ছয়
কাপালিদের আদি নিবাস ছিল বাঁকুড়ার জটাকেশী গ্রামে। সেখানে তাঁদের বংশগত কবিরাজি চিকিৎসার ব্যবসা ছিল। ভেষজ-চিকিৎসায় খুব নামডাক ছিল তাঁদের। বংশের উজ্জ্বলতম সন্তান ছিলেন সোমেশ্বর কাপালি, যিনি ছিলেন আমার পিতামহ। সোমেশ্বরের যখন মাত্র বাইশবছর বয়স তখনই তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর যা প্রতিভা তাতে বাঁকুড়ার এক অজ পাড়াগাঁয় পড়ে থাকা তাঁকে মানায় না।
সোমেশ্বরের পিতৃদেব, মানে আমার প্রপিতামহ সবেমাত্র তার আগের বছরেই দেহ রেখেছিলেন। মা মারা গিয়েছিলেন শৈশবেই। কাজেই তাঁর কোনো পিছুটান ছিল না। আরো খ্যাতি এবং আরো অর্থের স্বপ্ন চোখে নিয়ে সোমেশ্বর জটাকেশী গ্রামের বাড়ি-জমি সব বিক্রি করে দিয়ে কলকাতায় চলে এলেন। সেটা ছিল ইংরিজি উনিশশো-একুশ সাল। কলকাতায় এসে সোমেশ্বর, মানে আমার দাদু, সার্পেন্টাইন লেনে ছ-কাঠা জমি কিনে এই বাড়িটা বানালেন এবং সেই বাড়িরই একতলায় খুলে বসলেন তাঁর কবিরাজি চিকিৎসালয়।
বছর দশেকের মধ্যেই তিনি কবিরাজি চিকিৎসায় অঢেল অর্থ উপার্জন করলেন। না, ভুল বললাম। সোমেশ্বর কাপালি চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করেছিলেন প্রথম পাঁচবছর। তারপরে উনি শুরু করেন পেটেন্ট-মেডিসিনের ব্যাবসা আর তাতেই লক্ষ্মীলাভ করেন।
আমি জিগ্যেস করলাম, পেটেন্ট-মেডিসিন মানে?
কাপালি স্যার বললেন, একেকরকম জটিল-রোগের জন্যে একেকরকম ওষুধ, যেগুলো ডাক্তার না দেখিয়েই খাওয়া যায়। মনে রেখো, সেটা টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরির প্রথমদিক। এখনকার মতন চারিদিকে তখন এত অ্যালোপ্যাথি ওষুধের দোকান ছিল না। এত ডাক্তারও ছিল না। শহরে তবু যা দু-চারজন ছিলেন, গ্রাম-মফসসলে তো বদ্যি আর হোমিওপ্যাথই ছিল ভরসা।
কাজেই সোমেশ্বর কাপালির গোপন ফর্মুলায় তৈরি অর্শের মলম অর্শমেধ, বাত-বেদনার মালিশ অশ্বিনী-তৈল কিম্বা স্ত্রীরোগের মহৌষধ অশোকা-বড়ি ভালোই বিক্রি হত। পাড়ার মুদিখানা থেকে লোকাল ট্রেনের কামরা, গ্রামের মেলা থেকে ট্রামের গুমটি সবখানে পাওয়া যেত জটাকেশী ফার্মেসির প্রোডাক্ট। তবে তাঁকে সত্যিকারের লাখোপতি করে দিয়েছিল তাঁরই আবিষ্কৃত ম্যালেরিয়ার মিক্সচার ম্যালাহারি।
জটাকেশী-ফার্মেসি!
হ্যাঁ, ওটাই ছিল আমার পিতামহের ব্যবসার ট্রেডনেম। খারাপ নয়, বলো। জটাকেশী নামটার মধ্যে শুধু তো তাঁর ছেড়ে-আসা ভিটের স্মৃতি ছিল না; একটা দৈবক্ষমতার গন্ধও ছিল। অসুস্থ মানুষের মনে ওটা চিরকালই বাড়তি ভরসা নিয়ে আসে।
যাইহোক, এইভাবেই কলকাতায় তাঁর পনেরোটা বছর কেটে গেল। এল উনিশশো ছত্রিশ সাল। উনিশশো ছত্রিশ বললে তোমার কি কিছু মনে পড়ে, রুদ্র?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলছেন কি?
গুড। হ্যাঁ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। শুরু হল সেই যুদ্ধ। হিসেবমতন সোমেশ্বরের বয়স তখন সাঁইত্রিশ। বিবাহিত। চারটি সন্তানের জনক। প্রথম তিনটি কন্যা। কনিষ্ঠ পুত্র বিশ্বনাথ কাপালি, অর্থাৎ আমার বাবার বয়স তখন মাত্র ছ’বছর।
তুমি নিশ্চয়ই জানো, যুদ্ধের বাজারে সবকিছুরই দাম হয়েছিল আকাশছোঁয়া। সেই সুযোগে বহু ব্যবসায়ী ধুলোমুঠিকে সোনামুঠি করে ফেলেছিল। কিন্তু সেই বাজারেও মার খেয়ে গেলেন আমার দাদু। কেন বলো তো? যে আটবছর যুদ্ধ চলেছিল তার মধ্যেই সারা দেশে হু-হু করে অ্যালোপ্যাথি-ডাক্তারখানা আর হাসপাতাল গজিয়ে উঠেছিল।
প্রথমে সৈনিকদের প্রয়োজনেই সেসব তৈরি হয়েছিল। তবে দেখতে-দেখতে সেসব সুবিধে সাধারণ মানুষদের নাগালেও পৌঁছিয়ে গেল। তার অনেক আগেই ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে কুইনাইন এসে গিয়েছিল বাজারে। ফলে দাদুর লক্ষ্মী সেই ম্যালাহারি মিক্সচারের বিক্রিও তলানিতে নেমে গিয়েছিল।
উনিশশো-সাতচল্লিশে জটাকেশী ফার্মেসির ঘাড়ে নিয়তির শেষ কোপটা পড়ল। দাদুর তৈরি ওইসব পেটেন্ট-মেডিসিনের বারোআনাই বিক্রি হত পূর্ববঙ্গের গ্রামগঞ্জে, যে-কারণে কলকাতার মতনই ঢাকাতেও কোম্পানির ফ্যাক্টরি এবং অফিস ছিল। দেশভাগের ফলে সেটা হয়ে গেল পূর্ব পাকিস্তান। দাদু হারালেন তাঁর আসল বাজার।
ডায়েরিগুলো পড়েছি বলেই বলতে পারছি, সেইসময়ে দাদুর অবস্থা হয়ে গিয়েছিল পাগলের মতন।
তখনো ছোটপিসির বিয়ে দেওয়া বাকি। ওদিকে আমার বাবা তখনো নাবালক। কলকাতার কারখানায় পনেরোজন কারিগর ছাড়াও অন্তত পঞ্চাশজন মাইনে-করা ক্যানভাসার ছিল, যারা স্টেশনে-বাজারে জটাকেশীর ওষুধ বিক্রি করে বেড়াত। এতগুলো মানুষের বেতন দেবেন কোথা থেকে সেই চিন্তাতেই দাদুর তখন রাতে ঘুম হত না।
তোমাকে বলা হয়নি, ওই যে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রি, ওইটেই তখন ছিল জটাকেশীর ওষুধের কারখানা।
ওইসময়েই, মানে উনিশশো-আটচল্লিশ সালে একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
তখন সন্ধে সাতটা কি আটটা হবে। কারখানার কর্মচারীরা তার অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে। কিছু কাঁচামাল আসার কথা ছিল। সেগুলো আসতে দেরি হচ্ছিল বলে দাদু আর দাদুর কোম্পানির ম্যানেজার রমেনবাবু কারখানা ছাড়তে পারছিলেন না। শেষ অবধি সেই জড়িবুটি চালান এসে পৌঁছল সন্ধে সাতটায়। দাদু কারখানার দরজায় তালা দিয়ে বেলেঘাটা রোডের দিকে হাঁটা দিলেন। রমেনবাবুর বাড়ি উল্টোদিকে। তিনি সেদিকে চলে গেলেন।
কারখানার গেট ছেড়ে দাদু বোধহয় দশ-পাও এগোননি, বেলেঘাটার দিক থেকেই একটা ট্যাক্সি এসে দাদুর গা ঘেঁষে থামল। দরজা খুলে নেমে এলেন এক সাহেব আর মেমসাহেব। দাদুর সামনে দাঁড়িয়ে সাহেব প্রশ্ন করলেন, মিস্টার কাপালি?
ইয়েস।
আপনার সঙ্গে একটু ব্যবসা সংক্রান্ত কথা ছিল।
দাদু তো আকাশ থেকে পড়লেন। চূড়ান্ত অবাক হয়ে বললেন, ব্যবসা! সাদা চামড়ার লোকেরা তো এখন ইন্ডিয়া থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে ব্রিটেনে ফিরে যাচ্ছে। আপনারা নতুন করে কোন ব্যবসার কথা ভাবছেন শুনি?
সাহেব বললেন, বলছি সব। আগে একটু ভেতরে গিয়ে বসি, চলুন।
অগত্যা দাদু আবার কারখানার দরজার তালা খুলে সাহেব এবং মেমকে নিয়ে নিজের অফিসঘরে গিয়ে বসলেন। অফিসঘরের আলো জ্বালার পরে এতক্ষণে তিনি দুই আগন্তুককেই ভালো করে দেখতে পেলেন।
সাহেবটির চেহারা অদ্ভুত। একেকজন লোক থাকে যাদের দেখলেই মনটা বিরক্তিতে ভরে ওঠে—এ ঠিক সেইরকমের লোক। শ্বেতাঙ্গ ঠিকই, কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় বহুদিন ধরে রোদে পুড়েছেন। তার ফলে গায়ের চামড়াতেই যে শুধু বাদামি রঙ ধরেছে তাই নয়, সারা মুখেও অজস্র আঁকিবুঁকি দাগ পড়েছে। টিয়াপাখির মতন বাঁকানো নাক। কুতকুতে দুটো চোখের মণির রঙ ঘোলাটে। সর্বোপরি ঝুলে-পড়া ঠোঁট আর হাতের আঙুলের কাঁপুনি দেখে একজন চিকিৎসক হিসেবে সোমেশ্বর কাপালির বুঝতে বাকি রইল না যে, বৃদ্ধটি চূড়ান্ত মদ্যপ।
হ্যাঁ, বৃদ্ধ। সাহেবটির বয়স তখনই সত্তরের কম ছিল না।
দাদুর চোখে তার পোশাক-আশাকও অদ্ভুত ঠেকেছিল। নোংরা একটা সাদা আলখাল্লা পরেছিলেন তিনি। মাথায় গোল বাটির মতন ক্যাপ। সব মিলিয়ে যাজকের পোশাক। গলার সঙ্গে চেনে বাঁধা একটা ধাতুর ক্রুশ তাঁর বুকের ওপরে ঝুলছিল, কিন্তু ঝুলছিল উলটো-মুখে—অর্থাৎ মাঝের ডাঁটিটার ছোট দিকটার মুখ নীচের দিকে ছিল। এর অর্থ দাদু সেদিন বোঝেননি।
ডেভিল-ওয়রশিপার? আমি জিগ্যেস করলাম।
একদম। শয়তানের উপাসক। স্টিফেন মেয়ার ছিলেন তাই। স্টিফেন মেয়ার ছিল তাঁর নাম। যাজক স্টিফেন মেয়ার। জানা গেল, তিনি দীর্ঘকাল মেঘালয়ের উপজাতিদের মধ্যে ধর্মপ্রচারের কাজ করেছেন; কিন্তু ইদানিং আদিবাসীদের মধ্যেও হানাহানি বড্ড বেড়ে গেছে। স্টিফেন আর আগের মতন শান্তিতে কাজ করতে পারছেন না। তাই যাজকের বৃত্তি ত্যাগ করে ব্যবসায় নামবেন বলে ঠিক করেছেন।
মেয়ার-সাহেবের রোদে-পোড়া চামড়ার কারণ বোঝা গেল। মেঘালয়ের পাহাড়ি রোদ।
এবার দাদু তাকালেন মেমসাহেবের দিকে। তিনি যুবতী এবং পরমা সুন্দরী। সোনালি চুল, নীল চোখ এবং দীর্ঘাঙ্গী। নাম বললেন ইভা স্টাইনবেক।
মেমসাহেবের নামটা শুনেই দাদুর খটকা লাগল। জিগ্যেস করলেন, আপনি কি জার্মান?
চিবুকটা সামান্য উঁচু করে সগর্বে সেই শ্বেতাঙ্গিনী উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। জার্মান এবং আর্য।
.
বেশ মন দিয়ে বিরাজ কাপালির কথকতা শুনছিলাম। পুরোনো দিনের গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে? কিন্তু হঠাৎ তিনি গল্প থামিয়ে এমন একটা প্রশ্ন করে বসলেন যে, আরেকটু হলে ভির্মি খাচ্ছিলাম। বললেন, আচ্ছা রুদ্র। তুমি লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের নাম শুনেছ?
বললাম, সে তো একজাতের মুরগি।
আঃ। কানে কম শোনো নাকি? একটু বিরক্ত হয়ে ঘাড় নাড়লেন বিরাজ কাপালি, লেগহর্ন নয়, লেগহর্ন নয়—। লেবেনসবর্ন। এল ই বি ই এন এস—লেবেন্স। বি ও আর এন—বর্ন। অরিজিনালি জার্মান শব্দ। বাংলায় অনুবাদ করলে মানে দাঁড়াবে প্রাণ-ঝরনা।
এতক্ষণ উনি যা বলে যাচ্ছিলেন তার সঙ্গে প্রাণ-ঝরনার কী সম্পর্ক বুঝতে পারলাম না! শুকনো-মুখে বললাম, ও। আচ্ছা।
বিরাজ কাপালি আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, মোটেই আচ্ছা নয়। নাৎসি বীভৎসতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ছিল ওই লেবেনসবর্ন প্রোগ্রাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই কালো দিনগুলোয় স্কুৎজস্টাফ বা সংক্ষেপে এস এস বাহিনীর নাম শুনলে সারা ইওরোপের মানুষের বুকের রক্ত হিম হয়ে যেত। হিটলারের বুলডগ বাহিনীও বলতে পারো এস এসকে।
সেই প্যারামিলিটারি ফোর্সের চিফ ছিলেন হাইনরিখ হিমলার। ওইসময়ে জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের পরেই সবচেয়ে পাওয়ারফুল লোক ছিলেন তিনি। আস্ত অমানুষ। ইহুদি-নিধন যজ্ঞ বা হলোকস্টের পেছনে তাঁর যে শয়তানি-বুদ্ধি ভরা মাথা কাজ করেছিল, সেই একই মাথা থেকে বেরিয়েছিল লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের ছক। আর এই দুষ্কর্মে হিমলারের সহযোগী ছিলেন এক নীতিজ্ঞানহীন চিকিৎসক—ডক্টর গ্রেগর এবনার। এরা দুজনে মিলে খাঁটি আর্য-সন্তান প্রসব করানোর এক প্রোজেক্ট তৈরি করেন। তারই নাম লেবেনসবর্ন-প্রোগ্রাম।
সেই সময়ে জার্মানিতে হিটলারের অন্ধ ভক্তের সংখ্যা তো কম ছিল না। তাদের মধ্যে শুধু পুরুষই ছিল না, নারীও ছিল অনেক। তাদের মধ্যে থেকেই বেছে নেওয়া হত অবিবাহিতা যুবতী ভলান্টিয়ারদের। দেখে নেওয়া হতো তাদের পেডিগ্রি। দেখা হতো তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কোনো অনার্য রক্ত, বিশেষত ইহুদি-রক্ত মিশেছিল কিনা। আর শারীরিক লক্ষণ হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া হত তাদের, যাদের চোখের মণি নীল, চুল সোনালি আর যারা দীর্ঘাঙ্গী।
এইবার আমি নড়েচড়ে বসলাম। একটু আগে বিরাজ কাপালি ইভা স্টাইনবেকের যে ডেসক্রিপসন দিলেন, তার সঙ্গে লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের ভলান্টিয়ারদের চেহারা বেশ মিলে যাচ্ছে তো!
তারপর? আমি প্রশ্ন করলাম।
তারপর এস এস বাহিনীর অফিসারদের মধ্যে যাদের ওই একই রকমের এরিয়ান পেডিগ্রি থাকত তাদের সঙ্গে মেয়েগুলিকে রাত কাটাতে হত। মাসের উর্বর রাতগুলো, বলাই বাহুল্য। সেসব হিসেব-নিকেশ করে দেওয়ার জন্যে প্রতিটি লেবেনসবর্ন-হোমে কোয়ালিফায়েড ডাক্তার থাকত।
এতই অবাক হলাম যে, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, আপনি সত্যি বলছেন?
মিথ্যেকথা বলে আমার লাভ? গুগল ঘেঁটে চেক করে নিতে পারো। তারপরে শোনো। এস এস অফিসার আর হিটলারের অনুগত মেয়েগুলির মধ্যে পরিচয়হীন প্রেমহীন সঙ্গম ঘটত। তারা কেউ কারুর পরিচয় জানত না। জানার দরকারই বা কী? হিমলারের প্ল্যান অনুযায়ী তারা তো সন্তান উৎপাদনের মেশিন ছাড়া আর কিছু ছিল না।
সঙ্গমের ফলে মেয়েগুলি গর্ভবতী হত। সন্তানের জন্ম দিত। সেই সন্তানগুলিকে লেবেনসবর্ন নার্সারিতে রেখে মেয়েগুলি ফিরে যেত যার যার বাড়িতে। পুরো ব্যাপারটাই রাখা হত গোপন। সত্যিকথা বলতে কি লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের পুরো ব্যাপারটাই সভ্যসমাজের গোচরে এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে, জার্মানির পরাজয়ের পরে।
সে যাইহোক, ওইসময়ে, মানে উনিশশো ছত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে লেবেনসবর্ন প্রোগ্রাম অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছড়িয়ে পড়ছিল। শুধু জার্মানিতেই নয়, ইওরোপের অন্যান্য যে দেশগুলো জার্মানি কব্জা করেছিল, যেখানকার মেয়েদের দেখে হিমলারের মনে হয়েছিল এদের মধ্যে আর্য লক্ষণ রয়েছে, সেখানেও শেকড় গেঁড়েছিল লেবেনসবর্নের বিষবৃক্ষ। বুঝতেই পারছ, সেসব দেশে তো আর হিটলারের অনুরাগী মেয়ে পাওয়া যেত না। কাজেই সেখানে যেটা হত সেটা অর্গানাইজড-রেপ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর্য সন্তান পাওয়ার জন্যে পোল্যান্ড কিম্বা নরওয়ের মতন দেশগুলোতে কত কুমারী মেয়েকে যে এস এস অফিসারদের সঙ্গে রাত কাটাতে হয়েছে তার গোনাগুন্তি নেই।
বাচ্চাগুলোর কী হত? আমি প্রশ্ন করলাম।
এমনিতে লেবেনসবর্ন-চাইল্ডরা ওইসময়ে পৃথিবীর অন্যান্য বাচ্চাদের চেয়ে একশোগুণ ভালো জীবন কাটিয়েছিল। রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে তারা প্রচুর খাবার পেত, ওষুধ পেত। নাৎসি-ধরনে শিক্ষাও পেত অনেকখানি। শুধু বাপ-মায়ের পরিচয়টুকু তারা জানতে পেত না। বাচ্চাগুলো হয়ে যেত নাৎসি-সরকারের সম্পত্তি।
হিমলারের আশা ছিল, ওই বাচ্চাগুলো বড় হলে নাৎসি ভাবধারায় নিবেদিতপ্রাণ এক বিপুলসংখ্যক যুবক যোদ্ধাকে পাওয়া যাবে। একইসঙ্গে পৃথিবীর বুকে গড়ে উঠবে খাঁটি আর্য এক জনসম্প্রদায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পরে যখন লেবেনসবর্নের লুকোনো নথিপত্র নুরেমবুর্গ ট্রায়ালে পেশ হল, তখন দেখা গেল ওই ন’-দশ বছরেই কুড়িহাজার অবৈধ সন্তানের জন্ম হয়েছিল। তার মধ্যে শুধু জার্মানি আর নরওয়ের লেবেনসবর্ন ক্যাম্পগুলোতেই জন্ম নিয়েছিল পনেরো হাজার শিশু।
কাপালি স্যারের কথা শুনতে-শুনতে মনে হচ্ছিল, খুব কুৎসিত একটা রূপকথা শুনছি। তবে যে-প্রশ্নটা অনেকক্ষণ ধরেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেটা আর না করে থাকতে পারলাম না। বললাম, আপনি বোধহয় ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির পত্তনির ইতিহাস বলছিলেন। তার সঙ্গে লেবেনসবর্ন-প্রোগ্রামের সম্পর্ক কী?
কাপালি স্যার বললেন, আছে। আরো কিছুটা না শুনলে বুঝতে পারবে না। যেদিন স্টিফেন মেয়ার আর ইভা স্টাইনবেক দাদুর সঙ্গে দেখা করতে এলেন, সেদিন আমার দাদুও সম্পর্কটা বুঝতে পারেননি। অবশ্য কেমন করেই বা বুঝবেন? ইভা যদিও চিবুক তুলে অহঙ্কারী-ভঙ্গিতে বলেছিলেন, আমি জার্মান এবং আর্য, কিন্তু এটা তো বলেননি যে তিনি ছিলেন লেবেনসবর্ন-প্রোগ্রামের একজন নিবেদিতপ্রাণ ভলান্টিয়ার। যখন বলেছিলেন, দাদু যখন তাঁর ডায়েরিতে ওই শব্দটার উল্লেখ করেছেন, ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে।
তবে হ্যাঁ। ইভা যে ঠিক কোন উদ্দেশ্যে ঈশপের উটের স্টাইলে দাদুর কারখানায় মাথা ঢুকিয়েছিল, সেটা জানলে দাদু নির্ঘাৎ ওদের সেইমুহূর্তেই বার করে দিতেন। কিন্তু কী আর করা যাবে।
বললাম, কারখানায় মাথা ঢুকিয়েছিল মানে?
মানে খুব সহজ। ধুঁকতে-থাকা জটাকেশী ফার্মেসির ওই বাড়িতেই একটা পোর্সেলিনের বাসনপত্র আর ছোট-ছোট মূর্তি তৈরি করার কারখানা গড়ার প্রস্তাব দিয়েছিন ওরা। মনে রেখো রুদ্র, এসব প্রায় পঁচাত্তর-বছর আগের কথা। তখনো এই ট্যাংরা-তিলজলা অঞ্চলকে প্রপার ক্যালকাটা বলে ধরা হত না। তাই ওদের প্রস্তাব শুনে দাদু প্রথমেই ভাবলেন, ওঁরা এই জমিটাতেই কারখানা বানাতে চাইছে কেন? তাছাড়া ‘সিক-ইন্ডাস্ট্রি’ হলেও জটাকেশীতে তো তখনো প্রোডাকশন চলছিল।
তার উত্তরে স্টিফেনসাহেব একটা ভারি অদ্ভুত কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, গোটা ইওরোপের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর পোর্সেলিনের বাসন যেখানে বানানো হয় জার্মানির সেই অঞ্চলটার নাম ব্যাভেরিয়া। আর সেই ব্যাভেরিয়ার সবচেয়ে খানদানি কারিগর-বংশের মেয়ে হচ্ছেন ইভা স্টাইনবেক।
ইভার কাছে রয়েছে দুধের মতন সাদা, শিশুর চোখের মতন নীল, কচি কুসুমপাতার মতন লাল এবং আরো একশোরকম রঙ আর ডিজাইনের বাসন বানানোর কারিগরি বিদ্যা। সেই আশ্চর্য পোর্সেলিন বানাতে ঠিক কোন-কোন মালমশলা যে লাগে, তা গত আড়াইশো বছর ধরে স্টাইনবেক পরিবারের ট্রেড-সিক্রেট। সেসব উপাদানের কথা ইভা তার বিজনেস-পার্টনার স্টিফেনকেও কোনোদিন বলেননি, দাদু তো কোন ছাড়। তবে তার মধ্যে একটা উপাদান হচ্ছে ব্লাড-চারকোল রক্ত থেকে তৈরি করা অঙ্গার। এবং সেটা লাগে প্রচুর পরিমাণে।
দাদুকে আর বেশি বুঝিয়ে বলতে হয়নি। কবরডাঙা রোডের একপাশে ওই কসাইখানাটা তো তার অনেক আগে থেকেই ছিল, যদিও সেটা ছিল কসাইখানার পেছনদিক। এদিক দিয়ে কেউই যাতায়াত করত না। তবে রাস্তার ধারের নালি দিয়ে দিনের মধ্যে চারবার জলের মতন হুড়হুড় করে বয়ে যেত জবাই করা পশুর রক্ত।
নালিটা ছিল দাদুর কারখানার একেবারে গা ঘেঁষে। ইচ্ছে করলে পুরো রক্তস্রোতটাকেই কারখানার ভেতরে এনে ফেলা যায়। ইভা বললেন, সেইজন্যেই এই জমিটা তার এত পছন্দ। দাদুকে ওই জমির জন্যে তিনি যা দাম দিতে চাইলেন, সেটা অবিশ্বাস্য রকমের বেশি এবং সোমেশ্বর কাপালির মতন একজন ডুবন্ত ব্যবসায়ীর পক্ষে দারুণ লোভনীয়।
তবু দাদু তখনই ওঁদের কোনো কথা না দিয়ে একসপ্তাহ সময় চাইলেন এবং পুরো সপ্তাহটা জুড়ে তিনি বম্বে, কলকাতা আর মাদ্রাজের নানান পাইকিরি বাজারে নানারকমের খোঁজখবর নিলেন। সেই সময়টা স্টিফেন আর ইভা রডন-স্ট্রিটের একটা হোটেলে শান্তভাবে অপেক্ষা করলেন। একসপ্তাহ বাদে সোমেশ্বর ওদের জানালেন যে, তিনি জমি বিক্রি করতে রাজি, তবে পুরো দামের কিছুটা তিনি নেবেন ক্যাশে আর বাকিটার জন্যে তাকে কোম্পানির একজন পার্টনার করে নিতে হবে।
কেন? এরকম ডিসিসন নিলেন কেন? আমি জিগ্যেস করলাম।
বিরাজ কাপালি বললেন, আসলে দাদু এরমধ্যে খোঁজ নিয়ে দেখেছিলেন যে, স্বাধীনতার পরে ভারতের বাজারে আর ইওরোপ-আমেরিকা থেকে আগের মতন অবাধে পোর্সেলিন আমদানি হচ্ছে না। অথচ দেশে নব্য ধনীদের সংখ্যা ক্রমশই বেড়ে চলেছিল। খুলছে নতুন-নতুন পাঁচতারা-তিনতারা সব হোটেল আর দামি রেস্তোঁরা। সব মিলিয়ে দাদু বুঝতে পেরেছিলেন, সময়টা এমন যে, ভালো-কোয়ালিটির পোর্সেলিনের বাসন বাজারে পড়তে পাবে না! সেইজন্যেই তিনি চেয়েছিলেন পার্টনারশিপ।
ইভা আর স্টিফেন দাদুকে আটকাবার অনেক চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দাদু ছিলেন নাছোড়। অগত্যা তাঁরা দাদুকে ওই জমি-বাড়ির পরিবর্তে তিন-লক্ষ টাকা আর কোম্পানির শতকরা কুড়িভাগের অংশীদারি দিতে বাধ্য হলেন।
কবরডাঙার ওই কারখানা-ঘরের খোলশটুকুই শুধু রইল। বন্ধ হয়ে গেল জটাকেশী ফার্মেসি। ছাঁটাই হয়ে গেল পুরোনো লোকজন। বিদেশি পার্টনাররা কারখানার বাইরের দিকে তেমন কিছু পরিবর্তন করলেন না, শুধু পঙ্খের কাজ করে ওই যে কোম্পানির নাম, ওটাকে খোদাই করে দিলেন আর একটা স্লুইস-গেটের ভেতর দিয়ে কারখানার ভিতরে রক্ত নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন।
কারখানা-ঘরের ভিতরের খোল-নলচে সবই বদলে গেল। দাদুই খুঁজেপেতে হাওড়ার কোন গ্রাম থেকে তিনজন কারিগরকে নিয়ে এলেন। লোকগুলোর দেশিয় পদ্ধতিতে চিনেমাটির বাসন তৈরির অভিজ্ঞতা ছিল। তবে হেড-মিস্ত্রি ছিলেন ওরা দুজন—স্টিফেন আর ইভা। দাদু কখনোই কারখানা-ঘরের ভেতরে পা রাখেননি। কারণটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। যেখানে নিজের ওষুধের কারখানা ছিল, সেখানে অন্য কাজ হতে দেখলে মন খারাপ হতে বাধ্য।
তবে স্টিফেন আর ইভার তাতে কিছু আটকাল না। বিদেশ থেকে আনানো হল চায়না-ক্লে, ফেলসপার আর আরো কী কী যেন সব কাঁচামাল। রানিগঞ্জ থেকে ট্রাকে করে এল ফার্নেসের জন্যে বিশেষ কোয়ালিটির কয়লা। শেষমেষ উনিশশো-উনপঞ্চাশ সালের অক্টোবর-মাসে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির ফার্নেসে প্রথমবারের মতন আগুন জ্বলল।
কাপালি স্যার হাত বাড়িয়ে একটা ডায়েরি তুলে নিলেন। দেখলাম, ডায়েরিটার অনেকগুলো পাতার ভাঁজে বুকমার্ক দেয়া আছে। একটা পাতা খুলে তিনি ঝুঁকে পড়লেন। চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ লেখার ওপরে চোখ বুলিয়ে বললেন, উনিশশো পঞ্চাশের সাতই জানুয়ারি। দাদু লিখছেন, প্রথম ত্রৈমাসিকে বিক্রির পরিমাণ খুশি হওয়ার মতন। লভ্যাংশ হিসেবে আমি পেয়েছি কুড়িহাজার তিনশো একুশ টাকা। মনে হচ্ছে ভাগ্যের চাকা আবার ঘুরছে। ছোটমেয়ের জন্যে আমোদপুর থেকে একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছে। ভাবছি কথাবার্তা পাকা করে নেব। দেনা-পাওনার জন্যে আটকাবে না।
আবার কয়েকটা পাতা উলটে অন্য একটা পাতায় এসে স্থির হল তাঁর হাত। বললেন, ওই বছরেরই অক্টোবর মাস। সতেরো তারিখ। দাদু লিখছেন, গত তিনদিন শরীর এবং মনের ওপর দিয়ে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। চোদ্দো তারিখ রাতে স্টিফেন মেয়ারের মৃত্যু হয়েছে। অপঘাতে মৃত্যু। এবং বীভৎস মৃত্যু। বেচারা ব্লো-পাইপ দিয়ে গলন্ত কাঁচের বুদ্বুদে ফুঁ দিয়ে ফুলদানি বানাচ্ছিল। কীভাবে কে জানে, সেই পেতলের ব্লো-পাইপ ওর টাকরা ফুঁড়ে মাথায় ঢুকে গিয়েছিল।
সময়টা ছিল গভীর রাত, সেইসময়ে ওদের ফাউন্ড্রির মধ্যে আর কেউ ছিল না। কাজেই কী করে যে এমন ঘটনা ঘটল সেটা কেউ বলতে পারছে না। ডাক্তারের অনুমান, কাজ করতে-করতেই স্টিফেনের একটা মাইল্ড হার্ট-অ্যাটাক হয়ে থাকবে, যার ফলে ওর মাথা ঝুঁকে পড়েছিল সামনে! ব্লো-পাইপের পেছন দিকটা মুখের তালু ফুঁড়ে ওপরে উঠে গিয়েছিল। আমাদের কংগ্রেসি কাউন্সিলরের দয়ায় থানা-পুলিশের ঝামেলা এড়ানো গিয়েছে।
ইভাকে জিগ্যেস করেছিলাম, স্টিফেনের মৃতদেহ ওর দেশে পাঠানোর দরকার আছে কিনা। তাতে ইভা অদ্ভুত একটা কথা বললেন। এই প্রথম ওর কাছ থেকে জানলাম, স্টিফেন আদতে ছিলেন রুমানিয়ার জিপসি সম্প্রদায়ের লোক। ওঁর না আছে ঘর, না আছে সংসার। একটা সময় অবধি আমি ভাবতাম, স্টিফেন বুঝি ইভার অসমবয়সি প্রেমিক। ইভাকে ব্যবসার পয়সাকড়ি ওই জোগাচ্ছে। কিন্তু গত কয়েকদিনে বুঝলাম, মোটেই তা নয়। ইভার সঙ্গে নাকি ওঁর সম্পর্কটা ছিল গুরু-শিষ্যার।
শুনে চমকালাম। স্টিফেন আবার ইভাকে কী শেখাতেন? যেদিন ওদের সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়েছিল, মনে আছে, সেদিন স্টিফেনই আমাকে বলেছিল, পোর্সেলিন বানানোর ‘নো-হাও’ সব ইভা জানে। সে-সব স্টাইনবেক পরিবারের বংশগত গোপন বিদ্যা; বাইরের কেউ জানবে না।
তাহলে?
ইভাকে জিগ্যেস করলাম, গুরু-শিষ্যা কথাটার মানে কী। প্রশ্নটা শুনে ইভা স্পষ্টতই অপ্রস্তুত হলেন। আমতা-আমতা করে বললেন, না, মানে ওই ইয়ে আর কি। কোনো শিল্পসামগ্রীই কি আর একটা কালচারের মধ্যে আটকে থাকে? নানান কালচারের মিশ্রণ থাকে তার মধ্যে। ও আমাকে শেখাত রুমানিয়ার ট্র্যাডিশনাল পোড়ামাটির বাসনপত্রের ডিজাইন।
ডায়েরি থেকে মুখ তুলে কাপালি স্যার বললেন, সে যাই হোক, স্টিফেনের মৃত্যুতেই গল্প শেষ হল না। পরের বছর, মানে উনিশশো-একান্নর দোসরা মার্চ, ওই ছোট্ট কারখানাটার চৌহদ্দির মধ্যে আরো এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল।
সেই-যে হাওড়া থেকে সোমেশ্বর কাপালি তিনজন কারিগরকে নিয়ে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেল। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, আগের রাতে তিনজন লেবার একই ঘরে ঘুমিয়েছিল। তারপর, তখন গভীর রাত, ওই যে-লোকটা পাগল হয়ে গিয়েছিল, সেই লোকটা বাকি দুজনকে ঠেলা মেরে জাগানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাকি দুজনের চোখে তখন গাঢ় ঘুম। ওরা ওঠেনি। শুধু আবছা মনে আছে, লোকটা বলেছিল, কারখানা-ঘরে একটা কিছু হচ্ছে। সে দেখতে চলল।
সেই ছিল লোকটার শেষ কথা। পরদিন ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে বাকি দুজন কারিগর দ্যাখে তাদের সেই সঙ্গী কারখানা-ঘরের দরজায় বসে আছে। কখনো হাসছে, কখনো কাঁদছে। আবার কখনো প্রবল আতঙ্কে চিৎকার করে উঠছে। তাকে গ্রামের বাড়িতে ফেরত দিয়ে আসা হল। বাকি দুজন মিস্ত্রি কারখানায় থেকে গেল।
কিন্তু সে মাত্র দুদিনের জন্যে। দুদিন পরেই, তখন সবে ভোরের আলো ফুটেছে, সেই দুজন মিস্ত্রি আমাদের এই সার্পেন্টাইন-লেনের বাড়িতে এসে দাদুর পায়ের কাছে মাটিতে থেবড়ে বসে পড়ল। হাঁউমাঁউ করে তারা যা বলল, তার সার কথা, কারখানা-ঘরে ভূত আছে। দাদু অবাক হয়ে বললেন, সে আবার কী! ওরা বলল, ওদের সেই সঙ্গী পাগল হয়ে যাওয়ার পর থেকে গত দু-রাত ওরা সজাগ হয়ে শুচ্ছে। সেইজন্যেই ওরা দেখতে পেয়েছে কারখানা-ঘরে গভীর রাতেও ফার্নেস জ্বলে। হঠাৎই পচা গন্ধে ভরে যায় চারপাশ আর হিংস্র কোনো জানোয়ারের গরগরানির মতন আওয়াজ আসে ওদিক থেকে। তাছাড়া…
ওরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে থেমে গেল।
দাদু ছাড়বার পাত্র নন। কড়া-গলায় বললেন, থামলে কেন? তাছাড়া কী?
তাছাড়া—ওরা আমতা-আমতা করে বলল, আমাদের চোখের ভুল হতে পারে—আপনি আমাদের নাম করে এই কথাটা কাউকে বলবেন না কোবরেজমশাই—মনে হয় দু-রাতেই যেন ইভা মেমসাহেবকে কারখানা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছি। একদম নাঙ্গা উদোম।
চোখের ভুল যে নয় সে কথা বোঝার মতন বুদ্ধি দাদুর ছিল। দুটো সুস্থ-সবল লোকের চোখ তো আর একইরকম ভুল দেখতে পারে না। দাদু ওদের বললেন, তোরা মেমসাহেবকে কিছু বললি না? এতদূর দৌড়ে চলে এলি?
বলব কেমন করে? কোন ভাষায় বলব? মেমসাহেব বাংলা-হিন্দি কিছুই জানেন না। স্টিফেনসাহেব ভাঙা ভাঙা হিন্দি জানতেন। তিনিই আমাদের কাজকর্ম বুঝিয়ে দিতেন। তাছাড়া মেমসাহেব তো বেলা বারোটা অবধি ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমোন। আপনি জানতেন না?
না, ইভার এই অভ্যেসের কথা দাদু সত্যিই জানতেন না। তিনি কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থেকে বললেন, তা তোরা এখন কী করবি?
ওদের মধ্যে একজন গেঁজের মধ্যে থেকে একটা বড় চাবির গোছা বার করে দাদুর পায়ের কাছে নামিয়ে দিয়ে বলল, আপনিই আমাদের চাকরি দিয়েছিলেন, তাই আপনার কাছেই ইস্তফা দিয়ে গেলাম। আমাদের থাকার জায়গা আর কারখানা ঘরের চাবি এই রইল। আপনি রাখুন। পরে মেমসাহেবকে দিয়ে দেবেন। আমরা দেশে ফিরে গেলাম। এই মাসের পাঁচদিনের মজুরি পরে কখনো এসে নিয়ে যাব না হয়।
দাদু দেখলেন, ওরা সত্যিই ঝোলা গুছিয়েই বার হয়েছে। দাদু ওদের হাতে পাঁচদিনের মজুরি ধরিয়ে দেওয়া মাত্র ওরা হ্যারিসন রোডের দিকে পা চালাল। একবার ঘুরেও তাকাল না।
