ছয়
একুশে নভেম্বর বিপ্রদাসের ডিউটি ছিল দুপুর দুটো থেকে। কিন্তু তার অনেক আগে, সাড়ে-বারোটা নাগাদ মাইতিসাহেবের ফোন এল, ‘চলে এস। জরুরি কথা আছে।’
মৌসুমী শুনে বলল, ‘তোমাদের মাইতিসাহেব কবে মরবে?’ তারপর থমথমে মুখে মাছ ভাজতে বসল; শুধু ডাল-ভাত তো আর দেওরকে দেওয়া যায় না।
থানার বারান্দায় পা রাখতেই ডিউটি বলল, ‘স্যার, ওসি-সাহেব দু-বার খোঁজ নিয়েছেন, আপনি এসেছেন কিনা।’
বিপ্রদাস বুঝল, সত্যিই খুব সিরিয়াস কিছু ঘটেছে। সে পা চালিয়ে মাইতিসাহেবের ঘরে ঢুকল। ঢোকামাত্রই মাইতিসাহেব তাঁর স্বভাবসিদ্ধ শান্তস্বরে বললেন, ‘বোসো মণ্ডল। বোসো, চা খাও। তোমার জন্যে বোধহয় কিছু ব্রেক-থ্রু জোগাড় করতে পেরেছি। তার জন্যে অবশ্য এই ফাইলটা নিয়ে কাল অনেক রাত অবধি কাজ করতে হয়েছে।’
তিতলি যাদবের পার্সোনাল-ফাইলটাকে তাঁর চাঁপাকলার মতন মোটা- মোটা আঙুলের এক টুসকিতে টেবিলের কাচের ওপর দিয়ে বিপ্রদাসের দিকে হড়কে দিলেন মাইতি-সাহেব।
বিপ্রদাস ভারি অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি স্যার ওই ফাইলটাতে তো তেমন কিছু।’
‘ঠিকই বলেছ। ফাইলটাতে অ্যাপারেন্টলি তেমন কিছু ছিল না, দুটো তথ্য ছাড়া। এক, তিতলি যাদব মেয়েটি বর্ন অ্যান্ড ব্রট আপ পটারি বস্তিতে। জায়গাটা সম্বন্ধে কোনো আইডিয়া আছে?’
বিপ্রদাস দুদিকে ঘাড় নাড়ল।
‘আমার আছে। ক্রিমিনালদের ডেন। দু-নম্বর তথ্য হচ্ছে, ওর ভোটার-কার্ড আধার-কার্ডে যে অ্যাড্রেসই থাকুক, সায়েন্স-কলেজ থেকে সমস্ত সার্টিফিকেট পাঠানো হয়েছিল ফুলবাগানের একটা ঠিকানায়। খুব সম্ভবত তিতলি নিজেই কলেজের কাছে নিজের প্রেসেন্ট-অ্যাড্রেস হিসেবে ওই ঠিকানা দিয়ে রেখেছিল।’
বিপ্রদাস কিছু একটা বলতে গেল। মাইতি-সাহেব তাকে হাত তুলে থামালেন। বললেন, ‘শোনো শোনো। এর পরের পার্টটাই ইন্টেরেস্টিং। জাস্ট এই দুটো তথ্যের ওপরে নির্ভর করে আমি ক্যালকাটা পুলিশের ক্রাইম-ইনফর্মেশন-ব্যুরোতে ফোন করে জানতে চেয়েছিলাম, গত একবছরের মধ্যে পটারি বস্তি আর ফুলবাগান এই দুটো পয়েন্টকে ছুঁয়ে গেছে, এরকম কোনো ক্রাইমের রেকর্ড তাদের কাছে আছে কিনা।
‘সল্টলেকে আমাদের ওই অফিসটা ব্যাপক; মানে ক্রাইম-ইনফর্মেশন- ব্যুরোর কথা বলছি। আমি নিজেও তিন-বছর কাজ করেছিলাম ওখানে। এক-ঘণ্টার মধ্যে ওরা আমাকে উত্তর পাঠাল, গোরখনাথ নামে পটারি-বস্তির এক উঠতি মাফিয়া গত ফেব্রুয়ারি মাসে ফুলবাগানের একটা বাই-লেনের মধ্যে ব্রুটালি খুন হয়েছিল। দিনটা খেয়াল কোরো তেইশে ফেব্রুয়ারি। যেদিন সকালে তিতলি যাদব কলকাতা থেকে এখানে, এই দুর্গাপুরে ল্যান্ড করেছিল।
‘জানতে চাইলাম, কেসটার ফলো-আপ কিছু হয়েছে কিনা। ওরা বলল, না। গোরখনাথের আর্চ-রাইভাল সুরেশ সিং-কে আটক করা হয়েছিল। কিন্তু সেরকম সলিড প্রমাণ দেওয়া যায়নি বলে সে ব্যাটা ছ’মাসের মধ্যে বেরিয়ে গেছে।
‘আমি হতাশ হয়ে ফোন নামিয়ে রাখতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু যে অফিসার আমার কোয়ারির উত্তর দিচ্ছিলেন, গড ব্লেস হিম, তিনিই বললেন, দাঁড়ান, দাঁড়ান। আমি বললাম, কী হল? তাতে সেই অফিসার বললেন, লোকাল থানা গোরখনাথের মোবাইল-নাম্বারটা ওর চ্যালাদের কাছ থেকে জোগাড় করেছিল। আমিই তখন সাইবার-ডিভিশন থেকে ওটাকে ট্রেস করার চেষ্টা করেছিলাম, পাইনি। খুনের পর থেকেই সেই সিমকার্ডের ফোনটা সুইচড অফ ছিল। বুঝতেই পারছেন, মার্ডারাররাই ওটা নিয়ে পালিয়েছিল। তারপর গত তিন-চারমাস আর দেখিনি। আমাকে একটু সময় দিন। একবার এখনকার পজিশনটা চেক করে দেখে নিই।
‘পাঁচমিনিট বাদেই সেই অফিসারের গলা পেলাম। ভয়ঙ্কর উত্তেজিত। বললেন, মাই গুডনেস! আঠারোই অগাস্ট, সেভেন থার্টি পি এম; ভিকটিম গোরখনাথের মোবাইল-ফোনটা চালু হয়েছিল। তারপর থেকে আবার বন্ধ। গত ন’মাসের মধ্যে ওই একবারই ফোনটা খুলেছিল। দশ-সেকেন্ডের একটা আউটগোইং কল ছিল স্যার। যে-নাম্বারে কলটা গিয়েছিল সেটা বলছি। নোট করুন। কী বলছেন? লোকেশন? দাঁড়ান দেখছি। হ্যাঁ স্যার, লিখুন। লোকেশন দুর্গাপুর।’
মাইতি-সাহেবের কথা শুনতে-শুনতে বিপ্রদাস নিজের অজান্তেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থাতেই বলল, ‘আঠারোই অগাস্ট, স্যার! ওইদিন থেকেই তো তিতলি যাদবকে পাওয়া যাচ্ছে না’।
মাইতিসাহেব বিপ্রদাসকে আবার বসে পড়ার জন্যে ইঙ্গিত করলেন। ইতিমধ্যে চা এসে গিয়েছিল। চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে তিনি বললেন, ‘জানি। সিমবায়োটিক তিতলিকে যে নোটিশটা পাঠিয়েছিল, এই ফাইলে তার কপি রয়েছে। আমি দেখেছি অ্যাজ ইট অ্যাপিয়ারস দ্যাট ইউ আর অ্যাবসেন্ট ফ্রম ইওর ডিউটিস সিন্স এইটটিনথ ডে অফ অগাস্ট এটসেটরা এটসেটরা…। যাগগে, শোনো। এই কিছুক্ষণ আগেই এস.পি. সাহেবের কাছ থেকে ঘুরে এলাম। ওনাকে তিতলির অন্তর্ধানের সঙ্গে এই মার্ডারারের কল, তারপর প্রদীপ কামাথের অসংলগ্ন আচরণ এইসব অনেকরকম হ্যাড্ডাব্যাড্ডা বুঝিয়ে দুটো পারমিশন জোগাড় করেছি।’
বিপ্রদাস সুধীর মাইতিকে মনে-মনেই বলল, ‘আপনার ঘাড়ের ওপরে ওটা মাথা না আইস-চেম্বার স্যার?’ মুখে বলল, ‘কী পারমিশন?’
‘একনম্বর, সিমবায়োটিকের ওই ল্যাবরেটরি এখন সিল করাই থাকবে, আনটিল ফার্দার অর্ডার। আর দুই, ওই কলটার ব্যাপারে তুমি, বিপ্রদাস মন্ডল, এখন থেকেই এনকোয়ারি শুরু করবে। দ্যাখো, আমার তো মনে হচ্ছে ওই কল ধরেই তিতলি যাদবের কাছে পৌঁছে যেতে পারবে। অবশ্য তাতে যে কী উপকার হবে সে তুমিই জানো।’
কথা থামিয়ে সুধীর মাইতি দেখলেন, বিপ্রদাস কী যেন বলার জন্যে উসখুস করছে। তিনি বললেন, ‘কী হল? আবার কী চাও?’
‘কিছু চাই না স্যার। একটা কথা শুধু বলব। কাল বাড়ি ফেরার পথে সুরেন পালোধি বলে একটা লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সে বলল…’
সুরেন পালোধির কাছে যা-যা শুনেছিল, সবটাই মাইতিসাহেবকে বলল বিপ্রদাস। উনি শুনলেন ঠিকই। কিন্তু তারপর হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বললেন, ‘তোমার কেসের ব্যাপারে এটা তেমন কিছু এসেনসিয়াল নয়। আগুন আর ঘি, একসঙ্গে থাকলে এসব হবেই। তবে ওই সিকিউরিটি অফিসার কী যেন নাম, জগন্নাথ না কি, ওকে কখনো ভড়কাবার দরকার পড়লে ঘটনাটার কথা উল্লেখ করতে পারো। আর শোনো, ক্রাইম ব্যুরোর ওই অফিসার আমাকে কথা দিয়েছেন, আজ বিকেলের মধ্যে সার্ভিস-প্রোভাইডারের সঙ্গে যোগাযোগ করে, গোরখনাথের ফোন থেকে যে-নম্বরে কল গিয়েছিল তার টাওয়ার-লোকেশন আমাদের দিয়ে দেবেন। ব্যস, আর কী? তখন দুর্গা বলে বেরিয়ে পোড়ো।’
.
বিকেল নয়। টাওয়ার-লোকেশন জানা গেল সন্ধে সাড়ে-ছ’টায়। থানার গেটের বাইরে সুজিত গাড়ি নিয়ে ওয়েট করছিল। ওর পাশের সিটে বসে বিপ্রদাস দরজাটা টেনে দিল। তারপর বলল, ‘সুজিত, ওয়ারিয়া জায়গাটা চিনিস? দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টের ময়লা ফেলা হয় যেখানে ”স্ল্যাগ ব্যাঙ্ক”। চিনিস?’
‘চিনি স্যার। কিন্তু এখন যাবেন? কাল গেলে ভালো হত না স্যার?’
‘কেন?’
‘না, মানে সন্ধে হয়ে গেছে। ওয়েদারটাও খারাপ। আর জায়গাটা কেমন আপনি তো জানেন। সঙ্গে আর দু-একজন থাকলে ভালো হত স্যার।’
বিপ্রদাস কব্জি উলটে ঘড়ি দেখল। সন্ধে সাতটা বেজে গেছে। ওয়েদারটাও সত্যিই খুব খারাপ। নভেম্বরের একুশ তারিখ আজ। তবু অসময়ের ঝিরঝিরে বৃষ্টি নেমেছে। তার সঙ্গে জোরালো একটা হাওয়াও বইছে। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের ওপর বড়-বড় কয়েকটা জলের ফোঁটা পড়ে ছিটকে গেল। বিপ্রদাস বলল, ‘নারে সুজিত। কাল যাওয়ার সময় পাব না। কাল কোর্টে একটা হিয়ারিং রয়েছে। চল চট করে ঘুরে আসি। আর কাজটা সেরকম কিছু নয়। একটা মেয়েকে একটু ইনটারোগেট করব। ব্যস।’
‘ঠিক আছে, চলুন।’
মিনিট কুড়ি বাদে জি.টি. রোড ছেড়ে বাঁদিকে বাঁক নেওয়া মাত্রই বিপ্রদাসের মনে হল সভ্যসমাজ যেন কত দূরে পড়ে রইল। এখন ওদের সামনে সভ্যতার চিহ্ন বলতে শুধু ওই দূরে স্টিল-ফ্যাক্টরির চিমনির মাথায় দপদপানো লাল আলোগুলো। রাস্তার দুদিকে কোনো জনবসতির চিহ্ন নেই। বেঁটে-বেঁটে খেজুরগাছের মাথায় মুঠো-মুঠো জোনাকি জ্বলছে। হেডলাইটের আলোর বিমের মধ্যে অজস্র মথের ওড়াউড়ি। তবে আরো মিনিট-কুড়ি এইভাবে যাওয়ার পরে হঠাৎই আবার জনবসতি শুরু হয়ে গেল।
এইখানে স্টিল ফ্যাক্টরির যতরকমের ‘ওয়েস্ট’ মানে বর্জ্য এনে ফেলা হয়। সেগুলো জমতে-জমতে ছোট ছোট টিলার চেহারা নিয়েছে। অন্ধকার টিলাগুলোর গা বেয়ে উঠে গেছে সরু রেল-লাইন, আর সেই লাইন বেয়ে চার কামরা, পাঁচ কামরার ছোট ছোট মালগাড়ি যাতায়াত করছে। ঢাকা বাক্সের মতন ওয়াগনগুলোর মধ্যেই রয়েছে জ্বলন্ত স্ল্যাগ, মানে লোহাপাথর থেকে লোহা বার করে নেওয়ার পরে যে গাদ পড়ে থাকে সেই গাদ-টা। একটা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছনোর পরে লিভারের হ্যাঁচকা টানে ওয়াগনের ঢাকনা খুলে দিলে সেই জ্বলন্ত গাদ আগুনের ঝরনার মতন ঝরে পড়ছে স্ল্যাগের জমাট পাহাড়ের ওপর। খালি ওয়াগনগুলো আবার ফিরে যাচ্ছে ব্লাস্ট-ফার্নেসের মুখে, নতুন স্ল্যাগ বয়ে আনবার জন্যে।
এই অন্ধকার টিলা, নাক জ্বালানো গন্ধ আর আকস্মিক আগুনঝরনা—তারই মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রায় ল্যাংটো কিছু মানুষ। তাদের প্রেতাত্মার মতন শীর্ণ শরীরের চলাচল দেখলে অবধারিতভাবে দান্তের নরকের কথা মনে পড়ে।
আসলে ওরা স্ল্যাগ ব্যাঙ্কের গা থেকে খুঁটে খুঁটে নানা রকমের নন-ফেরাস মেটালের টুকরো উদ্ধার করছে। ওদের খুঁটে-তোলা সিসে, তামা, দস্তার টুকরোর দাম কয়েক কোটি টাকা। বলাই বাহুল্য, টাকাটার খুব সামান্য অংশই এই গরিব লোকগুলোর হাতে পৌঁছয়। স্টিল-প্ল্যান্টও তার থেকে কিছুই পায় না। লাভের গুড় পুরোটাই খায় অন্ডালের দু-তিন জন মাফিয়া। ওয়ারিয়া স্ল্যাগ-ব্যাঙ্কে সেই মাফিয়াদের সরকার চলে। পুলিশ প্রশাসন এখানে আউটসাইডার।
বিপ্রদাস গাড়ির কাচটা তুলে দিয়ে বলল, ‘সুজিত, তুই কয়লাবস্তি চিনিস?’
‘চিনি স্যার। ওখানে যাবেন?’
‘হ্যাঁ।’
সুজিত একটা বড় গাড্ডা থেকে গাড়িটাকে কোনো রকমে তুলে বলল, ‘পুরোটা যেতে পারব কিনা জানি না স্যার। রাস্তার হাল দেখেছেন তো।’
‘যতটা যেতে পারিস চল।’
আরো দশমিনিট ঝাঁকানি খেতে খেতে চলার পর একটা জায়গায় গিয়ে সুজিত হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখুন স্যার। এরপরে আর এগোনো রিস্কি হয়ে যাবে।’ বিপ্রদাস গাড়ি থেকে নেমে কোমরে হাত দিয়ে সামনের রাস্তাটাকে মাপল। সত্যিই। এ রাস্তার যা চেহারা, তাতে গাড়ি চালালে খোয়ায় ঠোক্কর লেগে মোবিল-ট্যাঙ্ক ফুটো হয়ে যেতে পারে। সে বলল, ‘তুই তাহলে এখানেই দাঁড়া সুজিত। আমি ঘুরে আসছি।’
সুজিতের তবু অস্বস্তি যায় না। সে খালি বলে, ‘একলা যাবেন স্যার? জায়গাটা ভালো নয়। যত ড্রাগখোর, ছিনতাইবাজদের আড্ডা। আমি যেতাম স্যার আপনার সঙ্গে। কিন্তু ভদ্রলোকের জায়গা নয় তো এটা। গাড়ি ফাঁকা রেখে গেলে পার্টস খুলে নিয়ে পালাবে। এরা পুলিশ ফুলিশ মানে না।’
বিপ্রদাস বলল, ‘কেন ভয় পাচ্ছিস বল তো? বললাম তো, কোনো অ্যাকশনে যাচ্ছি না। একজনের সঙ্গে কয়েকটা কথা বলেই চলে আসব। তোর টর্চটা দে।’
সুজিত গ্লাভস কম্পার্টমেন্ট থেকে একটা এল-ই-ডি টর্চ বার করে বিপ্রদাসের হাতে দিল। সেইটা জ্বালিয়ে বিপ্রদাস সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
একটা বাঁক ঘোরার পরেই হঠাৎ সে অদ্ভুত একটা লোকালিটির মধ্যে গিয়ে পড়ল। এখানে পিচ নয়, কয়লার ঘেসের রাস্তা। রাস্তার দুপাশে সারিসারি কালো প্লাস্টিকের ঝুপড়ি। দশ-বারোটা দোকানঘর। তেলেভাজা, সস্তার স্টেশনারি, মুদিখানার জিনিস আর শুয়োর কিম্বা মুরগির মাংস বিক্রি হচ্ছে দোকানগুলো থেকে। পুরো জায়গাটাতে কোথাও ইলেট্রিকের কানেকশন নেই। থাকার কথাও নয়, কারণ এটা স্টিল-প্ল্যান্টের জমি জবরদখল করে গড়ে ওঠা কলোনি। এদিকে ওদিকে হ্যারিকেন কিম্বা কুপি জ্বলছে। বৃষ্টির জোরটা একটু বেড়েছে বলেই বোধহয় রাস্তায় বিশেষ লোকজন নেই। যে দু-একজন লোক দোকানঘরের সামনে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে কিম্বা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, বিপ্রদাসের চোখে তাদের সকলকেই মনে হল নেশাগ্রস্ত।
তবে এইসব কারণে জায়গাটাকে অদ্ভুত মনে হয়নি বিপ্রদাসের। অদ্ভুত মনে হয়েছিল ঝুপড়ির সারির পেছনে ছড়িয়ে পড়ে থাকা কালো জলের বিলটা দেখে। জল থেকে হিলহিল করে সাদাটে ধোঁয়া উঠছে। সালফারের গন্ধে নাক জ্বলে যাচ্ছিল বিপ্রদাসের। তবু ওই জলের মধ্যেই পা ডুবিয়ে মেয়ে পুরুষ এমনকী বাচ্চারা অবধি কী যেন করছিল।
মাছ তো নিশ্চয় ধরছে না। এমন বিষাক্ত জলে মাছ থাকবে না। তাহলে?
একটা স্টেশনারি দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল বিপ্রদাস। বুড়ো দোকানদার একটা শতচ্ছিন্ন গেঞ্জি আর ময়লা লুঙ্গি পরে বসেছিল। পুলিশের ইউনিফর্ম পরা লোক দেখে কোনঠাসা জন্তুর মতন ছটফট করে উঠল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্যে বিপ্রদাস বলল, একটা গোল্ড ফ্লেক দিন কাকা। দেশলাইটাও দেবেন। ওইখানে দাঁড়িয়েই সে সিগারেট ধরাল। তারপর দোকানদারকে জিগ্যেস করল, লোকগুলো ওই জলের ভেতর দাঁড়িয়ে কী করছে?
দোকানদার ততক্ষণে একটু সহজ হয়েছিল। বলল, ‘ওই জলাটাই তো কয়লাবস্তির ভাত-ভিত্তি স্যার। ব্লাস্ট-ফার্নেস থেকে বেরিয়ে আসা ওই জলের মধ্যে কয়লার গুঁড়ো মিশে থাকে। ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে যাবার আগেই এখানকার হারামি লোকগুলো ওই জল পাইপ কেটে বার করে বিলের মধ্যে জমায়। তারপর জল থেকে কয়লার গুঁড়ো ছেঁকে বার করে তাই দিয়ে গুলকয়লা বানিয়ে বিক্রি করে।’
‘বটে? বিক্রি হয় কোথায়?’
‘কোথায় হয় না স্যার? এ তো কোক-ওভেনের কয়লা। দারুণ কোয়ালিটি। উখড়া, পাণ্ডবেশ্বর, রানীগঞ্জ সর্বত্র এখানকার গুল-কয়লা সাপ্লাই যায়। দিনে পনেরো-ষোলো লরি গুল-কয়লা বেরোয় এখান থেকে। মাসে তিন থেকে চারকোটি টাকার লেনদেন হয়।’
‘কে চালায় এই ব্যবসা?’
দোকানদার হাত জোড় করে বলল, ‘আমি গরিব লোক স্যার। এখানেই ব্যবসা করে খেতে হয়। এরপর আপনার সঙ্গে আর বেশি কথা বললে আমার লাশ পড়ে যাবে।’
বিপ্রদাস মুচকি হেসে সিগারেটের টুকরোটা টুসকি মেরে নালায় ফেলে দিল। তারপর পকেট থেকে ফোন বার করে সেই নম্বরটায় একটা ফোন করল, যে-নম্বরে গোরখনাথের ফোন থেকে কল গিয়েছিল। ফোনটা অনেকক্ষণ ধরে বাজল। স্বাভাবিক। অচেনা নম্বরের কল দেখলে রিসিভ করার আগে তো ভাববেই। তারপরেই ওদিক থেকে এক মহিলার গলা ভেসে এল, ‘হ্যালো!’
‘তিতলি যাদব বলছেন তো? আমার নাম বিপ্রদাস মণ্ডল। কোক-আভেন থানার সেকেন্ড অফিসার। আপনার সঙ্গে দেখা করব বলে এখানে এসেছি কয়লা বস্তিতে। কিন্তু আপনি ঠিক কোন বাড়িটায় আছেন বুঝতে পারছি না। একটু বলবেন?’
তিতলির যা প্রোফাইল, তাতে ও নিজের পরিচয় অস্বীকার করা বা বাড়ি ছেড়ে পালানোর মতন কাঁচা কাজ যে করবে না, সে বিশ্বাস ছিল বিপ্রদাসের। ধারণাটা মিলে গেল দেখে সে খুশি হল। তিতলি বেশ সপ্রতিভভাবেই বলল, ‘যে কাউকে জিগ্যেস করুন মিশিরজির কোঠি কোথায়। দেখিয়ে দেবে। আমি আপনার জন্যে ওয়েট করছি।’ বিপ্রদাস সেই মনিহারি দোকানের দোকানদারকেই বলল, ‘কাকা। আমাকে একটু মিশিরজির কোঠার রাস্তাটা বাতলে দিন।’
দোকানদার হাঁ করে বিপ্রদাসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বিপ্রদাস জিগ্যেস করল, কী হল?
‘না, মানে…আপনি উর্দি পরে আছেন।’
‘তো?’
‘মিশিরজির কোঠায় উর্দি পরে আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি সোজা গিয়ে একটা দেশি মদের দোকান পাবেন। ওটার বাঁ-দিকের গলি ধরে কিছুটা গিয়ে আবার বাঁদিকে বেঁকবেন। পেয়ে যাবেন মিশিরজির কোঠা।’
দোকানের ছাউনির নীচ থেকে বেরিয়ে জমা জলের মধ্যে দিয়ে ছপছপ করে হাঁটতে হাঁটতে বিপ্রদাস পৌঁছে গেল মিশিরজির কোঠার দরজায় এবং ওখানে পৌঁছিয়েই বুঝতে পারল, দোকানদার উর্দি পরে তাকে এই কোঠায় আসতে দেখে কেন অবাক হয়েছিল।
মিশিরজির কোঠা আদতে বেশ্যাবাড়ি। এই বৃষ্টির মধ্যেও পাঁচ-ছ’টা ক্ষয়াটে চেহারার মেয়ে মুখে রং মেখে আর যথাসাধ্য ছোট সাইজের পোশাক পরে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিশ দেখে ওদের মধ্যেই একজন দৌড়ে ভেতরে চলে গেল।
পুরো তল্লাটের মধ্যে একমাত্র এই বাড়িটাতেই বিদ্যুত সংযোগ রয়েছে। কোনো ক্ষমতাবান কাস্টমারের দাক্ষিণ্য ছাড়া যে এটা সম্ভব হয়নি সে-কথা একটা বাচ্চাও বুঝতে পারবে। বিপ্রদাসের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল। পুলিশের চাকরির অভিজ্ঞতায় তার প্রায়ই ইচ্ছে করে, ক্ষমতা জিনিসটা কোথায় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তার একটা মানচিত্র তৈরি করে।
তার এই ভাবনার মধ্যেই সবক’টা মেয়েকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে যে বেরিয়ে এল, সেই যে এই কোঠাবাড়ির মাসি তা বলে দিতে হয় না। বিপ্রদাসের পা থেকে মাথা অবধি এক পলকে মেপে নিয়ে মাসি হাসল। মনে হল একটা মেছোকুমিরে হাই তুলল। বলল, ‘কী সৌভাগ্য! আসুন সাহেব, ভেতরে আসুন।’
কোঠাবাড়িটা বহু পুরনো। মনে হয় স্টিল-প্ল্যান্ট তৈরি হওয়ারও অনেক আগে এদিকে কোনো গ্রাম ছিল এবং সেই গ্রামে মিসিরজি নামে কোনো পয়সাওলা লোকের বাড়ি ছিল এটা। আপাতত বাড়ির হাল মিউজিয়ামে সাজিয়ে রাখার যোগ্য। পলেস্তার খসা দেয়াল, ঘুনধরা চৌকাঠ আর দরজা জানলার পাল্লা। এমনকী দোতলার টানা বারান্দার লোহার রেলিংগুলো অবধি জায়গায় জায়গায় মরচে লেগে খসে পড়েছে। মাতাল কাস্টমাররা যাতে রেলিংবিহীন বারান্দা থেকে খসে নীচে না পড়ে যায় তার জন্যে মাসি সেইসব বিপজ্জনক জায়গায় বাঁশের বেড়া বেঁধে দিয়েছে। মাসির পেছন পেছন বিপ্রদাস এই বাড়িরই নীচের তলার একটা বড় ঘরে ঢুকে চৌকির ওপর বসল।
যে ঘরটায় বিপ্রদাসকে নিয়ে আসা হল, সেই ঘরে শুধু একটা কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছিল। এদিক থেকে ওদিকে টানা দেওয়া নারকোল-দড়িতে মাসির শাড়ি শায়া ইত্যাদি শুকোচ্ছিল। একদিকে দেয়ালের কুলুঙ্গির মধ্যে কার্তিক ঠাকুরের ছবি। অন্যদিকে কয়েকটা টিনের তোরঙ্গ, একটার ওপর আরেকটা ডাঁই করে রাখা। তেলচিটে চাদরে ঢাকা বড় চৌকিটা ছাড়া এই হল সাকুল্যে ঘরের আসবাব।
ও হ্যাঁ। একটা বড়সড় চামড়া-বাঁধানো শ্রীনিকেতনের মোড়া ছিল। সেইটাই টেনে নিয়ে মাসি বিপ্রদাসের মুখোমুখি বসে কণ্ঠিতভাবে হাসল। বলল, ‘আমার ছোট ব্যবসা সাহেব। কুড়িটা মোটে মেয়ে এখানে কাজ করে। কাস্টমার সব ট্রাকের ড্রাইভার আর খালাসি। বুঝতেই পারছেন, তাদের হাত দিয়ে কিরকম পয়সা বেরোয়। তবু যদি বলেন, আপনাদের থানার হিস্যা পরের মাস থেকে পৌঁছে দেব।’
বিপ্রদাস বলল, ‘আমি হিস্যার জন্যে আসিনি।’
মাসি আবার সেই কুমির-হাসি হেসে বলল, ‘সে আমি বুঝতেই পেরেছি। আপনার মুখ দেখলেই বোঝা যায় আপনি ওসবের উদধে। তাহলে আর কী করতে পারি বলুন।’
বিপ্রদাস মাসির চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আমি তিতলি যাদবের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। তিনি জানেন যে আমি এসেছি। তার কাছেই নিয়ে চলুন।’
মুহূর্তের মধ্যে মাসির চোখেমুখে রাগ আর ভয়ের যমজ-ছায়া খেলা করে গেল। দাঁত কিড়মিড় করে মাসি বলল, ‘জানতাম ওই বিদ্যেধরী মাগি একদিন ঠিক আমাকে বিপদে ফেলবে। কী করেছে সেই পোকায় খাওয়া সুন্দরী, একবার আমাকে বলুন তো বাবু।’
‘বিদ্যেধরী মাগি’ আর ‘পোকায় খাওয়া সুন্দরী’ দুটো বিশেষণই বিপ্রদাসকে একটু অবাক করল। সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল—’না, না। উনি অন্যায় কিছু করেননি। আমি শুধু ওঁর কাছ থেকে দু-একটা ইনফর্মেশন নেওয়ার জন্যে এসেছিলাম।’
মাসিকে দেখে বিপ্রদাসের যতটা আতাক্যালানে বলে মনে হয়েছিল, দেখা গেল অতটা নয়। চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, ‘মাগি দুর্গাপুরে যেখানে ভেজলিনের বাটি ভাড়া দিত, সেখানেই কিছু কাণ্ড বাঁধিয়ে আসেনি তো? ও বাবু?’
‘এই চুপ!’ পুলিশি হুঙ্কার দিয়ে উঠল বিপ্রদাস। ‘একদম মুখখারাপ করবে না। শিগ্গির ডাকো ওনাকে।’
মাসি থতমত খেয়ে বলল, ‘এখানে ডাকব? নাকি আপনি ওর ঘরে যাবেন?’
বিপ্রদাস এই প্রশ্নে ভারি দোটানায় পড়ে গেল। সত্যিকারে খোঁজখবর পেতে হলে তিতলির নিজের ঘরে যাওয়াই উচিত। কোথা থেকে কোন ক্লু বেরিয়ে আসে তা কি বলা যায়? এদিকে আবার যে-ঘরে লরির খালাসি আর ড্রাইভারেরা বিছানা পেতে শোয়, সেরকম ঘরে ঢোকার কথা ভেবেও তার গা গুলোচ্ছিল।
মাসি দেখা গেল মন পড়তে পারে। বিপ্রদাসের মুখের ভাব লক্ষ করে বলল, ‘না বাবু, যা ভাবছেন তিতলির ঘর সেরকম নয়। ও বেবুশ্যে নয়। এই গুল-কয়লার ব্যবসায় একজন মস্ত বড় বিজনেসম্যান রয়েছেন নাম শুনে থাকবেন অন্ডালের বিল্টুবাবু। ভালো নামটা কী যেন বিজন উপাধ্যায় বোধহয়। তিনিই তিতলিকে ঘরভাড়া করে এখানে রেখেছেন। ওর আসল কাজ বিল্টুবাবুর কোম্পানির খাতা লেখা।’
বিপ্রদাস অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘খাতা লেখা? মানে অ্যাকাউন্টস মেইনটেইন করা?’
‘তাই হবে। আমি অশিক্ষিত মেয়ে মানুষ, সঠিক বলতে পারব না। এখান থেকে ক’লরি মাল বেরোলো, কোথায় গেল, কার কাছে কত টাকা পাওনা রইল, এইসব হিসেব রাখে। তিতলির তো নিজের ল্যাকপ্যাক আছে, জানেন না?’
‘ল্যাকপ্যাক!’
মাসি কোলের ওপর দু-হাতের আঙুল দিয়ে কি-বোর্ডের বোতাম টেপার ভঙ্গি করল। বিপ্রদাস হেসে ফেলল। ‘ল্যাপটপ?’
‘হুঁ।’ মাসি লজ্জা পেল। ‘ও মেয়ের এখানে আসার কথাই নয়। খুব শিক্ষিত মেয়ে। কেমন করে এসে পড়েছিল বলতে পারব না। সত্যি কথাই বলি আপনাকে স্যার, ও শরীর বেচবার কথাই আমাকে বলেছিল প্রথমে। শরীরও চাবুকের মতন। মুনিদেরও মতিভ্রম হয়ে যাবে। কিন্তু।’
‘কিন্তু কী?’
‘যতই কামপোকার কামড় খেয়ে হারামিগুলো ঘরে ঢুকুক, ওই মুখ দেখলে কি কেউ কিছু করতে পারে? কতজন ঘরে ঢুকে তিতলির মুখ দেখে আবার হাঁউমাঁউ করে ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসেছে।’
বিপ্রদাস কিছুই বুঝতে পারছিল না। ভাবছিল, ভুল জায়গায় চলে এলাম নাকি? পার্সোনাল ফাইলে তিতলি যাদবের পাসপোর্ট সাইজ ছবি দেখে তো তার মেয়েটিকে রীতিমতন চটকদার মনে হয়েছিল।
মাসি কথা থামায়নি। তখনো বলে চলেছিল, ‘ভগবানের দয়ায় সেই সময়েই মেয়েটা বিল্টুবাবুর চোখে পড়ে গেল। বিল্টুবাবুর যে একটা পাড়ভাসান আছে, সে আমরা অনেকদিন থেকেই জানতাম।’
‘পাড়ভাসান?’ বিপ্রদাস আবার আকাশ থেকে পড়ল।
‘আহা, আমি অশিক্ষিত মেয়েমানুষ। অত কি সঠিক করে বলতে পারি? বুঝতে পারেন না কেন? পাড়ভাসান মানে মনের বিকার।’
‘ওঃ! পারভারসান।’
‘ওই হল। উনি বরাবর খুঁজতেন কুচ্ছিৎ মেয়ে। তা তিতলির থেকে কুচ্ছিৎ মেয়ে উনি কোথায় পাবেন। বিল্টুবাবু তখন থেকেই তিতলিকে প্রায় রাখেল বানিয়ে ফেললেন। তিতলির কপাল খুলে গেল।’
‘তারপর?’
‘তারপর তো বললামই আপনাকে। এখন তিতলি ওঁর ম্যানেজারের কাজ করে। বিল্টুবাবু খুব পেয়ার করেন ওকে। রোজ রাতে একবার অন্তত অন্ডাল থেকে আমার এই কোঠায় ঢুঁ মেরে যান। ব্যাবসার খাতাও চেক করেন আবার খাতা যে লেখে তাকেও চেক করেন। খি খি খি খি!’
বিপ্রদাস আবার ধমকাল। ‘চুপ করো। ওকে এখানেই ডাকো। দুটো কথা বলে চলে যাই। আর শোনো, যে এই ঘরে আড়ি পাতবে, তার কপালে দুঃখ আছে।’
