চার
দুপুরে ঘুম আসাটা যত সহজ হয়েছিল, রাতে হল ঠিক তার বিপরীত। কিছুতেই ঘুম আসছিল না। আসলে দুপুরে তো শরীর অনেকটাই বিশ্রাম পেয়ে গিয়েছিল। তার ওপরে এরকম অদ্ভুত জায়গা, অদ্ভুত সব ঘটনা। হাসিদির আশ্চর্য বিবৃতি। সবমিলিয়ে রগের শিরাগুলো দপদপ করতে শুরু করেছিল।
আমি জানি, দশটা-পাঁচটা অফিস করেন যে ভদ্রমহোদয় ভদ্রমহোদয়াগণ, কিম্বা কলেজে পড়ে যে যুবক-যুবতীরা, কিম্বা দোকানে খাতা লেখে এরকম কোনো মানুষ—আজ সারাদিন যে-অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আমি গেলাম, সেরকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে—হয় চিৎকার করত, না-হলে পুলিশ ডাকত। কিছুই না করলে অন্তত এই জায়গাটা ছেড়ে পালাত। কিন্তু আমি ওসব কিছুই করতে পারব না। আমি অপেক্ষা করব, কারণ আমি জানি, এই সবই সত্যি। বিশাখার মৃত্যু সত্যি। হাসিদির জোড়া-অস্তিত্ব সত্যি। পঙ্কজদার ভেতরে মৃত আত্মার সঞ্চারও সত্যি।
মাথার ভেতরে যে পোকাটা ঘুরে-ঘুরে এতদিন ধরে গুটি বুনছিল, তার কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। পরিষ্কার বুঝতে পারছি, এই মুহূর্তে যদি আমার খুলিটা একটা কৌটোর ঢাকনার মতন খুলে ফেলা যায়, তাহলে দেখা যাবে পুরো খুপরিটা জুড়ে একজন গুড়িসুড়ি মেরে শুয়ে আছে। সে কে? জানি না। হয়তো আমার মৃত্যু।
অনেকক্ষণ বিছানার ওপরে ছটফট করতে-করতে অবশেষে রাত দেড়টা কি দুটো নাগাদ হালকা তন্দ্রার মধ্যে ডুবে গিয়েছিলাম। কিন্তু সে বেশিক্ষণের জন্যে নয়। এক রক্ত হিম করা আওয়াজে ছিটকে বিছানার ওপরে উঠে বসলাম।
ওটা কোন প্রাণীর চিৎকার ভেসে এল আমার বন্ধ জানলার বাইরে, উঠোনের দিক থেকে?
কুকুর নয়। কুকুরের ডাকের মধ্যে অমন অশুভ ইঙ্গিত, অমন মৃত্যুর আতঙ্ক মিশে থাকে না।
বিছানা থেকে উঠে পা টিপে-টিপে জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘরের আলোটা জ্বালতেই পারতাম, কিন্তু জ্বালিনি। মনে হয়েছিল, জন্তুটা যদি আলো দেখে পালিয়ে যায়। আমি ওটাকে স্বচক্ষে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জানলার পাল্লা সামান্য ফাঁক করে যে-দৃশ্য দেখলাম, তেমন দৃশ্যের কথা কোনোদিন দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি।
পূর্ণিমার রাত ছিল সেটা। কাপড়-কাচা গোলা সাবানের মতন হড়হড়ে আর হলুদ একটা চাঁদ উঠেছিল আকাশে। সেই মরা-চাঁদের ঘোলাটে আলোয় উঠোনটাকে তখন আরো বড় মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল উঠোন নয়, একটা পাহাড়ি-উপত্যকা। কারখানা-ঘরের চিমনির মুখে আগুনের আভা হিলহিল করে কাঁপছিল। তার মানে ফার্নেসে নতুন করে আগুন জ্বলে উঠেছে। কীভাবে?
জ্যোৎস্না আর আগুনের আভায় মাখামাখি সেই উঠোনের ঠিক মাঝখানে দুহাতে দুটো আগুনের মালসা নিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচ করছিল এক নগ্ন নারী; কালো কাজল দিয়ে আঁকা তার শরীর। আমি সেই নারী-শরীরের প্রতিটি বক্ররেখা, প্রতিটি উত্তল-অবতল, এমনকি তার বামস্তনের বৃন্তের নীচে একটা নীল জড়ুল অবধি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম।
সম্মোহিত হয়ে পড়েছিলাম, কারণ পুরো দৃশ্যটার মধ্যেই এক আদিম জাদু ছিল। ওই উঠোন কি দু-হাজার একুশ সালের কলকাতার কোনো বাড়ির উঠোন নাকি হিমযুগের কোনো গুহামুখ? ওই আগুন কি কোনো কারখানার ফার্নেসের আগুন না গুহাবাসীদের অগ্নিকুন্ডের? আর ওই নগ্নিকা—ও তো আজকের কেউ নয়ই! হতেই পারে না। ওর ওই নগ্নতা, ওর ওই দু-হাতে আগুনের মালসা নিয়ে ঘুরে-ঘুরে নাচ—ওই নাচ আজকের পৃথিবীর নয়।
পূর্ণিমার রাতে হাসি মণ্ডল এক গুহামানবী হয়ে গিয়েছিল।
যেন আমার চিন্তার সঙ্গে তাল মিলিয়েই হঠাৎ আমার ঘরের সামনের সেই টানা দালানেরই অন্য প্রান্ত থেকে আবার সেই ক্ষুধার্ত নেকড়ে ডাক ভেসে এল—ওওও ওউ ওউ ওউ। উ উয়া। উ উয়া। উ উয়া।
আবারও আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। মানুষের কৌতূহল অদম্য! তাই জানলার পাল্লাদুটো আরো একটু ফাঁক করে চোখদুটো গরাদের ফাঁকে প্রায় সেঁটে দিয়ে কোনোরকমে দালানের ওই কোণটাকে নজরের মধ্যে নিয়ে এলাম। দেখলাম সেখানে দাঁড়িয়ে পঙ্কজ মিদ্যা একমনে হাসিদির নাচ দেখছে। আমি তাকিয়ে থাকতে-থাকতেই বোবা মানুষটা আবার চাঁদের দিকে মুখ তুলে নেকড়েবাঘের গলায় চিৎকার করে উঠল—উউউ হাহাহা। হাহাহা হাহাহা উউউ।
পরক্ষণেই দালান থেকে উঠোনে ঝাঁপিয়ে পড়ল পঙ্কজ মিদ্যা। চার হাতে- পায়ে দৌড়ে গেল হাসিদির দিকে। অবিকল এক নেকড়ের মতোই ওকে ঘিরে লাফাতে শুরু করল। বহুদিন পরে প্রভু ঘরে ফিরলে তাকে ঘিরে পোষা কুকুরগুলোও ঠিক এইভাবে নাচতে দেখেছি। এটা নেকড়ের উল্লাস।
হঠাৎই হাসিদির সেই কথাটার মানে পরিষ্কার হয়ে গেল আমার কাছে। ও বলেছিল না, পঙ্কজদা পুরুষমানুষই নয়? সত্যিই তো নয়। মানুষই নয় পঙ্কজ মিদ্যা, তার আবার নারী আর পুরুষ। ও একটা নেকড়েবাঘ।
আরেকজনকেও এবার দেখতে পেলাম। বিশাখা। ব্যারাকবাড়ি থেকে নয়, অবাক হয়ে দেখলাম ভিজে কাপড়ে কারখানা ঘরের পেছনের দরজাটা খুলে বিশাখা বেরিয়ে এল। তারপর নৃত্যরতা হাসিদিকে মাঝখানে রেখে বিশাখা আর সেই নেকড়েটা গোল হয়ে ঘুরতে শুরু করল।
মাঝখানে একবার বিশাখা মুঠো থেকে কী যেন একটা গুঁড়ো পদার্থ হাসিদির হাতে ধরে-থাকা আগুনের মালসাটার মধ্যে ছুঁড়ে দেওয়া মাত্র গলগল করে সবজেটে ধোঁয়া বেরিয়ে এসে আমার চোখের সামনের সমস্ত দৃশ্য আবছা করে দিল। কী কটু গন্ধ সেই ধোঁয়ায়! মনে হল শ্বাসনালি পুড়ে যাচ্ছে। অথচ ওদের তিনজনকে দেখে মনে হচ্ছিল গন্ধ-টন্ধ কিছু টেরই পাচ্ছে না।
আমি পারলাম না, আমার অত সহ্যশক্তি নেই। জানলার পাল্লাদুটো বন্ধ করে দিয়ে ছুটে গেলাম ঘরের কোনায়, যেখানে জলের কুঁজো আর গ্লাস রাখা ছিল। ঢকঢক করে এক গ্লাস জল খেলাম। কিছুটা জল হাতের চেটোয় নিয়ে ঘাড়ে মুখে থাবড়ালাম। একটু আরাম পাওয়ার পর ভাবলাম, আরেকবার জানলা খুলে দেখি। মনে আশা ছিল, হয়তো দেখব উঠোন ফাঁকা; এতক্ষণ যা দেখেছি সবই ছিল আমার চোখের ভুল।
ভুল ভেবেছিলাম। যা দেখে গিয়েছিলাম, তার চেয়ে আরো বীভৎস দৃশ্য অপেক্ষা করছিল আমার জন্যে। জানলার পাল্লাদুটো আবার অল্প একটু ফাঁক করে তার মধ্যে চোখ লাগাতেই দেখতে পেলাম, হাসিদি তার নাচ থামিয়ে, চার-হাত-পায়ে ভর দিয়ে, মাটির ওপরেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে। মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়েছে নীচে। রাশি-রাশি চুলের আড়ালে ওর শরীরের ওপরের অংশটা ঢাকা পড়ে গেছে।
ওর ঝুঁকে পড়া মাথার সামনে বিশাখা যে-জিনিসটাকে দুদিকে টান দিয়ে ধরে রেখেছিল, সেটাকে একটা প্রাণী বলে চিনতেই পারতাম না, যদি না হতভাগ্য কালো বেড়ালটা একবার ওর গলার ওপরে বিশাখার হাতের মুঠির চাপ আলগা হওয়ামাত্রই মরণ-যন্ত্রণায় কঁকিয়ে কেঁদে না উঠত। পরক্ষণেই হাসিদি এক ঝটকায় মুখটা ওপরে তুলে বেড়ালটার কন্ঠনালিতে দাঁত বসিয়ে দিল। নেতিয়ে পড়া বেড়ালটাকে ওর মুখ থেকে কেড়ে নিয়ে বিশাখা নিখুঁত লক্ষে কারখানা-ঘরের দরজার দিকে ছুড়ে দিল আর সেই-মুহূর্তেই বন্ধ-দরজাটা আবার খুলে গেল।
ঘরের ভেতরে আগুন জ্বলছিল বলে দরজাটাকে দেখাচ্ছিল অন্ধকার দেয়ালের গায়ে একটা আগুনরঙের আয়তক্ষেত্রের মতন।
আগুনের সেই চৌকো ফ্রেমের মাঝখানে কয়েকমুহূর্তের জন্যে একজনকে দেখতে পেলাম। এক বিশাল পুরুষশরীর—ষাঁড়ের মতন মাথা। আগুনের আভার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন বলে তাঁকে কালো পাথরের মূর্তির মতন দেখাচ্ছিল। বিশাল দুই বাহু সামনে বাড়িয়ে তিনি মরা বেড়ালটাকে লুফে নিয়ে আবার ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন। তাঁর পেছন-পেছন ঢুকে পড়ল বিশাখা, হাসিদি আর সেই নেকড়ে বাঘটা যাকে কিছুক্ষণ আগে অবধি আমি পঙ্কজ মিদ্যা বলে জানতাম। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
কাচ কারখানার পুরো কম্পাউন্ডটা এখন অস্বাভাবিক শান্ত। একটা ঝিঁঝিপোকা অবধি ডাকছে না কোথাও। আমি জানলাটা বন্ধ করে বিছানার ওপরে লুটিয়ে পড়লাম। এখন একটু ঘুম দরকার আমার—গভীর ঘুম। না-হলে রক্তের চাপে মাথার ভেতরের শিরা-উপশিরা সব ছিঁড়ে যাবে।
ব্যাগ হাতড়ে একটা বাদামি কাচের শিশি বার করে এনে ভেতর থেকে কয়েকটা সাদা ট্যাবলেট হাতের তালুতে ঢেলে নিলাম। যখন খুব যন্ত্রণা বাড়ত, তখন…একমাত্র তখনই লেপ্রসি-সেন্টারের ডাক্তারবাবু এই ট্যাবলেটটা আমাকে খাওয়াতেন। একসঙ্গে দুটো ট্যাবলেট মুখে পুড়ে জল দিয়ে গিলে ফেললাম। মিনিট-পাঁচেকের মধ্যে আমার চোখ বুজে এল। এটা খেলে প্রতিবারই তাই হয়।
.
সেই ঘুম ভাঙল বেলা দশটায়। ওরা কেউ আমাকে ডাকেনি, নিজে থেকেই ভাঙল। কিছুক্ষণ চৌকির কিনারায় মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রইলাম। যন্ত্রণায় মাথা ফেটে যাচ্ছিল। কাল রাতে একসঙ্গে দুটো ট্যাবলেট খেয়ে নেওয়ার এফেক্ট? তাই হবে। কিছুক্ষণ ওইভাবে বসে থাকার পর নিজের মনেই বললাম, না। যা দেখেছি সব ভুল। ওসব কিছুই ঘটেনি। আমি দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম।
কুঁয়োতলায় গিয়ে এক-বালতি ঠান্ডা জল তুলে মাথাটা ধুয়ে নিলাম। একটু আরাম হল। গামছা দিয়ে মাথাটা মুছতে-মুছতেই বুঝতে পারলাম, আমার পেছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। তাকিয়ে দেখলাম, ঠিকই। হাসিদি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে। খুব সাবধানী চোখে আমার কাজকর্ম লক্ষ করছিল।
আমি তীব্রদৃষ্টিতে হাসিদিকে আপাদমস্তক জরিপ করলাম। ঠিক এই উঠোনেই কয়েকঘণ্টা আগে ওকে নগ্ন হয়ে ঘুরতে দেখেছিলাম।
দেখেছিলাম কি? সত্যিই দেখেছিলাম? নাকি সবটাই আমার অন্তর্গত অভিশাপের ফসল—হ্যালুসিনেসন। এই প্রশ্নটার উত্তর আমার জানা দরকার এবং এখনই দরকার। জানবার একটাই উপায় আছে।
একবার চারিদিকে চেয়ে দেখে নিলাম, হাসিদি ছাড়া আর কাউকে সামনা-সামনি দেখা যাচ্ছে না। হাসিদি বোধহয় আমার মনের কথা বুঝে থাকবে—বলল, ওরা এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। আমিই শুধু তোমার ঘুম ভাঙার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। তুমি চান করবার সময়েও পায়ের জুতো খোলো না রুদ্র?
প্রায় চিৎকার করেই বললাম, না। খুলি না। কতবার বলব?
হাসিদি একটুও ভয় পেল না। বরং ওর চোখ দেখে মনে হল, ও বলতে চাইছে, এসো জোসেফ রুদ্রনাথ এক্কা। দেখে নাও, যা তুমি দেখতে চাইছ। সন্দেহমুক্ত হও।
আমি কুঁয়োতলা থেকে প্রায় দৌড়ে গিয়েই ওর হাত চেপে ধরলাম। তারপর এক হেঁচকা টানে ওকে ঢুকিয়ে নিলাম কলঘরের মধ্যে। ও একটু ‘উঃ’ শব্দ অবধি করল না। অদ্ভুত শান্ত-চোখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আমি ওর কুর্তার বোতামগুলো দ্রুত হাতে খুলতে শুরু করলাম। আমার মাথা ঝুঁকে পড়েছিল হাসিদির বুকের ওপরে আর আমার ভিজে মাথা থেকে ঝরে পড়া জলের ফোঁটায় ওর কুর্তার বুকের কাছটা ভিজে যাচ্ছিল।
তাড়াহুড়োয় আমি একটা বোতাম ছিঁড়ে ফেললাম। হাসিদি আমার হাতটা ঠেলে দিয়ে গম্ভীরমুখে বলল, সরো। আমি খুলছি।
নিজের হাতেই কুর্তাটা খুলে ফেলল হাসিদি। দেখলাম গোলাপিরঙের সস্তার প্যাডেড ব্রায়ের নীচে ওর শিশুমুঠি দুই স্তন। ওই ছোট স্তনকে বড় করে দ্যাখানোর ইচ্ছেটা দেখে আমার আবার মনে হল, না, এ নয়। এ তো পামার বাজার বস্তির সামান্য একটা মেয়ে। দু-হাতে দুটো আগুনের মালসা নিয়ে উঠোন জুড়ে উদ্দাম-নৃত্য এর দ্বারা সম্ভবই নয়। তবু নিশ্চিত হবার জন্যে আমি দু-হাতের মুঠোয় ওর ব্রায়ের কাপদুটোকে খামচে ধরে ওপরে তুলে দিলাম আর তুলে দিয়েই বুঝতে পারলাম, এই সেই অলৌকিক নর্তকী। কারণ, ওর বামস্তনের নীচে এই তো সেই নীল জড়ুল।
এতক্ষণ যে মনের জোরটা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেই জোরটা হঠাৎই আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমার পা দুটো থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। বুঝতে পারলাম, কাল রাতে যা দেখেছি, যা শুনেছি, তার কিছুই আমার কল্পনা নয়; যেমন কল্পনা নয় আমার মাথার ভেতরে গুঁড়িসুঁড়ি মেরে বসে থাকা সেই প্রাণীটি কিম্বা কাল রাতে কারখানা-ঘরে পেছনের দরজা খুলে একমুহূর্তের জন্যে যে দেখা দিয়েছিল, সেই বৃষমানুষ।
আমি অসহায়ের মতন চৌবাচ্চার পাড়েই বসে পড়লাম।
হাসিদি আমার দিকে পিছন ফিরে ওর অন্তর্বাস ঠিক করে নিল। কুর্তাটা আবার পরে নিয়ে, আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ভয় পেও না, রুদ্র। আমি, পঙ্কজদা, বিশাখা, আমরা সবাই খুব সাধারণ মানুষ। আমাদের ভয় পাবার কিছু নেই। বরং আমরাই চারিদিকের স্বাভাবিক মানুষদের ভয়ে মরতে-মরতে, পালাতে-পালাতে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছি। লুসিফার আমাদের তার আশ্রয়ে ডেকে নিয়েছেন। চলো, খাবার ঘরে গিয়ে বসি।
খাবার ঘরের টেবিলের দুপাশে দুটো চেয়ার টেনে আমি আর হাসিদি বসলাম। হাসিদি আমাকে জলখাবার সাজিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু আমার খেতে ইচ্ছে করছিল না। হাসিদি কিছুক্ষণ চুপ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, বুঝতে পারছি, তুমি কাল রাতে আমাদের সাবাথ দেখেছ।
‘সাবাথ’! শব্দটা এই প্রথমবার শুনলাম, তাই মানে বুঝলাম না।
আমি যে বুঝতে পারিনি সেটা হাসিদি বুঝতে পারল। বলল, সাবাথ মানে লুসিফারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার দিন। বছরে দুবার এমন দিন আসে। কাল ছিল তার মধ্যে একটা।
মনে মনে ভাবলাম, কাপালি স্যার কি জানেন, তার কারখানার মধ্যে এই বহিরাগত নারী-পুরুষগুলি কী করে চলেছে? কিছুই কি জানেন না? না জানলে হঠাৎ আমাকে এখানে নিয়ে আসার কারণ কী? আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি এই তিন উড়ুক্কু ঝরাপাতার দলে আমিও আরেক ঝরাপাতা। যে-অপার্থিব বাতাস ওদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে সেই একই হাওয়া আমার শরীরে বুনে দিয়ে গিয়েছিল কুষ্ঠ রোগের বীজ। আমার মুখ দিয়ে নিজের মনেই বেরিয়ে এল একটা শব্দ—বেচারা।
কাকে বলছ? জিগ্যেস করল হাসিদি।
বললাম, তোমাকে। না, তোমাদের।
তারপর একটু ভেবে বললাম, নিজেকেও বলছি।
