শয়তানের সন্তান – ৮

আট

কাপালি স্যারের ঘরের দেওয়ালের সবকটা ঘড়ি, মায় ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে-থাকা গ্র্যান্ডফাদার-ক্লকটা অবধি ঠিক এইসময়ে একসঙ্গে বেজে উঠল। দশটা বাজল। কথায়-কথায় যে কখন প্রায় একঘণ্টা কেটে গেছে বুঝতেই পারিনি। তবে অসুবিধে নেই। কলকাতা শহরে এই এপ্রিল মাসে রাত দশটা মানে সন্ধে। তাছাড়া আমাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে প্রশান্তবাবু রয়েছেন।

ঘণ্টার আওয়াজ থামার পরে কাপালি স্যার বললেন, আমাদের কথা আর খুব বেশি বাকি নেই। তবু সংক্ষেপেই বলছি।

যে জিনিসগুলো বাবাকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল, আপাতদৃষ্টিতে সেগুলো এতই সাধারণ যে বলবার কথা নয়। একজন মানুষ রাস্তায় এগুলোকে পড়ে থাকতে দেখলে হয়তো পাশ কাটিয়ে চলে যেত। কিন্তু বাবা ছিলেন অ্যান্টিক-কালেক্টর। তিনি সেগুলোকে শয়তান-সাধনার উপকরণ বলে চিনতে পেরেছিলেন। ওই তুমি যাকে একটু আগে বললে ডেভিল-ওয়রশিপ।

বলেন কী! কাপালি স্যারের কথা শুনে আমি চমকে উঠলাম।

হ্যাঁ। জিনিসগুলোর প্রকৃত পরিচয় জানলে তুমি বুঝতে পারবে বাবার আতঙ্কিত হওয়ার কারণ। সেটাই তোমাকে আগে বলি।

তুমি জানো নিশ্চয়ই, আফ্রিকা এবং ইওরোপে শয়তানের আরাধনা বা ডেভিল-ওয়রশিপের ইতিহাস আজকের নয়। খ্রিস্টধর্মের থেকেও প্রাচীন তার ইতিহাস এবং ওরা স্বীকার করুক বা নাই করুক, আজ অবধি কখনোই সেই সাধনায় ছেদ পড়েনি। বরং আমেরিকাতেও দিব্যি ছড়িয়ে পড়েছে।

নানান কালচারের মানুষদের কাছে শয়তানের নানারকম নাম। মিশরে ডেভিল-ওয়ারশিপারদের কাছে তিনি ছিলেন বেড়ালমুখো বাস্টেট। ব্যাবিলন কিম্বা সিরিয়ায় বৃষদেবতা ব্যাল। গ্রিসে অজ-মানব প্যান। আর লুসিফার কিম্বা বিলজিবাবের উল্লেখ তো বাইবেলের মধ্যেই রয়ে গেছে।

এই দেবতাদের মধ্যে একটা জায়গায় মিল রয়েছে। স্যাটানই হোক কিম্বা প্যান, বাস্টেট কিম্বা ব্যাল, তারা কেউ কাল্পনিক অস্তিত্ব নন। পদ্ধতি মেনে ডাকলে তাঁরা এই ধুলোমাটির পৃথিবীতে সশরীরে নেমে আসেন। ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন। এমনকী নারীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সন্তানও দেন তাদের।

আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, এই শয়তান-আরাধনার পদ্ধতি আর উপকরণগুলোও সারা পৃথিবীতেই প্রায় এক। হয়তো শয়তানও আসলে একজনই, পৃথিবীর নানান কোণে তাকে নানান নামে ডাকা হয়।

ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানায় বাবা এরকমই এক সেট উপকরণ খুঁজে পেয়েছিলেন। একজন অ্যান্টিক কালেকটার হিসেবে সারা পৃথিবীর ফোক-আর্টের সঙ্গেই বাবার পরিচয় ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সেগুলোর অরিজিন রুমানিয়ার কোনো জায়গায়।

আমি বললাম, তার মানে স্টিফেন মেয়ার এগুলো নিয়ে এসেছিলেন?

একদম ঠিক। দাদুর এই ডায়েরিগুলো আমার বাবা যে পড়েননি তা তো হতে পারে না। কাজেই বাবাও জানতেন স্টিফেন মেয়ার রুমানিয়ার জিপসি সম্প্রদায়ের মানুষ। মেঘালয়ের যাজকের পরিচয়টা একটা ব্লাফ। আসলে তিনি ছিলেন ডেভিল-ওয়রশিপার। তবে ভারতে যে অনেকদিন ধরে ঘুরছিলেন সেটা সত্যি। মনে হয় নিজের সাধনার জন্যে একটা মনোমতন জায়গা আর একজন সহচরী খুঁজছিলেন। কবরডাঙার কারখানা তাঁকে দিয়েছিল প্রথমটা আর ইভা দ্বিতীয়টা।

অবশ্য ইভার নিজেরও একটা অ্যাজেন্ডা ছিল। হ্যাঁ, ওই লেবেনসবর্ন প্রোগ্রাম নিয়েই। ডিটেলসটা একটু পরে বলছি।

যাই হোক, মূল কথা হল ইভা আর স্টিফেন দুজনে মিলে এই কবরডাঙার নির্জন মাঠে সেই শয়তান নামানোর বিদ্যা হাতে-কলমে কাজে লাগিয়েছিলেন।

হয়তো আমার চোখে অবিশ্বাসের চিহ্ন ফুটে উঠেছিল। তাই কিছুক্ষণ দোনামোনা করে বিরাজ কাপালি বললেন, আচ্ছা, জিনিসগুলো তোমাকে দেখাই। আমার মাথার কাছের আলমারিটা খোলো। দ্যাখো, নীচের তাকে একটা বড় কাঠের বাক্স আছে, ওটা নিয়ে এসো।

বাক্সটা বার করে নিয়ে এলাম। কাপালি স্যারের নির্দেশমতন সেটা ওঁর কোলের ওপরে নামিয়ে রাখলাম। উনি চাদরের মধ্যে থেকে হাত বার করে বাক্সটার ডালা খুলে, তার ভেতর থেকে একে-একে বার করলেন একটা পোড়ামাটির ঘট, একটা বাঁশের চলটা দিয়ে বানানো ছুরি আর তাঁতে বোনা খুব রংচঙে একটা কাপড়ের টুকরো।

সেগুলোকে বিছানার চাদরের ওপরে সাজিয়ে রেখে বিরাজ কাপালি নিজের মনেই বললেন, আমি নিজেও রিসেন্টলি রুমানিয়ার ফোক-আর্টের অ্যালবামের সঙ্গে এগুলোকে মিলিয়ে দেখেছি। ছুরি আর পাত্রের এই গড়ন, কাপড়ের মোটিফ সবই মিলে যাচ্ছে। বাবা কিছু ভুল বলেননি। এবং জেনে রাখো, সারা পৃথিবীতেই ঠিক এই জিনিসগুলোই ডেভিল ওয়ারশিপের কাজে ব্যবহৃত হয়। অঞ্চলভেদে শুধু তাদের উপাদান বদলে যায়। গ্রিসের কোনো দ্বীপে হয়তো এই ঘটিটা তৈরি হত ব্রোঞ্জ দিয়ে। আবার মিশরে হয়তো এই উলেন কাপড়ের বদলে সুতির কাপড় ব্যবহৃত হত। কিন্তু জিনিসগুলোর চরিত্র একই থাকত।

বললাম, চরিত্র মানে?

কাপালি স্যার হেসে বললেন, চরিত্র মানে যা চোখে দেখা যায় না। যেমন, চোখে দেখে তুমি বুঝতে পারবে না যে, এই ঘটিটার মধ্যে একটা প্ল্যাসেন্টা ছিল—যাকে বাংলায় বলা হয় নাড়ি কিম্বা ফুল। যে নাড়ির মধ্যে দিয়ে গর্ভের ভ্রূণের সঙ্গে মায়ের রক্তের যোগ থাকে। শিশুর জন্মের পরে ফুলটাকে এইধরনের ঘটিতে করে মাটির নীচে পুঁতে রাখা হয়। এটাকেও মাটির নীচ থেকেই চুরি করে তুলে আনা হয়েছে।

এই যে বাঁশের ছুরি! এটাও ব্যবহার করা হয় বাচ্চার নাড়ি কাটার কাজে। আর এই কাপড়টা আসলে মৃত শিশুর দেহ আচ্ছাদনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। আমার বাবা এগুলোর আসল চরিত্র জানতেন।

বললাম, এই উপকরণগুলো হাতে পেলেই যে কেউ শয়তানকে ডেকে আনতে পারবে?

কাপালি স্যার বললেন, উঁহু! একেবারেই না। তারও বিশদ পদ্ধতি আছে এবং বাবা সত্যিকারে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তখনই, যখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানা ঘরের ভেতরে সেই পদ্ধতি মেনে শয়তান নামানোর পালা শেষ হয়ে গেছে।

দ্যাখো, সেই পদ্ধতি যে কেমন, তা আমি অত ডিটেলে বলতে পারব না। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে বাবার মুখে শোনা কিছু কথা—তার সব তো আমার মনে নেই। তবে যেটা মনে আছে, সেটা হল, ডেভিল, ডেমন কিম্বা শয়তান যাই বলো, তাকে নিয়ে আসার জন্যে প্রথমে নরকের সঙ্গে পৃথিবীকে একটা ঘরের মধ্যে দিয়ে জুড়ে দিতে হয়। যেমন মাটির নীচে যে-জল, সেই জলের কাছে পৌঁছতে গেলে একটা কুঁয়ো খুঁড়তে হয়, সেইরকমই। শয়তান-উপাসকদের কাছে এই কুঁয়োটা একটা ঘর। নরকের সঙ্গে সেটা যুক্ত। শয়তানকে ডাকলে তিনি সেই ঘরে আবির্ভূত হন।

ঘরটাকে এমন হতে হবে, যে-ঘরের বাতাসে অনেক মানুষের আতঙ্ক আর শোক জমে পাথর হয়ে আছে। রুমানিয়ার জিপসিরা সাধারণত মড়কে উজার হয়ে যাওয়া কোনো গ্রামের একটা তাঁতঘর বেছে নিত। তাঁতঘর বোঝো তো? কাপড় বুনবার তাঁতযন্ত্র বসানো থাকে যে ঘরে। ওরা সেই ঘরটাকেই নানান গুহ্য প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে শয়তানের ঘরে রূপান্তরিত করত।

কাপালি স্যারের কথা শুনতে-শুনতে আমার মাথার মধ্যে একটা ছবি আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে উঠছিল। বললাম, তাঁতঘরের বদলে পোর্সেলিনের কারখানা হলে হবে?

কাপালি স্যার অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, হবে নয়, বললামই তো, হয়েছিল। তবে তার জন্যে স্টিফেন মেয়ারের মৃত্যুর প্রয়োজন ছিল না।

তাহলে যে আপনি বললেন, সেই ঘরে অনেক মানুষের আতঙ্ক আর শোক জমে থাকতে হবে। স্টিফেন মেয়ার ছাড়া আর কেউ তো…

কাপালি স্যার বললেন, আর কেউ ওই কারখানায় মারা যায়নি, তাই তো? তা হয়তো যায়নি, কিন্তু তবুও বহু নিরীহ মানুষের দীর্ঘশ্বাস ওই ঘরে তখনো ছিল এবং এখনো জমে রয়েছে।

কীভাবে?

এইভাবে—!

বিরাজ কাপালি সেই কাঠের বাক্সটার ভেতর থেকে খুব সাবধানে একটা নরম কাপড়ের মোড়ক বার করে আনলেন। তারপর মোড়কটা খুলে একটা পোর্সেলিনের প্লেট বার করে কোলের ওপরে রেখে আমাকে বললেন, কাছে এসো। ভালো করে দ্যাখো। রক্তের দাগ দেখতে পাচ্ছ?

আমি ওঁর কোলের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে দেখলাম, সত্যিই, সাদা প্লেটটার গায়ে কোনো তরল শুকিয়ে জমাট বেঁধে রয়েছে। কালচে রঙ দেখে সেটাকে রক্তের দাগ বলেই মনে হল। আমি চোখে প্রশ্ন নিয়ে কাপালি স্যারের দিকে তাকালাম। উনি বললেন, এরকম রাশি-রাশি পোর্সেলিনের প্লেট আর মিনিয়েচার স্ট্যাচু তুমি নিশ্চয়ই ওখানে দেখেছ; মানে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানা-ঘরের র‌্যাকে। এর প্রত্যেকটির সঙ্গে মৃত-মানুষের দীর্ঘশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে।

কেন? আমি জিগ্যেস করলাম।

হলোকস্টের সময় জার্মান গেস্টাপো-বাহিনী যখন দলে-দলে ইহুদিদের ধরে কনসেনট্রেসন-ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সেই হতভাগ্য ইহুদি-পরিবারগুলোর ঘর থেকে যত বাসন-কোসন আর আসবাবপত্র তুলে নিয়ে গিয়েছিল ইভা স্টাইনবেকের মতন এস এস বাহিনীর কর্মীরা। ম্যুনিখ শহরের বড়-বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে নিলামে বিক্রি করা হত সেই ইহুদিদের সম্পত্তি। এখনো তুমি গুগল সার্চ করলে সেরকম নিলামখানার ছবি দেখতে পাবে।

বিশ্বযুদ্ধের শেষে ভারতে পালিয়ে আসার সময় ইভা স্টাইনবেক বাক্স ভর্তি করে ওরকম ইহুদি ক্রকারির স্তূপ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি জানতেন, ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির ফার্নেসে একটি-দুটি করে এই কাচের বাসন আহুতি দিতে হবে। তাতেই শয়তানের টনক নড়বে। তিনি সহজে দেখা দেবেন।

জিগ্যেস করলাম, এইভাবে ইভা স্টাইনবেক আর স্টিফেন মেয়ার দুজনে মিলে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানাটাকেই শয়তানের ঘর বানিয়ে তুলেছিলেন?

হ্যাঁ। প্রথম থেকেই সেটাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। ওসব ব্লাড চারকোল ফারকোল সবই বাজে কথা। কসাইখানার ওই রক্ত, এই কাচের বাসন, ওই ফার্নেস—সবই ছিল শয়তানের ঘর বানানোর প্রক্রিয়া।

ওদের উদ্দেশ্য কী ছিল?

তক্ষুনি আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বিরাজ কাপালি আবারও বাক্সের ভেতর থেকে একটা নরম কাপড়ের মোড়ক বার করে আনলেন। বাক্সটা খালি হয়ে গেল। তিনি মোড়কটা খুলে বার করে আনলেন একটা দশ ইঞ্চি মাপের স্কাল্পচার। জিনিসটা দেখে মনে হল, কোনো পশুর হাড় খোদাই করে সেটাকে তৈরি করা হয়েছে। এবার আমাকে আর কাছে যেতে হল না। এতই নিখুঁত ছিল সেই ভাস্কর্য যে, আমি নিজের জায়গায় বসেই তার সমস্ত ডিটেলস পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম।

মোট তিনটে ফিগার ছিল মূর্তিটার মধ্যে।

একদম পেছনে এক বৃষ-মানুষ। তার পেশিবহুল হাত, পা এবং দেহকান্ড সবকিছুই মানুষের মতো। শুধু ঘাড়ের ওপরে মাথাটা মানুষের নয়, ষাঁড়ের। যেন বিজয়গর্বে মাথাটা সামান্য পেছনে হেলিয়ে রেখেছে সেই মহাষন্ড। তার দুই উরুর মাঝখানে প্রকট অতিদীর্ঘ লিঙ্গটিও মানুষের নয়, ষাঁড়ের। আর দুই পায়ে পাতার বদলে চেরা-ক্ষুর।

বৃষমানুষের সামনে একটা পাথরের ওপরে বসে রয়েছে এক নারী। এক জননী। তার কোলে শুয়ে রয়েছে এই ভাস্কর্যের তৃতীয় মূর্তিটি—যা এক সদ্যোজাত শিশুর মূর্তি। নারীটি পরম মমতায় তাকিয়ে রয়েছে কোলের শিশুটির দিকে। শিশুটিকে সে স্তন্যদান করছে।

এই স্কাল্পচারটা পৃথিবীর আর সমস্ত স্কাল্পচার থেকে আলাদা শুধু ওই স্তনের কারণে। নারীটির বুকে তিনটি স্তন। শিশুটি মাঝের স্তন থেকে দুগ্ধপান করছে।

আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। নিজের অজান্তেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘ওহ মাই গড।’

বিরাজ কাপালি বললেন, এইসব মূর্তির উপস্থিতিতে গডের নাম কোরো না হে জোসেফ রুদ্রনাথ। এরা গডের প্রতিদ্বন্দ্বী। শয়তান পরিবারের সদস্য এরা।

বললাম, কিন্তু কেন? কেন স্যার?

কী ‘কেন’? তৃতীয় স্তন? শোনো। ডেভিল, ডেমন, প্যান, বাস্টেট কিম্বা ব্যাল—এদের সঙ্গে জড়িত যত মিথ—সবক’টাতেই এই তৃতীয় স্তনের কথা আছে। নারীর স্বাভাবিক যে-দুটি স্তন, সে তো ঈশ্বরের দান। স্বাভাবিক মানবশিশুদের জন্যে ওই স্তনদুটি ঈশ্বরের করুণাধারার পাত্র। কিন্তু শয়তান তার নিজের ঔরসজাত সন্তানের জন্যে ঈশ্বরের অনুগ্রহ নেবে কেন? তাই শয়তানের সঙ্গে মিলনের ফলে কোনো নারী গর্ভবতী হলে, তার বুকে গজিয়ে ওঠে ওই তৃতীয় স্তন। যেমন গজিয়ে উঠেছিল…

তাঁকে কথা শেষ করতে না দিয়ে আমি বলে উঠলাম, ইভা স্টাইনবেকের বুকে।

এগজ্যাক্টলি।

তারপর আপনার বাবা কী করলেন?

তিনি এই জিনিসগুলো বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। মাকে যখন বিশদে সবকিছু বুঝিয়ে বলছিলেন, তখন আমার কানেও কিছু কথা এসেছিল। খুব একটা মনোযোগ দিইনি। তবে বাবার একটা কথা মনে গেঁথে আছে। বাবা বলেছিলেন, ঈশ্বরের নামে খুব নিরাপদে রাজনীতি করা যায়। দুনিয়া জুড়ে পুরুত মোল্লা, পাদ্রী আর রাষ্ট্রনায়করা তার প্রমাণ রেখে চলেছে। কিন্তু শয়তানকে যে রাজনীতির কাজে লাগানো যায় না, সেটা বুঝতে নাৎসি-মেয়ে ইভা স্টাইনবেকের একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। ফলে সে তো মরলোই, মাঝখান থেকে প্রাণ গেল আমার বেচারা বাবার। উনি সোমেশ্বর কাপালির কথা বলছিলেন, বুঝতেই পারছ।

বাবা নিজে যেটা বুঝতে পারেননি সেটা হল, শয়তানের-জমি বিক্রিও করা যায় না। ওই ঘটনার ক’দিন পরেই বাবা এক ডিমোলিশন-ফার্মকে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিনের কারখানা দেখিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পরের সপ্তাহেই ওই বিল্ডিং ডিমোলিশ করার কথা হয়েছিল। কিন্তু তিনিও আর বাড়িতে ঢুকতে পারলেন না। যে-কানাগলিটা ধরে এই বাড়িতে তুমি আজ ঢুকলে, ওই গলির একটু ভেতরেই তিনি উপুড় হয়ে পড়েছিলেন।

খুন?

হ্যাঁ, খুন।

কে করল? কেনই বা করল?

কাপালি স্যার বললেন, লোকে বলে নকশালেরা। পুলিশও একই অনুমানে কেসটা ক্লোজ করে দিয়েছিল। সালটা উনিশশো উনসত্তর। কাজেই অবিশ্বাস করার কিছু নেই, যদিও বাবার মতন অরাজনৈতিক লোক কেনই বা নকশালদের টার্গেট হবেন তা বোঝা কঠিন। তাছাড়া বাবার ডেডবডির পাশে যে-ছুরিটা পড়েছিল, যেটা দিয়ে বাবার গলার নলি কেটে ফেলা হয়েছিল, সেটা ঠিক এইরকম একটা ছুরি। বাঁশের চোঁচ দিয়ে বানানো। কলকাতার নকশাল-যুবকেরা রুমানিয়ার জিপসি-ছুরি দিয়ে অপারেশন করছে, এটা কি তোমার বিশ্বাসযোগ্য লাগছে?

সে যাইহোক, মোদ্দা কথা হল, বাবার মার্ডার নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য হল না। তখন সকাল-বিকেল কলকাতায় লাশ পড়ছে। তার মধ্যেই আরেকটা লাশ হয়ে মিশে গেলেন বিশ্বনাথ কাপালি।

ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানার তো আগে থেকেই ভূতুড়ে বাড়ি দুর্নাম ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পরে সেই দুর্নামের মাত্রা চড়ল। উনিশশো উনসত্তরের পর আবার পঞ্চাশ-বছর সেই কারখানা ফাঁকা পড়ে রইল, কেউ ওখানে পা দিল না। তারপর আজ থেকে দু-বছর আগে আবার আমি গেলাম ওখানে। মানে যেতে বাধ্য হলাম। অনেকটাই আমার বাবা যে-কারণে গিয়েছিলেন সেই একই কারণে—অর্থসংকটে।

তারপর একটু ইতস্তত করে বিরাজ কাপালি বললেন, না। মিথ্যে বলব না। অর্থসংকটে নয়, অর্থলোভে।

লোভটা দেখাল, ওই নীচের ঘরে যে বিদেশিনীদের দেখলে, তারা। দু-বছর আগে থেকে ওরাই যাতায়াত শুরু করল এখানে, আমার কাছে। ওদের একটাই অনুরোধ। ডেমনের সঙ্গে সঙ্গমের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

সে কী! ওরা কারা? আমি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম।

‘নিও-নাৎসি’। সোজা কথায় নতুন নাৎসি। গোপনে-গোপনে ওরা আবার ছড়িয়ে পড়ছে জার্মানির আনাচে-কানাচে। কিন্তু ওদের দর্শনটা পুরোনো। সেই হিমলারের দর্শন—জার্মান নারীদের গর্ভে জন্ম নেবে এমন সব সন্তান যাদের রক্তে কোনো নীচ জাতির ভেজাল থাকবে না। ইহুদিদের নয়, অনার্যদের নয়। অতএব আদিম দেবতা বা ডেমনের সন্তান চাই ওদের। সেই আশা নিয়েই ওরা এখানে, সার্পেন্টাইন-লেনের এই কানাগলিতে খুব গোপনে যাতায়াত করছে। তার বদলে ওরা আমাকে যে পয়সাটা কবুল করছে, সেটা অবিশ্বাস্য। আমার এই-মুহূর্তে পয়সার খুব দরকার। সম্পত্তি বেচে খাচ্ছি।

কিন্তু ওরা আপনার কারখানার সঙ্গে শয়তানের যোগসূত্রের কথা জানল কেমন করে?

কেন? ইভা স্টাইনবেক যে সংগঠনের সদস্যা ছিলেন ওরাও তো তারই সদস্যা। ওরাও তো লেবেনসবর্ন-গার্লস। ইভা স্টাইনবেক কোন উদ্দেশ্যে ভারতের কোথায়-কোথায় ঘুরেছিলেন তার কিছু নথি তো ওদের হাতে পৌঁছবেই।

ইভা নাকি সেই সত্তরবছর আগে শয়তানের সঙ্গে সফল মিলনের পরে আনন্দে পাগল হয়ে ওদের সেই গোপন-সংগঠনের সর্বময় কর্তাকে চিঠি লিখেছিল—আমি আমার স্বপ্নের খুব কাছে এসে পৌঁছেছি। সবচেয়ে আশ্চর্য কী জানো রুদ্র, এই মেয়েগুলো সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে ইভা আর স্টিফেনের সাধন-প্রক্রিয়ার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা। প্রথম যখন আমার সঙ্গে দেখা করেছিল, তখন ওরা খুব কনফিডেন্টলি বলেছিল, শুধু ব্যাভেরিয়া ইন্ডাস্ট্রির ঘরটা পেলে বাকি কাজটা ওরা নিজেরাই করে ফেলতে পারবে।

ইভা স্টাইনবেক আর সোমেশ্বর কাপালির অপঘাত মৃত্যুর কথা আপনি ওদের বলেননি? বলেননি আপনার বাবার মৃত্যুর কথা?

সব বলেছি। কিন্তু ওরা নাছোড়। ফ্যানাটিকদের সাইকোলজি এরকমই হয়।

তারপর?

এখনো অবধি ওরা সাফল্য পায়নি। ওরা বলছে, ডেমন নাকি ওদের দেখাও দিয়েছেন। কিন্তু তিনি খুঁজছেন তাঁর আগের সন্তানকে। তাকে না পেলে তিনি আর নতুন সন্তান দিতে রাজি নন।

কিন্তু তাকে আপনারা পাবেন কোথায়? সেই বাচ্চা তো মারাই গেছে মনে হয়।

বিরাজ কাপালি কাঠের বাক্সের মধ্যে জিনিসগুলো একে একে গুছিয়ে তুলে রাখতে-রাখতে বললেন, জানি না। ওদের বক্তব্য, সে বেঁচে আছে। ডেমন নিজেই তাকে নিয়ে আসবেন।

আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো। ওদের আপনি ওই কারখানায় রেখেছেন কেন? ওই হাসি, পঙ্কজ, বিশাখাদের?

বিরাজ কাপালি বললেন, ওরা এমনিই চলে আসে রুদ্র। যখন সোমেশ্বর কাপালি আর ইভা স্টাইনবেক ওই কারখানায় ছিলেন, তখনও এরকম অদ্ভুত কিছু নারী-পুরুষ সেখানে এসেছিল। আমার ধারণা, এই পৃথিবীতে কিছু-কিছু মানুষের ওপরে খুব স্বাভাবিকভাবেই শয়তানের প্রভাব এসে পড়ে। তাদের মধ্যে কিছু-কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দেখা যায়। আলো দেখলে যেমন মথেরা আপনা থেকেই সেদিকে ছুটে যায় ওরাও সেইভাবেই ওই কারখানায় চলে আসছে। আমি ওদের তাড়াইনি। আছে থাক। যদি ওদের অস্তিত্ব শয়তানের মনঃপূত হয়, যদি ওদের জন্যে তার এখানে আসার টান বাড়ে, তাহলে ক্ষতি কী?

আমাকে কেন নিয়ে এলেন? আমিও কি বিশাখা, পঙ্কজ আর হাসিদির দলে? শয়তানে পাওয়া ছেলে?

না না! কখনোই নয়। এর উত্তরও আমি তোমাকে দেব। তবে আজ নয়। এগারোই এপ্রিল। আর ঠিক পাঁচদিন পরে। সেদিন শুকতারা মানে শুক্রগ্রহ পৃথিবীর খুব কাছে আসছে। ভোরের আকাশে এক জ্যোতিষ্কের ঔজ্জ্বল্যে সেদিন ফুটে উঠবে সেই তারা। তুমি জানো কিনা জানি না, খ্রিস্টধর্ম যাকে শয়তান বলে দেগে দিয়েছে, সেই ঈশ্বরবিরোধী লুসিফার আসলে শুকতারার সন্তান। তিনি ভোরের দেবদূত। আমি নিজেও জানতাম না। ওরাই আমাকে বলল—ওরা মানে ওই এমা, হানা, সোফিয়া, লীনারা। সেদিনই ওরা আবার লুসিফারের কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করবে। ওদের ধারণা সেদিন ওরা সফল হবেই। সেদিনই তোমাকে আমি বলব, তোমাকে কেন এখানে এনেছি।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, বেশ। তাই হবে। এই ক’দিন কি আমাকে ওখানেই থাকতে হবে স্যার? না, মানে ভাবছিলাম যদি এদিকে একটা হোটেল-টোটেলে মাঝের এই ক’টাদিন কাটিয়ে দিই। নিজের টাকাতেই থাকব, আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।

বৃদ্ধ কাপালি স্যার হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা চেপে ধরে বললেন, না রুদ্র, প্লিজ। ওখানেই থাকো। তোমার ওখানে থাকাটা খুব জরুরি।

আচ্ছা বেশ। তবে ওই অবধিই। তারপরে আর থাকব কিনা সেটা বলতে পারছি না।

.

শেষ অবধি রাত বারোটা নাগাদ প্রশান্তবাবুর গাড়িতে কাচ কারখানায় পৌঁছেছিলাম। ওরা জেগেই ছিল। ক্লান্ত লাগছিল খুব। সেটা যতটা না শরীরের ক্লান্তি, তার চেয়ে বেশি মনের। কোনোরকমে দুটো রুটি পেটে চালান করে, নিজের ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।