনো হ্যাকারের হাতে পড়েছিল। কয়েকটা ফাইল এমনভাবে পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রোটেক্ট করেছে যে, খুলতে কালঘাম ছুটে যাচ্ছে। তবে খুলে আমি ছাড়বই।’
ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, এবং ওইভাবে টানা চল্লিশ-মিনিট চেষ্টা করার পর শেষ অবধি খুলেও ফেলল সেটাকে।
চেয়ার ছেড়ে উঠে আড়মোড়া ভেঙে অনির্বান বলল, ‘এবার মাস্টারমশাইকে বলুন টেক আপ করতে। এসব আমার ফিল্ড নয়। আমি বরং একটু ধোঁয়া খেয়ে আসি।’
অনির্বাণ কিছু ভুল বলেনি। ও বেরিয়ে যাওয়ার পর সুধীর মাইতি মনিটরে স্ক্রল করে দেখলেন, বিভিন্ন ফাইলে পাতার-পর-পাতা শুধু নানান মলিকিউলের বন্ডিং-এর জটিল থেকে জটিলতর ডায়াগ্রাম, কেমিকাল ইকুয়েশন এবং ডি.এন.এ.-র বিখ্যাত সেই ডাবল হেলিক্স। তার প্যাঁচের একেক জায়গায় একেক রকম রং—বোধহয় জিন এডিটিং-এর সূত্র। তাছাড়াও রয়েছে প্রচুর ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়ার কুষ্ঠি ঠিকুজি।
প্রফেসর সত্যপ্রিয় বসাক তখন অন্যান্য সব মেশিন চেক করা শেষ করে একটা ক্রায়োজেনিক-কনটেনারের ভেতর থেকে একটার পর একটা টেস্টটিউব বার করে কী যেন দেখছিলেন। মাইতি-সাহেব ডাকলেন, ‘একটু এদিকে আসবেন স্যার?’
‘বলুন।’ তাঁর ডাক শুনে এগিয়ে এলেন প্রফেসর বসাক।
‘দেখুন, এই কম্পিউটারটায় ডক্টর কামাথের ওয়ার্কিং-শিটসগুলো রয়েছে। এগুলো দেখে আপনি কিছু আন্দাজ করতে পারবেন, ওঁর কাজ কিরকম এগোচ্ছিল? আচ্ছা, তার আগে ওঁর প্রোজেক্টটার কথা আপনাকে একটু বলে দিই।’
‘ওঁর প্রোজেক্টের ব্যাপার আপনি কোত্থেকে জানলেন?’
‘এই ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর মিস্টার চ্যাটার্জিকে একটু আগে দেখলেন না? উনিই বলেছিলেন। আমাকে বলেননি অবশ্য। বলেছিলেন আমার সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট বিপ্রদাস মণ্ডলকে।’
মাইতিসাহেব সংক্ষেপে প্রদীপ কামাথের স্পার্ম-সেল মডিফাই করার প্রোজেক্টটা সত্যপ্রিয় বসাককে বুঝিয়ে বললেন। তারপর পকেট থেকে মোবাইলটা বার করলেন। সোয়া-দশটা বাজল। বাড়িতে একটা ফোন করে জানিয়ে দেওয়া উচিত, ফিরতে দেরি হবে। তাছাড়া এই দুজন গেস্টের রাতে থাকার অ্যারেঞ্জমেন্টও করতে হবে, অবশ্য যদি রাতের মধ্যে কাজ শেষ হয় তবেই।
কিন্তু পকেট থেকে ফোনটা বার করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই সুধীর মাইতির মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি চাপা-স্বরে বললেন। ‘ওহ গড। ওহ মাই গড।’
ও.সি. সাহেবের অবস্থা দেখে অনির্বাণ এবং প্রফেসর বসাক দুজনেই নিজেদের চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে তাঁর দু-পাশে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘কী হল মাইতিসাহেব?’
‘কিছু না। কিছু না। ইউ প্লিজ ক্যারি অন। আমি আধঘণ্টার জন্যে একটু আসছি।’
সিকিউরিটির ছেলেটি অবাক হয়ে দেখল, থানার বড়বাবু লিফটের কথা ভুলে গিয়ে দুড়দাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাচ্ছেন। শুধু নেমে যাচ্ছেন তাই নয়, নামতে-নামতেই তারস্বরে কাদের যেন অর্ডার দিয়ে যাচ্ছেন। কয়েকটা কথাই মাত্র শুনতে পেল বিজয় নামে সেই ছেলেটি। ফোর্স রেডি রাখো। হ্যাঁ হ্যাঁ, এক্ষুনি বেরোব। বললাম তো যতজনকে পারো ইত্যাদি।
পনেরো মিনিট নয়। আধঘণ্টা বাদে পুলিশের ইউনিফর্ম পরে এক চলন্ত পাহাড় ল্যাবরেটরি-ঘরে এসে ঢুকলেন। অত স্থূলকায় যে-কোনো মানুষ হতে পারেন বিশ্বাস করা মুস্কিল। অনির্বাণ আর প্রফেসর বসাক হা করে তাঁর দিকে তাকিয়েছিলেন। পাহাড়প্রমাণ লোকটি যখন কথা বললেন, তখন দেখা গেল তাঁর গলার স্বরটা বাচ্চাছেলের মতন সরু। সেই চিকন-গলাতেই তিনি বললেন, ‘নমস্কার। আমি সাব-ইনস্পেকটর হরিনাথ পাল। মাইতি-সাহেব আমাকে বললেন, এখানে এসে বসে থাকতে। ওঁরা সবাই থানা ফাঁকা করে বেরিয়ে গেল।’
সত্যপ্রিয় বসাক বললেন, ‘কোথায় গেল?’
হরিনাথ পাল উত্তরটা দিতে যাচ্ছিলেন। অনির্বাণ হাত তুলে তাঁকে থামাল। তারপর দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মিস্টার চ্যাটার্জি, আপনি কিছু বলছেন?’
পাহাড়ের পেছন থেকে শুভময় চ্যাটার্জি যে উঁকি মারছেন, সেটা আর কেউ খেয়াল করেনি। শুধু অনির্বাণই দেখেছিল। শুভময় চ্যাটার্জি বললেন, ‘হ্যাঁ। মানে আমাকেও মাইতিসাহেব এইমাত্র ফোন করেছিলেন। বললেন, একটা বিশেষ কাজে বেরিয়ে যেতে হচ্ছে। উনি না ফেরা অবধি পালসাহেব এখানকার চার্জে থাকবেন।’
হরিনাথ পাল গর্বিত-ভঙ্গিতে হাসলেন।
মিস্টার চ্যাটার্জি তখনো দাঁড়িয়েছিলেন। অনির্বাণ বলল, ‘আর কিছু বলবেন?’
‘আপনাদের ডিনারের ব্যবস্থা করেছিলাম। রাত হয়ে গেছে। তা, আপনারা ডাইনিং-রুমে যাবেন, না এখানেই পাঠিয়ে দেব?’
ওরা কেউ কিছু বলার আগেই সাব-ইনস্পেক্টর পালসাহেব কচি-গলায় বললেন, ‘এখানেই পাঠিয়ে দিন। ডিউটি-আওয়ারের মধ্যে আমরা পোস্ট ছেড়ে নড়ি না।’
‘ওকে স্যার।’ মিস্টার চ্যাটার্জি চলে গেলেন।
অনির্বাণ বলল, ‘হ্যাঁ, পালসাহেব, এবার বলুন তো, কী হয়েছে।’
‘কী আর বলব স্যার? মাইতিসাহেব একটু আগে নাকি ফোন খুলে দেখেছেন, বিপ্রদাস হোয়াটস্যাপ মেসেজ পাঠিয়েছে। লিখেছে, ‘কী হল স্যার আপনাদের? আমি যে লিখে পাঠালাম, আর্জেন্ট চলে আসুন। ওরা তো পালাবার প্ল্যান করছে।’
প্রফেসর বসাক অবাক হয়ে বললেন, ‘বিপ্রদাস মানে তো আপনাদের সেকেন্ড-অফিসার। তিনি লিখে পাঠিয়েছিলেন? জানি না বিপ্রদাসবাবু কোথায় গিয়েছেন, কোন কাজে গিয়েছেন। কিন্তু লিখে যখন পাঠিয়েছিলেন, তখন দেরি করা তো ঠিক হয়নি।’
‘আরে ধুউউর।’ নাক দিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করে হরিনাথ পাল একটা চেয়ারে সাবধানে বসলেন। তারপর বললেন, ‘পাঠিয়েছিল বোধহয় ওর পেয়ারের ড্রাইভার সুজিতের হাত দিয়ে। সে-চ্যাংড়া তো থানাতে ফেরেইনি। ফিরলে কি আর আমরা বসে থাকি? কোথাও বোধহয় মদ-টদ খেতে বসে গেছে।’
‘তারপর?’ ওরা দুজনে একসঙ্গেই প্রশ্ন করল। হরিনাথ পাল বললেন, ‘তারপর ওই মেসেজ দেখে এই দশমিনিট আগে সবাই ওয়ারিয়ার দিকে দৌড়ল। আমার আবার দৌড়োদৌড়ি, খুনজখম ওসব ভালো লাগে না। মাইতিসাহেব সেটা জানেন। উনি বললেন, হরি! তুমি তাহলে সিমবায়োটিকে চলে যাও। মনে রাখবে, যতক্ষণ আমি না ফিরছি, তুমিই স্টেটকে রিপ্রেজেন্ট করছ। কেয়ারফুল থাকবে।’
কথাটা বলতে-বলতেই হরিনাথবাবু হাতের ধাক্কায় একটা কাচের বিকারকে টেবিল থেকে মেঝেতে ফেলে ভাঙলেন। বিরক্তমুখে বললেন, ‘জায়গাটা বড্ড ছোট, তাই না? এদের পয়সা আছে, রুচি নেই। ওই তো খাবার এসে গেছে। রাখুন, এখানে রাখুন।’
যে মেয়েদুটি খাবারের প্যাকেট, জলের বোতল ইত্যাদি নিয়ে এসেছিল, তারা সেগুলো নামিয়ে রেখে ঘর থেকে বেরোবার আগেই হরিনাথবাবু তাঁর বিশাল থাবায় একটা প্যাকেটের যাবতীয় স্যান্ডুইচ, পেস্ট্রি, সন্দেশ সব একসঙ্গে মুখে পুরে চিবোতে শুরু করলেন। অনির্বাণ আর সত্যপ্রিয় বসাক নিজেদের খাওয়া ভুলে, তাঁর ওই বকরাক্ষস মূর্তি দেখছিল আর মনে-মনে ভাবছিল এর উপস্থিতিতে বাকি কাজটা সারবে কেমন করে।
তবে ঈশ্বর করুণাময়। খাওয়া শেষ করেই হরিনাথ পাল বললেন, ‘বিছানাটা দেখে লোভ সামলাতে পারছি না, বুঝলেন। আমি জাস্ট একটু চোখদুটো বুজে গড়িয়ে নিচ্ছি। এরা কোনোরকম নন-কো-অপারেশন করলেই আমাকে ডাকবেন।’ এই বলে তিনি সেই হসপিটাল কটের ওপরে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লেন এবং পাঁচমিনিটের মধ্যে প্রবল নাক ডাকিয়ে স্টেটকে রিপ্রেজেন্ট করতে শুরু করলেন।
সত্যপ্রিয় বসাক একঢোক জল খেয়ে পেপার-ন্যাপকিনে হাত মুছতে-মুছতে বললেন, ‘বাঁচা গেল। চলো অনির্বাণ। আমরা কাজটা শেষ করে ফেলি।’
অনির্বাণ একটু কিন্তু-কিন্তু করে বলল, ‘স্যার। আপনার কাজ নিয়ে বসার আগে একটু এই ছবিগুলো দেখে যাবেন? এগুলোর কি কোনো গুরুত্ব আছে? তাহলে কপি নেব।’
‘কী ছবি? দেখি।’ সত্যপ্রিয় বসাক ঘরের অন্য কোনে, যেখানে অনির্বাণ বসে কাজ করছিল সেদিকে এগিয়ে গেলেন এবং দেখলেন ডেস্কটপ ছেড়ে অনির্বাণ একটা ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। এটা নাকি একটা আলমারির ভেতরের দিকে রাখা ছিল। অনির্বাণ পাশের চেয়ারটা দেখিয়ে বলল, ‘বসুন স্যার। ল্যাপটপটা ডক্টর কামাথ ইউজ করতেন। কিন্তু এর মধ্যে একটা ফাইল বানিয়ে রেখেছেন, যেটার নাম—Titli’s Darlings। তিতলির প্রেমিকেরা। আমি ভাবলাম ব্লু টাইপের কিছু ইয়ে সে যাক। খুলে দেখি একগাদা পোকা আর মাকড়ের ছবি। আপনি একবার দেখুন তো।’
প্রফেসর মণ্ডল মনিটরের দিকে চেয়ারটা আরেকটু এগিয়ে নিলেন। মিনিট পাঁচেক ভালো করে দেখার পর উনি বললেন, ‘সবগুলোই তো দেখছি কোনো না কোনো প্যারাসাইটের host-এর ছবি। অ্যাকচুয়ালি, প্যারাসাইট এদের শরীরে ঢুকে গেছে; সেই অবস্থাতেই ছবিগুলো তোলা হয়েছে। তবে ডক্টর কামাথ ফাইলের নামটা ভুল কিছু দেননি। একটু আগে বলছিলাম না, তিতলি এই প্যারাসাইট গুলোকে চুমু খায়।’
অনির্বাণ বলল, ‘স্যার, আমি কিন্তু আই.টি.-র স্টুডেন্ট। প্যারাসাইট ব্যাপারটা যদিও বা আবছা-আবছা বুঝি, host কথাটা তো একেবারেই বুঝছি না।’
‘বলছি। প্রাণী জগতে বহু প্যারাসাইট আছে যারা বেঁচে থাকবার জন্যে অন্য কোনো প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল। যাদের ওপর প্যারাসাইট নির্ভর করে সেই প্রাণীগুলোকেই বলা হয় host। একেকটা প্যারাসাইটের হোস্ট নির্দিষ্ট থাকে। মানুষের উকুন যেমন গরুকে ধরে না আবার গরুর গায়ের এঁটুলি মানুষকে কামড়ায় না, বুঝলে?’
‘এখন প্যারাসাইট দু’রকম ভাবে হোস্টদের ব্যবহার করতে পারে। এক, সেই হোস্ট এবং প্যারাসাইট নির্বিবাদে সারাজীবন একসঙ্গে কাটাতে পারে। তখন প্যারাসাইটগুলো হোস্টের শরীরটুকু স্রেফ বাসা বাঁধার জন্যে ব্যবহার করে, কিম্বা বড়জোর সামান্য পুষ্টি চুরি করে। তাতে হোস্টের কোনো ক্ষতি হয় না। আমাদের শরীরের মধ্যেও এরকম অজস্র ব্যাকটেরিয়া বাসা বেঁধে আছে। তাদের মধ্যে অনেকে আমাদের উপকারই করে। আমাদের খাবার হজম করতে সাহায্য করে।’
‘দ্বিতীয় ধরনের প্যারাসাইটরা কিন্তু হোস্টকে মেরে ফেলে নিজেরা বেড়ে ওঠে। সরাসরি মেরে ফেললে বোধহয় হোস্টদের যন্ত্রণা কম হত। কিন্তু অনেক সময়েই প্যারাসাইটরা তা করে না। তারা নিজেদের সুবিধে মতন হোস্টকে দিয়ে স্বভাববিরোধী নানান কাজ করিয়ে নেয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় প্যারাসাইটরা যেন সম্মোহনবিদ্যা জানে। না হলে নিজেদের থেকে লক্ষগুণ বড় হোস্টদের দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করায় কেমন করে?
‘এই ফাইলের ছবিগুলোতে এরকমই কিছু হতভাগ্য হোস্টের ছবি দেখা যাচ্ছে।
‘এই ছবিটা দেখো। এটা একটা শামুক। দেখলে মনে হবে কোথাও কোনো গন্ডগোল নেই, শুধু শুঁড়দুটো কেমন যেন ডোরাকাটা আর স্বাভাবিকের চেয়ে বড়। কিন্তু ও আসলে অলরেডি একজাতের প্যারাসাইটকে ক্যারি করছে। এই প্যারাসাইটগুলো লার্ভা অবস্থায় শামুকের শরীরে বাসা বাঁধে কিন্তু বড়বেলাটা কাটায় পাখির পেটে। তাহলে একসময় না একসময় তো ওদের শামুকের শরীর ছেড়ে পাখির পেটে ঢুকতে হবে। আর তাহলে পাখিকে শামুক খেতে হয়। কিন্তু পাখি যে মোটেই শামুক খেতে ভালোবাসে না। তাহলে কী করা?
‘ওই প্যারাসাইট লার্ভারা যেটা করে, সেটা হল, দল বেঁধে শামুকের শুঁড়ে উঠে বসে থাকে। তখন শামুকের শুঁড়গুলো মোটা হয়ে ফুলে ওঠে। শুধু তাই নয়, কী যেন এক অদ্বুত উপায়ে লার্ভাগুলো শুঁড়ের রংটাকেও পালটে সবুজ আর হলুদ ডোরা ডোরা করে দেয়। তারপর শামুকটাকে এমন হিপনোটাইজ করে যে সে ব্যাটা গাছের মাথায় উঠে এই নতুন চেহারার শুঁড়দুটোকে আচ্ছাসে নাড়াচাড়া করতে শুরু করে। সব মিলিয়ে তখন ওর শুঁড়দুটোকে মনে হয় দুটো পুরুষ্টু শুঁয়োপোকা, যে শুঁয়োপোকা আবার পাখিদের ভারি পছন্দ। ব্যস, তারপরে আর কী? পাখিতে শামুকের শুঁড় ছিঁড়ে নিয়ে মুখে পোরে। শামুকটা মরে, কিন্তু লার্ভাগুলো পাখির পেটের ডেস্টিনেসনে পৌঁছে যায়।’
প্রফেসর মণ্ডলের বিবরণ শুনতে-শুনতে অনির্বাণের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। ও বলে উঠল, ‘থাক থাক। আর টলারেট করতে পারছি না। ঠিক আছে স্যার, আপনার চেনা জিনিস যখন, তখন এটার আর কপি নিচ্ছি না।’
‘দরকার নেই। তুমি বরং একটা কাজ করো অনির্বাণ। এই সমস্ত স্যাম্পেলের কন্টেনারের গায়ে কোড লেখা আছে দেখছ তো? আমি তোমাকে একটা একটা করে কোড বলে যাচ্ছি। তুমি খুঁজে দেখো, ডাটাব্যাঙ্কের মধ্যে সেই কোডের এগেনস্টে কোনো ডেসক্রিপশন খুঁজে পাও কিনা। পেলেই আমাকে বলবে, কেমন?’
অনির্বাণ বলল, ‘ঠিক আছে স্যার। আপনি শুধু একটু চেঁচিয়ে বলবেন। হরিপাল-লোকাল যেরকম সিটি মারছে তাতে কিছু শুনতে পাওয়া মুশকিল।’
হরিনাথ পালের নাকের গর্জন বেড়েই চলেছিল।
